প্রণয়ের_রূপকথা (৩১)

0
49

#প্রণয়ের_রূপকথা (৩১)

একটা ছোট বিষয় কুহুকে তাড়া করে বেড়াল। দীপ্র ভাই এভাবে পাটকেল মা রবে তা ও যদি বুঝত। তবে ভুলেও ম্যাসেজটি করত না। ও ঠোঁট কামড়ে রাতের খাবার তৈরিতে মা-চাচিদের সাহায্য করছে। তবে ওর মুখের ভঙ্গিমা খেয়াল করেছেন জেবা। তিনি খুন্তি নাড়তে নাড়তে বললেন,”কী রে কুহু। মুখটা ওমন করেছিস কেন?”

ববিতা আর আবিদা নজর ফেরালেন। কুহু মুখটা ঠিক করে বলল,”এমনি বড়ো মা।”

“মনে হচ্ছে, কাকে যেন গালিগালাজ করছিস।”

মনে মনে কুহু বলল, হুম করছিই তো। কিন্তু মুখে বলল,”আমি তো গালি দেই না।”

“তাই নাকি রে?”

কোথা থেকে ছুটে এসে বলল আয়ানা। এই হলো আরেক বিপদ। কুহু চোখের দৃষ্টি সরু রাখল।

“গালি দিতে শুনেছ আয়ানাপু?”

“খোঁজ রাখিনি। তবে এখন থেকে রাখব। দেখব গালি দিস কি না।”

“হুম রেখো।”

যদিও দুজনের কথার টোন স্বাভাবিক। তবে আবিদা দ্বন্দ্বটি বুঝতে পেরেছেন। তিনি বললেন,”খাবার রেডি হয়ে গেছে। দুজনে গিয়ে সবাইকে ডেকো আনো।”

কুহু যেই না পা বাড়াতে যাচ্ছিল ওমনি আয়ানা বলে ওঠল,”আমি দীপ্র দাদা ভাইকে ডাকতে গেলাম।”

ওর ওমন তাড়াহুড়ো, আগ্রহ রান্না ঘরে থাকা সবাইকেই ভাবিয়ে তুলল। ববিতা আর জেবা একে অপরের মুখের দিকে চেয়েছেন। আবিদা দুই জা কে চোরা চোখে দেখে বললেন,”দীপ্র’র পাগল। ছোট বেলায় কুহু যেমন করত। এখন আয়ানা তেমন করে।”

কথা কাটালেন তিনি। তবে কথা কি কাটল? না। বিষয়টা বাকি দুই নারীকেই ভাবিয়ে তুলল। কিছু সময় পর সকলে খাবার খেতে চলে এল। আজ এসেছেন দাদিজান ও। তাকে নিয়ে এসেছে দীপ্র। এর পেছনে বিশেষ কারণ আছে অবশ্য। সবাই যখন খাওয়া শুরু করবে ঠিক তখনই দীপ্র বলল,”আমি একটা কথা ভেবেছি।”

মোটামুটি সবাই চাইল দীপ্রর দিকে। দীপ্র তাকাল কুহুর দিকে। কুহু চোখের ইশারায় বোঝাল বলে দেন। ওদের এই ইশারা আয়ানা দেখল। দাঁত কিড়মিড় করে তাকাল ও। কুহু যখন দৃষ্টি ফেরাল, তখন ওর সাথে চোখাচোখি হলো। তবে পাত্তা দিল না ও। দীপ্র সবাইকে একবার দেখে নিয়ে তাকাল রাত্রির দিকে। রাত্রি বিষয়টি তখনো ধরতে পারে নি। চেয়ে আছে প্রশ্ন নিয়ে।

“রাত্রির জন্য ছেলে দেখা দরকার। আবিরের বিয়ের পর পর কিংবা আগে ভাগে পেয়ে গেলে যদি এক সঙ্গেই দুজনের বিয়েটা দিয়ে দেয়া যায়।”

বিস্ফোরণ নিয়ে তাকাল রাত্রি। দীপ্র ভাই এটা কী বলতে চাচ্ছে? সবাই কেমন চুপ। ওর কথাকে জোরাল করতে মুখ খুলল কুহু।

“হলে তো ভালো হয় খুব। রাত্রিপুর বিয়ে নিয়ে আমি আর কণা প্ল্যান করতাম আগে।”

“এমনটা হলে আসলেই দারুণ হবে। এক ঢিলে দুই পাখি। ফুপার কিন্তু খরচ ও কমে যাবে।”

কণার শেষ কথায় রমিজ হাসলেন। ববিতা ছোট কণ্যাকে শাসন করতে বললেন,”কণা, এটা কেমন কথা?”

