#আমায়_রেখো_প্রিয়_শহরে
#লেখনীতে_নূরজাহান_আক্তার_আলো
#পর্ব_চল্লিশ
–
–
–
আকষ্মিক এ ঘটনায় রুপক স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ। হঠাৎ কি থেকে কি হয়ে গেল তার বোধগম্য হচ্ছে না। মস্তিষ্কে চক্কর দিচ্ছে বেশ কিছু প্রশ্ন। রিদওয়ান এসব জানল কিভাবে? কে বলল? কুহু নিজেই এসব জানত না, জানার কথাও না, তাহলে কীভাবে কি? নাকি রিমি আগ বাড়িয়ে কিছু বলেছে? বললে কি বলেছে? রিদওয়ান কি তাকে ভুল বুঝেছে? ভুল না বুঝলে তখন ওভাবে কথা বলল কেন? আর হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানে কি? সে মুখ কাচুমাচু করে রিমির দিকে তাকাল। মেয়েটা ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে। আশপাশ মেহমানভর্তি। সবার উৎসুক দৃষ্টি তার উপর। নিলুফা ইয়াসমিন এবং আতিকুল রহমান অপেক্ষা করছে তার জবাবের। এগুলো মানুষ মাঝে সে কি বলবে? কি করবে ভেবে পেলো না। অস্বস্ত্বিতে ডুবে গেল। ইসমত আরা বেগম ছেলের হাতে রিং ধরিয়ে দিয়ে হাসলেন। আন্দাজ করে নিলেন ছেলের মনের কথা। মায়ের কান্ডে সে আরেকদফা অবাক হলো তার মাও জানে? জানে বলেই কি এভাবে রিং নিয়ে একেবারে হাজির হয়েছে? আসার সময় রিংটা কিনেছে। সে নিজে পছন্দ করেছে ভেবেছে বার্থডে গিফ্ট হিসেবে দিবে কিন্তু তার মাও আরেকধাপ উপরে..! ছেলেকে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে কুহু বিরক্ত হয়ে ফিসফিস করে বলল,
-‘কি হলো, তাড়াতাড়ি পরাও? কেক খাব আমি। ভদ্রতার খাতিরে একা গিয়ে খেতেও পারছি না।’
কুহুর কথা শুনে রিদওয়ান আড়চোখে তার দিকে তাকাল। বেশ লাগছে কুহুকে। তবে সে মুখ ফুটে প্রশংসাও করবে না। এই মেয়েটা বড্ড পাজি হয়েছে। আজকাল কথায় কথায় প্যাঁচ মারে। কিছুক্ষণ আগে রেডি হয়ে বের হওয়ার সম্ভব তাকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে দেখে বলেছিল,
-‘চমৎকার লাগছে আমার পুতুল বউটাকে।’
-‘লাগবেই তো ধীরে ধীরে রাত বাড়ছে না?’
-‘মানে?’
-‘মানে কিছু না।’
-‘এই, এই দাঁড়াও! কি বললে তুমি? ‘রাত বাড়ছে’ এক কথা দিয়ে কি মিন করলে?’
-‘সেটা বুঝেছেন সেটাই মিন করেছি।’
-‘কুহু!’
-‘রিদওয়ান!’
-‘তুমি আমার নাম ধরে ধমকাচ্ছো? এত্ত বড় সাহস? আমি তোমার বড়। সন্মান দিয়ে কথা বলবে বেয়াদব। ভুলে যেও না তোমার স্যার’ও ছিলাম।’
-‘তো?’
-‘তো আবার কি? কি আশ্চর্য, দেশের মাটিতে পা রাখতে না রাখতেই প্রেম হারিয়ে গেল? বেয়াদবি শুরু হয়ে গেল?’
-‘কি আশ্চর্য, দেশে মাটিতে পা রাখতে না রাখতেই খ্যাচ খ্যাাচানি শুরু হয়ে গেল আপনার? খ্যাচ খ্যাচ করে দেশে ছেড়েছিলেন আবার ফিরে এসে ওই খ্যাচ খ্যাচানি শুরু হয়ে গেল?’
-‘খ্যাচ খ্যাচ কখন করলাম! মিথ্যাবাদী কোথাকার। গতকাল রাতে ফিরে আদর করে বুকে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ালাম। ঘুম ভেঙে যাবে বলে সারারাত পাশও ফিরি নি। এক কাতেই রাত কাবাড় করেছি।
সকালে উঠলামও দেরি করে। এরপর সারাদিন বিজিই ছিলাম কাছেই ঘেঁষতে পারি নি। তাহলে খ্যাচ খ্যাচ কখন করলাম, বুঝাও আমারে?’
-‘কাউকে বুঝানোর দায় পড়ে নি আমার। সরুন সামনে খেকে।’
-‘ জবাব না দিয়ে কোথাও যাবে না তুমি। কোমরের এপাশে পিন লাগাও।
কোমর দেখা যাচ্ছে কেন?’
-‘পারব না লাগাতে। দেখা যাক। প্রয়োজনে সবাইকে ডেকে ডেকে দেখাব এই দেখুন আমার কোমর। সাদা ফকফকা কোমর।’
-‘মাইর দিবো। দেখি, এদিকে এসো।’
-‘না।’
-‘ আরে বাবা এত রাগের কারণ কি বলবে তো নাকি? না বললে বুঝবো কিভাবে? যার উপরে রাগ করেছো সে রাগের কারনই জানে না। তাহলে কিভাবে হবে? রাগ করলে ভালো করে রাগ করা উচিত যাতে পাশের মানুষটা বুঝতে পারে। রাগ ভাঙানোর প্রয়োজন মনে করে। মনের মধ্যে রাগ নিয়ে বসে থাকলে হবে?’
