সাঝের_প্রণয়ডোর #সাদিয়া_সুলতানা_মনি #পর্ব_৪৫[বর্ধিতাংশ]

0
22

#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৪৫[বর্ধিতাংশ]

তালুকদার বাড়ির ড্রয়িংরুমের বর্তমানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। সকলে আশিয়ানের কথা কর্মকান্ডের কথা শুনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হায়ার চোখে বেদনা মিশ্রিত অশ্রু কণা খেলা করছে, আর আশিয়ান সেই দৃশ্যটুকু সনতর্পণে অবলোকন করছে। এখানে সকলের মধ্যে শুধু একজনের মনের হালাত বেশ ভালো।

ব্যক্তিটি হলো ফারাবি। তার ঠোঁটের কোণে বিজয়ীদের হাসি। যেই হাসি আশিয়ানকে বলছে, ফারাবি আজ ভাগ্যের চরম নিষ্ঠুরতার খেলায় অস্বাভাবিকভাবে জিতে গিয়েছে। আর আশিয়ান জিতের দারপ্রান্তে এসেও হেরে গিয়েছে। আচ্ছা সত্যিই কি আশিয়ান হেরে গিয়েছে? সে যদি হেরে যায় তাহলে সেই হার তো শুধু তার একার হবে না, বরং সেই হারের মাধ্যমে ভেঙে যাবে একটা সুন্দর যৌথ পরিবার। মৃত্যু ঘটবে একটি সুন্দর ভালোবাসার গল্পের।

_____________________________

আবরার ধীর পায়ে সকলের পেছন পেরিয়ে এসে থেমে দাঁড়ান আশিয়ানের সামনে। আশপাশে তখন ঘন নীরবতা, বাতাসে অজানা এক ভয়ের প্রতিধ্বনি। তাঁর কণ্ঠে যেনো লোহার মতো ঠান্ডা দৃঢ়তা—

—আমি একটা প্রশ্ন করব, হ্যাঁ অথবা না-তে উত্তর দেবে। ঠিক আছে?

আশিয়ান মুখে কিছু না বলে মাথা নাড়ায়। মুখে অভিব্যক্তি নেই, চোখে একরাশ জমাট বিষণ্ণতা।

আবরার গলা খাঁকারি দিয়ে কথাটা ছুড়ে দেন, যেন নিজের বিশ্বাসের বুক চিরে বার করে আনছেন
প্রশ্নটা—

—তুমি কি সত্যিই ফারাবির বোনকে কিডন্যাপ করেছিলে? হ্যাঁ অথবা না?

প্রশ্নটা যেন এক ছুরি হয়ে কেটে যায় বাতাস, রক্তাক্ত করে ফেলে পিতৃত্ব আর সন্তানের বন্ধনের ভিত। আশিয়ান স্থির চোখে বাবার দিকে তাকায়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টির আড়ালে এক সমুদ্র অশ্রু লুকিয়ে আছে। একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, আবরারের চোখজোড়াও ভিজে উঠছে নিঃশব্দে। যে মানুষটি এতদিন অনড় পাহাড় হয়ে থেকেছেন, আজ তার ভিতরটা ভেঙে পড়ছে নীরবে।

এই বয়সে এসে আবরার যেন আবারও নিজেকে হারিয়ে ফেলছেন। তাঁর আদর্শ, তাঁর নীতি, তাঁর শিক্ষায় গড়া ছেলেটি এমন ঘৃণ্য কাজ করতে পারে এই সত্যটা কিছুতেই মানতে পারছেন না তিনি। আর আশিয়ান? সে বাবার চোখে চোখ রাখতে পারে না। পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে সে চোখ নামিয়ে নেয় নিচের দিকে, গলায় কাঁপন এনে ক্ষীণ স্বরে উত্তর
দেয়—

—হ্যাঁ।

একটা মাত্র শব্দ। কিন্তু সেই ‘হ্যাঁ’ যেন বজ্র হয়ে আছড়ে পড়ে আবরারের হৃদয়ে। আর পর মুহূর্তেই সেই হৃদয়ঘাতী শব্দের প্রতিধ্বনি হয়ে আবরারের হাতের থাপ্পড় আছড়ে পড়ে আশিয়ানের গালে।

