আমার উপমা তুমি —-১৯ [রোমান্টিক এলার্ট।]
আফরোজা আঁখি
ফোনের রিংটোনের আওয়াজে ধ্যান ভাঙলো ইয়াশের। হাতের চিঠিটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল ইয়াশ,
“তুমি কেন আমাকে এতো ভালোবাসলে রোহি? আমি যে তোমার ভালোবাসার যোগ্য ছিলাম না কোনো কালেই। আমার জন্য নিজের জীবন দিতেও ভাবলে না একবার! অথচ আমি মানুষটা কতো নিষ্ঠুর, তোমার প্রতি এক বিন্দু ভালোবাসাও জন্মালো না আমার। তোমাকে ভালো না বাসলেও আমি মনে রেখেছি রোহি। আমার হৃদয়ের গভীরতম স্থানে রেখে দিয়েছি তোমাকে যত্ন করে।”
ফোনের রিংটোন বেজে যাচ্ছে বারবার। বিরক্তিতে কপাল কুঁচকাল ইয়াশ, চিঠিটা যত্ন করে রেখে দিল যেখানে ছিল সেখানেই। ফোনটা হাতে তুললেই দেখল উজ্জ্বল কল দিয়েছে ওকে,
“বলো ভাইয়া।”
“তুমি কি আসবে না ইয়াশ?”
“না।”
“তোমার উপমার এক্সিডেন্ট হয়েছে। হাতে, পায়ে আর মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছে। তুমি না ওকে ভালোবাসো? ভালোবাসার মানুষকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছ যে!”
ইয়াশের চোখ-মুখের ভাবভঙ্গি পরিবর্তন হয়ে গেল মুহূর্তেই। ওর উপমার এক্সিডেন্ট হয়েছে মানে? ইয়াশের যে চিন্তা হচ্ছে,উপমার অবস্থা কেমন ভাবলেই ভিতরটা কেঁপে উঠছে বারবার। চোখ বন্ধ করে বড় একটা শ্বাস ফেলল ইয়াশ, নিজেকে শান্ত করে বলল উজ্জ্বলকে,
“আ… আমি আসছি।”
কাশফিয়া আর ইয়াশের মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়েছিল কিছুদিন আগে। কলেজে কোনো একটা ঝামেলা হওয়ায় ইয়াশের তখন মাথা গরম ছিল, কাশফিয়া না বুঝেই রিয়্যাক্ট করেছে, তাই ইয়াশও নিজেকে সংযত রাখতে পারেনি, যা তা বলে দিয়েছে কাশফিয়াকে। সেদিন ২য় বারের মতো ইয়াশের রাগ দেখেছিল কাশফিয়া। কিন্তু ওরও যে অভিমান হয়েছিল! তাই তো ইয়াশকে ছেড়ে চলে এসেছিল ভাইয়ের কাছে। এক সপ্তাহ মতো কাশফিয়া ছিল ওর ভাইয়ের কাছে। ইয়াশ একদিনও দেখা করতে আসেনি ওর সাথে, কল দিয়েও জিজ্ঞেস করেনি কেমন আছে? এইজন্যই অভিমান হয়েছে কাশফিয়ার। যত দিন যাচ্ছে, ও কেমন মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে ইয়াশের কাছে! এরকম হলে এই সম্পর্কটাও টিকবে না বেশিদিন। কাশফিয়ার মন খারাপ দেখে কৌশিকই বারবার বলছিল দেশে যাওয়ার কথা। কাশফিয়ারও মনে হলো এরকমটাই, কতোদিন হলো মামীকে দেখে না সে। ইয়াশের বাড়ির লোকেদের সাথে মাঝেমধ্যে কথা হয়। দেশে গেলে সবার সাথে দেখা হবে ভেবে ভাইয়ের কথায় অমত করেনি কাশফিয়া। আজ তিন দিন হলো কাশফিয়ারা সবাই বাংলাদেশে এসেছে। কৌশিক বা ইনায়াকে কিছু না বলেই কাশফিয়া একা একা চলে এসেছে খন্দকার মঞ্জিলে। রোহির মৃত্যুর পর সেদিন আবার খন্দকার মঞ্জিলে ফিরে এসেছিল আনন্দ, সবাই ভেবেছিল ইয়াশও এসেছে হয়তো। কিন্তু সবটা শুনে আবারও মুখজুড়ে চিন্তারা ভিড় জমিয়েছিল সবার। কাশফিয়া কোনোভাবে সামলালো সবটা, কৌশিক এরমধ্যে ওকে নিতে আসলেও যায়নি, থেকে গেছে ও বাড়িতেই। সারাদিন কাটতো কাশফিয়ার মমীর সাথে কথা বলেই। কিন্তু মমীটা হুট করেই কোথায় যেন হারিয়ে গেল! কাশফিয়ার ভয় হলো, এক তো ইয়াশকে না বলে মমীকে নিয়ে এসেছে, আবার হারিয়ে ফেলেছে!এসব শুনলে ইয়াশ নিশ্চয়ই ছেড়ে দেবে না ওকে। বিড়ালটা তো ওর অনেক পছন্দের! কাশফিয়া মমীকে খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও গেল, কিন্তু ওকে হাতে নিবে তখনই কোথা থেকে ছুটে আসল একটা গাড়ি। তারপর আর কি,হাতে পায়ে মাথায় ব্যথা পেলো অনেক, বিছানায় পড়ে আছে দুইদিন যাবত!সিমির মুখে শুনেছিল ইয়াশ নাকি আসবে বলেছে কিন্তু দুইদিন হয়ে গেলো এখনও আসার নাম নেই উনার। কাশফিয়ার ভিতরটা পুড়ছে কষ্ট হচ্ছে খুব,বার বার মনে হচ্ছে ইয়াশ ওকে আর ভালোবাসে না আগের মতো।
কাশফিয়া শুয়ে আছে বিছানায়, মমী বসে আছে ওর পাশেই, কেমন করে তাকিয়ে আছে কাশফিয়ার মুখটার দিকে। কাশফিয়া ঠোঁটের কোণে হাসি টানলো, মমীর গায়ে হাত বুলিয়ে বলল,
“কি হলো মমী? তোর তিত করলা মালিকটাকে মিস করছিস? ওই লোক তো আমাদের মিস করে না। তুই কেন মিস করবি? মালিকের জন্য বেশি মন খারাপ হলে আমি কিন্তু তোকে রাস্তায় ছেড়ে আসব!”
কাশফিয়া শান্ত কণ্ঠে শাসালো মমীকে। মমী কি যেন বুঝল, হেঁটে গিয়ে কোলে উঠে বসল কাশফিয়ার। কাশফিয়া কিছুক্ষণ মমীর দিকে তাকিয়ে হাত বুলিয়ে দিল ওর গায়ে। মমীও ঘাপটি মেরে বসে রইলো ওর কোলে। অনেক চেষ্টার পর চোখের পাতাটা মাত্রই লেগেছিল কাশফিয়ার, কোনো কোনো কিছুর আওয়াজে চোখ খুলে তাকাল সে। জানালার দিকে চোখ যেতেই দরফরিয়ে উঠল বিছানা থেকে, চিৎকার দিয়ে ডেকে উঠল ইয়াশকে।
কাশফিয়ার গলার আওয়াজ কানে গেছে ড্রয়িংরুমে বসে থাকা সবার। সুফিয়া বেগম সহ বাকিরা দৌড়ে এসেছেন ইয়াশের রুমে। বউমার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন সুফিয়া বেগম, উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন ওকে,
“কি হয়েছে মা? পায়ে ব্যথা পেয়েছিস? কি লাগবে আমাকে বল।”
কথা নেই কাশফিয়ার মুখে, ও তো এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে জানালার দিকে। উজ্জ্বল লক্ষ্য করল বিষয়টা, কাশফিয়ার মুখের দিকে তাকাতেই কপালে ভাঁজ পড়ল ওর। মেয়েটা এমন ভয় পেয়ে আছে কেন? কি এমন দেখেছে যে এভাবে ভয় পাচ্ছে? কৌতূহল থেকেই জানতে চাইল উজ্জ্বল,
“জানালার দিকে ওমনভাবে তাকিয়ে কি দেখছ কাশফিয়া? কি দেখে এভাবে চিৎকার দিয়ে উঠলে তুমি।”
“ঈ… ঈশান ভাইয়াকে দেখেছি মাত্রই। ও কেমন করে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে! আমার ভয় লাগছে ভাইয়া, আমি চলে যাব এখান থেকে।”
