#প্রণয়ের_অমল_কাব্য
#Writer_Drm_Shohag
#পর্ব-[৫৪+৫৫]
[Page – DrmShohagHoney]
মাইরা ভীত চোখে তাকিয়ে আছে ইরফানের দিকে। ইরফান আবারও আগের চেয়েও শক্ত কণ্ঠে বলে,”____”কথা কানে যায় না? আর বলবি ছাড়ার কথা? বল?”
মাইরা দ্রুত দু’দিকে মাথা নাড়ায়। অর্থাৎ সে বলবে না। ইরফান একই সুরে বলে,____”মুখে বল, নয়তো এটা একদম গেরে দিব।”
মাইরা ভীতি কণ্ঠে দ্রুত বলে ওঠে,____”আআর বলব না। আর ববলবা না।”
ইরফান মুহূর্তেই শান্ত হয়ে যায়। শীতল দৃষ্টিতে তাকায় মাইরার পানে। মাইরার চোখমুখ লাল। চোখেমুখে ভীতি। ডিম লাইটের আলোয় চোখের কোণে লেপ্টে থাকা পানি চোখ এড়ালো না তার। হাতের ভাঙা গ্লাস টা ছুঁড়ে ফেলে পাশের বালিশে শুয়ে পড়লো। ডান হাত বাড়িয়ে মাইরাকে তার দিকে টেনে নিয়ে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল। ডান হাত মাথায় আলতো হাতে ছোঁয়ায়, সাথে নরম কণ্ঠে বলে,____”স্যরি! ঘুমাও।”
মাইরা ইরফানের নরম কণ্ঠ পেয়ে চুপ হয়ে থাকলো। ভীতি ভাবটা হয়তো একটু কমলো। চোখ বুজলো। ইরফান ঠোঁট বাঁকালো। মাইরার আচরণে তার মনে বিশেষ প্রভাব পড়েছে বলে মনে হলো না। মাইরার মাথায় ঠোঁট ছোঁয়ায় খুবই আলতোভাবে। তবে মাইরা তা বুঝলো না। ইরফানের বুকে মুখ ঠেকিয়ে চোখ বুজে রেখেছে। বেশ কিছুক্ষণ এর মাঝেই ঘুমিয়ে যায়। ইরফান মাইরার ঘুমন্ত মুখটা তার বুক থেকে উঠিয়ে পাশের বালিশে রাখলো। ডান হাত বাড়িয়ে মাইরার ভেজা মুখটা মুছিয়ে দেয়। ভাবুক ভঙ্গিতে বলে,____”আই অ্যা’ম রাইট। ইউ আর আ রিয়েলি স্টুপিট গার্ল। বাট ইট’স ওকে। আই হ্যাভ নো প্রবলেম।”
.
.
শুদ্ধ দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে। তারেক নেওয়াজ বাসায় নেই। রুমা নেওয়াজ ঘুমিয়ে ছিলেন। চিৎকার চেঁচামেচি তে উঠে গিয়েছে। কিন্তুু ঘর থেকে বেরিয়ে দেখলেন ফাইজ এসে গিয়েছে। কথা না বাড়িয়ে ফাইজকে খেতে দিয়েছে। বেশকিছু কথাবার্তা বললো। ফাইজকে আজ থাকতে বললো রুমা নেওয়াজ, তবে ফাইজের কাজ আছে বলে ফাইজ সম্মতি দিতে পারলো না। আরেকদিন আসবে বলে জানিয়েছে। ফারাহ আর ইনায়া ঘরে গিয়েছে রেডি হতে। তারা খেয়েছে।
শুদ্ধকে দেখে রুমা নেওয়াজ শুদ্ধকে খেতে বসতে বলেন। শুদ্ধ ফাইজের পাশের চেয়ারটায় বসল। ফাইজ ভাবলেশহীনভাবে খাবার খাচ্ছে। শুদ্ধ আড়চোখে ফাইজের দিকে তাকালো। রুমা নেওয়াজ শুদ্ধকে খাবার বেড়ে দিলে শুদ্ধ হেসে বলে,_____”মামি তুমি খেয়েছ?”
রুমা নেওয়াজ উত্তর করে, “খেয়েছি। তোমার মা কে আনলে না কেন? ফুপু যে আনতে বললো!”
শুদ্ধ খাবার মাখাতে মাখাতে বলে,____”কালকে মাকে নিয়ে আসবো মামি। গ্রান্ড মা কোথায়?”
রুমা নেওয়াজ গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বলে,____”ঘুমিয়ে গিয়েছে। তোমরা আসলে ডাকতে বলেছে।”
!
“আজ গ্রান্ড মা কে ডাক দিও না। কালকে মাকে নিয়ে আসবো। আমার কিছু কাজ আছে।”
!
“আচ্ছা। কালকে সকাল সকাল এসো।
এরপর ফাইজের দিকে চেয়ে বলে,____” ফাইজ আব্বু একটু ভাত নাও।”
ফাইজ মাথা নিচু করেই ছোট করে বলে,___”আর না আম্মু। পেট ভরে গিয়েছে।”
রুমা নেওয়াজ আর কিছু বললেন না। রান্নাঘরের দিকে গেলেন। শুদ্ধ প্রথমবারের মুখের খাবার গিলে নিয়ে ফাইজের দিকে তাকায়। অতঃপর গলা ঝেড়ে ডাকে,_____”এ্যাই সোনা ভাই!”
ফাইজ তার মতো খাবারে ব্যস্ত, যেন সে কিছুই শুনতে পায়নি। শুদ্ধ আবারও বলে,____”ফারাহ’র জ্বর কমেনি?”
ফাইজ চোখ তুলে তাকিয়ে তার শ্বাশুড়িকে না দেখে শুদ্ধর দিকে তাকায়৷ শুদ্ধ ফাইজের দিকেই চেয়ে আছে। ফাইজ হঠাৎ-ই বা হাতে শুদ্ধর কলার ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,_____”আর একবার যদি তোর মুখে আমার বোনের নাম নিতে শুনেছি। বিলিভ মি, তোকে আমি কি করব নিজেও জানি না।”
শুদ্ধ হেসে বলে,_____”আমার ফারাহ পাখি..এই যে নিলাম।”
ফাইজ খুব স্বাভাবিকভাবে বলে,_____”ফারাহ’র গলার দাগটা আমার চোখ এড়ায়নি শুদ্ধ। যে আমার বোনকে খু’ন করতে চাইছিল তার সাথে আমার বোনকে বেঁধে দেয়ার মতো ভাই আমি না। ভালোভাবে বললাম, আমার বোনের থেকে দূরে থাক। আমি আমার এক এব্রডের ফ্রেন্ড এর সাথে কথা বলেছি, সে নেক্সট উইকে ফারাহকে দেখতে আসবে। দেখার কিছু নেই। দেখেছে ফারাহকে। আসলে একেবারে…
ফাইজ থেমে গেল। কিছু বললো না আর।
শুদ্ধ স্তব্ধ চোখে ফাইজের দিকে চেয়ে রইলো। ফারাহ’র বিয়ে ঠিক করছে? তাকে একটা কথা বললো না? ফাইজ তার প্লেটে থাকা খাবারটুকু শেষ করে চুপচাপ উঠে গেল। শুদ্ধ ভাতের প্লেট থেকে হাত ঝেড়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজল।
ইনায়া ফারাহ বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। ফারাহ’র মাথা নিচু। ডায়নিং এ বসা শুদ্ধর দিকে বেশ কয়েকবার তাকিয়েছে ফারাহ। মুখটা মলিন।
রুমা নেওয়াজ বেরিয়ে আসলে ফাইজ, ইনায়া, ফারাহ রুমা নেওয়াজ এর থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে যায়। শুদ্ধ সেভাবেই চোখ বুজে থাকলো। একটা টুঁশব্দ করল না।
রুমা নেওয়াজ এগিয়ে এসে বলে,___”শুদ্ধ আব্বু খাচ্ছো না কেন?”