এক প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে তালুকদার বাড়ির ড্রয়িংরুম। উপস্থিত সবাই থমকে যায়, বিস্ময়ে, আতঙ্কে। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই, শুধু থাপ্পড়ের প্রতিধ্বনি যেন এখনও দেয়ালে দেয়ালে প্রতিফলিত হচ্ছে।

আশিয়ান হাত তুলে চেপে ধরে তার লাল হয়ে ওঠা গাল। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে নির্বিকার নয়, যেন নিঃশেষ এক অনুতাপে ডুবে।

কিন্তু আবরারের রাগ থেমে থাকে না। তাকে দ্বিতীয়বার আঘাত করার জন্য আরও একবার হাত তুলতেই হায়া ছুটে এসে দাঁড়িয়ে যায় বাপ-ছেলের মাঝখানে। সবকিছু ঘটে যায় এক মুহূর্তের ঝড়ের মতো। আর সেই ঝড়ে হায়ার গালে পড়ে আবরারের দ্বিতীয় থাপ্পড়।

এক পুরুষালি হাতে এত জোর থাপ্পড়—তা কি হায়ার মতো ছোটখাটো মেয়ের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব? মুহূর্তেই তার মুখটা ঘুরে যায়, শরীর দুলে ওঠে। ভারসাম্য হারিয়ে সে পড়ে যেতে উদ্যত হয়, কিন্তু ঠিক তখনই আশিয়ান তাঁকে জাপটে ধরে। নিজের বাহুর মধ্যে আগলে রাখে তাকে, যেন পৃথিবীর সব কষ্ট, সব অপমান থেকে রক্ষা করতে চায়।

ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটে যায় যে, কেউ কিছু বোঝার আগেই যেন সময় থেমে গিয়ে একটা ইতিহাস লিখে ফেলে।

ড্রয়িংরুমে তখন নিঃশব্দ এক বিস্ফোরণ। প্রত্যেকেই স্তব্ধ, বিস্ময়সূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই তিনটা প্রাণের দিকে যাদের চোখে, মুখে, শরীরে লেখা হয়ে গেছে অভিমানের এক অনুচ্চারিত অধ্যায়।

আবরার হতভম্ব হয়ে যায় হায়ার এহেন কান্ডে। সেই সাথে ড্রয়িংরুমে অবস্থান করা প্রত্যেকটি ব্যক্তি। আবরার একবার নিজের বাড়ন্ত হাতটার দিকে আরেকবার আশিয়ান ও হায়ার দিকে তাকাচ্ছে। সে তার আদরের ভাগ্নীকে জীবনের প্রথম অনিচ্ছা সত্ত্বেও থাপ্পড় মেরেছে–কথাটা এখন তার মস্তিষ্ক গ্রহণ করতে পারছে না। কিন্তু গ্রহণ যে তাকে করতে হবেই। তার স্তব্ধতায় ভাঙণ ধরে ফারাবির অযাচিত আগমনে।

ফারাবি হায়ার কাছে যাওয়ার সময় আবরারকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে যায়। আবরার এমন আকস্মিক ধাক্কায় পড়ে যেতে নিলে জায়িন এসে তাকে ধরে ফেলে। ফারাবি হায়ার কাছে এসে তার বাহু টেনে ধরে আশিয়ানের কাছ থেকে খানিকটা সরিয়ে এনে অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করতে থাকে–

—হায়া, দেখি কোথায় ব্যথা পেয়েছো?

হায়ার শরীরে একজন পরপুরুষের স্পর্শ বুঝি আশিয়ান দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখবে? এত ভালো বুঝি সে? সে ফারাবির বুকে জোড়দাড় একটা ধাক্কা দিয়ে তাকে নিচে ফেলে দেয় আর হায়াকে টেনে আবার নিজের বুকে নিয়ে আসে। ফারাবির দিকে তাকিয়ে রাগে হিসহিসিয়ে বলে–

—স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম মাই ওয়াইফ, আদারওয়াইস আই উইল শো ইউ আ সাইড অফ মি দ্যাট উইল মেইক ইউ উইশ ইউ ওয়্যার নেভার বর্ন।

