#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৪২
[পর্বটা রোমান্টিক। যাদের রোমান্স পছন্দ না তারা প্লিজ স্কিপ করবেন]
প্ল্যান অনুযায়ী পরেরদিন সকালে আশিয়ানরা ফিরে আসে। সকলে আগের রুটিন মোতাবেক কাজবাজ শুরু করে দেয়। আশিয়ান,জাহান, জায়িন তিনজনেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজেদের কর্মে। তাদের রমণীগণ আপাতত ছুটিতে আছে।
জাহান আর মেহরিমার সম্পর্কের মলিনতা খানিকটা দূর হয়েছে। জাহান এখন বেডেই ঘুমায়। মেহরিমার তার কাজকর্ম দিয়ে প্রতিনিয়তই জাহানকে বুঝানোর চেষ্টা করে সে অনুতপ্ত তার করা কর্মের জন্য এবং জাহান যাতে তাকে ক্ষমা করে দিয়ে পুনরায় নিজের ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে নেয়। কিন্তু জাহান সব বুঝেও যেনো অবুঝ।
_____________________
হায়া আশিয়ানের মধ্যে সেদিন রিসোর্ট থেকে ফিরে আসার পর থেকে নিরব মান-অভিমান চলছে। এর শুরুটা অবশ্যই নাটেরগুরু হায়া করেছে। হায়া ঘুরে আসার পর থেকে বায়না ধরেছে তার বেবি চাই। প্রথম বার কথাটা শোনার পর আশিয়ান ঘণ্টাখানেক থ মেরে বসে ছিলো। মানে কি ভাই? বেবি কি বাজারে বেচে নাকি যে চাইলো আর আশিয়ান কিনে এনে তার কোলে দিয়ে দিলো? একটা বেবিকে পৃথিবীতে আনতে কতগুলো প্রসেসের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, সেই সাথে সময়ও লাগে। হায়ার কথা হলো তার নাকি তার বান্ধবীদের থেকে আগে বেবি হওয়া চাই। তাহলে সে তার বান্ধবীদের মেয়েদের সাথে তার ছেলেদের বিয়ে দিতে পারবে। এসব কথা শুনে আশিয়ান একটুর জন্য অজ্ঞান হতে নিয়েও নিজেকে সামলে নিয়েছে।
আশিয়ান হায়ার এখন বেবি নেওয়া নিয়ে অসম্মতি জানিয়েছে। সে সাফসাফ বলে দিয়েছে–
—গ্র্যাজুয়েশনের আগে কোন বেবি-টেবি প্রশ্নই আসছে না।
হায়াও সাফসাফ তার মতামত দিয়েছে যতদিন না আশিয়ান হায়াকে বেবি নিতে সম্মতি দিচ্ছে ততদিন যেনো আশিয়ান ভুলেও হায়াকে স্পর্শ না করে। হায়া ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে স্পর্শকে নিজের টিমে করে নিয়েছে। আবরারকেও খানিকটা হাত করে নিয়েছে নাতি-নাতনিদের সাথে খেলা করার লোভ দেখিয়ে। সকলে প্রায় একজোট হয়ে আশিয়ানকে মানানোর মিশনে নেমেছে।
________________________
আশিয়ানের আজ ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছে। বাসায় এসে কলিংবেল দিতেই প্রতিদিনের মতো হায়া দরজা খুলে দেয়। সারাদিন পর ভালোবাসার মানুষটিকে দেখে আশিয়ানের সব ক্লান্তি যেনো নিমিষেই দূর হয়ে যায়। তার মনটা ভীষণ করে চাইছে হায়াকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ঘণ্টাখানেক বসে থাকতে, কিন্তু আশিয়ান তা করতে পারছে না। হায়া দরজা খুলে দিয়েই কিচেনের দিকে চলে যায়। আশিয়ান তার প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেদের রুমের দিকে হাঁটা দেয়।
রুমে যেতে যেতে খেয়াল করে আজ বাড়িটা একটু বেশিই চুপচাপ ও শান্ত। নিচে তার বাবা-মাকেও দেখে নি। আশিয়ানের মনে প্রশ্ন জাগে–
—আম্মু আর বাবা কি বাড়িতে নেই? এত রাতে কোথায় গেলো তারা তাহলে?