-‘রাগের কারণ মুখে বলতে হবে কেন? আপনি চোখে দেখেন না? নাকি চোখে ঠুসি পরে থাকেন?’
-‘ঠুসি কি?’
-‘আমার মাথা।’
-‘ওহ।’
রিদওয়ান এবার ড্রেসিংটেবিলের উপর থেকে একটা পিন নিয়ে এগিয়ে গেল। তারপর কুহুর শাড়িতে লাগিয়ে দিয়ে দুই পা পিছিয়ে গিয়ে দেখে নিলো। এরপর একটা টিস্যু নিয়ে কুহুর ঠোঁটের পাশে জড়িয়ে যাওয়া লিপস্টিক মুছে দিলো। এবার সব ঠিকঠাক দেখে গলায় স্বর নরম করে বলল,
-‘বউদের এত রাগ বাগ করতে নেই। বউয়ের রাগী চোখ স্বামীদের হার্ট এ্যার্টাকের অন্যতম কারণ।’
-‘দুপুরবেলা একটু জড়িয়ে ধরার আবদার করায় ঝাড়ি মারলেন কেন?
বিকেলে চা করে দিলাম না খেয়ে হনহন করে চলে গেলেন কেন? সন্ধ্যায় বেলি ফুলের মালা আনতে বললাম ভুলে গিলে খেলেন। এরপর বললাম শাড়ি চুজ করে দিতে দিলেনই না বরং নিজের ড্রেসটাও আমাকে দিয়ে চুজ করালেন। সারাদিনে কি ব্যবহার করলেন মনে করুন। এখন আবার সুর তুলেছেন ‘চমৎকার লাগছে আমার পুতুলবউটাকে’ ঢং!’
-‘ দুপুরে ভীষণ রেগে ছিলাম তো তাই না? বাবার সঙ্গে একচোট ঝগড়া হওয়াতে মেজাজ খু্ব খারাপ ছিল। এজন্য ঝাড়ি দিয়ে ফেলেছি।এখন ‘সরি’ বলছি। তখন আমার আর্জেন্ট কাজ ছিল চা বানাতে দেরি হচ্ছিল দেখেই বেরিয়ে পড়েছিলাম। বেলি ফুলের মালার কথা সত্যি সত্যিই ভুলে গিয়েছিলাম। অনুষ্ঠানের এত সব কাজ বাজ আমাকে সব দেখতে হচ্ছে। সবদিকে এত খেয়াল থাকে? তারপরও যখন মালার কথা স্মরণ হলো গিয়ে গোলাপের গাজরা এনে দিলাম তো। বেশি ফুলের মালা খুঁজে পাই নি। অন্যদিন এনে দেবো?’
-‘লাগবে না। এতকিছু শুনতেও চাই নি কারো থেকে। ভাইয়া এলেই আজ ওই বাসায় চলে যাব। যে শুধু শুধু খ্যাচ খ্যাচ করে তার কাছে থাকব না।
পুরনো হয়েছি গেছি তাই না? এখন তো আর ভালো লাগবে না।’
-‘এসব আবার কি কেমন কথা? ভালোবাসি তো। ভালোবাসা পুরনো হয় নাকি?’
-‘জানি না।’
-‘জানো তো রেগে যাচ্ছো কেন শুধু শুধু?’
-‘খবরদার বলছি সাধু সাজবেন না। সারাদিন খ্যাচ খ্যাচ করে রাতের বেলা মিষ্টি মধুর সুর তুলেছেন। ভেবেছেন কিছু বুঝি না আমি? আজকে একা ঘুমাবেন আপনি। থাকব না আমি। সত্যি সত্যি চলে যাব।’
একথা বলে কুহু বেরিয়ে এসেছে। তাকে কিছু বলার সুযোগটুকু দেয় নি।
বউকে যেতে দেখেও সেও সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এসেছে। এরপর মুখে হাসি এঁটে দু’জন একসঙ্গে নেমেছে। কিন্তু নিচের পরও কুহু তার কাছ ঘেষছে না। দূরে দূরে থাকছে। যদিও এটা কোনো সমস্যা না তার কাছে। কারণ কুহু মুখে যতই বলুক তাকে ছেড়ে থাকতে পারে না। ঝগড়া করবে, দূরে দূরে থাকবে কিন্তু চোখের আড়াল করবে না। কুহুর কথা ছেড়ে সে এবার রুপকের দিকে তাকাল।রুপককে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে তার বিরক্তের মাত্রা বাড়ল। ইচ্ছে করল, নাক বরাবর ঘুষি মেরে আক্কেল আনতে। এরা দুই ভাই বোন গবেট প্রজাতির। নিজেদের অনুভূতির কথা তো জানাবেও না। উল্টে তাদের অনুভূতিকে সন্মান করে এগিয়ে এলেও তারা বিকারশূন্য। রিদওয়ান আর অপেক্ষা করতে পারল না। সে এবার ফিসফিস করে বলল,
-‘রিং পরাবি নাকি এখানকার কাউকে খুঁজে নিবো? আমার বোনের জন্য ছেলের অভাব হবে না।’
-‘রিদ তুই ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিস তো?’
