#সায়েবা_আসক্তি
#লেখিকা_সানজিদা_বিনতে_সফি
#পর্ব_২+৩
সাত তলার বারান্দার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে সায়েবা।ফারহান বারান্দার ডিভানে আধসোয়া হয়ে ঘুমাচ্ছে। বুকের উপর বই দেখে বোঝা যাচ্ছে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেছে।ফারহানের স্টাডির সমস্ত কিছু বারান্দায় সেট করা।বুকসেল্ফ থেকে শুরু করে স্টাডি টেবিল সব কিছু সুন্দর করে সাজানো গোছানো। দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়।
মধ্যে রাতের দিকে ঘুম না আসায় ছাদে এসেছিল সায়েবা।এসেই এমন একটা দৃশ্য চোখে পড়বে ভাবতে পারে নি সে।ফারহানের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো সায়েবা।এই ছেলের দিকে তাকিয়ে মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই।তবু্ও বেহায়া চোখ কিছুতেই কথা শুনতে চায় না। বার বার তার দিকেই চলে যায়।নিজের সাথে যুদ্ধ করেই সায়েবা ছাদের অন্য পাশে চলে গেলো। আজকের আবহাওয়া টা দারুণ। বৃষ্টি না হলেও দমকা হাওয়া প্রকোপ খুব বেশি। অদূরেই হয়তো কোথাও কোন অনুষ্ঠান হচ্ছে। ওখান থেকে গানের শব্দ ভেসে আসছে।
সায়েবা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে গান শুনলো।কণার গান বাজতেই সায়েবার মন ভালো হয়ে গেলো। গানের সাথে তাল মেলাতে শুরু করলো,
যাও বলো তারে,
মেঘের ওপারে,
বৃষ্টি বন্দনা জুড়ে ধরণীতল,
যাও বলো, শ্রাবণ আষাঢ়ে,
মেঘের শতদলে ছুঁয়েছ ভেজাজ ।
মাতাল হাওয়ার ধ্বণী বৃষ্টি কি শোনে
না,
ময়ূর পেখম তোলে ধিমতানা দেরে না,
ধিমতানা বাজে ধিমতানা…
বাজে ধিমতানা, দে রে না
ভেজাজল টলমল, অপেক্ষার জানালা
ছুঁয়ে,
দু’হাতে নিয়ে জল, ভেজাবো সুখের
কপল,
সন্ধ্যে এলো, ঝলোমলো বৃষ্টি তবু এলো
না ।
মাতাল হাওয়ার ধ্বণী বৃষ্টি কি শোনে
না
ময়ূর পেখম তোলে ধিমতানা দেরে
না…
স্বাগতম সম্ভাষণ অপেক্ষার হলো
অবসান,
প্রকৃতির আভরণে মন্ত্র তালের
উচ্চারণ,
রাত্রি এলো জলছল বৃষ্টি সুরের
মূর্ছনা,
মাতাল হাওয়ার ধ্বণী বৃষ্টি কি শোনে
না
ময়ূর পেখম তোলে ধিমতানা দেরে না
ধিমতানা বাজে ধিমতানা…বাজে
ধিমতানা, দে রে না..
