#প্রণয়ের_রূপকথা (৩৪)
“আমি তোদের বিষয়ে কথা বলি নি, এবার বলার প্রয়োজন মনে করছি। তোরা কি চাস সম্পর্কটা ঠিক হোক?”
অরণ্য বসে। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। ও আসলে সিগারেট খায় খুব। দীপ্র এগিয়ে এসে ওর হাত থেকে সিগারেট ছিনিয়ে নিল।
“কী ভাই?”
“আমি তোকে জিজ্ঞেস করেছি। তুই কি ওর বিষয়ে সিরিয়াস ছিলি?”
“সিরিয়াস না হলে প্রেম করতাম?”
“তাহলে এখন?”
“ওর ইগো আছে, আমার নেই?”
“দেখ অরণ্য, এক দিক থেকে একটু নরম হতেই হয়।”
“সব সময় আমিই কেন হব দীপ্র?”
অরণ্যর মুখ বিবরে একটা কালো আঁধার এসে ধরা দিল। দীপ্র বসল ওর পাশে।
“রাত্রি বিয়ে নিয়ে সিরিয়াস।”
“যা ইচ্ছে করুক।”
“সময় চলে গেলে, তখন আবার আপসোস করিস না।”
কথা বলতে পারল না অরণ্য। দীপ্র ওর পিঠে হাত রাখল।
“তুই সময় নে অরণ্য। একটু ভাব। রাত্রিকে আমি চিনি। আমার স্নেহের বলে বলছি না। ও আসলেই খুব ভালো। শুধু, শুধু একটু অভিমান বেশি। তুই সময় নে। তবে এতটা নিস না যতটা নিলে আর কিছু করতে পারব না।”
বলে অরণ্যকে একা রেখে চলে গেল দীপ্র। অরণ্য উদাস হয়ে চেয়ে রইল। রাত্রির বিষয়ে ও সিরিয়াস ছিল। মেয়েটিকে ওর ভালো লেগেছিল। কিন্তু দিনের পর দিন সন্দেহ, কথা কাটাকাটি নিতে নিতে ও আসলেই ক্লান্ত।
শাড়িটা গায়ের ওপর দিয়ে দেখে চলেছে কুহু। কণা বসে আছে বিছানায়। হাতে ফোন। আড়চোখে বোনের কাজ কর্ম দেখছে। এই পর্যায়ে ও কথা বলার প্রয়োজন বোধ করে।
“এহেম, এহেম।”
ধ্যান ফিরে কুহুর। ও শাড়িটা কাবাডে তুলে রাখতে রাখতে বলে,”কী?”
জবাবে কণা বলে,”দীপ্র ভাইয়ের পছন্দ আছে।”
কাবাড লাগিয়ে পেছনে চায় কুহু। কণা ওঠে এসে বোনের পাশে দাঁড়ায়।
“শাড়ির কথা শুধু বলিনি।”
কুহু চায় ভ্রু বাঁকিয়ে। কণা বোনের গাল টেনে বলে,”তোর কথা বলছি আপু। দীপ্র ভাই তোকে পছন্দ করে। কারণ তার চোখ সুন্দর।”
“বাজে কথা বলবি না কণা। সে আমাকে পছন্দ করে না।”
“তুই মানতে চাস না বিষয়টা। কিন্তু আমি সিওর সে তোকে পছন্দ করে। মাঝে বিয়ে ভাঙার বিষয়টা…
বলে কণা ধ্যানে ডুবে গেল। কুহুর গলাটাও শুকিয়ে এল। এই বিষয়টা থেকে ও পালাতে চায়। তবে কেন যেন পারে না। সারাক্ষণ কোনো না কোনো ভাবে তাড়া করে বেড়ায়। আসলে জীবনের মিথ্যে গুলো, এভাবে সব সময় পেছনে পড়ে থাকে। চাইলেও এর থেকে নিস্তার পাওয়া যায় না।
“আমার কী মনে হয় জানিস?”
