প্রেমের ঘাটের মাঝি #পর্ব ৯ #লেখনিতে খুশবু আকতার

0
127

#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ৯
#লেখনিতে খুশবু আকতার

“সুজন ভাই খেয়ে নাও।”

সুজন তখন জহিরের ছোট চৌকির ওপর শুয়ে আছে।জুঁইয়ের কন্ঠে তাড়াহুড়ো করে উঠে বসলো।জুঁই ওর সামনে খাবার থালাটা রেখে আবার বলল,

“তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও।আর সকাল থেকে যে কিছু খাওনি সেই কথাটা কি আমাকে একবার বলা যায়নি?পর হয়ে গেলাম মনে হচ্ছে?”

সুজন আলতো হেসে বলল,

“না তেমন কোন ব্যাপার না।আসলে আজ সকাল থেকে কাজের এত বেশি চাপ ছিল যে আমি নিজেই ভুলে গিয়েছিলাম না খেয়ে আছি।”

খাবার থালায় হাত দিল সুজন।ভীষণ খিদে পেয়েছিল।নিজের বোনের শ্বশুরবাড়ি হলেও তার একটু খাবার খাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করার কোন অধিকার নেই।জুঁই সুজনের খাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।অন্যান্য দিন সুজন কে খেতে বললে কোনমতেই রাজি করাতে পারে না অথচ আজকে কি সুন্দর এক বাক্যে খেয়ে নিল,কোন কথা বলল না। নিশ্চয়ই অনেক ক্ষুধা পেয়েছিল।ভাগ্যিস জামশেদের বলা কথাগুলো সুজনের কান অব্দি পৌঁছায়নি। না হলে ক্ষুধা পেটে নিয়ে সারাদিন কেটে যেত।জুঁই এদিক ওদিক তাকিয়ে জহির কে খোঁজার চেষ্টা করল।সুজন সেটা খেয়াল করে বলল,

“জহির নেই।”

“আবার কোথায় গিয়েছে ও?”

“ঠিক বলতে পারছি না।শুধু বলল তোমার জন্য যেন কি আনতে যাচ্ছে।”

“একে নিয়ে তো আর পারিনা।দেখলোই আজকে বাড়িতে একটা ঝামেলা হলো আবার আজকেই কাউকে কিছু না জানিয়ে যেতে হয়েছে।একবার আসুক আজ ও মা/র খাবে।”

সুজন হাসলো।জুঁই অপেক্ষা করলো দাঁড়িয়ে যদি সুজনের কিছু প্রয়োজন হয় তাহলে এনে দেবে।কিন্তু সুজন আর কিছু চাইলো না।অতটুকু খাবারই গুছিয়ে খেয়ে হাত ধুলো।প্লেটটা ধুয়ে দিতে চাইলে জুঁই আপত্তি জানালো।সুজনের খাওয়া শেষ তাই জুঁই চলে যাওয়ার জন্য উদ্দ্যত হলো।সুজন কি যেন একটা ভেবে জুঁই কে ডেকে উঠলো।

“হ্যাঁ বলো।”

সুজন আনমনে প্রশ্ন করল,

“তোমার কি মনে হয় তোমার দুলাভাই হিসেবে কি মতিউর সাহেবের থেকে আমি খারাপ হতাম না ভালো হতাম?”

“হঠাৎ এই প্রশ্ন?”

“আজ তোমায় বলতে শুনলাম মতিউর সাহেব নাকি সবথেকে ভালো দুলাভাই।তোমার মনে আছে জুঁই তুমি আমায় আগে মজা করে এই নামে ডাকতে।কিন্তু যবে থেকে জবার বিয়ে হয়ে গিয়েছে আর ডাকো না।অবশ্য ডাকবেই বা কেন।জানো আমার মনে হয় আমি তোমার দুলাভাই হিসেবে অতটাও খারাপ হতাম না।”

কথাটা বলে সুজন জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে আলতো হাসলে।জুঁই খাবার থালাটা মেঝেতে রেখে সুজনের দিকে এগিয়ে এলো।আলতো হেসে বলল,

“তুমি মানুষ হিসেবে খুব ভালো সুজন ভাই।আমি জানি তুমি আমার দুলাভাই হিসেবেও খুব ভালো হতে।তবে তোমার সাথে তো আমার এখন সেই সম্পর্ক নেই।তবে আমি এতোটুকু বলতে পারি তুমি একজন ভাই হিসেবে সেরা।আমার নিজের ভাইদের থেকেও তুমি অনেক বেশি ভালো।অন্তত আমার বড় আর মেজ ভাইয়ের থেকে আমি তোমায় বেশি ভালোবাসি।ছোট ভাইজান তো ভালো তাই তোমায় ছোট ভাইজানের সমান ভালোবাসি।”

“মতিউর সাহেব তোমার মন জয় করে নিয়েছে তাই না?এই বাড়িতে আমার চাকরিটা চলে গেলে আমাদের তো নিয়মিত যোগাযোগ থাকবে না।তখন তুমি নিশ্চয়ই আমায় ভুলে যাবে। মতিউর সাহেবের সাথে তোমার সম্পর্কটা আরো ভালো হয়ে যাবে।”

“কেন এসব কথা বলছো সুজন ভাই?ওনার সাথে তোমার তুলনা করছো কেন?”

“আচ্ছা তোমার কি মনে হয় জবাকে আমি বেশি ভালোবাসি না উনি বেশি ভালোবাসেন?”

“তুমি তো নিজেই আজ বলে এলে যে দুলাভাই নাকি আপাকে ভালবাসার দিক দিয়ে তোমাকে কখনোই হারাতে পারবে না। নিজের কথার উপরে কি ভরসা নেই নাকি? নিজের ভালবাসার উপর নিজেই সন্দেহ করছো?”

সুজন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।মতিউরের চোখে জবার জন্য যে ভালোবাসা দেখেছিলো সেটা তো আর অস্বীকার করা যায় না।কিন্তু একটা বিষয় বুঝতে পারছে না যে সেই ভালোবাসা সুজনের ভালোবাসার সমকক্ষ ছিল কিনা।

জুঁই থালাটা হাতে নিয়ে চলে যেতে ধরলো। দরজার কাছে যেতেই জহির এলো।হাতে অনেকগুলো কদম ফুল।জুঁইয়ের সেদিকে নজর গেল ঠিকই তবে দেখেও না দেখার ভান করে মুখে রাগ ফুটিয়ে তুলে জহির কে বলল,

“ওই কালা, তোর সাহস খুব বেড়েছে তাই না?যখন তখন কাউকে কিছু না জানিয়ে কোথায় বেরিয়ে যাস?প্রেম-টেম করছিস না তো আবার?”

জুঁইয়ের শেষের বাক্যটা শুনে জহিরের মুখটা শুকিয়ে গেল। ভয় পেল বোধহয়।জুঁই কে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

“এইসব কি কস জুঁই?তুই ছাড়া তোর কালা কারো দিকে চোখ তুইলাও তাকায় না।”

“এই ভয়টা যেন সারা জীবন থাকে।না হলে না তোর চোখ উপড়ে নদীতে ফেলে দেবো।এখন বল কোথায় গিয়েছিলি?”

জহিরের হাতে থাকা কদম ফুলগুলো জুঁইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে আলতো হেসে বলল,

“তুই না কদম ফুল চাইছিলি আমার কাছে।কদম ফুল আনতে গেছিলাম।ধর।”

জুঁই বেশি কিছু বলল না, চুপচাপ ফুলটা হাতে নিল।একটা বিষয় খেয়াল করল আসার পর থেকে জহির নিজের একটা হাত পিছনে লুকিয়ে রেখেছে। যেন আড়াল করতে চাইছে জুঁইয়ের থেকে। সন্দেহ হলে জুঁইয়ের।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“তোর হাতে কি হয়েছে রে কালা?”

“কই কিছু হয় নাই তো?”

জুঁই চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল,

“মিথ্যা বলার ক্ষমতা তোর র/ক্তেই নেই অযথা চেষ্টা করছিস কেন?শোন তুই শুধু পারিসই নৌকা চালাতে আর হা করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে। এই দুইয়ের বাইরে অযথা আর কিছু করার চেষ্টাও করবি না।হাত দেখা।”

পিছন থেকে সুজন বলে উঠলো,

“হাতটা দেখা জহির।না হলে জুঁইয়ের হাত থেকে তুই নিস্তার পাবি না কিন্তু।”

শেষে বাধ্য হয়ে জুঁইয়ের জোড়াজুড়িতে নিজের হাতটা দেখাতে হলো।র/ক্ত দিয়ে পুরো হাতটা লাল হয়ে উঠেছে।জুঁই হাতটা দেখে আৎকে উঠলো। কাঁপা কাঁপা হাতে জহিরের হাতটা ধরে বলল,

“কি করে কা/টলো এতটা?”

জুঁইয়ের মুখ থেকে কথাটা শুনে সুজন বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।জহিরের ডান হাতের তালুতে লম্বা করে কাটার দাগ।সুজন যেন দেখেই বুঝলো কি করে এটা কাটতে পারে।তবুও নিশ্চিত হতে সন্দেহি গলার প্রশ্ন করল,

“মনে হয় গাছের ডাল দিয়ে কে/টেছিস তাই না?”

জহির মাথা নিচু করে বলল,

“হ।একখান ডাল ভাঙ্গা আছিল ওইডা দিয়াই কা/ইটা গেছে।কিন্তু বিশ্বাস কর জুঁই একটুও ব্যথা করতেছে না। তুই চিন্তা করিস না।”

জুঁই অগ্নিদৃষ্টিতে জহিরের দিকে তাকিয়ে হুংকার ছেলে বলল,

“একটা চ/ড় মে/রে তোর সব দাঁত ফেলে দেবো কালা।সাহস বেড়ে গিয়েছে তোর তাই না?মাতব্বরি করে কে তোকে ফুল আনতে যেতে বলেছিল?তোকে কষ্ট দিয়ে আমি এই ফুল গুলো নিয়ে কি করব?”

জহির কোন উত্তর দিলে না।সুজন তাড়াতাড়ি করে জহিরোর হাতের র/ক্তগুলো মুছে দিয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে নিজের রুমালটা বের করে হাতে বেঁধে দিল।করা গলায় হুকুম করে বলল,

“এ জায়গাটায় যেন আর পানি না লাগে।আর দয়া করে নিজের প্রেমিক সত্তাটাকে একটু দাবিয়ে রেখে কিছুদিনের জন্য হাতটাকে বিশ্রাম দিন।আমি বাইরে যাচ্ছি তোমরা কথা বলো জুঁই।”

“না সুজন ভাই তুমি থাকো।কালার সাথে আমার কোন কথা নেই।”

জুঁইয়ের কথা শুনে সুজন হালকা হেসে চলে গেল।এদিকে বেচারা জহিরের সাহস হচ্ছে কিছু বলার। বরাবরি জহির জুঁই কে ভীষণ ভয় পায়।মেয়েটা অত্যাধিক রাগী।জহিরের উপরে নিজের রাগ দেখাতে পিছপা হয় না। বরং অন্যদের রাগও জহিরের উপরে দেখায়।তাতে অবশ্য জহিরের কোন অভিযোগ নেই।ওর উপর রাগ দেখাবে না তো বর কার উপর রাগ দেখাবে?জুঁইয়ের সব রাগ, অভিমান, দুঃখ, সুখ তো জহির কেই সহ্য করতে হবে তাই না?মিনমিনে গলায় জুঁই কে বলল,

“তুই রাগ করছোস জুঁই?”

জুঁই চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“না রাগ কেন করব?আমি তো ভীষণ খুশি। দেখ আমি দাঁত বের করে হাসছি।”

“রাগ করতেছোস কেন?হইয়া গেছে তো হইয়া গেছে। এখন তো চাইলেও আর কিছু ঠিক করন যাইবো না।এইডা বাদ দিয়া তুই আমারে ক তোরে আমি যে ফুল আইনা দিলাম তুই খুশি হস নাই?”

জুঁইয়ের রাগটা একটু কমে গেল তবে জহির কে সেটা বুঝতে দিলে চলবে না।

“খুশি হওয়ারও কিছু নেই না হওয়ারও কিছু নেই।”

জুঁইয়ের উত্তরটা জহিরের একদমই পছন্দ হলো না।এত কষ্ট করে গাছে উঠে ফুলগুলো আনল আর জুঁইয়ের মাঝে বিশেষ কোনো হেলদোলই দেখা গেল না।মন খারাপ করে বলল,

“আমার উপর থেইকা মনে হয় তোর ভালোবাসা উইঠা যাইতেছে রে জুঁই।নাইলে কি আর আমার দেওয়া ফুল তোরে খুশি করতে ব্যর্থ হয়?”

জুঁইয়ের মনটা এবার সত্যি নরম হয়ে এলো।ভাবলো একটু বেশি হয়তো কঠোরতা দেখিয়ে ফেলেছে জহিরের প্রতি।গিয়েছিল তো ওকে খুশি করতে।তাছাড়া জুঁই তো একদিন কদম ফুলগুলো চেয়েছিল। তাহলে বেচারা জহিরের দোষটা কি?

“হয়েছে আর ঢং করতে হবে না।হয়েছি তো খুশি।”

“তুই খালি আমারে রাগ দেখাস।রাগ দেখা সেইডা সমস্যা না কিন্তু কথা হইলো গিয়া আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যে তুই আর আমারে আগের মতন ভালোবাসিস না।”

“কেন মনে হয়?”

“জানিনা।তোরে হারানোর ভয় সব সময় আমার মনের মধ্যে থাকে রে জুঁই।আমার ক্যান জানি মনে হয় কোনো না কোনো একদিন আমি তোরে হারাইয়া ফালামু।মনে হয় তুই আমারে ছাড়া অন্য কারো লগে সংসার করবি।আমার ভাবনা গুলান কি সত্যি রে জুঁই?”

জুঁই কপট রাগ দেখিয়ে বলল,

“তোকে এবার আমি সত্যি সত্যি একটা চ/ড় লাগালেই তুই নিজেই বুঝতে পারবি যে তোর ভাবনা সত্যি না মিথ্যা।আমার ভালোবাসায় একদম সন্দেহ করবি না কালা।অন্য কারো সাথে সংসার বাধার আগে আমি তোর সাথে এই নদীতে ডুব দিয়ে ম/রবো।”

মাটিতে পড়ে যাওয়া কদম ফুলগুলো জুঁই হাতে তুলে নিয়ে মুগ্ধ নয়নে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে আনমনে হেসে জহির কে বলল,

“ওই কালা।”

“হু ক।”

“সবাই তো নিজেদের ফুলশয্যার ঘর হয় রজনীগন্ধা নাইলে গোলাপ দিয়ে সাজায় আমরা বরং কদম ফুল দিয়ে সাজাবো কেমন?”

জুঁই নির্বিঘ্নে কথাটা বললেও জহির লজ্জা পেল।ইতস্তত গলায় বলল,

“এইসব কি কইতাছোস? বিয়াই তো হইলো না এখনো।”

জুৃঁই বিরক্তি মাখা গলায় বলল,

“তো যখন বুঝতেই পারছিস বিয়ে এখনও হয়নি তাহলে লজ্জা পাচ্ছিস কেন মেয়েদের মতন?”

“কই?লজ্জা পাই নাই তো।”

“আমায় কি তোর কানা মনে হয়?জানিস তোকে নিয়ে আমার খুব চিন্তা হয়।”

জহির উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,

“ক্যান?”

“এই যে তুই এত লাজুক আমি ভেবে পাইনা বিয়ের পর তুই কি করবি।আদৌ কি তুই সামনের দিকে এগোতে পারবি?”

কোন জটিল কথা চটপট ধরে ফেলার মতন ক্ষমতা জহিরের নেই। জুঁইয়ের এই কথাটাও তার কাছে বেশ জটিল লাগলো। ফলে খুব তাড়াতাড়ি মস্তিষ্ক ধারণ করতে পারল না। বেশ কিছুটা সময় মনোযোগ দিয়ে ভাবার পর বুঝতে পারল।সে ছেলে হয়ে একটা মেয়ের কথায় লজ্জা পেয়ে গেল।চোখ মুখে অস্বস্তি ফুটে উঠলো।জহিরের অস্বস্তি মাখানো মুখটা দেখে জুঁই ফিক করে হেসে ফেলল।

“তোকে দিয়ে কিছু হবে না রে কালা।”

হাসতে হাসতে কথাটা বলে জুঁই চলে গেল।জহির ওর যাওয়ার পানে বোকার মতন তাকিয়ে থাকলো।মনে মনে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল,

“সত্যি কি আমারে দিয়া কিছুই হইব না?”
______
রাতে খেতে বসে সবার মাঝে জুঁইয়ের মুখটা দেখতে না পেয়ে জলিল তালুকদার কপাল কোঁচকালেন।নিজের স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলেন,

“আনোয়ারা জুঁই কোথায়?”

“জুঁই খাইবো না রাইতে।”

“খাবে না কেন?শরীর খারাপ নাকি?”

“না শরীর ভালোই আছে।”

“তাহলে সমস্যা কি?”

আনোয়ারার মুখটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে তিনি ভয়ে কিছু একটা বলতে পারছেন না,ইতস্তত বোধ করছেন। উপস্থিত প্রত্যেকেরই তার দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভরা মুখটা দেখে সন্দেহ হলো।কিন্তু ঘটনাটা যে আসলে কি সেটা দু একজন বাদে আর কারোরই ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না। ঝামেলা যে হয়েছে সেই বিষয়ে মতিউর নিজেও নিশ্চিত হলো তবে কি ঘটেছে সেটা তার জানা নেই।তার পাশে চুপচাপ বসে থাকা জবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি হয়েছে জবা?”

জবা ধীর গলায় বলল,

“বড় ভাইজানের সাথে জুঁইয়ের ঝামেলা হয়েছে।সুজনকে খাবার দিতে দিচ্ছিলো না বড় ভাইজান।তাই জুঁই ওর ভাগের রাতের খাবারটুকু সুজনকে দিয়েছে আর বলছে ও রাতে খাবে না।সেই জন্য এখন রাগ করে খেতে আসছে না।”

মতিউর ঘাড় কাত করে একবার বিরক্তি মাখা মুখে জামশেদের দিকে তাকালল।ভদ্র সভ্য ছেলেটাও মনে মনে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করলো জামশেদকে।সেই গালিগুলো যদি জামশেদ শুনতে পেত তবে নির্ঘাত তার মতন মানুষও লজ্জায় মাটিতে মিশে যেত।এদিকে আনোয়ারা চুপ করে বসে আছে।জলিল তালুকদার হালকা ধমক দিয়ে বলে উঠলেন,

“কিছু জিজ্ঞেস যখন করেছি তার উত্তর দিতে পারো না?বোবার মতন চুপ করে আছো কেন?”

আনোয়ারা কেঁপে উঠলেন।ওনার পাশে বসা জবা বলে উঠলো,

“জুঁই ওর ভাগের খাবার অন্য একজনকে দিয়ে দিয়েছে আব্বা।সেজন্য রাতে খেতে আসছে না।”

জলিল তালুকদারের ভ্রুঁ দ্বয়ের মাঝে সুক্ষ্ম ভাঁজ সৃষ্টি হলো।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“মানে?”

“মানেটা বরং তুমি জুঁইয়ের থেকেই শুনে নাও।সমস্যাটা কি সেটা তো ওই ভালো বলতে পারবে।দাঁড়াও আমি ওকে ডেকে আনছি।”

জলিল তালুকদার মাথা নাড়িয়ে সায় জানালেন।জবা উঠে গিয়ে জুঁইকে ডেকে এনে নিজে আবার তার পূর্বের জায়গায় বসে পড়লো।

জামশেদ তখনো নিশ্চিন্ত মনে খেয়ে যাচ্ছে।জাফর আবার বড় ভাইজানের ভীষণ ভক্ত।তাই সেও জামশেদ কে অনুসরণ করে নিশ্চিন্ত মনে চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে।খাবার হাত থেমে আছে জাকির,জলিল তালুকদার আর মতিউরের।মতিউর মনে মনে ঠিক করেছে শ্বশুরের সামনে কোন ধরনের বেয়াদবি কথাবার্তা সে বলবে না,যতই হোক জামাই মানুষ শশুরের সামনে ভদ্র থাকতে পারলে শ্বশুরবাড়িতে তারই সুবিধা।আড়ালে না হয় পরে জামশেদের সাথে বোঝাপড়া করা যাবে।

“বল আব্বা।”

জলিল তালুকদার গম্ভীর গলায় জুঁইকে প্রশ্ন করলেন,

“খাবার কেন খেতে আসো নি?”

জুঁই আড় চোখে একবার জামশেদ কে দেখে নিয়ে বলল,

“তোমার বাড়িতে যে দুর্ভিক্ষ লেগেছে।আমি এক বেলা না খেলে যদি সে খাবারটা বেঁচে যায় তাহলে তো তোমাদেরই লাভ তাই না?এমনিতেও তিনবেলা বসে বসে খাই জন্য খোঁটার তো কমতি হচ্ছে না।”

“কে খোঁটা দিয়েছে তোমায়?”

“কেন তোমার বড় ছেলে।”

“কি করেছে?”

“বড় ভাবি সুজন ভাইকে একটু খাবার দিতে চেয়েছিলো তোমার বড় ছেলের সেটা সহ্য হলো না।এক থালা ভাত আর এক পিছ মাছ দিলে তো এই সংসার আকাল পড়বে খাবারের।সেজন্য আমি আমার ভাগের রাতের খাবারটুকু সুজন ভাইকে দিয়ে দিয়েছি।তাহলে সেই হিসেবে তো আমি আর রাতের খাবারটুকু পাই না তাই না আব্বা?তাই খেতে আসিনি।”

এবারে আর জামশেদ নিজের খাওয়া চালিয়ে যেতে পারল না।মতিউর মুগ্ধ নয়নে জুঁইয়ের বলা কথাগুলো শুনল।মেয়েটার সাহস আছে বলতে হবে।ইচ্ছে তো করছে জুঁইয়ের এই সাহসিকতার জন্য বাহবা দিতে কিন্তু এখন সেটা করলে ঝামেলা বাড়বে।জলিল তালুকদার গম্ভীর গলায় জামশেদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“জামশেদ এসব কি শুনছি?”

জামশেদ মুখের মধ্যে অবশিষ্ট খাবারটুকু গিলে স্বাভাবিক কন্ঠে জলিল তালুকদার কে বলল,

“জুঁই যা বলল তাই শুনলেন আব্বা।আর এখানে তো আমি অবাক হওয়ার মতন কিছু দেখছি না।ভুলে যাবেন না সুজন আমার শালা।ওর সাথে আপনাদের সবার পরিচয় আমার সূত্র ধরে।তাই ওর যেকোন বিষয়ে সিদ্ধান্তটা আমিই নেব।”

“সে তুমি নিতেই পারো।কিন্তু ভুলে যেও না সুজন আমার বিশ্বস্ত কর্মচারী সেই হিসেবে আমারও অধিকার আছে ওর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার।আর এসব সম্পর্কের কথা বাদ দাও,মানুষ হিসেবেও তোমার এই কাজটা করা উচিত হয়নি।”

“জুঁইকে আরো প্রশ্রয় দিচ্ছেন?”

“ব্যাপারটা প্রশ্রয় দেওয়া না দেওয়ার না।তোমার এই সব অমানবিক কাজকর্মের জন্য আমার মেয়ে সারারাত না খেয়ে বসে থাকতো।আর তাছাড়া ভুলে যেওনা সম্পত্তি সব এখনো জলিল তালুকদারের নামেই আছে।এই বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্য এখনো আমার টাকাতেই খাচ্ছে।সেই হিসেবে তুমি কেন ওকে খোঁটা দেবে?”

“তাহলে তো আমায় বলতে হচ্ছে সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা করে দিন।তাহলে আর আপনার মেয়েকে কথা শোনাতে হবে না আমার।”

জামশেদের খাওয়া তখনও সম্পূর্ণ হয়নি।প্লেটের অবশিষ্ট খাবারের মাঝে হাত ধুঁয়ে উঠে চলে গেল।জাফর জামশেদের অনুগত ভাই হিসেবে নিজের খাওয়া অসম্পূর্ণ রেখে উঠে চলে গেল।ওদের দুজনের পিছু পিছু তাদের স্ত্রীরাও চলে গেল।সেদিকে আর জলিল তালুকদার মনোযোগ দিলেন না।হাত বাড়িয়ে আদুরে কন্ঠে জুঁইকে কাছে ডাকলেন।জুঁই গুটিগুটি পায়ে গিয়ে জলিল তালুকদারের পাশে বসল।থালায় ভাত মাখতে মাখতে জলিল তালুকদার বললেন,

“আজ আমি আমার আম্মাকে খাইয়ে দেবো।আর শোনো মা তোমার আব্বা এখনো বেঁচে আছে।কারো ওপর রাগ করে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেবে না।”

পরিস্থিতি যেহেতু স্বাভাবিক হয়ে গেছে তাই সেই হিসেবে মতিউরও খাওয়া শুরু করে দিয়েছে।জলিল তালুকদারের এমন কথা শুনে জুঁই কে বলল,

“জুঁই তো দেখছি বড্ড আদরের।তা আব্বা এই আদরের মেয়েকে পরের ঘরে পাঠাবেন কি করে?তাই বলছি জুঁই কে কাছে-কুলেই রেখে দিন।”

জলিল তালুকদার মৃদু হেসে বললেন,

“মেয়ে হয়ে যখন জন্ম নিয়েছে পরের ঘরে তো পাঠাতেই হবে বাবা।আমার জবা কেও তো পরের ঘরে পাঠিয়েছি।”

“তা অবশ্য ঠিক বলেছেন।মেয়েদের আপনার মতন এত ভালোবাসতে আমি কিন্তু খুব কম মানুষকেই দেখেছি। অন্তত নিজের ছেলেদের উপর প্রাধান্য দিতে কাউকে দেখিনা।”

“দুই মেয়েই আমার বড় আদরের বাবা।”

জলিল তালুকদারের মুখ থেকে এমন কথা শুনে জবা আনমনে বলে উঠলো,

“তবে সেই ভালোবাসাটা ততদিন থাকে যতদিন তারা তোমার কথায় উঠবস করে তাই তো আব্বা?যখনই গ্রামের মাতব্বরের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করবে তখনই সে আর তার প্রিয় থাকে না হোক সেটা তার নিজের আদরের মেয়ে।”

মতিউরের খাবার হাত থমকে গেল।উপস্থিত প্রত্যেকে চমকালো।জলিল তালুকদার নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে জবার দিকে তাকালেন।কথাটা হয়তো জবা বলতে চায়নি মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে।যখন হুশে এলো যে সে ভুল জায়গায় ভুল কথা বলে ফেলেছে তখন অস্বস্তি তে পড়ল।সেখানে বসে থাকতে না পেরে উঠে চলে গেল।পরিবেশটা আরো একবার থমথমে হয়ে উঠলো।মতিউর স্বাভাবিক করার জন্য আনোয়ারা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আম্মা একটু ভাত দেন তো।তরকারি গুলো কিন্তু মারাত্মক হয়েছে খেতে।শ্বশুর বাড়িতে যদি আর কয়েকদিন থাকি না আম্মা আপনার হাতের রান্না খেতে খেতে মোটা হয়ে যাব।”

আনোয়ারা তাড়াহুড়ো করে পাতিল থেকে ভাত তুলে মতিউরের প্লেটে দিয়ে বলল,

“হইলে হইবা তা কি হইছে?যতদিন শ্বশুর-শাশুড়ি বাইচ্যা আছে ততদিনই জামাই আদর পাবা আব্বা।আমরা না থাকলে কি আর তোমার শালারা এমন কইরা যত্ন নিব নাকি?”

কথাটার মর্মার্থ যে কতটা গভীর সেটা মতিউর আর জুঁই গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পারলো।তারা দুজন না থাকলে যেমন মতিউরের এই বাড়িতে জামাই আদর কমে যাবে এটা সত্যি ঠিক তেমনি আনোয়ারা জীবিত থাকা অবস্থাতেও যদি জলিল তালুকদারের কিছু হয়ে যায় তাহলে যে জুঁইয়ের জীবনেও ঘোর অশান্তি নেমে আসবে সেটাও সত্য।খাওয়া-দাওয়া শেষে মতিউর আর জলিল তালুকদার উঠে গেল।এবার খেতে বসলেন আনোয়ারা।জুঁই গিয়ে জবা কে ডেকে আনলো।বসে বসে মা আর বোনের খাওয়া দেখলো সে।খাওয়ার মাঝে কি যেন একটা ভেবে আনোয়ারা বলে উঠলেন,

“নিজের মাইয়া আর পরের মাইয়ার মধ্যে তফাত মেলা তাইনা রে জুই?”

জুঁই কপাল কুঁচকে বলল,

“হঠাৎ এই কথা কেন বললে আম্মা?”

আনোয়ারা খাওয়া থামিয়ে আনমনে হেসে বলল,

“তোর আব্বারে দেখ না,জামশদ তোরে খোঁটা দিছে লাইগা কত কথা শুনাইলো।কেন জানোস?কারণ তুই তার মাইয়া।তুই হইলি তার র/ক্ত।আর আমি হইলাম পরের মাইয়া।হের লাইগা আমারে খোঁটা দেওন যায়।তুই এক বেলা খাস নাই লাইগা তোরে নিজের হাতে খাওয়াইয়া দিল অথচ বিয়া হওনের পর এমনও রাইত গেছে যে বাড়ির সবাইরে ভাত দেওয়ানের পরে ভাত বাচে নাই আমি অমনি না খাইয়া ঘুমাইয়া গেছি।অথচ তোর আব্বা একটাবার জিজ্ঞাসা করে নাই যে জামশেদের মা তুমি খাইছো কিনা?”

দুই বোনই একটা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।কথাটা তিনি মিথ্যা বলেননি।ছোটবেলায় দেখেছে সামান্য কথাতেও ওদের আব্বা কিভাবে আম্মার গায়ে হাত তুলতো।বিনা কারণে রাগারাগি করত,লোকজন মানতো না যা নয় তাই বলে গালাগালি করতো,অপমান করত।অথচ জবা কিংবা জুঁইয়ের বেলায় এমন কখনোই হয়নি।দুজনেই জলিল তালুকদারের থেকে সমান আদর পেয়েছে।

জুঁই বলল,

“আব্বাকে নিয়ে তোমার মনে অনেক অভিযোগ তাই না আম্মা?বলোতো একটু শুনি কি কি অভিযোগ আছে।”

“জীবনডাই তো ফুরাইয়া আইলো রে মা এতদিনে আইসা অভিযোগ কইরা কি করমু।হে মারুক, কাটুক,গালি দেক তাও তো হে আমার স্বামী।তোর আব্বার অধিকার আছে আমার উপরে নিজের রাগ দেহানোর।কিন্তু জানোস রে মা একটু যদি ভালোবাসতো তাইলে হয়তো এত কষ্ট হইত না।তোর আব্বা আমারে কষ্ট দিছে ঠিকই কিন্তু কহনো মলম লাগাইতে আসেনাই।”

“আব্বাকে তুমি খুব ভালোবাসো তাই না?”

“এইডাই মাইয়া মানুষের জীবন রে মা।তোর স্বামী যতই খারাপ হোক না কেন কবুল কওনের পর তার উপরে মায়া ঠিকই পইড়া যাইবো।এইডা আল্লাহরই রহমত।মাইয়া মানুষের ধৈর্য ধারণ করা লাগে।আমরা ধৈর্য না ধরলে সংসার কেমনে টিকবো?তোর আব্বা যেমনই হোক না কেন আমারে তার বউ কইরা এই বাড়িত আনছে,তার বাড়িত থাকতে দিছে,তিনবেলা খাইতে দিছে,আমারে এই সংসার দিছে এত কিছুর পরেও তার নামে অভিযোগ করা আমার সাজে না।”

“কিন্তু তুমি যেটা চেয়েছো সেটাই দেয়নি তাই না?”

আনোয়ারার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।জীবনে ভালোবাসার খুব অভাব তার।সেই কোন ছোটবেলায় জলিল তালুকদারের বউ হয়ে এই বাড়িতে পা রেখেছিল।সংসারের তো কম গুলো দিন হলো না।এতগুলো দিনেও তিনি এটা মনে করতে পারেন না যে জলিল তালুকদার কখনো তাকে একটু ভালোবেসে কাছে টেনে নিয়েছেন কি না।সবটাই হয়তো ছিল অধিকারবোধ কিংবা পুরুষ দেহের চাহিদা।এই বংশের পুরুষদের নিজেদের নিয়ে ভীষণ গর্ব।তারা পুরুষ তারা সব পারে।তাদের স্ত্রী মানে তাদের কেনা গোলাম।আনোয়ারা কে চুপ করে থাকতে দেখে জবা বলে উঠলো,

“আব্বার এই ব্যবহারের কারণ কি আম্মা?আজ একটা সত্যি করে কথা বলোতো আব্বার সাথে তোমার এত ঝামেলার আসল কারণ কি ছিল?সত্যিই কি কোন কারণ ছাড়াই আব্বা তোমার গায়ে হাত তুলতো নাকি এর পেছনে বড় কোন কারণ আছে যেটা আমরা জানি না?”

আনোয়ারা আৎকে উঠলেন।উঁকি দিয়ে একবার বাইরেটা দেখে নিলেন যে কেউ শুনছে কিনা।সাবধানী গলায় জুঁই আর জবা কে বললেন,

“আস্তে কথা ক মা।তোর আব্বাই শুনলে কেলেঙ্কারি হইয়া যাইবো।”

জুঁই প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“সত্যি করে বলোতো মা কি সমস্যা ছিল?”

“তোরা তোর আব্বারে খারাপ ভাবিস না মা।আমি তগোরে কোনদিন কইবার চাই নাই কিন্তু আজ বুকটা কেমন জানি খা খা করতাছে।মনে হইতেছে কইলে শান্তি পামু।”

জুঁই উঠে এসে আনোয়ারার পাশ ঘেসে বসলো।কাঁধে হাত রেখে বলল,

“তুমি বলো আমরা শুনছি।”

“পাশের গেরামে একখান মাইয়া ছিল।নাম তার কমলা।যৌবনকালে তার লগে তোর আব্বার ভালোবাসার একখান সম্পর্ক নাকি ছিল।কিন্তু হে মাইয়ার চরিত্র ভালো ছিল না।তার নাকি নিয়মিত শহরে যাতায়াত ছিল।সেইহানে নষ্টামি কইরা বেড়াইতো।কিন্তু তোর আব্বা ওই মাইয়ারে বিয়া করনের লাইগা পাগল হইয়া উঠছিল।আর আমার শশুর আব্বা এমন মাইয়ারে কোনদিনও বাড়ির বউ কইরা আনবো না।শেষে তোর আব্বারে তিনি কইলো কমলারে বিয়া করলে কোন সম্পত্তি তোর আব্বারে দিবো না।শেষে আমি হইলাম কুরবানির গরু।আমার গরীব আব্বা আমার বড়লোক শ্বশুর আব্বার কাছে আমারে জবাই করনের লাইগা দিয়া দিল।”

“তারপর?”

জুঁই এর কন্ঠে তীব্র উৎসাহ প্রকাশ পেল।আনোয়ারা পুনরায় বলা শুরু করলেন,

“তারপর কি?বিয়া হয়ে গেল কিন্তু তোর আব্বার মন আমি পাইলাম না।কমলার লগে নিয়মিত তার যোগাযোগ ছিল।তার মনে তহনও কমলাই ছিল আর আমি ছিলাম কেবলমাত্র তার ঘরে।তারপরে কমলা একদিন তারে ছাইরা শহরের এক বাবুর লগে বিয়া কইরা গেরাম ছাইড়া চইলা গেল।”

“এই নিয়ে অশান্তি হতো?”

“হ।তোর আব্বা যহন ওই গেরামে কমলার লগে দেখা করতে যাইতো আমার পরান খান ফাইটা যাইত মা।আমি তো তারে ভালোবাসছি।কোন বউ তার স্বামী ভাগ অন্য মাইয়ারে দিব ক?তারে বহুত আটকানের চেষ্টা করছি কিন্তু পারি নাই।শেষে না পাইরা তার দুই পা খান চাইপা ধরছি,সে আমারে লাথি মাইরা তার ভালোবাসার কাছে চইলা গেছে।কতো চড় খাইছি,লাথি খাইছি, গালাগালি শুনছি,চুলের মুঠি ধইরা আমারে মারছে কিন্তু তারপরেও তারে যাওনের দেওনের লাইগা আমার মন মানে নাই।”

জবা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“নানাকে জানাওনি তুমি বিষয়টা?”

“হ জানাইছিলাম।আমার আম্মা আমারে কইছিল পুরুষ মানুষের এমন দুই একটা দোষ থাকেই।আমিতো মাইয়া আমার মাইনা নেওন লাগবো।তোর আব্বার উপরে দুই দিন রাগ কইরা বাপের বাড়ি আছিলাম তিনদিনের দিন আব্বা কইল বিয়াইত্তা মাইয়ারে তার পক্ষে বইসা খাওয়ান সম্ভব না।আমি যেন আমার স্বামীর ঘরে ফিরা আসি।শশুর আব্বা ততদিনে মারা গেছেন।শাশুড়ি রে কইলাম সে কইলো দুইডা পোলা হওনের পরেও যহন তার ব্যাটা অন্য মাইয়ার কাছে যাই তাইলে দোষ আমারই।আমি নাকি এতদিনেও আমার স্বামীরে বান্ধিতে পারি নাই আমার আঁচলে।”

“এই কমলার কাহিনী বন্ধ হয়েছে কবে আম্মা?”

“জাকির যহন আমার পেটোত,আমার ছয় মাস চলতাছে তহন কমলা বিয়া করে।তারপর থেইকা কমলা রে নিয়ে আর কোনো অশান্তি হয় নাই কিন্তু তোর আব্বা খুব খিটখিটে হইয়া গেছিল।তারপরে যহন তোরা দুইজন হইলি তহন তোর বব্বা একটু শান্ত হইছিল কিন্তু আমারে মা/রতো তহনো।তারপর তোরা ধীরে ধীরে বড় হইলি,এইতো কয় বছর হইলো তোর আব্বা আর আমার গায়ে হাত তুলে না।”

“আমি যদি তোমায় বলি আম্মা যে এই ঘটনাটা শোনার পর আমার আব্বার উপরে কিছুটা ঘৃণা জন্মালো তাহলে কি আমার অন্যায় হবে?”

জুঁইয়ের বলা কথাটায় আনোয়ারা হাসালেন।মেয়ের মাথা দুই হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“হইবো অন্যায়।তোর আব্বা তগোরে দুই বোন রে আদর ভালোবাসা দেওয়নে কোন কমতি রাখে নাই।আমারে হয়তো মা/রছে,গালাগালি করছে কিন্তু তগোরে খুব ভালোবাসছে।”

“তাহলে বলতে হচ্ছে আমি আমার আব্বাকে ভালোবাসি,ভীষণ ভালোবাসি।কিন্তু আমার মায়ের স্বামীকে ঘৃণা করি।”

কথাটা বলে জুঁই উঠে গেল।ওর যাওয়ার পানে জবা তাকিয়ে থাকলো।কি সুন্দর নিজের মনের কথাটা অনায়াসে বলে দিতে পারলো জুঁই।নিজের আব্বার উপরে ঘৃণার কথাটাও বলে দিতে পারলো।সেই একই ঘৃণাটা তো জবার মনেও সৃষ্টি হয়েছে তাহলে সে কেন নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারছে না?

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here