দমকা বাতাসে এক তরুণীর মন মাতানো নাচের দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে ফারহান। কিছুক্ষন আগেই ঘুম ভেঙেছে তার।ঘুম ভাঙতেই এমন মন মুগ্ধকর দৃশ্য দেখবে ভাভতেই পারেনি সে।সাদা গ্রাউনে ঠিক জেন এক অপ্সরি লাগছে সায়েবা কে।বারান্দার লাইট টা অফ করে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো সেদিকে।
🌸
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেড়ি হয়ে গেছে সায়েবার। কাল অত রাত অব্দি ছাদে নাচানাচি কারার ফল হাতেনাতে পেলো সে।ইসস এখন ক্লাস মিস না হলেই হলো। মাকে বলে বাসা থেকে বেরিয়ে তারাতাড়ি হাটতে লাগলো সায়েবা।আরেকটু দূরে গেলেই বাসস্ট্যান্ড।স্কুটি টাও আজকেই খারাপ হতে হলো! বিরক্তি তে কপাল কুচকে বিরবির করে নিজেকেই গালি দিতে লাগলো। আচমকা কারোর সাথে ধাক্কা খেতেই তার জায়গা হলো রাস্তার পাশের কাদামাটি তে।হতভম্ব হয়ে আর্তনাদ করতেই ভুলে গেলো সে।ক্ষীনসময় বাদে কোমরে ও হাতে ব্যথার অস্তিত্ব অনুভব করতেই মুখ থেকে অস্পষ্ট স্বরে ‘আহ’ বেড়িয়ে গেলো।
— রাস্তার মধ্যে শুয়ে আছো কেন?
ফারহান অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো সায়েবা কে।
ফারহানের কথা শুনে ব্যাথা ভুলে রাগ মাথায় চেপে বসলো সায়েবার।দাতে দাত চেপে বললো,
— আমি ধুলার রানী। তাই রাস্তায় রাস্তায় গড়াগড়ি খেয়ে গায়ে ধূলা মাখছি।এখানেই নিজের রাজপ্রাসাদ বানিয়ে রাজত্ব শুরু করবো। প্রশিক্ষণ দিয়ে সৈন্য সামন্ত বানিয়ে ধূলোর মহারানী হয়ে যাবো।তারপর যারা আমার সামনে এসে বেহুদা কথা বলবে তাদের ধরে ধূলোয় গড়াগড়ি খাওয়াবো।
সায়েবার কথা শুনে খুকখুক করে কেশে উঠলো ফারহান। মেয়েটা অসম্ভব রেগে গেছে বুঝতে পেরে আর কোন কথা বাড়ালো না।ফোন টা পকেটে ভরে সায়েবার দিকে এগিয়ে গেলো। আচমকা সায়েবার হাত ধরে টেনে তুলতেই সায়েবা আর্তনাদ করে উঠলো। ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো।চোখ থেকে দু ফোটা পানি বেরিয়ে যেতেই ফারহান নিজের খোলস থেকে বেরিয়ে এলো। অস্থির হয়ে সায়েবার হাত পা চেক করতে লাগলো।
— কোথায় লেগেছে তোমার?কোথায় ব্যাথা পেয়েছো?(অস্থির হয়ে)। রাস্তার মধ্যে পরে গেলে কি করে! চোখ কান খোলা রেখে হাটা যায় না!অপদার্থ মেয়ে।
শেষের কথা গুলো ধমকে বলতেই কেপে উঠল সায়েবা।
সায়েবার উত্তরের অপেক্ষা না করেই সায়েবা কে কোলে তুলে নিল ফারহান। সায়েবা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে ফারহানের দিকে। সম্ভতি ফিরে পেতেই চেচিয়ে উঠলো।
— আরে কি করছেন?নামান আমাকে।মানুষ তাকিয়ে আছে ফারহান ভাইয়া।
সায়েবার দিকে বিরক্তিকর দৃষ্টি দিতেই সায়েবা চুপ হয়ে গেলো। সায়েবা কে গাড়ি তে বসিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট করলো ফারহান।
— আমাকে নামিয়ে দিন।আমি বাসায় চলে যাবো। আপনার গাড়ি নোংরা হয়ে যাচ্ছে। আমার গায়ে কাদা লেগে আছে।শুনতে পাচ্ছেন আপনি?
সায়েবার কথা হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে ফারহান গাড়ি হসপিটালের দিকে ছোটালো।
দিশ মিনিটে হসপিটাল পৌঁছে সায়েবাকে আবার কোলে তুলে নিলো ফারহান। সায়েবা কাচুমাচু করে আশপাশে তাকাচ্ছে। সবাই ভুত দেখার মতো করে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।
ডাক্তারের কেবিনে ঢুকে সায়েবা কে চেয়ারে বসিয়ে দিলো ফারহান। ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ শক্ত গলায় বললো,
— দশ মিনিটের মধ্যে ফুল বডি চেকআপ করুন। কোথাও একটা স্ক্রেচ থাকলে ও আমাকে জানাবেন। আমি বাইরে আছি।
দ্রুত পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো ফারহান। সায়েবা আহাম্মক হয়ে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। এটা কি হলো😲😲😲!
