#প্রণয়ের_রূপকথা (৫০)
২৪ ঘন্টার ও বেশি সময় হলো অরণ্যকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। ও একটু আলাভোলা স্বভাবের। এটা সবাই এই ক মাসে বুঝে গেছে। তবে এত দীর্ঘ সময় ফোনে না পাওয়াটা সত্যিই চিন্তায় ফেলেছে সবাইকে। কুহু চিন্তিত ভাবে রুমে প্রবেশ করল। একরাশ মন খারাপের সহিত বলল,”এখনো অরণ্য ভাইয়ার সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। কী হলো বলো তো।”
রাত্রি শুকনো একটা ঢোক গিলল। এমনিতেই বিয়ের দিন যত আগাচ্ছে, রাত্রির ভেতরের উষ্ণতা তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ওর দিন দুনিয়া কেমন অন্ধকার হয়ে আসে। এরই মধ্যে কণা রুমে প্রবেশ করল। সে ফোন হাতে নিয়ে এসেছে। মুখটা আলুর মতন করে বলল,”রাত্রিপু, কল রিসিভ করো না কেন?”
ওর কথায় রাত্রি ফোনের দিকে চাইল। কিছু বলার পূর্বেই কণা তার নিজের ফোন খানা রাত্রির হাতে ধরিয়ে দিল।
“নাও, কথা বলো।”
এক মুহূর্তের জন্য রাত্রি বুঝল না কথার মানে। ফোনের স্ক্রিনে কোনো নামও নেই। ওর হৃদয় কেমন একটা করে ওঠল। মনে হলো অরণ্য কল করেনি তো? করতেই পারে। এমন একটা বিশ্বাস নিয়ে উদ্বিগ্ন ভাবে ও বলল,”হ্যালো।”
ওপাশ থেকে একটি উষ্ণ শ্বাস ফেলার শব্দ হলো। ব্যক্তিটি ভরাট গলায় বলল,”থ্যাংক গড। ফাইনালি তোমাকে পাওয়া গেল।”
রাগীবের গলা। রাত্রি কি বলবে বুঝল না। চুপ করে রইল। রাগীবই বলল,”কত গুলো কল করেছি। রিসিভই করলে না। শেষে না পেরে তোমার এই দুষ্টু বোনের নাম্বারে কল করেছি। ভাগ্যিস ওর নাম্বারটা ছিল।”
“সরি রাগীব। আমি আসলে খেয়াল করিনি। ফোন সাইলেন্ট করা ছিল।”
“সেটা বুঝতে পেরেছি। কল করেছি একটি বিশেষ দরকারে। বিয়েতে তো শাড়ি দেয়া হলো। বউ ভাতে লেহেঙ্গা নেবে? কেনাকাটা করা হচ্ছে। বাড়ির সবাই খুব ব্যস্ত। সামনে আরো ব্যস্ততা যাবে। তাই আগেভাগেই তোমার জিনিস গুলো সিকিউর করতে চাচ্ছি।”
রাত্রির কানে কথা গুলো যেমন করে এল, সেভাবেই বেরিয়ে গেল। ও শুধু বলল,”একটা হলেই হবে।”
“একটা হলেই হবে। এটা কোনো কথা হলো। তুমি বলো কী চাও।”
“লেহেঙ্গা।”
“ওকে। আর কিছু? আর কোনো চয়েস?”
“নেই।”
“আচ্ছা।”
কথা থেমে গেল। রাগীব বোধহয় আরেকটু কথা আগাতে চাইছিল। এমন সময় মানুষ কথা বলতে চায়। বিশেষ এক ভালো লাগার অনুভূতি থাকে এই সময়ের কথা গুলোতে। তবে রাত্রির এমন মৌনতা ওকে আর কথা আগাতে দিল না। কলটি কেটে যেতেই কণার হাতে ফোন খানা বাড়িয়ে দিল ও। কণা ফোঁস করে দম ফেলে বলল,”আমি তো ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম হুট করে আমাকে কল করায়। মনে হচ্ছিল হয়তো বকে দেবে। পরে বুঝলাম এ ব্যাপার।”
কুহু কিংবা রাত্রি, কেউ সেভাবে আগ্রহ দেখাল না। অগত্যা কণাকেও চলে যেতে হলো। ও চলে যেতেই শুকনো ঢোক গিলে রাত্রি বলল,”একটা হেল্প করতে পারবি?”
“কী?”
