মৌনপ্রেম #অয়ন্তিকা_রাফিয়াত_ঐশী পর্বঃ ৩২ (খ)

0
27

#মৌনপ্রেম
#অয়ন্তিকা_রাফিয়াত_ঐশী
পর্বঃ ৩২ (খ)
(অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)
📌“গল্পের এই অংশে যে ঘটনাগুলি তুলে ধরা হয়েছে তা কেবল কাল্পনিক ও কাহিনিচালিত। চরিত্রগুলি বাস্তব ব্যক্তির প্রতিরূপ নয়। তাই যেকোনো পরিস্থিতি পাঠকদের বিবেচনার অনুরোধ রইলো।”

——————————————

বাড়িতে এ কদিনের টানা ব্যস্ততায় প্রাণেশা, দিথী, ইশি সবারই পড়া সব পিছিয়ে গিয়েছে। তাই আজ ওদের সবাইকে মিসেস আয়েশা আমিন যার যার কলেজ, ইউনিভার্সিটি যাওয়ার জন্য বলছেন বার বার। মেয়েগুলো সব এত এত পড়া মিস দিয়েও চুপচাপ। কারো কোন টেনশন নেই, উনাকেই বার বার বলে বলে পড়ার কথা স্মরন করিয়ে দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে প্রাণেশা সব চেয়ে পিছিয়ে আছে। নানান ঝামেলায় বেশ অনেক গুলো দিন কলেজ মিস দিয়েছে মেয়েটা। তাই ওর যাওয়া তো আবশ্যক মনে করছেন তিনি। দিথীও যাবে, তবে ইশির আজ পিরিয়ড হয়েছে। তাই সে যাবেনা। মেহেরিনও চলে যেতে চাচ্ছে বাড়ি। ওর ও নাকি কি কাজ আছে। তো সকাল সকাল মেহেরিন, দিথী, প্রাণেশা তিন জনেই এক সাথে বের হলো। দিথী তার ইউনিভার্সিটি নেমে গিয়েছে। মেহেরিনও মার্কেট নেমেছে। ওর কিছু কেনার আছে। তারপর এদিক থেকে বাড়ি চলে যাবে। আর প্রাণেশাও যথাযথভাবে তার কলেজ চলে গেল।

প্রাণেশা এখন ক্লাসরুমে বসে আছে। তার বান্ধবী মেহা এখনো আসেনি। কেন আসলনা কে জানে। আসার আগে তো যোগাযোগ করে এসেছিল। এতক্ষণে পৌছে যাওয়ার কথা। তাহলে?

ওর ভাবনার মধ্যেই ক্লাসরুমে প্রবেশ করতে দেখা যায় মেহাকে। সে হাত নাড়ায়। ওর ইশারায় মেহা এসে পাশে বসলে প্রাণেশা তার দিকে তাকায় । চোখ মুখ শুকনো লাগছে। মনে হচ্ছে সারারাত ঘুমায়নি। মেহা কি কোন সমস্যায় পড়েছে? একথা ভেবে সে জানতে চাই কি হয়েছে তার। চোখ, মুখ এমন লাগছে কেন?

ওর কথা শুনে মেহা বলে,

“আর বলিসনা বোন, বাড়িতে অনেক সমস্যা চলছে। কিভাবে যে আজকে কলেজে এসেছি আমিই জানি।”

প্রাণেশা ওর কথা শুনে ইশারায় কি সমস্যা জানতে চাই।

“আমার আপুকে নিয়ে। ওকে দুদিন হলো শ্বশুর বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে আমার বাবা। ওর যে বরটা আছে? অদ্ভুদ মানুষ একটা। আমার আপুকে একটুও শান্তি দেয়না। আমার পরিবারের কাছে কতভাবে অনুরোধ করে ওকে বিয়ে করেছিল তখন। তবে আমার বাবা, ভাইয়া ওকে আগে নিজের পায়ে দাড় করাতে চেয়েছিল বলে মানাও করে দিয়েছিল। কিন্তু ওদের মিষ্টি মিষ্টি কথায় এসে বিয়ে দিয়েছে, আর এখন ভুগতে হচ্ছে।”

