মৌনপ্রেম #অয়ন্তিকা_রাফিয়াত_ঐশী পর্বঃ ৩৬ (খ) edited

0
27

#মৌনপ্রেম
#অয়ন্তিকা_রাফিয়াত_ঐশী
পর্বঃ ৩৬ (খ) edited
(অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)
📌“গল্পের এই অংশে যে ঘটনাগুলি তুলে ধরা হয়েছে তা কেবল কাল্পনিক ও কাহিনিচালিত। চরিত্রগুলি বাস্তব ব্যক্তির প্রতিরূপ নয়। তাই যেকোনো পরিস্থিতি পাঠকদের বিবেচনার অনুরোধ রইলো।”

——————————————

সাহিল পুলিশদের সাথে কথা বলে সাংবাদিকদের উপেক্ষা করে চলে গিয়েছে তা সরোয়ার বাড়ির সবাই দেখেছে টিভিতে। কিন্তু ভাবতে পারেনি তাদের বাড়িতে চলে আসবে সোজা। আগে অন্তত নিজের বাড়ি গিয়ে স্থির হয়ে, তারপর প্রাণেশাকে নিতে আসবে ভেবেছিল। কিন্তু ছেলেটা ঘটনাস্থল থেকে না বাড়ি গেলো। আর না আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে হস্পিটালে গেলো। স্পট থেকে বোনের খবর বের করে সোজা তাকে নিতে চলে এসেছে।

মিসেস আয়েশা আমিন ভেবেছিলেন মেয়েটার জ্ঞান ফিরলে একটু কথা বলবেন। মান অভিমান ভাঙিয়ে স্বামীর কাছে ফিরতে, শ্বশুর বাড়ি ফিরতে অনুরোধ করবেন। ছেলেকে যেন আরেকবার সুযোগ দেয় সে অনুরোধ করে ওদের সম্পর্কটা ঠিক করে নিতে বলবেন। তারপর খাইয়ে ধাইয়ে বাড়ির কেউ নিতে আসলে তাদের সাথে পাঠাতেন। কিন্তু কিসের কি! মেয়েটার ভাই চলে এলো আধ ঘণ্টা পার হতে না হতে।

সাহিলকে এত তাড়াতাড়ি এখানে চলে আসতে দেখে প্রত্যেকে অবাক হলেও নিজেদের সামলে তাকে ভেতরে আসতে বলে। উনাদের সাথে প্রাথমিক আলাপ সেরে সাহিল জানায় অন্তিক তার বোনকে নিয়ে এসেছে জেনে ওকে নিতেই এসেছে মূলত। মাহমুদ সরোয়ার মাথা নাড়িয়ে বলেন,

“হ্যাঁ বাবা। তোমার বোন এখন এ বাড়িতেই আছে, উপরে। অন্তিক নিয়ে এসেছে। এখনো জ্ঞান ফেরেনি। তুমি বসো। একটু আলাপ সালাপ করি।”

“হ্যাঁ, আগে একটু বসো। তোমার হাতেও বেশ লেগেছে। আমার নাতি দিগন্ত… সে ডাক্তার। তাকে ডাকছি। একটু চিকিৎসা নাও হাতে। তারপর অল্প একটু নাশ্তা খেয়ে বোনের কাছে যেয়ো। ততোক্ষণে তারও জ্ঞান ফিরুক। তুমিও একটু জিরিয়ে নাও।” দাদি

তাদের আন্তরিকতা দেখে সাহিলের ভেতরে অপরিচিত মানুষদের কাছে প্রাণেশা আছে ভেবে যে অস্থিরতা ছিল, তা কিছুটা দমন হয়। সৌজন্য হেসে সায় জানায়। তার সাথে পিয়াসও আছে।