কথাগুলো বলে থামল কাশফিয়া, বুকটা ধুকধুক করছে এখনও, কেমন ভয় ভয় লাগছে ওর। ঈশান এখানে কেন আসলো? ওর রুমেই বা কেন উঁকিঝুকি মারল? কতো শত ভাবনা কাশফিয়ার মাথায়। ঈশানের নামটা শোনামাত্রই সুফিয়া বেগমের মুখটা কেমন অন্ধকারে ঢেকে গেছে, হয়তো খুশি হননি এই নামটা শুনে। রোহির মৃত্যুর পর থেকে দেখা নেই ঈশানের। এমনকি এর ৩-৪ দিন আগেই বাড়ি ছেড়েছিল সে, তারপর থেকে আর দেখা হয়নি ঈশানের সাথে। ইয়াশের কথায় আর ঈশানের বেপাত্তা হয়ে যাওয়ায় দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে খুব একটা সমস্যা হয়নি সুফিয়া বেগমের। সেদিনের পর থেকেই তীব্র ঘৃণা জন্মেছে উনার ঈশানের প্রতি। ওর কথা মাথায় আসলেই বারবার মনে পড়ে উজ্জ্বলের সেদিন বলা কথাটা। উজ্জ্বল বলেছিল—-যেদিন উনার বা বাড়ির কারোর বিরাট কোনো ক্ষতি করবে ঈশান, সেদিনই বুঝবেন দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পুষেছিলেন। উজ্জ্বলের কথাই সত্য হলো অবশেষে। ফুলের মতো মেয়েটাকে ঈশান মে’রে ফেলেছে, ভাবলেও কষ্টে ভিতরটা ফেটে যায় উনার।
উজ্জ্বল একটা পানির গ্লাস এনে ধরেছে কাশফিয়ার সামনে, ইশারা করে বলছে ওকে,
“শান্ত হও কাশফিয়া। তুমি ঠিক কি দেখেছ আমাকে বুঝিয়ে বলো। ঈশান বাড়িতে আসলে তো মেইন গেইট দিয়েই ঢুকবে, দারোয়ানকে বলে দেওয়া হয়েছে ওকে আশেপাশে দেখলে যেন সবার আগে আমাকেই খবর দেওয়া হয়। আমাকে তো কেউ কিছুই বলেনি, তুমি হয়তো ভুল দেখেছ।”
“না না, আমি ঠিক দেখেছি, ওটা ঈশানই ছিল।”
উজ্জ্বল আর বাকিরা শান্ত হতে বলল কাশফিয়াকে, কিন্তু ওর কেমন ভয় লাগছে, কোনোভাবেই নিজের মনকে শান্ত করতে পারছে না। বারবার মাথায় আসছে, ঈশান কেন এসেছে এখানে? সব রেখে ওর রুমের জানালার সামনেই বা উঁকিঝুকি মারছিল কেন? কাশফিয়া আস্তে ধীরে বিছানা থেকে উঠতে চাইলে পায়ের অসহ্য ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে বসে পড়ল আবার। পায়ে হাত দিয়ে কান্না করছে কাশফিয়া, এর মধ্যেই শোনা গেল কারো গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
“এগুলো হলো অতিরিক্ত পাকনামির ফল। আমার কথা অমান্য করার শাস্তি দিয়েছেন আল্লাহ তোমাকে।”
পরিচিত কণ্ঠস্বর কানে আসায় সবার সাথে সাথে কাশফিয়াও তাকাল দরজার দিকে।চোখ মুখের চিন্তা সরে গেলো সবার, ইয়াশের আসাতে খুশি হলেন সকলেই। সুফিয়া বেগম আর আফিয়া চলে গেলেন ইয়াশের জন্য খাবার বানাতে।উজ্জ্বলও তার মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো ওদের রুম থেকে। কাশফিয়া এখনও রেগে তাকিয়ে আছে ইয়াশের দিকে,লোকটা দিন দিন এমন পাষাণ হয়ে যাচ্ছে কেন? ওর কান্না দেখে কি খুশি লাগছে উনার? ইয়াশ এসে বসল কাশফিয়ার পায়ের কাছে। হাত দিয়ে দেখল কতোটা ব্যথা পেয়েছে। কাশফিয়া আস্তে আস্তে পা টা সরিয়ে আনল ইয়াশের থেকে, অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল অভিমানী স্বরে,
“আল্লাহ আমাকে কি শাস্তি দিবেন, সব শাস্তি তো আপনিই দিচ্ছেন!”