শুদ্ধ চোখ মেলে তাকায়। নিজেকে সামলে বলে,___”খেতে পারছি না মামি। কালকে দেখা হচ্ছে।”
এটা বলে বেসিনে হাত ধুয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
শুদ্ধ বাইরে বেরিয়ে দেখল ফাইজের দু’পাশে ইনায়া আর ফারাহ ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। শুদ্ধ বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে যায়। হঠাৎ-ই ইনায়ার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলে,_____”আমার মা তোকে দেখতে চেয়েছে। আজকেই দেখতে চেয়েছে।”
ইনায়া শুদ্ধর পায়ের সাথে তাল মেলাতে পারে না। ফাইজ আর ফারাহ দাঁড়িয়ে যায়। ইনায়া পিছু ফিরে ফাইজের দিকে তাকায়। ফাইজ তীক্ষ্ণ চোখে শুদ্ধর কান্ড দেখল। ইনায়ার দিকে চেয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে গলা উঁচিয়ে বলে,_____”লিটল কুইন তোমার ফুপির সাথে আজ থাকো। আমি তোমাকে আগামীকাল ভোরে গিয়ে নিয়ে আসবো। ওকে?”
শুদ্ধ তার গাড়ির ডোর খুলে গম্ভীর গলায় ইনায়াকে বলে,___”বোস।”
ইনায়া কি বলবে বুঝলো না। ফাইজ নিজেই তাকে যেতে বলেছে সেখানে সে কি বলবে? চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসল। শুদ্ধ শব্দ করে ডোর লাগিয়ে গটগট পায়ে হেঁটে এসে ফাইজের সামনে দাঁড়ায়। কাউকে কল করে ফোন লাউডে দেয়। ফাইজ ফারাহ’র হাত ধরে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে শুদ্ধর দিকে। শুদ্ধ নত ফারাহ’র পানে চেয়ে বা হাতে ফোন ধরে আছে। ডান হাত প্যান্টের পকেটে। ফারাহ মাথা উঁচু করে একবার তাকিয়েছিল। শুদ্ধর সাথে চোখাচোখি হতেই ফারাহ চোখ নামিয়ে নিয়েছে। শুদ্ধ একটু ঠোঁট বাঁকালো। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলে কেউ বলে,_____”হ্যাঁ বল।”
শুদ্ধ দৃষ্টি ঘুরিয়ে ফাইজের দিকে তাকায়। মৃদু হেসে বলে,_____”ইনায়াকে নিয়ে আমাদের বাড়ি যাচ্ছি। তুইও চলে আয়।”
!
মামা সত্যি? ইনায়া কবে ওর বরকে ডিভোর্স দিবে মামা? আমার কিন্তুু সহ্য হয় না। মন ডা চায় ওই খাইজরে খু’ন কইরা ফালাই। আমার আর ইনায়ার মাঝখানে আসছে। আমি জানি আমার ইনায়া এখনো পাক্কা ভার্জিন। ইনায়া আমাকে ছাড়া কারো কাছে নিজেকে বিলাইবে না, এই বিশ্বাস আমার আছে। কি রে কথা বলিস না কেন?”
শুদ্ধ হেসে বলে,_____”বললাম ই তো ইনায়াকে নিয়ে যাচ্ছি। তুই আয় আমাদের বাসায়।”
কথাটা বলে লাইন কাটতে দেরি হলেও ফাইজের শুদ্ধর দিকে তেড়ে যেতে দেরি হয়নি। চিৎকার করে বলে,____”আমি তোকে খু’ন করে ফেলব শুদ্ধ।”
শুদ্ধ ভাবলেশহীন। শার্ট টা একটু উঁচিয়ে বলে,____”সেই গরম পড়ছে। চল এসিতে বসে মারামারি করি।”
ফাইজ শুদ্ধকে ধাক্কা দিয়ে দ্রুত পায়ে শুদ্ধর গাড়ির দিকে যায়। শুদ্ধ পিছু ফিরে তাকালো না। ফারাহ’র সামনে দাঁড়িয়ে ফারাহ’র হাত ধরলে ফারাহ চোখ তুলে তাকায়। শুদ্ধর চোখে চোখ পড়ে। শুদ্ধ মলিন মুখে চেয়ে আছে ফারাহ’র দিকে। মৃদুস্বরে বলে,____”অনেক ভালোবাসি।”
ফারাহ’র চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। শুদ্ধ দেখল তা, তবে কিছু বললো না। দ্রুতপায়ে উল্টো ঘুরে তার গাড়ির দিকে এগোয়। ফারাহ কোনো কথা ছাড়াই শুদ্ধর পিছু পা মেলায়।
ফাইজ ইনায়াকে তার গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে শুদ্ধর গাড়ির দিকে তাকালো। ফারাহকে শুদ্ধর পিছু যেতে দেখে সেদিকে পা বাড়িয়ে গলা উঁচিয়ে বলে,____”ফারাহ, তুই শুদ্ধর সাথে যেতে চাস?”
ফারাহ’র পা থেমে যায়। শুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে পিছু ফিরে তাকায় ফাইজের দিকে। বিরক্তি কণ্ঠে বলে,___”ওর শ্বশুরবাড়ি ও যেতে চাইবে না তো কি তোর শ্বশুরবাড়িতে পড়ে থাকবে? আমার বউ বহুত ভালো। তোর মতো ছ্যাছড়া না-কি! আমি তো বুঝেছি, তুই আমার বউয়ের শ্বশুরবাড়ি যেতে চাইছিস ইনডিরেকলি। কিন্তুু আপাতত বেদ্দপ ফাইজের জায়গা আমার বাড়িতে নাই। যা, দূর হো।”
ফাইজ বিরক্ত চোখে তাকালো শুদ্ধর দিকে। এগিয়ে এসে বলল,_____”ফারাহ আমার গাড়িতে গিয়ে বোস।”
ফারাহ নড়লো না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। শুদ্ধ রেগে বলে,___”আমার বউ তোর গাড়িতে বসবে কেন? তোর কি আমাকে ফকির মনে হয়?”
ফাইজ রেগে বলে,___”চুপ করবি তুই?”
শুদ্ধ তার গাড়ির ডোর খুলে ফারাহ’র উদ্দেশ্যে বলে,___”আমার জান, আমার ফারাহ পাখি, উঠে বসো তো পাখি। আমি আর তুমি লং ড্রাইভে যাবো। বাইরের মানুষের কথায় কান দিতে নেই। এরা ফা’ল’তু প্যাঁচাল পাড়তে অভ্যস্ত।”
ফাইজ রেগে বলে,____”এই বে’য়া’দ’ব আমি ওর ভাই!”
শুদ্ধ ফারাহ’র দু’হাত উল্টেপাল্টে চেক করে। এরপর ফাইজের দু’হাতও চেক করে হতাশ কণ্ঠে বলে,____”স্যরি রে বাইরের লোক, আমি তোদের কারো হাতেই প্রমাণ পেলাম না। বিশ্বাস কর, একটা হাতের কোণায় ছোট্ট করেও যদি লেখা থাকতো তবেই তুই আজ আমার ফারাহ পাখিকে নিজের বোন রূপে পেয়ে যেতি! আহারে! তোর কত কষ্ট! বোনকে এতোদিন বোন ভেবে এখন প্রমাণ না পেয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে না রে!
ডান হাত বাড়িয়ে ফাইজের কাঁধে হাত দিয়ে ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলে,____”আমি তোকে পরে মালিশ করে দিব সোনা। চিন্তা করিস না।”
ফাইজের মেজাজ গরম হয়। এর সিরিয়াস মোমেন্টে এসব হেয়ালি পনা এ জীবনে যাবে না। শুদ্ধ মিটিমিটি হাসছে। ফাইজ ফারাহ’র দিকে তাকিয়ে রেগে বলে,___”তুই কি গাড়িতে গিয়ে বসবি?”
