#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৫৭
আশিয়ান ফ্রেশ হয়ে বের তারা দু’জন নিচে নেমে আসে। ড্রয়িংরুমে প্রতিদিনকার ন্যায় আজও শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সাথে সন্ধ্যার নাস্তার পর্ব সাড়ে হায়া। যদিও অন্যান্য দিনের থেকে একটু ব্যতিক্রম রয়েছে। আজ আশিয়ান বিকালেই চলে এসেছে। হায়া খেয়াল করে আবরার কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে আছে। কখনো একধ্যানে চায়ের কাপ টার দিকে তাকিয়ে আছে তো, কখনো বড় বড় করে শ্বাস ফেলছে। তার এই শ্বাসের সাথে কত হতাশা ও ক্লান্তি মন থেকে বের করে দিতে চাইছে সে, সেটা হায়ার বুঝতে বাকি থাকে না।
হায়া না পারতে জিজ্ঞেসই করে ফেলে–
—বাবাই, কি হয়েছে তোমার? আজ তোমাকে এমন লাগছে কেনো? টেনসড লাগছে তোমায়।
হায়ার হঠাৎ প্রশ্নে আবরার খানিকটা হকচকিয়ে যায়। আশিয়ানও বাবার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি স্থাপন করে। স্পর্শের বুঝতে বাকি থাকে না আবরার কি নিয়ে চিন্তায় বিভোর। আবরার হায়ার প্রশ্নের কোন উত্তর দিচ্ছে না দেখে হায়া আবারও একই প্রশ্ন করে উঠে। হায়ার বারবার জিজ্ঞেস করায় আবরার বলেই দেয়–
—আশিয়ানের দাদাভাই অসুস্থ। হসপিটালে ভর্তি করানো হয়েছে কাল তাকে।
আবরারের কথাটা শুনে হায়া ও আশিয়ান দু’জনই বেশ চমকে যায়। বিশেষ করে আশিয়ান। তার দাদাভাই অসুস্থ বিষয়টা আজই সে জানতে পারল। হায়া অস্থির গলায় সুধায়–
—কি হয়েছে নানাভাইয়ের বাবাই? পরশুও তো কথা বললাম, তখন তো মনে হলো না হসপিটালে ভর্তি করানোর মতো এত অসুস্থ।
—কাল ফজরের সময় অজু করতে গিয়ে ওয়াশরুমে পড়ে গিয়ে বাম পায়ে চোট পেয়েছে। তোমার নানুমনি ওয়াশরুম থেকে জোড়ালো আওয়াজ পেয়ে গিয়ে দেখেন বাবার এই অবস্থা। জানোই তো, একজন কেয়ার টেকারের তত্ত্বাবধানে তারা থাকেন। সেই লোকটিও কাল ছুটিতে নিজের বাড়িতে গিয়েছিল। তোমার নানুমনি পাশের বাড়ির রহিম চাচাদের সহায়তায় তোমার নানাভাইকে হসপিটালে নিয়ে যায়। পা’টা ভে”ঙে না গেলেও অনেকটা সেই পর্যায়েই চলে গিয়েছে। সেই সাথে নাকি হার্টের ব্যথাও বেড়েছে। আমাদের গ্রামে সবচেয়ে উন্নত হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয় আমার নির্দেশে কিন্তু সেখানকার চিকিৎসা শহরের মতো এতটা উন্নত হয়নি। ডাক্তাররা বলেছেন, ঢাকায় এনে অন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা করাতে, নাহলে থার্ড টাইম হার্ট অ্যা”টাক হতে পারে যেকোন সময়।
শেষের কথাটা বলতে বলতে আবরারের গলা ধরে আসে। একসময় তার বাবা তাকে আর তার বোনকে সীমাহীন ক”ষ্টের সাগরে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু আজ সে বাবা হয়ে বুঝতে পারছে, বাবা শব্দটা অর্থ কি। খারাপ হোক, ভালো হোক, সুস্থ হোক, অসুস্থ হোক বাবা বেঁচে আছেন এটাই সন্তানদের জন্য অনেক বড় কিছু। বাবারা তো সেই বটগাছের মতো, যে নিজে সূর্যের প্রখর তাপে শুকিয়ে যেতে প্রস্তুত কিন্তু তার ছায়াতলে থাকা অন্যদের বিন্দু মাত্র ক”ষ্ট দিতে রাজি না।
আশিয়ান বেশ চিন্তিত হয়ে যায় তার দাদাভাইয়ের শরীরের কন্ডিশন শুনে। সে উৎকণ্ঠিত গলায় বলে–
—তাহলে বাবা দাদাভাইকে ঢাকায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা করছো না কেনো? এভাবে হেলায় রেখে দিলে পরিস্থিতি হাতের বাহিরে চলে যাবে যে।
আবরার এবার বেশ রে”গে গিয়েই বলে–
—তুমি জানো না কেন ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করছি না?
