#প্রণয়ের_অমল_কাব্য
#Writer_DRM_Shohag
#পর্ব_৭৫ [শেষাংশ]
[Page – DrmShohagHoney]
প্রায় সপ্তাখানেক পর ইরফান নাছিমদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেয়। এই শহরে নাছিমদের নিজের বাড়ি আছে, কিন্তু সেখানে নাছিমকে পায়নি, তার মাকেও পায়নি। আশেপাশে জিজ্ঞেস করলেও কোনো খোঁজ পায়নি ইরফান।
বেশ কয়েকদিন পর ইরফান মাইরাদের গ্রামে গিয়েছিল, সেই গ্রামে নাছিমদের আত্মীয় থাকে শুনেছিল, সেখানে গিয়েও কোনো খোঁজ পায়নি। যেন নাছিম নামের কোনো অস্তিত্ব-ই নেই। তাকে একটা কথা বলার সুযোগ না দিয়েই হারিয়ে গেল! আবারও ভুলে যেতেও বললো। সে বলেছিল, এসব ভুলে যাওয়ার টপিককে সে হেইট করে। অথচ নাছিম তাকে সেই অফার করে অদৃশ্য হয়েছে।
দেখতে দেখতে প্রায় ৬ মাস পেরিয়েছে। নাছিমদের বাড়ি গিয়ে প্রায়-ই খোঁজ নেয় ইরফান।
পরিচিতদের সবার কাছেই খোঁজ নিয়েছে, এখনো মাঝে মাঝেই খোঁজ নেয়, কিন্তু কোথাও পায়নি এখনও পায়না।
কথাগুলো ভেবে ইরফান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সেদিনের পর নাছিমের সিম একবারের জন্য-ও অপেন হয়নি। ইরফান অনেক ট্রাই করেছে। কিন্তু কোথাও কোনো হদিস পায়নি। বুকে দু’হাত আড়াআড়িভাবে রেখে চোখ বুজে নেয়।
লাইফে ফার্স্টটাইম নাছিম ইরফানকে বাইক রাইডে হারিয়েছিল। ইরফানকে হারাতে পেরে যেন নাছিমসহ, শুদ্ধ, ফাইজ-ও খুশি হয়েছিল। ইরফান বিরক্ত চোখে ওদের তিনজনকে দেখছিল। তার গায়ে জ্বর ছিল। ওরা তিনজন কথা বলার ফাঁকে নাছিম খেয়াল করেছিল ইরফানের চোখ লাল। এগিয়ে এসে যখন দেখল ইরফানের গায়ে জ্বর, তখন ইরফানকে রে’গে কথা শুনেয়েছিল। ইরফান-ও রে’গে নাছিমকে ধাক্কা দিয়েছিল। কেউ তার উপর কথা বলবে, এসব সে নিতে পারেনা। ইরফানের রা’গকে পাত্তা না দিয়ে শুদ্ধ, ফাইজ, নাছিম সবাই রে’গে কথা শুনিয়েছিল।
শুদ্ধর কথা ছিল,
– এ তো শা’লা ম’রে চাঁদে গিয়ে আরামসে ঘুমাবে। আর আমরা পা’গ’লা হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরব। বে’দ্দ’প।
নাছিমের কথা ছিল,
– শা’লা তোর বাইক ভে’ঙে টুকরো টুকরো করে ভা’ঙা’চুরা হিসেবে বেঁচে হাওয়াইমিঠাই কিনে খাবো। তখন হাওয়ায় বসে রাইড করিস।
ফাইজও কিছু বলেছিল হয়তো। ইরফান না শুনেই তার বাইক স্টার্ট দিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়। নাছিম দ্রুত তার বাইকে উঠে ইরফানের পিছু পিছু আসছিল আর বলছিল,
– এ্যাই বে’য়া’দ’ব দাঁড়া। আজ শুধু এক্সিডেন্ট করে দেখ!
ইরফান বাইকের স্পিড আরও বাড়ায়। নাছিম বিরক্ত চোখে তাকায়। মনে মনে দোয়া করে, এর মতো ঘাড়ত্যাড়া বন্ধু যেন কারো না হয়। আবারও চেঁচিয়ে বলে,
– এই ত্যাড়ার বাচ্চা দাঁড়া,, বা’ল একটা।
ইরফান পাত্তা দেয়নি। সে তো এমন-ই। তবে আজ কথাগুলো ভেবে কেন যেন ঠোঁটের কোণে আপনাআপনি একটুখানি হাসি ফুটল। আবার তা মিলিয়ে যেতেও সময় লাগলো না।
মাইরা রান্নাঘর থেকে তার জন্য পরোটা এনে টি-টেবিলের উপর রাখে। ইরফানের ব্ল্যাক কফি-ও রাখে। এরপর ইরফানের সামনে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কিছু হয়েছে না-কি? এভাবে আছে কেন? মাইরা ইরফানের পিছনে দাঁড়িয়ে দু’হাত ইরফানের মাথার চুলের ভাঁজে গলিয়ে দেয়।
নিজের মাথায় ছোট নরম হাতের স্পর্শ পেয়ে ইরফান একটু হাসলো। তবে চোখ খুলল না। মাইরা একটু ঝুঁকে প্রশ্ন করে,
– আপনার কি মাথা ব্য’থা করছে?
ইরফান তার বা হাত পিছনে দিয়ে মাইরাকে ঘুরিয়ে টেনে এনে তার কোলে বসায়। মাইরা চোখ ছোট ছোট করে বলে,
– কি হয়েছে আপনার?
