মৌনপ্রেম #অয়ন্তিকা_রাফিয়াত_ঐশী পর্বঃ ৩৪(খ)

0
30

#মৌনপ্রেম
#অয়ন্তিকা_রাফিয়াত_ঐশী
পর্বঃ ৩৪(খ)
(অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)
📌“গল্পের এই অংশে যে ঘটনাগুলি তুলে ধরা হয়েছে তা কেবল কাল্পনিক ও কাহিনিচালিত। চরিত্রগুলি বাস্তব ব্যক্তির প্রতিরূপ নয়। তাই যেকোনো পরিস্থিতি পাঠকদের বিবেচনার অনুরোধ রইলো।”

——————————————

প্রাণেশা এখন তার বাবা বাড়িতে আছে। হসপিটাল থেকে এখানে আনা হয়েছে তাকে। যদিও সে আসতে চায় নি। কিন্তু ভাইয়ের কথা আর অনুরোধ অমান্য করতে পারেনি।

প্রাণেশাকে পেয়ে তার বাবা বাড়ির সবাই ভীষণ খুশি। তারা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি প্রাণেশার অস্তিত্বের ব্যাপারে। আলিজা আহমেদ যে কখনো একটা কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তারা সকলে অজ্ঞ ছিল এতদিন। প্রাণেশাকে পেয়ে তারা সকলে খুশি হলেও, প্রাণেশা নিজে তেমন একটা খুশি নয়। সে কখনো চায় নি বাবা বাড়ির কারো সাথে তার দেখা হোক।

প্রাণেশা কাল অন্তিকের তার প্রতি করা আচরণের পরই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল, যে বাড়ি ছেড়ে সে চলে যাবে। তবে তখনও দুটোদিন সময় নিবে ভেবেছিল, আর মামা বাড়ি অব্দিই ছিল তার ফিরে যাওয়ার ভাবনা। কিন্তু রাতে অন্তিক তার উপর আবার যে নিকৃষ্ট কর্তৃত্ব ফলালো, তারপর সে আর ঐ লোকের মুখোমুখি হতে চায় নি। সকালে এক আচরণ, বিকালে এক আচরণ আর রাতে আরেক, বহুরুপী লোক।

মামা বাড়ি গেলে সেখান থেকেও ফিরিয়ে নিয়ে আসতে চাইতে পারে, এটা মাথায় আসার পর প্রাণেশা মেহার বাড়িতে দুটোদিন থেকে তারপর মামা বাড়ি চলে যাবে ভেবেছিল। ততোদিনে অন্তিকও ওকে না পেলে নিশ্চয় আর খুজত না। এসব ভেবে দূর্বল শরীর নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার মাথায় আসে মেহার বাড়িতেও সমস্যা চলছে এখন। কালই তো বলেছিল। এখন কথাবার্তা ছাড়া সে তাদের বাড়িতে গেলে সবাই ব্যাপারটা নিশ্চয় ভালোভাবে নিবেনা। তখন টেনশনে কি করবে, কোথায় যাবে এসব ভাবতে ভাবতে একটা গাড়ির সাথে ধাক্কা খায়।

এরপর স্পষ্ট করে তেমন কিছু মনে না থাকলেও একটা ছেলে তাকে কোলে নিয়ে হসপিটালে যাচ্ছে তা সে বুঝতে পারে। তারপর আরেকটু হুশ আসলে কেউ একজন তাকে বিবাহিতা কি না জানতে চাচ্ছে চাচ্ছিল। প্রাণেশা ভয় পেয়েছিল, তারা কোথাও আবার অন্তিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে চাচ্ছেনা তো ভেবে। তাই ‘না’ বলে। এরপর আরো কি কি যেন জানতে চাচ্ছিল। প্রাণেশা সেসব আমলে নেয় নি। বার বার মাথা নেড়ে ‘না’ বুঝিয়েছে, সে বিবাহিতা নয়। এর কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে পড়লে। যখন ঘুম ভাঙে তখন প্রথমবারের মতো বাবা-চা, ভাই, দাদি-ফুফি -সবাইকে দেখে। যদিও সে তখনও চেনেনা কাউকে।