-‘যেখানে আমার বোনের জীবন জড়িয়ে আছে সেখানে না ভেবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বোকা আমি নই নিশ্চয়ই!’
-‘ঠিক আছে আমিও তবে খুশি মনে গ্রহণ করলাম।’
একথা বলে রুপক ইসমত আরা বেগমের থেকে রিং নিয়ে রিমির হাতে পরিয়ে দিলো। করতালিমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হলো। এরপর খাওয়ার পর্ব শুরু হলো। হলো অরো অনেক মজা। রিমি, রুপক, মনের অভিমান সব ঝেড়ে ফেলে আনন্দে সামিল হলো। রিদওয়ান আর কুহু তাদেরকে কথা
বলার সুযোগ করে দিয়ে সরে এলো। ধীরে ধীরে গেস্টরাও চলে যাচ্ছে।
নিলুফা ইয়াসমিন তাদের বিদায় জানাচ্ছেন। রিদওয়ান বাগানের দিকে যাচ্ছে দেখে কুহুও তার পেছন পেছন এলো। বসল বাগানের দোলনায়।
আকাশে চাঁদ উঠেছে। চারপাশের ফুলের সৌরভ। পাশে সহধর্মিণী। খুব সুন্দর একটি মুহূর্ত। হঠাৎ রিদওয়ানের মনে হলো কুহু রাতের মেডিসিন
খায় নি এখনো। আজ অনেকটা দেরি হয়ে গেল। সে তড়াক করে উঠে হাঁটা ধরল। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে গ্লাসভর্তি পানি এনে কুহুর হাতে
মেডিসিন ধরিয়ে দিলো। কুহু খেলো বরং না মুখ গোমরা করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। তা দেখে রিদওয়ান তার হাত থেকে মেডিসিন নিয়ে গাল চেপে ধরে মুখে পুরে দিয়ে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো। অগত্যা মেডিসিন গিলে নিলো। তার মনের অভিমান দূর হয়ে গেল। যে মানুষটা তার এত খেয়াল রাখে, ভালোবাসে, তার প্রতি অভিমান করে থাকা যায়? না তো। সে অভিমানও করে নি তবে অভিমানের ভাণ ধরেছে। শখের পুরুষটাকে
পেছন পেছন ঘুরানোর ধান্দা আর কি। তখন হঠাৎ তার মনে একটা প্রশ্ন জাগল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে রিদওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
-‘এত সহজে মেনে নিলেন কেন তাদের? রিলেশনের কথা শুনে রাগ বাগ করা উচিত ছিল আপনার।’
-‘কার উপরে রাগ করতাম?’
-‘ভাইয়া আর রিমি আপুর উপরে?’
-‘তারা আমার কে?’
-‘একজন বোন আর আরেকজন বন্ধু।’
-‘তারা দু’জনেই আমার আপনজন। তারা কষ্ট পেলে আমিও পেতাম। ‘
-‘ কথাটা যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে না। আপনজন বলেই কি সাতখুন মাফ? আপনি কি কিছু লুকাচ্ছেন? ‘
-‘তেমন কিছু না। রুপককে আমি ছোটো থেকে চিনি। ছেলে, ভাই কিংবা বন্ধু হিসেবে সে দায়িত্ববান একজন মানুষ। নেশাভান করে না। খারাপ কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত নেই। দেখতে শুনতে ভালো। ভালো স্যালারির জব করে। ছিমছাম পরিবার। আর কি চাই? পাত্র হিসেবে সব দিক দিয়ে পারফেক্ট। মোদ্দাকথা, রিমি রুপককে ভালোবাসে। বোন ভালো একটা ছেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে। তাকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে চায়। ভাই হিসেবে আমার দায়িত্ব নয় কি তাদের চার হাত এক করে দেওয়া? বন্ধু বলেই তো তাকে ভালো করে চিনি, জানি, এজন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। খুব তাড়াতাড়ি তাদের অনুষ্ঠানটাও সেরে ফেলবো।’
