#প্রণয়ের_রূপকথা (৩৭)
সবাই বাড়ি ফিরে এসেছে। কুহুর পায়ে ব্যান্ডেজ। ওকে ধরে ধরে নিয়ে আসছে দীপ্র। বসার ঘরে দাঁড়িয়ে আয়ানা এটা দেখে শুকনো ঢোক গিলল। রাগে ওর চোয়াল শক্ত হলো। তবে কিছু বলল না। কুহুকে সোফায় বসানো হলো। ববিতা একটু আগেই ফিরেছেন। মেয়ের পায়ের এমন অবস্থা দেখে তিনি হায় হায় করে উঠলেন।
“ক্ষত কতটা গভীর?”
ব্যস্ত গলায় শুধালেন তিনি। কুহুর বলতে হলো না। বলল দীপ্রই।
“অনেক বেশি না। তবে রক্ত গিয়েছে ভালো। জ্ঞান হারিয়েছিল।”
“মেয়েটা যে কী করে। দেখে চলিস না?”
“ওর দোষ নেই চাচী। এটা শুধুই দূর্ঘটনা।”
দীপ্র সুন্দর মতন বুঝিয়ে বলল পুরোটা। সবটা শুনল সবাই। কুহুর খোঁজ নিলেন আবিদাও। আয়ানা বিষয়টা ভালো চোখে দেখল না। তাই মায়ের সাথে একটা রাগ দেখিয়ে চলে গেল। মেয়ের পেছন পেছন চললেন আবিদাও। পুরো বিষয়টাই দীপ্র খেয়াল করেছে। ওর খেয়াল করার ক্ষমতা ভালো। ও একটু চিন্তিত এই বিষয়টি নিয়ে। আয়ানাকে সরাসরি বলা ঠিক হবে কি না সেটাও একটা ভাবনার বিষয়। এই মুহূর্তে ভালোই চাপের মধ্যে ও।
কুহু শুয়ে আছে। ওর পায়ের কাছে বসে আছে রাত্রি। কুহু মন খারাপ করে বলল,”তুমি আমার সাথে রাগ করেছ রাত্রিপু। দেখো সেই জন্য শাস্তিও পেলাম আমি।”
“এভাবে বলিস না কুহু। আমি কখনোই তোর ক্ষতি চাই না।”
“সেটা জানি। আমিই একটু ভুল ছিলাম। চাচ্ছিলাম তোমাদের সম্পর্কটা যদি ঠিক হয়।”
রাত্রি ফোঁস করে দম ফেলে। একটু দূরে বসা ছিল। আরেকটু কাছে আসে।
“কুহু, একটা বিষয় কি জানিস, ভাগ্যে না থাকলে কিছুই হয় না।”
কথাটা শুনে কুহু বোধহয় একটু কম্পিত হলো। সত্যিই ভাগ্যে না থাকলে কিছু সম্ভব না।
“অরণ্যকে আমি এখনো ভালোবাসি কুহু।”
“তবে, তবে কেন সব ঠিক করে নিচ্ছ না?”
“জানি না। আমার সব এলোমেলো লাগে। আমার ভয় হয়।”
“এখন তবে কী করবে?”
“বিয়ে করব।”
“অরণ্য ভাইয়াকে?”
“সেটা কি সম্ভব বল? সেটা সম্ভব না। বাসা থেকে ছেলে দেখা হচ্ছে। সেখান থেকেই বিয়ে করব।”
কুহু হতাশ হয়ে পড়ল। রাত্রিও চুপ রইল। খানিক বাদে রাত্রি বলল,”তুই নিজের দিক ভেবেছিস কুহু?”
কুহু না বুঝে বলল,”আমার আবার কীসের দিক?”
“তোর নিজের বিয়ে নিয়ে?”
কুহু একটু জড়োসড় হলো। ছোট করে বলল,”বিয়ে নিয়ে আমার কোনো ভাবনা নেই রাত্রিপু।”
“ভাবনা রাখিস রে কুহু। ভাবনা রাখিস। পরে আপসোস না হয়। দীপ্র ভাই কিন্তু….
ওর কথাটা পূরণ হলো না। তার আগেই খুশি মনে আগমন হলো আয়ানার। ওর এই খুশির হেতু কেউ খুঁজে পেল না।
“কুহু, কেমন আছিস এখন? পা ঠিক হলো?”