প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা নেই আশিয়ানের। রুমে এসে অফিস ব্যাগ রেখে পকেট থেকে ওয়ালেট ও হাত ঘড়ি খুলে ড্রেসিংটেবিলের উপর রাখে। তখনই দরজায় নক পড়ে। আশিয়ান বুঝতে পারে হেল্পিং হ্যান্ড খালা এসেছে, হায়া আসলে পারমিশন নিতো না। আশিয়ান তাকে ভেতরে ঢোকার পারমিশন দিলে, খালা ভেতরে প্রবেশ করে হাতে থাকা সরবতেই গ্লাসটা আশিয়ানকে দেয়। আশিয়ান গ্লাসটা নিজের হাতে নিয়ে খালাকে জিজ্ঞেস করে–
—খালা আম্মু আর বাবাকে নিচে দেখলাম না যে? তারা কি বাসায় নেই?
—না আশিয়ান আব্বা। ম্যাডাম আর স্যার তো ঐবাড়ি গেছে। পরশু নাকি জাহান আর জায়িন বাবাগো বইভাত হেই লেইগা।
—ওহহ আচ্ছা।
খালা চলে যায়। আশিয়ান সরবতটা শেষ করে টাউজার ও টাওয়াল নিয়ে ফ্রেশ হতে চলে যায়। আশিয়ান ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে দেখে হায়া তার ফেলে যাওয়া নোংরা কাপড়গুলো বাস্কেটে রাখছে আর টুকটাক ঘরদোর গুচাচ্ছে। আশিয়ান ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা মুছতে মুছতে আয়নার মাধ্যমে হায়াকে দেখতে থাকে। মুখটা গোমড়া করে রেখেছে। বেশ কিছুদিন ধরেই আশিয়ান খেয়াল করছে হায়া তার সমানেই মুখটা এমন গম্ভীর করে রাখে।অন্যদের সাথে হেসেখেলে কথা বললেও আশিয়ানের সময়ই ব্যতিক্রম।
আশিয়ান ভালো করেই জানে, হায়া এমন করছে যাতে আশিয়ান হায়ার মলিনতা সহ্য করতে না পেরে হায়ার কথায় রাজি হয়ে যায়। কিন্তু এবার আশিয়ানও কঠিন ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে হায়ার কোন ট্রিকসেই গলবে না। এমনিতেই হায়া পড়ালেখায় মহা ফাঁকিবাজ। পরীক্ষার সময় ছাড়া পড়তেই বসে না। এখন যদি বাচ্চা নিয়ে নেয় তাহলে তো পড়ালেখা একদমই ছেড়ে দিবে। সে একটা ভার্সিটির প্রফেসর হয়ে তার বউ কিনা গ্র্যাজুয়েশনটাও শেষ করবে না? এটা যে তার জন্য বড়ই লজ্জার বিষয়।
আশিয়ান মুখে ক্রিম মাখতে মাখতে আয়নায় পুনরায় নজর দিলে দেখতে পায় হায়া নেই। তার কপালে ভাজ পড়ে। এই মাত্র না এখানে ছিলো? তাহলে হঠাৎ করে কি গেলো? হঠাৎ হায়া বলে উঠে–
—আমাকে দেখা শেষ হলে নিজে আসুন, ডিনার রেডি।
কথাটা বলে ভাব দেখিয়ে নিচে চলে যায়। আশিয়ান টি-শার্ট গায়ে দিয়ে নিচে এসে ডিনার করে নেয় তারা। আশিয়ান ডিনার সেরে উপরে চলে গেলেও হায়া নিচে রয়ে যায় টেবিল গুছাতে। আশিয়ান রুমে এসে ল্যাপটপ নিয়ে অফিসের কিছু কাজ করতে থাকে। হায়া একটু পর রুমে এসে তার বালিশটা হাতে নিয়ে বাহিরের দিকে যেতে যেতে বলে–
—আমি গেস্ট রুমে যাচ্ছি। কিছু প্রয়োজন হলে ডাক দিয়েন।