পুরো কথা সম্পূর্ণ করে রিদওয়ান কুহুর দিকে তাকাল। কুহু মুগ্ধ নয়নে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মনোমুগ্ধের মতো তার কথা শুনছে। এভাবে তাকাতে দেখে রিদওয়ান হেসে তার নাক টেনে দিলো। কুহু ব্যথা পেয়ে কিছু বলার আগে সেখানে দুই পরিবারে সদস্যরা উপস্থিত হলো। গেস্টরা চলে গেছে। বাড়ি ফাঁকা। কাজের লোককে ডেকে রিদওয়ান চেয়ার এনে
সবাইকে বসার ব্যবস্থা করে দিলো। সবাই উপস্থিত এখানে। তাই বড়রা রুপক আর রিমির বিয়ের ডেট ঠিক করার আলোচনা শুরু করল। এমন না ব্যাপারটা কেউ জানে না। রিদওয়ান আজ দুপুরে সবাইকে ডেকে এই কথা জানিয়েছে। আসলেই সেও এ ঘটনা জানত না জেনেছে গতকাল।
কাল দেশে ফেরার পথে রুপকের ফোন কুহুর কাছে ছিল। গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিল কুহু। তাকে ঘুমাতে দেখে রিদওয়ান ইয়ারফোন খুলে রুপকের ফোন হাতে নিতেই একটা মেসেজ আসে। এরপর হঠাৎই কিভাবে যেন সেটা অন হয়ে যায়। এরপরে দেখে রিমির আইডি সবার
প্রথমে। সচারাচর যার সঙ্গে বেশি কথা বলা হয় তার আইডিই প্রথমে শো করে। কৌতুহলবশত সে ইনবক্সে ঢুকে বেশ কিছু মেসেজ দেখে। এরপর
হোয়াটসঅ্যাপে করা তাদের কথোপকথন তার নজরে পড়ে। মেসেজের
ধরণ দেখে স্পষ্ট হয় অনেককিছুই। প্রিয় বন্ধুর প্রেমালাপ খুঁটে খুঁটে পড়া গেলেও বোনের প্রেমালাপ পড়তে পারছিল না সে। ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল তার। এবং আরেকদফা অবাক হয় যখন দেখে রিমিই রিলেশনের প্রস্তাব দিয়েছে রুপককে। রুপক শুরুর দিকে রিমিকে অনেক বোঝায়। বকে’ও। পরে রুপকও যে দূর্বল হয়ে পড়ে তাদের মেসেজই তা বোঝা যায়। এসব দেখে রিদওয়ান আর কাউকে কিছু বলে নি। সরাসরি বোনকে জিজ্ঞেস করে এবং রিমিও অকপটে স্বীকার করে। এরপর রিদওয়ান বাবা মা সহ, কুহু এবং ইসমত আরা বেগমকে সরাসরি জানায়। যেখানে তারা দু’জন দু’জনকে চায় সেখানে কেউ আর দ্বিমত করেন নি। সংসার করবে তারা তাই তাদের পছন্দকেই প্রাধান্য দিয়েছে সবাই। সত্যি বলতে রিদওয়ানের সিদ্ধান্তে কেউ দ্বিমত পোষণ করার সাহস করে নি। বড়রা সিদ্ধান্ত নিলেন সামনে মাসের প্রথম সপ্তাহে রুপক আর রিমির বিয়ের অনুষ্ঠানে সম্পূর্ণ করবেন। হাতে বিশ পঁচিশ দিন সময় বাকি। এমন আরো কিছু ব্যাপারে
আলোচনা করা হলো। তখন নিলুফা ইয়াসমিন একটা প্রস্তাব রাখলেন,
-‘আমার এক ছেলে; এক মেয়ে। ইসমত আরা আপাও তাই। ভাগ্যে ছিল বলে হয়তো এই বাড়ির মেয়ে ওই বাড়িতে যাচ্ছে। ওই বাড়ির মেয়ে এই বাড়িতে এসেছে। আমি ভাগ্য বিশ্বাসী তাই মেনেও নিয়েছি। আমরা বাবা মায়েরা চাই আমাদের সন্তানরা যেন ভালো থাকে।সুখে থাকে। তবে এটা
ঠিক রিদওয়ান আর কুহুর বিয়েতে আমার মত ছিল। রিদওয়ান জোর করে বিয়েটা করেছে। এবং সময়ের প্রেক্ষিতে সব ঠিক হয়ে গেছে কিন্তু রিদওয়ান আর কুহুর বিয়ে একদম সাদামাটাভাবে সম্পূর্ণ করা হয়েছে। তাই আমি চাই, তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানটাও এই সুযোগে সম্পূর্ণ করতে।
আমাদের দুই পরিবারের দুই রাজকন্যা একই দিনে বউ সাজুক।’
To be continue……!!
(গতকাল রাতে আরেকটা পর্ব দিতে চেয়েও দিতে পারিনি কারণ ইডিট করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ফলে সেভ না করাতে সাড়ে তিন হাজার শব্দের একটা পর্ব ডিলিট হয়ে গেছে। আজ সারাদিনে এইটুকু লিখেছিলাম তাই পোস্ট করলাম।)
#আমায়_রেখো_প্রিয়_শহরে
#লেখনীতে_নূরজাহান_আক্তার_আলো
#পর্ব_একচল্লিশ
–
–
–
-‘রিদ চুপ কেন? কিছু বলার থাকলে বলো?