🌸
— হ্যালো।
— সায়েবার বাসার পাশে বাস স্ট্যন্ডের আসেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ চেক কর।সায়েবা কে কে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে তার খবর আমার চাই।
— ঠিক আছে ভাই।আমি এখনই আপনাকে জানাচ্ছি। আমাকে কয়েক মিনিট সময় দিন।
— শুধু খবর দিলে চলবে না। তাকে বিকেলের মধ্যে আমার সামনে হাজির চাই।
— আচ্ছা ভাই।চিন্তা করবেন না। আমি দেখছি।
ফোন কেটে রাগে চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলো ফারহান। রাগে গা থেকে গরম ধোঁয়া বেরুচ্ছে তার।
🌸
–আরে আরে কি করছেন? আমি তো বললাম আমি কোমড়ে আর হাতে ব্যাথা পেয়েছি।এতো টেস্ট করার দরকার নেই।
— প্লিজ ম্যাডাম আমাদের কে আমাদের কাজ করতে দিন।নাহলে স্যার খুব রেগে যাবেন।
নার্সটির অসহায় গলা শুনে সায়েবা ভ্রু কুচকে তাকাল তার দিকে। সসন্দিহান গলায় জানতে চাইল,,
— ফারহান ভাইয়াকে এতো ভয় কেন পাচ্ছেন আপনি?
— হস্পিটালের মালিকের ছেলে কে ভয় পাবো না!(অবাক হয়ে)
— এই হসপিটাল ওনাদের কবে থেকে হলো? (ভ্রু কুচকে)
— আরো এক বছর আগে থেকে। স্যারের মেয়ে তো কয়েকদিন পরেই ডক্টর হয়ে ফিরবেন।তখন তিনিই এই হসপিটালের দায়িত্ব নিবেন।
— ওহহহহ।
— আর না করবেন না ম্যাডাম। প্লিজ কোঅপরেট করুন।
— কি আর করার। নিন করেন যা খুশি।
সমস্ত টেস্ট করিয়ে রিপোর্ট পেতে দুই ঘন্টা সময় লেগে গেলো। সায়েবা এখন একটি লাক্সারি কেবিনে বসে আছে। একেই বলে বড়লোকের বড়লোকি কারবার। মশা মারতে কামান দাগা।হুহ।মনে মনে ফারহানের গুষ্টি শুদ্ধো উদ্ধার করে ফেলছে সে।
আরো আধঘন্টা পরে ফারহান আসলো। দেখে মনে হচ্ছে সায়েবার বড় কোন রোগ ধরা পরেছে। চেহারা পেচার মতো করে এসে সায়েবার সামনে দাড়ালো।
— কি হয়েছে?
— তেমন কিছু না। কোমড়ে একটু ব্যাথা পেয়েছ।হাত আর পায়ে কিছুটা ব্যাথা হবে। রাতে জ্বর আসতে পারে।কয়েকদিন ফুল বেড রেষ্টে থাকবে।বেশি নড়াচড়া করবে না। তকোমড়ের সমস্যা বাড়তে পারে। তাহলে আর তোমার ধূলোর রানী হওয়া হবে না।
ফারহানের কথা শুনে সায়েবা কটমট করে তার দিকে তাকালো। সায়েবাকে এভাবে তাকাতে দেখে ফারহান মুচকি হেসে ওর গাল টেনে দিলো।
সায়েবা চোখ বড় বড় তাকালো ফারহানের দিকে। এই ছেলের হঠাৎ করে কি হলো! এতো দিন তো পাত্তাই দিতো না।এখন এতো দয়া দেখাচ্ছে কেন। মোটা টাকা হসপিটালের বিল ধরিয়ে দেয়ার ধান্দা না তো!আল্লাহ! কি ধান্দা বাজ লোক।নাউজুবিল্লাহ!
