#প্রণয়ের_রূপকথা (১৪)
সবটা শোনার পর কুহু আসলে বলার মতন কিছু পেল না। এখানে সে কী বলবে? কীই বা বলার আছে তার। ও এমন ভাবে চেয়ে রইল যে কণা বিরক্ত হয়ে পড়ল।
“তুই সব সময় এমন করিস আপু। এত উদাস কেন দীপ্র ভাইয়ের বিষয়ে? আয়ানাপু ঠিকই মাঝ থেকে দীপ্র ভাইকে নিয়ে পালাবে।”
“বাচ্চাদের মতন কথা বলছিস কণা! ওনার বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য থাকার কথা না।”
“একশবার থাকার কথা। তোদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।”
“কথা ছিল। হয়নি তো। আর না আমি রাজি ছিলাম। আর শেষ সময়ে ওনিও রাজি ছিলেন না। সবটা কাটাকাটি। এখন তুই যা তো। আমার মাথা ধরে গেল।”
বলে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল কুহু। কেমন যেন লাগছে তার। সময় যেন চলছেই না। সব এমন থমকে আছে কেন?
কুহুর ঘুম ভাঙল সেই সন্ধ্যায়। তাও একটা ফোন কলে। ও ঘুমুঘুমু ভাবেই কলটি রিসিভ করল। ওপাশ থেকে চ্যাঁচিয়ে বলা হলো,”তুই কি এই দেশে আছিস? নাকি অন্য কোথাও চলে টলে গিয়েছিস। কোনো খোঁজই নেই!”
মানুষটার কণ্ঠ কুহুর পরিচিত। ওর বান্ধবী লাবিবা। মেয়েটির সাথে বরাবরই তার সু সম্পর্ক।
“বেঁচে আছিস তুই?”
“আছি।”
“মনে তো হচ্ছে কথাই বলতে চাচ্ছিস না! তোর কী হলো? কবে আসবি ভার্সিটি?”
বিয়ের ঘটনার পর কুহুর আর যাওয়া হয়নি কোথাও। ওর ভেতর কেমন একটা উদাসীনতা কাজ করে।
“এই কুহু। কী হয়েছে? সোশ্যাল মিডিয়ায় নেই কেন?”
“ভালো লাগে না। তাই ডিএকটিভ।”
ওপাশ থেকে লাবিবা দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ফেলল। কুহু বলল,”দ্রুতই যাব।”
“সায়ের বার বার তোর কথা জানতে চাচ্ছে। ও খুব চিন্তিত।”
“অহ।”
“কথা বলিস পারলে। বার বার তোর কথা জানতে চায়।”
“তোকে বলেছিলাম বিষয়টা ও যেন না জানে। তুই যে কি করলি লাবিবা।”
“আমি কি করতাম দোস্ত? আমার একার পক্ষে কিছু সম্ভব হতো?”
কুহু ছোট করে নিশ্বাস ফেলল। বলল,”যাক, যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। ব্যাপারটা অত দূর গড়াতে হয়নি। আমি দ্রুতই ফিরব। এদিকটা একটু ঠিক হোক।”
“ঠিক আছে দোস্ত। তুই দ্রুত আয়। একা একা ভালো লাগে না আমার। রাখছি এখন।”
বলে কল কাটল লাবিবা। কুহু শোয়া থেকে ওঠে বসল। বুকের ভেতর ছোট একটা ভয় কাজ করে সারাক্ষণ। ইচ্ছে হয়,সব ছেড়ে ছুড়ে কোথাও একটা পালিয়ে যেতে। কিন্তু সে উপায়টি কি আছে?
