চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড় লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ ১৯.

0
26

#চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড়
লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ

১৯.
মুন্নি খাবার ছেড়ে থালায় হাত ধুয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে নিজ ঘরে চলে গেলো। জমিদার গিন্নীও খাবার ছেড়ে উঠে মেয়ের পিছু পিছু গেলো। সাজাদ উঠতে নিলেই সহিনী তার কাঁধে হাত রেখে তাকে বসিয়ে দিলো। সাজাদ সহিনীর দিকে তাকাতেই সহিনী ইশারায় চুপ থাকতে বলল। সাইর খাবার শেষ করে এক গাল হাসলো। তুলির দিকে তাকিয়ে বলল„ —“এত ভালো রান্না করতে পারো আগে বলো নি কেন?”

তুলি চোখ-মুখ শক্ত করে বলল„ —“আগে বললে কি করতেন?”

—“তোমাকে নতুন করে হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে দিতাম যাতে আমি ব্যতীত আর কেউ তোমার হাতের রান্না না খেতে পারে।”

উপস্থিত সবাই সাইরের দিকে তাকাতেই সে ফিক করে হেসে দিলো সবার মাঝে। তুলি চলে যেতে নিলেই সহিনী পেছন থেকে ডাকলো„ —“তুলি। কোথায় যাও তুমি? খাবে এসো?”

তুলি একবার সাইরের দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল„ —“বাবা-মায়ের সাথে খাবো ভাবি। আপনি খান।”

সহিনী নাকঁচ করে দিলে„ —“উহু তা হবে না। একসাথে খাবো। যাও খালা-খালু’কেও নিয়ে এসো। সবাই এক-সাথে খাবো।”

তুলি বাইরে গেলো তার বাবা-মাকে ডাকতে। বাগানে তারেক মতির সাথে বসে গল্প করছিলো। মতি বেশ কাজের লোক। জমিদারের কোনো কথায় সে ফেলতে পারে না। হুজুরের নূন খেয়েছে বলে কথা‚ গুণগান তো গাইতেই হবে। তুলি এসে দুজনের মাঝে উপস্থিত হলো। তুলিকে দেখে মতি তার দাঁত-কপাটি বের করে একগাল হাসলো। বলল„ —“লও তারেক মিয়া তোমার চাঁন্দের টুকরা মাইয়া আইছে।”

তারেক পেছন তাকিয়ে দেখলে তুলি তার পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে। তারেক উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল„ —“কিরে মা তুই এখানে? কিছু হয়েছে কি?”

—“সব সময় তুমি আমার চিন্তা কেন করো বাবা? তোমার নিজের চিন্তা হয় না নাকি?”

তারেক হাসলো„ —“আমার কাছে তুই সব রে মা। তুই থাকলে আর কিছুই লাগবে না।”

তুলি এসে তার বাবার পাশে বসলো। বলল„ —“শুধু আমি থাকলেই হবে? খাবার খেতে হবে না। চল?”

তারেক আদুরী সুরে মেয়েকে বুকে টেনে নিলো। তুলিও ছোট বাচ্চার মতো বাবার কোলে ঝাপিয়ে পরলো। মতি তাদের বাবা মেয়ের আদুরে মাখা সময়গুলো পরখ করলো।

কিছুক্ষণ পরেই খাবার টেবিলে হাজির হলো তুলি। সাথে তার বাবা-মাও রয়েছে। সহিনী তুলিকে আসতে দেখে টেবিলে খাবার বেরে দিলো। সবাই একসাথে বসে খুব আনন্দ সহকারে খাবার শেষ করলো।

বিকাল হতেই সাইর জমিদার বাড়ি ফিরলো। তার সাদা লুঙ্গি কাঁদায় মেখে একাকার। হুড়োহুড়িয়ে বাড়িতে ঢুকেই তুলিকে ডাকতে লাগলো„ —“তুলি। তুলি। তুলি।”

সামনে সিঁড়ির কাছে যেতেই তার মায়ের সাথে দেখা হলো। সাইর মুখ আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন করল„ —“আম্মা তুলি কোথায়?”