সে উনাদের সাথে সোফায় গিয়ে বসলে দিগন্ত আসে। কেটে যাওয়া জায়গায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দেয়। হামলা সম্পর্কে অল্প স্বল্প আলাপে বসে তাদের সাথে। মিসেস আয়েশা আমিন সাহিলকে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে। ধরতে গেলে সে আজ প্রথমবার বোনের শ্বশুর বাড়ি এসেছে। আর বিপরীতভাবে, সরোয়ার বাড়িতে বাড়ির একমাত্র বউয়ের বাপের বাড়ি থেকে প্রথম কেউ এসেছে। আর এই বিষয়টা সাহিল না জানলেও উনারা তো জানেন। তাই তার আপ্যায়নের কোন ত্রুটি রাখেন না মিসেস আয়েশা আমিন।
সাহিল এত টেনশন আর ঝামেলার মধ্যে সেসব বিষয় চোখে পড়ার মতো হলেও তেমন আমলে নেয় না।
সে আলাপ বেশিদূর না টেনে বোনকে দেখতে চায়। কোথাও কোনভাবে লেগেছে কি না চোখে না দেখলে চিন্তা একেবারেই কমছে না। তার উপর বাড়ি থেকেও ফোনের উপর ফোন আসছে। ওর ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আয়েশা আমিন বাড়ির বাকিদের দিকে তাকান। অন্তিক এই মুহূর্তে বাড়িতে নেই। তার চাচা অবশ্য সাহিল আসার পর পরই ফোন করেছিল। কিন্তু সে জানিয়েছে আধ ঘণ্টার মতো সময় লাগবে। হামলার স্পটে পুলিশ আর নিরাপত্তা কর্মীরা পৌছে গিয়েছে শুনে সে সেদিকে আর যায় নি। নিজের কেইসের কোন একটা দরকারি কাজে আধ ঘণ্টার জন্য বেরিয়েছে। সেও হয়তো ভাবেনি সাহিল এতো তাড়াতাড়ি চলে আসবে বোনকে নিতে। নাহলে বাড়িতেই থাকতো।

সাহিলের বোনকে দেখতে চাওয়ায়, চেয়েও আর না করতে পারেননা উনারা। অন্তিক আসলে তারপর যা কথা বলার বলতে চেয়েছিলেন উনারা। কারণ অন্তিক এখনই সাহিলকে প্রাণেশা আর তার বিষয়ে কিছু জানানোর কথা ভেবেছে কি ভাবেনি। কিংবা অন্য যেকোনো কথা সে কিভাবে, কি এবং কতোটুকু জানাতে চায় সাহিলকে – তার কিছুই জানেন। সব মিলিয়ে অন্তিক থাকলে ভালো হতো, এটাই ভাবছিলেন সবাই। তবে সাহিলের উদ্বিগ্ন চেহারা দেখে আর না করেন না। পিয়াস ছেলেটাকে নিচে বাকিদের সাথে বসিয়ে মিসেস আয়েশা আমিন যান সাহিলকে নিয়ে।

সাহিল রুমে প্রবেশ করে দেখে প্রাণেশা এখনো অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছে। এসির ঠাণ্ডায় রুমটা ভীষণ শান্ত আর রিল্যাক্সড আবহাওয়া দিচ্ছে। প্রাণেশা আরামে শুয়ে আছে। সাদা একটা চাদরও গাঁয়ে দেওয়া আছে পেট অব্দি। সে গিয়ে বোনের পাশে বসে হাত পা সব দেখে। কোথাও লাগেনি দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