কণার চোখ দুটো চকচক করছে। কিছু একটা মেলাতে পেরে ভীষণ খুশি লাগছে তাকে।
“মনে হচ্ছে, প্রথম প্রথম দীপ্র ভাইয়া মানতে পারে নি। হয়তো তোদের দুজনের যোগাযোগ ছিল না। তারপর হুট করে একটা সিদ্ধান্ত। এসবের জন্য তখন ওমন সিদ্ধান্ত নিল। এখন ঠিকই তোর প্রেমে পড়েছে।”
“তুই চুপ কর তো।”
“উফ, তুই বোঝ আপু। আমি চাচ্ছি আয়ানাপুর আগে, দীপ্র ভাই তোর হয়ে যাক।”
“আমি এসবে নেই কণা।”
“তোকে আসতেই হবে আপু। আসতেই হবে। একটা কথা বলি?”
“আবার কী?”
“তুই না চাইলেও, দীপ্র ভাই হয়তো তোকে চেয়ে নেবে।”
কুহু আটকায়। তাকায় ছোট দুটো চোখে। কণা বোনকে জড়িয়ে ধরে।
“সব এত সহজ না কণা।”
“কেন সহজ না?”
“আয়ানাপু দীপ্র ভাইকে খুব পছন্দ করে।”
“তাতে কী?”
“একটা ঝামেলা হয়ে যাবে। আমার এসব আর ভালো লাগে না। সবটা কেমন এলোমেলো।”
“তুই কঠিন করে ভাবছিস।”
“না রে। তুই অবুঝ। তাই বুঝতে চাচ্ছিস না।”
বলে কুহু ছুটে চলে আসে বারান্দায়। এত সময় অল্প অল্প বৃষ্টি হচ্ছিল। এবার বাতাসের জোর বেশি। ও বারান্দার কাপড় গুলো এনে বলে,”ছাঁদে কাপড় আছে। একদমই মনে নেই। আমি যাই।”
বলে ছুট লাগায় কুহু। ছাঁদে এসে দেখে কাপড় গুলো একদমই ভিজে গিয়েছে। ও হতাশ হয়। ভেজা কাপড় গুলো তুলতে গিয়ে নিজেও ভিজে যায়। ঠিক সে সময়ই দীপ্রর কণ্ঠটা পাওয়া যায়। বোধহয় ছাঁদের অন্যপাশ টায় ছিল। এগিয়ে আসে। কুহু দাঁড়ায়। বৃষ্টির পানি মাথা থেকে নেমে, মুখশ্রীতে এসে পড়ছে। কুহু থেকে থেকে ঠোঁট দুটো বন্ধ করছে। দীপ্র ওর বরাবর হয়ে বলে,”আচ্ছা, যা।”
কুহু শুধায়”কিছু বলতে চেয়েছিলেন?”
“না।”
“তাহলে ডাকলেন যে?”
“কি জানি। যা, ভিজে গিয়েছিস।”
বলে অন্যপাশটায় তাকায় দীপ্র। কুহু কয়েক সেকেন্ড থেমে থেকে ছাঁদ থেকে নেমে আসে।
কুহু তখন ঘরে বসে। সাথে কণাও আছে। দীপ্র ও জামা কাপড় বদলে এসেছে। ওর ঠান্ডার বাতিক আছে। ও কয়েকবার হাঁচি দিয়ে ঘরের দরজায় ঠকঠক করে। কণার অধরে হাসি আসে।
“দীপ্র ভাই। আসো, আসো।”
বলে এগিয়ে আসে কণা। দীপ্র হেসে বলে,”এলাম একটা দরকারে। কুহু চা বানাতে পারবি?”
