#প্রণয়ের_রূপকথা (৪১)
রাত্রিকে দেখতে এসেছে যারা, তারা পাশের এলাকার। বেশ নামডাক আছে। দেওয়ান বাড়ির সাথে সম্পর্ক তৈরির ইচ্ছে বোধহয় আগে থেকেই ছিল। তাই মেয়ে দেখার আগেই বলছিল, আপনাদের মেয়ে মানে আমাদের মেয়ে। না দেখেই কথা বার্তা হতে পারে। এসব মুখের কথা ধরেই রাত্রিকে দেখানো হলো। মেয়েটিকে পছন্দ করল সবাই। ছেলে শহরে ব্যবসা করে। বয়স ত্রিশ। মানে রাত্রির সাথে সব দিক থেকেই মানাচ্ছে। এসব নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। আয়ানাকে বেশ খুশি দেখাচ্ছে। এর কারণ সমন্ধটা ওর বাবা এনেছে। আর এই বিয়েটা হলে, বাবার প্রতি সবার আরেকটু দৃষ্টি পড়বে।
“ছেলে কিন্তু বেশ ভালো রাত্রিপু।”
রাত্রি আসলে ভালো মতন দেখেই নি। ও শুধু হাসল। আয়ানা আবার বলল,”বেশ টাকা পয়সা আছে।”
এ কথায় রাত্রি বলল,”টাকা পয়সা দেখে আমি তো বিয়ে করব না আয়ানা।”
“সেটা বলিনি। তবে টাকার তো দরকার আছে তাই না?”
“তা আছে। তবে টাকা পয়সা থাকল, কিন্তু সুখ থাকল না। অথবা ছেলে ভালো না। ওমন হলে টাকার কোনো মূল্য নেই।”
“হুম।”
বলে সরে গেল আয়ানা। ও আসলেই বুঝে না, সবাই কেন ওর সাথে এমন করে। ও ভালো করতে গেলেও বিষয় গুলো খারাপই হয়।
“আপু।”
বলে ডেকে ওঠল কুঞ্জ। হাজার হোক, ভাই-বোন তো। আয়ানা ওর ডাকে সাড়া দিয়ে বলল,”কী বলবি?”
“তোমার জন্য মিষ্টি এনেছি।”
“মিষ্টি কেন?”
“তুমি তো খাওনি। তাই আনলাম।”
“এত দরদ দেখাচ্ছিস। আমার তো মনে হয়েছিল সব দরদ কুহু আর কণার জন্যই।”
কুঞ্জ মুখটা কালো করল। বলল,”এভাবে বলছো কেন? তুমি আমাকে বকা দাও বেশি। তবে আমি মনে রাখি না।”
আয়ানা ফোঁস করে দম ফেলল। দুটো মিষ্টি এনেছে কুঞ্জ। আয়ানা বলল,”তুই খেয়েছিস?”
“হুম।”
“আচ্ছা, আরেকটা খা।”
বলে আয়ানা একটা মিষ্টি কুঞ্জর মুখে তুলে দিল। পুরো মিষ্টিটাই এক মুখে খেয়ে নিল কুঞ্জ। এভাবে খেতে দেখে আয়ানা হো হো করে হেসে ফেলল। হাসল কুঞ্জও। ওদের এই খুনসুটির মুহূর্ত ধরা দিল আবিরের কাছে। আবির অদূর থেকে বলল,”বাহ, বাহ। শুধু কুঞ্জই ভাই? আর আমরা কেউ না?”
“অহ, আবির ভাইয়া। খাও না তুমিও।”
“না রে। আমি খেয়েছি। মজা করে বললাম।”
“কোথাও যাচ্ছ?”
“হ্যাঁ, একটু বের হব। রাত্রির বোধহয় এখানেই বিয়েটা হয়ে যাবে। আগামীকালই ছেলের বাড়িতে যাওয়া হবে। তাই কিছু কেনাকাটা আজই করে রাখব। কাল ঝামেলা হবে।”
“সেটাই ভালো। আচ্ছা সাবধানে যাও।”
“হুম। তোদের কিছু লাগবে? কুঞ্জ, কিছু খাবি?”