প্রাণেশা তার গাড়ির সামনে এসে পড়ার আগে তাকে রাস্তায় ঠিক কোথায় কোথায় দেখা গিয়েছে সেসব খোঁজ নিতে বলেছিল পিয়াসকে। কিন্তু ওর গাড়ির সামনে এসে পড়ার আগের আধ ঘণ্টার সিসিটিভি ফুঁটেজ ছাড়া তার আগের কোন তথ্য জানাতে পারে নি এখনো। তাই ওর সাথে ঠিক কি হয়েছিল তা এখনো জেনে উঠতে পারেনি। আর খোঁজ পাওয়া ঐ আধ ঘণ্টার ফুঁটেজে তেমন বিশেষ কিছু পায় নি। শুধু এলোমেলো পায়ে এদিক ওদিক করে হাঁটতে দেখেছে।
চেক আপ করিয়ে সাহিলের মাথা গরম ছিল। গাড়িতে পিয়াস যখন তাকে আবার ফোন দেয়। তখন ওর সাথে কথা বলতেই নেমেছিল সে। এর মধ্যে কতো কি হয়ে গেলো। বোনটা নিজেও কতো ভয়, দ্বিধা আর কষ্টে ছিল তা সে বুঝতে পেরেছে। এর মধ্যে চোখের সামনে এতো গু লা গু লি। এ কদিনে বোনকে সে যথেষ্ট পড়ে নিতে শিখেছে। খুব নরম আর দূর্বল মনের তা সে বুঝতে পারে। তাই হঠাৎ এসব নিতে পারেনি। সাহিল ওর পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে প্রাণেশাকে চোখ নাড়াতে দেখে। জ্ঞান ফিরছে। সেকেন্ড কয়েক সময় লাগিয়ে আস্তে আস্তে চোখ খুলে প্রাণেশা।

সবার আগে মাথায় কারো হাতের ছোঁয়া অনুভব করে তার দিকে তাকায়। সাহিলকে দেখতে পায়। নরম চোখে তাকিয়ে চোখের পলক ফেলতেই হামলার ঘটনা মাথায় আসে। তৎক্ষণাৎ অস্থির চেহারায় ভাইকে দেখে আগাগোড়া। কিছু হয় নি দেখেও ভয়ের আভাস সরেনি চেহারা থেকে। হাতের কনুই বিছানায় ঠেকিয়ে উঠে বসে। অস্থির হয়ে ভাইকে কিছু বলতে যাবে তার আগে সাহিল ওকে শান্ত হতে বলে।

“রিল্যাক্স, কিছু হয়নি বোন। আমি ঠিক আছি, তুইও ঠিক আছিস। উই অল আর সেইফ নাও। ওখান থেকে আমরা সবাই চলে এসেছি। এতো অস্থির হোস না। দুজনেই ঠিক আছি দেখ।”

বলতে বলতে প্রাণেশার মাথাটা বুকে নিয়ে হাত বুলিয়ে দেয়। কারো কিছু হয়নি শুনে অস্থিরতা কমে গেলেও ভয় কমেনা প্রাণেশার। মা মা রা যাওয়ার পর এমন বীভৎস কোন ঘটনা প্রথমবার দেখেছে সে স্বচক্ষে। বারবার ছোটবেলার ঐ দিনটা মাথায় আসছে। কি নিষ্ঠুর ভাবেইনা নিজের মাকে ডুবে যেতে দেখেছিল চোখের সামনে। ডুবন্ত মাকে পানির উপরে হাত তুলে অসহায়ের মতো চটপট করতে দেখা ঐ দৃশ্য চোখে ভেসে আসতেই ভাইয়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুফিয়ে উঠে সে। সাহিল ওকে আগলে নেয়। কিছু সময় পর আস্তে আস্তে শান্ত হলে সাহিল ওভাবেই মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,

“এবার কান্না থামা। বাড়ি যেতে হবে। সবাই অপেক্ষা করছে। দুশ্চিন্তা করছে। আর কাঁদতে হবেনা। আমিতো আছি।”

ভাইয়ের কথা শুনে প্রাণেশা মাথা তুলে তাকায়। তারা বাড়িতে নেই বুঝতে পেরে হসপিটালে আছে ভেবে সামনে তাকাতেই থম মেরে যায়।

মিসেস আয়েশা আমিন এখানেই ছিলেন। দাড়িয়ে দাড়িয়ে প্রাণেশাকে তার আপন কারো বুকে মাথা রেখে কাদঁতে দেখছিলেন। মেয়েটার কেউ নেই বলে তাকে নিয়ে একটু বেশিই দুশ্চিন্তা হতো উনার। বিশেষ করে ছেলের দিক থেকে বার বার হতাশ হয়ে দুশ্চিন্তা বাড়তো। যদিও ছেলের সাথে বিচ্ছেদ হোক তা তিনি কোনভাবেই চান না। কিন্তু অবশেষে ছেলে যদি ওকে জীবন থেকে বেরও করে দিতে চায় সামনে যেকোনো কারণে, তাহলেও উনারা ছাড়া মেয়েটার আর কেউ নেই এটা ভেবে আর দুশ্চিন্তা হবেনা। তিনি মন ভরে দেখে নেন ভাই বোনের দৃশ্যটা।