শুদ্ধ ফারাহকে বলে,____”ফারাহ পাখি তোমার শ্বাশুড়ি তোমাকে খুব করে দেখতে চেয়েছে। যাবে না?”
ফারাহ শুদ্ধর দিকে তাকায়। শুদ্ধ মৃদু হেসে ফারাহ’র দিকে চেয়ে আছে। ফারাহ মাথা নিচু করে তার ভাইয়ের উদ্দেশ্যে মিনমিন করে বলে,____”আমি শুদ্ধ ভাইয়ের সাথে যেতে চাই।”
ফারাহ’র কথায় ফাইজের চেয়ে শুদ্ধ বেশি অবাক হয়। ফারাহ তো এমন নয়। ত্যাড়ামি করল না কেন? রাজি হলো কেন? শুদ্ধর চোখেমুখে বিস্ময়।৷ সে ভেবেছিল ফারাহকে জোর করেই নিয়ে যাবে, আরও অনেক কসরত করতে হবে। সেখানে ফারাহ নিজেই যেতে চাইছে! শুদ্ধ ভারি অবাক হলো।
ফাইজ উল্টো ঘুরে যেতে যেতে বলে,____”ওকে, আন্টির সাথে দেখা কর। আমি নিতে আসব রাতেই। রাত তিনটে বাজলেও নিতে আসবো।”
শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। দাঁত কিড়মিড় করে বিড়বিড় করে,___”শা’লা ভিলেন, তোমার জন্য আমিও ওয়েট করব। মালিশ করতে হবে তো না-কি!”
শুদ্ধ ফারাহ’র দিকে চাইলে দেখল ফারাহ তার দিকেই চেয়ে আছে। শুদ্ধকে তাকাতে দেখে মেয়েটা চোখ নামিয়ে নেয়। শুদ্ধ মৃদু হেসে যে গালে থাপ্পড় দিয়েছিল, সেখানে আলতো হাত রেখে বলে,____”অনেক ব্য’থা পেয়েছ পাখি?”
ফারাহ চোখ তুলল না। মাথা নিচু রেখেই নিরবে চোখের পানি ফেলে। দুঃখমিশ্রিত অশ্রু শুদ্ধর হাতে এসে ঠেকে। শুদ্ধর হাত কাঁপলো কেন যেন। কিচ্ছু বললো না। মৃদুস্বরে বলে,____”গাড়িতে ওঠো পাখি।”
ফারাহ ধীরে ধীরে উঠে বসল। শুদ্ধ ফারাহ’র ব্যবহারে অবাক হয়। মেয়েটা এমন বাধ্য হয়ে গেল কেন? ভাবনা রেখে সেও ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে পড়ে। এরপর গাড়ি স্টার্ট দেয়। ফারাহ সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বুঝলো। শুদ্ধ ঘাড় বাঁকিয়ে একবার ফারাহ’র দিকে তাকায়। চোখেমুখে অসহায়ত্ব।
.
.
ফাইজ কিছুদূর ড্রাইভ করার পর একটা জায়গায় গাড়ি থামায়। ইনায়া নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে,____”আপনি সত্যি ফারাহ আপুর জন্য পাত্র দেখেছেন?”
ফাইজ ভ্রু কুঁচকে তাকালো ইনায়ার দিকে। ভ্রু নাচিয়ে বলে,___”তোমার কি মনে হয়?”
ইনায়া বোকা চোখে চেয়ে থাকে ফাইজের দিকে। সে কিভাবে জানবে এটা? ফাইজ গাড়ি থেকে বেরিয়ে ইনায়ার পাশের ডোর খুলে দিলে ইনায়া নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে। ফাইজ গাড়ি ডোর লাগিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,____”ওকে টাইট দিয়েছি বুঝলে? তোমার ভাই যে লেভেলের বিচ্ছু। আমার এইটুকু টাইট ওর জন্য কিছুই না।”
এরপর ইনায়া হাত তার ডান হাতে আঁকড়ে নিয়ে বলে,_____”এসব বাদ দাও লিটল কুইন। আমার সাথে এসো।”
ইনায়া পাশ ফিরে দেখল অন্ধকার একটা জায়গা। মিনমিন করে বলে,____”ওদিকে কোথায় যাবেন?”
ফাইজ কিছুদূর এগোয়। ইনায়াও ফাইজের পাশে এগোয়। ফাইজ গম্ভীর গলায় বলে,___”লিটল কুইন একটা সত্যি কথা বলবে? আমি তোমাকে বিলিভ করি। বাট ওই ছেলেটা আমাদের ভেতরের খবর কি করে জানলো? আর তুমিও কেমন যেন…বাদ দিই। তুমি কি অন্যকাউকে লাইক করতে?”
লাস্ট কথাটা বলতে গিলে কণ্ঠ কাঁপলো ফাইজের। নিজেকে সামলে নিয়ে পিছু ফিরে তাকালে দেখল ইনায়া কোনদিকে যেন চেয়ে আছে। ফাইজ দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকালে দেখল সামনে এক অন্ধকার ঝোঁপঝাড়ের মাঝে চেয়ে আছে। সে পিছু ফেরার আগেই ইনায়া এক বিকট চিৎকার দেয়। ফাইজ দ্রুত ইনায়ার দিকে তাকায়। ইনায়া হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে রাস্তায় বসে পড়ে। ফাইজ হতভম্ব। দ্রুত ইনায়ার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে বিচলিত কণ্ঠে বলে,_____”লিটল কুইন? কি হয়েছে তোমার? লিটল কুইন?”
ইনায়া দু’হাতে মুখ চেপে কেঁদে কেঁদে বলে,____”আমায় ছেড়ে দাও প্লিজ। আমি বাড়ি যাবো। আমায় ছেড়ে দাও।”
ফাইজ দ্রুত ইনায়াকে কোলে তুলে নিল। গাড়ির দিকে গিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দেয় ইনায়াকে। কিছু সময় পর ইনায়ার কান্নার তোড় কমে আসে। ফাইজ পানি খাইয়ে দেয় ইনায়াকে। ইনায়া থেকে থেকে কেঁপে উঠছে। ফাইজ সিটে বসে ইনায়াকে তার কোলে নিয়ে নিজের সাথে জড়িয়ে নেয়। মৃদুস্বরে বলে,_____”লিটল কুইন? কি হয়েছে তোমার?”
ইনায়া দু’হাতে ফাইজের গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে। ফাইজ বিচলিত হয়। মৃদুস্বরে বলে,____”ভয় পেয়েছ লিটল কুইন?”
ইনায়া ফোঁপাতে ফোঁপাতে ছোট করে বলে,____”হুম।”
!
“কি দেখে ভয় পেয়েছ?”
ইনায়া কিছু বলে না। বেশ অনেক সময় পেরিয়ে গেলেও ইনায়াকে চুপ থাকতে দেখে ফাইজ এড়িয়ে গেল ব্যাপারটা। আবারও বলে,____”স্যরি! তোমাকে ভুল বুঝেছি মেইবি। বাট কাউকে লাইক করলেও তোমাকে কিছু বলব না। যাকে লাইক কর, তাকে সুন্দর সুন্দর ট্রিটমেন্ট দিব, তুমি ভয় পেও না।”
ইনায়া ফাইজকে ছেড়ে মাথা নিচু করে মিনমিন করে বলে,____”আমার কাউকে পছন্দ ছিল না।”
ফাইজ মিটিমিটি হেসে মৃদুস্বরে বলে,____”তাহলে আমাকে পছন্দ ছিল?”
ইনায়া মাথা উপর-নীচ করে সম্মতি দেয়। ফাইজের হাসি দীর্ঘ হয়। দু’হাতে ইনায়াকে জড়িয়ে বলে,_____”এটা তো জানিই। ভাবলাম ক্রাশ-ফ্রাশ আছে না-কি! তবুও স্যরি লিটল কুইন!”