জমিদার গিন্নী মাটির সিঁড়িতে পায়ের ছোট ছোট ধাপ ফেলে বলল„ —“তোর বউ তো সারাদিন শুয়েই থাকে। দেখ ঘরেই আছে হয় তো। কানে তো সোনা দিয়া রাখছে ডাকলে শুনতে পারে না।”

সাইর কিছু না বলে দ্রুত মাটির সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরে গেলো। ঘরে আসতে দেখলো তুলি জানালা খুলে দাড়িয়ে আছে। জানালা দিয়ে আসা বাতাসে খোলা চুলগুলো এদিক সেদিক নড়ছে তার। দুই হাত বুকে গুঁজে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে সে। পড়ন্ত বিকেলের নীল আকাশের বুকে লাল সূর্যের ডুবন্ত আবহাওয়া দেখতে ব্যস্ত তুলি। সাইর কিছু না বলে পাশে কলপাড়ে গেলো। নিজেকে পরিপাটি করতে গোসল সেরে বাইরে বেরিয়ে এলো সে। সাদা-কালো চেক লুঙ্গি পরে বাইরে বেরিয়ে এলো সাইর। তুলি তখনও জানালার পাশেই দাড়িয়ে ছিল। সাইর ধীর পায়ে তুলির কাছে গেলো। নীল-সবুজ মিশ্রণে গাঢ় লাল ফুলে আলাপন দিয়ে আঁকানো গাঁয়ের তাতের শাড়ি শরীরে জড়িয়ে রেখেছে তুলি। সাদা করে শাড়ি পড়ায় পেছনের কিছু অংশ উন্মুক্ত হয়ে আছে। সাইর পেছন থেকে দুই হাতে শাড়ির ফাঁকা জায়গা ভেদ করে তুলিকে জড়িয়ে ধরলো। ঠান্ডা হাত পেটের উপরে পড়তেই তড়িৎ গতিতে লাফিয়ে উঠলো তুলি। পেছনে ফিরে সাইরকে দেখে ভরকে গেলো। আমতা আমতা করে বলল„ —“আ আপপননি এ এখ খানে?”

সাইর তুলির কাঁধে থুতনি রেখে বলল„ —“হুম আমি’ই এখানে। তুমি কি অন্য কাউকে আশা করেছিলে?”

তুলি আবারও জানালার দিকে তাকালো। গম্ভীর গলায় বলল„ —“নাহ।”

সাইর মাথা ঘষল তুলির গালে। চুলে থাকা বিন্দু বিন্দু ঠান্ডা পানির ফোটা গালে স্পষ্ট করতেই কেঁপে উঠলো তুলি। সাইর হাতের বাঁধন আরও শক্ত করলো। তুলি সহসাই জানালার বাইরে তাকিয়ে চুপচাপ দাড়িয়ে আছে। সাইরের বিষয়টা ভালো লাগছে না। তুলিকে ছেড়ে দিয়ে দুই হাতে তার বাহু চেপে নিজের দিকে ফেরালো। বলল„ —“কি হয়েছে তোমার? এভাবে প্যাঁচার মতো মুখ করে রেখেছো কেন?”

তুলি একবার সাইরের দিকে তাকিয়ে আবার অন্য দিকে ফিরলো।কোনো উত্তরই সে করলো না। সাইর তুলির চুপ থাকা দেখে বেশ অবাক হলো। তুলির নিরবতা তাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে বারবার। তুলিকে আরও কাছে টেনে নিয়ে বলল„ —“যাও এই শাড়িটা ছেড়ে ভালো একটা শাড়ি পড়ে নাও। বাহিরে যাবো। গাঁয়ের কিছু জায়গা-জমিতে কাজ আছে। আমি তোমাকে নিয়ে সেদিকেই যাবো।”

সাইর যেতে নিলেই তুলি বলল„ —“আমি যাবো না।”

সাইর পেছন ফিরে বলল„ —“কেন যাবে না? মন খারাপ করছে? বাইরে থেকে ঘুরে এলে সবকিছু ঠিক হয় যাবে। চলো। তুমি তৈরি হয়ে নিচে এসো। আমি নিচে যাচ্ছি। দ্বিতীয় বার যেন বলতে না হয় কেমন?”