প্রাণেশা চোখের সামনে অন্তিকের মাকে দেখে স্তব্দ হয়ে যায় । জমে গিয়েছে তার শরীর। মাথা আপাদত কাজ করছেনা। চোখ ঘুরিয়ে চারপাশে তাকায়। সাথে সাথে নিঃশ্বাস ভারী হয়। এটা অন্তিকের রুম। যেখানে কয়েকটা দিন খুব সুখে কাটিয়েছিল সে। কিছু বুঝতে পারছেনা। সে এখানে কেন? কিভাবে? কে নিয়ে আসলো? ভাইয়াও এখানে……
কি হচ্ছে এসব?
প্রাণেশা ভাইয়ের দিকে তাকায়। বোনকে বুকে রেখে ওকে শান্ত হতে বলে ড্রাইভারকে আরেকটু অপেক্ষা করতে মেসেজ করে পাঠাচ্ছিল সে। বোনের চাহনি দেখে বলে,

“রিল্যাক্স। এখানে আমরা সেইফ আছি। আমাদের বিপদ দেখে তোকে তখন গাড়ি থেকে এবাড়ির ছেলে উঠিয়ে নিয়ে এসেছিল সেইফলি। এখন তাদের বাড়িতেই আছি। ডোন্ট ও্যরি। একটু পর চলে যাব।”

এবাড়ির ছেলে। মানে কে? দিগন্ত ভাইয়া? নাকি উনি……প্রাণেশা ঢোক গিলে।

মায়ের দিকে তাকায় অসহায় চোখে। সে মায়ের অপরাধী। মানুষটা তাকে খুব ভালোবাসা দিয়েছিল। এ বাড়িতে নতুন নতুন এসে এই মানুষটাই তার একমাত্র ভরসাস্থল ছিল। কিন্তু সে ঐ লোকটার উপর রাগ অভিমান থেকে হুট করে যে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। মায়ের মতো দেখে রাখা এই মানুষটাকে একবারো জানায়নি। তার এই বিষয়টা ভেবে আগে থেকেই অপরাধবোধ হতো। এখন সামনা সামনি দেখে উনার চোখের দিকে তাকাতে পারছে না। সে তো কিছু বলতেও পারেনা, যে ক্ষমা চাইবে। তবে আয়েশা আমিন ওর মনের কথা বুঝে যান চোখ দেখেই। মৃদু হাসেন ছেলে বউয়ের চিন্তাভাবনা বুঝতে পেরে। তবে আগের কোনো কথা তুলেন না সাহিলের সামনে।

“সাহিল, প্রাণেশাকে একটু পানি দাও। মাথা ঠাণ্ডা হোক। অস্থির লাগছে হয়তো।” মিসেস আয়েশা আমিন

সাহিল উনার কথায় বেডসাইড টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে বোনকে পানি খাওয়ায়। তারপর ওকে নিয়ে উঠে চলে যেতে নেবে ওমনি পায়ে হালকা ব্যথা অনুভব করে প্রাণেশা। ব্যথাতুর শব্দ করে উঠতে নিয়েও আবার বসে পরে। এর মধ্যে হঠাৎ ফোনে কথা বলতে বলতে অন্তিক প্রবেশ করে রুমে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠার পর দিথী তাকে বলেছিল রুমে ভাবির ভাই আর বড়মা আছে। তবে সে ফোনে মনোযোগ থাকায় দিথীর কথা সেভাবে আমলে নেয় নি। ভেবেছিল প্রাণেশার এখনো জ্ঞান ফেরেনি।