ইনায়া মাথা নিচু করেই উত্তর করে,____”আপনি আপনার জায়গায় ঠিক আছেন। স্যরি কেন বলছেন? আমি স্যরি!”
ফাইজ ইনায়াকে জড়িয়ে ধরে। মৃদুস্বরে বলে,____”ইট’স ওকে। নো প্রবলেম লিটল কুইন।”
.
.
শুদ্ধ একজায়গায় গাড়ি থামিয়ে গাড়ি থেকে নেমে যায়। ফারাহ বোধয় ঘুমিয়ে গিয়েছে। শুদ্ধ মিনিট পাঁচেক পরেই হাতে একটি প্যাকেট, নাপা সাথে দুটি পানির বোতল নিয়ে আসে। গাড়িতে উঠে বসে গাড়ির ড্যাশবোর্ডের উপর হাতের সবগুলো রেখে দিল। এরপর ফারাহ’র দিকে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। ঘুমন্ত ফারাহ’র মুখ টা কেমন শুকিয়ে গিয়েছে। শুদ্ধ এগিয়ে গিয়ে ডান হাত আলতো করে ফারাহ’র গালে রেখে মৃদুস্বরে ডাকে,____”ফারাহ পাখি?”
বেশ কয়েকবার ডাকলে ফারাহ পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায়। শুদ্ধকে তার মুখের সামনে দেখে একটু নড়েচড়ে ওঠে। শুদ্ধ ফারাহ’র চোখের দিকে চেয়ে মৃদু হেসে বলে,____”ভালোবাসি ফারাহ পাখি।”
ফারাহ কিছু বললো না। চুপচাপ শুধু চেয়ে রইল শুদ্ধর দিকে। শুদ্ধ তার জায়গায় বসে ডান হাতের শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিল। জানালা দিয়ে হাত ধুইয়ে প্যাকেট টি হাতে নিয়ে মুখ খুলল৷ ফারাহ শুদ্ধর দিকেই চেয়ে আছে। প্যাকেটের মুখ খুললে দেখল সেখানে মোরগ পোলাও। এটা তার খুব পছন্দের। ভাবনার মাঝেই শুদ্ধ ফারাহ’র দিকে খাবার এগিয়ে দেয়। ফারাহ হ্যাবলার মতো শুদ্ধর দিকে চেয়ে আছে। শুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে বলে,___”নাও।”
ফারাহ চুপচাপ শুদ্ধর হাত থেকে খাবার নিল। শুদ্ধ প্রশান্তিময় হাসলো। বেশ কিছু সময় নিয়ে শুদ্ধ ফারাহকে পুরোটা খাইয়ে দেয়। কখন যে সব খেয়ে নিয়েছে, শুদ্ধকে দেখতে দেখতে সে খেয়াল-ই নেই মেয়েটার। শুদ্ধ পানি এগিয়ে দিলে ফারাহ প্যাকেট ফাঁকা দেখে বলে,___”তুমি খেয়েছ?”
শুদ্ধ হাত ধুয়ে নিল। এরপর ওষুধের প্যাকেট থেকে ওষুধ ছিঁড়ে ফারাহ’র দিকে এগিয়ে দিয়ে হেসে বলে,___”আমার ফারাহ সুস্থ হলে তার হাতে খাবো।”
ফারাহ বিনা বাক্যে শুদ্ধর হাত থেকে নিয়ে ওষুধ টা খেয়ে নেয়।
শুদ্ধর ফোনে কল আসে। শুদ্ধ পকেট থেকে ফোন বের করে কল রিসিভ করে। কানে ফোন নিয়ে বলে,____”আর পাঁচ মিনিট।”
বলেই কল কেটে গাড়ি স্টার্ট দেয়।
পাঁচ মিনিটের মাথায় শুদ্ধ একজায়গায় গাড়ি থামায়। এরপর গাড়ি থেকে বেরিয়ে ফারাহ’র পাশের ডোর খুলে দিয়ে মৃদুস্বরে বলে,_____”এসো।”
ফারাহ প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে আছে শুদ্ধর দিকে। শুদ্ধ একটুখানি ঝুঁকে মৃদুস্বরে বলে,____”এসো ফারাহ পাখি।”
ফারাহ মাথা নিচু করে গাড়ি থেকে বেরোলে সামনে অন্তরা, নাছিম সহ আরও দু’জন অপরিচিত ছেলেকে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। অন্তরা এগিয়ে এসে ফারাহকে জড়িয়ে ধরে বলে,____”কেমন আছিস?”
ফারাহ মৃদুস্বরে উত্তর করে, ভালো। কিন্তুু এরা সবাই এখানে কেন বুঝলো না। শুদ্ধ ফারাহ’র হাত তার হাতের মুঠোয় নিয়ে সামনে এগোয়। পাশাপাশি সবাই এগোয়। ফারাহ জায়গাটা চিনলো না। শুদ্ধকে কিছু বলতে চাইলে তার আগেই চোখের সামনে বড় করে ‘কাজী অফিস’ লেখা চোখে পড়ে। ফারাহ’র পা থেমে যায়। শুদ্ধ পিছু ফিরে ভ্রু কুঁচকে তাকায় ফারাহ’র দিকে। ফারাহ’র দৃষ্টি অনুসরণ করে বুঝলো ফারাহ’র মনোভাব। এক পা এগিয়ে এসে ফারাহ’র সামনে দাঁড়ালে ফারাহ বিস্ময় দৃষ্টিতে শুদ্ধর দিকে তাকায়। শুদ্ধ দু’হাতের আঁজলায় ফারাহ’র মুখটা আগলে নিয়ে মৃদুস্বরে বলে,____”আমার বউ হবে ফারাহ পাখি?”
ফারাহ নিরব চোখে চেয়ে থাকে শুদ্ধর দিকে। শুদ্ধ আবদার সুরে বলে,___”হবে না?”
ফারাহ চোখ নামিয়ে নেয়। মিনমিন করে বলে,___”কাউকে না জানিয়ে এভাবে….”
শুদ্ধ ফারাহ’র কথার মাঝেই বলে ওঠে,____”নেক্সট ডে মাকে মামাকে তোমাদের বাসায় পাঠাবো। এখন তোমাকে বউ বানাবো এসো।”
ফারাহ কি বলবে বুঝলো না। নাছিম এগিয়ে এসে বলে,____”কি রে ভাই? আর কত টাইম লাগাবি? রাত বিরাতে তোর জন্য আমাদের অনেক ধকল গিয়েছে। বহুত কষ্টে কাজী পাইছি। এবার দয়া করে আয়।”
শুদ্ধ বিরক্তি কণ্ঠে বলে,____”যা তো! ডিস্টার্ব করিস না।”
অন্তরা এগিয়ে এসে বলে,____”আমি বললামই কালকে আন্টি আঙ্কেল কাজী সাথে নিয়ে যাবে নাহয়। কিন্তুু না ওর আজকে মানে আজকেই বিয়ে করা লাগবে! এই আধপাগলের বউ হবি নাকি, সুস্থ কারো বউ হবি ফারাহ? এখনো টাইম আছে। বলে ফেল।”
শুদ্ধ কটমট দৃষ্টিতে তাকায় অন্তরার দিকে। রেগে বলে,___”তোদের জন্যই আমি আজকেই ফারাহকে আমার বউ বানাবো। আমার বউকে নিয়ে তোরা টানাটানি করিস ক্যান? মেজাজ খারাপ লাগে।
তাছাড়া আমার খুব ভালোই জানা আছে। এক সপ্তাহ লাগায়ে বিয়ে করাবে। এমনিতেই ফাইজের বাচ্চা ভিলেনি স্টার্ট করছে। ওর খবর তো আমি পরে করছি।”
কথাগুলো বলে ফারাহ’র দিকে চেয়ে বলে,____”ফারাহ পাখি প্লিজ ত্যাড়ামি কর না, অমত কর না। এসো তো এসো। আগে বিয়ে তারপর কথা।”
কথাটা বলে ফারাহ’র হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়। ফারাহ মাথা নিচু করে শুদ্ধর পাশে হাঁটে। চোখজোড়ায় পানি চিকচিক করছে। ভেতরে গিয়ে শুদ্ধ একটা চেয়ারে বসল, পাশের চেয়ারে ফারাহ। শুদ্ধ হঠাৎ-ই বসা থেকে দাঁড়িয়ে বলে,____” মাথার উপর যে বিয়ের ওড়না থাকে, ওটা কোথায় পাবো?”