“পা কি এত সহজে ঠিক হবে আয়ানাপু? সময় তো লাগবেই।”
“কী বলিস রে। সময় লাগলে তো চলবে না।”
ওর এ কথায় রাত্রি আর কুহু একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। আয়ানা হেসে বলল,”বলা তো যায় না। রাত্রিপুর বিয়ের আগে আমার বিয়েটাই হয়ে যেতে পারে।”
এ কথায় ওরা দুজনেই হাবুলের মতন চেয়ে রইল। রাত্রি বলল,”তোর বিয়ে?”
আয়ানা একটু লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গি করল। বলল,”হাঁ, দীপ্র ভাইয়ের সাথে।”
রাত্রির মেজাজ গরম হলো। আয়ানার এই মিথ্যাচার,ঢং ওর সহ্য হচ্ছে না। ও ঠোঁট কামড়ে রইল। আয়ানাই বলল,”দ্রুত সুস্থ হ কুহু। আমার বিয়েতে খুব নাচতে হবে তোকে। আসি রাত্রিপু।”
বলেই বেরিয়ে গেল আয়ানা। রাত্রি বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। কটমট করে বলল,”ওর এই মিথ্যে গুলো একদম নিতে পারি না আমি।”
“সত্যিও তো হতে পারে রাত্রিপু।”
“তুই পাগল হয়েছিস? এটা কীভাবে সত্যি হবে?”
“কেন হবে না?”
“কারণ তুই কুহু।”
“আমি?”
“হ্যাঁ, তুই। বিয়ে হলে, তোর আর দীপ্র ভাইয়েরই হবে।”
“রাত্রিপু।”
“চুপ কর কুহু। কোনো কথা শুনতে চাই না। যা করেছিস, তা ভুল ছিল। যা হবে, তা হতে দে। পারলে সাহায্য কর। কিন্তু বাঁধা হোস না।”
কুহু মাথা নামিয়ে ফেলে। ওর কিছু বলার নেই। করারও নেই। সত্যিই ও জানে না সামনেটা নিয়ে। এখন যা হবে, তাই হতে দিবে ও।
দাদিজান গল্প বলছেন। আর সেই গল্প মন দিয়ে শুনে চলেছে কুঞ্জ। এক পর্যায়ে কুঞ্জ বলল,”দাদিজান, আপনি আর দাদাজান চাচাতো ভাই-বোন ছিলেন?”
বৃদ্ধা হাসলেন। বললেন,”হ্যাঁ, ভাই।”
“দারুণ তো। কুহুপু আর দীপ্র দাদাভাইয়ের বিয়ে হলেও আপনাদের মতন হোতো। তাই না?”
বৃদ্ধা এবার হতাশার নিশ্বাস ফেললেন। বললেন,”হ্যাঁ, সেটা হলেই তো ভালো হোতো। কিন্তু কি যে হলো।”
তার চোখে মুখে আপসোস ভেসে এল। সে সময়েই পাশে এসে বসলেন জেবা।
“আম্মা, চা দেব?”
“না বড়ো বউ। চা আর খাব না। তুমি বোসো।”
জেবা বসলেন। শীতল পাটির ওপর বসে দাদি-নাতি গল্প করছিলেন। জেবা বললেন,”কিছু ভাবছেন আম্মা?”
“হুম। তা তো ভাবছি।”
“কী?”
“দীপ্র আর কুহুকে নিয়ে।”
এ কথা উঠতেই জেবা নড়েচড়ে উঠলেন। গলার স্বরটা সামান্য নিচু করে বললেন,”আম্মা, দীপ্র একটা ভুল করে ফেলেছে। কিন্তু আমি ওর মা। ওর চোখ যে অন্য কথা বলে।”
“আমিও বুঝি বড়ো বউ। কিন্তু সমস্যা ধরতে পারি না।”
“ওদের একটু সময় দিলে হয়তো কিছু সম্ভব আম্মা। কুহুকে আমার পছন্দ।”
“এখন সবটাই সময়ের উপর বড়ো বউ। দেখি কি হয়।”
ওমন সময় আসরে যোগ দিতে এলেন আবিদা। কথা থেমে গেল। নারীটি বললেন,”কী নিয়ে কথা হচ্ছে আপা?”
“এমনি কথা বলছিলাম। সেরকম গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।”
তিনি স্পষ্টত বুঝলেন জেবা যে কথা লুকালেন। তবে এটা নিয়ে আর ঘাটলেন না। বরং হাসি মুখে অন্য কথায় ডুবলেন।
এতদিন আয়ানা চিন্তিত ছিল। এবার আবিদাই চিন্তিত হলেন। তিনি অনেক বিষয় দেখেও না দেখার ভান করে ছিলেন। এবার আর ভান ধরতে পারছেন না। স্বামী আসতেই তিনি কথা শুরু করলেন। বললেন,”মেয়েটার জন্য আমার ভয় হচ্ছে। কথা বলা দরকার। আমার ধারণা দ্রুতই দীপ্র আর কুহুর বিয়ে নিয়ে আবারো কথা উঠবে।”
“তোমরা এত ধৈর্যহীন হচ্ছ কেন? দীপ্র বিয়ে ভেঙেছিল। আবার কোন মুখে এ কথা উঠবে?”
“তুমি বুঝতে পারছো না। বাড়িতে তো থাকো না। আমি থাকি। আমি জানি। দীপ্র কুহুর মেলামেশা বেড়েছে। তাছাড়া বড়ো আপাও বোধহয় কিছু একটা চাচ্ছে। আয়ানা এমনি এমনি রাগ দেখায় না।”
“মানে?”
“আম্মার সাথে বিকেলে কথা বলছিল। আমি জিজ্ঞেস করায় এড়িয়ে গেল।”
আবিদার কথা গুলো এত সময় আমলে না নিলেও এবার নিতে বাধ্য হলেন আনোয়ার। বললেন,”চিন্তা কোরো না। আমি দ্রুতই একটা সমাধান করব। বড়ো ভাইয়ের সাথে ব্যবসাটা পোক্ত হলেই কথা তুলব। বড়ো ভাইকে আমাদের দিকটা বোঝাতে হবে। ভাবি অন্যদিকে সুর টানলেও, ভাইকে আমাদের দিকে রাখতে হবে।”
“রাখো, যা ইচ্ছে করো। তবে মেয়ের মন যেন না ভাঙে। না হলে, আমাদের অনেক বড়ো মূল্য দিতে হতে পারে।”
কুহুকে বাসায় আনার পর আর দেখা হয়নি দীপ্রর সাথে। গতকাল সন্ধ্যাতেই শেষ দেখা। এর পর মেয়েটি আর ঘর থেকে বের হয়নি। দীপ্রও সারাদিন বাহিরে ছিল। অরণ্যকে নিয়ে এখানে ওখানে ঘুরেছে। এখন ফিরে শাওয়ার নিতে নিতে কুহুকে দেখার কথা মনে হলো। রাতের খাবার খাওয়ার আগে মেয়েটির সাথে দেখা করা প্রয়োজন। ও দ্রুত জামা বদলে নিয়ে, এল কুহুর কক্ষে। কুহু তখন চোখ বন্ধ করে আছে। কিন্তু ঘুমায়নি। দীপ্র ভাবল ও বুঝি ঘুমিয়ে আছে। তাই নীরবে কক্ষে প্রবেশ করল। বসল পায়ের কাছে। হালকা হাতে পায়ের ক্ষত দেখতে যেতেই হুড়মুড় করে উঠল ও। দীপ্র ও বোধহয় চমকাল।
“দীপ্র ভাই।”
টান টান হয়ে বসে রইল দীপ্র। কুহু শোয়া থেকে উঠে বসল। উড়নাটা টেনে নিয়ে বলল,”আপনি, কখন এলেন?”
“মাত্রই। ঘুমাসনি?”
“না।”
“ভেবেছিলাম ঘুমিয়ে আছিস। পায়ের ব্যথা কমেছে?”
“কমেছে। তবে হাঁটতে পারছি না।”
“কদিন সময় লাগবে। তারপরই ঠিক হয়ে যাবে।”
“হুম।”
বলে একটু সময় নেয় কুহু। বলে,”একটা কথা বলব?”
“হ্যাঁ, বল।”
“রাত্রিপু এখনো অরণ্য ভাইয়াকে ভালোবাসে।”
“নিজে বলেছে?”
“হ্যাঁ। কিন্তু সম্পর্ক নিয়ে ভাবছে না।”
“ও দ্বিধায় আছে। অরণ্যও তাই। দেখা যাক কী হয়?”
“হুম।”
“আচ্ছা, তুই রেস্ট নে। দরকার হলে জানাস।”
কুহু ফট করেই বলল,”কীভাবে জানাব? ফেসবুক ছাড়া আর কিছু আপাতত চালাচ্ছি না।”
দীপ্র একটু থামল। তারপর ফোন বের করে বলল,”আমি রিকোয়েস্ট দিচ্ছি। অ্যাকসেপ্ট কর।”
চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি
(৩৮)
https://www.facebook.com/100076527090739/posts/819995857227977/?app=fbl

