সাঝের_প্রণয়ডোর #সাদিয়া_সুলতানা_মনি #পর্ব_২০

0
24

#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_২০

পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায় হায়া। হঠাৎই আলো চোখে এসে পরায় ভালো করে তাকাতে পারে না। আস্তে ধীরে সময় নিয়ে সে ভালো করে তাকাতে পারে। প্রথমেই সে আশেপাশের জায়গা চিনে উঠতে পারে না।

একটু সময় নিয়ে তাকিয়ে দেখলে বুঝতে পারে সে তার ও আশিয়ানের রুমে আছে। আস্তে আস্তে তার সব কথা মনে পরতে শুরু করে। কিভাবে তাদের কিডন্যাপ করা হয়েছিলো, কিভাবে তার শ্লীলতাহানি করার চেষ্টা করা হয়েছিলো সবশেষে কিভাবেই তাদের উদ্ধার করা হয়েছিলো সবগুলো ঘটনাই মনে পরে তার।

ভয় হায়া’র আত্মা আবারও কেঁপে উঠে। কিন্তু সেই ভয় বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। কারণ কিছু পল পরেই সে নিজের আত্মার মানুষগুলোর কণ্ঠ পায়। হায়া খেয়াল করে দেখে তাদের রুমে তার ফ্যামিলির প্রায় সবাই উপস্থিত। নিজের মাথায় কারো হাতের উপস্থিতি অনুভব করতে পেরে হায়া চোখ উঁচিয়ে তাকালে দেখতে পায় নিজের জন্মদাতাকে।

জাভিয়ান মেয়ের মাথায় শিয়রে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। হায়া তার দিকে তাকালে জাভিয়ান বলে–

—এখন কেমন লাগছে মা? শরীর খারাপ লাগছে কি?

পিতার স্নিগ্ধ কণ্ঠে আদরের পরশমাখা প্রশ্নটি শুনে হায়া যেন ফিরে গেল শৈশবের সেই সহজ-সরল সময়ে। অশ্রু আটকে রাখতে পারল না সে—ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে শিশুর মতো কেঁদে ফেলল। তার মনে হয়েছিল, আর হয়তো কখনো দেখা হবে না এই মানুষটির সঙ্গে, যিনি শুধু পিতা নন, তার জীবনের প্রথম ভালোবাসাও বটে।

প্রতিটি নারীর জীবনের প্রথম প্রেম পুরুষটি হয় তার পিতা—যিনি শত ব্যস্ততার মধ্যেও কন্যার হাত ধরে পথ চলেন, যিনি প্রতিটি কান্নার আগে বুঝে ফেলেন তার মেয়েটির না বলা ব্যথা। যে স্নেহের ছায়ায় এক কন্যা শিশু বেড়ে ওঠে, সেই স্নেহ, সেই ভালোবাসা—সমগ্র জীবনে আর কোনো পুরুষের কাছ থেকে পাওয়া সম্ভব হয় না অনেক সময়েই।

পিতার ভালোবাসা নিঃশর্ত, নিঃস্বার্থ, অথচ নিঃশব্দ। আর ঠিক সেই নিঃশব্দ ভালোবাসার উপস্থিতি টের পেয়ে হায়ার চোখ ভেসে গেল আবেগের জলে।

জাভিয়ান মেয়ের কান্না দেখে বিচলিত হয়ে পড়ে। সেই সাথে সেখানে উপস্থিত সকলেও। জাভিয়ান অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে–

—কি হয়েছে মা? খারাপ লাগছে বেশি? জায়িন যাও গাড়ি বের করো। আমি বলেছিলাম তোমাদের ওকে ডাইরেক্ট হসপিটালে নিয়ে যেতে কিন্তু তোমরা শুনলে না আমার কথা।

প্রথম দুটো প্রশ্ন হায়া’কে করে বাকি কথাগুলো জায়িন-জাহানকে উদ্দেশ্য করে বলে। জাভিয়ান হায়া’কে আস্তে করে বসিয়ে দিয়ে বেড থেকে নামাতে গেলে হায়া বলে–

—পাপা আমার খারাপ লাগছে না।

—তাহলে কাঁদছো কেনো মা?

—তোমায় দেখে কান্না পাচ্ছে তাই।

—আমায় দেখে? কিন্তু কেনো?

প্রচন্ড বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করে জাভিয়ান। হায়া ছলছল চোখে বলে–

—আমি ভেবেছিলাম তোমার সাথে আর দেখা হবে না আমার। আমি হয়ত তার আগেই…..