শুদ্ধর কথায় নাছিম, অন্তরা সহ আরও দু’জন ফ্রেন্ড ভস্ম করে দেয়া চোখে শুদ্ধর দিকে চাইলো। রাত ১২ টা বাজতে চললো। কত কষ্ট করে এক কাজী যোগার করেছে। আর এই বে’য়া’দ’ব এখন তামাশা করবে। শুদ্ধ সবার দৃষ্টি দেখে মেকি হেসে বলে,_____”জানি বরদের একটু আধটু সুন্দর লাগেই। তোদের চোখ ঠিক কর। আমার বউ থাকতে তোরা এভাবে আমার বউ এর হক নষ্ট করতে পারিস না।”
কথাটা বলে শুদ্ধ তার পরনের সাদা শার্টের বোতাম খুলতে লাগলো। সবাই শুদ্ধর দিকে চেয়ে আছে। শুদ্ধ তার পরনের শার্ট খুলে ফারাহ’র মাথার উপর দিয়ে দেয়। এরপর বলে,___”এটাই বেশি সুন্দর লাগছে।
এরপর ফারাহ’র পাশে বসে কাজি সাহেবের উদ্দেশ্যে বলে,___”নিন এবার শুরু করুন।”
ফারাহ’র চোখ ভেজা। শুদ্ধর কান্ডে অবাক না হয়ে পারলো না। সকলে অদ্ভুদচোখে শুদ্ধর দিকে চেয়ে আছে। নাছিম, অন্তরা সহ তাদের দু’জন ফ্রেন্ড শব্দ করে হেসে দিয়েছে। কাজী সাহেবও মিটিমিটি হাসছে। ফারাহ ল’জ্জা পায়। কান্নামাখা চোখে শুদ্ধর দিকে তাকায়।
শুদ্ধ সবার দিকে তাকিয়ে বলে,___”কি হলো?”
নাছিম হাসি থামিয়ে বলে,___”বউ এর মাথার উপর কিছু একটা দিতে গিয়ে তুই শার্টলেস হয়ে গেলি! তোর বউ এর মাথায় তো হিজাব আছেই।”
শুদ্ধ বিরক্ত হয়ে বলল,____”তোরা বুঝবি না। ফারাহকে সুন্দর লাগছে। ওর মাথার উপর সাদা কিছু থাক, আমার গায়ে সাদা সেন্ডো-গেঞ্জি আছে। এখন বর বউ বর বউ লাগবে।”
শুদ্ধর লজিক শুনে সব মুখ টিপে হাসছে। নাছিম শুদ্ধদের সামনে গিয়ে ফটাফট কয়েকটা পিক তুলে নিল। না হেসে ও পারছেনা। হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল,___”সেই লাগছে আমাদের শুদ্ধ বাবুকে। গায়ে সেন্ডো গেঞ্জি, হাতে দামি ঘড়ি, পায়ে জুতো, ব্ল্যাক প্যান্ট টাও দারুণ। সেন্ডো গেঞ্জি টা একটু বেশিই দারুণ!”
নাছিমের কথায় সবাই হাসছে। শুদ্ধ পাত্তা দিল না। তার যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে বিয়ে করবে। বিরক্ত কণ্ঠে বলে,___”তো আমি কি পাতলু না-কি! যে আমাকে শার্ট ছাড়া আ’বা’ল লাগবে?”
পাশ ফিরে ফারাহ’র দিকে তাকালে দেখল ফারাহ তার দিকে অদ্ভুদ চোখে চেয়ে আছে। শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে তার সেন্ডো গেঞ্জি টেনে বলে,____”তুমি বললে এটাও খুলে ফেলব।”
ফারাহ চোখ সরিয়ে নেয়। শুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে বলে,___”কান্না অফ কর ফারাহ। বিয়ে করছি, কিডন্যাপ নয়।”
ফারাহ মাথা নিচু করে রইল। কিছু বলল না।
প্রথমে রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করে শুদ্ধ। এরপর ফারাহ’র দিকে এগিয়ে দিলে ফারাহ ছলছল দৃষ্টিতে শুদ্ধর দিকে তাকায়। শুদ্ধ আবদারের সুরে বলে,___”স্যরি! আর মারবো না। প্লিজ আমার বউ হয়ে যাও।”
ফারাহ চোখ সরিয়ে সাইন করার জায়গাটায় তাকায়। চোখ থেকে আবারও অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। কাজী ফারাহ কে দেখে সবার দিকে চেয়ে বলে,____”মেয়ে সেই থেকে কাঁদছে তো কাঁদছেই। তোমরা কি মেয়েকে তুলে এনে জোর করে বিয়ে করাতে এনেছ? এরকম হলে আমি বিয়ে পড়াবো না।”
শুদ্ধ রেগে তাকায় কাজীর দিকে। টেবিলের উপর একটা থাপ্পড় মেরে রেগে বলে,____”কাজী কাজীর মতো থাকবেন। নয়তো আমি পাজী হয়ে আপনার জন্য এখন পিস্তল কিনতে বেরুবো।
কথাটা বলে হাতঘড়িতে একবার সময় দেখল। অতঃপর ভদ্রলোকটির দিকে চেয়ে বলে,____”১২ টা বাজতে আর আট মিনিট। যদি ১২ টা বেজেছে আমার বিয়ে পড়াতে, তাহলে আপনার ছেলেমেয়ের কপাল পুড়লো বলে!
১২ টার আগে বিয়ে পড়ানো শেষ করতে পারলে আপনার কপাল খুললো বলে!
আপনি কি নিজের মাথার খুলি উড়াবেন না-কি আমার বিয়ে পড়াবেন?”