সাইর ঘর ছেড়ে বাইরে গেলো। তুলি ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো জানালার পাশে। তার মন ভালো নেই। বিকেলবেলায় রাতের জন্য রান্না করছিল সহিনী। তুলি রান্নাঘরে যেতেই জমিদার গিন্নী কত কথাই না শুনালো তাকে। বাবা-মা তুলে গালিগালাজও করলো। সেই থেকে ঘরে এসে চুপচাপ জানালার পাশে দাড়িয়ে বাইরের আবহাওয়া দেখছে সে। মন খারাপেরা যেন তাকে ঘীরে ধরেছে।

কিছুক্ষণ পরে সাইর একটা ব্যাগ হাতে ঘরে আসলো। তুলিকে একই জায়গায় দেখে রাগ হলো তার। হাতের ব্যাগটা চৌকির উপর রেখে দ্রুত তুলির কাছে গেলো। কোন কথা না বলে তুলিকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে সোজা কলপাড়ে গেলো। আচমকা এমন হওয়াই তুলিও বেশ ভয় পেলো। সাইর তুলিকে নিচে নামিয়ে পানি ভর্তি বালতি থেকে এক মগ পানি ঢেলে দিলো। শাড়ি ভিজিয়ে পানি শরীর স্পর্শ করতেই তুলির ধ্যান ভাঙলো। দুই হাতে সাইরকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দিলো। তুলির এমন আক্রমণে মাটিতে পরে গেলো সাইর। ঠান্ডা পানিতে শরীর ভিজতেই কেঁপে উঠলো তুলি। সাইরকে এমন রেখে কলপাড় থেকে বেরিয়ে কপাট থেকে গামছা নিয়ে শরীর মুছলো সে। সাইরও বেরিয়ে এলো কলপাড় থেকে। তুলি শাড়ির কিছু অংশ ঝাড়া দিতেই পানির ফোটা ছিটকে এলো সাইরের মুখে। সে চোখ-মুখ খিঁচে বলল„ —“এসব ছাড়ো। নতুন শাড়ি এনেছি। ওটা পড়। সুন্দর দেখাবে তোমায়।”

তুলির চোখ বড় বড় করে তাকালো„ —“আপনি একটা বেয়াদব কবে থেকে হয়েছেন? দেখছেন যে আমার মন ভালো নেই। তাহলে জোর করছেন কেন? আপনি আপনার মতো থাকুন না? আমাকে কেন বিরক্ত করছেন?”

তুলির আদুরে মাখা মুখখানা দেখে কাছে এগিয়ে এলো সাইর৷ এগোতে এগোতে বলল„ —“তুমি আমার বউ। তোমার মন খারাপের কারণ আমার জানা প্রয়োজন। কিন্তু তুমি? তুমি তো সব সময় ডিম পা’রা মুরগির মতো ঝিম মেরে থাকো? আমাকে কিছু বল’ই না।”

তুলি চোখ নামিয়ে নিলো। আপাতত তার কিছু করতে ভালো লাগছে না। অন্য মনস্ক হতেই সাইর আবারও বলল„ —“শাড়িটা পড়ে নাও। বাইরে ঘুরতে যাবো।”

—“আমি যাবো না।”

সাইর ভ্রু উঁচিয়ে বলল„ —“কেন যাবে না?”

তুলি অন্যদিকে মুখ ঘুরালো„ —“আমার ভালো লাগছে না তাই আমি যাবো না।”

সাইর কটমটিয়ে তাকালো„ —“তোমার ভালো লাগা আর না লাগার উপরে আমি চলি না। আমি বলেছি মানে যেতেই হবে। দ্রুত পড়ে নাও নয়তো অর্কা’র কাছে রেখে আসবো।”

অর্কা’র কথা কানে আসতেই তুলি কেঁপে উঠলো। একপলক সাইরের দিকে তাকিয়ে ব্যাগ থেকে শাড়িটা বের করলো। জলপাই রঙের শাড়িতে লাল নীল রঙের বাহারী ফুলের কারুকাজের নকশাঁ তৈরি। মাথা তুলে তাকিয় বলল„ —“আপনি বাইরে যান। আমি শাড়িটা পড়ে আসছি।”

সাইর একহাতে বুকে আর অন্য হাত গালে দিয়ে তুলির দিকে তাকালো„ —“আমার সামনে পড়তে কি আপত্তি আছে তোমার?”