ইরফান মাইরার দিকে তাকিয়ে রইল। মাইরা আগের চেয়ে একটু লম্বা হয়েছে, সাথে একটু মোটা-ও হয়েছে। দু’গালে হালকা মাংস ধরেছে। ভালো লাগে বেশ। মাইরা ইরফানকে ঠেলে বলে,
– ধ্যাত! ছাড়ুন তো! আমার কলেজ আছে।
ইরফান গম্ভীর গলায় বলে,
– আজ কলেজ যেতে হবে না।
মাইরা গালে হাত দিয়ে বলে,
– আমার কলেজে এক্সাম চলছে। আমি সেকেন্ড ইয়ারে উঠব না?
কথাটা বলে ইরফানের পাশে বসে কোলের উপর পরোটার প্লেট নিয়ে খেতে থাকে। আর সামনে বই মেলে রেখেছে।
ইরফান কফি খেতে খেতে মাইরাকে দেখল। মাইরা পড়ছে বলে আর ডিস্টার্ব করল না।
মাইরা তার খাবার শেষ করে কলেজ ড্রেস এর বোরখা পরে নেয়। জট লেগে যাওয়া চুলগুলো আঁচড়ানোর জন্য চিরুনি হাতে নেওয়ার আগেই ইরফান তার হাতে তুলে নেয় চিরুনিটি। মাইরা পিছু ফিরে বলে,
– কি করছেন? দিন আমাকে।
ইরফান মাইরাকে উল্টো ঘুরিয়ে দিয়ে মৃদুস্বরে বলে,
– আমি করছি।
মাইরা ভ্রু কুঁচকে বলে,
– আপনি পারবেন না। আমার চুলে অনেক জট।
ইরফান দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
– আই ক্যান ডু এভরিথিং।
মাইরা কোমরে হাত দিয়ে আয়নার ভেতর ইরফানকে দেখতে লাগলো। যে খুব মনোযোগ দিয়ে চুলের জট ছাড়াতে ব্যস্ত। মাইরার ভালোই লাগছে। সময় লাগলেও ইরফান সব জট ছাড়িয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল যেন বিরাট বড় অসাধ্য সাধন করেছে।
এরপর মাইরার চুলে বেনি করা স্টার্ট করে।
এই বেনি শিখতে ইরফান পুরো এক মাস লাগিয়েছে। মাইরা ভীষণ বিরক্ত হতো। ইরফান ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার চুল নিয়ে বসে থাকতো, কিন্তু পারতো না। উল্টে জট পাকিয়ে ফেলতো। মাইরা বিরক্ত হতো বলে, মাইরা ঘুমিয়ে গেলে ইরফান মাইরার চুলগুলো নিয়ে চেষ্টা করতো, এভাবে প্রায় ১ মাস পর সে সফল হয়েছে। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিন-ই মাইরার চুলে সে-ই বেনি করে দেয়। মাইরার চুলে দু’টো বেনি করে, বেনি দু’টো কাঁধের দু’পাশে দিয়ে মাইরার দিকে চেয়ে বলে,
– সি!
মাইরা হেসে বলে,
– হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি সব পারেন, আমি তো জানি-ই। আসলে হাসবেন্ড টা কার, দেখতে হবে না?
কথাটা বলে ইরফানের সামনে থেকে দৌড় দেয়। এরপর কাভার্ড থেকে তার হিজাব বের করে। ইরফান আড়চোখে মাইরার দিকে তাকালো। একটু হাসলো বোধয়। এরপর ওয়াশরুমে যেতে যেতে বলে,
– শাওয়ার শেষে বেরিয়ে যেন দেখি রেডি কমপ্লিট।
মাইরা মুখ বাঁকায়। নিজেই একটা লেট লতিফ, আবার তাকে বলে।.
.
.
.
ফারাহ শুদ্ধর সাথে গ্রামে এসেছে দু’দিন আগে। আজ ফিরে যাবে শহরে। আগামীকাল শুদ্ধর ভার্সিটেতে ক্লাস আছে। ফারাহ’র ও আছে।
তৃণা বেগম তিলের নারু বানিয়ে একটি বৈয়াম ভরিয়ে দিল। শ্বাশুড়ির হাতের এই নারু ফারাহ’র ভীষণ পছন্দ। তৃণা বেগম আরও দুটি বৈয়াম ভরিয়ে দিলেন মাইরা আর ইনায়ার জন্য।
এরপর ফারাহ’র দিকে চেয়ে বলে,
– একটু ভাত খেয়ে যাও আম্মু।
ফারাহ এতোক্ষণ বসে বসে শ্বাশুড়ির হাতের নারু খাচ্ছিল। মুখের টুকু গিলে হেসে বলে,
– মা আপনার হাতের নারু সামনে থাকলে পেটে ভাত খাওয়ার জায়গা পাইনা, কি করব?
তৃণা বেগম হাসলেন। ফারাহ পানি খেয়ে বলে,
– আপনি চলুন না আমাদের সাথে। আপনার ছেলে আবার রেখে যাবে আপনাকে।
তৃণা বেগম হেসে বলে,
– তোমরা আবার কয়েকদিন পরেই আসবে। আমার শহরে ভালো লাগেনা মা। তোমরা এখানে একেবারে চলে এসো।
ফারাহ ভাবুক ভঙ্গিতে বলে,
– আমার ভার্সিটি শেষ হলে আমি সত্যিই এখানে পার্মানেন্ট হয়ে যাবো।
– হ্যাঁ দোয়া করি, দ্রুত শেষ হোক তোমার ভার্সিটি। তারপর মা মেয়ে একসাথে থাকবো।
পিছন থেকে শুদ্ধ বলে,
– হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি গরুর খামার দিব। তোমরা দু’জনে মিলে গরুর পারফিউম ওয়ালা ডার্ক চকলেট পরিষ্কার করবে।
তৃণা বেগম ছেলের কথায় হেসে ফেলে। ফারাহ-ও হেসে বলে,
– আর ওই চকলেট গুলো তোমাকে যত্ন করে খাওয়াবো। হাজার হোক, তোমার আবার ডার্ক চকলেট একটু বেশিই পছন্দ!
