শুভ্রফুল — ২১ #কলমে_লিজা_আক্তার_আলো

0
30

#শুভ্রফুল — ২১
#কলমে_লিজা_আক্তার_আলো

[ কপি নিষিদ্ধ ]

” আলো কষ্ট করে নিচে আসতে গেলি কেন? আমি তো খাবার নিয়ে যাচ্ছিলাম তোর জন্য।

” মামুনি আমি এখন সুস্থ রোজ রোজ তোমাকে কষ্ট করতে হবে না। তাছাড়া আমার জন্য তোমার ছেলে ও ভার্সিটিতে যাচ্ছে না৷ তাই আজ জোর করে পাঠিয়েছি। আমি এখন দিব্যি সুস্থ আছি।

আফিয়া চৌধুরীর কথায় আলো উক্ত বাক্য বলে
আঁধারের পাশের চেয়ারে বসলো। নীলিমা চৌধুরী
প্লেটে খাবার দিতে দিতে বললো,

” দেখেছিস ছেলেটার কান্ড ও এখন হোস্টেলে যেতে চাইছে না তোর আদরে সত্যিই বাঁদর হয়ে গিয়েছে ও।

হাসলো আলো। আঁধার হাসলো না বরং গম্ভীর হয়ে বললো,

” মা কি বলছো তুমি? আমার আপুনিকে বাজে কথা বলো না। আমার আপুনির মতো তুমি ও আদর কর না আমায়। তোমরা সবাই শুধু বকো আর আমার আপুনিই আমায় আদর করে।

” হয়েছে পাকা ছেলে খাও এবার। নয়তে তোমার মতো আমাকে শাসন করবে কাকিয়া।

” আমাদের ছেড়ে একা একাই খেতে বসে পড়েছো
তোমরা?

রাফা ও আতিকা বেগম আসে নিচে। ডাইনিংয়ের
কাছে আসতে আসতে বলে আতিকা বেগম। ফের বলে,

” ওমা আলো দেখি সুস্থ হয়ে গিয়েছে। ভালোই হয়েছে আফিয়াকে আর কষ্ট করে চাকরের মতো খাবার রুমে দিয়ে আসতে হবে না। বাড়িতে এতোগুলা কাজের লোক থাকার পর ও কাজের মহিলার মতো খাবার নিয়ে যেতো।

আলোর মনটা বিষিয়ে গেলো। সে বললো,

” মামিমা ওনি এই বাড়ির কে আপনার নিশ্চয়ই অজানা নয়। আর আমি ওনার কে হয় এটা ও জানেন তাহলে জেনেশুনে কেন মিষ্টি সম্পর্ককে তেতো করতে চাইছেন বলুন তো? মা যত্ন করলে সে কাজের লোক হয় না তাহলে তো পুরো মা জাতিকে কাজের লোক অথবা চাকর বলা হবে। মা মেয়ের সম্পর্কের মধ্যে ঝামেলা সৃষ্টি করতে চাইছেন আপনি?

আতিকা বেগম বলেন,

” আমি ওভাবে বলিনি। আমি বলতে চেয়েছি…

” থাক ভাবি আপনার আর কিছুই বলতে হবে না।
ভাইজান ফোন দিয়েছিলো আপনাকে ফোনে পায়নি। ভাইজান অসুস্থ বাসায় যেতে বলেছে। আর আমি আমার মেয়ের জন্য খাবার নিলে যদি চাকরানী হয় তাও আমার জন্য ভালো। আমি একই কাজই করবো।
শুধু ও কেন রাফা অসুস্থ হলে ও আমি তাই করি সেটা ও তোমার অজানা নয়। কেন দ্বন্দ্ব তৈরি করছো?

রাফা মাকে বিরবির করে বকে যাচ্ছে। কখন কি বলতে হয় সেটা ও বুঝে না মহিলাটা। এখন খাবার খাওয়ার সময় এখন কিভাবে খেতে বসবে লজ্জা করছে রাফার। দু’দিনভর চেষ্টার কোনো কমতি রাখেনি রাফা। মা যেভাবে বলেছে সেভাবেই চলেছে সে। কিন্তু, ফলাফল বরাবরই শূন্য। কয়েকবার মায়ের বলা উল্টাপাল্টা কথা বলায় শুভ্রের ধমক খেতে হয়েছিলো। ভয়ে এখন শুভ্রর সামনেই যায় না রাফা। শুভ্র আজ ভার্সিটিতে গিয়েছে। আলো অসুস্থ বিদায় যাওয়া আপাতত বারণ। দু’জনেই খেতে বসলো। চুপচাপ কথা না বলে খেয়ে উঠে পড়লো। সময়টা এখন দুপুর দু’টো হবে। আসিফ চৌধুরী ও আরিফ চৌধুরী অফিসে। আসতে আসতে রাত হবে। সকলেই খেয়ে ডয়িংরুমে বসে রইলো শুধু রাফা ও আতিকা বেগম রুমে চলে গিয়েছে।

