#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৩৯
#রেইনি_ডে_স্পেশাল
[গল্পের শেষের কথা গুলো পড়ার অনুরোধ রইলো]
রাহাত আজ অন্যান্য দিনের থেকে একটু আগেই চলে এসেছে। ইদানীং তার মন মেজাজ ভালো যাচ্ছে না। বিয়ের পর থেকে মেয়ের সাথে একদিনের জন্যও কথা হয়নি। এমনটা না সে ফোন করে নি, করেছিল কিন্তু রাহাই ফোন রিসিভ করেনি। সে বুঝতে পারে মেয়ে তার ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। সেও বা কি করত? সব ধরণের চেষ্টা তো করেই ছিলো, কিন্তু লাস্ট মোমেন্টে এসে তার বউ আর জাহান পুরো গেইমটা ঘুরিয়ে দিলো। হ্যাঁ, রাহাত মনে করে মুনতাহার জন্য সে তার মেয়ের ইচ্ছে পূরণ করতে পারেনি। অথচ বোকা রাহাত এটা বুঝে না জাহান যেখানে নিজেই মানা করে দিয়েছিল সে মেহরিমা ব্যতীত আর কাউকে বিয়ে করবে না, সেখানে মুনতাহা বেগমের কিছু বলা না বলায় কি যায় আসে?
সেদিন বিয়ে থেকে এসে রাহাত মুনতাহাকে অনেক খারাপ কথা শোনায়। মুনতাহা তাকে বরাবরের মতোই বিষয়টা বুঝাতে চায়, ছলচাতুরী করে বিয়েটা তাদের হয়ে গেলেও তাদের মেয়ে কোনদিন সুখী হতো না। কিন্তু এবারও বুঝতে চায় না। সে নিজের লজিকে বলে–
—বিয়ে হয়েছে, থাকতে থাকতে একদিন না একদিন ঠিকই মেনে নিতো। ভালোবাসাও তৈরি হয়ে যেতো। কিন্তু তোমার কারণে আমার মেয়ে তার ভালেবাসার মানুষটিকে পেলো না।
মুনতাহা প্রতিউত্তরে বলছিলো–
—আসলেই কি ভালোবাসা হতো? হ্যাঁ, মেনে হয়ত একদিন জাহান নিতো, কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা ভুলে গিয়ে রাহাকে আবারও ভালোবাসতে পারত? কই তুমি তো আজও আমায় ভালোবাসি কথাটা বললে না, আজও তুমি হানিয়াকে বুকের গভীরে সযত্নে লালন করে রেখেছো। যেখানে আমি নামক ব্যক্তিটির অস্তিত্ব টুকু অব্দি নেই।
মুনতাহার এই কথা সহ্য করতে না পেরে রাহাত সব সীমা অতিক্রম করে মুনতাহার গায়ে হাত তুলে। বিয়ের এত গুলো বছরে সেই দিন প্রথমবারের মতো রাহাত মুনতাহার গায়ে হাত তুলেছিল। হানিয়ার কথা তোলায় সে হাতটা তুলেছে মূলত। মুনতাহা নিষ্প্রাণ চোখে রাহাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। থাপ্পড়টা তার গালে না বুকে গিয়ে লেগেছে।
রাহাত থাপ্পড় মেরে নিজেও কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। রাগের মাথায় সে তার স্ত্রী, তার সন্তানদের মা’র গায়ে হাত তুলে ফেলেছে কথাটা মস্তিষ্কে অনুধাবন করতে পেরে রাহাত ঘাবড়ে যায়। হ্যাঁ, সে এই নারীটির সাথে দায়িত্ব নামক সম্পর্ক চালিয়ে এসেছে, নারীটি তার জীবনের সবটা দিয়ে রাহাতকে ভালোবাসলেও রাহাত তার প্রথম ভালোবাসাকে আজও ভুলতে পারে নি। তাই বলে গায়ে হাত দিবে? যেটার কথা রাহাত কল্পনাতেও কোনদিন আনেনি, আজ সেই কাজই নাকি সে করলে ফেললো? লজ্জা, অপরাধবোধে রাহাত সেদিন স্তব্ধ, বিমূঢ় হয়ে সেই স্থান ত্যাগ করে বাহিরে চলে গিয়েছিল।