“মূল সমস্যা কি? নিয়ে এসেছে কেন? আর আপুকে কি ভালোবাসেনা ওর স্বামী?” সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ

“আল্লাহ্‌ মালুম, ভালোবাসে কি বাসেনা। বাসলেও বুঝতে পারিনা কেমন ভালোবাসা এসব। একটা মানুষ এত টক্সিক কি করে যে হয়। দুলাভাই আমাদের এক আত্মীয়ের বিয়েতে আপুকে দেখে পছন্দ করেছিল। প্রস্তাব পাঠালে আমার বাবা মা না করে দিলেও পরে ওদের নানান অযুহাত, কথাবার্তায় এসে বিয়ে না দিয়ে পারেনা। আমাদেরও মনে হতো ভাইয়া বোধ হয় আপুকে ভীষণ ভালোবাসে। তো বিয়ে হয় খুব ধুমধাম করে। আমার আব্বুর এক টাকাও খরচ হয়নি। সব ওরা করেছে স্বেচ্ছায়। আপুকে পেতে খুব বেগ পোহাতে হয়েছিল কিনা? তাই খুশি হয়ে তারাই সব করেছিল। এভাবে বিয়ের পর তিন বছর গেল। আস্তে আস্তে সব অন্যরকম হলো। আপুর স্বামী নাকি ছোটবেলা থেকে ভীষণ মেজাজি। তাই আপুর হাতে তিনটা আঙ্গুল না থাকা স্বত্তেও আপুকে বিয়ে করতে চাওয়ায় তার পরিবার তেমন আপত্তি করেনি, ছেলেকে ভয় পায় বলে। কিন্তু বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর ওর শ্বশুর বাড়ির লোকজন ওকে নানান ভাবে অপদস্ত করে ভাইয়ার অনুপস্থিতিতে। ভাইয়া জানতে পেরে সবাইকে সাবধান করে, বাবা মায়ের সাথে ঝামেলাও হয়। কিন্তু নিজেও আপুকে সবসময় নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়তো সে, আপু উনার উপর কোন কথা বলতে পারেনা। বললেই শাস্তি দেয় নানানভাবে। সাইকোদের মতো বিহেভ করে। এদিকে আপুকে মা রবে ধ রবে অপ মান করবে। আবার আপুকে ছাড়া থাকতে পারবেনা।”
তারপর একটু ইতস্তত করে মেহা আবার বলে,

“কিছুদিন আগে একবার আপু অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে ডাক্তার বলে স্বামী স্ত্রীর অতিরিক্ত মেলামেশার কারণে এমন হয়েছে। কি লজ্জ্বার কথা!! এসব অবশ্য কেউ জানেনা। আমি তো এমন নানান গোপন খবর সংগ্রহ করে থাকি, সে হিসেবে জানি আরকি। তো এবার ভেবে দেখ। কত টা জালিম। আমার আপুকে সারাদিন কতভাবে নির্যাতন করে। তারপর আপু সুস্থ হলে আব্বুকে বলে বাড়ি আসতে চায় সে। আমার মনে হয় ভাইয়া আপুর মধ্যে কোন ঝামেলা চলছিল আগে থেকে, বা আপু কোন কারণে বেশি কষ্ট পেয়েছে। নাহয় আমার আপু ওর স্বামীর উপর তেমন কথা বলেনা। তো আব্বু নিয়ে এসেছিল। এরপর আর যেতে চাচ্ছেনা। দুলাভাই নিতে চাইলেও যেতে চাচ্ছেনা। তারপর আপু গতকাল আবার অসুস্থ হয়ে গেলে, আবার ডাক্তার দেখায়। তারপর সবাই জানতে পারি ও প্রেগন্যান্ট। সারারাত কারও ঘুম হয়নি খুশিতে। কিন্তু ও স্বামীর কাছে ফিরতে চাচ্ছেনা দেখে আবার সবাই টেনশনে আছে। কি জানি কি হবে। দুলাভাই নিয়ে যাবে আপুকে যেভাবে হোক, সেটা জানি। আর আপু প্রেগন্যান্ট জানলে তো কথায় নেই। কিন্তু ব্যাটা একটু শাস্তি পাক, এটাই চাচ্ছিলাম। আমার পরীক্ষার সময় আপু আর তার বিয়ের ডেট ফেলেছিল। একটুও মজা করতে পারিনি। আমার এখনো মনে পরে। শাস্তি পাক ঐ ব্যাটা, আমিন।”

প্রাণেশা জানতে চায় ওর আপুর হাতে আঙ্গুল নেই কেন?