রুমে ঢুকে ফোনে কথা বলতে বলতে প্রাণেশা আর সাহিলের দিকে চোখ যায়। মাকেও দেখতে পায়। তবে অতো দিকে নজর না দিয়ে প্রাণেশাকে বসে থাকতে দেখে ওর দিকেই তাকায়। এক পলক সাহিলের দিকে তাকিয়ে আবার প্রাণেশার দিকে চোখ দেয়। ওর দিকে চেয়েই ফোনের ওপাশে কিছু একটা বলে কল কাটে।

সাহিল অন্তিককে দেখে খুশিই হয়। এসেছে যখন ওর সাথে দেখা হলে ভালো হতো এমনটাই ভাবছিল সে মনে মনে। সৌজন্য হেসে বোনকে রেখে সে উঠে দাড়ায়। হাত মিলিয়ে বলে,

“থ্যাংক্স, মি. সরোয়ার। বিপদের সময় সাহায্য করার জন্য। আপনি হুট করে এসে তখন বড় উপকার করলেন। নাহলে কেউ না কেউ ইনজুরড হতাম নিশ্চিত।”

তখন অন্তিক এসে ঐ গাড়িটাকে ধাক্কা লাগিয়ে না দিলে প্রাণেশাকে হয়তো সে নামিয়ে নিতো গাড়ি থেকে। কিন্তু তাও ধাক্কা লাগলে গাড়িটা ঠিকই তাদের দিকে এসে পড়তো। আর কোন না কোন বিপদ হতোই। অন্তিকের জন্য আজ অনেক বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে। তাই মন থেকে কৃতজ্ঞ সে।
অন্তিক মৃদু হেসে মাথা নাড়ায়। সাহিলের পেছনে বিছানায় বসে থাকা ভয়ার্ত প্রাণেশার দিকে চেয়ে সাহিলকে বলে,

“কোন ব্যাপার না, এত কৃতজ্ঞতা জানাতে হবেনা। দায়িত্ব ঠিকঠাক ভাবে আগে পালন না করতে না পারলেও এখন আর মিস যাবেনা। নিশ্চিন্তে থাকুন।”

সাহিল তার কথার মানে বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়। অন্তিক তার দৃষ্টি দেখে কথা ঘুরিয়ে বলে,

“আপনার তো হাতে লেগেছে দেখছি। আপনার বোনের কোথাও লেগেছে কিনা দেখুন। ওকে টেনে নেওয়ার সময় অল্প একটু লাগলেও লাগতে পারে।“

“হ্যাঁ, পায়ে একটু লেগেছে। তেমন বেশি না। এগেইন থ্যাংক্স টু ইউ। আপনি না আসলে একটু সমস্যায় পড়তে হতো। এখন আমরা উঠি। আপনার সাথে দেখা করে যাওয়ার অপেক্ষাতেই ছিলাম।”

“এখনই কি উঠবেন!! আগে আমি একটু ফ্রেশ হয়ে নেয়। আপনি বসুন আপনার বোনকে নিয়ে। আরেকটু বসুন, আমিও বসি। দেখি আপনাদের। তারপর একটু জিরিয়ে নাহয় বাড়ি ফিরে যাবেন।”

অন্তিকের কথাই সাহিল হেসে মাথা নাড়ায়।
মিসেস আয়েশা আমিনও সবটা দেখেন। তিনি ভেবেছিলেন অন্তিক এবার ওদের বিষয়ে জানিয়ে দেবে। কিন্তু সে তো কিছুই বললো না। কি করতে চাইছে কি জানি ছেলেটা। বাড়ির বউ যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি ফিরবে ততোই ভালো।
তবে দুশ্চিন্তা হলেও তিনি আলাদাভাবে কিছু বলেন না।