কথাটা বলে আশিয়ানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হনহনিয়ে বের হয়ে যায়। আশিয়ান বেআক্কলের মতো বসে থাকে। বিষয়টা বুঝতে তার কিছুক্ষণ সময় লাগে, কিন্তু ততক্ষণে হায়া রুম থেকে বের হয়ে গিয়েছে। আশিয়ান নিজেকে ধাতস্থ করে উঁচু গলায় বলে–
—হ্যা যাও যাও। এখন তো আর আমাকে ভালো লাগে না, সব ভালোলাগা ভালোবাসা বেবির জন্যই। পঁচে গিয়েছি না আমি। দিবো না বেবি, গ্র্যাজুয়েশনের পরও দিবো না। যখন আমার মন চাইবে তখন দিবো।
কথাগুলো বলে একা একাই ফুস ফুস করতে থাকে। তারপর রাগ নিয়েই নিজের কাজে মন দেয়৷ কিন্তু বেশি একটা করতে পারে না। এরই মাঝে ধরণী কাঁপিয়ে বজ্রপাতের সাথে বৃষ্টি নামতে শুরু করে।
ল্যাপটপের কি-বোর্ডে হাত চালাতে চালাতে হঠাৎই আশিয়ানের মনে পড়ে যায় হায়া বজ্রপাতে ভয় পায়। সে ল্যাপটপটা তাড়াতাড়ি ফেলেই দৌড় দেয় গেস্টরুমের দিকে। গেস্টরুমের দরজায় কয়েকবার নক করার পরও যখন হায়া দরজা খুলে না তখন সে নিজেই লক মুচড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। রুমে এসে আশিয়ানের আক্কেলগুড়ুম অবস্থা। কেনো? কারণ রুমে হায়ার ছায়া পর্যন্ত নেই।
আশিয়ান ওয়াশরুম চেক করে দেখে সেখানেও নেই। সে এবার ভয় পেয়ে যায়। সে তাড়াতাড়ি করে বাড়ির অন্য রুমগুলো খুঁজতে থাকে কিন্তু কোথাও পায় না। সে এই বৃষ্টির মধ্যেই দৌড়ে বাহিরে আসে দারোয়ানের কাছে। বৃষ্টি নামার কারণে দারোয়ান চাচা তখন মেইন গেইটের পাশে তার ছোট্ট ঘরটায় অবস্থান করছেন।আশিয়ান ভীত ও তটস্থ গলায় দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে–
—চাচা হায়া কি বাহিরে গিয়েছিল?
দারোয়ান চাচা বলে–
—না আশিয়ান আব্বা, হায়া মামুনি তো কুনোহানে যায় নাই।
—আপনি নিশ্চিত তো চাচা?
—হ আব্বা। এহান থেকা দরজার পর্যন্ত সব দেহা যায়। কেউ গেলে বা হায়া মামুনি গেলে আমি অবশ্যই দেখতাম।
আশিয়ান কিছুটা আশা ও খানিকটা হতাশা নিয়ে বাসায় ফিরে আসে। আশা এই জন্য যে, হায়া বাসার থেকে বাহিরে বের হয়নি। কি হতাশার কারণ, সে জানে না হায়া কোথায়। হঠাৎই আশিয়ানের মনে পড়ে সে ছাঁদে দেখতে ভুলে গিয়েছে। কিন্তু এই বৃষ্টির মধ্যে কি হায়া গিয়েছে ছাঁদে? প্রশ্নটা মনে চেপেই আশিয়ান ছাঁদের দিকে পা বাড়ায়।
_____________________________
ছাদে এসে আশিয়ান হতভম্ব হয়ে যায়। যাকে খুঁজে খুঁজে আশিয়ান তার প্রেশার বাড়িয়ে ফেলছে সে কিনা এখানে সুন্দর বৃষ্টি বিলাশ করছে? আশিয়ানের প্রচন্ড মেজাজ গরম হয়ে যায়। সে বড়বড় পা ফেলে হায়ার কাছে এসে তার পেছনে দাঁড়ায়। ধমক দিয়ে বলে–
—এই ইডিয়েট, এত রাতে বৃষ্টিতে ভিজছো কেনো? তোমার যে ঠাণ্ডার সমস্যা আছে ভুলে গিয়েছো?