“ছোট থাকতে একবার এ ক্সি ডেন্ট করেছিল। তখন আঙ্গুল কে টে গিয়েছিল তিনটা। সেই থেকে আরকি।”

————————

“মিস, আপনি সাদা ড্রেস পড়ে আছেন। এভাবে বৃষ্টিতে ভেজা উচিত হচ্ছেনা।”

মেহেরিন মার্কেট থেকে কিছু টুকটাক জিনিস কিনে বাড়ি ফিরবে ভেবেছিল। বাড়িতে ফোন করে বলেছে নিউ মার্কেটের ওখানে গাড়ি পাঠাতে। এতক্ষণে এসে যাওয়ার কথা। কিন্তু একটু আগে ড্রাইভার কাকা কল দিয়ে জানালো গাড়িতে কিছু সমস্যা হয়েছে, মাঝরাস্তায় আঁটকে পড়েছে হঠাৎ।

একথা শুনে মেহেরিন হাটতে শুরু করে। রিকশা নিয়ে চলে যেতেই পারত। কিন্তু ওপাশে ফুটপাতের উপর কিছু দোকান দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন কালারের ফুল, চুড়ি, দুল, চুলের ক্লিপসহ মেয়েদের আরও নানানরকম জিনিসপত্র দেখা যাচ্ছে। সে হাঁটতে হাঁটতে ওগুলো দেখতে যায়। কিন্তু এর মধ্যে বৃষ্টি চলে এসেছে। দোকানিরা নিজেদের মালপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে। সবাই বৃষ্টি থেকে বাচতে নানান জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছে। পুরো জায়গাটা এখন খালি বলতে গেলে। দোকানপাট তুলে নিয়েছে দেখে সে আরও কিছুটা দূরে চলে গেল হেঁটে হেঁটে। ওদিকে কেউ নেই। ওখানে দাড়িয়ে সে ভিজছে। ভালোই লাগছে। এভাবে হঠাৎ বৃষ্টি চলে আসবে আশা না করলেও এভাবে ভিজতে মন্দ লাগছেনা। ভেবে সে দুহাত মেলে দিয়ে বৃষ্টি বিলাস করছিল। হঠাৎ কারো কণ্ঠে ধ্যান ভাঙে। ছাতা হাতে দাড়ানো সুদর্শন এক যুবক। তাকেই বলেছে কথাটা। কিন্তু কি কারণে বললো তা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়। যুবকটা আবার বলে,

“আপনি সাদা ড্রেস পড়েছেন।”

“তো?”

মেহেরিনের অবুঝ প্রশ্নে দীর্ঘশ্বাস ফেলে যুবকটা তার শরীরে একবার চোখ বোলায়। মেহেরিন এতে হতবম্ব হয়। আজাইরা মানুষ। রাস্তায় অচেনা মেয়েকে হঠাৎ বলছে সে সাদা ড্রেস পড়েছে। আবার কারণ জিজ্ঞেস করলে বাজে দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। তবু মাথা ঠাণ্ডা রেখে আনমনে নিজের দিকে তাকায় সে। আর ওমনি হতবাক হয়। হায় আল্লাহ্‌! সে তো খেয়াল ও করেনি এত কিছু। মেহেরিন সংকুচিত হয়ে যুবকটার দিকে তাকায়। কি করবে বুঝতে পারছেনা এই মুহূর্তে। এমন বোকামো করা তার উচিত হয়নি। এদিকটাই বেশি মানুষ না থাকলেও সে খেয়াল করে দেখে, যে কজন আছে তারাই চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে ওকে। সে যুবকটিকে কোন ভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে একটা রিকশা পাওয়ার আশায় এদিক ওদিক তাকায়।

