#সায়েবা_আসক্তি
#লেখিকা_সানজিদা_বিনতে_সফি
#শেষ_পর্ব,,(প্রথমাং।শ)
সাত মাসের উচু পেট নিয়ে ফায়জার রুমে বসে আছে সায়েবা।পার্লারের মেয়েগুলো ফায়জা কে বধু সাজাতে ব্যস্ত।শোয়েবের মৃত্যুর পর থেকে সায়েবা খুব একটা কথা বলে না।সব সময় চুপচাপ হয়ে বসে থাকে।ফারহান অনেক চেষ্টা করেছে সায়েবা কে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার।কিন্তু ফলাফল শূন্য। সায়েবা নিজে থেকে কখনো চেষ্টা করে নি স্বাভাবিক হওয়ার। দেশের সবচেয়ে বড় সাইক্রেটিস্ট দেখিয়ে ও কোন লাভ হয় নি। তাই সব বাদ দিয়ে ফারহান নিজেই সায়েবা কে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।ফারহানের বিশ্বাস তাদের সন্তান পৃথিবীতে আসলেই সায়েবা স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আয়নায় সায়েবা কে দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল ফায়জা।সায়েবার চোখের নিচে কালি পরে গেছে।গলার হাড় গুলু দূর থেকেই গুনা যাবে।সাহেরা বেগম তার ভাইয়ের কছে ইতালি চলে গেছে।সায়েবার সাথে কোন যোগাযোগ রাখে নি সে।তার ভাষ্যমতে, ফারহানের সাথে সায়েবার বিয়ে না হলে আজ এমন কিছুই হতো না।এই আশংকায় সে ফারহানের সাথে সায়েবা কে বিয়ে দিতে চায় নি।আজ তার আশংকা ই ঠিক হলো। তার বুক খালি করে দিলো ওরা।তার পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করলে সায়েবা আস্তে আস্তে ফারহান কে ভুলে যেতো। তাহলে আজ আর তার শোয়েব কে অন্ধকার কবরে থাকতে হতো না।শোয়েবের মৃত্যুর একমাসের মাথায় সে ইতালি পারি জমায়।যাওয়ার আগে সে কারোর সাথে কোন কথা বলে নি।সারাদিন শোয়েবের কবর থেকে একটু দূরে বসে থাকতো। রাত হলে ফারহান গিয়ে তাকে জোর করে নিয়ে আসতো। সাহেরা বেগম প্রথম প্রথম ফারহান কে সহ্য করতে পারতো না।হাতের কাছে যা পেতো তা দিয়েই আঘাত করতো।কিন্তু হঠাৎ করেই সে চুপ হয়ে গেলো। তার কয়েকদিন পরেই কাওকে কিছু না বলেই ইতালি তার ভাইয়ের কাছে চলে যায়।সায়েবার মামা সায়েবা কে কল করে জানিয়েছে তার ইতালি যাওয়ার কথা। সাহেরা বেগম স্পষ্ট জানিয়েছে তার ছেলের খু*নিদের সাথে সে কোন যোগাযোগ রাখবে না।বাকি জীবন সে এখানেই কাটিয়ে দিবে।
— তৈরি হবে না সায়েবা?
