#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_১১
ভার্সিটি যাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে তাও মেয়ে রুম থেকে বের হচ্ছে না দেখে মুনতাহা বেগম মেয়ের রুমের সামনে এসে উপস্থিত হলেন। উদ্দেশ্য মেয়েকে ডেকে তুলে ভার্সিটিতে পাঠানো। মুনহাতা পরপর কয়েকবার মেয়ের দরজায় কড়াঘাত করলেও তার মেয়ে দরজা খুলেন না। একপর্যায়ে জোরে জোরে দরজায় হাত দিয়ে বারি দিতে থাকেন আর মেয়ের নাম ধরে ডাকতে থাকেন–
—রাহা! এই রাহা! দরজা খুলছিস না কেন মা? ভার্সিটিতে যাবি না আজ? দরজা খুল।
এমন আরো বহু কথা বলে মেয়েকে ডাকতে থাকেন। কিন্তু রাহা তার ডাকে কোন সারা দেয় না। মুনতাহা বেগমের গলার আওয়াজে তার স্বামী রাহাত ও কলেজ পড়ুয়া ছেলে রায়হান নিজেদের রুম থেকে বের হয়ে আসে। যদিও তারা দু’জন নিজেদের গন্তব্যে যাওয়ার জন্য ঘরে থেকে বের হচ্ছিল, কিন্তু মিসেস চৌধুরীর এমন চিৎকার করা শুনে তারা রাহা’র রুমের সামনে আসেন।
রায়হান তার মা’কে জিজ্ঞেস করে–
—মা, কি হয়েছে? তুমি আপুর ঘরের দরজায় এত জোরে জোরে আওয়াজ করছো কেনো?
রাহাতও স্ত্রীকে একই প্রশ্ন করে। মুনতাহা তাদের আদ্র গলায় জবাব দেয়–
—কাল ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরে সেই যে ঘরের দোর দিয়েছে, রাতের খাবার টাও খায় নি। সকালে ও ভার্সিটির সময় হয়ে যাচ্ছিল দেখে এসে ডাকা শুরু করি কিন্তু এত ডাকার পরও রাহা দরজা খুলছে না।
কথাটা বলতে বলতে ভদ্রমহিলা ঝরঝরিয়ে কেঁদে দেন। রাহাত প্রাণপ্রিয় সন্তানের এমন কথা শুনে অস্থির হয়ে যায়। মুনতাহাকে ধমক দিয়ে বলে–
—রাহা যে কাল থেকে এমন অদ্ভুত আচরণ করছে সেই কথা আমায় কাল রাতে জানাতে পারলে না? মেয়েটা কাল রাতে খায় ও নি। এত কাণ্ডজ্ঞানহীন কি করে হতে পারে একজন মা আমি বুঝে পারি না। সরো দরজার সামনে থেকে।
রাহাত ভীষণ রুঢ়ভাবে কথা গুলো বলে মুনতাহাকে। মুনতাহা বেগম শাড়ির আঁচলে মুখ গুঁজে পেছনে সরে যায়। রাহাত রাহা’র দরজার সামনে এসে বেশ কয়েকবার কড়াঘাত করে কিন্তু রাহা এবারও কোন জবাব দেয় না। সে এবার রায়হানকে উদ্দেশ্য করে বলে–
—দরজা ভাঙতে হবে মনে হচ্ছে। রায়হান তুমি আমার সাথে কাঁধ মেলাও।
রায়হান মা’কে আরেকটু দূরে দাড় করিয়ে দিয়ে বাবার সাথে কাঁধ মিলিয়ে রাহার রুমের দরজা ভাঙতে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই দরজা ভেঙে তার রুমে প্রবেশ করে। তারা রুমে প্রবেশ করে দেখতে পায় রুমে অবস্থা ভীষণই করুণ। একটা জিনিসও আস্ত নেই রুমের।
সাথে এ-ও দেখতে পান তাদের মেয়ে ফ্লোরে অজ্ঞান হয়ে পরে আছে। মুনতাহা দৌড়ে মেয়ের কাছে গিয়ে মাথার সমীপে বসে পরে। মেয়ের মাথা নিজের কোলে তুলে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ডাকতে থাকে–
—রাহা! ও রাহা! মা আমার! চোখ খুল মা। কি হয়েছে তোর?