“এই বৃষ্টির মধ্যে রিকশা বা গাড়ি কোনটাই পাবেন না। আমার গাড়িতে আসুন। কোথায় যাবেন আমি আপনাকে ড্রপ করে দিচ্ছি।”

অচেনা লোকটা যেচে ওকে সাহায্য করেছে ঠিক। কিন্তু এমন প্রস্তাবে সে সন্ধীহান চোখে তাকায়।

“এভাবে তাকানোর কিছু নেই। আমি কোন মেয়েধরা নই। আপনাকে সাহায্য করতেই বলা। আপনি উঠুন গাড়িতে। আশেপাশের মানুষের দৃষ্টি মোটেও সুবিধার নয়, আর না আপনার বাহ্যিক অবস্থা। তাড়াতাড়ি উঠুন।”

লোকটার কথা শুনে মেহেরিন। তবে কিছু বলবে তার আগে লোকটা তাকে ধমক দিয়ে বলে,

“উঠতে বলেছি না? এখানে এভাবে দাড়িয়ে থাকতে বেশি ভালো লাগছে? বাইরের মানুষকে দেখাতে হবেনা। গাড়িতে উঠো, আমি দেখবো।”

মেহেরিন ধমক শুনলেও এমন অপমানজনক কথার বিপরীতে কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু লোকটার রাগী চেহারা দেখে কেন জানি কিছু বলতে চেয়েও পারল না। লোকটার খুলে দেওয়া দরজা দিয়ে গাড়িতে ঢুঁকে গেল।

————————

গাড়িতে উঠে সবার আগে মেহেরিনকে একটা তোয়ালে দিয়ে লোকটা মাথা মুছে নিতে বলে। সে থমথমে মুখে নিয়ে মাথা না মুছে গাঁয়ের উপর জড়ায় ওটা।

“আগে মাথা মুছুন, তারপর গাঁয়ে দিয়েন।”

“লাগবেনা।”

“লাগবে, আগে মাথা মুছুন।”

মেহেরিন এবার বিরক্তি নিয়ে বলে,

“আপনার সমস্যা কি জানতে পারি? আপনি কে? আমাকে নিয়ে এত ভাবতে হবেনা আপনার। তখন আমাকে হেল্প করেছেন, এজন্য ধন্যবাদ। এবার আমাকে আমার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিন, তাহলেই হবে।”

তুরাগ শান্ত দৃ্ৃষ্টিতে তাকায় ওর দিকে।

“আপনার ঠাণ্ডা লেগে যাবে মেহেরিন। আগে মাথা মুছুন। আপনার শরীরে এতক্ষণ যখন অশ্লীল নজর দেইনি। এখনো দেবনা। নিশ্চিন্তে মাথা মুছুন।”

মেহেরিন বিস্ফোরিত চোখে লোকটাকে দেখছে।

“আপনি আমার নাম জানলেন কিভাবে?”

তুরাগ একবার ওর দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে বলে,

“সেটা আপনাকে ভাবতে হবেনা। আপনি মাথা মুছুন, আমি ঠিকভাবে আপনাকে বাড়ি পৌছিয়ে দিচ্ছি।”

“জানতে হবেনা কেন? আপনি আমার নাম জানেন কিভাবে?”

“বলেছি তো না জানলেও চলবে।”

“চলবেনা, বলুন। আপনার উদ্দেশ্য কি? আমাকে চিনেন কিভাবে? নাহলে আমি গাড়ি থেকে লাফ দেব।”

তুরাগ ওকে এমন করতে দেখে ভ্রু টানটান করে ঠাণ্ডা চোখে দেখে। তারপর কোন কথা না বলে ড্রাইভ করতে থাকে।

“আপনি বলছেননা কেন? আমি কিন্তু সত্যি সত্যি লাফ দেব।”

তুরাগ হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে দেয়। তারপর ওর দিকে ফিরে বিরক্ত মুখে বলে,

“আপনি তো আগে এমন বকবক করতেন না? অনেক পাল্টে গেছেন দেখছি। আমি আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেব বলেছি তো নাকি?”

