১.
—“আচ্ছা মা। জমিদার বাড়িতে কুমারী মেয়েরা গেলে আর ফিরে আসে না কেন?”
কলমি শাঁক বেছে পাতিলে রাখছিল তুলি। সকালে তার এক চাচি এসে তার মাকে বলেছিল তখন সে শুনেছে। তার মা মাধুরী কুলোয় চাল বেছে নিচ্ছে। মেয়ের এমন কথায় কোনো উত্তর তিনি দিলেন না। তুলি আবারও বলল„ —“মা তুমি কি জানো এসব বিষয়ে? কেন গ্রামের বাবা মায়েরা তার কুমারী মেয়েদের এভাবে লুকিয়ে রাখে?”
মাধুরী তবুও কোনো উত্তর দিলো না। পাতিলে চাল ঢেলে এগিয়ে দিলো তুলির দিকে„ —“নে অনেক গোয়েন্দা হয়েছিস এবার চালগুলো ধুয়ে দে তো দেখি।”
দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে চলেছে। রাতে রান্না ভাতগুলো সকালে পান্তা করে খেয়েছে মা-মেয়ে। তুলির বাবা শহরে মাস্টারের চাকরি করে। জমিদার বাবু’ই তাকে চাকরিটা দিয়েছেন আর শহরে পাঠিয়েছেন। গত সাত বছর থেকে তুলির বাবা তারেক রহমান শহরে চাকরি করে। গত তিন বছর আগেই তুলির দাদী মা’রা গিয়েছে। এখন বাড়িতে তুলি আর তার মা মাধুরী থাকে। দুই গ্রাম পরেই তুলির নানীর বাড়ি।
চাল ধুয়ে চুলায় বসিয়ে দিলো তুলি। বয়স আঠারো-উনিশের মাঝামাঝি। কাঁঠালী রঙের ব্লাউজের সাথে রংধনুর সাত রঙে মিশ্রিতকরণ শাড়ি পরেছে সে। আঁচল কাঁধের শেষ কার্নিশ ঘষে কোমরে পেঁচিয়ে মায়ের সাথে তালে তাল মিলিয়ে কাজ করছে।
বাইরে খড়িঘর থেকে শুঁকনো পাতার বস্তা নিয়ে এলো হেসেল ঘরে। মাটির দু-চুলা। চুলাটা তার দাদীর বানিয়ে দিয়েছিল সেই কবে। তখন থেকেই তার মা মাধুরী এটাকে যত্ন করে রেখেছে। চুলার কোনো অংশ ধ্বসে গেলে মাটির প্রলেপ দিয়ে আবার যেটাকে সজাগ করে তোলে।
—“জানালার পাশে উনুন আছে নিয়ে আয় তো তুলি?”
তুলি দৌড়ে তার ঘরে গেলো। জালানার লম্বা থাঁকে উনুন নিয়ে এসে তার মায়ের হাতে ধরিয়ে দিলো।
—“মা আমি একটু বাইরে যাচ্ছি?”
মাধুরী পেছনে তাকালো„ —“যাবি যখন তাহলে মধু’কে নিয়ে যা? আর হ্যাঁ সন্ধ্যার আগেই বাড়িতে আসবি নয়তো মেরে ঠ্যাং ভেঙে দিবো। ভুলেও জমিদার বাড়ির দিকে যাবি না বলে দিলাম।”
তুলি মধু’কে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। মধু! তুলির ছাগলের নাম। ব্যাটা ছাগল। গত বছর থেকেই তুলির বাড়িতে আছে। তুলির মা বাইরে গেলে তুলি মধুকে নিয়েই সময় কাটায়।
মধু আপন মনে ঘাস খাচ্ছে। কলা গাছের ছায়ায় বসে বসে সময় কাটাচ্ছে তুলি। হঠাৎই শশির সাথে দেখা হলো তার। শশি তার ছোটবেলার সখি। মায়ের ভয়ে বাড়ি থেকে বের হতে পারে না সে। তাই চেনাজানা মানুষগুলোকে সে হারিয়ে ফেলেছে ভীড়ের মাঝে। মাগরিবের আযান পরতেই মধুতে নিয়ে বাড়ির দিকে যেতে লাগলো। শশি উঠে তার গরুটাকে নিতে গেলো। তুলি তাকে জানালো একসাথে বাড়ি ফিরবে। কিন্তু সেই যে শশি গেলো এখনও ফিরলো না। এদিকে সন্ধ্যে হলো প্রায়। তুলি মধুকে নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটা ধরলো। হয়তো শশি পেছনের পথ দিয়ে বাড়িতে চলে গেছে।
মনকে বুঝিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলো তুলি। হঠাৎই কলাগাছগুলো ভেদ করে কারও চিৎকার ভেসে এলো„ —“বাঁচাও।”