তারা নিজেরাই নিজেদের পরিচয় দিয়েছে। প্রাণেশা খুব অবাক হয় হঠাৎ অচেনা মানুষগুলোকে তার পরিবার বলে পরিচয় দেওয়ায়। সে বিশ্বাস করেনি শুরুতে। তাদের কোন কথার জবাব দেয়নি সে, আর না নিজে কিছু জানতে চেয়েছে। কিন্তু সাহিলের হাতে মা, ভাইয়ের ছবি দেখে সে ওগুলো কেঁড়ে নেয়। তারপর হাতের ইশারা-ইঙ্গিতে তার অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত জিনিস ছোয়ায় অধিকার কে দিয়েছে জানতে চায় শক্ত মুখে। ওর সে প্রশ্নের অঙ্গভঙ্গিতে সবাই বিভ্রান্তিতে পরে যায়। কারণ তারা জানে না যে, প্রাণেশা কথা বলতে পারেনা। প্রাণেশা অস্থির হয়ে ছবিগুলো নিয়ে বেড থেকে নেমে যেতে চায়। হস্পিটাল থেকে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়। এতে গিয়ে সবার হুশ ফেরে।

সবাই আটকাতে চাইলে সাহিল হাত দেখিয়ে তাদের থেমে যেতে বলে। তারপর নিজে আস্তে ধীরে প্রাণেশার সামনে বসে। প্রাণেশার চেহারা সহ আপাদমস্তক স্নেহভরা দৃষ্টিতে দেখে নরম স্বরে জানতে চায়,

“তোমার নাম?”

প্রাণেশা তার দিকে তাকায়। এতক্ষণ বৃদ্ধা আর মাঝবয়সী মহিলা নিজেদের তার পরিবার বলে পরিচয় দিলেও শান্তভাবে কেউ কিছু বুঝিয়ে বলেনি। যার কারণে তার কাছে অবান্তর কথাবার্তা লেগেছে সেসব। সাহিলকে সুন্দরভাবে তার পরিচয় জানতে চাইতে দেখে সে তার দিকে তাকায়। এই ছেলেটাই তাকে হস্পিটালে নিয়ে এসেছিল। তার আবছা মনে আছে। সে চোখে মুখে দ্বিধা, আর এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য অস্থিরতা নিয়েও মন দিয়ে সাহিলের পুরো চেহারা দেখে। লোকটাকে তার ভালো মনে হচ্ছে। তার দিকে চেয়েও আছে কেমন মায়াভরা চোখে। প্রাণেশা শান্তভাবে বসে হাতের আঙ্গুল দিয়ে অক্ষর বানিয়ে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে নিজের নাম বোঝায়।
সাহিল তার হাতে ছবিগুলো দেখে যখন মেয়েটা রেগে গিয়েছিল, তখনই কিছুটা আন্দাজ করেছিল যে সে কথা বলতে পারেনা। তার ধারণা সত্যি হওয়ায় থমকে যায়। কয়েক মুহূর্ত প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর নিজের পড়নের পাঞ্জাবি পকেট থেকে ফোন বের করে লক খুলে প্রাণেশার হাতে ধরিয়ে দেয়।

“এখানে লিখে দাও। আমি আসলে একটু গাধা ধরণের। কেউ ইশারা-ইঙ্গিতে কিছু বোঝালে ঠিক ধরতে পারিনা। ছোটবেলায় পরীক্ষার হলেও আমার বন্ধুরা কোন উত্তর ইশারায় বুঝিয়ে দিলে বুঝতাম না। তুমি একটু কষ্ট করে লিখে দাও প্লিজ।”