“আমি তো এমনি বললাম মা।”

“ভাবি, ওকে বকা দেবেন না। ও ছোট মানুষ। মজা করে বলেছে। তাছাড়া বিষয়টা কিন্তু ভালো। জানেন তো আমি একটু কৃপণ টাইপের।”

“যদি এক সাথেই আয়োজন করতে চাও। তবে আমি কিন্তু আমার বিয়ের জন্য একটুও খরচ করব না। সবটা তোমার দিতে হবে। কৃপণ গিরি কমাও বাবা।”

ছেলের কথায় রমিজ হাসলেন। বললেন,”সে দেখা যাবে। আমাদের যা কিছু আছে সব তো তোমাদের দু ভাই-বোনের ই।”

রমিজের কথাটা শুনে কুহুর একটু মন খারাপ হলো। মনে পড়ল বাবাকে। বাবা থাকলে তিনিও হয়তো এভাবেই বলতেন। আমাদের যা কিছু আছে। তা তো তোমাদের দু বোনেরই।

“আমি কিছু বলতে চাই। শোনো সবাই।”

বৃদ্ধার কথায় সবাই থামল। দৃষ্টি ফেরাল।

“বিয়ে হলো আলাদা রহমতের বিষয়। রাত্রির বয়স তো হয়েছেই। তাই ওর বিষয়ে ভাবা দরকার। আর দুই ভাই-বোনের এক সাথে হয়ে গেলে, আমাদের দুঃখ কিন্তু কমই হবে। এক মেয়ে বিদায় নিয়ে, আরেক মেয়েকে তো ঘরে আনা হবে। এটা হলে বেশ ভালো হয়। তোমরা খোঁজ করো।”

এত সময় পর রাত্রি মুখ খুলল। বলল,”বাহ, ভালোই তো নানিজান। আমাকে বিদায় করার জন্য খুব তাড়া দেখাচ্ছ।”

“দেখো মেয়ের কাহিনী। মেয়ে মানুষ কি সারাজীবন বাপের ঘরে থাকে? থাকে তো না।”

“কেন দাদিজান? দীপ্র দাদাভাই আর কুহুপুর বিয়ে হলে তো কুহুপু সবসময় এখানেই থাকত।”

ফট করেই সবার মাঝ খানে কথাটা বলে ফেলল কুঞ্জ। এই এক কথায় সবার মুখের রং বদলে গেল। আবিদা ধমকে ওঠলেন।

“কুঞ্জ! একটা কথাও না। বড়োদের মাঝে কথা বলছো কেন? বেয়াদব হয়ে গেছ তুমি।”

আয়ানার মাথায় তো আকাশ ভেঙে পড়ার মতন অবস্থা। ওর ইচ্ছে করছে ছোট ভাইকে চড় বসিয়ে দিতে। নেহাতই এখানে মেহমান তথা অরণ্য বসে আছে। না হলে এমনটি ঠিকই করে ফেলত ও। ওর মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, এই ছেলে আদৌ ওর ভাই তো। ওর দৃষ্টির আগুন নিভল না। চেয়ে রইল অগ্নি দৃষ্টি নিয়েই। ভেতরে ভেতরে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। এদিকে দীপ্র স্বাভাবিক। তবে কুহু কেমন অস্বস্তিতে পড়েছে। কারণ সকলে না জানলেও, সে তো জানে, অন্যায়টা তার নিজেরই হয়েছে।

কুহুর খুব খারাপ লাগছে। ওর খাওয়া হয়নি ঠিক মতন। ও অপেক্ষা করছে দীপ্র ভাইয়ের জন্য। মানুষটার প্রতি সকলের একটা কেমন দৃষ্টি পড়েছিল আজ। সবাই তো তাকেই দোষারোপ করেছে। অবশ্য সবার দোষ নেই। যা ঘটেছে তাতে দীপ্রর দোষটাই দৃশ্যমান। আর কুহুর সবটাই লুকিয়ে। এই লুকিয়ে থাকার কারণেই কুহু নিজের ভুল গুলো শুরুতে বুঝতে পারেনি। আজকাল মনে হচ্ছে সব ওর নিজের জন্য হয়েছে। ও চাইলেই ঘটনা অন্য রকম হতে পারত। আপসোস লাগছে। খাবারের সময় নিশ্চয়ই দীপ্রর অস্বস্তি হয়েছে। যদিও সে নিজেকে স্বাভাবিক দেখিয়েছে। এসবই ভাবছিল ও। এদিকে মেয়েটিকে ঘরের সামনে দেখে দীপ্র ডাকল।

“কুহু।”

চাইল কুহু। পুরো দৃষ্টি দিয়ে। দীপ্রর চোয়াল ভরা চাপ দাড়ি। পেটানো শরীর। চোখে মুখে মাঝে মাঝে বেশ কঠিন ভাব থাকলেও বেশির ভাগ সময়ই দৃষ্টি থাকে শীতল।

“কীরে?”

ধ্যান ফিরে ওর। ও চায়। বলে,”হুম।”

“কিছু বলবি?”