শুদ্ধ হেসে বলে,
– আহারে বউ আমার! মুরগির পেছন থেকে ইন্ডিয়ান চকলেট বের হয়। তোমার তো ইন্ডিয়ান চকলেট বেশি পছন্দ। আমি তোমাকে অবশ্যই খাওয়াবো।
ফারাহ চোখমুখ কুঁচকে নেয়। তৃণা বেগম হাসতে হাসতে বলে,
– তোরা থাম। কি শুরু করলি দু’জনে!
ফারাহ মুখ বাঁকায়। শুদ্ধ হাসলো। এগিয়ে এসে বলে,
– বিকালের আগেই বের হব। দ্রুত রেডি হয়ে নাও ফারাহ।
_________________________________
মাইরার কলেজ শেষে মাইরা ইরফানের সাথে ফাইজদের বাড়ি এসেছে। মূলত মাইরা ইরফানকে টেনে এনেছে। ইনায়া প্রেগনেন্ট হওয়ার পর থেকে ফাইজ ইনায়াকে বাসা থেকে বের হতে দেয় না। এজন্যই মাইরা ইনায়াকে দেখতে এসেছে।
ইরফান মাইরার হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। ইরফানের ফোনে কল আসায় পকেট থেকে ফোন বের করতে মাইরার হাত ছেড়ে দেয়। মাইরা ছাড়া পেয়ে একপ্রকার দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। একটা উস্টা খেয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে যায়। ইরফান রে’গে তাকায় মাইরার দিকে। ধমকে বলে,
– স্টুপিট থা’প্প’ড় খাওয়ার জন্য বাঁদরের মতো লাফালাফি করছ?
মাইরা ইরফানের দিকে চেয়ে বলে,
– আমি পড়ে যাচ্ছিলাম, সমবেদনা না জানিয়ে উল্টে বকছেন। একটু মধু দিয়ে কথা বললে কি হয় আপনার?
মাইরার কথা শুনে ইরফান একটু হাসলো। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। মাইরা ইনায়াদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ইরফান দ্রুতপায়ে এগিয়ে গিয়ে মাইরার সামনে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলে,
– মধু লাগবে তোমার?
মাইরা ইরফানের কথাটা বোঝার চেষ্টা করছে। তার ভাবনার মাঝেই ইরফান মাইরার ঠোঁটজোড়া আঁকড়ে ধরে। মাইরা চোখ বড় বড় করে তাকায়। ইরফানকে ঠেলে সরাতে চায়। কয়েক সেকেন্ড পর ইরফান নিজেই মাইরাকে ছেড়ে দেয়। তখন-ই ওপাশ থেকে ইনায়া দরজা খুলে দেয়।
ইরফান এখানে দাঁড়িয়ে আগেই নক করেছিল। মাইরা ভীষণ ল’জ্জা পায়। তার মনে হচ্ছে ইনায়া সব দেখে নিয়েছে। ইনায়া মাইরাকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দেখে মাইরাকে ঝাঁকিয়ে বলে,
– এ্যাই মাইরা কি হয়েছে? ভেতরে এসো।
মাইরা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ-ই তেজী কণ্ঠে বলে,
– আপু তোমার ভাই একটা অ’স’ভ্য লোক।
ইনায়া থতমত খেয়ে তাকায়। ইরফান ভাবলেশহীনভাবে ভেতরে প্রবেশ করছে। ইনায়া ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলে,
– ভাইয়া তুমি মাইরার সাথে কি করেছ?
ইরফান খুব স্বাভাবিকভাবে বলে,
– মধু খাইয়েছি।
মাইরা কটমট দৃষ্টিতে তাকায় ইরফানের দিকে। কি পরিমাণ অ’স’ভ্য হলে বোনকে এভাবে বলছে। ইনায়া মাইরার দিকে চেয়ে বলে,
– তুমি মধু খাওনা মাইরা? আমিও আগে খেতাম না। ভাইয়া মনে হয় তোমাকে জোর করে খাইয়েছে তাই না? মন খারাপ কর না। মধু অনেক উপকারী বুঝলে? একটু একটু করে খাবে, আমিও জোর করেই একটু একটু করে খাই।
মাইরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলে,
– এ্যা!
ইনায়া মাইরার হাত ধরে ভেতরে এনে দরজা লাগাতে লাগাতে বলে,
– এ্যা নয় হ্যাঁ। একটু একটু করে খেলে অভ্যাস হয়ে যাবে।
কথাটা বলে ইনায়া মাইরাকে আসতে বলে তার ঘরের দিকে যায়। মেয়েটার ছয়মাস চলছে। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা।
মাইরা কপাল চাপড়ায়। আবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ও ফেলে ইনায়া বোঝেনি বলে। ইরফানের দিকে তাকালে দেখল ইরফান তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসছে। এগিয়ে গিয়ে ইরফানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কটমট করে বলে,
– সবসময় তো আমকে বলেন ভালো হওয়ার কথা। নিজে যে একটা অ’স’ভ্য লোক, সে খেয়াল নেই আপনার?
ইরফান মৃদুস্বরে বলে,
– আই নো, তোমার এটুকুতে মন ভরেনি। বাট, কিছু করার নেই। টাইম লিমিটেড ছিল। রাতে আনলিমিটেড দিব, ওকে?