আকস্মিক কারো ধমকে হায়া খানিকটা চমকে গেলেও সাথে সাথে নিজেকে সামলে নেয়। সে পেছনে ঘুরে আশিয়ানের দিকে তাকায়। মনে মনে নিজেকে বাহবা দিতে ভুলে না।
আশিয়ান হায়ার দিকে ভালো করে লক্ষ্য করলে তার মাথা ঘুরে যায়। হায়া হোয়াইট কালারের সিল্কের শাড়ি পড়ে আছে। বৃষ্টির পানিতে ভিজার কারণে হায়ার শরীরের সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্ম জায়গা দৃশ্যমান। ভীষণ আবেদনময়ী লাগছে হায়াকে। হায়াকে এই অবস্থায় দেখে আশিয়ানের পুরো শরীরে শিহরণ বয়ে যায়। কেমন একটা ঘোরে চলে যায় সে। হায়ার শরীর থেকে চোখ সরিয়ে তার চোখে চোখ রাখলে হায়ার দুষ্টুমি বুঝতে পারে। তাকে কাবু করার জন্য হায়া এসব করেছে সেটা আশিয়ান খুব ভালো করেই বুঝতে পারে। আশিয়ানও না চাইলে তার পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলছে। আশিয়ান তার দুষ্টু নজর দেখে গলা খাকাড়ি দিয়ে বলে–
—একটা কথা ব্যয় ব্যতীত চুপচাপ রুমে গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করো যাও। আমি কিন্তু ভীষণ রেগে যাচ্ছি।
হায়া তার কথা শুনে হেসে দেয়। সে আশিয়ানের কাছে এগিয়ে এসে তার হাত থেকে ছাতাটা নিয়ে ফেলে দেয়। বৃষ্টির পানি মুহূর্তেই ভিজিয়ে দিতে থাকে আশিয়ানকেও। হায়া আশিয়ানের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে, তারপর আশিয়ানের এক গালে নিজের অধরের গভীর স্পর্শ দেয়। আশিয়ানের পুরো শরীর সিরসিরিয়ে উঠে। সে খপ করে হায়ার কোমড় আঁকড়ে ধরে হায়াকে টেনে নিজের আরো কাছে নিয়ে আসে। হায়া নিজের প্ল্যান সাকসেসফুল হতে দেখে নিজের উপরই প্রসন্ন হয়।
হায়া একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে–
—রাগ কমেছে?
আশিয়ান কোন জবাব দেয় না। হায়া আশিয়ানের অপর গালটিতেও ভালোবাসার স্পর্শে সিক্ত করে দেয়। পূর্বের ন্যায় জিজ্ঞেস করে এবারও, কিন্তু এবারও আশিয়ান কোন জবাব দেয় না। হায়া তার কাজটা ক্রমাগত করতে থাকে। একসময় আশিয়ানও নিজের উপর থেকে কন্ট্রোল হারাতে থাকে। আশিয়ানের ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেলে সে নিজেও হায়াকে নিজের ভালোবাসার স্পর্শ দিতে থাকে। হায়া স্বামীকে নিজের সাথে আঁকড়ে ধরে তার আদরে সাড়া দিতে থাকে।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে ভেজার কারণে হায়ার শরীরে ঠাণ্ডায় কাঁপন শুরু হয়ে যায়। আশিয়ান হায়ার কাঁপন টের পেয়ে তাকে কোলে তুলে নিজেদের রুমের দিকে হাঁটা শুরু করে। রুমে এসে বেডে বসিয়ে হাত বাড়ায় হায়ার কাধের আঁচলে। হায়া তৎক্ষণাৎ তার হাতটা ধরে ফেলে। ক্ষীণস্বরে বলে–
—নো বেবি, নো টাচ।
হায়ার কথা শুনে আশিয়ানের শান্ত, সুন্দর মুড টার বারোটা বেজে যায়। সে রাগান্বিত দৃষ্টিতে কতক্ষণ হায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর হায়ার সামনে থেকো চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে হায়া হুড়মুড়িয়ে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। আশিয়ান তাকে নিজের থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে আর গম্ভীর গলায় বলে–
—ছাড়ো। এখন নিজে ধরলে কেন? আমি তোমাকে স্পর্শও করবো না আর বেবিও দিবো না। আমিও দেখতে চাই, তুমি কতদিন পর্যন্ত দূরে সরিয়ে রাখতে পারো নিজেকে আমার থেকে।
হায়া আশিয়ানকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে তার বুকে নাক-মুখ ঘসতে ঘসতে বলে–
—আপনি জানেন তো আমি পারি না নিজেকে আপনার থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে, তাও এমন করছেন। এত নিষ্ঠুর কেন আপনি? একটা বেবি দিলে কি হয়? অন্যরা কি বেবি নিয়ে পড়াশোনা করে না?