“হ্যাঁ।”

“আচ্ছা,ভেতরে এসে বল।”

বলে রুমে প্রবেশ করল দীপ্র। ওর পেছন পেছন রুমে প্রবেশ করল কুহু ও। এই রুমটায় আলাদা একটা ঘ্রাণ পাওয়া যায়। দীপ্রর শরীরের ঘ্রাণ। প্রতিটা মানুষেরই আলাদা একটা ঘ্রাণ আছে। ছোট বেলায় দীপ্রর শরীরের ঘ্রাণ কুহুর খুব পছন্দ ছিল। না দেখেই মানুষটার আগমন ধরতে পারত। কিন্তু আজকাল পারে না। আগের মতন টানে না। এই দূরত্ব, এই হারিয়ে যাওয়া দীর্ঘ দিনের তৈরি। ওর দৃষ্টি খানা নামানো।

“কী যেন বলবি।”

একটা অস্বস্তি, কুহুর গলা চেপে ধরল। ও শুকনো একটা ঢোক গিলে নিজেকে ঠিক করে নিল। বলল,”আপনি চাইলে বলে দিতে পারেন।”

যদিও দীপ্র বুঝেছে। তবু ও না বোঝার ভাণ করে বলল,”কী বলব?”

“এই যে, আমি পালাতে চেয়েছিলাম।”

“বলার হলে আগেই বলতে পারতাম।”

“আজকেও কথাটা ওঠল। আমার এখন খারাপ লাগছে। আমার জন্য দোষী হয়েছেন। ঋণ বেড়ে যাচ্ছে আমার।”

দীপ্র হাসল। বলল,”ঋণ বাড়া মাঝে মাঝে ভালো। দরকারের সময় শোধে সমেত ফেরত নেয়া যায়।”

ওর কথার মানে কুহু কী বুঝল? হয়তো না। বোঝার কথাও না। ও ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইল। খারাপ লাগাটা মুখশ্রীতে দৃশ্যমান। দীপ্র সেটা দূর করার প্রয়াস থেকে বলল,”খারাপ লাগার কিছু নেই। আমরা এখন সব ঠিক করে নিয়েছি না? আর পুরোটাই ঘটেছে ভাগ্যের জন্য। ভাগ্যে বিশ্বাস করিস তো?”

“হুম, করি।”

“তাহলে আর কিছু ভাবার নেই। এটা এখানেই শেষ। ঠিক আছে?”

“আচ্ছা।”

“তাহলে এই কথা আর আসবে?”

“আমার আসলে মনে হলো, একবার বলা দরকার। তাই বলতে এলাম।”

“আচ্ছা। কিন্তু আমি আবার ক্লিয়ার করছি,আমার কোনো খারাপ লাগা নেই। তোর ওপর রাগ ও নেই। শুরুতে না বুঝে আমি রাগ থেকে তোর সাথে কথা না বলেই ওমন একটা কাজ করে ফেলেছি। আমি কথা বললে ঘটনা কিন্তু ভিন্ন হতে পারব। যাই হোক, আমি এসব আর ধরছি না। যা হবার তা হয়ে গেছে। একে অন্যকে দোষ দিলে ঠিক হবে না কিছুই। এখন আমাদের লক্ষ্য রাত্রি আর অরণ্যর মিল ঘটানো। এখানে ফোকাস করি?”

টানা কথা গুলো বলে থামল দীপ্র। শুধু যে কুহুর মাঝে পরিবর্তন হয়েছে তা কিন্তু না। দীপ্র নিজেও তো পরিবর্তন হয়েছে। আগে, খানিক রাগ, ক্ষোভ থেকে সব কিছু করত। আর এখন সবটা বুঝিয়ে বলে। খুব সুন্দর ভাবে, পরিস্থিতি সামলে নেয়। আর এই দিকটায় কুহুকে স্বাভাবিক হতে সাহায্য করে চলেছে। কুহুর ভেতরে শীতল একটা বাতাস নেমে এল। ও ছোট করে বলল,”আচ্ছা। আমি চেষ্টা করব এসব আর না বলতে।”

“চেষ্টা কেন? একেবারেই বলবি না। পুরোটাই বাদ।”

“ঠিক আছে। বাদ, তাহলে যাই আমি।”

বলে পা বাড়াতে যাচ্ছিল কুহু। দীপ্র বাঁধা দিয়ে বলল,”শুনে যা।”

কুহুর আর আগানো হলো না। ও মাথা তুলে চাইল। দীপ্র ভাই ভীষণ লম্বা। সিনেমার হিরোদের মতনই লম্বা। এই পর্যায়ে মেয়েটার চোখের দৃষ্টি দীপ্রর দৃষ্টির সাথে মিলে গেল। দীপ্র চোখ দুটো স্থির রেখেই বলল‍,”কুহু, তুই কিন্তু এখনো আমার আদরেরই আছিস। সব থেকে আদরের।”

শুনেন আমার আইডি লক হয়ে গিয়েছে। এরপর কী হবে জানি না। তাই যদি গল্প মিস না করতে চান, তাহলে অবশ্যই পাঠকমহলে জয়েন করে নিন। আর আমার নতুন আইডিতে ফলো দিয়ে রাখুন।

আইডি :
https://www.facebook.com/profile.php?id=61580004394988

পাঠকমহল :
https://facebook.com/groups/2944711092471263/

চলবে…..
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here