ফারাবিও রাগান্বিত দৃষ্টিতে আশিয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের চোখে চোখে যেনো এক নিরব যুদ্ধ চলছে, কে হায়াকে জিতে নিতে পারে। হায়া তখনও আশিয়ানের বুকে মাথা ঠেকিয়ে নিজে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। আশিয়ান ফারাবির থেকে চোখ সরিয়ে বুকে থাকা প্রেয়সীর দিকে মনোযোগ দেয়। সে আলতো হাতে হায়াকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে তার ব্যথা পাওয়া গাল টায় হাত রাখে, অতি সাবধানে, অতি যত্নে। গালটা কয়েক মুহূর্তের মাঝেই গাল হয়ে কিছুটা ফুলে গিয়েছে। আশিয়ান সেদিকে নিজের দৃষ্টি নিবন্ধন রেখে মলিন গলায় বলে–

—তুমি আসলে কেন আমাদের মাঝে হু? বাবা মারছিল মারত, শুধু শুধু আমাদের মাঝে এসে নিজে মারটা খেলে। দেখেছো কতটা লাল হয়ে ফুলে যাচ্ছে। সবসময় তোমার বেশি বেশি না করলে হয় না?

শেষের কথাটা কিছুটা ক্ষোভ নিয়ে বলে। হঠাৎই হায়া ঝট করে আশিয়ানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে–

—বন্ধ করুন আপনার নাটক। দয়া করে আর নাটক করবেন না। আপনার ক্লান্ত লাগে না এত নাটক করতে?

আশিয়ান অবাক হয়ে যায় হায়ার কথা শুনে। সে হায়াকে জিজ্ঞেস করে–

—কিসের নাটক করছি আমি?

—আবার জিজ্ঞেস করছেন কিসের নাটক? তাহলে শুনুন, ভালোবাসার নাটক। আপনি তো আমায় ছোট থেকেই সহ্য করতে পারেন না। আমি পৃথিবীতে আসায় আপনার আদর-ভালোবাসায় কম পরেছে, তাই আপনি আমায় দেখতে পারতেন না। আর আমিও সেরা বলদ, সেই আপনাকেই ভালোবেসে ফেললাম। একবার কষ্ট পেয়ে শিক্ষা হয়নি আবারও ভালোবাসলাম। আপনি এসব কিডন্যাপিংয়ের ঘটনা সাজিয়েছেন আমায় আবারও কষ্ট দেওয়ার জন্য তাই না?

আশিয়ান হতভম্ব হয়ে যায় হায়ার কথা শুনে। তার এতদিনে ভালোবাসাকে হায়াকে আজ নাটক বলে আখ্যায়িত করলো? এটা কি সে প্রাপ্য? এই পাঁচ মাসের সংসারে একটা দিনের জন্যও হায়ার মনে হয়নি, আশিয়ানও তাকে ভালোবেসে?

আশিয়ান হায়ার কাছে আসতে চায় তাকে বুঝানোর উদ্দেশ্য। কিন্তু হায়া হাত উঠিয়ে তাকে থামিয়ে দেয়। সে ভাঙা অথচ দৃঢ় গলায় বলে–

—আমি ডিভোর্স চাই। এমন ক্রিমিনাল, হিপোক্রিট মানুষের সাথে আমি আর থাকতে চাই না।

হায়ার এই কথাটা যেনো ড্রয়িংরুমে বোম ফেলার মতো কাজ করে। ডিভোর্স চাইছে হায়া, কথাটা যেনো কেউ বিশ্বাস করতে চাইছে না। হানিয়া আর জাভিয়ান দ্রুত এগিয়ে আসে মেয়ের কাছে। রাগের মাথায় ভুল সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিতে চায় কিন্তু হায়া শুনে না তাদের কথা।

হায়া সেই জায়গা ত্যাগ করার আগে সকলকে বলে যায়–

—ভাইদের রিসেপশন পার্টি কালই হবে, এটা যেনো না পেছায়। যদি আমার জন্য পেছনাে হয় তাহলে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো বলে দিলাম। তাদের রিসেপশন পার্টির পরেই আমার আর উনার ডিভোর্সের কার্যক্রম শুরু হবে।

কথাটা বলেই হায়া ড্রয়িংরুম ত্যাগ করার উদ্দেশ্য হাঁটা দেয়।

চলবে?

[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here