“পেট ফুল ভাইয়া।”
বলে নিজের পেটখানা দেখাল কুঞ্জ। এইটুকু বয়সেই কুঞ্জর পেটে মেদ জমে গেছে। বিষয়টা আসলেই খারাপ। তবে বাচ্চা মানুষ, খাওয়া কমাতে বললে আবার অভিমান করবে।
কুহু কখনোই চায় নি কুঞ্জ আর আয়ানার মাঝে ঝামেলা হোক। দুই ভাই-বোন। মায়া মহব্বত নিয়ে থাকবে। এটাই তো স্বাভাবিক। তবে কণা এটা আবার মানতে পারছে না। ও পুরো ঘটনা দেখেছে। এসে বোনের কাছে বলল। কুহু একটু বিরক্তই হলো।
“তুই কি চাস ওরা ঝগড়া করুক?”
“সেটা তো বলিনি আপু।”
“তাহলে? মিলে মিশে থাকলেই তো ভালো?”
“ভালো, কিন্তু….
বলে কণা থামল। কুঞ্জ সবার আদরের। তবে এ ক মাসে কুঞ্জর সাথে সবথেকে বেশি মিশেছে কণা। ওর কেমন হিংসে হলো। নিজের ভাই না থাকার যে অভাবটা, তা এই ছোট্ট কুঞ্জ দূর করে দিয়েছিল। আয়ানা সেখানেও ভাগ বসাল। অথবা ও ই হয়তো আয়ানার ভাগে ভাগ বসিয়েছিল। কেন যেন খারাপ লাগছে খুব। কণা উদাস মনে বেরিয়ে এল। এখানে সেখানে ঘুর ঘুর করল। নিচ তলায় আসতেই দাদিজানের গলা শোনা গেল। দাদিজান বসার ঘরে আসতে চাইছেন। কণা গিয়ে নিয়ে এল। বসাল বসার ঘরে। বৃদ্ধা গল্প জুড়ে দিলেন। বাড়িতে এখন একটা বিয়ে বিয়ে ভাব এসেছে। সবাই খুব ব্যস্ত। দেওয়ান বাড়ি আগে আরো উৎসবমুখর ছিল। ওনার আরো জা ছিল। সময়ের সাথে সাথে প্রায় সবাই হারিয়ে গিয়েছেন। তাদের ছেলে মেয়েরা একেক জন একেক জায়গায় থাকেন। সেসব গল্পই করলেন তিনি। কণা সব শুনল। ও দাদির পায়ের কাছে বসা।
“আমার খুব সে সময় গুলোতে যেতে ইচ্ছে করে দাদিজান। সেই সময় গুলো সুন্দর ছিল তাই না?”
বৃদ্ধা হাসলেন। বললেল,”সব সময়ই সুন্দর হয় রে। কিন্তু এটা তখুনি অনুভব করা যায় না। অতীত হয়ে গেলে, কেবল তখনই অনুভব করা যায়।”
“তাই? তবে এখনকার সময় গুলোও একটা সময় সুন্দর লাগবে?”
“হুম, লাগবে, লাগবে।”
“এই যে, আমার একটা ভাই নেই। অথচ রাত্রিপু, আয়ানাপুর ভাই আছে,একটা সময় পর এই ভাই না থাকার সময়টাও সুন্দর মনে হবে?”
ফট করেই বলে ওঠল কণা। বৃদ্ধা ঘাড় ফিরিয়ে চাইলেন।
“ওদের ভাই কি তোর ভাই না?”
“ভাই, কিন্তু আপন তো না।”
বলে কণা মাথাটা নামিয়ে ফেলল। বৃদ্ধা বললেন,”কী হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে?”
“না দাদিজান। কে কি বলবে? আপন তো আপন ই হয় তাই না?”