চলবে,,,
(এতো ভালোবাসা দেয়ার জন্য ধন্যবাদ সবাইকে।)
#সায়েবা_আসক্তি
#লেখিকা_সানজিদা_বিনতে_সফি
#পর্ব_৩
মায়ের সামনে কাচুমাচু করে বসে আছে সায়েবা।সামনের সোফায় ফারহান বসে তার মা কে মেডিসিন বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। সায়েবার মা কিছুক্ষণ পর পর কটমট করে তাকাচ্ছে সায়েবার দিকে। ফারহান সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে যাওয়ার সময় সায়েবার দিকে একবার তাকালো।মেয়েটা এখনো এক কোনায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে।
ফারহান চলে গেছে প্রায় দু ঘন্টা হতে চললো। তবুও সায়েবার মায়ের প্রশংসার ঝুলি খালি হচ্ছে না।সায়েবা বিরক্ত হয়ে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সায়েবার মা কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে বললেন,
— ছেলেটা এতো কষ্ট করলো তোর জন্য। আমি ভাবছি ওকে একদিন দাওয়াত করে খাওয়াবো। কি বলিস?
সায়েবার বিরক্তি এবার আকাশ ছুলো।মায়ের দিকে তাকিয়ে বিরক্তিকর গলায় বললো,
— উফফফ মা! ছাড়ো তো। এতো বড়লোক মানুষের আমাদের গরিবের খাবার মুখে রুচবে না।আমরা যা আয়োজন করে খাওয়াবো তা তারা প্রতিদিন ই খায়।
— আহ থাম তো।সব সময় দুই লাইন বেশি বুঝিস।আগামী শুক্রবার ফারহান কে আমাদের বাসায় লাঞ্চ করার জন্য ইনভাইট করবি।কথাটা মনে থাকে যেন।এখন রেষ্ট কর।শোয়েব চলে আসবে এখুনি।
ছোট ভাইয়ের কথা শুনে সায়েবার মন খারাপ হয়ে গেলো। তাকে এই অবস্থায় দেখলে ছেলেটা হয়তো কান্না কাটি শুরু করে দিবে।
মা চলে যেতেই সায়েবা বন্ধুদের কল করে এক্সিডেন্টের কথা জানিয়ে দিলো। কয়েকদিন ভার্সিটিতে যেতে পারবে না তাই নোটস গুলো কালেক্ট করে দিতে বললো। সবাই সন্ধ্যায় বাসায় আসবে বলে কল কেটে দিল।
🌸
দশতালার চিলেকোঠায় একটা ছেলেকে বেধে রাখা হয়েছে।ছেলেটা মিজানের বন্ধুদের মধ্যে একজন। আদিব ছেলেটার সামনে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। ছেলেটাকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে আগ্রহ নিয়ে বললো,
— ছ্যাকা ট্যাকা খাইছিস ভাই?না মানে মরার সখ কেন হলো বুঝতে পারছি না। আর মরতে হলে অনেক অপশন আছে।এই অপশন টাকেই কেন বাছতে হলো!
