#প্রণয়ের_রূপকথা (৬০)
ধীর পায়ে দীপ্রর ঘরে প্রবেশ করল কুহু। রাত্রিপুর বলে যাওয়া কথাতে, ভেতরটা কেমন করে চলেছে। ও শুকনো একটি ঢোক গিলল।
“এসেছিস?”
শুধাল দীপ্র। কুহু জবাব দিল না। ও দেখল দীপ্র নিজের শরীরে থাকা ব্লেজার খুলে রাখছে। এরপর শার্টটাও খুলে ফেলল। এটা দেখে কুহুর চোখ দুটো হলো বড়ো বড়ো। ও দ্রুত পেছন ঘুরে ফেলল।
“এদিকে আয়।”
দীপ্র ডাকল। তবে কুহু নড়ল না। চোখ দুটো তখনো বড়ো হয়ে আছে।
“কী রে। এদিকে আয়।”
ঘাড় ফিরিয়ে চাইল কুহু। উন্মুক্ত শরীরের দীপ্রকে দেখা মাত্রই কুহুর বুকের ভেতর কেমন ধীম ধীম করে ওঠল। ধীর পায়ে এগোল ও। শুকনো ঢোক গিলে বলল,”জি?”
কুহুর কণ্ঠ, ওর তাকানো, শ্বাসের গতি খেয়াল করল দীপ্র। কয়েক সেকেন্ডেই মেয়েটির অবস্থা বুঝে ঠোঁট কামড়ে হাসল।
“অত দূরে কেন? কাছে আয়।”
কাছে আয়? তবে দীপ্র ভাই চাইছেনটা কী? রাত্রিপুর কথাই কী ঠিক? ও শুকনো ঢোক গিলল।
“কী রে?”
“জি।”
“কাছে আসতে বললাম তো।”
“কাছে কেন?”
“কাছে কেন বুঝিস নি?”
এবার গলা শুকিয়ে এল মেয়েটির। দীপ্র নিজেই ওঠে এল। বলিষ্ঠ দেহের দীপ্রর বুক খানা দৃশ্য মান হলো কুহুর চোখ বরাবর। ও সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতেই দুষ্টু হাসল দীপ্র। কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,”এখনই লজ্জা পাচ্ছিস তুই। তবে….
ওর কথা পুরো হওয়ার আগেই খানিকটা দূরে সরে গেল কুহু। বলল,”লজ্জা কেন পাব?”
“পাচ্ছিস না?”
“না। একদমই না।”
আত্মবিশ্বাসের সুর। অথচ কুহু তো জানে, ওর বুকের ভেতর আত্মা আর বিশ্বাসের ছিটেফুটোও আর বেঁচে নেই। দীপ্র আবারো এগোল। দূরত্ব কমাল। গভীর ভাবে,’কুহু’ বলে ডাকতেই কুহুর ভেতরটা আনচান করে ওঠল। হেসে ফেলল দীপ্র।
“ঘাড় ব্যথা করছে। একটু মালিশ করে দিবি প্লিজ?”
কুহু বিস্মিত হয়ে চাইল। এই ব্যাপার নিয়ে এত ভণিতা কেন করতে হবে? কুহু দাঁতে দাঁত চেপে মালিশ নিয়ে এল। দীপ্র আরাম করে বসে বলল,”এখানে।”
কুহু মালিশ নিয়ে দীপ্রর ঘাড়ে স্পর্শ করতে গিয়ে বুঝল বুকের ভেতরটা কেমন করছে। দীপ্র হেসে বলল,”ভয় পেয়ে গিয়েছিলি?”
“ভয় কেন পাব?”
“এটা ভেবে, যদি কিছু করি।”
“মোটেও না। আমি ভয়টয় পাইনি।”
“হুম খুব বোঝা গেছে।”
“আপনি তো সবসময় বেশিই বুঝেন।”
বলে মালিশ নিয়ে পুরুষটির ঘাড়ে হাত ছোঁয়াল ও। কুহুর নরম হাত খানা দীপ্রর ঘাড়ে আসা মাত্রই দীপ্র বুঝল তার ভেতরটা অদ্ভুত ভাবে কাঁপছে। মনের ভেতর আন্দোলন শুরু হয়েছে। ও ফোঁস করে দম ফেলল।
“আর লাগবে না।”
“কেন? দিলামই তো না।”
“যতটুকু দিয়েছিস, তাতেই জান যাওয়ার মতন অবস্থা।”
কুহু কথার মানে বুঝল না। তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যাল করে। দীপ্র ওঠে গিয়ে ঘাড় নাড়াল। শার্টখানা গায়ে জড়াতে জড়াতে বলল,”বেশি সময় এখানে থাকিস না কুহু। মন আর মস্তিষ্কের দ্বন্ধ চলছে। মন জিতে গেলে প্রলয় নামতে পারে।”
ববিতা মাত্রই ফিরেছেন। তাকে দেখেই এগিয়ে এলেন জেবা। হেসে বললেন,”চা আনি?”