বাবার হঠাৎ রাগ দেখে আশিয়ান চমকে যায়। কিন্তু সেই সাথে এটাও মনে পড়ে যায় কেন তার বাবা তার দাদাকে ঢাকায় আনছে না। মূলত মি.মির্জার একটা জেদের কারণেই তাকে ঢাকায় আনা যাচ্ছে না। হায়াকে বিয়ের আসরে রেখে আশিয়ানের লন্ডনে চলে যাওয়ায় মি.মির্জা ভীষণ কষ্ট পায়। বিয়ে করবে না সেটা আশিয়ান নিজেই বলতে পারত তাকে, সে না হয় তার ছেলেকে বুঝাত বিষয়টা। কিন্তু এভাবে একটা মেয়েকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পালিয়ে যাওয়াটা কতটা ঘৃ”ণ্য একটা কাজ সেটা আশিয়ান তখন অনুভব করতে পারে নি। আশিয়ান চলে যাওয়ায় সবাই যখন হায়াকে নানান লথা শোনাচ্ছিল, তখন হায়া বেশ ভে”ঙে পড়ে।
চঞ্চল, উড়ন্ত পাখিটা প্রচন্ড এক ধাক্কা খেয়ে একদম নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তখন প্রিয় নাতনীর এমন অবস্থার জন্য মি. মির্জা নিজেকেই দোষী ভাবতে শুরু করে। এদিকে মেয়ের এমন অবস্থা দেখে জাভিয়ানও হার্ট অ্যাটাক করে বসে। করতে চাইল সকলের ভালো, ভালো তো কিছুই হলো না বরংচ মেয়ের স্বামী ও সন্তানের জীবন নিয়ে টানাটানি লেগে গেলো। এসব সহ্য করতে না পেরে মি.মির্জাও হার্ট অ্যা”টাক করে বসেন। কি দুর্বি”ষহ ছিল সেই দিনগুলো! হায়া নিজের শোক ভুলে গিয়ে পরিবারের দিকে নজর দেয়। একজনের দেওয়া কষ্টে জন্য সে তার অন্য ভালোবাসার মানুষগুলোকে অপ”রাধী বানিয়ে ফেলছে। বিষয়টা অনুধাবন করতে পেরে হায়া আশিয়ানের কথা ভুলে যেতে চায়। কিন্তু প্রথম অনুভূতির জোগানদাতাকে কি এতই সহজ?
হায়া তার পরিবারের জন্য আস্তে আস্তে আগের মতো হয়ে যায়। হায়াকে স্বাভাবিক হতে দেখে সকলের মন থেকে দুঃশ্চিতার বোঝা কিছুটা কমে,কিন্তু পুরোপুরি যায় না। জাভিয়ানের শরীর হার্ট অ্যাটাকের ধাক্কা সয়ে গেলেও, বৃদ্ধ মির্জা সাহেব প্রায় এক বছরের মতো অসুস্থ ছিলেন। এরপর কিছুটা সুস্থ হতেই সে এক অদ্ভুত জেদ ধরে। সে জানায়, নিজের জীবনের বাকিটা সময় তিনি তার পৈতৃক ভিটায় কাটাতে চায়। সকলে এক বাক্যে মানা করে দেয় তাকে। মানা করবেই না কেনো? গ্রামের বাড়িতে তাদের তেমন কোন আত্মীয়ই তখন থাকে না। তারা হয় বেশিরভাগ ঢাকায় চলে এসেছে, নাহয় অন্য জেলায় সিফট করে ফেলেছে। সকলের অনেক বুঝানোর পরও মি.মির্জা রাজি হয় না। সে গ্রামেই থাকবেন। আসলে সে তখনও হায়ার অপ””মানের কারণ হিসেবে নিজেকেই দায়ী মানতে। সে যদি প্রস্তাবটা না রাখত তাহলে সকলে হয়ত এত তোড়জোড় করত না হায়া ও আশিয়ানের বিয়ের। এই কারণে নিজেকে শাস্তি দেওয়ার জন্য তিনি এই বয়সে এসে সন্তান ও নাতি-নাতনীদের সাথে দূরত্ব বাড়িয়ে দেন। স্ত্রীকে অবশ্য ঢাকাই থাকতে বলেছিলেন, কিন্তু মিসেস মির্জা থাকেন নি।
মি.মির্জার জেদের সাথে না পেরে সকলে রাজি হয়ে যায়। তাদের সাথে গ্রামের বাড়িতে থাকার জন্য আবরার ২৪/৭ জন্য একজন কেয়ার টেকারের ব্যবস্থা করেন। তাদের পাশের বাড়িতে মি.মির্জার দূরসম্পর্কের এক ভাই থাকেন পরিবার সহ, তাকেও দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে এসেছেন।
আবরার এই কয়েক বছরে কম চেষ্টা করেনি মি. এন্ড মিসেস মির্জাকে ঢাকায় নিয়ে আসার কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছেন। এক পর্যায়ে সব চেষ্টা থামিয়ে দেন তারা। কিন্তু আজ বাবার অসুস্থতায় আবরার বিচলিত হয়ে পড়েছে, স্বাভাবিকভাবেই বাবা-মা অসুস্থ হলে সন্তানরা বিচলিত হয়ে পড়ে।
ড্রয়িংরুমে পিনপতন নীরবতায় ছেয়ে রয়েছে। কেউ কিছু বলছে না, শুধু তাদের নিরবতাই অনেক কিছু বলে যাচ্ছে চুপিচুপি। হায়া ও স্পর্শ বরাবরের মতো স্বামীদের মতামত জানার জন্য চুপ করে অপেক্ষা করছে। আবরার কিছুটা ক্ষি”প্ত ও ব্যথিত নয়নে আশিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। আর আশিয়ান, সে অপরাধীর ন্যায় নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
কিছুক্ষণ পর আবরার বুকে কষ্ট নিয়েই উঠে দাঁড়ায় বসা থেকে, উদ্দেশ্য রুমে যাওয়া। হঠাৎই নিস্তব্ধতার দেওয়াল ভঙ্গ করে আশিয়ান বলে উঠে–
—আমি যাবো। আমি গিয়ে দাদাভাই ও দাদুমনিকে ফিরিয়ে আনব। যেই ভুলটা করেছি তার জন্য অনেক আগেই ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল আমার, কিন্তু আর নয়। বাবা, তুমি আর আম্মু কালই গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যাও। আমি ভার্সিটি থেকে ছুটি নিয়ে হায়াকেসহ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, গ্রামে যাবো। আমার বিশ্বাস, আমি গিয়ে বললে দাদাভাই আর রাগ করে থাকতে পারবে না সেখানে।
আশিয়ানের কথা শুনে উপস্থিত বাকি তিনজন কথা বলতে ভুলে যায়। হায়া আর স্পর্শের চোখেমুখে খুশির ঝলক দেখা দেয়। আবরার কতক্ষণ হা করে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখের কোণেও কেমন চিকচিক করছে। বুঝাই যাচ্ছে কাঙ্ক্ষিত কথাগুলো শুনতে পেয়ে তার চোখ আপনাআপনিই অশ্রুতে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। সে নিজের অশ্রু লুকাতে তটস্থ পায়ে হেঁটে জায়গা ত্যাগ করে।
স্পর্শ এগিয়ে এসে ছেলের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দেয়। তারপর সেও রুমের উদ্দেশ্য রওনা হয়। কাল সকাল সকাল রওনা হতে হবে গ্রামের উদ্দেশ্য, তাই তো এখনই সব গুছাগাছ করতে হবে।
_________________________
আজ রাহার ঘুম ভাঙে একটা কোমল গলার আওয়াজে। গলার মালিক খুব সাবধানে আস্তে ধীরে তাঁকে ডাকছে ঘুম থেকে ওঠানোর জন্য। কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পর রাহা ঘুমটা ভে”ঙে যায় ঠিকই কিন্তু সে চোখ মেলে তাকায় না। লোকটাকে একটু শায়েস্তা করার স্বাদ জেগেছে মনে। রাহার এমন একটা ভান করে যেনো সে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। হালকা একটু নড়াচড়া করে আবারও ঘুমানোর ভান করে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। রাহা মনে মনে ভাবে, আজ দেখবে আফিফের ধৈর্য শক্তি কত।