—“হুম।”

সাইর ভ্রু উঁচিয়ে বলল„ —“কেন? কেন? কিসের আপত্তি বলো?”

তুলি সাইরের দিকে তাকালো। বলল„ —“আপনি পুরুষ মানুষ। এতেই আমার বড় আপত্তি। আপনি আসুন।”

সাইর ঠাট্টা করলো„ —“পুরুষ হলেও আমি তো তোমার স্বামী তাই না। আর স্বামী স্ত্রী হলো একে অন্যের পোশাক স্বরূপ।”

—“হয়েছে আমাকে আর কিছু শুনাতে হবে না। এখন আপনি আসুন।”

সাইর মুচকি হেঁসে বাইরে গেলো। তুলি আর কোনো বাহানা ছাড়াই শাড়িটা বদলে সাইরের আনিত শাড়ি পরিধান করলো।

মাটির সিঁড়ি বেয়ে ছোট ছোট ধাপ ফেলে একসাথে নিচে নেমে এলো সাইর আর তুলি। তাদের এভাবে আসতে দেখে জমিদার গিন্নী তলব করলেন„ —“সাইর কোথায় যাচ্ছিস?”

—“তুলিকে নিয়ে একটু বাইরে যাবো। বাবা বলেছিল মুন্নি কাকার জমিতে নাকি গন্ডগোল চলছে সেটা একটু দেখতে যাচ্ছি।”

—“তা তুই যাবি ভালো কথা। তোর বউকে কেন নিচ্ছিস সাথে? বাড়িতে অনেক কাজ পরে আছে। তোর বউকে রেখে যা।”

সাইর একবার তুলির দিকে তাকালো। এখন সে মাথা নিচু করে আছে। তার কথায় নতুন শাড়ি পরে ফিতা দিয়ে বিনুনি করে বাইরে চলছে। এখন যদি মায়ের সামনে বলে যাবে না তাহলে আরও মন খারাপ করতে তুলি। লম্বা একটা নিশ্বাস নিলো সাইর। তারপর বলল„ —“বাড়িতে অনেক লোক আছে। তাদের দিয়ে কাজ করাও। আজ আমরা দুজন একটু ঘুরে আসি।”

পাশের হেঁসেল ঘর থেকে সহিনী বেরিয়ে এলো। তুলি আর সাইরকে এমন দেখে জিজ্ঞেস করল„ —“কোথায় যাচ্ছো তোমরা দুজন?”

সাইর তুলির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলো। তারপর বলল„ —“ভাবি একটু বাইরে যাবো ঘুরতে। দুজন মিলে গ্রামগুলো হেঁটে হেঁটে ঘুরে দেখে আসবো।”

জমিদার গিন্নী আবার কিছু বলতে যাবে তখন সহিনী বলল„ —“তুমি এত ভালো কেন সাইর। আর তোমার ভাইকে দেখ? সারাদিন ঘরের ভিতরে ঘুরঘুর করে আর আমাকে বলে শহরে যাবে। আমি তো গ্রামে তেমন আসি নি। আমাকে কি একটু ঘুরতে নিয়ে যেতে পারে না তোমার ভাই?”

সহিনীর অভিমান বুঝে সাইর কথা ঘুরালো„ —“আচ্ছা ভাবি। বাড়িতে কি আর কোন কাজ আছে?”

সহিনী সহসা উত্তর করল„ —“না সব কাজই শেষ।”

—“তাহলে চলো তুমিও আমাদের সাথে ঘুরে আসবে?”

সহিনী যেতে নারাজ„ —“তোমার ভাইকে ছাড়া যাবো না। তুমি তুলিকে নিয়ে যাও ঘুরে এসো। আর বেশি দেরি করিও না যেন। সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরো দুজনে।”

সাইর মাথা নাড়িয়ে দ্রুত তুলিকে নিয়ে বাইরে গেলো। সহিনী পুরো বাড়িটাতে একবার চোখ বুলিয়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা হলো। জমিদার গিন্নী তার রাগ-ক্ষোভ নিয়ে টেবিলে গিয়ে দড়াম করে বসলেন।

মুন্নি পানি খেতে নিচে নেমে এলো। টেবিলে তার মাকে বসে থাকতে দেখেও কোনো প্রতিক্রিয়া করল না সে। এগিয়ে গিয়ে এক গ্লাস পানি পান করে আবারও চুপচাপ নিজের ঘরের দিকে রওনা হলোম জমিদার গিন্নী পেছন থেকে ডাকল মুন্নিকে„ —“মুন্নি? আমার কাছে আয়?”