আদিবের কথা শুনে বন্ধু মহলের সবাই কিটকিট করে হেসে উঠলো। আদিব ওদের দিকে তাকাতেই ওরা আরো জোরে হেসে উঠলো।
ওদের হাসির মাঝেই ফারহান রুমে প্রবেশ করলো। ছেলেটার মুখোমুখি চেয়ার টেনে বসতেই ছেলেটা কাপা কাপা চোখে তাকালো।
ফারহান শান্ত চোখে তাকিয়ে বললো,
— দেখ,কাল তোদের এতো মারার পরেও তোরা আবার একই কাজ করলি।
— ভুল হয়ে গেছে ভাই।আর কখনো এমন করবো না।
ছেলেটির কাদো কাদো গলা শুনে ফারহানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। রক্তলাল চোখে তাকিয়ে বললো,
— এটা আমার কলিজায় আঘাত করার আগে ভাবা উচিত ছিল। আমার আফসোস হচ্ছে আমি তোকে একেবারে মেরে ফেলতে পারবো না। কারণ তোর মায়ের তুই ছাড়া আর কেউ নেই। তবে এর শাস্তি তুই পাবি।
আদিবের দিকে ইশারা করতেই আদিব একটা হকিস্টিক এগিয়ে দিলো ফারহানের দিকে।
প্রায় দশ মিনিট বেধম মারার পরে ছেলেটি কে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলো।
নিজের ফোন বলে বের করে কাউকে কল করলো ফারহান।
— একটা ছেলে কে পাঠাচ্ছি। বেস্ট ট্রিটমেন্ট দিবেন তাকে।কোন কিছুর কমতি যেন না হয় সে দিকে খেয়াল রাখবেন। আশা করি বুঝতে পেরেছেন।
অপর পাশ থেকে কাপা কাপা গলায় বললো,,,
— জ জ্বি স্যার।
ফারহান কল কেটে ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাড়ালো। আদিব ফারহানের পাশাপাশি দাড়িয়ে মন্থর চোখে তাকিয়ে রইলো।
ফারহান আদিবের দৃষ্টি দিকে দেখে ভ্রু কুচকে বললো,
— হোয়াট???
— সাহেবানের তোকে পাগল করে ছারবে ভাই।তুই তো পাগল আশিক হয়ে গেছিস(দুষ্টু হেসে)।এতো ভালোবাসিস তাহলে রিজেক্ট কিরেছিস কেন?
আদিবের কথায় দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ফারহান। মলিন চোখে তাকিয়ে বললো,
— সায়েবার বাবা মারা যাওয়ার পর আন্টি খুব ভেঙে পরেছিলেন।মেয়ে আর ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে খুব সহজে সামলে ও নিয়েছেন। সায়েবা আর শোয়েব কে নিয়ে ওনার অনেক স্বপ্ন। সায়েবা কে প্রোফেসর হিসিবে দেখা আংকেলের একমাত্র স্বপ্ন ছিল।সায়েবার জন্য এটা একটা আবেগের সময়।ও আমাকে ভালোবাসে তা আমি জানি।তবে এখন এভাবে কোন সম্পর্কে জরিয়ে আমি ওর পড়াশোনা নষ্ট করতে চাই না। যে সময় টা আমাকে দিবে ওই সময় টা পড়াশোনায় কাজে লাগাবে।তাছাড়া এখন আমার মাস্টার্স ফাইনাল এক্সাম সামনে। সায়েবা কে পেতে হলে নিজেকেও গুছিয়ে নিতে হবে। দুজনের ই সময় দরকার।যে আমার তাকে হারানোর ভয় নেই।কারণ যে আমার সে শত ঝড় সয়ে ও আমার ই থাকবে।
— সাহেবান কিন্তু খুব রেগে আছে তোর উপর।
— আমি তো চাই সে রাগুক।অভিমান, অভিযোগ জমিয়ে রখুক।যখন এক সমুদ্র ভালোবাসা নিয়ে তার সামনে দাড়াবো তখন সে সমস্ত রাগ অভিমান আমার বুকের মুখ লুকিয়ে ঝড়িয়ে দিক।অভিযোগের পাহাড় আমার বুকের মাঝেই শেষ করুক।আর আমি তার অভিমানী চোখের প্রেমে পড়ে আরো একবার পাগল প্রেমিক হয়ে যাই।
ফারহানের কথা শুনে আদিব কাদো কাদো গলায় বললো,,
— আজ একটা গালফ্রেন্ড নেই বলে,,,,, 🥺🥺
আদিবের কথা শুনে ফারহান হতাশার নিশ্বাস ফেললো। বন্ধু সব সময় সিরিয়াস কথার মধ্যে এমন মজা করে।
🌸
শোয়েব ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে সায়েবার দিকে। কিছুক্ষণ পর পর পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বোলাচ্ছে।
— কি?এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? জীবনে অসুস্থ মানুষ দেখিস নি?