প্রাণেশা ভাই আর বরের সব কথা শুনে। লোকটা তার খোঁজ কিভাবে পেয়েছে সে কিছু জানেনা। তার এই মুহূর্তে কি করা উচিত, কি প্রতিক্রিয়া দেওয়া উচিত তাও জানেনা। অন্তিককে দেখার পর থেকে কেমন ঝিম ধরে গিয়েছে সে। সেইরাতের সব দৃশ্য মনে পড়ছে একে একে। এই রুমে, এই বিছানাতেই তো নিজের আসল রুপ দেখিয়েছিল অন্তিক।
কিন্তু সেসবও সে ভালোবাসা মনে করে হাসিমুখে গ্রহন করে নিতো। স্বামী যখন, অধিকার তো আছেই। সেটা প্রাণেশা জানে। একদিন না একদিন তো এমন কিছু হতোই। তাই সেকথা বাদ দিলো। কিন্তু সেদিন বিকেলে যে ব্যবহার করেছে, তার জন্য সে লোকটাকে ক্ষমা করবেনা। একদম না।
পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে নিজের দিকে অন্তিকের চাহনি লক্ষ্য করে। সাথে সাথে সে মাথা নামিয়ে নেয়। প্রাণেশা জানে সে কোন দোষ করেনি। তাও ভয় করছে কেন জানি। শরীর ঘামছে এসির এই নিম্ন তাপমাত্রাতেও। অন্তিকের ঐ ধারালো দৃষ্টি তাকে স্বস্তি দিচ্ছেনা। প্রাণেশা কাস্মিককালেও ভাবেনি এভাবে দেখা হয়ে যাবে অন্তিকের সাথে। এত নিরুপায় ভাবে, যে পালিয়েও যেতে পারবেনা, আবার কিছু বলতেও পারবে না।

তার মাথায় হঠাৎ একটা প্রশ্ন আসে। অন্তিক তার ভাইকে কি বলে দেবে যে তাদের বিয়ে হয়েছিল? ভাই যদি তাকে এবাড়িতে রেখে চলে যায়? তারপর অন্তিক যদি আবার ও কার সাথে চলে গিয়েছিল, কার সাথে পালিয়ে গিয়েছিল এমন সব প্রশ্ন করে, ওকে সন্ধেহ করে? আবার যদি ওকে অপমান করে? তাহলে প্রাণেশা সেটা মোটেও নিতে পারবেনা। লোকটা যদি আবার তার চরিত্রে আঙ্গুল তুলে তাহলে সে আরও দূরে কোথাও চলে যাবে। বাবার বাড়িতেও যাবেনা। ভাবতে ভাবতে মুখ অন্ধকার হয়ে আসে তার।

অন্তিক প্রাণেশার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি এবং প্রতিক্রিয়া ভালোভাবে পরখ করেছে। মনে মনে কি ভাবছে মেয়েটা তাও সে কিছুটা আন্দাজ করতে পারে। একটু আফসোস হলেও বেশি পাত্তা দেয় না। ওর ভুল ধারণা সে খুব তাড়াতাড়ি ভাঙিয়ে দেবে। তবে হঠাৎ কিছু ভেবে ওকে আগাগোড়া দেখে নেয়। দেখতে দেখতে হালকা হাসির রেখার দেখা মেলে ঠোঁটের কিনারায়। কাবার্ড থেকে ট্রাউজার আর টি শার্ট বের করে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।

অন্তিককে এই রুমের কাবার্ড থেকে ড্রেস বের করে ওয়াশরুমে যেতে দেখে সাহিলের চেহারা গম্ভীর হয়। বুঝতে পারে এটা অন্তিকেরই রুম। একটা অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের রুমে এনে এনারা তার অচেতন বোনকে রেখে দিয়েছে। ব্যাপারটা তার পছন্দ হয়নি। এত বড় বাড়িতে কি তার বোনকে রাখার জন্য আর কোনো রুম ছিল না? তার জানা মতে এবাড়িতে তিনটা মেয়ে আছে। তাদের কারো রুমে রাখা যেতোনা প্রাণেশাকে?
মনে মনে বিষয়টা অপছন্দ হলেও মুখে কিছু বলেনা। কারণ দেখতে গেলে এই অন্তিক সরোয়ারের কারণেই তারা দুই ভাই বোন অক্ষত অবস্থায় এখানে দাড়িয়ে আছে। কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে কিছুটা অসন্তুষ্ট হলেও তা প্রকাশ করেনা।

কিন্তু আয়েশা আমিন ওর চেহারা দেখে মনের কথাটা বুঝে যান। দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ছেলে কি করতে চাইছে না চাইছে কিছু বুঝতে পারছেন না। বুঝিয়ে সুঝিয়ে বিয়ের ব্যাপারটা জানিয়ে দিলে ভালো হতো। সাহিলের মনে তাদের নিয়ে অল্প হলেও যে বিরুপ চিন্তা এসেছে, তা আসতো না। সাহিলকে সব বুঝিয়ে বললে নিশ্চয় বুঝতো। তাও বললো না ছেলেটা।

প্রাণেশার যেহেতু পায়ে একটু লেগেছে তাই সাহিল ওকে ধরে সাবধানে নিয়ে যায়। অন্তিক ওকে টেনে নিজের গাড়িতে নেওয়ার সময়ই লেগেছে কিছুটা।

নিচে সবাই আছে। প্রাণেশার বাড়ির বাকি সদস্যদের সাথেও দেখা হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। সবাই ওকে দেখে একেবারেই অচেনা আচরণ না করলেও। আগের কথা তেমন তুলেনা। প্রাণেশা সবাইকে আগের কথা না তুলতে দেখে অবাক হলেও মনে মনে স্বস্তি পায়। তাকে এই মুহূর্তে কোন জটিল পরিস্থিতিতে পরতে হচ্ছেনা এর চেয়ে স্বস্তির আর কি হতে পারে?

সাহিলের সাথে পরিবারের বাকি সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে নানান কথাবার্তা হয়। শুরু থেকে প্রাণেশা অবশ্য তার ভাইয়ের পাশেই বসে আছে। তাকে অনেক কিছু খেতে দিয়েছিল। কিন্তু আজ সকালেই বমি করে সব ভাসিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে এত কিছু ঘটে গেলো। সব মিলিয়ে তার কিছু মুখে তুলতে ইচ্ছে করছিল না। ওর অবস্থা বুঝতে পেরে উনারা তেমন জোর করেন না। এরপর থেকেই সে কাচুমুচু হয়ে ভাইয়ের পাশে বসে আছে। অন্তিকের দৃষ্টি এত কিছুর মধ্যেও তার উপর নিবদ্ধ তা সে অনুভব করতে পারছে।

একারণে তার ভীষণ ভয় করছে। ভাই পাশে আছে তার। তাও ভয় একটুও কমছেনা। এখন ভাই পাশে আছে দেখে অন্তিক চুপ থাকলেও কেন জানি মনে হচ্ছে একা পেলেই কিছু একটা করবে। যা তার জন্য মোটেও ভালো হবেনা। এত এত মানুষের মধ্যেও অন্তিকের দৃষ্টিতে তার ভয় করছে, অস্বস্তি হচ্ছে। একা যদি তাকে পেয়ে বসে, তখন কি হবে তার?
মনে মনে নানান কিছু ভেবে প্রাণেশা কোণা চোখে একবার অন্তিকের দিকে তাকায়। সাহিলের কোন একটা কথার জবাব দিচ্ছে সে। কিন্তু তার দিকে তাকাতেই প্রাণেশার অন্তরাত্মা কেপে উঠে। প্রাণেশা ভেবেছিল কারো কথার জবাব দিচ্ছে যখন নিশ্চয় তার দিকে আর ধ্যান থাকবেনা। কিন্তু লোকটার ধারালো দৃষ্টি তার দিকে। না না। ধারালো না। নেশালো দৃষ্টি মনে হচ্ছে। পরিবারের সবার সামনে অন্তিক নেশা করে আসলো? কতো অধঃপতন হয়েছে লোকটার। ঢোক গিলে আবার তাকাতেই দেখে এখনো তার দিকে তাকিয়ে হু হাঁ উত্তর দিচ্ছে। এবার অন্তিকের ঐ দৃষ্টিতে কিছু একটা ছিল। হুট করে সেই রাতের দৃশ্য চোখে ভাসছে। লজ্জ্বার আভা ফুঁটে উঠে তার চেহারায়। চোখ নামিয়ে নেয়। অন্তিক তা দেখে ঠোঁট বাকিয়ে মৃদু হাসে।

চলবে………

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here