মুন্নি কোনো কথা না বলে তার মায়ের কাছে এলো। মাথা নিচু করে মায়ের সামনে দাঁড়াল। জমিদার গিন্নী জিজ্ঞেস করল„ —“মন খারাপ করে আছিস কেন?”

—“আমার মন খারাপে কারও যায় আসে না।”

জমিদার গিন্নী বিরক্ত হলো„ —“সব সময় বাপের মতো এক সেড় বেশি বুঝিস কেন? দেখতে আসলেই কি বিয়ে হয়?”

মুন্নি মাথা তুলল„ —“হয় না তবে এবার হবে। তুমি জানো না? সাজাদ ভাইয়ার পরে আমার বিয়ের কথা ছিল। সেখানে সাইর আগেই বিয়ে করেছে। আর এখন বাবা যাকে পাবে তাকেই আমার গলায় ঝুলিয়ে দিবে। আমি এসব বিয়ে-টিয়ে করতে পারবো না। বাবার বাড়িতে আছি, খাচ্ছি-দাচ্ছি, ঘুরিচ্ছি-ফিরিচ্ছি চিন্তা শেষ। অন্যের বাড়িতে গিয়ে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ভাতের পাতিল নিয়ে রান্নার জন্য বের হতে হবে, থালা-বাসন মাজতে হবে, ঘরবাড়ি পরিষ্কার করতে হবে। আরও কত কি আল্লাহ।”

জমিদার গিন্নী কিছু বলতে যাবে তখনই মুন্নি দুই হাতে কান চেপে ধরলো। তারপর জোড়ে চেঁচিয়ে বলল„ —“আমি বিয়ে করবো না।”

জমিদার গিন্নীকে আর কিছু বলতে না দিয়ে হনহনিয়ে নিজের ঘরের দিকে গেলো মুন্নি। জমিদার গিন্নী তব্দা মেরে মেয়ের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। তার মেয়ে কি-না সংসার করতে অমনোযোগী।

মাঠের আঁকাবাকা পথ ধরে হেঁটে চলেছে সাইর আর তুলি। সামনে হাটছে সাইর। তুলির হাত শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় রেখেছে সে। তুলি বাম হাত সাইরের কব্জায় আর ডান হাতে শাড়ির কুঁচি ধরে ধীরে ধীরে হাঁটছে।

আকাশের কোল ঘেঁষে শালিক পাখিরা তাদের নীড়ে ফিরছে। সাইর মাথা তুলে তাকাতেই দেখলো। ঝটপট তুলির হাত টেনে বলল„ —“দেখো পাখিরা কত সুন্দর দলবেঁধে যাচ্ছে।”

সাইরের টানে জমির এলো পথ থেকে কাঁদায় পরে গেলো তুলি। রাগে কটমটিয়ে বলল„ —“এসব কি করলেন? পরে গেলাম তো কাঁদায়। এখন কি হবে? জমিতে পানিও নাই। ধ্যাৎ।”

সাইর কিছু না বলে তুলিকে পাঁজা কোলে তুলে নিলো। তুই দুই হাতে ঝটপট সাইরের গলা চেপে ধরলো। এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল„ —“এসব কি করছেন? আশেপাশে লোকজন আছে তো। কেউ দেখলে কি ভাববে?”