—অন্যরা আর তুমি এক নও হায়া। তুমি হলে মহা ফাঁকিবাজ। এমনিতেই পড়তে চাও না, বাচ্চা হলে পড়ালেখা একদমই ছেড়ে দিবে। আমি ভার্সিটির একজন প্রফেসর হয়ে আমার বউ কিনা গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করবে না? বুঝতে পারছো আমার কলিগরা এসব জানতে পারলে আমার কতটা ফেসলস হবে।তাই আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল, তোমার গ্র্যাজুয়েশনের আগে কোন বাচ্চা নিবো না আমরা।
হায়া আশিয়ানের বুক থেকে মাথা উঠিয়ে আশিয়ানের দুই গালে হাত রেখে বলে–
—আমি ফাঁকি বাজি করবো না পড়ায়। প্লিজ এমন করবেন না আশিয়ান। আমি আপনার সব লথা শুনবো। আগের থেকেও ভালো রেজাল্ট করবো প্রমিজ। প্লিজ এই কথাটা রাখেন আর কোন আবদার করবো না।
আশিয়ান চোখমুখ শক্ত করে হায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। হায়া আবারও বলে–
—আশিয়ান একটা বাচ্চা আমাদের ঘরে থাকবে, খেলবে ঘুমাবে। আমাদের দিনটা শুরু হবে ওকে নিয়ে আর রাতও হবে ওকে ঘিরেই। আপনি অফিস থেকে ক্লান্ত শরীরে ফেরার পর সে আপনার কোলে ওঠার জন্য অস্থির হয়ে যাবে। তার অস্থিরতা দূর হবে তার বাবার স্পর্শে। সে যখন ঘুমের রাজ্যে বিভোর থাকবে তখন আমরা দু’জন পরম তৃপ্তি নিয়ে মন ভরে তাকে দেখবো। সে একটু বড় হলেই আমাকে মাম্মা আর আপনাকে পাপা বলে ডাকবে। একবার ভাবুন, আদো আদো গলায় তার পাপা ডাকটা। এমন করছেন কেন আশিয়ান? একটু সদয় কি হওয়া যায় না আমার প্রতি? আপনি শুধু নিজেরটা ভাবেন সবসময়। আজও তাই। শুধু নিজের ফেস লস হওয়ার কথা ভাবছেন, আমার চাওয়া-পাওয়ার কোন দাম নেই আপনার কাছে।
হায়া কথা গুলো বলতে বলতে কেঁদে দেয়।কাঁদতে কাঁদতে আশিয়ানকে ছেড়ে নিচে বসে পড়ে। সেখানে বসেই কাঁদতে থাকে। হায়ার শেষের কথাগুলো আশিয়ানের মস্তিষ্ক ও মনে বেশ ভালোভাবেই আঘাত করে। সত্যিই তো বলছে হায়া। অতীতেও সে নিজের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে হায়াকে চরম ভাবে অপমানিত করেছে। কয়েকবছর পর আবার নিজের ভালোবাসাকে পাওয়ার জন্য দ্বিতীয় বারের মতো হায়ার বিয়েটা সেই ভেঙে দিয়েছিল। আজও নিজের কথাই ভাবছে। মেয়েটা বরাবরই তাকে শর্তবিহীন ভাবে ভালোবেসে যাচ্ছে আর আশিয়ান কিনা শুধু নিজের ইচ্ছেকেই প্রাধান্য দিচ্ছে? নিজের ইচ্ছেগুলো হায়ার উপর চাপিয়ে দিচ্ছে, হায়া সেগুলোকে চাইছে বা না চাইছে সেদিকে আশিয়ান বিন্দুমাত্র নজর রাখছে না। ভীষণ স্বার্থপর হয়ে গিয়েছে আশিয়ান।