তারপর থেকেই সে আর মুনতাহা আলাদা রুমে থাকে। মুনতাহা থাকে গেস্টরুমে আর রাহাত নিজের রুমে থাকে। রাহাত তাকে রুমে আসার কথা বললেও সেদিনের থাপ্পড় মারার জন্য একবারও মাফ চায় নি। মুনতাহা তাকে শুধু একটা কথাই বলেছিল–
—যেই মানুষটার সাথে ২৩টা বছর সংসার করেও তার মনে জায়গা করতে পারলাম না, সেখানে তার রুম দিয়ে আমি কি করবো? থাকি না দু’জন দুই রুমে, ভালো থাকার অভিনয়টা দুই রুমে থেকেও খুব সুন্দর ভাবেই চালিয়ে যাবো আমি। এই বিষয়ে তুমি একদম নিশ্চিন্ত থাকো। ছেলেও কিছু টের পাবে না।
রাহাত মুনতাহার কথার প্রতিউত্তরে কিছুই বলতে পারেনি। কোন মুখে বলবে? মুখ তো সে নিজেই খুইয়েছে। মুনতাহা যদিও বলেছিল রায়হান কিছু টের পাবে না কিন্তু সে তো অলরেডি সব জেনে গিয়েছে তাদের অজান্তেই। রাহাত-মুনতানার ঝগড়া, কথা কাটাকাটির সব কিছুই সে শুনেছে আর দেখেছে। তারপর থেকে সে তার বাবাকে প্রচন্ড ঘৃণা করতে শুরু করেছে। পারত পক্ষে কথা বলে না সে তার বাবার সাথে, বাসায় থাকলে বেশিরভাগ সময় মায়ের কাছে থাকে নাহয় নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে বসে থাকে।
খাবারের টেবিলেও কম আসা-যাওয়া হয় তার। রাহাতকে মুনতাহা বেড়ে খাওয়ালেও নিজে ছেলেকে ছাড়া খায় না। রাহাতের খাওয়া শেষ হয়ে যাওয়ার পর মা-ছেলে একসাথে বসে খায়।
__________________________
আজ অফিস থেকে রাহাতকে তাড়াতাড়ি ফিরতে দেখে মুনতাহা একটু অবাকই হয় কিন্তু কোন বাক্যালাপ করে না তার সাথে। আগে এমনটা হলে সে রাহাতকে প্রশ্ন করতে করতে মাথা খারাপ করে দিতো। কি হয়েছে আপনার? তাড়াতাড়ি আসলেন যে? শরীর খারাপ লাগছে? মাথা ব্যথা করছে? এক প্রকার অস্থির হয়ে নিজের প্রেশারই বাড়িয়ে ফেলত। রাহাত বরাবরই তেমন একটা গুরুত্ব দিতো না মুনতাহার এমন কেয়ার। কিন্তু আজ মুনতাহা কিছু জিজ্ঞেস না করায় তার মনটা কেমন খচখচ করছে।
রাহাত আঁড়চোখে মুনতাহাকে একবার দেখে হনহনিয়ে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। যাওয়ার আগে উঁচু গলায় বলে যায়–
—এক কাপ কফি লাগবে, মাথা ধরেছে আমার।
মুনতাহা রাহাতের মাথা ধরেছে শুনেও তার কাছে যায় না। কেন জানি আগের মতো টান আসে না রাহাতের প্রতি তার। মুনতাহা চুপচাপ কফি তৈরি করে দিয়ে হেল্পিং হ্যান্ডকে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে রাতের রান্নার ব্যবস্থা করতে থাকে।