মাইরা থতমত খেয়ে তাকায়। ইরফানের কথা বলার ধরনে একটু একটু ল’জ্জা পায়। এই লোকটার সাথে কথা বলাই উচিৎ না। শুধু তাকে জ্বালায়। ইরফানকে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলে ইরফান মাইরার হাত টেনে বলে,
– কোথায় যাচ্ছো?
মাইরা ইরফানের দিকে চেয়ে চোখ ছোট ছোট করে বলে,
– আমি এখানে এসেও কি এখন আপনার কোলে উঠে বসে থাকবো?
ইরফান কিছু বলার আগেই পাশ থেকে শুদ্ধ বলে,
– বেড়াতে এসেও আমাদের ইরফানের ইচ্ছে করে বউকে কোলে নিয়ে বসে থাকতে! হাউ বালুপাশা!
মাইরার ল’জ্জায় মাথা কাটা যায়। সব হয় এই লোকটার জন্য। ইরফানের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে দ্রুত ইনায়ার ঘরের দিকে যায়।
ইরফান শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বলে,
– তুই কখন এসেছিস?
শুদ্ধ হেসে বলে,
– তোরা আসার পাঁচ মিনিট আগে।
ভেতর থেকে ফাইজের বাবা বেরিয়ে এসে ইরফান আর শুদ্ধকে দেখে হেসে বলে,
– আরে আমার দুই বাবা কখন আসলে?
শুদ্ধ, ইরফান দু’জনেই সালাম দেয় ফাইজের বাবাকে। এরপর এগিয়ে গিয়ে ইরফান, শুদ্ধ পাশাপাশি বসে। ফাইজের বাবা তাদের সামনে বসে টুকটাক কথা বলায় ব্যস্ত হয়। এর মাঝে ফাইজের মা ইরফান, শুদ্ধকে নাস্তা দিয়ে যায়। শুদ্ধ জামাই, আর ইরফান তার ছেলের শ্বশুর বাড়ির লোক। এদের নিজে আপ্যায়ণ না করলে খারাপ দেখায় বলে তিনি কাজের লোককে রান্নাঘরে রেখে নিজেই এসেছেন। তিনিও ফাইজের বাবার পাশে বসে শুদ্ধ, ইরফানের সাথে ভালোমন্দ কথা বললো।
.
.
ফারাহ ওয়াশরুম থেকে শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে। সে মূলত শুদ্ধদের গ্রাম থেকে ফিরেছে। ভার্সিটি ছুটি থাকায় দু’দিন আগে শুদ্ধ তাকে নিয়ে গ্রামে গিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরে শাওয়ার নিল। ভীষণ বিরক্ত লাগছিল, শাওয়ার নিয়ে একটু আরাম লাগছে। মাথা মুছে তাওয়াল মেলে দিল।
শুদ্ধ কে ঘরে আসতে দেখে এগিয়ে গিয়ে বলে,
– তুমি খেয়েছ?
শুদ্ধ হেসে বলে,
– তোমাকে খাই পাখি?
ফারাহ শুদ্ধকে ঠেলে বলে,
– মাত্র গোসল করেছি। জ্বালিয়ো না তো।
শুদ্ধ ফারাহ’কে জড়িয়ে নিয়ে বলে,
– সেকেন্ড বার আমি করিয়ে দিব, পাক্কা প্রমিস!
মাইরা ইনায়ার কাছে ফারাহ আসার কথা শুনে ফারাহ’র ঘরে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকে,
– ফারাহ আপু?
ফারাহ শুদ্ধকে ধাক্কা দেয়। বেডের উপর থেকে ওড়না নিয়ে দ্রুত গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বলে,
– ভেতরে এসো মাইরা। কখন এসেছ?
শুদ্ধর আড়ালে ফারাহ ছিল বলে মাইরা সেভাবে দেখতে পায়নি। ভেতরে এসে ফারাহকে জড়িয়ে ধরে বলে,
– একটু আগেই এসেছি আপু। কেমন আছো? অনেকদিন পর দেখলাম তোমাকে।
ফারাহ, মাইরা টুকটাক কথা বলায় ব্যস্ত হলো। শুদ্ধ অসহায় চোখে চেয়ে আছে। মানে এসব কি? সে কি সুন্দর একটা রোমান্টিক মুডে ছিল। আর তার মেলায় হারিয়ে যাওয়া বোনটা এসে সব ভেস্তে দিল। মনে হচ্ছে শোধ নিচ্ছে তার থেকে। কিন্তু সে তো ইরফানদের রোমান্টিক মোমেন্ট ক্রিয়েট করে দিত। আর ইরফানের বউটা তার সব ভেস্তে দিচ্ছে। শুদ্ধ গলা ঝেড়ে বলে,
– মাইরা ফাইজের বাচ্চার লেজ ধরে আরেকজন সদস্য আসলে কেমন হবে বলো তো?
শুদ্ধর কথা শুনে মাইরা ভীষণ খুশি হয়ে বলে,
– অনেক ভালো হবে ভাইয়া। কিন্তু কোথা থেকে আসবে?
শুদ্ধ কিছু বলার আগেই ফারাহ মাইরার হাত ধরে টেনে ঘরের বাইরে যেতে যেতে বলে,
– তোমার ভাইয়ার পেটে বাচ্চা আছে। ওখানে থেকেই বের হবে।
মাইরা চোখ বড় বড় শুদ্ধর দিকে চেয়ে হেসে বলে,
– সত্যি ভাইয়া? ফারাহ আপুর কষ্ট হবে বলে বাচ্চাটাকে আপনার পেটে নিয়ে নিয়েছেন, তাই না?