রাহাত ও রায়হানও কয়েকবার রাহা’কে ডাকে কিন্তু রাহা যে অজ্ঞান। রাহাত মুনতাহাকে বলে–
—ওকে আমার কাছে দাও। আমি বেডে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিচ্ছি।
মুনতাহা স্বামীর কথা মতো মেয়েকে তার দিকে বাড়িয়ে দিলে রাহাত তাঁকে কোলে তুলে বেডে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দেয়। তারপর রাহার হাত-পা চেক করে দেখে ঠাণ্ডা হয়ে বরফ হয়ে গিয়েছে। সে রায়হানকে বলে–
—তোমার ডাক্তার আঙ্কেলকে ফোন করে তালে আমাদের বাসায় আসতে বলো যত তাড়াতাড়ি সম।আর তুমি (মুনতাহাকে উদ্দেশ্য করে বলে) তেল গরম করে নিয়ে আসো। হাত-পা প্রচন্ড ঠাণ্ডা হয়ে পরেছে রাহার।
রায়হান আর মুনতাহা নিজেদের কাজে লেগে পরে। মুনতাহা সরিষার তেল গরম করে নিয়ে এসে মেয়ের হাত-পায়ের তালুতে মালিশ করে দিতে থাকে আর রায়হান তাদের ফ্যামিলি ডা.কে ফোন করে তাদের বাসায় আসতে বলে দেয়।
ডাক্তার আসার পূর্বেই রাহার জ্ঞান ফিরে আসে কিন্তু দূর্বলতার কারণে কিছু বলতে পারছে না। ডা. তার চেক-আপ করে জানান–
—বিপি প্রচন্ড লো। খাওয়া-দাওয়াও ঠিক মনে করে না দেখা যাচ্ছে। আর যা বুঝতে পারছি শারীরিক অসুস্থতার থেকে ও মানসিক ভাবে কোন কাজে ভীষণ ডিস্টার্ব। প্রোপার কেয়ার না করলে যেকোন সময় বড় কিছু ঘটে যেতে পারে। আমি ঔষধ লিখে দিয়ে যাচ্ছি সেগুলো রেগুলার খাওয়ান আর ওর মানসিক অবসাদ দূর করার চেষ্টা করুন।
কথাগুলো মুনতহানা ও রাহাতের উদ্দেশ্য বলে ডাক্তার। তারপর কিছু ঔষধ প্রেসক্রাইব করে দিয়ে চলে যান। রাহাত রায়হানকে ঔষধ গুলল পাঠিয়ে দিয়ে মুনতাহাকে রাহার জন্য খাবার আনতে পাঠিয়ে দেন।
মুনতাহা বেগম রাহার জন্য খাবার নিয়ে এসে রুমে ঢুকতে ঢুকতে শুনেন,, রাহাত বলছে–
—তুমি আজ পর্যন্ত যা চেয়েছো পাপা তাই তোমাকে এনে দিয়েছে। এবারও তাই হবে। তুমি খাওয়াদাওয়া করে নিজেকে ফিট করে তুলো, সামনে যে গ্র্যান্ড অনুষ্ঠান আছে।
রাহা তার একটা হাত দিয়ে বাবার ডান হাত ধরে উঁচু করে সেটায় চুম্বন করে অসুস্থ গলায় বলে–
—আই লাভ ইউ পাপা। ইউ আর দ্যা বেস্ট পাপা ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড।
রাহাতও মেয়ের কপালে স্নেহের পরশ দিয়ে বলে–
—পাপা অলসো লাভ ইউ মাই প্রিন্সেস।
মুনতাহা তাদের কথার কিছুই বুঝে না আর না সেই বিষয়ে তেমন একটা মাথা ঘামায়। সে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে–
—হ্যাঁ, সব ভালোবাসা তো পাপার জন্যই। মাম্মা তো বানের জলে ভেসে এসেছে না। থাক আমার কাউকে ভালোবাসা লাগবে না। যখন মাম্মা আকাশের স্টার হয়ে যাবো তখন ভালোবাসার জন্য আমায় খুঁজো।
রাহাত হাসি মুখে মুনতাহার সবটা কথা শুনলেও শেষের কথাটা তার কেন জানি ভালো লাগে না। নিমিষেই তার হাসি হাসি মুখটা গম্ভীর্যতার আড়ালে ঢেকে পরে। মুনতাহা খাবারের প্লেট নিয়ে এসে তাদের সম্মুখে দাঁড়ালে রাহাত তার জায়গা ছেড়ে উঠো গিয়ে সেখানে মুনতাহাকে বসার জন্য জায়গা করে দেয়। মুনতাহা মেয়েকে আস্তে করে বসিয়ে দিয়ে তাকে খাইয়ে দিতে থাকে। রাহাত তাদের থেকে বিদায় নিয়ে নিজের অফিসে চলে যায়।