শুদ্ধর ফ্রেন্ড রা সব মুখ চেপে হাসছে। কাজী সাহেব একটু ভয়-ই পেল। শুদ্ধ কথাগুলো একদম সিরিয়াস ভাবে বলেছে। কাজী মেকি হেসে বলল,___”হ্যাঁ হ্যাঁ পড়াচ্ছি বাবা।”
অতঃপর ফারাহ’র দিকে তাকিয়ে বলে,___”দ্রুত সাইন করে দাও মা।”
ফারাহ কলম হাতে নিয়ে বসে আছে। শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে আছে ফারাহ’র হাতের দিকে। প্রায় দুই মিনিট অপেক্ষা করল। ফারাহকে একইভাবে বসে থাকতে দেখে মেজাজ খারাপ হলো। এর ভাই তাকে জ্বালায়। আবার এর ত্যাড়ামি এ জনমে তো ছুটবে না। রেগে ধমকে বলে,_____”এ্যাই মেয়ে এ্যাই, এখানে তোমাকে তামাশা করাতে এনেছি। সাইন কর। আর এক মিনিট লেট করলে তোমার হাতের আঙুল-ই রাখবো না। বে’য়া’দ’ব মেয়ে একটা।”
শুদ্ধর ধমকে ফারাহ কেঁপে ওঠে। আবারও চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। শুদ্ধ ডান হাতে ফারাহ’র গাল চেপে তার দিকে ফেরায়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,____”তুমি কি মার খেতে চাইছো ফারাহ পাখি? তুমি চাইলে অবশ্যই আমি মারবো। কিন্তুু সেটা ১২ টার পর। এখন সাইন টা কর চুপচাপ।”
কাজী সাহেব চোখ বড় বড় করে তাকায় শুদ্ধর দিকে।
অন্তরা এগিয়ে এসে জোর করে শুদ্ধর হাত ছাড়িয়ে ফারাহকে তার পেটের সাথে জড়িয়ে ধরে। রেগে বলে,____”তোর প্রবলেম কি শুদ্ধ? ভালোভাবে কথা বলতে পারিস না ওর সাথে? দু’টো ভাই একই নায়ের মাঝি। একজন রকেট তো আরেকজন প্লেন।”
শুদ্ধ রেগে বলে,___”বাইরে ওকে কি সুন্দর করে রাজি হতে বললাম বল তো! এখানে এসে আবার ত্যাড়ামি করছে। ওকে সাইন করতে বল। নয়তো আরেকটা গালে মার খাবে ও এখন।”
অন্তরা ফারাহ’র মুখে হাত বুলিয়ে বলে,____”সাইন করে দে বোন। দেখছিস তো শুদ্ধ কেমন রেগে যাচ্ছে। ফারাহ আড়চোখে শুদ্ধর দিকে তাকালে শুদ্ধর চোখে চোখ পড়লে শুদ্ধ জোরে আরেকবার ধমকে বলে,____”সাইন কর।”
ফারাহ আবারও কেঁপে ওঠে। নাছিম শুদ্ধর পিঠে একটা চাপড় মেরে বলে,___”মাথা এতো গরম হয় ক্যান? ঠাণ্ডা কর।”
শুদ্ধ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,___”ও আমার বউ না হওয়া পর্যন্ত মাথা ঠাণ্ডা হচ্ছে না। ওকে সাইন করতে বল।”
নাছিম ফারাহ’র পিছনে দাঁড়িয়ে বলে,___”ফারাহ তোমাদের রেজিট্রির ব্যাপারে কাউকে বলব না। বলার প্রয়োজনই নেই। কারণ আগামীকাল শুদ্ধর বাসা থেকে তেমাদের বাড়িতে যাবে বিয়ের কথা পাকা করতে। কিন্তুু তোমার ফিউচার বরের কথা সে আজ রাত পার করবে না, তোমাকে বউ না বানিয়ে।তোমাকে তার নামে দলিল করে তবেই ঘুমাবে। বুঝেছ তো? এইটার জন্য কোনো ঝামেলাই হবে না। সাইন কর নাও।”
ফারাহ নাছিমের কথাগুলো মন দিয়ে শুনলো। বা হাতে চোখের পানি মুছে নেয়। এরপর কাঁপা হাতে সাইন করে দেয়।
শুদ্ধ কাজীর দিকে তাকিয়ে বলে,____”বিয়ে পড়ান।”
কাজী শুদ্ধর দিকে কেমন করে তাকিয়ে আছে। শুদ্ধ কাজীকে চুপ দেখে রেগে বলে,____”আপনার কি খুলি উড়ানোর শখ জেগেছে? পাঁচ মিনিট ওয়েট করুন।”
কথাটা বলে উঠে দাঁড়ালে কাজী দ্রুত কিছু পড়া শুরু করে। শুদ্ধ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে আবারও চেয়ারে বসে পড়ে। ইসলামিকভাবে বিয়ে পড়ানো হয়ে গেলে শুদ্ধ ফারাহ’র হাত ধরে বাইরে বেরিয়ে আসে। ফারাহ’র মাথার উপর থেকে শার্ট টা নিয়ে ফারাহ’র সামনে দাঁড়িয়ে শার্ট পরতে থাকে। অন্তরা এগিয়ে এসে শুদ্ধর উদ্দেশ্য বলে,____”আমার বোনকে আর যদি মেরেছিস বা বকেছিস, তোর খবর আছে বলে দিলাম।”
শুদ্ধ শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে ফারাহ’র নত মুখপানে চেয়ে মৃদু হেসে বলে,____”কোনোটাই করব না, আদর করবো শুধু।”
অন্তরা মুখ বাঁকিয়ে যেতে যেতে বলে,___”দেখি মারিস কি-না আর। আর একদিন শুনলে আমি ফারাহ’র বাবার কাছে বিচার দিয়ে আসবো সোজা।”
শুদ্ধ বিরক্ত হলো। কিন্তুু কিছু বলল না। সে ফারাহ’র দিকে চেয়েই শার্টের সবগুলো বোতাম লাগালো। এরপর ফারাহ’র হাত ধরে গাড়িতে গিয়ে বসে। প্রায় ১০ মিনিট ড্রাইভ করে এক জায়গায় গাড়ি সাইড করে। ফারাহ মাথা নিচু করে বসে আছে। একবারও তাকায়নি শুদ্ধর দিকে।
শুদ্ধ ফারাহ’র পাশের ডোর খুলে কিছু না বলেই ফারাহকে কোলে তুলে নিল। ফারাহ চোখ বড় বড় করে তাকায়। কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। অভিমানে ঘিরে চুপ করে রইলো।
শুদ্ধ ফারাহকে কোলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মৃদু হেসে ফিসফিসিয়ে বলে,____”এ্যাই ফারাহ বউ পাখি, আমি এখন থেকে অনুমতি বিহীন অনেককিছু করার সার্টিফিকেট পেয়েছি, জানো?”
ফারাহ’র ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠল। কিছু বললো না। চারপাশটা কেমন ফাঁকা। শুদ্ধ বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে ফারাহকে এক জায়গায় নামিয়ে দেয়। ফারাহ খেয়াল করল তারা নদীর পাড়ে এসেছে। শুদ্ধ ফারাহ’র দিকে চেয়ে আছে। ফারাহ নদীতে টলমল পানির উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে শুদ্ধর দিকে তাকালে দেখল শুদ্ধ কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে। আশেপাশে কৃত্রিম কোনো আলো নেই। তবে চাঁদের আলোয় খুব বেশি অস্পষ্ট লাগলো না। ফারাহ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। শুদ্ধ হঠাৎ-ই ফারাহকে শক্ত করে জড়িয়ে নেয় নিজের সাথে। থেমে থেমে বলে,____”ফারাহ পাখি এখন থেকে আমার বউ। আমার তো বিলিভ-ই হচ্ছে না। উফ এতো শান্তি কোথায় রাখি!”
ফারাহ ঢোক গিলে। শুদ্ধ ফারাহকে ছেড়ে দাঁড়ায়। যে গালে থাপ্পড় দিয়েছে সে গালে অসংখ্য চুমু আঁকলো ছোট ছোট। কতবার যে স্যরি বললো! ফারাহ শুদ্ধ কে ঠেলে মাথা নিচু করে বলে,___”আর স্যরি বলতে হবে না।”
শুদ্ধ দু’হাতে ফারাহ’র গাল আঁকড়ে নিয়ে অসহায় কণ্ঠে বলে,_____”তুমি রাগ করেছ ফারাহ পাখি? আমি তোমায় হসপিটালে অনেক খুঁজেছিলাম। স্যরি! আর মারব না। আর বকবোও না। বিয়ের আগে তোমাকে চিনতাম না। ওসব ভুলে যাও। এখন আমার একটামাত্র বউ তুমি।”
ফারাহ অদ্ভুদভাবে তাকালো শুদ্ধর দিকে। বিয়ের আগে তাকে চিনতো না? এটা ভাবতে হবে? শুদ্ধ পকেট থেকে ফোন বের করে ফ্লাস জ্বালায়। এরপর ফারাহ’র হিজাব টা খুলে দেয়। ফোনের ফ্লাস নিয়ে ফারাহ’র গলা চেক করে। দাগ মুছে যায়নি এখনো। বা হাতে ফোন ধরে ডান হাতে গলায় হাত বুলিয়ে মৃদুস্বরে বলে,____”ব্য’থা আছে?”