প্রাণেশা ছেলেটার এমন বোকা বোকা কথায় হতবম্ব হয়ে যায়। পরীক্ষার হলে করা বন্ধুর ইশারা আর তার ইশারা কি এক হলো? তার ভাষা তো নির্দিষ্ট নিয়মে তৈরি। উল্টা পাল্টা বলা যায় নাকি? আর পরীক্ষার হলে তো হাতের আঙ্গুল কিংবা মুখে ফিসফিস করে, যা পারে দেখিয়ে কোন একটা উত্তর বুঝিয়ে দেয়। কোথাকার কি তুলনা……
ভেবে সে হালকা হেসে উঠে। ওকে হাসতে দেখে সাহিলও মৃদু হেসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। প্রাণেশাকে একটু সহজ করতে চেয়েছিল সে তাদের সাথে। হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে অপরিচিত মানুষদের সামনে দেখে, আবার তারা যদি নিজেদের তার পরিবার বলে পরিচয় দেয় তাহলে তার কাছে সব হযবরল লাগবে স্বাভাবিক। আর দাদি, ফুফির বোকামির পর মেয়েটার নিশ্চয় তাদের ভালো কথা শুনতেও বিরক্ত লাগবে।

প্রাণেশা মোবাইলে লিখে দেখায় তার নাম প্রাণেশা।

ওর নাম পড়ে সাহিল বলে,

“তোমার বাড়ি কোথায় জানতে পারি? তুমি আমার গাড়ির সামনে এসে পড়েছিলে হঠাৎ। তারপর এখানে নিয়ে আসি। তোমার বাড়ির কাউকে তো চিনিনা, যে ফিরিয়ে দেব। যদি বাড়ির কারো নাম্বার বা ঠিকানা দিতে তাহলে আমাদের জন্য সুবিধা হতো।”

সাহিলের দাদি আর ফুফি তার কথা শুনে আপত্তি জানাতে চায়। পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেবে মানে? এত দিন যেখানে থাকুক, যার বাড়িতেই থাকুক। এখন তো তারা জানে মেয়েটা তাদের বংশধর। তাহলে ফিরিয়ে দেবে কেন? তাই তারা আপত্তি জানাতে চাইলে সাহিলের বড় বাবা চোখের ইশারায় তাদের কোন কথা না বলতে বলেন। মেয়েটা এত দিন কোথায় ছিল, কিভাবে ছিল জানতে হবে তো নাকি? আর এভাবে কোন কথাবার্তা ছাড়া নিজেদের তার পরিবার দাবি করলে মেয়েটা উল্টো তাদের পাগল ভাববে, নয়তো খারাপ কারো হাতে পড়েছে ভাববে। তাই সাহিল যা করছে তা করতে দিতে তাদের চুপ থাকতে বলে।

সাহিলের কথা শুনে প্রাণেশার মুখে আধার নেমে আসে। সে নিজে চলে যেতে পারবে এমনটা লিখে দেয় ফোনে। সাহিল তার মুখভঙ্গি খেয়াল করেছে। মামনি যখন চলে গিয়েছিল, তখন সে ছোট ছিল বলে কিছু বুঝতো না। কিন্তু বড় হয়ে মামনির বাপের বাড়ির ওখানে গিয়ে খোঁজ নিয়েছিল, কাউকে পায়নি। তারা নাকি ওখানে থাকেনা। সে তাও অনেক খোঁজ নিয়েছে। বিভিন্ন ভাবে তার মামনি কোথায় থাকে জানতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। বাবার সাথে তার তেমন ভাব নেই। তাই বড় হয়ে মামনির ব্যাপারে সব তথ্য সে নিজে সংগ্রহ করে, নিজে খোঁজ করেছিল। অথচ মামনির ছায়াটুকুর দেখাও পায়নি।

আজ এত গুলো বছর পর হঠাৎ এই মেয়েটাকে পায় কাকতালীয়ভাবে। জানতে পারে মামণির মেয়ে হয় সে, তার বোন। সাহিলের যে কেমন অনুভূতি হচ্ছে তা সে বোঝাতে পারবে না কাউকে। বোনকে পেয়েছে, তার মানে মামনিকেও পাবে। কিন্তু বাড়ির লোকের কথা জিজ্ঞেস করতেই মেয়েটা চেহারা অন্ধকার করে নিল কেন? মামনি কি অসুস্থ?

“কি হলো? বলছ না যে? তোমার মা কোথায়? তোমরা কোথায় থাকো? আমাকে বলো, আমি তোমার মাকে নিয়ে আসি। তোমার কাছে এনে দেই। বলো?” সাহিল নিজের অস্থিরতা লুকানোর চেষ্টা করে কোনভাবে জানতে চায়। উদ্বিগ্ন চোখে চেয়ে আছে প্রাণেশার দিকে। পেছনে সাহিলের বাবা সজল ফারদিনেরও একই অবস্থা। তিনি মেয়ের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর থেকেই পাথর বনে আছেন।

আলিজা নিজের গর্বে তার সন্তান নিয়ে অপমানিত হয়ে বাড়ি ছেড়েছিল! কথাটা মাথায় ঢুকতেই জীবনটা নিরর্থক লাগছে। এতদিন যে আফসোস আর গ্লানি নিয়ে বেচে ছিল, তা এখন নিছকই কম লাগছে উনার কাছে। তার একটা মেয়ে আছে, যে এখন তার সামনে। মেয়েকে যখন খুজে পেয়েছে, নিশ্চয় আলিজাকেও খুজে পাবে এবার। একা একা মেয়েকে মানুষ করেছে? এতগুলো বছর। একবার জানালে কি হতো। এত অভিমান? মেয়ের অস্তিত্ব সম্পর্কেও জানায়নি। নিজে তো তাকে আফসোসের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে হারিয়ে গেল, সাথে মেয়েটাকেও নিয়ে নিয়েছিল? এখন কোথায় আছে? এই শহরে?

“আমার মা নেই। মা অনেক আগে মারা গিয়েছেন। আমি……”

সাহিল আর কিছু পড়তে পারেনা। তার আগে সজল ফারদিনের পাশের টেবিলে থাকা পানির বোতলটা উনার হাতে লেগে পড়ে যায়। প্রাণেশার লেখাটুকু পড়ছিল সাহিল নিজের ফোনে। তার কথা শুনে সজল ফারদিন ভারসাম্য হারিয়ে পাশে কিছু ধরতে চেয়েছিলেন। তাতেই পড়ে যায় পানির বোতলটা। সাহিল নিজেও আর পড়তে পারেনা। বাবার দিকে তার ধ্যান নেই। নিজেই শক্ত হয়ে আছে লেখাটা পড়ে।

প্রাণেশা আওয়াজ শুনে ভদ্রলোকের দিকে তাকায়। তিনি প্রাণেশার সামনে এসে ভঙ্গুর কণ্ঠে জানতে চান,

“আলিজা বেচে নেই?”

প্রাণেশা হতবম্ব হলেও মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বোঝাতে চাইবে, তার আগে উনার কথা মাথায় খেলে যেতেই আর কিছু বলেনা। কয়েক মুহূর্ত তাকায়। চেহারা পুরোপুরি দেখে নিয়ে, ভদ্রলোকের আপাদমস্তক চোখ বোলায়। কিছু বুঝতে পেরে সে থমকে যায়। তার নিঃশ্বাস আঁটকে আসে তার। পেছনে থাকা বাকিদেরও দেখে নেয়। সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থেমে যায়। তারপর ঢোক গিলে সামনে শক্ত হয়ে থাকা সাহিলের পাশ থেকে ফোনটা নিয়ে কিছু টাইপ করে তার হাতে দেয়।

“আপনার নাম?”

প্রাণেশার বাবা চোখে পানি নিয়ে মৃদু হেসে জবাব দেয়,

“সজল ফারদিন। তোমার বাবা। চিনতে পেরেছো তাইনা? তোমার মা আমার কথা বলেছে?”

তারপর আবার চশমা খুলে চোখের পানি মুছে জিজ্ঞেস করেন,

“তোমার মা কবে চলে গিয়েছে?”