“আপনি কে?” মেহেরিন ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বলে। কারন লোকটার কোন কথা তার সুবিধার লাগছেনা। সে নাকি আগে বকবক করতো না। কিন্তু এই লোক এসব জানলো কিভাবে?

মেহেরিন কে ভয় পেতে দেখে তুরাগ দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

“আমাকে আপনি মনে করতে পরছেননা মেহেরিন?”

লোকটার কথায় কেমন এক ধরণের আক্ষেপ, অভিমানের সুর পেল মনে হচ্ছে তার। যদিও চোখে মুখে তেমন কিছুর আভাস নেই।

“আপনাকে আমার চেনার কথা?”

লোকটা হেসে বলে,

“ওহ, আপনিতো চিনতেও পারছেন না। মনে রাখবেন কিভাবে।”

মেহেরিন দ্বিধান্বিত চোখে তাকায়। একটু থেমে বলে,

“আ আপনি কে? আমার চেনার কথা কেন?”

“অন্তিককে তো চেনেন? মনেও আছে নিশ্চয়?”

মেহেরিন হঠাৎ অন্তিকের নাম আসায় একটু থমকায়। অন্তিক ভাইয়ের নামটা আজও তাকে অনেক জ্বালায়। শুনলেও কেমন নিজেকে ভগ্ন ভগ্ন লাগে। অন্তিকের নাম শুনতেই ওর চেহারার পরিবর্তন দেখে তুরাগ চোখ বন্ধ করে নেয়।

মেহেরিন নিজেকে সামলে বলে,

“অন্তিক ভাইয়ের কথা বলছেন? তাকে কিভাবে চেনেন?”

“হ্যাঁ, আপনার মামাতো ভাই অন্তিকের কথায় বলছি। আমি তার খালার ছেলে হই, তুরাগ।”

মেহেরিন হতবাক হয়ে তাকায়। তুরাগ? মানে যার জন্য অয়ন্তিকে দেখতে আসার কথা ছিল কাল? কিন্তু ভাইয়ার কারণে ক্যান্সেল করেছে সেটা সবাই……

“আ আপনি? মানে অন্তিক ভাইয়ের খালাতো ভাই? মানে কাল……” সে শেষের কথাটা বলতে গিয়ে থেমে যায়।

“হ্যাঁ, সেই। যার জন্য অয়ন্তিকে দেখতে যাচ্ছিল সবাই কাল।”

মেহেরিন সংকুচিত হয়ে যায়। কোন কথা বলেনা। সে ভাবে তার ভাইয়ের জন্য বেচারা কাল বউ দেখতে আসল না। অপমানিত বোধ করেছে হয়তো। আর তাই শাসাতে চাইছেনা তো মেহেরিন কে? এমন আজগুবি ভাবনা চলে আসে তার মাথায়। সেতো আর জানেনা, তুরাগ নিজেও আপত্তি করে দিয়েছিল শেষ মুহূর্তে অয়ন্তিকে দেখতে। তার জন্যই।