ফায়জার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লো সায়েবা।আস্তে ধিরে চলে গেলো নিজের রুমের দিকে। তার তৈরি হওয়া মানে জিলবাব পড়া।
আজ আদিব আর ফায়জার বিয়ে।অনেক ঝড় ঝাপটা পার করে তারা আজ এক হচ্ছে। ফায়জা লাজুক মুখ দেখেই তার খুশি আন্দাজ করা যাচ্ছে। আদিব নির্লজ্জের মতো ফায়জা কেই দেখে যাচ্ছে। বন্ধুরা কয়েকবার খোচা দিয়ে কিথা বললেও তার সেদিকে কোন হেলদোল নেই।ড্রয়িং রুমের একপাশে সোফায় আফরিন বেগম আর ফরিদ সাহেব বসে আছে। তার বরাবর সানোয়ার সাহেব আর ফারহানা বেগম। নীতি রান্নাঘরে ব্যস্ত।সব কিছুর তদারকি তাকেই কর্যে হচ্ছে। শোয়েবের ঘটনার পর সবার ভিতরেই নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেছে। সাহেরা বেগমের চলে যাওয়ায় সব চেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছে সায়েবা।কয়েকদিন একটানা কান্না করলেও এখন খুব একটা কাদতে দেখা যায় না তাকে।তবে মাঝে মাঝে মাঝ রাতে সায়েবার রুম থেকে চিৎকার করে কান্নার আওয়াজ শোনা যায়।সাথে বাকি সবার দীর্ঘশ্বাস ও।ফায়জার বিয়েতে শাহানা বেগম আসে নি।সে আজ পাচ মাস যাবত লিজা কে খুজে চলেছে।শোয়েবের মৃ*ত্যুর পর থেকে লিজা গায়েব।শাহানা বেগম আর তার স্বামী হাজার খোজাখুজি করেও লিজা কে খুজে পায় নি।হন্যে হয়ে বাংলাদেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত খুজে চলেছে তারা। শাহানা বেগম কয়েকবার ফারহানের কাছেএসেছিলো।তার দৃঢ় বিশ্বাস ফারহান ই লিজা কে গায়েব করেছে।মেয়ের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত সে।কিন্তু ফারহানের কাছে এসে ও ফলাফল শূন্য। ফারহান মুখ খোলে নি।শক্ত গলায় শাহানা বেগম কে বাইরের রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছে। শাহানা বেগম সেই থেকে এ বাসায় আর আসে না। সানোয়ার সাহেব ও বোন কে ডাকে নি আর।
🌸
মুখোমুখি বসানো হয়েছে আদিব আর ফায়জা কে।আদিব অবশ্য কয়েকবার নিজের লাজ লজ্জা ভুলে মাঝের পর্দা সরিয়ে ফায়জা কে দেখে নিয়েছে কয়েকবার।ফরহাদ হেসে কুটিকুটি হলেও ফারহান চোখ রাঙিয়ে দমিয়ে রেখেছে আদিব কে।আদিব পারলে ফায়জার কোলে চড়ে বসে থাকে।সবার হাসাহাসি তে ফায়জা লজ্জায় গুটিয়ে যাচ্ছে। মনে মনে কয়েক কোটি বার আদিব কে নির্লজ্জ ঘোষণা করা শেষ।আদিব ফারহানের কানে ফিসফিস করে বললো,
— ভাই বাসর ঘরে কখন যাবো?সময় তো সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। কাজ তারাতাড়ি শেষ কর ভাই।আমার কিন্তু আর তর সইছে না।সবার সামনে চুমু টুমু খেয়ে ফেললে আমাকে কিছু বলতে পারবি না।আমার আবার এতো ধৈর্য নাই।হায় হায়,আমার বউ এতো সুন্দর কেন?দেখেছিস,আমি কতো সুন্দরী বউ পেয়েছি!একেই বলে কপাল।
ফারহান বিরক্তি তে কয়েক বার মাথা নাড়লো। এই ছেলে আর এ জীবনে ঠিক হওয়ার নয়।সব সময় লাগাম ছাড়া কথা। মন চাইছে ঠাটিয়ে এক চড় বসিয়ে দিতে।ফারহান দাতে দাত চেপে কাজি সাহেব কে বললো বিয়ের কাজ শুরু করতে।সায়েবা আর নীতি ফায়জার দুই পাশে বসে আছে।ফায়জা শক্ত করে ওদের হাত ধরে রেখেছে।সাবা ও এসেছে ওর বরের সাথে। নীলের সাথে বিয়ে হয়েছে সাবার।যদিও দুজনের সম্পর্ক সাপে নেউলে।তবে সংসার টা বেশ গুছিয়ে ই করছে দুজন।