নিলুফা ইয়াসমিন উনার পুরো কথা শেষ করতেই আতিকুর রহমান উক্ত কথাটি বললেন রিদওয়ানকে। রিদওয়ান পূর্বের মতোই নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। মূলত মন দিয়েই শুনছিল সবার কথা। কুহু আর রিমি অনুষ্ঠানে কে কি রংয়ের শাড়ি/লেহেঙ্গা পরবে তা নিয়েও একচোট আলোচনা হয়ে গেছে। ঠিক হলো কোন পার্লার থেকে তাদের সাজাতে আসবে। কোন কোম্পানির মেহেদি দিয়ে হাত রাঙাবে। মেয়েলি এসব আলোচনার মধ্য পুরুষরা এতক্ষণ চুপ’ই ছিল। তখন বাবার কথা শুনে রিদওয়ান একবার কুহুর দিকে তাকাল। মেয়েটা খুশিতে গদগদ করছে। চোখে, মুখে, উপচে
পড়ছে অবাধ খুশি। এই মুহূর্তে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে নিজের খুশি
পুরো পৃথিবীকে জানাতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে ধৈই ধৈই করে এক
একচোট নেচে নিতে। কারণ আর পাঁচটা মেয়ের মতো তারও ইচ্ছে ছিল লাল টুকটুকে শাড়ি পরে লাগে রাঙা বউ সাজবে। গা ভর্তি গয়না পরবে।
বউ সেজে শখের পুরুষটাকে বর বেশে দুচোখ ভরে দেখবে। সেই খুশি উদযাপন করতে কখনো হাসবে; কখনো কাঁদবে। কিন্তু পরিস্থিতি তাকে বউ সাজার সুযোগই দেয় নি। দেখতে পারে নি পাগড়ি পরা বরের বেশে থাকা রিদওয়ানকে কেমন লাগবে দেখতে! খুব সাদামাটাভাবেই তাদের বিয়েটা সম্পূর্ণ হয়েছিল। শখের পুরুষকে পেলেও বউ সাজতে না পারার আফসোসটা তার রয়ে গেছে। অথচ আজ সেই স্বপ্নটা পূরণ হতে যাচ্ছে।
ওদিকে আতিকুর রহমান উনার জবাবের আশায় ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে। তখন কুহু পাশ থেকে তার কোমরে একটা চিমটি কেটে বোঝাল কিছু একটা বলতে। চিমটিটা একটু জোরেই হয়ে গেছে৷ জ্বলে যাচ্ছে ওই জায়গাটা। সবার সামনে রিদওয়ান কুহুর চিমটি নীরবে হজম করে মৃদু হেসে জবাব দিলো,
-আমি কি বলবো? আপনারা বড়রা যেটা ভালো মনে হয় করুন ।’
-‘তা বললে হয় নাকি? তুমি একদিকে বড় ছেলে আবার আরেকদিকে ওই বাড়ির একমাত্র জামাই। অবশ্যই তোমার মতের দাম আছে। কিসে ভালো হবে; মন্দ হবে তা বলবে না তুমি?’
-‘যেখানে দুই পরিবারের মানুষগুলোকে নিয়ে আমার পরিবার। যেখানে খুব ভালো করেই জানি তারা আমার ভালো বৈ মন্দ চাইবে না। সেখানে তাদের সিদ্ধান্ত বেস্ট অপশন হবে। তাই আলাদা করে কিছু বলার কারণ দেখছি না। আমার সিদ্ধান্ত অনেক সময় অনেকের মনমতোও হবে না। যেহেতু আমরা সবাই আলাদা আলাদা মানুষ।’
ছেলের এমন কড়া জবাব শুনে আতিকুল রহমান মুখ ভোঁতা করে বসে রইলেন। ছেলে যে উনার উপর রেগে আছে উনি জানেন। কারণ দুপুরে ছেলের সঙ্গে উনার একচোট ঝগড়াও হয়েছিল। ঝগড়ার কারণ রিমির জন্য উনি রুপকের চেয়েও আরো ভালো পাত্র চাচ্ছিলেন। সময় নিয়ে তা খুঁজতে চাচ্ছিলেন। রুপক যে ভালো নয়, তাও নয়। তবে নিজের মেয়ের জন্য সময় নিয়ে আরো ভালো কাউকে খোঁজা বাবা হিসেবে উনার গুরু দায়িত্ব। কিন্তু রিদওয়ানের কথা রুপক’ই রিমির জন্য বেস্ট কেউ। বন্ধুর সাপোর্ট করাতে উনার খুব রাগ হচ্ছিল। এক সম্পর্কের মধ্যে বারংবার অন্য সম্পূর্কের জোড়াতালি দেওয়াটা উনার পছন্দও হচ্ছিল না। কারণ
এতে সম্পূর্ক নষ্ট হওয়ার চান্স বেড়ে যায়। রুপক বন্ধু ছিল এরপর হলো বউয়ের বড় ভাই; সমন্ধি। বন্ধুকে আগে যেসব কথা শেয়ার করা যেতো
সমন্ধিকে কি সেসব শেয়ার করতে পারবে? পারবে না। বরং একপ্রকার অস্বস্তি কাজ করবে। আবার সমন্ধি যখন বোন জামাই হবে তখন তাদের মধ্যে আরেকধাপ দূরত্ব সৃষ্টি হবে। কিছু বলতে গেলে অথবা করতে গেলে দশবার ভাবতে হবে। মাথাতে রাখতে হবে বাড়ির জামাইকে কোনোভাবে চটানো যাবে না। এতে বোনের সংসারে অশান্তি হবে। কিন্তু এ কথাগুলো উনি ছেলেকে আর বোঝাতে পারলেন না। ছেলে একপ্রকার জেদ করেই এসব আয়োজন করেছে। নিজ উদোগ্যে সবাইকে জানিয়ে রুপক আর রিমির এনগেজমেন্টের ব্যবস্খা করেছে। এমনকি ছেলেটা এমন গোঁয়ার প্রকৃতির যে যাদের এনগেজমেন্ট তাদের কে বাদে সবাইকে জানিয়েছে।