মেহেরিনকে তুরাগ আগে থেকে ভালোবাস তো। বড় হয়ে এই মেয়েটাকে সে দুই/তিন বার দেখেছে খালার বাড়িতে। প্রথম দেখা থেকেই ওকে ভালোবাসতো সে। কিন্তু তখন এটাও বুঝে গিয়েছিল, সে যাকে ভালোবাসে তার মনে অন্য কেউ। তুরাগ মেহেরিন কে তেমন কাছ থেকে কখনো সেভাবে পায়নি। সেই দুই কি তিনবার দেখার ভালোবাসা এই মেয়েটা। ছোট মেয়েটার মনে অন্তিক আছে জেনে সে আর কখনো নিজের মনের খবর ওকে জানানোর কথা ভাবেনি। আর না বলার জন্য দেখা পেয়েছে মেহেরিনের। সে তো এত বছর ভেবেছিল অন্তিকের সাথে মেয়েটা প্রেমের সম্পর্কে রয়েছে হয়তো এত দিনে। ওকে অনেক ভুলতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। তারপর সেবার জানতে পারে অন্তিকের বিয়ে হয়েছে। সে আর কিছু শুনেনি অন্তিকের বিয়ে হয়েছে কথাটা শুনার পর। মেহেরিনকেই বিয়ে করেছে ভেবেছিল। তারপর একদিন শুনে তার বাবা মা একটা মেয়ে দেখতে যাবে ঠিক করেছে তার জন্য। সে কোন রা করেনা। কারণ তার এসব নিয়ে তখন আর কোন অনুভুতিই নেই। যেদিন বাড়ির সবাই মেয়ে দেখতে যাবে সেদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় গাড়ি থেকে অন্য একটা গাড়িতে মেহেরিনকে দেখেছিল তুরাগ। হয়তো বাবা, মায়ের সাথে মামা বাড়িতেই যাচ্ছিল। ওকে দেখে পুরনো অনুভূতি কেমন তাজা তাজা লাগছিল। অস্থির হয়ে নিজেকে পাগল পাগল মনে হচ্ছিল। তারপর কথায় কথায় গাড়িতে ওর পাশেই বসে থাকা চাচাতো ভাইয়ের কাছে জানতে পারে আজকে অয়ন্তিকেই নাকি দেখতে যাচ্ছে সবাই। তার খালাতো বোন অয়ন্তিকে। সে ভীষণ অবাক হয়। তারপর তার চাচাতো ভাই আবার বলে,

“সেদিন তোর খালা ছোট মাকে বলেছে শুনলাম তোর খালাতো ভাই অন্তিক নাকি কোন বোবা মেয়ে একটাকে বিয়ে করেছে? সত্যি নাকি? এত বড় আইনজীবী হয়ে বোবা মেয়েকে বিয়ে করলো? দেখেছিস তুই?”

“বোবা মেয়ে? তোকে এসব কে বলেছে?” তুরাগ ভ্রু টানটান করে বলে।

“তোর খালায় তো বললো তার ছেলের বউ কথা বলতে পারেনা। তাই ওকে বাড়ি রেখে এসেছে বলে চিন্তা হচ্ছে। মেয়েটা নাকি কিছু মুখ ফুঁটে চায় না।”

তুরাগ অবাক হয়ে শুনে।

“তুই শিউর এসব শুনেছিস?”

“আমাকে কি বয়রা লাগে? যে উল্টাপাল্টা শুনবো।”

তারপর নিজে খোঁজ লাগিয়ে সব জানতে পারে সে। অন্তিকের বিয়ে মেহেরিনের সাথে হয়নি। অন্য কারো সাথে হয়েছে। মেহেরিন এখন কারো নয়। ওর বিয়ে হয়নি। একথা শুনে সে অনেক্ষন চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। কি কি জানি ভাবছে, তারপর হঠাৎ মাকে ফোন দিয়ে অয়ন্তিকে দেখতে যেতে মানা করে দেয়। অথচ উনারা তখন সরোয়ার বাড়ির খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলেন। তুরাগ কে অনেক বুঝালেও সে নিজের কথায় অনড়। তার মা এসবের কারণ জানতে চাইলে, সে বলে দেয় মেহেরিনের কথা। সে বিয়ে করলে ঐ মেয়েটাকে করবে। আর কাউকে না।

তুরাগ এসব ভেবে মেহেরিনের দিকে তাকায়।

“এখন মনে পরছে আমাকে?”

“হু? না মানে… সেভাবে মনে নেই। আপনার সাথে কি আগে কখনো দেখা হয়েছিল?”