আঁধার ও আলো গল্প করছিলো তখনই দ্বিধা দ্বন্দ্ব বেঁধ করে বলে উঠলো আফিয়া চৌধুরী,

” আলো তোর সাথে কিছু কথা ছিলো আমার।

” হ্যা বলো মামুনি আমি শুনছি তোমার কথা।

তখনো আলো আঁধারের সাথেই তার দুষ্টুমিতে সায় দিচ্ছিলো। আফিয়া চৌধুরী সিরিয়াস ভাবে বলে,

” আমি তোর সাথে কথা বলছি তুই ওর সাথে কথা বলছিস তাহলে শুনবে কে?

” আলো আগে আপার কথা শোন কি বলে।

স্থির হয়ে বসলো আলো। বললো,

” বলো এবার।

” তোর চাচা মারা গিয়েছে।

আলো থমকালো। খানিক্ষন স্থির হয়ে রইলো সে।
পলক ফেলতে ভুলে গিয়েছে বোধহয় মেয়েটা।
চোখে পানি জমে গেলো। চেহেরা মলিন হয়ে এলো।

” তুই ঠিক আছিস আলো?

” কাকিয়া মামুনি আমি তো গতকাল ও চাচার সাথে কথা বলেছিলাম সে তো সুস্থ ছিলো। টাকা ও
তো পাঠিয়েছিলো ওনি তাহলে কিভাবে কি হলো?

আফিয়া চৌধুরী আফসোসের স্বরে বলেন,

” কখন কার কি হয় কেউ জানে না রে মা। তোর বাবা এখন মেসেজ দিলো। তুই কষ্ট পাবি বলে জানায়নি। গতকাল রাতেই মারা গিয়েছে। কবর ও দিয়ে দিয়েছে। আজ আমাদের গ্রামের বাড়ির কেয়ারটেকার ফোন দিয়ে জানালো।

” চাচা আমায় নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতো।
কিন্তু, চাচি মেয়ে ভাবতে পারেনি আমায়৷ তারপর
চাচাকে ও নিজের মতো করে আমাকে তার চোখে
অপছন্দ করে তুললো। চাচা সেইদিন ও আফসোস করে বলছিলো, সে ভুল করেছে। মাফ চেয়েছিলো
আমার সাথে করা অন্যায়ের জন্য। আমার রাগ নয় অভিমান ছিলো তাদের প্রতি। আমি তো ভেবেছিলাম আমার চলে আসায় তারা ভালো আছে। কিন্তু চাচি চাচার সাথে ও খারাপ আচরন করতো। কষ্ট দিতো। জানো মামুনি ছোট্ট বাচ্চার মতো কান্না করছিলো সেদিন। আসার জন্য ছটফট করছিলো। আমাকে দেখর ইচ্ছে ছিলো তার। কিন্তু, এভাবে চলে গেলো চাচা? আমি যাবো
মামুনি আমায় গ্রামে নিয়ে চলো প্লিজ?

কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো আলো। আফিয়া চৌধুরী বলেন,

” গেলে তো দেখতে পাবি না। আর তুই নিজে ও অসুস্থ কিভাবে যাবি? আগে সুস্থ হয়ে নে তারপর
শুভ্রকে নিয়ে ঘুরে আসবি গ্রামে।

হ্যা বা না কিছুই বললো না আলো। সোজা নিজের রুমে চলে গেলো। নীলিমা চৌধুরী বলেন,

” মেয়েটা কাঁদছে না বললেই ভালো হতো আপা।

” কাঁদুক! পরে বললে আরো কষ্ট পেতো। কিন্তু,

” আবার কি হয়েছে?

” আলোর চাঁচি আলোর কাছে আসতে চাইছে। কেউ নেই বলে এখন আলো আলো মেয়ে মেয়ে করছে। আমার মহিলাটাকে বিশ্বাস হয় না। দেখেছিসই তো গতবছর আলো গিয়েছিলো তখন মহিলাটা কেমন করলো। মেয়েটার গায়ে হাত তুলতে চেয়েছিলো।

” ঠিকই বলেছো আপা। সামান্য একটু বাড়ির জায়গার জন্য। ওনি ভেবেছিলো জায়গা নেওয়ার জন্য আসছিলো তাই মারতে চলে আসলো। আলোর জন্যই তো কিছু করতে পারলাম না নয়তো আঁধারের বাবাকে বলে আলোর বাবার পুরো জায়গা আলোর নামে দলিল করাতাম। কিন্তু বোকা মেয়ে স্বার্থপর মহিলাকে দান করলো যে
শুকরিয়া আদায় করা তো দূর যে দান করলো উল্টো তাকেই মারতে চাইলো। আমি চাই না আলো
গ্রামে যাক অথবা ওই মহিলা এখানে আসুক।
তুমি বরং ভইজানকে বলো অসহায় ভেবে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিতে। লাগলে বলবে প্রতি মাসে টাকা পাঠিয়ে দিবে এটাই সম্পর্ক এর বাইরে আর কোনো সম্পর্ক রাখার প্রয়োজন নেই। কারন যারা
খারাপ তারা কখনোই ভালো হয় না কেবল ভালো হওয়ার নাটক করে। সময়ের সৎ ব্যবহার করে। নিজ স্বার্থে জন্য এরা সব করতে পারে।

” তাই-ই করতে হবে। আমি শুভ্রর বাবার সাথে এই নিয়ে রাতে কথা বলবো। দেখি ওনি কি বলে।

” তুমি টাকা পাটিয়ে দিতে বইলো।

” ঠিক বলেছিস।
____________________

ভার্সিটিতে দীর্ঘ সময় ক্লাস নিয়ে শুভ্র যখন বাসায় ফিরলো , তখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। সারাদিনের গরম আর ক্লান্তিতে শুভ্রর শরীরটাকে যেন ভারী করে তুলেছে। দরজাটা আলতো করে ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই নিস্তব্ধ ঘরটা তাকে স্বাগত জানালো। ব্যাগটা সোফার পাশে রেখে শুভ্র ধীরে ধীরে শার্টের উপরের বোতামগুলো খুলে দিল। গরমে ভেজা শরীরে একটু স্বস্তি আনার চেষ্টা কেবল। হালকা নিঃশ্বাস ফেলে সে ডাকলো আলোকে,

” আলো…?

তার কণ্ঠে ক্লান্তির সঙ্গে মিশে ছিল পরিচিত এক স্নেহের সুর। কিন্তু ঘরটা নিঃশব্দ। কোনো উত্তর এল না। আলো কোথায়? এই অসুস্থ শরীর নিয়ে কোথাও ডয়িংরুমে ও তো নেই। শুভ্র ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকাল। আবার ডাকলো সে,

” আলো কোথায় তুমি ?

অদ্ভুত তো কোনো উত্তর নেই। কয়েক পা এগিয়ে সে রুমের দিকে গেল। ঠিক তখনই চোখে পড়ল রুমের সাথে থাকা ছোট্ট এটাচ লিভিং স্পেসটা। সেখানে সোফার উপর গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে আলো। মুখটা সামান্য পাশ ফিরানো। চোখ দুটো বন্ধ। মনে হচ্ছে গভীর ঘুমে ডুবে আছে, অথচ চোখের কোণ বেয়ে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর দাগ স্পষ্ট। দুপুরের আফিয়া চৌধুরীর বলা আলোর চাচা আর নেই। সেই খবর শোনার পর থেকেই আলো অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছে। কান্নার ক্লান্তি আর মানসিক ভারে হয়তো কখন যে চোখ লেগে এসেছে, সে নিজেও বুঝতে পারেনি। ঘুমের ভেতরেও সে যেন নিজের ভেতরে গুটিয়ে আছে একদম ছোট্ট হয়ে। দৃশ্যটা দেখে শুভ্র কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো। সে জানে তার কাছে ও খবরটা এসেছে। কিন্তু, আলো জানলো কিভাবে নয়তো এভাবে কাঁদার তো কথা নয়। কেনো কাঁদছে মেয়েটা?

সোফার পাশে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিলো শুভ্র। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো আলোর মুখশ্রীর সামনে। মাথায় হাত রাখলো শুভ্র। ঠিক তখনই জেগে উঠলো আলো। হয়তো তার উপস্থিতি টের পেয়েছে আলো। চমকে উঠে বসে পড়লো সে। কিছু মুহূর্ত যেন ঠিক বুঝতেই পারল না কোথায় আছে। তারপর চোখ তুলে সামনে তার দিকে খানিকটা ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকা শুভ্রকে দেখতেই বুকের ভেতরে জমে থাকা কষ্টটা আর ধরে রাখতে পারল না। মুহূর্তেই তার চোখ ভিজে উঠলো।
কাঁপা কণ্ঠে সে বলে উঠলো আলো,

” মি. চৌধুরী..

কথাটা বলেই তার গলায় যেনো কথা আটকে গেলো। হয়তো কান্নার জন্য কথা বলতে পারছে না মেয়েটা। আবার ও বললো,

” চাচা! চাচা আর নেই মি. চৌধুরী।

শেষ কথাটা বলতে না বলতেই তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ভাঙা গলায় আবার বললো,

” আমি ওনাকে শেষবারের মতো দেখতেও পারলাম না।

কথাগুলো বলতে বলতে যেন তার বুকটা ভেঙে যাচ্ছে। ঘরটা আবারও নিস্তব্ধ হয়ে উঠলো। শুভ্র স্থির হয়ে থাকতে পারলো না আগলে নিলো কান্নারত আলোকে নিজের বুকের মধ্যে। আহ্লাদ পেয়ে আলো এবার শব্দ করে কেঁদে বলে উঠলো,

” পরের মতো ছিলো তবুও তো বাবার জায়গায় ছিলো। বাবার পরই তো হয় চাচা বাবার মতো। আমায় তো তেমন আদর যত্ন করেনি। তবুও কষ্ট হচ্ছে কেন?

শুভ্র কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে আলোর দিকে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটার চোখ ভরা জল, মুখজুড়ে গভীর শোকের ছাপ।

আলোর কপালে চুমু খেলো। এলোমেলো হয়ে আসা চুলগুলো সরিয়ে দিলো কানের পাশে। নরম স্বরে বলল,

” উপরওয়ালা যখন কাউকে নিয়ে নেন, তখন আমাদের আর কিছু করার থাকে না আলো। আগে জানলে যেতে পারতাম কিন্তু তারা তো আমাদের আজ জানিয়েছে। এখন কিছুই করার নেই।

আলোর কান্না তখনও থামেনি। শুভ্র একটু ঝুঁকে আলোর দিকে তাকালো। কণ্ঠটা আরও কোমল হয়ে উঠলো শুভ্রর। বললো,

” এইভাবে কাঁদতে থাকলে তোমার শরীর খারাপ হয়ে যাবে।”

একটু থেমে আবার বললো,

“প্লিজ আলো.. ডোন্ট ক্রাই!

শুভ্র অনুরোধ করলো প্রায়। কারন এই শরীরে কান্নার জন্য অনেক ক্ষতি হওয়ার চান্স আছে। ফের বললো,

” আই ক্যান’ট বেয়ার ইয়োর টিয়ার্স, আলো.. প্লিজ, ডোন’ট ক্রাই। নিজের শরীরের জন্য হলে ও কান্না থামাও।

” আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে। আফসোস হচ্ছে। যেনো ওনি আমার সন্তান। মা মা করে আমার কাছে মাফ চেয়েছে। এভাবে মাফ চেয়ে বিদায় নিলো আমার মাথায় হাত বুলিয় দিয়ে বাবার স্নেহে কাছে টেনে নিলো না সেই সুযোগটা পেলো না।

হিচঁকি ওঠে গিয়েছ কাঁদতে কাঁদতে আলোর তবুও মেয়েটা কাঁদছেই। শুভ্রর টেনশন হচ্ছে আলোর শরীরের জন্য। মেয়েটা নিজে ও যে অসুস্থ সেটাই ভুলে বসেছে। বারণ করলো বা স্বযত্নে বুকে আগলে রাখলো। নিশ্চুপ থাকলো। খানিক্ষন পর থেমে এলো কান্না শুধু ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে ওঠছে আর হিচঁকি ওঠছে।

” শরীরটা এখন বোধহয় পুরোপুরি ক্লান্ত হয়েছে তাই না? এবার চলো শুইয়ে পড়বে। আমাকে শাওশার নিতে হবে। এভাবে তোমাকে ছুঁলে আমার শরীরে থাকা ময়লা তোমার অসুস্থ শরীরের জন্য ক্ষতিকারক। আর হ্যা উপরওয়ালা নিয়ে নিয়েছে মানে আল্লাহর রুহমত হিসেবে এমন ও হতে পারে আমাদের ছেলে সন্তান হয়ে তিনি ফিরবেন। আফসোস একসময় পূর্ণ হবে আলো।
সেটা আমাদের সন্তান পূর্ণ করবে। হয়তো চাচা নয় তবুও তোমার মন শান্তি পাবে।

” এভাবেই থাকি?