বেচারা রিমি আর রুপক আকষ্মিক সারপ্রাইজে শক্ড। ছেলেটা আগেও এমন মর্জি মতো চলতো এখনো তাই। তার যেটা ভালো মনে হবে সেটাই করবে। এদিকে বাবা ছেলের নীরব অভিমান খুব সহজেই ধরে ফেললেন নিলুফা ইয়াসমিন। ইসমত আরা এবং কুহুর বাবাও বুঝলেন কিছু একটা হয়েছে। নয়তো রিদওয়ান তো এভাবে কথা বলার ছেলে না। এইদিকে রুপকে ওমন খুঁতখুঁত করতে লাগল যে তার আর রিমির সম্পর্কের কথা জানার পথে কোনো ঝামেলা হয়েছে নাকি তা নিয়ে। সবাই ভিতর ভিতর উদ্বিগ্ন। আর এই ব্যাপারটা খেয়াল করে নিলুফা ইয়াসমিন ছেলের দিকে ঘুরে বেশ গুছিয়ে বললেন,
-‘আমরা চাচ্ছি রুপক আর রিমির সঙ্গে তোমাদের অনুষ্ঠানটাও সারতে। সুইজারল্যান্ডে থাকাকালীন বিয়ের সময় কুহুর বাবা মা থাকতে পারেন নি। একমাত্র মেয়ের বিয়ে, অথচ বাবা-মা স্বশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারাটা খুবই কষ্টদায়ক। এবার অনুষ্ঠান করলে উনারাও খুব খুশি হবেন।
জামাই হিসেবে তোমার দায়িত্ব উনাদের মন বুঝে চলা, তাই না? আমরা তাহলে দুই কাপলের বিয়ের আয়োজন করি। এতে আনন্দটাও দ্বিগুন হবে।’
মায়ের কথা শুনে রিদওয়ান কোনো জবাব দিলো না। বরং রিমি আর কুহুকে বলল ফ্রেশ হয়ে নিতে৷ অনেক রাত হয়েছে। তারা দু’জনেই বুঝল কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলাপ করবে বড়রা। এসব আলোচনায় তাদের রাখবে না। এমন ইঙ্গিত বুঝে অগত্যা উঠে চলে গেল তারা। ওরা যেতেই এবার রিদওয়ান সরাসরি কথা তুলল,
-‘ আমি আমার দুই পরিবারকেই বলছি কথাগুলো পজেটিভভাবে ভেবে এরপর সিদ্ধান্ত নিবেন আপনারা। কথা হচ্ছে, আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের অনুষ্ঠান করতে চাচ্ছেন খুবই ভালো কথা। আল্লাহ দিলে আমাদের দুই পরিবারই যথেষ্ট স্বচ্ছল। দুই বিয়ের অনুষ্ঠান একসাথে করার সামর্থ্যও আমার দুই পরিবারেরই আছে। কিন্তু এসব করার আগে সবাইকে মনে রাখতে হবে কুহুর কথাটা। সে কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ নয়।বলতে বাধ্য হচ্ছি, অনুষ্ঠান করুন, যার যা ইচ্ছে করুন, আমার বাঁধা নেই। কিন্তু কুহু আমার নজরের আড়াল যেন না হয়। এমন সিদ্ধান্তও যেন না নেওয়া হয় বিয়ের অনুষ্ঠানের আগ মুহূর্তে আমরা আলাদা থাকব। দু’জন দুই বাসায় থাকব। এমনকি বিয়ের আগে কথা বলা বা মুখ দেখাদেখিও বারণ। এসবে আমি
পক্ষপাতী নই। তারপরেও যদি নিয়মের দোহায় দিয়ে এসব করতেই হয়, তাহলে আমাদেন ব্যাপারটা স্কিপ করাই ভালো। রুপক আর রিমি বিয়েই জাঁকজমকভাবে সম্পূর্ণ করা হোক। আমাদের বিয়ে যখন হয়েই গেছে অনুষ্ঠান যে করতেই হবে এর কোনো মানে নেই। আমি আমার সিদ্ধান্ত জানালাম, এবার আপনারা যে যেটা ভালো মনে করেন করতে পারেন।
আমার কথাটা দৃষ্টিকটু লাগলেও আমার কিছু করার নেই। এর কারণও কুহু। এই অবধি এসে আমার সমস্ত কষ্টকে তো বৃর্থা হতে দিতে পারি না।
আশা করি সবাই বুঝেছেন আমি আসলে কি বলতে চাচ্ছি।’
রিদওয়ানের কথা শুনে এবার সবার কপালে দুঃচিন্তার ভাঁজ পড়ল।তবে
তার কথাটা যুক্তিযুক্ত। অনুষ্ঠান অনুষ্ঠান করে হেদিয়ে মরলে হবে না। যে বিপদ থেকে মেয়েটা সেরে উঠছে সেদিকেও নজর দিতে হবে। আরেকটা কথা না বললেই না রিদওয়ানের মতো কেউই কুহুর দিকে নজর রাখতে
পারবে না। একে তো বিয়ের বাড়ি। তার উপরে হাজার রকমের ব্যস্ততা।
তাছাড়া রিদওয়ান যে শুধু টাইম টু টাইম কুহুকে মেডিসিনই খাওয়াই তা নয়। কুহুকে নিয়মিত ব্যায়ামও করায়। যে ব্যয়াম ব্রেণ সচল রাখে। তার মুড কিসে ভালো হয় সেদিকে খুব খেয়াল রাখে রিদওয়ান। এমনকি সে কুহুকে একা থাকতেও দেয় না সে। একা থাকলে’ই কুহু ভাবনার জগতে ডুবে যায়। ভুল ভাবনায় নিজেকে বন্দি করে ফেলে। তখন তার পাগলামি বেড়ে যায়। আর রিদওয়ানকে ছাড়া কুহু কারো কথায় শুনবে না। দেখা যাবে অনুষ্ঠানের ঝামেলা দুই চার বেলার মেডিসিনও মিস করবে। যেটা হতে দেওয়া যাবে না, কোনো ভাবেই না। তাহলে এখন উপায়? অনুষ্ঠান করলে সবার কাজের ব্যস্ততা বাড়বে। গেস্ট আসবে। তাদের আপ্যায়ন করতে হবে। কাজের শেষ থাকবে না এরমধ্যে আলাদাভাবে কুহুকে কে সময় দিবে? মনে মনে এমন নানান কথা চিন্তা করল সবাই। কিন্তু কেউই কোনো সমাধান খুঁজে পেলো না। তখন ইসমত আরা বেগম বললেন,
-‘তাহলে রুপকের বিয়েতে কুহু আমার বাসায় যাবে না?ভাইয়ের বিয়েতে বোন উপস্থিত থাকবে না তা কি করে হয়?’