কণার মন খারাপ। সে বসে আছে একা একা। রাত্রি বাসায় নেই। তাই আলোচনাও করতে পারছে না। ওর খুব করে কুহুপুর নামে নালিশ করতে ইচ্ছে হয়। কুহুপুর উচিত দীপ্র ভাইকে নিজের দিকে টানা। কিন্তু সে সেটা করছে না। কণার ছোট মন এমনই সব ভাবনায় মগ্ন। ও শুধু চায় দীপ্র ভাই যেন কুহুপুরই হয়। তাই তো আয়ানাকে ওর সহ্য হয় না। আয়ানা এসেছিল টিভি দেখবে বলে। সেটা বুঝতে পেরে কণা চট করেই রিমোর্ট নিয়ে বসল। টিভি অন করতেই আয়ানা বলল,”রিমোর্টটা দে তো কণা।”
“কেন? আমি তো দেখছি আয়ানাপু।”
“এত সময় তো দেখছিলি না। দে আমাকে।”
“আমি এখন দেখব। তুমি পরে দেখো।”
বলে গুমোট ধরে বসে রইল কণা। নির্দিষ্ট চ্যানেলে কার্টুন ছেড়ে বসতেই ওর পাশে এসে বসল কুঞ্জ। ছেলেটা একদম গদগদ হয়ে বলল,”কণাপু বেস্ট। এটা আমার সবথেকে ফেবারিট চ্যানেল।”
কুঞ্জর সাপোর্ট পেয়ে কণার ভেতরে অদ্ভুত একটা শান্তি এল। আয়ানা দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে চেয়ে ছিল। ও স্পষ্ট দেখেছে কণা এত সময় টিভি দেখছিল না। ও আসতেই রিমোর্ট খানা নিজের কোলে নিয়ে বসে যায়। ও একটু মেজাজি। তাই মেজাজ রাখতে ব্যর্থ হলো। কণার সামনে এসে দাঁড়াল।
“কী? সামনে এসে দাঁড়ালে কেন? আমি তো দেখতে পারছি না।”
“রিমোর্ট দে কণা। আমি আধা ঘন্টা দেখব। তারপর দেখিস।”
“আমি তো দেখা শুরু করেছি আয়ানাপু। তুমি এভাবে সামনে এসে ঝামেলা কেন করছো?”
“তুই এত সময় দেখছিলি না। আমি আসায় রিমোর্ট নিয়ে বসে গেছিস।”
“আজব তো!”
“রিমোর্ট দে। ইচ্ছে করে এমন করেছিস তুই।”
“দেব না। করলে বেশ করেছি। তোমার আগে রিমোর্ট ধরেছি।”
পরপর তর্কে আয়ানা মেজাজ হারাল। ও কণার হাত থেকে রিমোর্ট কেড়ে নিতে চাইল। কুঞ্জ হাবুলের মতন চেয়ে রইল। এদিকে দুজনের মাঝে রিমোর্ট নিয়ে কাড়াকাড়ি চলছে। সেই সাথে আছে বাক যুদ্ধও। সব মিলিয়ে পুরো বাড়িতে হৈচৈ পড়ে গেল। সবার আগে ছুটে এলেন জেবা। তিনি কাছাকাছিই ছিলেন।
“এই,কী করছিস তোরা! দুজনে এভাবে ঝগড়া কেন করছিস?”
“আমি আগে রিমোর্ট ধরেছি বড়ো মা।”
“এতসময় টিভি দেখেনি। আমি আসায় ইচ্ছে করে রিমোর্ট নিয়ে বসে গিয়েছে। শয় তা নি শুরু করেছে।”
“করলে বেশ করেছি। তোমার মতন তো হাত থেকে কেড়ে নিচ্ছি না।”
“ভালোই ভালোয় দিয়ে দে কণা। তুই খুব বেশি বেশি করিস।”
“তুমি কি দুধে ধোঁয়া তুলসি পাতা নাকি?”
বলেই রিমোর্টে জোরে টান দেয় কণা। আয়ানা ব্যালেন্স হারিয়ে পড়ে যায় মেঝেতে। ঠিক তখনই হাজির হোন আবিদা। তিনি ছুটে আসেন।
“একি কান্ড! কণা তুই আয়ানাকে ফেলে দিলি!”
বলে মেয়েকে ধরে ওঠান তিনি। আয়ানা ব্যথা পেয়েছে। ও কেঁদে ফেলে। কণা বলে,”আয়ানাপুই রিমোর্ট ধরে টানাটানি শুরু করেছে। আমার এখানে দোষ কোথায়?”