এদিকে আফিফ রাহাকে ডেকে ডেকে অস্থির। অন্যদিন হলে এত ডাকাডাকি মোটেই করত না, বরং বউকে বুকে নিয়ে সেও ঘুমিয়ে থাকত। কিন্তু আজ যে একটা জিনিস জানার জন্য তার এত অস্থিরতা। কাল সারারাত কেমন ছাড়া ছাড়া ঘুম হয়েছে। এমনটা তার সাথে তখনই হয় যখন সে কোন বিষয় নিয়ে অনেক এক্সাইটেড, অথবা কোন বিষয় নিয়ে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত। আফিফের বর্তমানে এমন কোন বিষয় নেই যেটা নিয়ে দুঃশ্চিন্তিত হয়ে রাত জেগে থাকবে। তাহলে বাকি থাকে এক্সাইটমেন্টের বিষয়টা। কাঙ্ক্ষিত সংবাদটা শোনার জন্য সে সেই ফজরের সময় নামাজ পড়তে গিয়েই পরিচিত এক ফার্মাসিস্টের দোকান খুলিয়ে কিট নিয়ে এসেছে।
হ্যাঁ, সে ধারণা করছে তাদের ঘর আলো করে একটা নতুন প্রাণ আসতে চলেছে। কাল যখন রাহার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পর যখন সে তার ব্লাডপ্রেশার, পালস রেট, হার্টবিট চেক করে তখনই আফিফের কিছুটা সন্দেহ হয়। কিন্তু সে সিউর হয়ে সবাইকে জানাতে চেয়েছে।
আফিফ তার ছোট ছোট চোখ গুলো আরেকটু ছোট করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে রাহার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পরই সে বুঝতে পারে রাহার ঘুম ভেঙে গিয়ে আর সে তার সাথে দুষ্টুমি করছে। রাহার চোখের পাতা হালকা হালকা করে নড়ছে। আফিফ রাহার এই ঘুমের নাটক ভাঙানোর জন্য রাহার নাক টিপে ধরে। রাহা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায় সে ঝট করে চোখ মেলে বড় বড় করে তাকায়। সে চোখ মেলে তাকাতেই আফিফ তার টিপে ধরা নাক ছেড়ে দেয়। তারপর মিটমিট লরে হাসতে থাকে।
রাহা ধরা তো পরে ঠিকই কিন্তু সে নিজের দুষ্টুমি স্বীকার করতে নারাজ। সে রাগী রাগী ভাব নিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে। তারপর মেকি ধমকের সুরে বলে–
—একজন ঘুমন্ত মানুষের নাক টিপে ধরা কোন ধরণের ফাজলামি ডাক্তার সাহেব? আপনি না ডাক্তার, একজন ডাক্তার হয়ে আপনি সাধারণ একজন মানুষকে পটোলের ক্ষেতে পাঠাতে চাচ্ছিলেন?
আফিফ রাহার এমন ধমকে কথা বলায় একটুও রা”গ করে না, বরং সে হাত বাড়িয়ে রাহার কপালে ও চোখের আশেপাশে পড়ে থাকা কিছু চুল কানের পিঠে গুঁজে দিতে দিতে বলে–
—আপনি সজাগ থাকা সত্ত্বেও ঘুমের ভান করে ছিলেন কেন, মিসেস ডাক্তার সাহেব? এটা কোম ধরণের ফাজলামি?
রাহা ধরা খেয়ে যায়। কিন্তু সে এত তাড়াতাড়ি হেরে যাওয়ার পাবলিক না। তাই সে নিজের পক্ষে সাফাই দিয়ে বলে–
—কি বলছেন আপনি এসব? আমি ঘুমের ভান করে থাকব কেনো? আমি সত্যি সত্যিই ঘুমচ্ছিলাম। ইশশশ, রে আপনি আমার এত সুন্দর ঘুমটার বারোটা বাজিয়ে দিলেন।
—বারোটা বাজালাম কিভাবে? মাত্র তো সাড়ে সাতটা বাজে।
বোকাবোকা গলায় কথাটা বলে আফিফ। রাহা বিরক্ত হয়ে যায় তার কথা শুনে। সে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় কিন্তু তখনই তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলে সে আবারও ধপ করে বেডে বসে যায়। আফিফ অস্থির হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে–
—এই রাহা, কি হয়েছে? খারাপ লাগছে? এভাবে বসলে কেনো?
রাহা তার মাথা চেপে ধরে বলে–
—তেমন কিছু না। কেন যেনো মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল।
আফিফ রাহার সাথে দুষ্টুমিতে মেতে প্রেগ্ন্যাসি টেস্টের কথা ভুলেই গিয়েছিল। সে রাহার বাহু টেনে ধরে নিজে কাছে নিয়ে আসে। তারপর একহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বিছানায় আধশোয়া হয়ে রাহাকে নিজের বুকের উপর শোয়ায়। রাহাও কোন প্রতিবাদ না করে চুপটি করে মিশে থাকে প্রিয় পুরুষের বক্ষে।
কিছুক্ষণ পর আফিফ বেড সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে তিনটা প্রেগ্ন্যাসি টেস্টের কিট বের করে রাহার সামনে ধরে। রাহা কিটের প্যাকেটের উপরে লেখা দেখেই বুঝে যায় এটা কি। সে হতবাক চাহনি নিয়ে আফিফের দিকে তাকায়। আফিফ তার অবাকতা বুঝতে পেরে কোমল গলায় বলে–
—কাল আমি প্রপোজ করার পর অজ্ঞান হয়ে গেলে না, তখন রুমে এনে কিছু চেক-আপ করাই। তখনই আমি কিছু উপসর্গ দেখতে পাই। পুরোপুরি সিউর না হয়ে আমি কাউকে জানাতে চাই নি। তাই তো আজ, ফজরের সময়ই নামাজ পড়তে গিয়ে মোড়ের ওখানের দোকান খুলিয়ে কিটগুলো নিয়ে এসেছি। অপেক্ষায় ছিলাম তোমার ঘুম ভাঙার।
আফিফ কোমল গলায় কথাগুলো বলে।রাহা চুপ করে তার কথাগুলো শুনে। সে মনে মনে হিসাব মিলাতে ব্যস্থ। তাদের একান্ত কাছাকাছি আসার পরের মাস থেকেই তার পিরিয়ড মিস হয়েছে। আজ দুই নাম্বার মাস চলছে। ইদানীং ক্লান্তি, খাবারের প্রতি অনীহা, মাথা ঘুরানো, বমি বমি ভাব সবই তার নিত্য দিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়ে। রাহা এতদিম আফিফের চিন্তায় এতই বিভোর ছিল যে, এসব শারীরিক পরিবর্তনে সে বিন্দুমাত্র খেয়াল করেনি। কিন্তু আজ আফিফের কথা শুনে তারও মনে হচ্ছে খুশির খবর আসতে চলেছে।
রাহার ধ্যান ভঙ্গ হয় আফিফের গলার আওয়াজে। সে বলে–
—যাও সোনাপাখি, আমাকে আর অপেক্ষা করিও না।
রাহা আফিফের কাছ থেকে কিট গুলো নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। আফিফ বসে বসে অপেক্ষা করতে থাকে খুশির সংবাদটি শোনার জন্য।
________________________
আফিফকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করায়নি রাহা। মিনিট পনেরো পরেই সে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসে। হাতের মুঠো কিট গুলো। আফিফ অস্থির হয়ে বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের দরজার সামনে পায়চারী করছিল। রাহা বের হয়ে আসতেই সে তার পায়চারী থামিয়ে দিয়ে তার কাছে এগিয়ে যায়।
আফিফ এগিয়ে আসতেই রাহা তার হাতের মুঠোয় থাকা জিনিসটা এগিয়ে দেয়। বাম হাতটা তার পেটে তখন। আফিফ পরপর তিনটা কিটেই নজর বুলায়। তিনটা লা”ল দাগ ইঙ্গিত করছে তারা খুব শীঘ্রই বাবা-মা হতে চলেছে।
আফিফ যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় কিটটা দেখে। সে চোখ বড় বড় করে একবার প্রেগ্ন্যাসির কিট টার দিকে আরেকবার রাহার দিকে তাকাচ্ছে। ঠোঁট কাঁপছে তার কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু গলায় যেন শব্দ আটকে গেছে।
হঠাৎই তার দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে এলো, শরীর টালমাটাল হলো খানিকটা। তাকে এমন দিলতে দেখে রাহা অস্পষ্ট গলায় বলে—
—আফিফ!!
শব্দটা যেন রাহার গলার ভেতরেই জমে গেল। সে ছুটে গিয়ে ধরতে চাইল, কিন্তু ততক্ষণে আফিফ ধপ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে।
শব্দ সংখ্যা~২০০০
~চলবে?
[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