-‘তাই তো। কুহুকে ছাড়া কিভাবে কি হবে?’
রুপক মাটির দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছে। কুহু না থাকলে সে অনুষ্ঠানই করবে না। একটাই বোন তার। রিদওয়ান যত যাই বলুন বোনকে ছাড়া সে অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত নিবেই না। প্রয়োজনে সব বাতিল করা হবে। তারাও সাদামাটাভাবে বিয়ে করবে। অনুষ্ঠান না করলে বিয়েই হবে না এমনটাও না। নিজের মনের কথা রুপক সত্যি সত্যি চট করে বলে বসল,
-‘তাহলে অনুষ্ঠানের দরকার নেই। এখনই কাজি ডাক পারিবারিক ভাবে বিয়ে করে বউ নিয়ে চলে যাই। যেই অনুষ্ঠানে আমার বোন থাকবে না সেই অনুষ্ঠানের মানে হয় না।’
-‘ কিন্তু আমার বোনকে তো আমি এভাবে যেতে দিবো না।’
-‘আমি দিতে পারলে তুই দিতে পারবি না কেন? কুহুও তো আমার এক মাত্র বোন। রিমি তোর কাছে যতটা আদরে কুহুও আমার কাছে ততটাই আদরের। রিমির থেকেও সাদামাটা আয়োজনে কুুহুর তোর হাতে তুলে দিয়েছি আমি। তখন আমার খারাপ লাগে নি? আমি যখন তা পেরেছি তুইও পারবি।’
-‘উল্টো প্যাঁচ মারিস না। ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর।’
-‘কোনো বুঝাবুঝি হবে না। এখন হয় অনুষ্ঠানে রাজি হবি আর নয়তো কাজি ডেকে ঘরোয়াভাবে আমাদের বিয়েটাও দিবি। যদি একটাতেও রাজি না হোস, তাহলে আমার বোন আমি নিয়ে যাব।’
-‘তোর বোন আমার বউ। আমার বউয়ের ব্যাপারে আমি কোনো ছাড় দেবো না। তাই বলছি, কথা বাড়াস না।’
-‘তোর বউ আমার বোন। আমার বোন আমার বিয়েতে যদি না থাকে তাহলে আমি বিয়ের অনুষ্ঠানই করব না। তাই বলছি, কথা বাড়াস না।’
ওদের দুই বন্ধু এমন মতবিরোধ দেখে বাকিরা বিরক্ত হলেন। বোন, বউ করে এরাই পাগল হয়ে গেছে। অথচ একবারও ভাবছে না তাদের বোন, বউরাই অনুষ্ঠানে জন্য প্রহর গুনতে শুরু করেছে। কে কি করে সাজবে তা নিয়েও আলোচনা হয়ে গেছে। এখন যদি অনুষ্ঠান না হয় তাহলে ওরা দু’জনই কষ্ট পাবে। আতিকুল রহমান ধমকে এবার দু’জনকেই থামালেন।
কিন্তু তারা দু’জনই নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় দেখে কেউ’ই আর কোনো সমাধান পেলেন না। কিছুক্ষণ এভাবে কেটে গেল। একটুপরে রিদওয়ান বলল,
-‘ এক কাজ করা যাক, একটা রিসোর্ট বুক করে ফেলি। সেখানে আমরা সবাই থাকব এবং সেখানেই যাবতীয় অনুষ্ঠানটা সম্পূর্ণ করা যাবে। এতে কারোরই আর এই বাড়ি, ওই বাড়ি যাওয়ার-আসার ঝামেলা থাকবে না। শুধু সময় মতো গেস্টদের লিস্ট দিয়ে দিলেই হবে।’
রিদওয়ানের সিদ্ধান্তটা সবারই পছন্দ হলো। বড়রাও রাজিও হলো এবং দেখে শুনে একটা রিসোর্ট বুক করার দায়িত্ব দেওয়া হলো রিদওয়ানকে।
এরপর আলোচনার সমাপ্তি ঘটিয়ে বড়রা বাসায় দিকে চলে গেল। আজ রুপকরা আজ এখানেই থাকবে। খাওয়া দাওয়ার পর্বও শেষ। তাই বড়রা যার যার বরাদ্দকৃত রুমে শুতে চলে গেলেন। তবে সবাই গেলেও দুই বন্ধু বসে আছে। দু’জনের দৃষ্টি যৌবণবতী চাঁদের দিকে। চাঁদ একটাই, অথচ তাদের ভাবনাও আলাদা। ভাবনার মানুষ আলাদা। রুপক বেশ কিছুক্ষণ নিজের ভাবনায় বুদ থেকে বলল,
-‘ কখনো ভেবেছিলি কুহুকে এতটা ভালোবেসে ফেলবি?’