এদিকে রাহাত চটপট ফ্রেশ হয়ে এসে বসে বসে ভাবতে থাকে সেদিনের ওমন কাজের জন্য সে মুনতাহার কাছে ক্ষমা চাইবে। নিজের স্ত্রী’ই তো, তার কাছে ক্ষমা চাইতে গিয়ে এত ইগো কীসের? বয়স হয়েছে তাদের এখন, এখন বউয়ের এমন কলিকা জ্বলানো অভিমান কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না রাহাতের। সে মুনতাহার সাথে শুধু দায়িত্বের খাতিরে সংসার করছে এমনটা না। কিন্তু তাকে যে ভালোও বাসে না এটাও রাত-দিনের মতো ধ্রুব সত্য। সে অনেক চেষ্টা করেছে মুনতাহাকে ভালোবাসতে কিন্তু সে বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে।
মাঝে মাঝে এটা বলেও নিজেকে বুঝিয়েছে “যাকে এত ভালোবেসে আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসতে পারছি না, সে তো ঠিকই তার ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে সুখের সংসার করছে, তাহলে আমি কোন ভিত্তিতে আমার স্ত্রীকে দূরে সরিয়ে রাখছি? কেন তাকে ভালোবাসতে পারছি না? নিজেকে নিজেই সহস্রবার প্রশ্ন গুলো করেছে রাহাত কিন্তু উত্তর মেলেনি তার।
তার ভাবনা গুলোর মাঝেই দরজায় নক পড়ে। রাহাত একটু অবাক হয় নক করায়। এত বছর এই ঘরেই তো মুনতাহার রাজ ছিলো, আর আজ সেই ঘরেই প্রবেশের জন্য সে রাহাতের পারমিশন নিচ্ছে? বিষয়টা রাহাতকে ভীষণ আহত করে। রাহাত গলার স্বর বাড়িয়ে বলে–
—আসো, তোমার ঘরে প্রবেশের জন্য আমার অনুমতি লাগবে না মুন।
কথাটা শেষ করার সাথে সাথেই হেল্পিং হ্যান্ড মহিলাটি রুমে প্রবেশ করে। তাকে কফি নিয়ে আসতে দেখে রাহাত যেমন চমকে যায় তেমনি কষ্ট পায়। এতটা কঠোরতা সে মুনতাহার কাছে আশা করেনি। হেল্পিং হ্যান্ড মহিলা বলে–
—স্যার নেন আপনার কপি।
মহিলাটির কথায় রাহাতের ধ্যান ভঙ্গ হয়। সে গম্ভীর গলায় বলে–
—আপনার ম্যাম কোথায়? আপনি আসলেন যে?
—ম্যাডাম তো ডিনারের জন্য ব্যবস্থা করতাছে।
—ওহহ্।
কথাটা শুনে রাহাতের মনটা খারাপ হয়ে যায়। রাহাত অসুস্থ শুনেও মুনতাহা তাকে দেখতে আসল না, বিষয়টা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। সে হেল্পিং হ্যান্ড মহিলা টিকে বলে–
—আমার কফি লাগবে না। আপনি নিয়ে যান।
মহিলাটি রাহাতের কথা মতো কফিটা নিয়ে যায়। এদিকে রাহাত মন খারাপ করে কাউচেই বসে থাকে। দশ কি পনেরো মিনিট পর হঠাৎই নিচ থেকে চিৎকার চেঁচামিচির আওয়াজ শোনা যায়। তার মিনিট খানেক পর হেল্পিং হ্যান্ড মহিলাটি দৌড়ে রাহাতের রুমে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে বলে–
—স্যার, শীগগির নিচে চলেন। ম্যাডাম অজ্ঞান হইয়া গেছে।
—কিহ্হ্হ? কি হয়েছে মুনের?