কুহু মাথা দোলায়। দীপ্র বলে,”তাহলে বসলাম আমি।”
কুহু চলে যায়। দীপ্র বসে কণাকে নিয়ে। টুকটাক কথার মাঝে কণা বলে,”আমার একটা ধারণা আছে।”
প্রশ্ন নিয়ে চায় দীপ্র। কণা বলে,”মনে হচ্ছে আমার দুলাভাই তুমিই হবে।”
“হলে খুশি হবি নাকি?”
“খুব খুশি হব।”
ওর এই খুশির মাঝে ঝামেলা পাকাতে আগমন হলো আয়ানার। ও এক গাল হেসে বলল,”তোমাদের বিরক্ত করলাম না তো?”
জবাব দিল দীপ্র,”না। বোস এখানে।”
বসল আয়ানা। দীপ্রর যতটা কাছাকাছি বসা যায় ঠিক ততটাই ঘেঁষে বসল ও। কণা ঠোঁট কামড়ে তাকানো। ও এসব নিতে পারে না। আয়ানার দোষ সবকিছুতেই পায় ও।
“তুই কি বিরক্ত হলি কণা?”
“না। বিরক্ত হলে তো আসতেই মানা করতাম।”
কণা এমনই। মুখের ওপর এমন ভাবে বলে। দীপ্র ওদের দ্বন্দ্ব বুঝতে পারল। তাই শাসনের সুরে বলল,”আমি কি বলেছিলাম, সবাই মিলেমিশে চলবি। সেগুলো মনে নেই?”
“সরি, আমার ই ভুল। কণা তো ছোট।”
বলে কথা মেটানোর চেষ্টা করে আয়ানা। কণা এতে গলে না। ও বরং ঠোঁট কামড়েই রাখে। এই অসহ্যকে নিয়ে ওর কিছু বলার রুচিও ও নেই।
“আমি এলাম তোমায় দেখে। কুহু বোধহয় চা বানাতে গেল। তাই না?”
“হ্যাঁ, আমিই বলেছি।”
“অহ, আমাকে বললেও পারতে। কুহু তো কত কিছু করে। আমি ফ্রি ছিলাম।”
দীপ্র একটু বিব্রত বোধ করল। তবে কথা কাটিয়ে বলল,”অন্য এক সময় তোকে বলব।”
ওদের কথার মাঝে চা হাতে ফিরে কুহু। আয়ানাকে দেখে বলে,”ও আয়ানাপু। আমি তো তিন কাপ চা বানালাম।”
“সমস্যা নেই আমি খাব না।”
নিজে ভাগ দেবে না বলে আগে ভাগেই চা নিয়ে এঁটো করে ফেলল কণা। কুহু বলল,”আচ্ছা, তুমি নাও। আমি পরে খাব।”
“বলছিস যখন, নেই তবে।”
বলে এক কাপ চা তুলে নেয় আয়ানা। কুহু এবার অন্য কাপটি দীপ্রর দিকে বাড়িয়ে ধরে। দীপ্র বলে,”আরেকটা কাপ নিয়ে আয়।”
“কেন?”
“নিয়ে আয়।”
কুহু চট করে আরেকটি কাপ নিয়ে আসে। দীপ্র এক কাপ চা দু ভাগে ভাগ করে নেয়। একটি কুহুকে দিয়ে বলে,”বোস।”
পুরো বিষয়টা দেখল আয়ানা। ওর খুব খারাপ লাগল। ও চা কাপটি তুলে নিয়েই বলল,”আমি যাই। আমার কাজ আছে।”
এরপর একটা সেকেন্ড ও থাকল না ও। চলে গেল। সেদিকে চেয়ে কুহুর মনটা উদাস হলো। ও চাইল কণার দিকে। কণাকে ভীষণ খুশি দেখাচ্ছে। এদিকে দীপ্র নির্বিকার। ও নীরবে, নীভৃতে আয়ানাকে কিছু একটা বুঝিয়ে দিয়েছে। বুঝিয়েছে কুহুকেও।
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি

