#কুন্দ ফুলের মালা
#পর্ব-১৫
হৃদয়ের থমথমে মুখ দেখে ঝিলমিল প্রশ্ন করলো,
“কিছু সমস্যা হয়েছে?”
“তোমার এই ছেলে মেয়েগুলোর পরীক্ষা আর কতদিন চলবে? ”
ঝিলমিল ভারী অবাক হলো। হৃদয়ের কুঁচকানো কপাল আর থমথমে মুখ দেখে ভেবেছিল আকাশ কে নিয়ে আবার কোনো সমস্যা হয়েছে। সরাসরি জিজ্ঞেস করতে ভয় পাচ্ছিলো। ঝিলমিল ওর কাঁধে ভর দিয়ে বাইকে বসার সময় বলল,
“ওই ছেলে মেয়েগুলো আমার না, আমি ওদের পড়াই। ”
হৃদয় হেসে ফেলল। হঠাৎ মেজাজ পরিবর্তন করে জিজ্ঞেস করলো,
“কিছু খাবে?”
“খাওয়া যায়। ”
বাইকের স্পিড বাড়িয়ে ছুটলো মেইন রোডের দিকে। ঝিলমিলের চুলগুলো কপালের দু’পাশের ক্লিপে আটকে থেকেও অবাধ্য হবার জন্য হাপিত্যেশ করছে। ঝিলমিল এক হাতে চুল ঠিক করতে গেলে হৃদয় উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“তুমি ভালো করে ধরে বসো। হাত সরিয়ে নিয়েছ কেন?”
ঝিলমিল শক্ত করে ধরে বসলো। সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তিরা উড়ে চলে যাচ্ছে বাতাসের সঙ্গে। ঝিলমিল একটু একটু করে হালকা হচ্ছে। সন্ধ্যার আলো মিলিয়ে গেছে পূবাকাশে। ঝিলমিল চোখ বন্ধ করে উপভোগ করতে লাগলো মুহুর্ত টা।
***
রাত এগারোটা বাজতে চলল। আকাশ খেয়েদেয়ে কিছু সময় হাটার নাম করে চৈতীদের বাসা থেকে সামনের রাস্তায় এলো। কল করলো অনিন্দিতা কে। অনিন্দিতা আজ সারাদিন এই কলটার অপেক্ষায় ছিলো। কল রিসিভ করে ব্যস্ত গলায় বলল,
“কেমন আছ তুমি? ”
আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমি বেঁচে আছি অনি। ”
অনিন্দিতার বুক কাঁপে। ব্যস্ত গলায় প্রশ্ন করে,
“আকাশ তুমি এভাবে কথা কেন বলছ?”
আকাশ অনিচ্ছাস্বত্তেও সংক্ষেপে কাল থেকে আজ অবধি সব খুলে বলল। অনিন্দিতা হতাশ গলায় বলল,
“এতো কিছু ঘটে গেছে? মনে হচ্ছে কোনো নাটকের গল্প শুনছি। ”
আকাশ রূঢ় ভঙ্গিতে বলল,
“তুমি আর আম্মু দুজনেই আসলে মানুষ চিনো না। কী বলেছিলে তোমরা? গ্রাম মফস্বলের মেয়েদের যা বুঝ দেয়া হয় তারা তাই বোঝে। আজ পর্যন্ত একটা নরমাল কথা চৈতীকে মানাতে পারি নি।”
অনিন্দিতা মন খারাপ করে বলল,
“আমি তেমনই জানতাম। থাক তুমি মন খারাপ কোরো না।”
আকাশ আক্রোশে ফেটে পড়ে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“মন খারাপ করব কেন? আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি আমার পুরো লাইফ শেষ হতে যাচ্ছে। আর আমি মন খারাপ করব? আমি তো চিল করব, ঢাকায় এসে বারে যাব, গলা ভিজিয়ে আনন্দ, ফূর্তি করব। ”
অনিন্দিতা আশ্বাসের সুরে বলল,
“আমি আছি তো নাকি। একটা না একটা উপায় ঠিক খুঁজে বের করব। তোমার লাইফ শেষ হবে না, কিছুতেই না। ”
প্রবল অন্ধকারেও এক টুকরো আলোর সন্ধান পেয়ে আকাশ নির্ভার হলো। বলল,
“আমি ভীষণ ক্লান্ত অনিন্দিতা, ঘুমাতে পারছি না, কাল রাতের পর আজ সন্ধ্যায় ভালো করে খেতে পারলাম। ”
অনিন্দিতা আঁতকে উঠে বলল,
“তোমাকে না খাওয়ায়ে রাখছে? খাও নাই ক্যান? ”
“তুমি আমার সিচুয়েশন টা বুঝতে পারছ না। আমি হয়তো বোঝাতে সক্ষম হচ্ছি না। এক গ্লাস পানি খেলেও সবাই চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকে। চৈতী কাঁদছে সেই অবস্থায় আমি পানি খাবার কথা ভাবছি কী করে!”
অনিন্দিতা মন খারাপ করা গলায় বলল,
“আকাশ তোমার আব্বু, আম্মু কী বলে? ”
“পুরো ডাকাত ফ্যামিলি। পাগল বানায়ে রাখছে সবাইকে। আব্বু, আম্মুকেও একটু পর পর কল করে ধমকাচ্ছে। এরা নাকি ভালো ফ্যামিলি। আম্মুর উপর রাগ হয়। কী দেখে এদের ভালো ভেবেছে। ”
“অর্থ, সম্পদ দেখে ভালো ভেবেছে। অর্থ প্রতিপত্তি এগুলোও দরকার। তারা এক হিসেবে ভুল করেন নি। ”
আকাশ চিৎকার করে বলল,
“ফোন রাখো তুমি! ”
অনিন্দিতা কিছু বলার আগেই আকাশ কল কেটে দিলো। ঘাড় ফিরাতেই ভুত দেখার মতো চমকে উঠলো। চৈতীর ছোট ভাই চমন দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। ও জিজ্ঞেস করলো,
“কী, কিছু বলবা?”
“কার সাথে চিল্লাইছেন? ”
“আমার আম্মুর সাথে। কোনো সমস্যা? ”
“না। বাড়ি আসেন, আপু আপনারে খোঁজে। ”
“আচ্ছা। ”
আকাশ যেতে যেতে দেখলো অনিন্দিতা টেক্সট করেছে। লিখেছে,
“মাথা ঠান্ডা রাখো আর কল হিস্ট্রি ডিলিট করে দাও। রেগে ডিসিশন নেয়া যাবে না। সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে অতি শিগগিরই। ”
আকাশ সঙ্গে সঙ্গে চ্যাট হিস্ট্রি, কল হিস্ট্রি ডিলিট করে দিলো। ওর ভাগ্য এখনো ভালো, চৈতীর হাত ফোন পর্যন্ত আসে নি। আসলে তো ফেসে যেত! প্রতি সপ্তাহে ফোনের সবকিছু ক্লিন করে ও, এখন মনে হচ্ছে আরেকটা ফোন রাখতে হবে। ”
***
অনিন্দিতা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। অপূর্ব পড়ার টেবিল থেকে উঠে কখন যে ওর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পায় নি। হঠাৎ পিছনে ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকে উঠলেও সামলে নিয়ে বলল,
“কিছু বলবি বাবু?”
অপূর্ব গম্ভীর গলায় বলল,
“তুমি কার সাথে কথা বলছিলে মা?”
“তোমার রিতা আন্টির সঙ্গে। কেন বাবু?”
অপূর্ব’র চোখে রাগের পরিবর্তে এখন হতাশা। ভাঙা গলায় বলল,
“মা তুমি বাবাকে কথা দিয়েছিলে… তারপরও আবার ওই লোকটাকে কল করছ?”
“তুমি পড়তে যাও বাবু। ”
“মা আমি কালিম্পং যাব না। আমাকে দূরে পাঠানোর জন্য কিছু করলে….
অনিন্দিতা কঠিন গলায় বলল,
“অপূর্ব! ”
অপূর্ব চোখ নামিয়ে নিলো। অনিন্দিতা একই রকম কঠিন স্বরে বলল,
“যাও তুমি। ”
অপূর্ব চলে গেল। অনিন্দিতার চিন্তার শেষ নেই। ছেলেটা বড় হবার পর অনেক কিছু মানতে চাইছে না। আকাশ কে আগে পছন্দ করলেও এখন করে না, আকাশ সেটা বুঝতে পারলেও অনিন্দিতা ছেলের ব্যাপারে কিছু বলে নি।
এই ছেলেটা একদিন অসময়ে বাসায় এসে মায়ের বেডরুমে তার পুরোনো টিচারকে দেখে সহজভাবে নেয় নি। মা’কে কিছু জিজ্ঞেস না করেই বাবাকে কল করে সব বলেছে। অনিন্দিতা সেইবার অনেক কষ্ট করে সব ম্যানেজ করেছিল। এরপর সতর্ক হয়েছে সব জায়গায়। কেয়ারটেকার, দারোয়ান, ম্যানেজার, সবাইকে দলে রাখতে নোট গুনতে হয়েছে। এভাবে কতদিন! তাই ভাবছে ছেলেকে পড়ার জন্য অন্য জায়গায় পাঠাবে।
****
আকাশ ঘরে ঢুকতেই একে একে সবার জেরার মুখে পড়লো। সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ঘরে এসে চৈতীকে জিজ্ঞেস করলো,
“আমি কী এখন ঘুমাতে পারি?”
চৈতী অভিমানী গলায় বলল,
“আমি কী মানা করছি?”
আকাশ শুয়ে পড়লো আর কোনো কথা খরচ না করেই। একটু তন্দ্রাভাব এসেছে এরমধ্যে চৈতীর কান্নার শব্দ কানে এলো। লাফিয়ে উঠে বসলো।
“চৈতী আবার কী হইছে? ”
“যা হইছে তা কী কম!”
চৈতী নাক টেনে জবাব দিলো। আকাশ মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলো। ভুল করেও কখনো মনে হয় নি যে এক ফোঁটা ঘুমানোর জন্য ওর এতো কাতর হতে হবে। আকাশ আজ চৈতীর বাড়ির সবার প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে ক্ষমা চেয়েছিল। মৌখিক কথাও দিয়েছে যে আর আঘাত করে চৈতীর সাথে কথা বলবে না। এরপর আর কী করতে পারে!
আকাশ জিজ্ঞেস করলো,
“আমি এখন কী করব চৈতী? কী করলে তোমরা শান্ত হবে? ”
“তুমি কেন আমাকে মিথ্যে বললে? কেন ঝিলমিলের সাথে সম্পর্কের কথা অস্বীকার করলে?”
“আমার ভুল হয়েছে। ”
“তুমি, তোমার মা, বোন একেকটা মিথ্যুক। এদের সঙ্গে থাকতে হবে আমার! ”
আকাশ চুপ করে রইলো। চৈতী বলল,
“শোনো আমি তোমাকে নিয়ে খুব পজেসিভ। ”
“ঝিলমিলের তো বিয়ে হয়ে গেছে তাই না! আমার কন্টাক্ট লিস্টে ওর নাম্বার টা পর্যন্ত নেই। ”
“তোমাদের সম্পর্ক টা কতদূর এগিয়েছিল? কতটা গভীর ছিলো? ”
আকাশ হতাশ চোখে তাকালো। বলল,
“আমার তরফ থেকে যা কিছু ছিলো সেটা শর্ট টাইমের। আমি ওর মতলব বুঝতে পেরে ভদ্র মানুষের মতো পিছিয়ে গেছি। ”
চৈতী বাঘের ন্যায় গর্জন করে উঠলো। বেডসাইডে একটা ফুলদানি ছিলো সেটা হাতে নিয়ে বলল,
“এটা দিয়ে মেরে মাথা ফাটিয়ে দেব তোর কু*ত্তার বাচ্চা। তুই সিডনি যাবার আগে আংটি দিয়া গেছস। হৃদয়ের সাথে তোর মারামারি হইছে ঝিলমিল কে নিয়া। অথচ আমার সাথে সিডনিতে থাকতে যখন কথা বলতি তখন বলছ কোনো মেয়ের সাথে প্রেম ছিলো না। ”