— কারোর সাথে ধাক্কা খেয়ে পরে গেলে যে মানুষের কোলে চেপে বাড়িতে আসতে হয় এটা আমার জানা ছিল না। বেচারা ফারহান ভাইয়া তোমার মতো দুই মণের একটা আটার বস্তা তিন তালায় তুলে এখনো পর্যন্ত বেচে আছে কি না সন্দেহ। দাড়াও আমি একটু দেখে আসি। আমার আশি কেজি বোনের জন্য একটা অবলা ছেলে অকালে ঝরে যাবে আমি তা কিছুতেই মেনে নিবো না। তুমি একজন ভবিষ্যৎ বিজনেস ম্যান কে এভাবে মেরে ফেলতে পারো না।আমি বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এটা কখনোই মেনে নিবো না। পাচশ টাকা দাও।তার জন্য কিছু ফলমূল কিনে নিয়ে যেতে হবে। দেখা গেলো তোমাকে কোলে তুলে বেচারা শক্তির ঘাটতি দেখা দিলো।তখন এই শোয়েবের ফলমূল ই কাজে লাগবে।
সায়েবা চোয়াল ঝুলিয়ে তাকিয়ে আছে শোয়েবের দিকে। কিছুক্ষণ আগে এই ছেলেটা তাকে নিয়ে চিন্তা করবে ভেবে সে অস্থির হচ্ছিল! এখন নিজেকেই নিজে কয়েকটা ভয়ংকর গালি দিতে ইচ্ছে হচ্ছে।
— তুই এই মুহুর্তে আমার চোখের সামনে থেকে যা।না হলে ছোট ভাই খুন করে আমি জেলে যেতে চাই না।
— আগে বেড থেকে নেমে তো দেখাও।এখন তুমি আটানা পয়সার মতো। অচল।
— মাআআআ।তোমার ছেলে কে এখান থেকে যেতে বলো।
— যাচ্ছি যাচ্ছি। এতো চিৎকার করার কিছু হয় নাই।এটা আমার ও বাবার বাড়ি। আমিও চিৎকার করতে পারি।
সায়েবা কটমট করে তাকাতেই শোয়েব ভেংচি কেটে চলে গেলো।
আধঘন্টা পরে শোয়েব আবার সায়েবার রুমে এলো। সায়েবা তখন ফোনে ফেসবুকে নিউজফিড স্ক্রল করছিল।সায়েবার কোলের উপর একটা প্যাকেট রেখে বললো,
— আপু তোর জন্য নিয়ে এলাম।
সায়েবা ভ্রু কুচকে তাকালো শোয়েবের দিকে। নিজের কোলের উপর প্যাকেট দেখে কপালের ভাজ দৃর হলো। সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করলো,
— কি এটা?
— আরে খুলেই দেখো না।তোমার খুব পছন্দের জিনিস।
সায়েবা প্যাকেট খুলতেই এক গাদা ধুলা এসে তার কোলের উপর পরলো।অবাক হয়ে শোয়েবের দিকে তাকাতেই শোয়েব দুঃখী দুঃখী গলায় বললো,
— শুনলাম তুমি নাকি ধূলোর রানী।আমার বোন ধূলোর রানী এই কথা আনার অন্য একজন থেকে জানতে হচ্ছে! বড়ো কষ্টের পাইলাম।তুমি আমাকে আপন না ভাবলে কি হবে আমি তো তোমাকে আপন ভাবি।ধূলোর রানী কে তো আর ধুলো ছাড়া রাখতে পারি না। তাই অনেক কষ্ট করে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে তোমার জন্য ধূলো নিয়ে আসলাম।ভালো করেছি না বলো?
চলবে,,,,