প্রাণেশা জবাব দেয় না। ছবি দেখেছিল সে বাবার। তাই প্রথমে চিনতে না পারলেও সন্ধেহ হওয়ার পর মনোযোগ দিয়ে দেখতেই চিনে ফেলে। এই লোকটার প্রতি তার আকাশসম রাগ। পৃথিবীতে শুধুমাত্র এই মানুষটাকেই বোধ হয় সে ঘৃণা করে।

প্রাণেশার আর এখানে থাকতে ইচ্ছে করছেনা এক মুহূর্তও। সে ব্যাগ খুঁজে নিয়ে আস্তে আস্তে উঠে চলে যেতে চাইলে সাহিল চোখ তুলে তাকায় তার দিকে।

“কোথায় যাচ্ছিস?”

প্রাণেশা নিজেকে শক্ত করে ভাইয়ের দিকে তাকায়।

লাল হয়ে আছে তার চোখ দুটো। মা নেই শুনে হয়তো। প্রাণেশা তো ডায়েরিতে পড়েছিল, ভাই তার মাকে খুব ভালোবাসতো। মামণি বলে ডাকতো। ভাইকে নিয়ে মায়ের অনেক স্মৃতি লেখা আছে ডায়েরির পাতায়। সেসব পড়ে পড়ে তার মনেও ভাইয়ের প্রতি আলাদা ভালোবাসা জন্মেছে। বাবার স্মৃতি ইচ্ছাকৃত হারিয়ে ফেললেও এই ভাই আর মায়ের সব স্মৃতি সে আগলে রেখেছে সবসময়। এই যে এই ছেলেটাই তার ভাই, বুঝতে পেরে তার খুব ভালো লাগছে। ভাইয়ের দেখা সে এ জীবনে কখনো পাবে তা ভাবতেও পারেনি। তবে সে ভাইয়ের প্রতি নিজের দুর্বলতা দেখাতে চায় না কাউকে। তার বাবা বাড়ির কারো প্রতি কোন রকম আবেগ দেখানোর ইচ্ছে নেই।

“হস্পিটালে থেকে যাবো নাকি?” সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে ইতস্তত করে কথাটা বুঝালেও, সাহিল তা বুঝতে পারেনি। সে বোনের দিকে তাকিয়ে থাকে কয়েক পল। তারপর হাত ধরে আস্তে করে টেনে আবার সামনে বসায়।

“মামণি নেই কবে থেকে?” কথাটার ওজন অনেক। অন্তত ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে প্রাণেশার তাই মনে হলো। নাহলে কথাগুলো বলতে ভাইয়ের এত কষ্ট হলো কেন? মা নেই বলে কষ্ট পেয়েছে বলে কি? হবে হয়তো। সে ‘মা নেই’ -এই কথাটার সাথে অভ্যস্ত। তাই তার আলাদা কোন অনুভূতি হয়না।

“আমি চার বছর থাকতে মারা গিয়েছে।” প্রাণেশা ফোনে টাইপ করে দেয়।

সাহিল লেখাটা পড়ে ঢোক গিলে বলে,

“কিভাবে?”

“এ ক্সি ডে ন্ট, রোড এ ক্সি ডে ন্ট।”

“তুই কোথায় ছিলি মা মা রা যাওয়ার পর?”

“মামা বাড়িতে।”

“মামা বাড়ি এখানে?”

“না।”

“তাহলে এখানে কি কাজে এসেছিস?”

প্রাণেশা ভাইয়ের প্রশ্ন শুনে তৎক্ষণাৎ আঙ্গুল চালাতে পারেনা। একটু সময় নিয়ে লিখে,

“কয়েক মাস ধরে তাদের এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়ি থাকছি। বাড়ি এখানেই।”

সাহিল মনোযোগ দিয়ে বোনের সব উত্তর দেখে।

“কাল কোথায় ছিলি?”