কথাটা জিজ্ঞেস তো করে ঠিকই রাহাত কিন্তু উত্তর শোনার অপেক্ষা করে না আর। দৌড়ে নিচে এসে কিচেনে চলে যায়। সেখানে এসে দেখে মুনতাহা অজ্ঞান হয়ে নিচে পড়ে আছে। রাহাত মুনতাহার কাছে হাঁটু গেড়ে বসে তার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নেয়, মুখটা নিজের দিকে ঘোরালে দেখতে পায় মাথায় চোটও পেয়েছে। রাহাত অস্থির হয়ে মুনতাহার গালে আলতো চাপড় মেরে তাকে ডাকতে থাকে–
—মুন, এই মুন! কি হয়েছে? উঠো।
কিন্তু না, মুনতাহা উঠে না। রাহাত আর সময় নষ্ট না করে মুনতাহাকে কোলে তুলে নিয়ে কিচেন থেকে বের হয়ে এসে ড্রয়িংরুমের সোফায় শুয়ে দেয়। তারপর বাসার ল্যান্ডলাইন থেকেই কল লাগায় তাদের ফ্যামিলি ডাক্তারকে।
ডাক্তার পনেরো মিনিটের মধ্যে এসে পড়ে। তারপর মুনতাহাকে এক্সামিন করে বলে–
—আর প্রেশার অনেক লো, আর নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া করে না হয়ত তাই এমনটা হয়েছে। আমি ঔষধ আর স্যালাইন দিয়ে যাচ্ছি। আশা করি তাতেই উনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবেন ইনশা আল্লাহ।
ততক্ষণে মুনতাহার জ্ঞানও ফিরে এসেছে। রাহাত তাকে সাহায্য করে রুমে যেতে। সে জোর করে মুনতাহাকে তাদের রুমে নিয়ে আসে, এবং সেখানেই ডাক্তার তাকে স্যালাইন দিয়ে চলে যায়। শরীর বেশি একটা ভালো লাগছে না বলে মুনতাহা বেশি কথা না বলেই চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। রাহাত উদ্বিগ্ন মুখে তার মাথার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।
__________________________
—ভালোবাসা কি কেবল পাওয়ার নাম? হয়তো না।
কারও হাত ধরা মানেই কি তার হৃদয় ধরা যায়?
যদি ভালোবাসার মানুষটিকে পেয়েও বুঝো, সে অন্য কারও অনুভবে বন্দি, তাহলে সে পাওয়া কি আদৌ প্রাপ্তি, না কি এক গভীর শূন্যতার নাম?
ভালোবাসা তখন বিষ হয়ে ওঠে, যখন প্রিয় মানুষটি তোমার চোখে চেয়ে হাসে, কিন্তু সেই হাসির ছায়া পড়ে অন্য কারও নামের উপর। তখন তার ভালোবাসার অভিনয় তোমার হৃদয়ে এমন এক নিঃশব্দ মৃত্যু ডেকে আনে, যার ব্যথা শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় না।
ভালোবাসা তখন আর জীবন দেয় না, বরং বাঁচা আর মরার মাঝের এক অসহ্য যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়ায়।
কথাগুলো বলে একটু থামে আফিফ। রাহা হা করে আফিফের কথাগুলো শুনছে। তার কথাগুলো শুনে রাহার মন খারাপ কিছুটা কমে যায়।
আফিফ আবারো এক মনে বলতে থাকে–
—ভালোবাসা কখনোই কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। যার হৃদয়ে তোমার জন্য কোনো জায়গা নেই,
তার পাশে থেকেও তুমি প্রতিনিয়ত একা হয়ে পড়বে।
ভালোবাসা মানে কেবল তাকে পাওয়ার নাম নয়,
বরং তার হৃদয়ে নিঃশর্তভাবে বাসা বাঁধার অধিকার পাওয়া। আর সে অধিকার চেয়ে নিতে হয় না,
তা দিতে হয়—ভালোবেসে, নিজে থেকে, মন থেকে।
ভালোবাসা যদি জোর করে আদায় করতে হয়,
তাহলে তা আর ভালোবাসা থাকে না—তা হয় একধরনের কারাগার, যেখানে হৃদয় বন্দি থাকে, আর আত্মা কাঁদে নিঃশব্দে।
আফিফের কথাগুলো শুনে রাহা ভাবনায় পড়ে যায়। রাহা ভাবতে শুরু করে–
— ঠিকই তো, আমি তো জানি জাহান মেহরিমাকে কতটা ভালোবাসে তাও আমি জোর করে তাকে পেতে চাইছিলাম। কিন্তু প্রকৃতি পক্ষে আমি জাহানকে ভালোবেসে নয়, নিজের জেদ বজায় রাখার জন্য নিজের করতে চাইছিলাম?
