#প্রণয়ের_রূপকথা (১২)
দীপ্রকে দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেয়ার বিষয়টি, সবাইকে ডেকে নিয়ে খোলসা করে দেওয়া হলো। এতে বিরোধ দেখালেন দবীর দেওয়ান।
“এ কেমন কথা মা? দীপ্রর তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না।”
“কিন্তু কুহুর সমস্যা হচ্ছে।”
দবীর তাকালেন কুহুর দিকে। ওর মাথাটা নামিয়ে রাখা। তিনি এগিয়ে এলেন ভাতিজির দিকে।
“দীপ্রর দেয়াতে সমস্যা, তবে আমি দায়িত্ব নিচ্ছি। এতে নিশ্চয়ই সমস্যা নেই?”
এখানেও কুহুর সমস্যা আছে। তবে সেটা বলতে গেলে বিষয়টা খানিকটা দৃষ্টিতে লাগে। ও উসখুস করছিল। তখনই মা বললেন,”সমস্যা আছে ভাইজান।”
দবীর তাকালেন ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর দিকে। ববিতা শুকনো ঢোক গিলে বললেন,”বেয়াদবি মাফ করবেন ভাইজান। কিন্তু আমি চাচ্ছি না আমাদের দায়িত্ব কারে হাতে যাক।”
“শুধুমাত্র বিয়েটা ভাঙার জন্য এ সিদ্ধান্ত নিলে তুমি?”
“ধরে নিন তেমনটাই। তবে একটা বিষয়ে আমার ভুল হয়েছে। কুহুর বাবা চলে যাওয়ার পর আমি এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে, অনেক কিছুই বুঝতে পারিনি। তাই আপনার দেয়া প্রস্তাবে হ্যাঁ করে দিই। ভেবেছিলাম এতে করে পরিবারে আবার বন্ধন আসবে। আর আমরাও মাথার ওপর একটা ভরসার হাত পাব। কিন্তু আমার ভাবা উচিত ছিল এত বছর ধরে আমার স্বামী একা একা লড়াই করে গিয়েছেন। কেউ সঙ্গ দেয়নি। তিনি চলে যাওয়ার পর, সঙ্গ নেয়া তাকে অপমানের মতনই।”
ববিতা থামলেন। তার শরীর কাঁপছে। স্বামীর কথা বলতে গেলেই বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। দীপ্র এত সময় চুপ করে শুনছিল। এবার বলল,”চাচি, আমার ওপর রাগ করেছ। সেটা বুঝতে পারছি। তাই বলে এভাবে দূরে ঠেলে দিও না।”
“দূরে ঠেলে দিচ্ছি না দীপ্র। আর না রাগ ধরে আছি। আমার ভুল হয়েছিল। সেটা ভেঙেছে।”
দীপ্র তাকাল কুহুর দিকে। মেয়েটিও এদিকেই তাকানো ছিল। চোখাচোখি হওয়াতে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
সুযোগ বুঝে আনোয়ার বললেন,”ভাইজান, আমার মনে হয় এটাই ঠিক। দীপ্র বিয়েটা ভেঙেছে। এখন ওদের মাঝে একটু স্বাভাবিক দূরত্ব রাখাটাই ভালো। না হলে ব্যাপারটা কেমন যেন লাগবে। যদিও ওরা চাচাতো ভাই – বোন। তবু, এখন পরিস্থিতিটা বুঝেন। সব তো ঠিক আগের মতন নেই।”
বাবার কথায় আয়ানার ঠোঁটে হাসি এল। এত সময়ে বাবা কিছু ভালো তো বললেন। ও ঠোঁট টিপে হাসছিল। কণার নজরে সেটা আসল। ও ভ্রু কুঞ্চিত করে চাইল।
“আপু, দেখ আয়ানাপু কেমন করে হাসছে।”
কুহু তাকাল। দেখল আয়ানার মুখটা। মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে ভীষণ খুশি।
“তুই মানিস আর না মানিস। আয়ানাপু তোর বিয়েটা ভাঙায় খুব খুশি হয়েছে।”
“বাদ দে না।”
“কেন বাদ দেব? ও কেন হাসবে?”