________________
আশিয়ান ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাড়িয়ে টাই বাঁধতে বাঁধতে আয়নার মাধ্যমে হায়া’কে দেখছে যাকে কিনা তারই ফুফিরূপী শ্বাশুড়ি খাইয়ে দিচ্ছে।
টাই বাঁধা শেষ করে চুলে চিরুনি ব্রাশ করতে করতে হায়া’র খাওয়া হয়ে যায়। হানিয়া তাড়াতাড়ি করে হায়া’কে ঔষধগুলো খাইয়ে দিয়ে হুড়মুড়িয়ে ঘরে থেকে বের হয়ে যায়। বাহিরে যাওয়ার আগে মেয়ে আর তার জামাইকে পারসোনাল স্পেস দিয়ে যায়। সে আড়চোখে খেয়াল করছিলো আশিয়ান তার কাজগুলো আস্তে ধীরে করছিলো।
শ্বাশুড়ি চলে যাওয়ায় আশিয়ান কিছুটা খুশি হয় বটে। সে সম্পূর্ণ রেডি হয়ে হায়া’র সামনে এসে দাড়ায়। বেডসাইড টেবিল থেকে ফোনটা তুলে পকেট ভরে হায়া’র দুই গাল চেপে ধরে টুপ করে তার ললাটে চুম্বন করে। তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে–
—ভালো মেয়ের থাকবে।সময় করে খাওয়াদাওয়া করবে আর ঔষধ খাবে। আর কতগুলো পড়া দিয়ে যাচ্ছি, অবসর সময়ে সেগুলো শেষ করেন রাখবে। আমি এসে ধরবো। মনে থাকবে?
হায়া বুঝি এত বাধ্য? সে চটপট করে বলে–
—না। আমি অসুস্থ না, তাহলে পড়বো কেন? নো পড়াশোনা, অনলি রেস্ট।
আশিয়ান চোখ গরম করে বলে–
—টেনে দেবো এক থাপ্পড় যদি কথা না শুনো। যা বলেছি তাই করবে।
হায়া ভেঙচি কেটে বলে–
—এহহহহহহ, আমার বাবা এখন আমার কাছে আছে। আপনি আমায় থাপ্পড় মারলে আমিও বাবার সাথে চলো যাবো। তখন আপনি হাত পা ছড়িয়ে কান্না করেন।
—কথাটা ফানি ছিলো কিন্তু আমার হাসি পেলো না। দাঁড়াও আমি বাবাইকে বলে যাবো, তারপর সেই তোমাকে ঘাড় ধরে পড়াবে। কাল ঝাড়ি খেয়েও লজ্জা হয়নি।
আশিয়ান হায়া’র মুখের উপর কিছুটা ঝুকে ছিলো। হায়া তার কথা শুনে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে নিজের সামনে থেকে সরিয়ে দিয়ে বলে–
—যান তো অসভ্য লোক। শুধু ঝগড়া করার পায়তারা।
আশিয়ান হাত ঘড়িয়ে তাকালে দেখে তার ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে। আশিয়ান হায়া’কে জ্বালানোর জন্য একটা শক্তপোক্ত চিমটি কেটে তার ল্যাপটপ ব্যাগ নিয়ে পগারপার। হায়ার পায়ে ব্যথা থাকায় সে সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে আশিয়ানের পিছু নিতে পারে না৷ তাই সেখানেই বসে চেঁচিয়ে বলে–
—সামনে পাই একবার। খামচে যদি আপনার চেহারা আফগানিস্তানের রিলিফ ম্যাপ না বানিয়ে দিয়েছি তাহলে আমার নামও জেসমিন তালুকদার হায়া না।
~চলবে?
[এত ছোট করে দেওয়ার জন্য দুঃখিত। আজ কিছুটা ব্যস্ততার জন্য ছোট হয়ে গেলো। কাল ইনশা আল্লাহ বড় করে দেওয়ার চেষ্টা করবো।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স 🤍]