প্রাণেশা কি উত্তর দেবে জানে না। কাল কোথায় ছিল জানতে চাচ্ছে কেন তাও বুঝতে পারছে না। তবু সে আঙ্গুল চালায়।

“কাল আবার আলাদা করে কোথায় থাকবো? বললাম না এক আত্মীয়ের বাড়ি থাকি… ওখানেই ছিলাম।”

সাহিল লেখাটা পড়ে নীরব থাকে। তারপর হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বলে,

“ঠিক আছে। আর যেতে হবে না কোন আত্মীয়ের বাড়ি। আমার সাথে চল।” তারপর দাদি, ফুফিকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ওর সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও।”

প্রাণেশা সাহিলের কথা শুনে ততক্ষণাৎ ‘না’ করে দেয়। সে তাদের সাথে কোথাও যাবে না। প্রাণেশার অনিচ্ছা দেখে সাহিল সে আবার সেই আত্মীয়ের বাড়ি যেতে চাচ্ছে কিনা জানতে চাইলে প্রাণেশা জানায় মামা বাড়ি যাবে। কিন্তু সাহিল মানে না। সে জানায় মামা বাড়ি সে নিয়ে যাবে বেড়াতে, আগে নিজের বাড়ি যাক তারপর।

কিন্তু প্রাণেশা জেদ ধরেছে সে দরকারে আবার আত্মীয়ের বাড়ি যাবে কিন্তু তাদের সাথে যাবে না। প্রাণেশা বোধ হয় মা মা রা যাওয়ার পর জীবনে প্রথমবার কারো কাছে এত জেদ ধরেছে।

সাহিল নিজেও রেগে বলে,

“মার খাবি কিন্তু। আত্মীয়ের বাড়ি যাবি, তাও নিজের বাড়ি যাবিনা। এটা কেমন কথা। আশ্চর্য!”

প্রাণেশা জেদ দেখিয়ে বোঝায়,

“আমি যাবো না তোমাদের সাথে।”

“তোমার বোনের হয়তো বাড়ি নিয়ে নয়, বাড়ির মানুষ নিয়ে সমস্যা।” সজল ফারদিন বিষণ্ণ মুখে বলেন। মেয়ের চোখে নিজের জন্য রাগ আর বিরক্তি দেখেছেন তিনি। ভাইয়ের সাথে যা একটু কথা বলছে মেয়েটা। আরো চারজন যে আছে সেদিকে খেয়াল নেই। তাদের খুব করে উপেক্ষা করছে। প্রাণেশার দাদি ফুফিও ওকে তাদের সাথে যেতে বলছে বার বার। বড় বাবাও আদুরে স্বরে বোঝানোর চেষ্টা করছে। অথচ মেয়েটা ওদের কথা কানেই নিচ্ছেনা। ভাইকেই জবাব দিচ্ছে।

বাবার কথায় সাহিলও কিছু আন্দাজ করতে পারে। তার বোনও তার মতো এদের প্রতি রাগ নিয়ে আছে বুঝতে পারে। হয়তো মায়ের সাথে হওয়া ঘটনা জানে সে।