“তিনবার দেখা হয়েছিল। ” তুরাগ মাথাটা সিটে এলিয়ে দিয়ে বলে।

“ওহ”

তুরাগ বিরবিরিয়ে বলে,

“হু, তিনবার দেখায় আপনি আমার মনে রাজ করে ফেললেন। অথচ আমাকে আপনি সামান্য মনের কোনেও জায়গা দিলেননা, যে জীবনে চলার পথে কখনো দেখা হলে চিনতে পারবেন।”

এরপর অনেক্ষণ কেউ আর কোন কথা বলেনা। মেহেরিন বলছেনা ভয়ে, দ্বিধায়। আর তুরাগ কি ভাবছে তা সেই জানে। সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে ছিল সে। মেহেরিন কি বলবে খুজে পাচ্ছেনা। এদিক সেদিক তাকায়, আবার তুরাগ ঘুমিয়ে গেল নাকি দেখে, বুঝতে পারছেনা। তাই আবার বিরক্তি নিয়ে বসে থাকে। ভেজা কাপড়ে অস্বস্তি হচ্ছে তার।

“ব বলছিলাম, আপনার বেশি ঘুম পেলে বাড়িতে গিয়ে ঘুমাতে পারেন, এখানে আরাম পাবেন না। আমাকে একটু কষ্ট করে বাড়ি পৌছে দিয়ে বাড়ি গিয়ে ঘুমান প্লিজ।”

ওর কথা শুনেও তুরাগের কোন হেলদোল দেখা যায়না। এরপর আরও পাঁচ মিনিট কেটে গেলে তুরাগ হঠাৎ চোখ খুলে বলে,

“আমি এতক্ষণ নিজেকে প্রস্তুত করছিলাম। কিসের জন্য আপনি জানেন?”

মেহেরিন অবাক হয়ে তাকিয়ে মাথা নাড়ায়।

“আপনাকে প্রস্তাব দিতে। আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই মেহেরিন। আপনাকে ভালোবাসি অনেক বছর। কিন্তু আপনি তখন মামাতো ভাইয়ের প্রেমে মত্ত। আমি দূরে সরে গিয়েছিলাম আপনার মনে অন্য কেউ আছে জেনে। মনে মনে ভালোবেসে গেলেও কখনো আপনার সামনে আসিনি। তারপর আপনি বিদেশে চলে গেলেন। একদিন শুনলাম অন্তিক ভাই বিয়ে করেছেন। আমি ভেবেছিলাম আপনার সাথেই হয়েছে। তাই আর কিছু জানতে চাইনি ঐ ব্যাপারে। গতকাল জানলাম আপনার সাথে অন্তিক ভাইয়ের বিয়ে হয়নি। অন্য কারো সাথে হয়েছে। এতে আপনি কষ্ট পেলেও আমি ভীষণ খুশি হয়েছিলাম বিশ্বাস করুন। তাই আপনাকে আর ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্ন আসেনা। সৃষ্টিকর্তা আপনার ভালোবাসার পূর্ণতা না রেখে হয়তো আমার ভালোবাসার পূর্ণতা লিখে রেখেছিলেন। আমাকে ফিরিয়ে দেবেননা।”

এরপর মেহেরিন আর কোন কথা বলেনি। কেমন স্তব্দ হয়ে ছিল। বাড়ি গিয়ে সে এটা নিয়ে অনেক ভাবে। কিন্তু কোন কুল কিনারা পায়না। তারপর সেদিন রাতে হঠাৎ বাবা, মা ডেকে বলে তার জন্য নাকি একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। যেটা তাদের সবার ভালো লেগেছে। এখন বিয়ে না দিলেও, মেহেরিনের মতামত পেলে তারা এনগেজমেন্ট করিয়ে রাখতে চায়।

তারপর আবার জানায়, ছেলে নাকি তুরাগই। একথা শুনে সে আর কিছু বলেনি। সম্মতি দিয়ে দেয়। মেহেরিন অনেক ভেবেছে। আর সব শেষে তার একটা কথায় মাথায় এসেছে। সেটা হলো “সৃষ্টিকর্তা আপনার ভালোবাসার পূর্ণতা না রেখে হয়তো আমার ভালোবাসার পূর্ণতা লিখে রেখেছিলেন। আমাকে ফিরিয়ে দেবেননা।”

চলবে……………

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here