ফারাহ আর মাইরার কথা শুনে শুদ্ধ ভোতা মুখে তাকিয়ে রইল। ফারাহ মিটিমিটি হাসছে। সে ঠিক জানে, এই লোকের মুখের ব্রেক নেই। মাইরার সামনে উল্টাপাল্টা বলবে আর সে ল’জ্জায় ম’র’বে। তার এই অ’স’ভ্য লোক একা একা বসে লাগাম ছাড়া কথা বাদ রেখে চুপ থাকুক।
_____________________
সন্ধ্যার পর পর ইরফান মাইরাকে নিয়ে ফাইজদের বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। যদিও ফাইজ, শুদ্ধ, ফাইজের মা অনেক জোর করেছিল,, কিন্তু ইরফানের কাজ আছে বলে সে থাকেনি।
ফোনে কল আসলে ইরফান ফোনে কথা বলতে থাকে। মাইরা হঠাৎ-ই কাউকে দেখল যেন, ইরফানের হাত থেকে তার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় মেয়েটির সামনে।
ইরফান ফোনে কথা বলতে বলতে মাইরাকে দেখল একটি মেয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আর কিছু বললো না। সে মাইরার দিকে নজর রেখে ফোনে কথা বলতে থাকে।
মাইরা সামিয়ার কাঁধে হাত রেখে বলে,
– তুমি সামিয়া আপু না?
সামিয়া মাথা নিচু করে ফোনে কিছু দেখছিল, কারো কণ্ঠ পেয়ে মাথা উঁচু করে তাকালে মাইরাকে দেখে অবাক হয়ে বলে,
– তুমি মাইরা?
মাইরা সামিয়াকে জড়িয়ে ধরে হেসে বলে,
– হ্যাঁ আপু। তোমাকে অনেকদিন পর দেখলাম। কেমন আছো?
সামিয়া মৃদু হাসলো। মাইরা মেয়েটা ভীষণ মিশুক। মাইরাকে সে সেভাবে চিনতোই না। মাত্র কয়েকদিনেই কেমন মিশে গিয়েছিল, আবার এখনও এতোদিন পর দেখা হওয়ায় কি সুন্দর করে কথা বলছে। সামিয়া মাথা নেড়ে বলে,
– এইতো আছি। তুমি কেমন আছো?
মাইরা সামিয়াকে ছেড়ে সামিয়ার দু’হাত ধরে বলে,
– ভালো। তুমি এখানে থাকো?
– এখানে থাকি না। এখান থেকে বেশ দূরে থাকি। এখানে টিউশন করাতে এসেছিলাম। তুমি এখানে যে?
– আমি ফারাহ আপুদের বাসায় এসেছিলাম।
সামিয়া অবাক হলো। ফারাহকে তো সে ভালো করেই চেনে, নামটাও জানে। ভোলার কথা নয় তো। কিন্তু মেয়েটার বাসা এখানে এটা জানতো না। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে জড়তা নিয়ে প্রশ্ন করে,
– ফারাহ আপুর কি বিয়ে হয়ে গিয়েছে?
মাইরা মৃদুস্বরে বলে,
– হুম
সামিয়া মলিন হাসলো। শুদ্ধ ছাড়া তো আর কারো সাথে বিয়ে হবে না। সব তো জানেই। তবুও কোথাও যেন একটা কাঁটা বিঁধলো।
তখন-ই একটি মেয়ে এদিকে আসতে আসতে বলে,
– এ্যাই সামিয়া তুই কি বাড়ি যাবি? তোর কাকা আমাকে ফোন দিতে দিতে পা’গ’ল করে দিল। বাড়িতে ছেলে পক্ষ বসে আছে। এই ছেলেদের ফেরত পাঠালে তোর কাকা তোর পিঠে কি-না কি ভাঙবে আল্লাহ-ই জানে। এইবার বিয়েটা করে নে মা।
কথাগুলো বলতে বলতে এগিয়ে আসছিল। মাইরা অবাক হয়ে তাকায় মেয়েটির দিকে। মেয়েটি ততক্ষণে সামিয়ার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সামিয়া চোখ পাকিয়ে তাকায় তার কাজিনের দিকে। মেয়েটি সামিয়াকে পাত্তা না দিয়ে বলে,
– দেখ, অনেক ছেলেকে আমার বয়ফ্রেন্ড দিয়ে ভাগিয়েছি তোর জন্য। এবার ও নিষেধ করে দিয়েছে। আমিও আর এসবে নেই। বাড়ি চল।
সামিয়া মাইরার সামনে এসব বলায় ভীষণ বিব্রতবোধ করে। তার কাজিনের হাত ধরে মাইরার দিকে চেয়ে বলে,
– মাইরা আজ আসছি। আরেকদিন কথা হবে।
কথাটা বলে তার কাজিনকে টেনে দ্রুতপায়ে উল্টোপথে যায়।
মাইরা বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। মেয়েটির সব কথা তার মাথার উপর দিয়ে যায়নি।
পাশে এসে ইরফান মাইরার হাত ধরে বলে,
– মেয়েটি কে ছিল?
মাইরা ইরফানের দিকে তাকিয়ে ছোট করে বলে,
– আমাদের গ্রামের একটা মেয়ে।
এরপর আর কিছু বললো না। ওই মেয়েটির কথা শুনে মনে হলো সামিয়া বিয়ে করতে চাইছে না, তার কারণ কি শুদ্ধ ভাইয়া? মাইরার খারাপ লাগছে সামিয়ার জন্য। কিছু তো করার-ও নেই।
.
.