—“লোকে কে কি ভাববে তাতে আমার কি? বউ তো আমার’ই। আমার বউ আমি কোলে নিবো।”

তুলি মুখ বাঁকালো„ —“সারাক্ষণ শুধু বউ আর বউ। হুহ।”

—“বউ থাকতেও যদি অন্য মহিলাদের সাথে ঘনিষ্ঠ হই তাহলে বউয়ের হক নষ্ট হবে। আমি তেমন স্বামী নই যে বউয়ের হক নষ্ট করবো।”

তুলি অন্য দিকে ফিরলো। সাইর তুলিকে কোলে তুলে সোজা পথে হাঁটতে লাগলো। সামনে জমিতে একজন লোক উপুড় হয়ে জমিতে ঘাস তুলছে৷ সাইর তাকিয়ে দেখলো লোকটা তুলির বাবা তারেক রহমান। শ্বশুরের সামনে বউকে কোলে তুলে হাঁটতে লজ্জা হচ্ছে সাইরের। সামনে গিয়ে তুলিকে নামিয়ে দিয়ে বলল„ —“সেন্ডেলটা আমাকে দাও। তুলি কষ্ট করে একটু খালি পায়ে হেঁটে চলো।”

সাইর এমন ভঙ্গি দেখে চমকে গেলো তুলি। নখ দিয়ে দাঁত খুঁটে বলল„ —“ব্যাপার কি জনাব। আমি কি কানে ভুল শুনলাম?”

—“না। তুমি ঠিক শুনেছো কিন্তু আমি ভুল বলেছি। এখন চলো তো?”

চলেই তুলির হাত থেকে সেন্ডেল নিয়ে সোজা পথে হাঁটতে লাগলো। তাদের কথা শুনে তারেক মাথা তুলে তাকালো। তুলিকে দেখে ডাকল„ —“তুলি। কোথায় গিয়েছিলিস মা?”

তুলি পেছনে ফিরে তার বাবাকে দেখলো। এবার বুঝলো সাইরের অন্যরকম ব্যবহারের কারণ কি। মুচকি হেঁসে কিছু বলতে যাবে তখন পেছন থেকে সাইর লম্বা একটা সালাম দিলো„ —“আস্ সালামু আলাইকুম আব্বা।”

তারেক উত্তর দিলো„ —“ওয়ালাইকুম আস্ সালাম জামাই বাবাজি। তা কোথায় গিয়েছিলে দুজন মিলে?”

সাইর মাথা চুলকে উত্তর দিলো„ —“একটু ঘুরতে বেরিয়েছি আব্বা।”

তারেক এক পলক তুলির দিকে তাকিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল„ —“সন্ধ্যা হয়ে এলো মা। জামাইকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যা।”

তুলি অকপটে প্রশ্ন করল„ —“তুমি যাবে না বাবা?”

তারেক স্মিত হাসলো„ —“জমির ঘাস ফেলে আমিও আসছি তুই যা।”

তুলি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। সাইরও আর কিছু না বলে তুলিকে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল। তারেক জমির বাকি ঘাসগুলো ফেলতে গেলো।

রাতের বেলা গ্রামে কোনো বিদ্যুৎ থাকে না। এই বিষয়টা গ্রামবাসীদের জন্য খুবই কষ্টকর। তবুও সবাই হারিকেন আর কূপ দিয়েই সাময়িক চালিয়ে নেয়।

রাতের অন্ধকারে জানালার কপাটে দুই হাত রেখে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে তুলি। তার মন খারাপেরা সব এক ঝটকায় পালিয়ে গেছে। সাইর ছেলেটাকে সে যতটা খারাপ ভেবেছিল ততটাও খারাপ সে নয়। আর যাই হোক তুলি নামের মেয়েটাকে সে একটু বেশি’ই ভালোবাসে। একটু না অনেক বেশি’ই। ফিক করে হেসে ফেলল তুলি। কূপের ধিকিধিকি আলোয় নিজের চেহারা উজ্জ্বল হলো তার। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো তার ভালোবাসা দিয়ে সাইরকে পরিপূর্ণ করবে। সব খারাপ কাজ থেকে ফিরে আনবে। তারপর দুজন মিলে সুখে-শান্তিতে সংসার করবে।