কণার এত দুঃখ যে কোথা থেকে এল কে জানে। বৃদ্ধা কি বলবেন বুঝলেন না। কণা এবার ঠোঁট উল্টাল।
“ভেবেছিলাম কুহুপুর সাথে দীপ্র ভাইয়ের বিয়ে হলে সত্যি সত্যি ভাই পেয়ে যাব। সেটাও হলো না। কুঞ্জটাও আয়ানাপুর সাথে মিলে গেল। ভালো লাগে না।”
বলে ওঠে গেল কণা। আদতে কণা একদিক থেকে যেমন চালাক চতুর। আবার এক দিক থেকে সহজ সরল বোকা। ও নিজেকে মাঝে মাঝে একদম বিলিয়ে দেয়। সব কথা বলে দেয়। ঠিক তেমনই ঘটল এখন। নিজের ভেতরকার কথা গুলো দাদিজানের কাছে একদম বিলিয়ে দিল যেন।
অরণ্য সিগারেট খাচ্ছে। ওর এই সিগারেট খাওয়াটা নিতে পারছে না কুহু। ইচ্ছে করছে টান মেরে সিগারেটটা ফেলে দিয়ে বলতে,’এসব ইগো বাদ দিন অরণ্য ভাইয়া। দয়া করে আমার বোনের মান ভাঙান।’ কিন্তু তেমন ও করতে পারছে না। ও হতাশ হয়ে ট্রে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল।
“চা নিয়ে এসেছি অরণ্য ভাইয়া।”
অরণ্য দ্রুত সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে নিভিয়ে ফেলল। ও এমনি সিগারেট খায় খুব। তবে ছোট মানুষদের সামনে খেলে, লজ্জা বোধ হয়।
“এ সময়ে চা আনলে যে আপু। দরকার ছিল না।”
“বড়ো মা পাঠাল। চা বানিয়েছে সবার জন্য।”
“ও,ও। থ্যাংক ইউ।”
বলে কাপটা তুলল অরণ্য। কুহু কিন্তু গেল না। দাঁড়িয়েই রইল।
“বসো আপু। কেমন আছ বলো।”
না বসেই কুহু বলল,”ভালো আছি। তবে আপনাকে বুঝতে পারছি না ভাইয়া।”
এ কথায় অরণ্য নড়েচড়ে ওঠল। কুহু কি বলতে চায় তা পরিষ্কার না হলেও ধরার মতন। ও হেসে বলল,”কেন আপু? আমাকে রহস্য লাগে নাকি?”
“সেটাও বুঝতে পারছি না।”
আবারো হাসল অরণ্য। বলল,”তাহলে?”
“রাত্রিপুর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।”
না পেরে নিজ থেকেই বলে দিল কুহু। দীপ্র ভাই তখন তাকে কি সব বুঝিয়েছে, ও জানে না। ওর মাথায় একটাই কথা, এদের সব ঠিক হতে হবে। হতেই হবে। তাই নিজ থেকেই বলে ফেলল।
“ভালো তো।”
“হুম। আপু চলে গেলে, আমার যে কি হবে।”
“তুমিও বিয়ে করে নাও।”
“ছেলে দেখেন। বিয়ে করে নিব।”
“দেখতে হবে কেন? তোমার তো ঘরের মধ্যেই পাত্র আছে।”
এ কথায় কুহু নড়েচড়ে ওঠল। প্রসঙ্গ বদলাবার জন্য বলল,”কাল ছেলের বাড়িতে যাবে সবাই। আপনি যাবেন না?”
“হ্যাঁ, যাব।”
সহজেই বলে ফেলল ‘হ্যাঁ যাব’। এ কথার পর আর কথা খুঁজে পেল না কুহু। ও বিদায় জানিয়ে চলে গেল। ও চলে যেতেই সিগারেট খানা পুনরায় ধরাল অরণ্য। তারপর চোখ দুটো মুদিত করল। মুদিত করতেই রাত্রির মুখ খানা ভেসে এল। রাত্রি একবার ও ভাবল না সম্পর্কের কথা। বেশ আমোদেই বিয়ে করে নিচ্ছে। অথচ,এই প্রেমের জন্য নাকি নিজের সবটুকু ছাড়তে রাজি ছিল বলে বড়ো বড়ো বাক্য শুনিয়েছিল। আদতে ওসব মিথ্যে। সব মিথ্যে। আর সেই মিথ্যেটাকেই অরণ্য সত্যি ভেবেছিল। কি বোকা ও! নিজের প্রতি ধিক্কার জানাতে ইচ্ছে হচ্ছে।
একটা চমক দেখুন 👇
https://www.facebook.com/share/163VT6qvyP/
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি
(৪২)
https://www.facebook.com/100076527090739/posts/837984925429070/?app=fbl