ছোট্ট আবদার আলোর। শুভ্র অবাক হলো বোধহয়
মেয়েটা অসুস্থ হওয়ার পর থেকে বাড়ি আসা নিয়ে প্রায় সতেরো দিন হলো। শুভ্রকে কেবল এড়িয়েই চলেছে। এক বিছানায় মধ্যোকার বড় কুলবালিশের প্রাচীর দিয়ে রেখেছে। আর আজ অনুরোধ করছে। কিছুই বললো না শুভ্র। নিঃশব্দে আর একটু জড়িয়ে নিলো নিজের সাথে। মেয়েটা কি নিজেকে একা ভাবছে? সব হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া মানুষ যেভাবে কাউকে পেলে আগলে নিতে চাই ঠিক তেমটায় মনে হচ্ছে আলোর ক্ষেত্রে।
কতক্ষণ সময় পেরোলো শুভ্র মাথা হাত বুলালো। হঠাৎ ওঠে পড়লো আলো। জোড় করেই বলা চলে,

” সরি আপনাকে বসিয়ে রাখলাম। আপনি না শাওয়ার নিবেন। দুপুরে বোধহয় কিছুই খাননি আমি খাবার আনছি।

” আমি খেয়ে আসছি তোমায় কষ্ট করতে হবে না। চুপচাপ বেডে যাও।

” সারাক্ষণ শুয়ে থাকতে বিরক্ত লাগে।

” বই পড়ো। পড়াশোনা করো।

” সকল বই পড়া শেষ।

” গুড গার্ল!

” আপনার লেইট হচ্ছে। ঠান্ডা লাগবে নয়তো।

” যাচ্ছি।

আলো বসে রইলো। তার এসবে মন নেই হঠাৎ মনটা তার শৈশব, কৈশোরে চলে গিয়েছে। কষ্ট হলে ও সময়টা কত সুন্দর ছিলো। হঠাৎ হঠাৎ কেমন চিনচিন ব্যাথা উঠছে তলপেটের মধ্যে। পাত্তা দিলো না আলো। সে ফের মগ্ন হলো তার গ্রামের অলিগলির বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, এবং ধানক্ষেত কত স্মৃতি মনে পড়ছে এখন। চাচার জন্য ভাত নিয়ে যাওয়া। লুকিয়ে বুড়ির গাছের বড়ই চুরি করে খাওয়া। আচ্ছা বৃষ্টি কেমন আছে? তার তো কোনো খোঁজ পেলাম না?

” আহ!
এভাবে ব্যাথা করলো কেন?

ঠিক ক্ষত স্থানের কাছে। আস্তেধীরে বাড়ছিলো ব্যাথাটা। তবুও দমিয়ে রাখলো নিজের মধ্যে। শুভ্র বেরিয়ে এলো। আলোর মুখের এক্সপ্রেশন দেখে বুঝলো মেয়েটা ঠিক নেই।

” কি হয়েছ আবার কাঁদছো ?

আলো হকচকিয়ে ওঠলো।

” না তো কাঁদছি না।

” তাহলে খারাপ লাগছে?

বললো না আলো। কথা ঘুরালো,

” তেমন কিছু না এমনিতেই বোরিং লাগছিলো।

দাঁড়াতে পারলো না আলো ব্যাথা যেনো ক্রমশ বেড়েই চললো। সে সুন্দর করে আধশোয়া হয়ে বসলো বেডের একপাশে।

শুভ্র কাছে ভালো ঠেকছে না আলোর ভাবসাব। কাছে আসলো চুলগুলো হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে দ্রুত
শুঁকিয়ে নিলো। আলের পাশেই বসলো। মনের মধ্যে জমা কথা বলতেই নিচ্ছিলো কেবল শুভ্র তার আগেই আলোর ব্যাথাতুর কন্ঠস্বর,

” শুভ্র পেটটা খুব ব্যথা করছে।

কথাগুলো বলতে বলতেই আলোর কণ্ঠ কাঁপতে লাগল। ব্যথা যেন ধীরে ধীরে তীব্র হয়ে উঠছে। শুভ্র ভয়ে ঘাবড়ে গেল। হঠাৎ কি হলো আলোর? শুধালো সে অস্থির চিত্তে,

” আলো! কি হয়েছে তোমার?