তার ভাবনা চিন্তার মাঝেই হায়া নিচ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। কাবার্ড থেকে জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে যাচ্ছিল তখনই আশিয়ান তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ গুঁজে দেয়। হায়া শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু বলছে না বা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টাও করছে না। আশিয়ান বুঝতে পারে হায়ার অভিমান হয়েছে।
আশিয়ান হায়ার ঘাড়ে মুখ গুঁজেই বলে–
—বেবি আসার পর আমার ভালোবাসার ভাগ কমে যাবে না তো?
হায়া তার কথা শুনে চমকে যায়। বেবি আসবে কিভাবে, যেখামে বেবির বাবাই তাকে আনতে চাইছে না? হায়া কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। আশিয়ান তার জবাব না পেয়ে পুনরায় সুধায়–
—কি হলো বলো? বেবি আসার পর আমায় কম ভালোবাসবে না তো? তাহলে কিন্তু আমি ভীষণ রাগ করবো, বেবিকে লুকিয়ে রাখবো তোমার থেকে।
হায়া তার কথা শুনে বলে–
—বেবি তার ভাগের ভালোবাসা পাবে আর আপনি আপনার।
—বেবি দেওয়ার পর এটা বলবে না তো” বাচ্চা তো হয়েই গিয়েছে আর পড়ালেখা করে কি লাভ,এখন মন দিয়ে সংসার করি”?
আশিয়ানের এই কথা শুনে আরো চমকে যায় হায়া। আশিয়ানের কথাগুলো শুনে বুঝাই যাচ্ছে সে রাজি। হায়া ঝটপট করে বলে–
—না বলবো না।
—তাহলে চলো।
কথাটা বলে আশিয়ান হায়াকে কোলে তুলে নেয়। হায়া থতমত খেয়ে বলে–
—কই যাবো?
—বেবি আনার মিশনে।
কথাটা শেষ করে আশিয়ান হায়াকে একটা চোখ টিপ দিয়ে তাকে বেডে শুয়ে দেয়। হায়ার কাঁধ থেকে আচল সরিয়ে সেখানে মুখ গুঁজে দেয়। হায়াও খুশি মনে বরের ভালোবাসায় সাড়া দিতে থাকে। তারা দু’জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তাদের ভালোবাসার চিহ্নকে দুনিয়ায় আনার কাজে।
_____________________________
দীর্ঘ ৮ঘণ্টা পর হায়াকে সুস্থসবল অবস্থায় দেখে সকলের প্রাণে জান ফিরে। আশিয়ান দৌড়ে এসে সকলের সামনেই হায়াকে জড়িয়ে ধরে। কিছুক্ষণ নিজের সাথে জড়িয়ে রেখে হায়াকে বুক থেকে সরায় আশিয়ান। অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করে–
—কই ছিলে তুমি জান? জানো আমরা কত টেনশন করছিলাম।
হায়া কিছু বলার আগেই একটা পুরুষ কণ্ঠ বলে উঠে–
—হায়া আমার সাথে ছিল আর তাকে কিছু সত্য জানানোর জন্য আমি তাকে নিজের সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম।
শব্দসংখ্যা~২১০০
চলবে?
[গেস করতে পারছেন কে এই লোকটা? রেসপন্স বেশি বেশি করলে কাল গল্প দিবো ইনশা আল্লাহ 😊]
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