ইরফান আর মাইরা বাড়ি ফিরেছে।
সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে মাইরা সিঁড়ির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে। ইরফান মাইরার পিছন পিছন উঠছিল। মাইরা দাঁড়িয়ে যাওয়ায় ইরফানের বুকে ধাক্কা লাগে। ইরফান দ্রুত মাইরাকে তার দিকে ফিরিয়ে চিন্তিত কণ্ঠে বলে,
– হোয়াট হ্যাপেন্ড?
মাইরা তার ডান হাতে মাথার একপাশে চেপে ইরফানের দিকে তাকায়। মৃদুস্বরে বলে,
– আমার ভীষণ মাথা ব্য’থা করছে।
মুহূর্তেই ইরফানের চোখেমুখে ভীতি দেখা দেয়। মাইরার ঔষধের কোর্স ছয় মাসের ছিল। প্রথম তিন মাস শেষে ইরফান মাইরাকে নিয়ে আবারও কানাডা গিয়েছিল। এরপর আরও তিন মাসের কোর্সের ঔষধ নিয়ে আসে। যেটা সপ্তাহখানেক আগে শেষ হয়েছে। আজ হঠাৎ এরকম মাথা ব্য’থার কথা শুনে ইরফানের গলা শুকিয়ে আসে। মাইরার মাথা ব্য’থা যেন ইরফানের জীবনের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরফান দ্রুত মাইরাকে কোলে তুলে নিয়ে বড় বড় পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উঠে তার ঘরে যায়। এরপর সে বেডে বসে মাইরাকে তার কোলে বসায়। মাইরা কিছু বলছে না। সত্যিই তার ভীষণ মাথা ব্য’থা করছে। ইরফান ব্যস্ত হাতে মাইরার হিজাব খুলে দেয়, এরপর মাইরার বোরখা খুলে বেডের উপর রাখে। মাইরা পিটপিট করে ইরফানের দিকে তাকায়।
ইরফান মাইরার মাথায় করা দুই বেনি দ্রুত খুলে দিল। এরপর বা হাতে মাইরাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ডান হাত মাইরার গালে দিয়ে নরম সুরে বলে,
– কোথায় পেইন হচ্ছে বার্ডফ্লাওয়ার?
মাইরা ইরফানের দিকে চেয়ে আছে। ইরফানের চোখেমুখে হাজারো চিন্তার ছাপ। তার যখন প্রথম টিউমারের কথা ইরফান জেনেছিল, এরপর ইরফানের মুখচোখ যেমনটা হয়েছিল, সবসময় কেমন মনমরা হয়ে থাকতো, আজ ইরফানকে মাইরার কাছে তেমনি লাগলো।
মাইরার খারাপ লাগে। ইরফান তার একটু কিছু হতেই কেমন যেন নেতিয়ে পড়ে। মাইরা ইরফানের গালে হাত দিয়ে বলে,
– আপনি আমার জন্য এতো ভাবেন কেন শিসরাজ?
ইরফান তার গালে রাখা মাইরার হাতে চুমু আঁকে। ডান হাত মাইরার গলার ভাঁজে গলিয়ে দিয়ে মাইরার চোখে চোখ রেখে অসহায় কণ্ঠে বলে,
– ইউ আর মাই মেন্টাল ডক্টর বার্ডফ্লাওয়ার। তোমার কিছু হয়েছে ভাবলে আমি মেন্টালি সিক হয়ে যাই। তুমি কেন সিক হও মাই হার্ট?
মাইরার কাঁদতে ইচ্ছে করল। ইরফান কেন এতো ভালোবাসে তাকে? দু’হাতে ইরফানের গলা জড়িয়ে ধরে ইরফানের গলায় মুখ ঠেকিয়ে চোখ বুজে নেয়। একটু থেমে বলে,
– আপনি আমাকে বকলে আমার মাথা ব্য’থা করে, এরপর আপনি আমাকে রা’গ দেখালেও মাথা ব্য’থা করে। আবার থা’প্প’ড় মারার জন্য হাত উঠালেও মাথা ব্য’থা করে।
ইরফান মাইরার কাঁধে চুমু এঁকে বলে,
– স্যরি! আই প্রমিস ইউ, তোমাকে আর বকবো না, রা’গ দেখাবো না। অ্যান্ড মারার জন্য হাত উঠাবো না।
মাইরা হাসলো। থা’প্প’ড় তো ইরফান মারেনা। কিন্তু রে’গে গিয়ে থা’প্প’ড় মারতে গিয়েও থেমে যায়। মাইরার খারাপ লাগে। ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলে,
– আপনি সব ভুলে যান। ওরকম অদ্ভুদ ব্যবহার করলে আমি কাঁদি, আর তারপর আমার মাথা ব্য’থা করে।
ইরফান মাইরাকে দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে নত স্বরে বলে,
– অনেস্টলি বলছি, আমি আর ভুলে যাবো না বার্ডফ্লাওয়ার।
মাইরা ইরফানের বুকে চোখ বুজে পড়ে থাকলো। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। ইরফান মাইরার মুখ দু’হাতের আঁজলায় নিয়ে মৃদুস্বরে বলে,
– ডক্টরের কাছে নিয়ে যাবো। ফ্রেশ হবে?
মাইরা মাথা নেড়ে বলে,
– কোথাও যেতে হবে না। আমি সকাল থেকে মাথায় হিজাব বেঁধে ছিলাম তো, এজন্য মাথা ব্য’থা করছে। মাথায় পানি দিলে ঠিক হয়ে যাবে।
ইরফান কিছু বললো না৷ মাইরাকে কোলে করে ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে শাওয়ার ছেড়ে দেয়। মাইরা দ্রুত বলে,
– ইইইই কি করলেন এটা?