পেছন থেকে দুটো হাত এসে তুলির কোমড় চেপে ধরল। তুলির আর বুঝতে বাকি রইলো না যে হাত দুটো সাইরের। সেই সম্মতি জানিয়ে সাইরের হাতের উপরে নিজের হাত রাখলো। দুই হাতে কোমড় টেনে তুলিকে নিজের দিকে ফেলালো সাইর। কূপের আলোয় সবকিছু পরিষ্কার না হলেও যে কেউ তার সহধর্মিণীকে আপন স্পর্শে চিনতে পারবে। ডান হাতে মাথায় দেয়া শাড়ির আঁচলখানা ভেলে দিলো সাইর। বাম হাতে তুলির কোমড় জড়িয়ে রেখেছে। আর একটু টেনে ঘনিষ্ট হলো তুলির সাথে। ডান হাতের সাহায্যে তুলির চুলের খোঁপা খুলে দিলো। ছন্নছাড়া এলোকেশী চুলগুলো বাঁধাহীন হতে পেরে চোখে-মুখে উপচে পড়ছে। সাইর তুলির থুতনিতে হাত রেখে তুলির মুখখানা উঁচু করলো। সাইরের নিঃশ্বাসের প্রতিটি শব্দ তুলির কানে বাঁজতে লাগলো। ভয়ে তিরতির করে কাঁপছে তুলির ঠোঁট-জোড়া। বেসামাল হয়ে পড়লো সাইর। হতবুদ্ধি সব হারিয়ে তুলির মাঝে ডুব দিলো।

সকাল হতেই জমিদার বাড়িতে সব আয়োজন শুরু হলো। মুন্নিকে দেখতে আসবে বলে পুরো জমিদার বাড়ি জঙ্গলের নানান ফুলে সাজানোর আদেশ দিয়েছে জমিদার মামুনুর। তার আদেশে পুরোনো ভাঙাচোরা বাড়িটা বিভিন্ন ফুলে নতুন রূপ নিয়েছে। নতুন নতুন বাবুর্চির হাতের রান্নার মোহনীয় গন্ধ বেরিয়ে সবার খিদে যেন দ্বিগুণ বারিয়ে দিয়েছে।

ঘড়ির কাঁটা সকাল পেরিয়ে দুপুর ছুঁইছুঁই। বাড়ির আয়োজন তখন বের শান্ত হয়েছে। তখনই কোলাহল শুরু হলো বাইরে। জমিদার আর তার গিন্নী দ্রুত পায়ে বাহিরে গিয়ে দেখলো মুন্নিকে দেখতে আসার লোকজন প্রায় সকলেই অসুস্থ হয়ে পরেছে। কারণ জানতে চাইলে একজন লোক বলল„ —“আমরা শহুরে লোকজন। গ্রামের এমন পরিবেশ আমাদের কাছে জীবন জ্বালা বলে মনে হয়। এমন জায়গায় যদি বিয়ে হয় তাহলে তো আমরা মরে যাবো।”

তাদের এমন কথায় জমিদার গিন্নী মন খারাপ করল। এই পরিবারের লোকেরা এখন থেকেই যত সচেতন দেখছি ভবিষ্যতে না জানি তার মেয়েকে আরও কত কি দেখতে হয়।

সব কিছু ছেড়ে সকলকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন জমিদার। সরাই খানায় সকলকে বসতে দেওয়া হলো। তবে একজন মহিলার অনুমতিতে একজনকে দোতলার ঘরে রাখা হলো। রাইসুল রাজ্জাক। বয়স চব্বিশ।

এক বালতি কাপড় হাতে ঘরের দিকে যাচ্ছিল মুন্নি। ঘরে প্রবেশের কিছুক্ষণ আগেই একজনের সাথে থাক্কা লেগে সব জামা কাপড় মাটিতে পরে অপরিষ্কার হয়ে গেলো। রাগে গজ গজ করতে করতে মুন্নি বলল„ —“চোখে দেখতে পারেন না? শরীরের যে চেহারা। ওয়াক।”

রাইসুলের ধুলোয় মাখা জামা-কাপড় দেখে মুখ ভেঙচে উঠলো মুন্নি। নাক ছিটকে বলল„ —“নিশ্চয় বাবা নতুন কাউকে কাজের জন্য এনেছে।”

রাইসুলকে কিছু বলতে না দিয়ে বালতিতে তার সব জামা-কাপড় জড়িয়ে হাতে ধরিয়ে দিলো। কড়া গলায় বলল„ —“সামনে বা দিকে কলপাড়। যান সবগুলো কাপড় পরিষ্কার করে নিয়ে আসুন।”

মুন্নি আর কিছু না বলে সোজা নিচে নেমে এলো। জমিদার গিন্নীকে হন্তদন্ত হয়ে কাজ করতে দেখে জিজ্ঞেস করল„ —“এত তাড়াহুড়ো করছো কেন? ধীরে কাজ করলে কি সমস্যা?”