সে যায় হোক, প্রাণেশার জেদ টেকেনি ভাইয়ের সামনে। প্রাণেশাকে নানান কিছু বুঝিয়ে নিয়ে এসেছে বাড়িতে। তবে প্রাণেশার এ বাড়ির মানুষদের প্রতি রাগ-ঘৃণা থাকলেও, তাদের নেই। বরং বংশের প্রথম এবং একমাত্র কন্যা সন্তান পেয়ে তারা ভীষণ খুশি। তারা পারছেনা প্রাণেশাকে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে রাখতে। প্রাণেশার বাবারা দুই ভাই এক বোন। বড় ভাই আর তার স্ত্রীর দুই ছেলে। প্রাণেশার বাবা আর তার এক ছেলে, সাথে এখন সে। আর ফুফি, ফুফির মেয়ে সহ দাদি মিলে ফারদিন পরিবার।
তারা হস্পিটালে থাকতেই প্রাণেশার জন্য একটা রুম প্রস্তুত করতে বলে দিয়েছিল। সে এখন ওখানেই আছে। এই যে নতুন একটা জীবন শুরু হলো। অথচ পুরনো কিছু সে ভুলতে পারছেনা। অন্তিককে ভুলতে পারছে না কিছুতেই। লোকটা কি তাকে খুজছেনা? সে চলে এসেছে জানার পর কেমন প্রতিক্রিয়া ছিল? খুশি হয়েছিল কি? নাকি দুঃখ পেয়েছে?
খুশি হলেও মা নিশ্চয় ওকে খুঁজতে বলবে। খুজছেও হয়তো।
কিন্তু সে আর যাবেনা অন্তিকের কাছে। যার কাছে তার মূল্য নেই, তার কাছে আর ফিরবে না। কাল রাতে কি ক্ষুধার্ত জা নো য়া রে র মতো আচরণ করেছিল তার সাথে। সে কোনদিন ভুলবেনা। ভুল বুঝাবুঝি দূর করে, ভালোবেসে কাছে টানলে কি সে মানা করে দিত? সে তো চেয়েছিল অন্তিকের সাথে সংসার করতে। এভাবে কোন হিং স্র জ ন্তুর মতো আচরণের তো দরকার ছিল না।

————————

অন্তিক সারা শহর খুঁজেও প্রাণেশা পায় নি। দিগন্ত, মাহাদ কেউ পায় নি। নিজে দু দুবার করে সব জায়গায় খুজেছে। তারপরও প্রাণেশাকে না পেয়ে যখন পাগল প্রায়, তখন ছেলের অবস্থা দেখে আর প্রাণেশার চিন্তায় মিসেস আয়েশা আমিন অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন আবার উনাকে নিয়ে তাড়াহুড়া শুরু হয়। মাকে অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখে অন্তিক আবার আগের মতো শান্ত হয়ে যায়। পরিস্থিতি প্রতিকূলে গেলে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সবটা ভাবা তার স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য।

দিগন্ত মিসেস আয়েশা আমিনের সবরকম চিকিৎসা করিয়ে উনাকে রেস্টে থাকতে বলে বের হয়ে আসে। মিসেস তাবিয়া আর শাইনা বেগম উনার কাছে বসে নানান কিছু বলে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।

অন্তিক বাড়ির বাইরে বের হয়ে সুখ টান দিচ্ছে। দুশ্চিন্তা কাঁটাতে। যদিও কতোটুকু সম্ভব হচ্ছে তা বলা যাচ্ছেনা। তার ভেতরটা এখনো ভীষণ অস্থির। ইরফান ওর পেছনে এসে দাড়ায়।

“সারাদিন তো খুজলাম। শহরের সব রকম অন্ধকার জগৎগুলোতে খবর নেওয়া হয়েছে। সেখানেও ওর খবর পেলাম না। আমার মনে হয়না খারাপ কারো হাতে পড়েছে। পড়লে খবর চলে আসতো এতক্ষণে। সেইফভাবে কোথাও গা ঢাকা দিয়ে আছে হয়তো। চারপাশে লোক লাগানো আছে। এত টেনশন নিস না। বেশিদিন লুকিয়ে থাকতে পারবে না।”

ইরফানের কথা শেষ হতে না হতে তোশাও বের হয়ে আসে ভেতর থেকে। সে এসে অন্তিককে উদ্দেশ্য করে বলে,

“আন্টি কি বলছে এসব? তুই প্রাণেশাকে অপমান করিস? অসম্মান করিস… আরও কি কি জানি বললো। কাহিনী কি?”

তোশার কথা শুনে ইরফানও ভ্রু কুচকে তাকায় অন্তিকের দিকে,

“হু, আন্টিকে বার বার তুই ওকে অসম্মান করিস বলতে শুনা যাচ্ছে। কাহিনী কি বলতো? আর মেইন ঝামেলাটা কি নিয়ে করেছিস? যে চলে গেল?”