“তুমি আমাকে কম শাস্তি দিচ্ছ?”
কাশফিয়া কথা বলল না, চুপ করেই তাকিয়ে রইলো আগের মতো। ইয়াশ এগিয়ে আসল কাশফিয়ার কাছে, নিজের দুহাতের আঁজলায় ওর ছোট্ট মুখটা নিয়ে চাওয়ালো নিজের দিকে। চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল সে,
“কান্না করো না উপমা। কান্না করলে তোমাকে খুব বাজে দেখায়। আমার উপমাকে হাসিতেই মানায়।”
ইয়াশের নরম কথায় মন গলল না কাশফিয়ার, ঝাড়া মেরে ওর হাত দুটো সরিয়ে দিল সে। নাক টেনে বলল আগের মতো করেই,
“আমি তো আপনার কেউ হই না, আমি কান্না করলেই বা আপনার কি?”
ইয়াশ ঘাড় কাত করে তাকিয়ে আছে কাশফিয়ার দিকে। বুকে হাত রেখে বলল শান্ত কণ্ঠে,
“তুমি কান্না করলে আমার এখানটায় চিনচিন করে ব্যথা করে উপমা।”
ইয়াশের মন বোলানো কথায় প্রতিবারের মতোই গলে গেল কাশফিয়া। এই লোকটার উপর রাগ করে থাকতে পারে না সে। কীভাবেই বা থাকবে! যত ঝগড়া ঝামেলাই হোক, এই মানুষটা যে ওকে আগলে রাখে নিজের সবটা দিয়ে। প্রতিবার না বুঝে নির্বোধের মতো ঝামেলা পাকায় কাশফিয়া নিজেই, কিন্তু পরে আবার ইয়াশ মানিয়ে নেয় সবটা। এবার তার উল্টোটা হয়েছে। ইয়াশ ওকে বুঝাবে দূর, কথাটা পর্যন্ত বলেনি, হয়তো কাশফিয়ার কাজে রেগে গিয়েছিল খুব। তাই তো এত অভিমান জমেছে ওর! ইয়াশ কাশফিয়ার হাত ধরে নিজের কাছে নিয়ে এল, ওর নরম সুন্দর হাতটাতে চুমু দিল পরপর কয়েকটা। কাশফিয়ার রাগ কমলেও বুঝতে দিল না তা, এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল ইয়াশের থেকে, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলল,
“চলে যান এখান থেকে।”
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে উঠে দাঁড়ালো ইয়াশ। কাশফিয়া এত সময়ে ভালো করে তাকাল ওর দিকে। সে বলেছে, ওমনি ইয়াশ চলে যাচ্ছে?এই ভেবে আবারও মনের মধ্যে রাগ জন্মালো ইয়াশের প্রতি। চলে যাক, এই পাষাণ মানুষটাকে নিয়ে সেও আর ভাববে না।
—————-
ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে রাত প্রায় ১২টার কাছাকাছি। অন্ধকার রুমটাতে একা বিছানায় শুয়ে আছে কাশফিয়া। ইয়াশ একবার এসেছিল রুমে, কাশফিয়া ইচ্ছে করেই কথা বলেনি ইয়াশের সাথে। তখন ওভাবে চলে যেতে বলায় ইয়াশের নিশ্চয়ই রাগ হয়েছে, কাশফিয়ার এই ভুলের শাস্তি দিতে এখন আর কথাই বলবে না ওর সাথে। না বললে না বলুক, কাশফিয়াও ভাববে না ইয়াশকে নিয়ে। পাশ ফিরে তাকাতেই কারো উপস্থিতি ঠের পেল কাশফিয়া, বিকেলের ঘটনাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো আবার। ভয়ে চিৎকার দিতে নিলেই কেউ আঁকড়ে ধরল ওর কাঁপা কাঁপা ঠোঁট জোড়া। প্রথমে ভয় হলেও পরে আবার মানুষটার গভীর আলিঙ্গনে শান্ত হলো কাশফিয়া। পরিচিত পারফিউমের গন্ধ, চেনা স্পর্শে বুঝতে বাকি নেই মানুষটা ইয়াশ। উঠে গিয়ে রুমের লাইট অন করল ইয়াশ। কাশফিয়ার কাছটায় এসে বসে বলল,
“ভয় কিসের উপমা? তোমাকে ছোঁয়ার সাহস অন্য কারো আছে? তোমার রুমে আমি ব্যাতীত আর কে আসবে?”
কাশফিয়া কিছুক্ষণ তাকাল ইয়াশের দিকে। কী যেন হলো ওর, নিজের সবটুকু ভর ছেড়ে দিল ইয়াশের উপর। ইয়াশ হয়তো জানে না বিকেলের ঘটনাটা। কাশফিয়াও আর বলবে না, নইলে শান্ত বাড়িটা মাথায় তুলবে এতরাতে! কাশফিয়াকে বুকে টেনে নিল ইয়াশ, হাত বুলিয়ে দিল ওর মাথায়। আলতো করে চুমু দিল ওর পুরো মুখে। ওদের রুমের দরজার সামনে দিয়েই হেঁটে যাচ্ছে উজ্জ্বল, অবিরত ডেকে যাচ্ছে ইয়াশকে। ইয়াশের কানে আসল উজ্জ্বলের গলার আওয়াজ, মনে হলো কোনো দরকারেই ডাকছে। ইয়াশ মিষ্টি হেসে বলল কাশফিয়াকে—-“আসছি উপমা।ঘুমাবে না একদম, আজকে সারারাত গল্প করব আমরা।”
কথাটা বলেই উঠে পা বাড়াল চলে যাবে বলে। ইয়াশ দরজার সামনে যেতেই ডেকে বলল কাশফিয়া,
“শুনুন।”
ঘুরে তাকাল ইয়াশ, কাশফিয়ার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল ওকে,
“বলো, কিছু লাগবে? ওয়াশরুমে যাবে?”
“না।”
“তাহলে?”
কাশফিয়া কীভাবে কথাটা বলবে বুঝতে পারল না, নিজের পরনে থাকা এলো মেলো শাড়িটার দিকে তাকিয়ে পরে আবার ইয়াশের দিকে তাকাল। ইয়াশ হয়তো বুঝল কিছু, কাশফিয়ার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল ওকে,
“চেঞ্জ করিয়ে দেব?”
উপর নিচ মাথা নাড়াল কাশফিয়া, যা উত্তর হ্যাঁ। ইয়াশ কাবাড থেকে একটা জামা বের করে নিয়ে আসল। সুন্দর মতো পড়িয়ে দিল কাশফিয়াকে। বারবার কল আসছে ইয়াশের ফোনে, হয়তো উজ্জ্বল কল দিচ্ছে। এখন ওকে যেতে হবে এখান থেকে, যাওয়ার আগে বলে গেল কাশফিয়াকে, কোনো দরকার পড়লেই যেন কল দেয় ওকে। বাধ্য মেয়ের মতো ইয়াশের কথায় মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো কাশফিয়া।
——————–
কেটে গেছে বেশ কয়েকটা দিন। কাশফিয়া এখন অনেকটা সুস্থ।আজকে কৌশিক আর ইনায়া এসেছে খন্দকার মঞ্জিলে।যদিও কৌশিক আর ইয়াশের সম্পর্কটা ভালো হয়নি এখনও, নানা কারণে ঝামেলা লেগে থাকে দুজনের মধ্যে। কিন্তু একমাত্র বোনকে না দেখে থাকবে কি করে কৌশিক! তাই তো রাগ হলেও বার বার ছুটে আসে কাশফিয়াকে দেখবে বলে। ইনায়া আর কাশফিয়া কি যেন কথা বলছে, মাঝেমধ্যেই আবার হেসে উঠছে দুজনে। ইয়াশ মাত্রই রুমে ঢুকেছিল, ননদ ভাবির এমন মধুর আলাপে বাগড়া দিতে চাইল না সে। চলে যাবে, তখনই ইনায়ার ডাক আসল ইয়াশের কানে,
“আরে ইয়াশ, চলে যাচ্ছিস কেন? তোর বউ নাকি তোর আদরের অভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে! ওকে আদর দিয়ে সুস্থ করে তোল, আমি যাচ্ছি।”
ইয়াশ তাকিয়ে আছে কাশফিয়ার দিকে। একটা খোলামেলা নাইটি পড়েছে কাশফিয়া পাতলা কাপড় ভেদ করে শরীরের অনেকাংশই দেখা যাচ্ছে।এগুলো নিশ্চয়ই ইনায়ার বুদ্ধিতে করেছে!কাশফিয়ার এমন ওর উদ্ভট সাজপোশাকে বিরক্ত হলো ইয়াশ। ইনায়া রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই বলল রেগে মেগে,
“এসব কী পড়েছ উপমা? রুমের দরজাটাই বা খোলে রেখেছ কেন? বাড়িতে আমি ছাড়াও আরও লোকজন আছে, জানা নেই তোমার?”