জমিদার গিন্নী একবার মুন্নির দিকে তাকিয়ে টেবিল থেকে শরবতের গ্লাসগুলো নিয়ে সরাই খানার দিকে যেতে লাগলো আর বলল„ —“টেবিল এক গ্লাস লেবুর শরবত রেখেছি ছেলেটাকে দিয়ে আয়।”

মুন্নি প্রশ্ন করল„ —“কোন ছেলে? কাকে দিতে যাবো আমি?”

জমিদার গিন্নী মুচকি হেসে বলল„ —“একটু আগে যেই ছেলেকে তোর ঘরের দিকে পাঠালাম। রাইসুল নাম ছেলেটার। তোকেই দেখতে এসেছে।”

মুন্নি দাঁত দিয়ে জিহ্বা কেটে মাথায় হাত চাপড় দিলো। সে যেই ছেলেটাকে এতগুলো কথা শুনিয়ে কাপড় ধুতে পাঠিয়ে দিলো সেই ছেলেটা তাকে দেখার জন্য এ বাড়িতে এসেছে। লজ্জায় মাথা কাটা গেলো মুন্নির। যদি তার বাবা এ কথা জানতে পারে তাহলে তার কি অবস্থা হবে। আর কিছু না ভেবে একদৌড় নিজের ঘরের দিকে গেলো মুন্নি।

ঘরে ঢুকেই হন্তদন্ত হয়ে লোকটিকে খুঁজতে লাগলো সে। কিন্তু আজব ব্যাপার লোকটি নেই। সে পুরো দোতলা খুঁজে দেখলো কিন্তু লোকটি কোথাও নেই। লোকটি আবার তার বাবার কাছে নালিশ দিতে গেলো না তো? চিন্তায় কপালে ভাজ পরলো মুন্নির। কি করবে এখন সে? মন ইজ্জত তো চলেই গেছে। এবার তো নিজেকেও যেতে হবে এ বাড়ি ছেড়ে। কি যে করবে সে ভেবেই পাচ্ছে না।

সৈয়দ মারিয়াহ্ হামিদ 🕊

[ চলে এসেছি আপনাদের অলসবতী লেখিকা। গত ১০ দিন পরে আপনাদের কাছে এলাম। কেমন আছেন আপনারা? আমার প্রতি কি খুব বেশি অভিযোগ পুষে রেখেছেন? কোন মতে কি মাফ করা যায় না?

আপনারা প্রায় সকলেই জানেন আমার আব্বু স্ট্রোক করেছিল। আপাতত আল্লাহর রহমতে সুস্থ আছে। তবুও আগের মতো সম্পূর্ণ সুস্থ নয় তিনি। আমার গল্প না দেওয়ার এই একটাই কারণ। কেননা আমার কাছে আমার আব্বু’ই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ। তার অসুস্থতায় তাকে ছেড়ে গল্পে কিভাবে মনযোগ দিই বলেন?

আপনাদের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। কেননা গত ১০দিনে একটা পর্বও আপনাদের দিতে পারি নাই। আমি অত্যন্ত দুঃখিত। দয়া করে আমার ওপরে আপনারা আর অভিমান কইরেন না।

ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা আছে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। রিচেক দিই নি‚ ভুল থাকতে পারে ধরিয়ে দিবেন। পর্বটি কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন কিন্তু। ভালো থাকবেন‚ সুস্থ থাকবেন‚ ধন্যবাদ।

বি:দ্র: এই পর্ব 1k রিয়েক্ট আর ৫০০+ কমেন্ট না আসলে পরবর্তী পর্ব আসতে দেরি হবে। কেননা ১৮ নং পর্বে ১০ দিনে 1k রিয়েক্ট এসেছে। আপনারা চাইলেই এই পর্বে 1k রিয়েক্ট আর ৫০০+ কমেন্ট করতে পারবেন। যত তাড়াতাড়ি রিয়েক্ট কমেন্ট করবেন তত তাড়াতাড়ি পর্ব পাবেন ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here