ইরফান দু’হাতে মাইরাকে আগলে রেখে মৃদুস্বরে বলে,
– শাওয়ার নাও, তাহলে মাথায় পানি দেয়া হয়ে যাবে। অ্যান্ড ফ্রেশ লাগবে।
মাইরা কিছু বললো না। কলেজ থেকে এসে সে গোসল করে। ইরফানকে ঠেলে বলে,
– আপনি ভিজছেন কেন? এখান থেকে যান। আপনার অফিসের শার্ট, প্যান্ট সব ভিজে গেল।
ইরফান পাত্তা দিল না। গায়ের ব্লেজার খুলে পাশেই ছুঁড়ে ফেলল। এরপর বলে,
– নো প্রবলেম। তুমি শান্ত হয়ে দাঁড়াও।
কথাটা বলে শেলফ এর উপর থেকে শ্যাম্পু নিয়ে মাইরার মাথায় ঢেলে দেয়। মাইরা মাথা উঁচু করে বলে,
– আবার কি করছেন?
ইরফান মাইরাকে ঝর্ণার নিচ থেকে একটু পাশে এনে দাঁড় করায়। এরপর তার দু’হাতের শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয় মাইরার চুলের ভাঁজে আঙুল চালায় আর বলে,
– মাথায় কবে শ্যাম্পু লাগিয়েছিলে?
মাইরা মিনমিন করে বলে,
– ওই ১০-১২ দিন হবে হয়তো।
ইরফান বিস্ময় চোখে তাকায় মাইরার দিকে। অবাক হয়ে বলে,
– তুমি কি আমার টাকা সেভ করতে চাইছো?
মাইরা মুখটা ছোট করে বলে,
– আমার আলসি লাগে।
ইরফান কিছু বললো না। আরও কিছুক্ষণ মাইরার চুলের ভাঁজে আঙুল চালায়। পুরো মাথা ফেনা হয়ে গিয়েছে। ইরফান মাইরার হাত ধরে আবারও ঝর্ণার নিচে দাঁড় করিয়ে দেয়। এরপর মাইরার দিকে চেয়ে চোখ পাকিয়ে বলে,
– আর একদিন এরকম শুনলে থা’প্প’ড় দিয়ে সব দাঁত ফেলব তোমার, স্টুপিট।
মাইরা চোখ ছোট ছোট করে বলে,
– আপনি কিছুক্ষণ আগে কি প্রমিস করেছেন, এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন?
ইরফান সাথে সাথে অনুতাপের স্বরে বলে,
– ওহ স্যরি! স্যরি! ইট’স মিস্টেক!
মাইরা মাথা নিচু করে হাসে। ইরফানের অবস্থা দেখে তার হাসি পাচ্ছে। ইশ! তার শিসওয়ালা সব মানতে চায়, কিন্তু পারেনা বলে আবার কেমন স্যরি বলতে থাকে।
.
.
মাইরা শাওয়ার নিয়ে বাইরে বেরিয়ে নামাজ পড়ে নেয়। মাথা ব্য’থা আর নেই। আসলে তার শ্যাম্পু করা উচিৎ, তাছাড়া টানা অনেকক্ষণ হিজাব বেঁধে থাকার কারণেও এমন হয়েছে। কিন্তু এখন অনেক ফ্রেশ লাগছে। ভালো লাগছে।
ইরফান শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে সেও নামাজ পড়ে নিল। এরপর একটি কালো প্যান্ট, তার সাথে কালো শার্ট জড়িয়ে নেয়। শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে বলে,
– ফাস্ট রেডি হও।
মাইরা অবাক হয়ে বলে,
– আবার কোথায় যাবো?
ইরফান মাইরার দিকে চেয়ে বলে,
– ডক্টরের কাছে।
– আমার মাথা ব্য’থা নেই। অনেক ফ্রেশ লাগছে। সত্যি বলছি।
ইরফান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
– হাসবেন্ড এর থেকে শাওয়ার নিলে সবার-ই এক্সট্রা ফ্রেশনেস কাজ করে। ইট’স নরমাল।
মাইরা ল’জ্জা পায়। অ’স’ভ্য লোক। সে কি ডেকেছিল? নিজেই জোর করে তাকে নিয়ে গেল। ইরফান কাভার্ড থেকে মাইরার একটা বোরখা আর হিজাব বের করে মাইরার সামনে এসে দাঁড়ায়। মাইরা ইরফানের দিকে চেয়ে বলে,
– আমি যাবো না। আমি তো সুস্থ মানুষ। কখনো দেখেছেন? সুস্থ মানুষেরা ডক্টরের কাছে যায়!
ইরফান বিরক্ত হয়। এমনিতেই তার টেনশনে কিছু ভালো লাগছে না। তার মধ্যে এই স্টুপিট সবসময় দশলাইন বেশি বুঝে বিশলাইন কথা বলবে। ধমক দিতে গিয়েও জিভ গুটিয়ে নিল মাইরার দিকে চেয়ে। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে মাইরার গালে ডান হাত দিয়ে মৃদুস্বরে বলে,
– ইউ নো? আমি কত টেনশনে থাকি তোমাকে নিয়ে? আই রিকুয়েস্ট ইউ, রেডি হয়ে নাও বার্ডফ্লাওয়ার! তোমাকে একবার চেক-আপ করিয়ে আনবো।
মাইরা অবাক হয়ে ইরফানের দিকে তাকায়। মানে তাকে ডক্টরের কাছে নিবে বলে রিকুয়েস্ট করছে! মাইরা বলার মতো কিছু খুঁজে পায় না। ইরফানের হাত থেকে বোরখা নিয়ে বলে,
– আপনি দু’মিনিট দাঁড়ান, আমি রেডি হয়ে নিচ্ছি।
ইরফান মৃদু হাসলো। মাইরাকে হিজাব পরতে দেখে কিছু একটা ভেবে বলে,
– তোমার হিজাবের কাপড় কি অনেক পুরু?