রাহার ভাবনার মাঝেই সে আবারও শুনতে পায়, আফিফ এবার তার দিকে তাকিয়ে, রাহার চোখে চোখ রেখে বলতে থাকে–
—যখন কেউ তোমায় নিঃস্বার্থ ভালোবাসবে, তখন তা বুঝতে শব্দের প্রয়োজন হবে না, তার চোখই হয়ে উঠবে নীরব স্বীকারোক্তি। চোখ হলো হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর ও সৎ ভাষ্যকার, যেখানে না-বলা অনুভূতিগুলো, অব্যক্ত প্রেম, লুকানো আকুলতা সব কিছু অদৃশ্য অক্ষরে লেখা থাকে। মুখ হয়তো থেমে যায় সংকোচে, অথচ চোখ থামে না—চোখ বলে দেয় সব।
তুমি যদি একবার গভীরভাবে তাকাও, তাহলে অনুভব করবে—তার দৃষ্টিতে জমে আছে শত না-বলা কথা, হঠাৎ থেমে যাওয়া স্বপ্ন, বুকের গভীরে পুষে রাখা মায়া আর ভালোবাসার অনন্ত অপেক্ষা। সে যা বলতে পারেনি, তার চোখে সব বলা হয়ে গেছে।
চোখ—এ যেন এক নিষ্কলুষ আয়না, যেখানে হৃদয়ের গোপনতম আবেগেরা প্রতিধ্বনিত হয় নিঃশব্দে, অথচ গভীরতরভাবে। ভালোবাসা কখনো কখনো নীরব, কিন্তু সেই নীরবতাও চোখের ভাষায় হয়ে ওঠে সবচেয়ে প্রবল আর নির্ভুল প্রকাশ। ❝যখন চোখ কথার স্বাক্ষী হয়, তখন মুখের স্বীকারোক্তিও অপ্রয়োজনীয় বোধ হয়।❞ এখন আমি তোমায় একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবো, তার সঠিক উত্তর দিবে ঠিক আছে?
রাহা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। আফিফ তাকে জিজ্ঞেস করে–
—তুমি কি জাহানের চোখে নিজের জন্য একবিন্দু পরিমাণ মায়া বা ভালোলাগা দেখেছো?
রাহা আফিফের প্রশ্ন শুনে মাথা নিচু করে নেয়। আফিফ অপেক্ষা করতে থাকে তার উত্তরে কিন্তু রাহা কোন উত্তর দেয় না। আফিফ নিজেই বলে–
—তোমার নিরবতাই তোমার হয়ে আমায় উত্তর জানিয়ে দিচ্ছে। যার কাছে তুমি এক বিন্দু পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ না তাহলে তাকে কেন এতটা গুরুত্ব দিচ্ছো? সে তো সুখে আছে, ভালো আছে নিজের ভালোবাসার মানুষটির সাথে। তাহলে কেন তুমি তার ভালো থাকাকে নিজের কান্নার কারণ বানিয়ে নিচ্ছো? তাকে যদি তুমি সত্যি ভালোবেসে থাকতে তাহলে এই ভেবে নিজেকে সামলাতে যে, আমার সাথে না হোক অন্য কারো সাথেই আমার ভালোবাসার মানুষটি ভালো আছে। তার ভালো থাকাতেই আমি খুশি, সুখী। কিন্তু তুমি কি করছো?