আবিদা এবার কিছুটা ক্ষেপে যান। তিনি ধমকে বলেন,”তাই বলে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবি? আর বড়ো বোনের সাথে কেউ এমন করে? শুরুর দিন থেকেই দেখছি, বড়ো বেয়াদব হয়েছিস তুই। কোনো দিকে ঠিক নেই। শিক্ষা দিক্ষা একদমই পাসনি। দিনকে দিন বেয়াদবি বেড়েই চলেছে।”
আবিদা এমন ভাবে বললেন যে কণার চোখ দুটো লাল হয়ে গেল। ও ঠোঁট কামড়ে চেয়েও পারল না নিজেকে আটকাতে। ওর চোখ থেকে অশ্রু নেমে এল। জেবা এবার বললেন,”আহ আবিদা, দোষ দুজনেরই। বাচ্চাদের মতন আচরণ। টিভির রিমোর্ট নিয়ে এসব করার মানে হয়!”
“আপা, কণা সবসময় এমন করে। আয়ানা এর আগেও বলেছে আমায়। আমিই কিছু মনে রাখিনি। ও একেবারেই দেখতে পারে না।”
কণার গাল বেয়ে টপটপ করে জল নেমে যাচ্ছে। ও আর দাঁড়াতে পারে না। রিমোর্ট খানা সোফায় ফেলে ছুটে চলে যায় অন্য পথে। আবিদা বিড়বিড় করে বলেন,”বেয়াদব মেয়ে। খুব ব্যথা পেয়েছিস? তোর বাবাকে কল করি। ঔষধ নিয়ে আসুক। যা তা একদম।”
আয়ানা কিছুটা মেজাজ নিয়ে বলে,”লাগবে না ঔষধ। ওদের আরো মাথায় তুলো তোমরা। তোমাদের আদরের তারা। আমার বিষয়ে ভাবতে হবে না।”
বলেই পা বাড়ায় ও। আবিদা বুঝতে পারেন কণার ওপর রাগের কারণ থাকলেও, মেয়ে তেজটা কুহুর ওপরও দেখাচ্ছে।
কুঞ্জর থেকে সবটা শুনে কুহু এল কণার কাছে। কিন্তু কণা দরজা বন্ধ করে বসে আছে। মা বাসায় নেই। কুহু কি করবে বুঝতে পারছে না। কণা ভেতর থেকে কাঁদতে কাঁদতে বলে,”তোরা সবাই যা আপু। যা তোরা। আমিই খারাপ। আমার বাবা নেই। তাই আমিই খারাপ।”
কুঞ্জ চেয়ে আছে। ওর খারাপ লাগছে। কি থেকে কি হয়ে গেল। কিছু সময় পর জেবাকেও আসতে দেখা গেল।
“দরজা দিয়ে বসেছে?”
“হু।”
ছোট করে জবাব দিল কুহু। তারপর সামনে থেকে সরে গেল। জেবা দরজায় ঠকঠক করলেন।
“কণা, দরজা খোল তো মা। রাগ করেছিস? আরে নিজেদের মানুষদের কথায় রাগ করে কেউ? বোকা, দরজা খোল।”
“আমি খারাপ বড়ো মা, আমি বেয়াদব।”
“আহারে মা আমার, এভাবে বলতে নেই। খোল মা।”
“একা থাকব। তোমরা সবাই যাও।”
বলে কাঁদতে লাগল কণা। হ্যাঁ তার রাগ আছে। কিছুটা দোষ আছে। তবে সেরকম দোষ তো আয়ানাপুর ও আছে। চাচি তাকে ওভাবে না বললেও পারত। কণার ছোট হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। ওর এখন মনে হচ্ছে, বাবা থাকলে ঘটনা ভিন্ন হতো। বাবা থাকলে চাচি ওভাবে কথা শোনাতে পারত না। ইনফ্যাক্ট বাবা থাকলে এই মানুষ গুলো এখানে এসেও ওঠত না। সব তখন সুন্দর হতো। আগের মতন। কিন্তু এখন, এখন সবটা শেষ। তাদের সাথে আর কিছুই ভালো হবে না। বাবা না থাকলে এমনই হয়। যে যার মতন, বকা দিতে পারে।
কুহু অনেকবার বলেও লাভ করতে পারল না। ও আসলে কী বলবে? চাচির সাথে গিয়ে তর্ক করবে? সেটা তো তার দ্বারা সম্ভব না। ওর হাত পা বাঁধা। মা থাকলে ভালো হতো। সেও এখন নেই। ও একটু পর পর এসে নক করে যাচ্ছিল। কিন্তু কণার কোনো খবর নেই। এমনভাবে আবার এসেছিল নক করতে। ঠকঠক করে ডাকার সময় দীপ্রকে আসতে দেখা গেল। সে বাহিরে ছিল। কুহু একটু মৌন হয়ে গিয়েছিল। পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল দীপ্রও। কিন্তু আবার ফিরে এল। কুহু তখনো চুপ।
“কিছু হয়েছে?”