ফারাহ মাথা নিচু করে দু’দিকে মাথা নাড়ায়। অর্থাৎ নেই। শুদ্ধ ফোনের ফ্লাস অফ করে পকেটে রাখলো ফোন। ফারাহ কিছু বোঝার আগেই শুদ্ধ ফারাহকে তার দিকে টেনে ফারাহ’র গলায় ছোট ছোট চুমু আঁকে। ফারাহ কারেন্ট শক খাওয়ার মতো কেঁপে ওঠে। শুদ্ধ মৃদু হাসে। একটু পর মাথা তুলে তাকায়। দু’হাতে ফারাহ’র মুখ আগলে নিয়ে ফারাহ’র কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে মৃদুস্বরে বলে,____”বিয়ের জন্য এই কাজ পেন্ডিং এ ছিল। আরও অনেককিছু পেন্ডিং এ আছে। কিন্তুু আজ তোমাকে ছুটি দিচ্ছি ফারাহ পাখি।
______________
ক্লান্তিতে নুইয়ে পড়া সূর্যটা ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। আশেপাশে বড় বড় বিল্ডিং তার ফাঁকে সূর্য ডোবার দৃশ্য একটু একটু দেখা গেল। মাইরা বেলকনির মেঝেতে মন খারাপ করে বসে তা দেখল। কলেজ থেকে ফিরেছে একটু আগে। ইরফান রেখে গিয়েছে তাকে। ভেতরে আসেনি। তাকে নামিয়ে দিয়েই কোথায় যেন চলে গেল। এটা একটা মাইরার মন খারাপের কারণ। মাইরা জিজ্ঞেস করেছিল, কোথায় যাবে। ইরফান ছোট করে উত্তরও করেছিল, অফিস। মাইরা জড়তা কাটিয়ে খেতে আসতে বলায় ইরফান বিরক্তি কণ্ঠে বলেছিল, ‘নো নিড’।
গতকাল তো ইরফান তার সাথেই এসেছিল। তাহলে আজ কেন আসলো না? এটা একটা মন খারাপের কারণ। তার মন খারাপের পিছনে আরও একটা কারণ আছে। হঠাৎ-ই গতকালকের বলা ইরফানের দাদির একটা কথা মনে পড়লো। তার ছেলের না-কি এমন ঘটনা ঘটেছিল। অর্থাৎ ছেলে ঘরের বউ রেখে বাইরের মেয়েদের সাথে জড়িয়ে গিয়েছিল। যদি ইরফান এমন করে? এই ভাবনা টুকুই মেয়েটার মন তীব্র খারাপ করে দেয়। ভীষণ বিষন্নতা ঘিরে ধরে ছোট্ট মাইরাকে। তার উপর গতকাল রাতের ঘটনা নিয়ে মাইরা ভীষণ আপসেট।
ভাবনার মাঝেই ঘরের ভেতর থেকে ইরফানের দাদির কণ্ঠ পেয়ে মাইরা বেলকনির মেঝে থেকে উঠে ঘরে আসে। ইরফানের দাদিকে বেডের উপর বসে থাকতে দেখে মাইরাও এগিয়ে গিয়ে বসল দাদির পাশে। ইরফানের দাদি মাইরার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে,___”আরে মেয়ে তুমি আবার জামা পরেছো কেন? আমি যে শাড়িগুলো তোমাকে দিলাম। ওগুলো কি করেছ?”
মাইরা মিনমিন করে বলে,____”রেখে দিয়েছি।”
!
আহা! তুলে রাখলে তো হবে না। সবসময় পরে থাকতে হবে মাইরা। আমার কথা বুঝতে পারছো না তুমি?”
মাইরা শাড়ি না পড়ায় বয়স্ক মহিলা অসন্তুষ্ট হলেও মাইরা কোনো গহনা খোলেনি এতে বেশ সন্তুষ্ট তিনি। ফুলের মতো মেয়ে। গহনাগুলো পড়লে মেয়েটা কেমন জ্বলজ্বল করে চোখে লাগার মতো।
মাইরা আজ ইরফানের দাদির কথায় রিয়েক্ট করল না। পা দু’টো তুলে ভালোভাবে বসে খুব সিরিয়াস হয়ে প্রশ্ন করে,_____”দাদিমা ছেলেরা বাইরের মেয়েদের দিকে কেন নজর দেয়?”
ইরফানের দাদি মাইরার গালে হাত দিয়ে বলে,____”যারা খারাপ মানুষ, তারাই ঘরে বউ রেখে বাইরের মেয়েদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তবে কখনো কখনো বউরা মুখ ফিরিয়ে নিলেও ছেলেরা বাইরে নজর দেয়। তখন ছেলে মেয়ে দু’জনেরই দোষ থাকে। আবার বউ মন মতো না হলেও এমন হতে পারে।”
মাইরা ঢোক গিলল দ্বিতীয় কারণ টা শুনে। ইরফানের দাদি আবারও বলে,____”এজন্য তুমি আমার দাদুভাইয়ের কাছে কাছে থাকবে, তাহলে তোমার এসব চিন্তা থাকবে না। আমার ছেলের ক্ষেত্রে এমন হয়েছিল, বুঝেছ? তার থেকে ছোট বয়সী মেয়েকে বিয়ে দেয়ায় মানছিল না। বাইরের মেয়েদের সাথে মেলামেশা করতো। পরে অবশ্য ভালো পথে এসেছিল। কিন্তু তোমরা তো এতোটাও ছোট না তাই না? এটা আমাদের পরের জেনারেশন রা বুঝতে চায় না। আমার ছেলের কাহিনী টা তো ইরফানের কাছে এসে রিপিট হয়েছে। এজন্য আমি আরও আগে আসতে চেয়েছিলাম। তুমি শাড়ি পরলে তোমাকে বড়দের মতো দেখায়। আমার ইরফান দাদুভাই তাহলে আর তোমাকে ছোট বলবে না। বউকে নিয়েই সংসার করবে, বুঝেছ?”
মাইরা চুপ করে শুনলো। সে তো গতকাল ফিরিয়েই দিয়েছিল ইরফানকে। তাহলে ইরফান কি তাকে ভুলে যাবে? অন্যমেয়েদের কাছে যাবে? ভাবতেই গলা শুকিয়ে আসলো। বেড থেকে নেমে টেবিলের উপর থেকে এক গ্লাস পানি খেয়ে নেয়। সে কি অনেক বড় হয়ে গিয়েছে? তার তো ১৬ বছর হতেই এখনো দুই মাসের মতো বাকি।
স্বামীরা কি বউদের সুযোগ দেয় না? স্কুলে পড়ায় সময় তার বান্ধবীদের সাথে এসব নিয়ে অনেক মজা করতো। কিন্তু নিজেদের কখনো এই সিচুয়েশনে বসিয়ে ভাবেনি তো। আজ সে নিজে সেই সিচুয়েশনে পড়ে তার দমবন্ধ লাগছে। ইরফান তাকে আগের মতো মনে রাখবে না, যত্ন করবে না, এসব যেমন মানতে পারে না, তেমনি এই ব্যাপারে সে সহজ হতে পারে না। পারছে না। তাহলে কি হবে তার? তার তো পরিবারও নেই! আছে, তবে সেখানে তো তার জায়গা নেই। চোখজোড়া ভিজে উঠল।
ইরফানের দাদিকে কেউ কল দিয়েছে। তিনি কথা বলায় ব্যস্ত হলেন। মাইরা ধীর পায়ে আবারও বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। বেলকনির রেলিং মাইরার কোমড় পর্যন্ত। উপরের দিকে ফাঁকা। মাইরা হালকা নিচু হয়ে দু’হাত রেলিং এর উপর রাখে। খানিকটা ঝুঁকে বিষন্ন মনে চেয়ে ব্যস্ত শহর টায় চোখ বুলায়। গাড়ি আসছে, যাচ্ছে। ইরফানের গাড়ি খুঁজতে অজান্তেই কখনো কখনো মাইরার চোখের মণি ছোটাছুটি করে।
.
.
মাইরা এশার নামাজ পড়ে রাত নয়টায় বেডের এক কোণায় হাঁটু মুড়ে বসেছে। মাঝেমাঝে একটু নড়েচড়ে আবারও সেভাবেই বসে চুপচাপ কি যেন ধ্যান করে। একটু পর পর ঘড়িতে সময় দেখে। ১১ টা ৩০। মাইরার ভালো লাগছে না কিছু। ইরফানের দাদির কথাগুলো সে হজম করতে পারছে না। ইরফান আসে না কেন? এতোক্ষণে তো চলে আসতো! আজ আসে না কেন? আরও ২০ মিনিট এভাবে বসে থাকলো। এরপর বেড থেকে নেমে বাংলা বই নিয়ে সোফায় বসল। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথ এই সাবজেক্ট গুলোর টিচার লাগবে তার। এসব তো তার মাথার উপর দিয়ে যায়। বাংলা বই খুলে কবিতা বের করল একটা। বাংলা পড়তে তার ভালো লাগে বরাবরই। কিন্তুু আজ মন বসছে না। এক লাইন পড়ে আর ঘড়ি দেখে নয়তো ভাবনায় ব্যস্ত হয়। এভাবে প্রায় ৫০ মিনিট পার করল। ঘড়ির কাটা ১২ টার ঘরে। মাইরার সবকিছু অসহ্য লাগছে।
দুঃখে চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। ইরফান আসে না কেন? তাকে ভুলে যাচ্ছে? ইরফানের দাদির বলা কথাগুলো ভাবতেই চোখের পানি বইয়ের উপর টুপ টুপ করে পড়লো। মাইরা বিরক্ত হয়ে বইটা ঠাস করে সেন্টার টেবিলের উপর রেখে সোফার উপর ডান কাত হয়ে শুয়ে পড়ে। এভাবে থাকতে থাকতেই একসময় মাইরা ঘুমিয়ে পড়ে।
.
ঘড়ির কাটায় তখন রাত ১ টা। ইরফান বাসার ভেতর প্রবেশ করে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে নিলে তার গ্রান্ডমা-র কথায় থেমে যায়।
“দাদুভাই তোমার বউকে পছন্দ হয়েছে?”
ইরফান ভ্রু কুঁচকে তাকায় তার দাদির দিকে। গম্ভীর গলায় বলে,____”নো।”
ইরফানের দাদি হেসে বলে,___”এতো সুন্দর সারপ্রাইজ দিলাম। তবুও পছন্দ করলে না?”
ইরফান কিছু বলল না। মাইরারকে যে তার গ্রান্ডমা-ই শাড়ি + গহনা দিয়েছে, এটা সে মাইরাকে দেখেই সে বুঝেছিল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে বলে,___”এসব ফা’ল’তু সারপ্রাইজ আর অ্যারেঞ্জ করবে না।”
ইরফানের দাদি মিটিমিটি হেসে বলে,___”কি বলো? আমি তো এসেছি-ই এজন্য দাদুভাই। আজকে সারপ্রাইজ আছে।”
ইরফান বিরক্তি হলো। আজ আবার কি করল? তবে পাত্তা দিল না। গটগট পায়ে তার রুমের দিকে এগিয়ে যায়।
ইরফান তার ঘরের ভেতর প্রবেশ করে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। ঘর অন্ধকার। তার আজ লেট হয়েছে, মাইরা হয়তো ঘুমিয়েছে। তবে মাইরা তো জিরো লাইট জ্বালিয়ে রাখে। ইরফান উল্টো ঘুরে দরজা লক করে দেয়। এরপর ঘরের সব সুইচ অন করল। কিন্তুু আলো জ্বলে না। ইরফান একে একে প্রতিটা সুইচ অন করলে একটাও জ্বলে না। বিরক্ত হলো ছেলেটা। এমনিতেই কাজের চাপে মাথা হ্যাং হয়ে আছে তার মধ্যে আরেক ঝামেলা। পকেট থেকে ফোন বের করে ফ্লাশ অন করে।
একটু একটু আওয়াজে মাইরার ঘুম হালকা হয়। চোখজোড়া মিটমিট করে খোলে, ঘুমঘুম চোখে একদম অন্ধকারের মাঝে একটা ছায়ামূর্তি দেখে সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে ওঠে। শরীর নড়ে ওঠে। সোফায় কোণায় এসে পড়ায় সোফা থেকে ঠাস করে মেঝেতে পড়ে যায়।
ইরফান হতভম্ব। দ্রুত বেডের দিকে ফোনের ফ্লাশ তাক করে দেখল বেড ফাঁকা। ধপ করে কিছু পড়ার শব্দ পেয়ে ইরফান দ্রুত পায়ে বেডের ওপাশে চেক করে তবুও ফাঁকা দেখে। ইরফানের চোখেমুখে ভীতি। এতো জোরে চিৎকার, সাথে পড়ে যাওয়া। কোথায় তার বার্ডফ্লাওয়ার? দ্রুত বেলকনির দিকে যেতে নিয়েও পিছু ফিরে আসে সোফার কাছে শব্দ পেয়ে। একপ্রকার দৌড়ে এসে সোফার সামনে থেকে সেন্টার টেবিলে বাম দিকে একটা জোরেসোরে লাথি দেয়, ফলস্বরূপ সেন্টার টেবিল বেশ অনেকটা দূরে ছিটকে সরে যায়। ইরফান ফোনের ফ্লাশ মেঝের দিকে ধরলে দেখল মাইরা উপুড় হয়ে পড়ে আছে। ইরফান দ্রুত হাঁটু মুড়ে বসে হাতে ফেন মেঝেতে উল্টো করে রেখে মাইরাকে দু’হাতে আগলে নেয়। বিচলিত কণ্ঠে আওড়ায়,____”আর ইউ ওকে?”
মাইরার শরীরে যেন শক্তি নেই। এই ইহজীবনে এতো ভয় পেয়েছে কি-না তার মনে পড়ে না। শরীর কাঁপছে মেয়েটার। ইরফান হাঁটু মুড়ে বসেই দু’হাতে মাইরাকে সোফার উপর শুইয়ে দিল। মাইরার শরীরের কাঁপন বুঝতে পেরে ইরফান মাইরাকে তার বুকে জড়িয়ে নিল। মাইরা পেটে ব্য’থা পেয়েছে ভীষণ। সাথে ভয়ে আত্মার পানি শুকিয়ে গিয়েছে, তার রেশ-এ এখনো শরীর কাঁপছে না চাইতেও। ইরফান মাইরার গালে ডান হাত দিয়ে মৃদুস্বরে বলে,____”I am here, don’t worry little girl.”
মাইরার এতো অভিমান হলো এই লোকটার উপর। সে কতক্ষন অপেক্ষা করতে করতে এখানে ঘুমিয়ে গিয়েছিল বুঝতেই পারেনি। অতিরক্তি ভয়ে চোখের কোণে জমে থাকা পানির সাথে অভিমানী অশ্রু মিশ্রিত হয়ে চোখের কোণ ঘেষে গড়িয়ে পড়ে। মাথা বাঁকিয়ে ইরফানের বুকে মুখ ঠেকিয়ে রাখলো। ইরফান মাইরার গলা চেক করলে দেখল মেয়েটা ঘেমে গিয়েছে। ইরফানের এতো রাগ হলো তার গ্রান্ডমা-র উপর। গ্রান্ডমা যদি তার চেয়ে ছোট হত, আজ গুণে গুণে একশ টা থাপ্পড় দিত ইরফান তাকে।
চলবে ইনশাআল্লাহ~~
🟥[শব্দসংখ্যা – ৫৩০০ +
সবাই রেসপন্স করবেন। আগামী বৃহস্পতিবার গল্প পাবেন ইনশাআল্লাহ। ]
আইডি লিংক:
https://www.facebook.com/DrmShohag.Modhu
গল্প সম্পর্কে আপডেট পেতে ও গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গ্রুপে জয়েন হয়ে নিন। গ্রুপ লিংক:
https://facebook.com/groups/437119506098736