আলো আর ঠিকমতো উত্তর দিতে পারল না। ব্যথায় তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। দেরি না করে শুভ্র দ্রুত তাকে নিয়ে মেডিকেলে ছুটলো। শুভ্রর চিৎকারে আফিয়া চৌধুরী ও নীলিমা চৌধুরী সহ আঁধার আতিকা বেগম ও রাফা বের হলো। নীলিমা চৌধুরী সাথে গেলো। আফিয়া চৌধুরী আসিফ চৌধুরীকে ফোন দিলো দ্রুত হঠাৎ মেয়েটার আবার কি হলো। কি সুন্দর সবার সাথে একসাথে বসে খাবার খেলো মেয়েটা। দিব্যি সুস্থ বলছিলো। রাফা ও আতিকা বেগম মহাখুশি।

হাসপাতালে পৌঁছেই ডাক্তাররা পরীক্ষা শুরু করলো। রক্ত পরীক্ষা, আল্ট্রাসাউন্ড, তারপর জরুরি স্ক্যান। শুভ্র ও নীলিমা চৌধুরী বসে থাকতে পারছে না। শুভ্রর মনে ভয় ডুকেছে। কেবলই মেডিকেল থেকে ডিসচার্জ করা হলো আবার ও আসতে হলো। আলোর এতো কষ্ট হচ্ছে কেন কি হয়েছে আবার নতুন করে?

” শান্ত হো শুভ্র আলোর কিছুই হবে না। হয়তো ক্ষত স্থানে ব্যাথা ওঠেছে।

” তুমি জানো না কাকিয়া ও কষ্ট পাচ্ছে। আমি দেখেছি ওর ভয়। হয়তো ভেবেছে ও আর ফিরে..

” চুপ এমন অলুক্ষণে কথা বলে না। আলো ঠিক হয়ে ফিরে আসবে। মেয়েটা দুপুরে সবার সাথে কত মজা করলো খেলো। হঠাৎ এমনটা ভাবতেই অবাক লাগছে আমার।

কিছুক্ষণ পর একজন ডাক্তার এসে শুভ্রকে আলাদা করে ডাকলেন। ডাক্তারের মুখটা গম্ভীর। তিনি কিছুটা সময় নিয়ে বলেন,

” আপনার স্ত্রীর আগের আঘাতের জায়গায় ভেতরে গুরুতর সমস্যা হয়েছে। জরায়ুতে মারাত্মক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।

শুভ্রের ভয় হলো মনে। তবুও নিজেকে যথাসম্ভব সক্ত করে বললো,

” ডাক্তার এখন কি করতে হবে সেটা বলুন। আর আমি আমার আলোকে সুস্থ দেখতে চাই। আপনারা যা করার করুন।

ডাক্তার ফের ধীরে বললেন,

” তাকে বাঁচাতে হলে এখনই অপারেশন করতে হবে।

শুভ্র একটু স্বস্তি পেলো। বললো,

” যা করার করুন আলোর যেনো কিছু না হয়।

” কিন্তু একটা বিষয় আপনাকে জানাতে হবে।
এই অপারেশন করলে আপনার স্ত্রী আর কখনো মা হতে পারবে না।

শুভ্র স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ডাক্তার আবার বললেন,

” আর যদি অপারেশন না করা হয়, তাহলে পেশেন্টকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।

কয়েক মুহূর্তের জন্য নীরবতায় ডুবে গেলো শুভ্র ।
শুভ্রের চোখ ভিজে উঠলো । অপারেশন থিয়েটারের দরজার ওপারে তার আলো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।

নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত বলে উঠলো,

” ডাক্তার আমার স্ত্রীকে বাঁচান। অপারেশন শুরু করুন। ও না থাকলে সন্তান দিয়ে কি করবো যার কোনো অস্তিত্বই নেই। আমার সন্তানের প্রয়োজন নেই। কিন্তু, কথাটা যেনো আমার আর আপনার মধ্যেই থাকে কেউ জানতে পারবে না।

ডাক্তার মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। আর সেই মুহূর্তে একটা সত্য চিরদিনের জন্য গোপন হয়ে গেলো। আলো কোনোদিন জানবে না, তার জীবন বাঁচাতে গিয়ে শুভ্র তাদের অনাগত সন্তানের স্বপ্নটা নিজের হাতে ত্যাগ করেছে।

চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here