শুধাল দীপ্র। কুহু স্বাভাবিক ভাবেই বলল,”না।”
দীপ্র জবাব দিল না। চেয়ে রইল এক পলক। কুহুর মন চাচ্ছে ছুটে চলে যেতে। দীপ্র একটু সন্দেহ নিয়ে বলল,”কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
“মিথ্যে বলছিস। বোঝা যাচ্ছে।”
বলেই কণার দরজায় ঠকঠক করল দীপ্র। কণা এবার চ্যাঁচিয়ে বলল,”যা না আপু। আমার ভালো লাগছে না। তোদের কাউকে লাগবে না আমার। আমি বেয়াদব। জানিসই তো।”
দীপ্র ভ্রু কুঞ্চিত করে চাইল। কুহু এবার একটু অস্বস্তিতে পড়ল। দীপ্র কণ্ঠটা শক্ত করে বলল,”কণাকে, বেয়াদব বলেছে কে?”
কুহু জবাব দিতে চাচ্ছিল না। তবে এভাবে চুপ করে থাকাও যায় না। ও ছোট করে বলল,”মেজো চাচি।”
দীপ্রর কপালের ভাঁজ আরো গভীর হলো। ও দরজায় আওয়াজ করল। কণা জবাব দেবার আগেই দীপ্র বলল,”দরজা খোল কণা। আমি এসেছি।”
কণা আসলেই দীপ্র’র পাগল। দীপ্রকে তার ভীষণ ভালো লাগে। তাই তো এক বলাতেই কেমন দরজা খুলে ফেলল। এতে কুহুর চোয়াল শক্ত হলো। ঠোঁট কামড়ে চাইল ও।
কান্নাকাটি করে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে কণা। দীপ্র ওর কক্ষে প্রবেশ করল। কণার তখন হিঁচকি ওঠেছে। ও জানে না আসলে, এই মানুষটাকে এত কেন ভরসা করতে ইচ্ছে করে। কণার মাথায় আলতো করে হাতটা রাখতেই একদম শব্দ করে কেঁদে ফেলল ও। কুহু দাঁড়িয়েই রইল। চেয়ে রইল বিহ্বলের মতন। সে দশ বারের বেশি ডেকে গিয়েছে। অথচ কোনো লাভই করতে পারেনি। এদিকে দীপ্র একবার বলাতেই কণা দরজা খুলে বসেছে! একেই হয়তো বলে, লাভ রেখে সুদের প্রতি মানুষের মায়া বেশি।
| এখন থেকে চাপে না পড়লে, একদিন পর পর গল্প পাবেন ইনশাআল্লাহ। না দিলে, আমাকে এসে বকা দিয়ে যাবেন। চরম অলসতায় ধরেছে। আপনাদের স্নেহ ও শাসন চাই। তাহলে খুব সুন্দর ভাবে আগাতে পারব। সবাই দোয়ায় রাখবেন।
ও হ্যাঁ, পরীক্ষা আপাতত শেষ। কিন্তু একদমই ভালো হয়নি। এই সেমিস্টারটা খুব খারাপ গেল। আগামীর জন্য দোয়া করবেন। |
চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি
(১৫)
https://www.facebook.com/100076527090739/posts/763304639563766/?app=fbl