মাইরা হিজাব বাঁধতে বাঁধতে ইরফানের দিকে চেয়ে বলে,
– বুঝিনা তো। এগুলো রেডিমেট কেনা।
ইরফান আর কিছু বললো না। মাইরাকে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
ডাইনিং-এ তারেক নেওয়াজ ইরফান, মাইরাকে আবারও বেরোতে দেখে বলে,
– তোমরা আবার কোথায় যাচ্ছ?
মাইরা তার শ্বশুরের দিকে চেয়ে বলে,
– আপনার ছেলে আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাচ্ছে বাবা।
ইরফান আড়চোখে মাইরার দিকে তাকালো। মাইরা হাসলো। সে তো সুস্থ মানুষ। তবুও নিয়ে যাচ্ছে, এটাকে তো ঘোরাঘুরি-ই বলে।
তারেক নেওয়াজ অবাক হয়ে বলে,
– আর কত ঘুরবে বউকে নিয়ে? আমার মেয়েটাকে আমার সাথেও একটু ঘুরতে দাও। আমি ভেবেছিলাম মাইরা আম্মুকে ফুসকা খেতে নিয়ে যাবো।
ইরফান ভাবলেশহীনভাবে বলে,
– আমি আমার বউকে নিয়ে যাচ্ছি। তুমি তোমার বউকে নিয়ে যাও। আমি তো তোমার বউয়ের পিছনে আম্মু আম্মু বলে ঘুরঘুর করছিনা, তাহলে তুমি আমার বউয়ের পিছনে মাইরা আম্মু মাইরা আম্মু বলে ঘুরঘুর করছ কেন?
ইরফানের কথা শুনে তারেক নেওয়াজ কেশে ওঠে। মাইরা চোখ বড় বড় করে তাকায়। ইরফানের দিকে চেয়ে ইরফানের পেটে গুঁতো দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
– অ’স’ভ্য লোক, আপনি বাবাকে এসব কি বলছেন?
ইরফান কিছু বললো না। মাইরার হাত ধরে বাইরে বেরিয়ে যায়।
তারেক নেওয়াজ কপালের ঘাম মুছল। সে ইরফানের পিছে লাগতে গিয়েছিল,, ভেবেছিল এই ছেলেকে একটু টাইট দিবে। ওমা সে তো নিজেই বেঁকে গেল।
তার কথা কম বলা ছেলেই ভালো ছিল, আবার ভাবলো ইরফান তো কথা কম-ই বলে,, যেটুকু বলে ওটুকু বোমা রূপে বের হয়।
ইরফানের বিয়ের পর ইরফান সত্যি সত্যিই তার বাবাকে এক মাসের জন্য সুইজারল্যান্ড পাঠিয়েছিল কাজে,, ইরফান ব্যবসায় হাত লাগানোর পর তারেক নেওয়াজকে আবার কতদিন পর দেশের বাইরে পাড়ি জমাতে হয়েছিল। কি সাংঘাতিক ছেলে!
তারেক নেওয়াজ কানে চিমটি দিলেন। তিনি আর মাইরার ব্যাপারে কিচ্ছু বলবে না। মাইরাকে নিয়ে বললেই তার ছেলে বেফাঁস কথা বলে দেয়। মাইরার হাওয়া লেগেই বোধয় এমন হয়েছে ছেলেটা। মাইরার চঞ্চলতা ঘুরেফিরে ইরফানের মাঝে আসতে আসতে উল্টেপাল্টে গিয়েছে।
____________________
ইরফান মাইরাকে চেক-আপ করিয়ে জানতে পারে মাইরার সবকিছু নরমাল। মাথা ব্য’থার কারণ নরমাল ছিল। ইরফানের বুক থেকে যেন বড়সড় পাথর নেমেছে মাইরা সুস্থ শুনে।
এরপর মাইরাকে বাসায় রেখে সে অফিসে চলে যায়।
মিটিং রুমে বসে ইরফান অনর্গল কথা বলছিল। হঠাৎ-ই তার ফোনে রিং আসলে ইরফান ফোনের দিকে নজর দিয়ে সরিয়ে নিতে গিয়েও নিল না। এক্সকিউজ মি বলে দ্রুত কল রিসিভ করে বিচলিত কণ্ঠে বলে,
– হ্যাঁ বলো। কোনো খবর পেয়েছ?
ওপাশ থেকে কেউ একজন বলে,
– আপনি যার কথা বলেছিলেন, নাছিম নাম, সে আজ দেশে ফিরছে স্যার। এর বেশি কিচ্ছু জানিনা।
ইরফান ছোট করে বলে,
– ওকে, থ্যাংকস্।
কথাটা বলে কল কেটে সবার উদ্দেশ্যে বলে,
– দ্যাটস্ ইট, ফর টু ডে।
কথাটা বলে দ্রুতপায়ে অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।
চলবে ইনশাআল্লাহ~~
🟥[শব্দসংখ্যা – ৩৮০০
সবাই রেসপন্স করবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। ]
গল্প সম্পর্কে আপডেট পেতে ও গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গ্রুপে জয়েন হয়ে নিন। গ্রুপ লিংক:
https://facebook.com/groups/437119506098736
আমার ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন।
চ্যানেল লিংক:
https://youtube.com/@drmshohaghoney?si=DXe0-6FMyZ46GoNE