“দীপ্র ভাইয়ের থেকে আবারো খোঁজ নিবি প্লিজ? আমার, আমার কেমন যেন লাগছে কুহু।”
রাত্রির বুকের ভেতর কান্না জমে আছে। কুহু এগিয়ে এসে দু হাতে রাত্রির মুখটা স্পর্শ করল।
“আমার ভালো আপু। আমার রাত্রিপু। এখনো ভালোবাসো, অথচ ভাগ্যের এ কেমন পরিণতি।”
রাত্রি কথা বলল না। বলার মতন কিছু নেই। দিন যত আগাচ্ছে, অন্তরের দহন তত বাড়ছে। অথচ শুরুতে মনে হয়েছিল কত সহজেই সব কাটিয়ে ফেলেছে।
দীপ্র বাড়ি নেই। এখানে ওখানে খুঁজে একবার দীপ্রর কক্ষেও উঁকি দিল কুহু। পেল না। না পেয়ে ফিরে যেতে নিতেই আয়ানার সাথে ধাক্কা লেগে গেল। আয়ানা শপিং করে ফিরল। ওর হাতের ব্যাগ গুলো মেঝেতে পড়ে গিয়েছে। বিরক্তি চোখে মুখে। কুহু সাহায্য করতে গেলেই আয়ানা বিরোধ করে ওঠল,”এই ধরবি না।”
এ কথাতে কুহু ভ্রু কুঞ্চিত করে ফেলল। আয়ানা ব্যাগ গুলো নিজেই তুলল। সব গুলো দেখে নিয়ে বলল,”এগুলো স্পেশাল। দীপ্রর জন্য এনেছি।”
দীপ্র’র জন্য এনেছি! আয়ানা এমন ভাবে বলল যেন দীপ্র ওর স্বামী হয়ে গিয়েছে। কুহু আর কোনো কথা না বাড়াতে চাইল না। তাই পাশ কাটিয়ে চলে এল।
কল দিতেই রিসিভ হলো। দীপ্র বলল,”কুহু, একটু ব্যস্ত আছি। একটু পর কল দিচ্ছি।”
কুহু কিছু বলার সুযোগ পেল না। কলটি কেটে গেল। ও অপেক্ষায় রইল। মিনিট দশেক পর কলটি এল। রিসিভ করেই ক্লান্তিময় একটা নিশ্বাস ফেলল দীপ্র।
“কুহু।”
“জি।”
“বল…এখন। তখন ব্যস্ত ছিলাম। কথা বলার সুযোগ হয়নি।”
“কল করেছি জানার জন্য।”
“কী?”
“অরণ্য ভাইয়ার সাথে যোগাযোগ হয়েছে?”
দীপ্র নিশ্বাস ফেলল। এই মেয়েটি তাকে কল করে অন্যের খোঁজ খবর নিতে। একটিবার তার খোঁজে তো কল করে না। ওর মৌনতা দেখে কুহু আবারো শুধাল,”হয়েছে যোগাযোগ?”
“হলো, মাত্রই। একটা সমস্যা বুঝতে পারছি।”
“কী?”
“অরণ্য নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছে। সেটার জন্য রিগ্রেট করছে।”
কুহুর খুব হতাশ লাগল। ও সেভাবেই বলল,”রাত্রিপুই আপনার থেকে খোঁজ নিতে বলল।”
“এরা দুজন সত্যিই এবার ঝামেলা বাঁধাবে। আমি খুব ভালোই বুঝতে পারছি কুহু।”
কুহু কি বলবে বুঝল না। এতদিন রাত্রি-অরণ্যর জন্য ওর মন কেমন করত। এখনো করে। তবে রাগীব, ঐ ভালো মানুষটা মাঝ খান থেকে ঠকে যাচ্ছে। ওর ছোট মস্তিষ্ক এত কিছু নিতে পারছে না। ও মৌন হয়ে রইল। সহসাই দীপ্র বলল,”খেয়েছিস?”
“না।”
ঘড়িতে সময় দেখল দীপ্র। ফিরতে ফিরতে মাঝ রাত হয়ে যাবে। আজ আর বাড়ি ফিরতে মন চাচ্ছিল না। তবে এখন আবার ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছে। দীপ্র আদুরে ভাবে ডাকল।
“কুহু।”
“জি।”
“খুব ক্ষিধে পেয়েছে?”
“পায় নি তো।”
“তাহলে একটু অপেক্ষা করতে পারবি? আমি এখনই বের হচ্ছি। হয়তো রাত কিছুটা বেশি হবে। একসাথে খাই?”