রাহা এবার আরো নিচে নামিয়ে নেয় নিজের মাথাটা। আবারও ফুপানোর আওয়াজ শোনা যায়। আফিফ এবার তার কাছে এগিয়ে এসে বসে। তার থুতনিতে হাত রেখে মাথা উঁচু করে তার চোখে চোখ রাখে। চোখে চোখেই অনেক কিছু বলতে থাকে তাকে, কিন্তু রাহা কি বুঝে চোখের কথা? বুঝলে তো আজ জাহান-মেহরিমার ছবি দেখে ছাদে এসে এমন হাউমাউ করে কাঁদত না।
আফিফ ভীষণ আবেগী গলায় বলে–
—আমি বুঝতে পারছি, তোমার জন্য হয়ত সবটা মেনে নিতে, মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু একটা কথা কি জানো, এটা আমাদের ধর্মীয় কিতাবেও আছে, “নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি” একটু কষ্ট করে নিজেকে গুছিয়ে নাও। উপরওয়ালা তোমার ভাগ্যেও সীমাহীন সুখ লিখে রেখেছেন। একটু ভরসা রাখো তারউপর।
আফিফের কথাগুলো রাহার কাছে ম্যাজিকের মতো কাজ করল বোধহয়। তার কান্না থেমে যায়। হঠাৎই আকাশে গুড়ুম গুড়ুম করে মেঘ ঢাকতে শুরু করে। তাদের দু’জনের সেদিকে কোন খেয়াল নেই। তারা হারিয়ে গিয়েছে একে অপরের চোখের গভীরতায়। আফিফের চোখজোড়া রাহাকে ভরসা দিচ্ছে সারাজীবন আগলে রাখার, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস অব্ধি পাশে থাকার।
আর রাহা, রাহা বুঝে নিচ্ছে তার সুখের ঠিকানা। এরই মাঝে বৃষ্টি পড়তে শুরু করে দেয়। তারা দু’জন তখনও সেখানে বসে থাকে। একে অপরের চোখে চোখ রেখে। হঠাৎই দূরে কোথাও বাজ পড়ার আওয়াজে রাহা চমকে উঠে আফিফকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। আফিফও আগলে নেয় স্ত্রীকে নিজের বাহুতে। তাদের বৈবাহিক জীবনের প্রথম বৃষ্টি বিলাস অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে ভীষণই চমৎকার ভাবে হয়। আফিফ রাহার কানের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলে–
—হাদীসে আছে, বৃষ্টির সময় করা দোয়া ফিরিয়ে দেন না আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। আজ একটা সুযোগ পেয়েছ। সুযোগটা হাতছাড়া করো না।
রাহা আফিফের বুক থেকে মুখ তুলে তার চোখে চোখ রাখে অবুঝের ন্যায়। সে জানত না এমন কিছু। আফিফ পলক ফেলে তাকে নিজের কথার আস্বস্ত করে। রাহা চোখ বন্ধ করে মুখটা আকাশের দিকে করে মনে মনে বলে–
—আমি এই দুনিয়াতেই জান্নাতি সুখ পেতে চাই এই লোকটার মাধ্যমে রাব্বুল আলামিন।
রাহা তার দোয়া চেয়ে পুনরায় আফিফের বুকে মুখ গুঁজে দেয়। ভীষণ স্বস্তি ও ভালোলাগার একটা জায়গা পেয়েছে সে।।
শব্দ সংখ্যা~২০৩৭
[ ১) “নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি ” সূরা ইনশিরাহ: আয়াত-৬
২) দুটি সময়ে দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না, আজান ও বৃষ্টির সময়। (মুস্তাদরাক শরীফ, হাদীস নং-২৫৩৪)]
[আসসালামু আলাইকুম সবাইকে। আপনারা কেমন আছেন? আমি আলহামদুলিল্লাহ একটু সুস্থ আর বেশ খানিকটা অসুস্থ। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও ২০০০+ শব্দের পর্ব দিলাম, আশা করি আমায় হতাশ করবেন না।
একটা গল্পতে যেমন নায়ক-নায়িকার জীবনের ঘটনা লেখা প্রয়োজন সেই সাথে তাদের পারিপার্শ্বিক চরিত্র গুলোর ঘটনা লেখা+পড়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। আজকের যেই দুটো জুটিকে নিয়ে লেখলাম তারাও কিন্তু গল্প টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তাই বিরক্ত হবেন না বলে আমি মনে করি।
কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু। রিচেক করা হয়নি। ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