জাভিয়ান মেয়ের মুখ চেপে ধরে। হায়া’কে বাকি কথাটা বলতে দেয় না। জাভিয়ান ধরা গলায় বলে–

—বাজে কথা বলবে না আর কখনো। তোমার পাপা যতদিন নিঃশ্বাস নিবে এই পৃথিবীর বুকে ততদিন তোমাকে প্রটেক্ট করে যাবে।

হায়া জাভিয়ানের বুকে মাথা রাখে। জাভিয়ান আস্তে আস্তে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। বাকিরা কালকের ওমন ঘটনা সম্পর্কে টুকটাক প্রশ্ন করতে থাকে। হায়া তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে খেয়াল করে এখানে সবাই উপস্থিত থাকলেও তার বরসাহেব নেই।

হায়া’র চিত্ত চঞ্চল হয়ে উঠে। লোকটাকে দেখার জন্য মনটা ছটফট করতে থাকে। তার ছটফটানি কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাওয়া হয়ে যায় যখন সে দেখে আশিয়ান ফোন কথা বলতে বলতে রুমে প্রবেশ করছে।

হায়া ভালো করে খেয়াল করে দেখে আশিয়ানের কপালের একপাশে দুটো ব্যান্ডের ক্রশ আকারে দেওয়া। ঠোঁটের এক কোণেও কালচে হয়ে আছে। বিষয়টা দেখে তার একটু বেশিই খারাপ লাগে। সে ঐ রুক্ষ পুরুষালী ওষ্ঠ ছোঁয়ার আগেই অন্যকেউ সেটাকে মেরে তক্তা বানিয়ে দিয়েছে।

আশিয়ান ফোন কেটে হায়া’র দিকে তাকালে দেখতে পায় তার পুতুলবউ তার দিকেই তাকিয়ে আছে। মেয়েটার গোলুমোলু মুখটা কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে শুঁকিয়ে এইটুকু হয়ে গিয়েছে। সেও এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকে ঐ আদুরে মুখ টার দিকে।

সকলে কালকের ঘটনা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বললেও হায়া ও আশিয়ান একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে এক ধ্যানে। চোখে চোখে অনেক অনুভূতি, কথা প্রকাশ করলেও তার কণ্ঠ নিশ্চুপ।

তাদের এউ নিরবতা আর কারো চোখে ধরা না পরলেও হানিয়া’র চোখে ধরা পড়ে যায়। হানিয়া খেয়াল করে সবাই কথা বললেও তার মেয়ে ও জামাতা চুপ করে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। মুহূর্তেই বুঝে যায় কিছু বিষয়।

হানিয়া সকলের উদ্দেশ্য বলে–

—আমাদের এখন যাওয়া উচিত। কারণ হায়া আর আশিয়ানের রেস্ট নেওয়া প্রয়োজন। কাল থেকে তো ওদের উপর কম ধকল গেলো না সেই সাথে আমাদের সকলেরও।

সকলে ভেবে দেখে হানিয়া’র কথাটা ঠিক। কাল সারারাত তারা সকলে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে ছেলেমেয়েদের চিন্তায়। সেই সাথে হায়া-আশিয়ানকে দেখেও ক্লান্ত লাগছে। সকলে এক এক করে রুম থেকে বের হয়ে আসে।

হানিয়া যাওয়ার আগে হায়া’কে বলে–

—আসো তোমায় ফ্রেশ করিয়ে দিয়ে যাই।

হায়া কিছু বলার আগেই আশিয়ান গম্ভীর গলায় বলে–

—আমি ওকে হেল্প করে দিবো মাম্মা ফ্রেশ হতে। তুমি আমাদের দু’জনের জন্য খাবারের কিছু পাঠিয়ে দিও কাউকে দিয়ে।

হানিয়া মনে মনে হেঁসে উঠে। সে জানত তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে এমন কিছুই বাক্য শুনতে চলেছে সে। আর হলোও তাই।

হানিয়া মেয়েকে আদর করে আশিয়ানের কাছে আসে। আশিয়ানের কপালের উপর পড়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলোকে গুছিয়ে দিয়ে বলে–

—এভাবেই একে অপরের ঢাল হয়ে থেকো সারাটা জীবন। ভালোবাসা, শ্রদ্ধা-সম্মান দিয়ে গড়ে নিও একটা সুখের নীড়। যেটা তোমাদের দুনিয়াতেই জান্নাতের অনুভূতি দিবে।

আশিয়ান স্মিত হেসে মাথা নাড়ায়। হানিয়াও চলে যায় নিচে। আশিয়ান দরজা লক করে নিজের শার্ট খুলতে খুলতে কাবার্ডের কাছে চলে যায়। সেখান থেকে হায়া’র একসুট ড্রেস বের করে সেটা ওয়াশরুমে রেখে আসে৷ তারপর আসে হায়া’র কাছে । তার কাছে এসে আস্তে করে হায়া’কে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটা দেয় ওয়াশরুমের দিকে।

হায়া একহাত দিয়ে আশিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে একধ্যানে তাকিয়ে থাকে তার বরের দিকে। লোকটাকে সে এখনো প্রচন্ড ভালোবাসে। কিন্তু প্রকাশ করতে এক আকাশ সমান দ্বিধা, অস্বস্তি ও অভিমান।
পূর্ব প্রথমে অনুভূতি প্রকাশ করে বাজে ভাবে প্রত্যাখ্যান পেয়েছিলো।