ইয়াশের ধমকে ভড়কালো না কাশফিয়া, মুখ ভেংচি কেটে বলল,
“হুহ্, এমনভাবে বলছেন, মনে হচ্ছে আমি আপনার শার্ট পড়ে বসে আছি। এখানে এসে এমন হুজুর হয়ে গেলেন যে! বাড়িতে তো একশোটা কাপড় পড়ে প্যাকেট হয়ে থাকলেও ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকেন।”
ইয়াশের এমনিতেই মাথা ঠিক নেই। কাশফিয়ার সাথে ঝামেলা করেও জিততে পারবে না, রেগে বকা দিয়ে বসবে, তারপর কাশফিয়া কান্নাকাটি করবে। এই ভেবে আর কথা বাড়াল না ইয়াশ। চুপ করে গিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়ল সোফায়। কাশফিয়ার রাগ হলো, ইয়াশের কাজে? এই লোকটা এমন নিরামিষ হয়ে গেলো কেন? সামনে মিষ্টি রেখেও কি খাওয়ার লোভ জাগছে না ওর! কাশফিয়া এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো ইয়াশের সামনে। ইয়াশ ওকে লক্ষ্য করল, ল্যাপটপের দিকে তাকিয়েই গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কি চাই?”
ইয়াশের হাতের ল্যাপটপটা সরিয়ে কাশফিয়া ওর কোলে বসল, দুহাত দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“বাবু চাই।”
হঠাৎ এমন আবদারে চমকে তাকাল ইয়াশ। ওভাবেই বসে থাকল, তারপর বলল কাশফিয়াকে,
“বাবু তো দেবই কিন্তু…”
“কিন্তু কী?”
“বাচ্চা সামলাতে পারবে? তুমি নিজেই তো বাচ্চা।”
“তা বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করলেন কেন?”
“পরিস্থিতির চাপে পড়ে।”
“উহ্ পরিস্থিতি কি আপনাকে গলা টিপে ধরে বলেছিল আধবুড়ো ইয়াশ, তুই সুন্দরী কাশফিয়াকে বিয়ে কর?”
ভ্রু জোড়া আপনা-আপনি কুঁচকে এল ইয়াশের, রেগে বলল ওকে,
“আমি আধবুড়ো?”
ফটাফট উত্তর দিল কাশফিয়া,
“তাছাড়া কী? বুড়ো বয়সে আমার মতো সুন্দরী, কম বয়সী বউ পেয়েছেন, এই তো অনেক! আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করুন।”
ইয়াশ চোখ-মুখ শক্ত করে তাকিয়ে আছে কাশফিয়ার দিকে। মেয়েটা ইদানীং সাহস দেখাচ্ছে অনেক। ইয়াশকে তো এখন আর ভয়ই পায় না, বরং যখন তখন যা মুখে আসে তাই বলে দেয়। ইয়াশের গম্ভীর মুখ দেখে কিছুটা ভয় পেল কাশফিয়া। রাগ কমাতে কিছু না ভেবেই টুপ করে চুমু দিয়ে বসল ইয়াশের ঠোঁটে। নিজের কাজে সফল হলো বটে, ইয়াশ মুচকি হেসে ওর কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ালো নিজের, ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল ওকে,
“আমার মাথার রোমান্টিক ভূতটা তোমার মাথায় চেপেছে দেখছি! চুপচাপ গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো, ভূত চলে যাবে।”
কাশফিয়া বাচ্চাদের মতো গাল ফুলাল, ইয়াশকে আগের থেকেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওর ঘাড়ে মাথা রেখে, কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“না, আমার বাবু চাই। সমস্যা হবে না, আপনি বাচ্চা সামলাবেন আর আমি আপনাকে।”
কাশফিয়ার এমন আবদারে গলে গেলো ইয়াশ। ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
“প্রতিবারের মতো আমাকে কাছে ডেকে পরে আবার পালানোর জন্য কান্না করবে না তো?”