-‘ভালোবাসি না আমি কাউকে।’
-‘এজন্যই বুঝি এসব যুক্তি দিয়ে চোখের আড়াল করা থেকে থামালি?’
-‘আপনি তো পন্ডিত সব বুঝে গেছেন?’
-‘বুঝলাম বলেই তো তোর সঙ্গে লেগে কৌশলে বড়দের রাজি করালাম।’
-‘আমি কাউকে ভালোবাসি না। আমি শুধু আমাকে ভালোবাসি।’
-‘ ওহ আচ্ছা আচ্ছা। তুই তোকে ভালোবাসি। তোর সঙ্গে কুহু জড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ তুই কুহুকেই ভালোবাসি। ‘
-‘খুব যুক্তিবিদ হয়ে গেছেন।’
একথা বলে রিদওয়ান হেসে ফেলল। এছাড়া সত্যি সত্যিই বড়রা এমন সিদ্ধান্ত নিতো। বিয়ের পর তারা একরাতও আলাদা থাকে নি। আলাদা থাকার কথা ভাবলেই কেন যেন দমবন্ধ হয়ে আসে। একথা তো বড়দের বলা যায় না যে, ‘বউয়ের বিরহে পাগল হয়ে যাব। প্রেমসাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি আমি। কেউ আমার বউকে আলাদা কোরো না। যদি করো তবে বউ তুলে আনতে পিছ পা হবো না আমি। বিয়ে করা বউকে নিয়ে পালাব আমি।’ ভদ্র সভ্য ছেলের মুখে এসব কথা কেউ সহ্য করতে পারবে না তাই একটু কৌশলে খাটালে হতো। এতে অনুষ্ঠানও হবে আবার বউটাও তার চোখের সামনেই থাকবে। রিদওয়ানকে হাসতে দেখে রুপকও হো হো করে হেসে ফেলল। তবে বোন জড়িয়ে আছে দেখে বেখাপ্পা কোনো কথা বলতে পারল না। এদিকে রিদওয়ানও তাই। তবে রিদওয়ান বলল,
-‘আমি কখনোই বলব না আমার বোনকে আমরা যেমন সুখে রেখেছি তুইও রাখিস। আমি বলব, তুই তোর মতো করেই আমার বোনকে দেখে শুনে রাখিস। তার ভুল গুলো শুধরে দিস। বাংলাদেশে জন্ম নিলেও সে বাংলাদেশের কালচার সম্পর্কে অনেককিছু জানে না। মানিয়ে নিবে তবে মানিয়ে নেওয়ার সময়টুকু দিস। পাশে থাকিস। সাপোর্ট দিস। সেও ছোট মানুষ। জেদ বেশি। কখনো যদি ওর সঙ্গে মতের মিল না হয় তাহলে সেই মুহূর্তে জোড়াজুড়ি করিস না। পরে ঠান্ডা মাথায় বুঝাস দেখবি বুঝবে।
বাবাকে খুব কম পেয়েছে তো তার সব আবদারের মানুষটা আমি। দেখ আমার কাছে এসে কেঁদে কেঁদে তোকে চাইল। আর আমিও প্রতিবারের মতো এবারও তার মুখের হাসি ফুটাতে তোর অনুমতি না নিয়ে আজকে এনগেজমেন্ট করিয়ে দিলাম।’
-‘এত বড় বাসাটা ফাঁকা হয়ে যাবে এজন্য কষ্ট পাচ্ছিস? সময় অসময়ে ভাইয়া, ভাইয়া করে কেউ দৌড়ে আসবে না, কারণে অকারণে জ্বালাতন করবে না, কতশত আবদার পূরণের জন্য পাগলামি করবে না, জুতোর ফিতা লুকিয়ে রাখবে না, ওয়ালেট থেকে চকচকে দশ বিশ টাকার নোট
হারিয়ে যাবে না, এজন্যই বুক ভার হয়ে আসছে তাই তো? জানিস আজ সকালে আমি বাসায় পা রাখতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি কুহু দৌড়ে আসবে। টাকা দাও! টাকা দাও! করে পিছু পিছু ঘুরবে। খালি হাতে বাসায় ফিরতে দেখে ভ্রুঁকুটি করে তাকিয়ে থাকবে। বোনগুলো সব এমনই সব। এরা মায়ার জিনিস। মায়া বাড়িয়ে নিজের বাসা শূন্য করে অন্যের বাসা আলোকিত করাই যেন এদের ধর্ম। কষ্ট পাস না, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
রুপক হাসল। অথচ তার চোখে ছলছল করছে। রিদওয়ান চট করে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটা ধরল। তার পক্ষে বসে থাকা সম্ভব নয়। সে আর পিছু ফিরে তাকাল না। নয়তো বেহায়া চোখের পানি তাকে বন্ধুর কাছে ধরা খাইয়ে দেবে।
To be continue…!!
গল্পটি সম্পর্কে রিভিউ, আলোচনা, সমালোচনা করুন আমাদের গ্রুপে। গ্রুপ লিংক নিচে দেওয়া হলোঃ
https://facebook.com/groups/holde.khamer.valobasa/