তার ভাবনা চিন্তার মাঝেই আশিয়ান তাকে ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে বাথটবে বসিয়ে দিয়ে নিজে দাড়িয়ে থাকে। ঠাণ্ডা পানির স্পর্শে হায়ার ধ্যাণ ভঙ্গ হয়। সপ নিজেকে বাথটাবে পেয়ে কিছুটা চমকে গেলেও মুখে কিছু বলে না।

হায়া দেখে আশিয়ান এখনো দাড়িয়ে আছে বাহিরে না গিয়ে। তাই সে স্মিত স্বরে বলে–

—যাচ্ছেন না কেনো বাহিরে? বাহিরে যান।

আশিয়ান গাছাড়া ভাব নিয়ে বলে–

— আমি যাবো না। এখানে দাড়িয়েই তোমায় পাহারা দিবো। এমনিতেই তোমার পায়ে ব্যথা তার উপর শরীর দুর্বল। বাথটাব থেকে উঠতে গিয়ে যদি পড়ে যাও? এসব কথা চিন্তা করেই আমি ভেবেছি যাবো না বাহিরে।

হায়া আশিয়ানের কথা শুনে বড়বড় চোখ করে তাকায়। আশিয়ান যদি এখানে দাড়িয়ে থাকে তাকে সে শাওয়ার নিবে কিভাবে? চেঞ্জই বা করবে কিভাবে? লজ্জা না হার্ট অ্যাটাক করে বসে।

হায়া তড়িঘড়ি করে বলে–

—আমার পায়ে তেমন ব্যথা নেই। আপনি বের হন তাড়াতাড়ি করে।

আশিয়ান বুকে হাত গুঁজে বলে–

—নো ওয়ে। আমি যাচ্ছি না কোথাও।

হায়া করুণ স্বরে বলে–

—প্লিজ আশিয়ান ভাই।

—ভাই বলে ডাকলে তো আরো আগে যাবো না। বরং বাথটবে আমিও আসছি তোমাকে কোম্পানি দিতে। লজ্জা করে না বরকে ভাই বলে ডাকতে। কাল আমাদের বাবু হলে সে তো আমায় মামা বলে ডাকবে তোমার জন্য।

আশিয়ান ভর্ৎসনা করে কথাগুলো বলে হায়া’কে। হায়া’র একটু রাগ হয় তার ভর্ৎসনা শুনে। সে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে–

—ভালোবাসাবাসির খবর নেই সে চলে গিয়েছে বাবু তে। আপনার কথা শুনলে মনে হয় এই বাথটবের পানিতেই চুবনি দিয়ে নিজেকে শহীদ করে দেই।

আশিয়ানের কুঁচকানো ভ্রূদ্বয় সোজা হয়ে যায়। হালকা পাতলা রাগের দেখা পাওয়া চোখজোড়াতও অদ্ভুত এক শীতলতা নেমে আসে। পুরুষালী ঠোঁটের কোণে দেখা দেয় এক ভালোলাগার ছোঁয়া।

আশিয়ান হায়া’র কথা শুনে নিজের একটা হাত বাথটবের উপর রেখে হায়া’র মুখের উপর ঝুঁকে আসে। নিজের মুখটা হায়া’র কানের কাছে নিয়ে গিয়ে ফিসফিসিয়ে হাস্কি টোনে বলে–

—❝আমি তো সদাই প্রস্তুত—তোমাকে আমার ভালোবাসায় নিঃশেষ করতে,
শুধু চেয়ে আছি তোমার একটিমাত্র সম্মতির দিকে।
তারপর এমনভাবে আবৃত করব তোমায় ভালোবাসার মায়াজালে,
তুমি নিজেই আমাতে হারিয়ে যেতে চাইবে বারবারে ❞

আশিয়ানের এমন নেশাক্ত গলায় লাগামহীন কথা শুনে হায়া’র লজ্জায় জান যায় যায় অবস্থা। সে ঝট করে নিজেকে বাথটবের পানিতে ডুবিয়ে দেয়। আশিয়ানের তার লজ্জা বুঝতে পেরে উচ্চস্বরে হাহা করে হেসে দেয়।

তারপর ওয়াশরুম থেকে বের হতে হতে বলে–

—তাড়াতাড়ি শাওয়ার নাও। ঠাণ্ডা লাগালে তার প্রতিষেধক হিসেবে আমাকেই গ্রহণ করতে হবে কিন্তু।

~চলবে?

[কিছু শারীরিক অসুস্থতা আর পেইজের অবস্থা দেখে লেখালেখি থেকে অবসরে যেতে মন চাইছে। হয়ত খুব শীঘ্রই তাই হতে চলেছে।

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স🎀🖤]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here