“উফ কণা। চুপ কর একটু।”
কণার চুপ করতে ইচ্ছে করছে না। ওর ইচ্ছে করছে আয়ানার চুল গুলো মুঠোয় নিয়ে বলতে এত রং কেন ওঠেছে তোমার মনে? তবে সেটি পারছে না। আর পারছে না বিধায় খুব রাগ হচ্ছে। ও ঠোঁট কামড়ে বসে থাকে। দীপ্রর দাদি বলেন,”আমি কারো ওপর কিছু চাপাবো না আর। তোমরা সবাই যে যার মর্জির মালিক।”
“আম্মা, আমাকে মাফ করবেন।”
“মাফের কথা না ছোট বউ। তোমাদের সবার সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার আছে। আমার ছেলেটা নেই। ও থাকলে সব অন্যরকম হতে পারত।”
বলে দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ফেললেন তিনি। দবীর হতাশ কণ্ঠে বললেন,”আমরা একবার ভুল করেছি। সেই ভুলটার জন্য এতটা শাস্তি প্রাপ্য? সম্পর্ক জোড়া লাগার বদলে, নতুন করে ভেঙে চলেছে। আমি আর কি বলব। আমার ছেলেটা চরম অন্যায় করেছে। তাই আর বলার মতন মুখ নেই।”
দীপ্রর দিকে চেয়ে হতাশার কথা গুলো বললেন দবীর। দীপ্র শুনল। একদম মনোযোগ দিয়ে শুনল। কিছু বলল না। দাদিজান বললেন,”যাই হোক। সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাইলে, সবাই স্বাভাবিক ভাবে ফিরে আসো। দীপ্র, শোনো কথাটা আয়ানা,কণা,রাত্রি তোমার কাছে যেমন। কুহুও ঠিক তেমনই। বিয়ের বিষয়টা নিয়ে কেউ আর ভাববে না। সবাই মিলেমিশে থাকতে পারলেই ভালো।”
দীপ্র হ্যাঁ না কিছুই বলল না। চুপ করেই রইল। কুহু একটু তাকিয়েছিল। দীপ্র’র শক্ত হওয়া মুখটা দেখে ওর কেমন ভয় লাগল।
কণার থেকে ঘটনা জেনে রাত্রি হতাশ হয়ে পড়ল। সত্যি বলতে এই কাহিনী দেখতে তার ভালো লাগছে না। দীপ্র তার ভাই। কুহু তার বোন। দুজনই আপন। ভুল ঠিক বিচার করতে গেলে সব কেমন আরো জটিল হয়ে যাচ্ছে। কণা অভিমানের মতন করে বলল,”রাত্রিপু, তুমি আপুকে একটু বুঝাও তো।”
“এই তুই চুপ করবি?”
“কেন চুপ করব? তুই এত বোকা কেন আপু?”
“কেন রে। কুহু আবার কী করল?”
“করেনি। তবে বোকা খুব। আজকে যখন এই কথা গুলো হচ্ছিল তখন আয়ানাপু খুব করে হাসছিল।”
“হাসছিল কেন?”
“কে জানে। তবে মনে হচ্ছিল এমনটাই চায় সে। আমার ধারণা আয়ানাপুর নজর দীপ্র ভাইয়ের ওপর। এটা আমি মানতেই পারব না। ভাল্লাগেনা।”
বলে ঘর ছেড়ে চলে গেল কণা। কুহু ছোট করে নিশ্বাস ফেলে বলল,”ওর কথা ছাড়ো তো আপু। ও পাগল।”
“পাগল না। আমারও আয়ানাকে সন্দেহ হয়।”
কুহু কিছু বলে না। রাত্রি বলে,”কুহু, বোন আমার। পরিস্থিতি জটিল।”
“আমি এখানে কী করতে পারি রাত্রিপু? আমি যাই করি তাতেই খারাপ হচ্ছে। আসলে বাবা চলে যাওয়ার পর আমার সব কিছুই শেষ।”
রাত্রি কি বলবে বুঝতে পারে না। চেয়ে থাকে হতাশ হয়ে। এরই মধ্যে দরজায় নক পড়ে। রাত্রি পেছন ঘুরে চায়। দীপ্র দাঁড়িয়ে।
“রাত্রি, একটু বাইরে যা তো।”
দীপ্রর কণ্ঠখানা শুনে কুহু নড়েচড়ে ওঠে। রাত্রি শব্দহীন ভাবে ঘর ত্যাগ করতেই দীপ্র ঘরে প্রবেশ করে। কুহু বিছানা ছেড়ে ওঠে দাঁড়ায়। মাথাটা সামান্য নতই রাখে।
“কুহু।”
শীতল একটা কণ্ঠ। দীপ্রর গলাটা ধরে এসেছে যেন। কুহুর গলাটাও তরলহীন মনে হচ্ছে।
“আমার প্রতি এত ঘৃণা তোর?”
কুহু কী বলবে বুঝল না। ওর কেমন অস্বস্তি হতে লাগল। দীপ্র এবার কণ্ঠের স্বর কঠোর করল।
“সবার কাছে আমাকে ছোট করে ফেললি। অথচ চাইলেই সবটা ঠিক হতে পারত। পারত না?”
কুহুর ভেতর থেকে কথা আসে না। ও মাথা নত রেখেই বলে,”আমি কী করতে পারি এখানে?”
“তুই কিছুই করতে পারিস না। আবার অনেক কিছুই করতে পারতি।”
“আমি, আমি আসলেই বুঝতে পারছি না। সবাই কেন আমাকেই বলে।”
দীপ্র একটু তাচ্ছিল্যর মতন হাসে। এই হাসিটা কুহুকে অসহ্য বেদনা দিয়ে যায়। ও ঠোঁট কামড়ে সেটা সয়ে নেয়।
“ছোট বেলায় তুই আমার খুব আদরের ছিলি। এটা সবাই জানত, অন্যদের থেকে তোকে বেশি স্নেহ করি। অথচ সময় আজ কোথায় দাঁড় করাল। তবে একটা কথা বলি, যা হচ্ছে ভালো হচ্ছে না। এর দায় শুধু আমার একা না কুহু। আমার একার না।”
বলেই ঘর থেকে চলে যায় দীপ্র। কুহু তাকায় সে পথে। ওর শরীর কাঁপে। মৃদু একটা ভয় শরীরকে শীতল করে দেয়। চোখ দুটোয় নোনা জল এসে আটকায়। সব দায় তার। হ্যাঁ, সব দায় তার। শুধুই তার।
| আমার পরীক্ষা চলে। ভয়ানক ব্যাপার স্যাপার। দোয়ায় রাখবেন সবাই। |
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি
(১৩)
https://www.facebook.com/100076527090739/posts/758007933426770/?app=fbl