অবশেষে বিয়ের কাজ শেষ হয়েছে।ফায়জা সময় নিয়ে কবুল বললেও আদিব কাজি কিছু বলার আগেই কবুল বলে দিয়েছে।তার অনেক তাড়া বাসর ঘরে যাওয়ার।
পুরোটা সময় সায়েবা ছিলো নির্লিপ্ত। ফায়জা কে বিদায় দিয়ে রুমে এসে বসে আছে সে।আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে আদিব ফায়জা কে বিদায়ে কাদা তো দূর কাউকে কিছু বলার ও সুযোগ দেয় নি।পিছে তার পরীর মতো বউ কাদতে কাদতে পেত্নী হয়ে যায়!তাই ফায়জা কে জরুরি কথার বাহানায় বাইরে ডেকে নিয়ে যায়।দরজার বাইরে আসতেই ফায়জা কে টেনে লিফটে ঢুকে পড়ে। ফায়জা আশ্চর্যে হা করে ছিল। সম্ভতি ফিরতেই নিজেকে গাড়িতে আবিষ্কার করলো। আদিব ফারহান কে ম্যাসেজ করে গাড়ি স্টার্ট দিতেই ফায়জা চিৎকার করে গাড়ি থামাতে বললো আদিব কে।জবাবে আদিবের কথা শুনে মুহুর্তে মুখ বন্ধ হয়ে গেলো তার।বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে বসে রইলো সে।তা দেখে বাকা হাসলো আদিব।অনেক জ্বালিয়েছো সোনা।আজ আমার পালা।
ফায়জার গাল রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে।ভয়,লজ্জা,উত্তেজনায় বুক কাপছে তার।তখকার আদিবের বলা কথা গুলো ভেবে চোখ বন্ধ করে ফেললো সে।তখন আদিব বলেছে,
— এখনই এতো চিৎকার কেন করছো জান।আমি তো এখনো কিছু করলাম ই না।কিছু চিৎকার রাতের জন্যও বাচিয়ে রাখো। তখন না হয় পরখ করে নিবো তুমি কতো চেচাতে পারো।
ফায়জা চোখ বন্ধ করেই বিরবির করে বললো,
— অসভ্য।
🌸
উষ্ণ আলিঙ্গনে কেপে উঠলো সায়েবা।পর পর কয়েকবার পেটে ঠোঁট ছুয়িয়ে উঠে দাড়ালো ফারহান।সময় নিয়ে চুমু খেলো সায়েবার কপালে, গালে,ঠোঁটে। বিউটি বোর্নে গভীর চুমু খেয়ে নিজের বুকে টেনে নিলো সায়েবা কে।শক্ত করে সায়েবার মাথা নিজের সাথে চেপে ধরে সায়েবার কানে ফিসফিস করে বললো,
— তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে রানী সাহেবা।এবার আমি তোমার মুখে তৃপ্তির হাসি দেখতে চাই বউ।তার সমস্ত ব্যবস্থা আমি করে ফেলেছি।কাল ই তুমি তোমার সারপ্রাইজ পেয়ে যাবে।আমি আমার আগের সায়েবা কে ফেরত চাই বউ।যে বারবার আমাকে চোখ রাঙাবে।একটু ভালোবাসা পাওয়ার লোভে আমাকে তার ভালোবাসায় উন্মাদ করে তুলবে।যাকে দেখলে আমার চোখ শীতল হয়ে যাবে।আমি আমার সেই সায়েবা কে ফেরত চাই।কথা দাও,দিবে তো সেই সায়েবা কে?
চলবে,,,
(কিছু কথা না বললেই নয়,আপনাদের আমি জানিয়েছি আমার ছেলের খাতনা করানো হয়েছে।গত শনিবার তার অনুষ্ঠান ছিল। মা হিসেবে আমার কতো কাজ থাকে বুঝতেই পারছেন।সেদিন আশি জন মানুষের রান্না আমাকে একা করতে হয়েছে।সব কিছু গুছিয়ে আবার ভোর রাতের জন্য সাহরি রান্না করতে হয়েছে।বাসায় এখনো মেহমান। দুপুর আড়াইটায় কিচেনে ঢুকলে সন্ধ্যায় বের হতে হয়।আবার রাতের রান্না।রাত তিনটায় ভোর রাতের জন্য রান্না।ঘুমাতে গেলে রান্না করা যাবে না।সেই জন্য রাতে আর ঘুমাই না।এক ঘন্টা ঘুমিয়ে উঠে পরা আমার কর্ম নয়।তাই একটু বোঝার চেষ্টা করুন। ভোরে শেষাংশ পেয়ে যাবেন ইংশাআল্লাহ।)