কুহু সত্যিই অপেক্ষায় রইল। রাতের খাবার খেল না। দীপ্রর আসতে একটু রাত হলো। বাড়ির প্রায় অর্ধেক ঘুমিয়েছে অনেক আগেই। জেবা জেগে ছিলেন। তিনি ছেলের জন্য খাবার গরম করতে চাচ্ছিলেন। তখনই দবীর নিষেধ করলেন। বললেন ঘুমাতে। সব নাকি তৈরি আছে। তবে মায়ের মন তো। তিনি ঠিকই নিচে নামতে যাচ্ছিলেন। তখনই দেখলেন খাবার গরম করছে কুহু। এটা দেখেই স্বামীর কাছে ফিরলেন তিনি। তার চোখে মুখে এক রকম উচ্ছ্বাস দেখা গেল।
“কুহু খাবার গরম করছে।”
“হুম। দেখে এসেছি।”
“এই জন্যই আমাকে মানা করলে?”
“হ্যাঁ।”
“তোমার কী মনে হয়, ওদের মাঝে কিছু সম্ভব?”
দীপ্রর বিষয়টি স্ত্রীকে এখনো জানাননি তিনি। এমনকি আনোয়ারের ভেতর যে ইচ্ছেটি রয়েছে সেটাও গোপন রেখেছেন স্ত্রীর থেকে। তার মৌন হওয়া দেখে জেবা বললেন,”কী হলো। কিছু বলো।”
“দেখা যাক কি হয়। আগেভাগেই কিছু বলা যায় না জেবা।”
“আমি চাই তোমার ছেলের এই সুবুদ্ধি হোক। কুহুটা সত্যিই লক্ষ্মী।”
দবীর কিছু বললেন না। এদিকে জেবা সুন্দর একটা স্বপ্নে বুদ হয়ে রইলেন। যা বাস্তব হতে পারে শুধুমাত্র দীপ্র আর কুহুর মন দেয়া নেয়ার ভিত্তিতে।
খাবার বেড়ে দিতেই দীপ্র বলল,”আই লাইক’ড ইট।”
কুহু মাত্রই নিজের প্লেটে খাবার নিয়ে বসেছে। এ কথায় হাবুলের মতন চাইল। দীপ্র মৃদু হেসে বলল,”এই যে, আমার জন্য অপেক্ষা করলি।”
কুহুর কেমন একটা অনুভূতি হচ্ছে। বাড়ির পরিবেশ নির্জন। ডাইনিং এড়িয়াটা একটু ভেতরের দিকে হওয়াতে এখানকার উপস্থিতি সহজেই শোয়ার ঘর গুলোতে যায় না। তাই কিছুটা নিশ্চিন্তেই বসা গেছে। তবু কেমন কেমন যেন লাগছে। কেমন চোর চোর অনুভূতি হচ্ছে। ও মুখ ফুটে বিষয়টা বলেই ফেলল। এ কথায় দীপ্র হাসল।
“মাঝে মধ্যে এমন চোর চোর কিছু কাজ করতে হতে পারে। এটা অভ্যাস করে নে।”
অভ্যাস করে নেবে? কুহুর নজর দীপ্রর দিকে ছিল। এবার সেটা প্লেটের দিকে আনল। ভাত নাড়াচাড়া করতে করতে ও বলল,”অভ্যাস জিনিসটা খারাপ দীপ্র ভাই।”
“জানি।”
“তবে অভ্যাস করতে কেন বলছেন?”
“কেন বলছি সেটা তুই তো বুঝিস কুহু। বুঝিস না?”
এ কথার জবাব দেয় না কুহু। মাথা নামিয়ে রাখে। ও বুঝে। বুঝতে পারে সবটা। তবে নিজের করা অতীতের কাজটি গলায় এসে আটকে ধরে। ভেতরে ভেতরে দগ্ধ করে। কোথাও একটা ভয় হয়। সেই ভয় তাকে আগাতে দেয় না। দীপ্র ও বোধহয় ওর অনুভূতি ধরতে পারল। তাই আর ঘাটাল না। পরিস্থিতি যতটা সহজ ভাবে নেয়া যায়, ততটাই ভালো। দীপ্র সে পথেই আগাতে চায়।
আমার প্রিয় পাঠকে’রা। আজই শেষ দিন, আমার সকল ই-বই তে ৫০% ছাড় নেয়ার। বিস্তারিত দেখে নিন।👇
https://www.facebook.com/100076527090739/posts/859106443316918/?app=fbl
চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি
(৫১)
https://www.facebook.com/100076527090739/posts/863834262844136/?app=fbl