আকাশ স্থির চোখে তাকিয়ে আছে ফুলদানির দিকে। ওটা দিয়ে মাথা ফাটিয়ে ও’কে নিস্তার দিক এই ঝামেলা থেকে। চৈতী মেঘস্বরে বলল,
“বাটপার! পুরো গুষ্টি বাটপার। বাটপারি ছুটায়ে দেব আমি। ”
আকাশের চোখ জ্বলছে এখন রীতিমতো। একটু আগে ও’কে ভয়ংকর একটা গালি দিলো, তুই তোকারি পর্যন্ত করলো। সেসবের মিশ্র অনুভূতিতে জর্জরিত হয়ে আছে। প্রচন্ড রাগ হচ্ছে মা আর অনিন্দিতার উপর।
***
সকালের মৃদু রোদ জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকলো। সোনালী আভা ছড়িয়ে পড়েছে ঘরময়। হৃদয় জানালাটা খুলে দিলো। উষ্ণ রোদে ঝিলমিলের মুখে পড়তেই কপালে ভাজ পড়লো। ঝিলমিল একটা হাত চোখের উপর দিয়ে রোদটা আড়াল করার চেষ্টা করে বলল,
“আমি আরেকটু ঘুমাব। ”
হৃদয় মৃদু হেসে কপালে হাত রাখতে গিয়ে দেখলো ঝিলমিলের গা গরম। জ্বরে রীতিমতো গা পুড়ে যাচ্ছে। সারা সকাল, দুপুর মাথায় পানি ঢালল, জলপট্টি দিয়ে জ্বর নামানোর চেষ্টা করলো। মাঝখানে অল্প একটু খাইয়ে প্যারাসিটামল দিয়েছিল। দুপুরেও জ্বর তেমন কমছে না দেখে ডাক্তারও আনালো। হৃদয়ের বাবা, মা’ও সমানে চিন্তা করে যাচ্ছেন।
আজ ওদের ঝিলমিল দের বাসায় যাবার কথা, আসমা কল করলে হৃদয় জানালো যে ঝিলমিলের জ্বর। আসমা উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,
“হঠাৎ জ্বর? ঠান্ডা লেগেছে? ”
“হ্যাঁ। ”
“ওর অসুখ বিসুখ সাড়তে সময় লাগে। ”
হৃদয় এই কথা শুনে আরও বেশী অস্থির হলো।
ঝিলমিল ঘোরের মধ্যেও টের পেল হৃদয়ের অস্থির হওয়া। মা, বাবা এসেছিলেন ও’কে দেখতে। মা অনেকটা সময় গালে, কপালে ছুঁয়ে দিয়েছেন। শাশুড়ী খাওয়া নিয়ে মা’কে অনেক অভিযোগ করলেন। ঝিলমিল খুব কম খায়, হাবিজাবিও বেশী খায় না। জ্বর হলে কী খেতে পারে সেটাও জানতে চাইলেন। হৃদয় সারারাত জেগে থাকে, বিরক্তিহীন ভাবে ওর চুলে হাত বুলিয়ে দেয়, গ্লুকোজ, পানি খাইয়ে দেয়।
একই সময়ে বিয়ে হওয়া দুটো মেয়ের জীবন দুই রকম। অর্থ বিত্ত, প্রভাব প্রতিপত্তির মধ্যে বড় হওয়া চৈতী মানসিক ভাবে নিজে বিপর্যস্ত হবার পাশাপাশি সবাইকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। আকাশের মা ছেলের জীবনের অস্থির এই সময়কে ভেবে ভয়ে কেঁপে ওঠেন। তিনি ভেবেছিলেন তার সন্তান এখানেই সবচেয়ে ভালো থাকবেন। কিন্তু এখন ভালোটা দিতে গিয়ে অনেক কিছু না হারিয়ে ফেলেন! কে কতটুকু ভালো থাকবে সেটার হিসেব করেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা। টাকা, পয়সা, প্রভাব প্রতিপত্তি এসব আসলে আপেক্ষিক।
চলবে….