তুলি হকচকিয়ে গেল। এতো শশির গলার স্বর। মধুর গলার দড়ি ছেড়ে দিয়ে আওয়াজের পিছু নিলো তুলি। দৌড়ে কলাগাছের ভিটা বেরিয়ে ঘন-কালো জঙ্গলে প্রবেশ করলো। সে যত এগিয়ে যাচ্ছিল আওয়াজ ততটাই পিছিয়ে যাচ্ছিল। জঙ্গলে ঢোকার আগ মুহুর্তে মাধুরীর কথা মনে পরলো তুলি„ —“তুলি সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফিরবি। ভুলেও জমিদার বাড়ির দিকে যাবি না।”
তুলি দাড়িয়ে পড়লো। চারদিকে তখন সূর্যের মৃদু আলো। একপলক চারদিকে তাকালো তুলি„ —“এটাতো জমিদার বাড়ির পেছনের জঙ্গল। জঙ্গল পেরিয়ে চূর্ণচূড়া পাহাড় আর তারপরেই জমিদার বাড়ি। মনকে মানিয়ে সেখান থেকেই বাড়ির দিকে আসতে লাগলো তুলি। তখনই তার সামনে দিয়ে শশি হেঁটে যাচ্ছে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল তুলি। কিন্তু শশি তো জঙ্গলের ভিতরেই যাচ্ছে। তুলি বার কয়েক ডাকল কিন্তু শশি কোনো উত্তর দিলো না। তুলি তার পিছু পিছু গেলো।
—“শশি কোথায় যাচ্ছিস তুই? বাড়িতে চল চাচি তোর জন্য দেরি করছে?”
শশি গম্ভীর গলায় বলল„ —“আমাকে জমিদার বাবু ছেলে ডেকেছে। মাকে বলে দিস আমি জমিদার বাড়িতেই যাচ্ছি।”
তুলি জমিদার বাড়ির নামটা শুনেই চমকে গেলো। সে তুলিকে বাঁধা দিয়ে বলল„ —“জমিদার বাবুর ছেলে আছে তা আমি জানি না। কিন্তু তোকে আমি জমিদার বাড়িতে যেতে দিবো না।”
বলেই দুই হাত অসাড় করে শশির সামনে দাঁড়ালো তুলি। শশি এক ঝটকায় তুলিকে পেছনে ফেলে সামনের জঙ্গলে ঢুকে পরলো। তুলি দৌড়ে গিয়ে শশির হাত চেপে ধরলো তবুও তার নাড়াল পেলো না সে। মনে হচ্ছে এটা শশি না হয়তো কোনো পিশাচ। যে শশির শরীরে ভর করে তাকে নিয়ে যাচ্ছে জমিদার বাড়িতে।
অনেক চেষ্টা করেও তুলি শশিকে আটকাতে পারলো না। শেষ মেষ জমিদার বাড়ির সামনে এলে দাড়ালো দু’জনই। আসেপাশে তখন এশার আযান পরেছে। তুলির মা বেশ চিন্তিত হয়ে পরেছে। তার মেয়েটা এখনো বাড়ি ফিরে নি। কোথায় আছে কোথায় গেলো সে নিয়ে ঘাবড়ে আছে মাধুরী। বারান্দায় লাঠি হাতে বসে আছে। আজ আসুক একবার তবেই মজা পাবে। হঠাৎই মধু বাড়িতে এসে ডাকাডাকি করতে লাগলো। ম্যা ম্যা করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলল মাধুরী বিরক্ত হয়ে মধুর পিঠে দুটো লাঠির বারি দিলো। কিন্তু তাতেও কাজ হলো না সে তো ডাকাডাকি করতেই আছে।
তুলি মাটির দেয়ালের পিছে লুকিয়ে পরলো। শশি ভেতরের দরজায় দাড়িয়ে আছে। জমিদারের অনুমতি ছাড়া কেউ ভেতরে যেতে পারবে না। হঠাৎই কালো কাপড় পরা একটা লোক এসে শশিকে কোলে তুলে নিয়ে ভেতরে গেলো। তুলি অন্ধকারে শিউরে উঠল। কঠিন মনস্থ করলো সে। আজ যে করেই হোস জমিদার বাড়ির রহস্য জানবে সে। কেন কুমারী মেয়েরা এখানে আসে ফিরে যায় না। পেছনের ফাটক দিয়ে জমিদার বাড়িতে ঢুকলো তুলি।
#চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড়
লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ
১.
[ কি হতে চলেছে তুলির সাথে? সে কি জমিদার বাড়ির রহস্য জানতে পারবে? নাকি বাকি মেয়েদের মতো সেও নিখোঁজ হয়ে যাবে? জানতে হলো সাথেই থাকুন? পরবর্তী পর্বটি আপনাদের রেন্সপন্স অনুযায়ী ভাবা হবে দেবো কি না? পরা শেষে মন্তব্য করুন। ধন্যবাদ ]