কথা বলল না কাশফিয়া, লজ্জায় মুখটা গুঁজে নিল ইয়াশের বুকে। ইয়াশের ঠোঁটের হাসি চওড়া হলো, কোলে তুলে নিল ওকে। পড়ে যাওয়ার ভয়ে ইয়াশের গলা জড়িয়ে ধরল সে। কাশফিয়াকে বিছানায় রেখে ওর কানের কাছে গেল ইয়াশ, ফিসফিস করে বলল,
“বেবি আর ইউ রেডি ফর আ রাইড?”
কাশফিয়ার গাল দুটো লাল হয়ে গেছে লজ্জায়, হাত দিয়ে মুখ ঢেকেছে নিজের।ইয়াশ হাসল,কাশফিয়ার মুখের উপর থেকে হাত দুটো সরাল, কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ওর লজ্জাবতীর লাজে রাঙা মুখটির দিকে।
ইয়াশ মুখ ডুবাল কাশফিয়ার গলায়, ওর অনাবৃত দেহের প্রতিটা ভাঁজে গভীর চুম্বন দিতে ব্যস্ত হলো সে। কাশফিয়া চোখ দুটো বন্ধ করে খামচে ধরেছে ইয়াশের মাথার চুল। ফর্সা ত্বকে ইয়াশের করা লালচে দাগগুলো স্পষ্ট দেখা গেল। ঘাড়ের ব্যথা পাওয়া স্থানে আবারও ব্যথা পাওয়ায় অসহ্য যন্ত্রণায় ইয়াশকে নিজের থেকে সরিয়ে দিতে চাইল সে। চোখ বেয়ে দু’ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি কি মানুষ?”
ইয়াশ তাকাল কাশফিয়ার মুখপানে,ওর নাকের সাথে নাক ঘষে বলল বলল মাদকতা মিশ্রিত কন্ঠে,
“কি করব বলো তোমার আলিঙ্গন যে আমাকে উন্মাদ করে ছাড়ে।আই লুজ কন্ট্রোল ওভার মাইসেল্ফ বেইবি।”
প্রতিউত্তর করল না কাশফিয়া চলে যেতে চাইলে ইয়াশ ওকে টেনে ফেলল বিছানায়। ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
“আমার আদর সহ্য করতে পারবেনা আবার আমাকে কাছে ডাকবে! দিস ইজ নট ফেয়ার। কাছে যখন ডেকেছোই আমার ভালোবাসার যন্ত্রণাও সহ্য করতে হবে উপমা।”
কাশফিয়া কিছু বলতে চেয়েও পারল না, ইয়াশ আঁকড়ে ধরল ওর ঠোঁটজোড়া। কাশফিয়াও আর দূরে সরানোর চেষ্টা করল না ইয়াশকে, নিজেই যে বিপদ ডেকে এনেছে তা ভালো করেই বুঝতে পারছে। ইয়াশ পুরোপুরি মত্ত হয়ে আছে কাশফিয়াতে, ওর হাতের অবাধ্য স্পর্শ আর অনবর্ণনীয় অত্যাচারে পাগলপ্রায় অবস্থা কাশফিয়ার। ইয়াশ এমনভাবে আচরণ করছে, মনে হচ্ছে রাগ ঝাড়ছে ওর উপর। কাশফিয়ার অসহায় আর্তনাদগুলো কানে আসলে পরক্ষণেই আবার বুকে টেনে নিচ্ছে ওকে, আদর করে চুমু দিচ্ছে কপালে। এই জিনিসগুলোর জন্যই কাশফিয়ার এতো ভালো লাগে ইয়াশকে। শতো যন্ত্রণার মধ্যেও ইয়াশের এই যত্ন, ভালোবাসা শান্তি দেয় ওকে।
#চলবে…….
পড়ুন রোমান্টিক ই-বই “রাগে অনুরাগে সিক্ত কাব্য”
https://link.boitoi.com.bd/GQcM
গল্প রিলেটেড সব আপডেট পেতে গ্রুপে জয়েন হোন।
https://facebook.com/groups/569604222322147