অন্তিকের মুখে থাকা সি গা রে ট টা ততক্ষণে শেষ হয়ে আসে। এতে সে বিরক্ত হয়। মুখে ‘চ’ সূচক শব্দ করে পকেট থেকে আরেকটা বের করে লাইটার দিয়ে আ গু ন ধরায়। তারপর একটান দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে বলে,

“হালকা ভাবে নিয়ে ভুল করে ফেলেছি।”

“কি হালকা ভাবে নিয়েছিস?”

“প্রাণোকে। আমি ভাবতাম শা লার বাচ্চা মেয়ে, কথায় কথায় এমনিতেও রেগে যায়, আবার লজ্জ্বা পায়। রাগের দৌড় বেশিতে বেশি আমার গাঁয়ে ছ্যাপ মারা অব্দি। এই মেয়ে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার ফন্দি আঁটতে পারে ভেবে অবাক হচ্ছি।”

“তোর গাঁয়ে ছ্যাপ মারে? মানে কেন?” তোশা অবাক হয়ে জানতে চায়।

অন্তিক নির্বিকারে বলে,

“চুমু খেয়েছিলাম।”

“জোর করে?” ইরফান কৌতুক স্বরে জানতে চায়।

“হু” অন্তিক ছোট করে জবাব দেয়।

তাতে ইরফান তোশাকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“দেখেছিস? সেদিন কি যেন বলছিলি, ‘তবাইকে নিদেল মতো ভাবিত না। তোর মতো হায়েনার সাথে একা রুমে কোন মেয়ে বন্ধি আছে জানলে সবাই নিশ্চিন্তে থাকতো না, ব্লা ব্লা’ দেখ…… আমার চেয়ে বেশি চিনিস ব্যাটা মানুষকে? বাইরের মানুষের কাছে সাধু হলেও বউয়ের কাছে সব পুরুষ অশ্লীল বুঝেছিস? তাই যেখানে সেখানে মুখ চালাবি না এবার থেকে।” তোশাকে ব্যঙ্গ করে কথাগুলো বলে ইরফান।

“তুই জোর করে চুমুও খাস?” তোশা ইরফানের কথায় পাত্তা না দিয়ে বিভ্রান্ত স্বরে অন্তিককে বলে।

ইরফান ওর কথা শুনে তাচ্ছিল্য হেসে বলে,

“শুধু চুমু? আমার তো মনে হচ্ছে মেয়েটার সাথে জোর জবরদস্তি করে ইজ্জতও হাতিয়ে নিয়েছে। সাথে আন্টির কথা অনযায়ী আরও কি কি অপমান, অসম্মান করেছে দেখ। নাহলে একে বাঙালি মেয়ে, তার উপর বাচ্চা ধরণের – এমনি এমনি প্রাণের স্বামী ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে না।”

ইরফান কথাগুলো রসিকতা করে বললেও ভুল কিছু বলেছে মনে হচ্ছেনা তার। তাই সন্ধেহ নিয়ে আবার জানতে চায়,

“সত্যি করে বলতো? করেছিস কি?”

“কাল ক্যাফেতে ঐ ছেলের সাথে দেখে মাথা ঠিক ছিল না।” অন্তিক

“মানে? ঝগড়া করেছিস এটা নিয়ে?” ইরফান

“উহু, মাথা ঠিক ছিল না। যা তা বলে দিয়েছি।”

“তারপর?” ভ্রু কুচকে ইরফান জিজ্ঞেস করে।

“কাজের চাপে ঠিক করে ক্ষমা চাইতে মনে ছিল না।”

“তারপর?”

“রাতেও রাগ করেছিল বুঝতে পারিনি, তাই রাগ ভাঙায়ও নি।”

“তারপর?”

“মাথা ঠিক ছিল না। সামলাতে পারিনি।”

“ও মানা করেছিল?”

“হু”

“তাও তুই……”

“হ্যাঁ”

চলবে………
(কাল আরেকটা পর্ব চাইলে বেশি বেশি রেস্পন্স করুন ভাই আর বোনেরা।😩)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here