“আমি বানাচ্ছি আপা।”
“মাত্রই এসেছ, আবার যাবে? আমিই আনি। তুমি হাত মুখ ধুঁয়ে আসো। গল্প করব।”
ববিতা হেসে চলে গেলেন। জেবা গিয়ে চা বানালেন। সাথে নিলেন চানাচুর মাখা। ঘরে প্রবেশ করতে করতে জেবা বললেন,”ববিতা, হলো তোমার?”
“এই তো আপা।”
বলে বাথরুম থেকে এলেন তিনি। চা নামাতে সাহায্য করলেন ববিতা। মুখে বললেন,”কষ্ট করে ঘরে আনার দরকার ছিল না আপা। আমিই যেতাম।”
“ভাবলাম তোমার ঘরেই আসি। এখানেই গল্প হবে।”
“তাহলে ভালোই হয়েছে। ওমা চায়ের সাথে দেখি চানাচুর মাখাও আছে।”
“হ্যাঁ, তুমি তো পছন্দ করো।”
“এটাও মনে রেখেছ আপা?”
জেবা হাসলেন। ববিতার বাহু স্পর্শ করে বললেন,”এককালে একসাথে সংসার করেছি ববিতা। কত সুখ দুঃখ ভাগ করেছি। আলাপ করেছি। তারপর দীর্ঘ বিচ্ছেদ, মাঝে মাঝে আপসোস লাগে। একটা ভালো জীবনের আশায় সুন্দর সময়, মানুষজন হারিয়েছি।”
ববিতা চোখের দৃষ্টি নত রেখেছিলেন। এবার তা ওঠালেন। হালকা হাসি রেখে বললেন,”সময় আমাদের জন্য শিক্ষা আপা। তাছাড়া তোমরা তখন তোমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে ঠিক ছিলে। এত দৈনতা চলে এসেছিল। কষ্ট সহ্য করে থাকাটা মুশকিল ছিল।”
“তুমি তো সব সয়ে গিয়েছিলে ববিতা। তুমি তো পেরেছ।”
“আমার দুঃখ তো এখনো চলছে আপা।”
“তুমি সাহসী। সামলে ওঠতে পারবে।”
“তাই যেন হয় আপা। তাই যেন হয়। মেয়ে দুটোর সুন্দর সংসার দেখে আমি একটু শান্তির নিশ্বাস ফেলতে চাই।”
“পারবে। অবশ্যই পারবে তুমি। কণা তো এখনো ছোট। তবু কি ওর বিষয় নিয়ে কিছু ভাবতে চাইছো?”
ববিতা কিছু বলার পূর্বেই ঘরে প্রবেশ হলো কণার। পায়ের শব্দে তাকালো দুজনেই। জেবা হেসে বললেন,”কণা, এদিকে আয় মা।”
“জি বড়ো মা।”
মেয়েটির চোখ মুখ অন্ধকার। যেন ভীষণ কষ্টে আছে। জেবা বললেন,”ভালো আছিস মা? তোকে তো দেখিই না আজকাল।”
“পড়াশোনা নিয়ে ঘরেই থাকি বড়ো মা।”
“যাক তাহলে ভালো। মন দিয়ে পড়বি।”
“হুম।”
“আচ্ছা, আমি তাহলে ওঠি।”
বলে জেবা ওঠলেন। ববিতা বললেন,”আপা, চলে যাচ্ছ এখনই যে।”
“পরে আবারো আসব ববিতা। কণাকে দেখো। আমারো একটু কাজ আছে।”
বলে তিনি প্রস্থান করলেন। জেবা চলে যেতেই কণা বলল,”আমাকে একটু ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দিবে মা?”
মেয়ের এ কথায় ববিতা ভ্রু কুঞ্চিত করলেন। বসা থেকে ওঠে দাঁড়ালেন। কণার শরীরটা কাঁপছে বোধহয়। ববিতা বাহু স্পর্শ করতেই কেঁপে ওঠলেন। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে শরীর।
রাতে কণার জ্বর বেড়ে গেল আরো বেশি। রাত্রি এসে বসল চিন্তিত মুখে। মেয়েটি সন্ধ্যা অবধি তার সাথে ছিল। অথচ একবার ও বলেনি শরীর খারাপ লাগছে।
“কখন জ্বর এল, জানতেও পারলাম না। সাথে ছিল। চুপচাপ দেখে ভাবলাম, হয়তো পড়াশোনা নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেল। জানালোও না।”
কুহু ওর ঠিক পাশেই বসা। মা জলপট্টি দিতে বলেছেন। সেটাই করে চলেছে ও। দীপ্র ভাই আবার বের হয়েছেন। রাত্রি বলল,”এই কুহু। দীপ্র ভাইকে একটা কল কর না। বল ঔষধ নিয়ে আসতে। বাসায় ঔষধ অবধি নেই।”
“আচ্ছা আমি দেখছি।”
বলে কুহু বের হয়ে গেল। কণার চোখ মুখ শুকিয়ে আছে। রাত্রি বলল,”মামি বলল ভাত নাকি খেতে পারিস নি।”
“হুম।”
“অন্য কিছু খাবি? স্যুপ খাবি?”
“উহু।”
“একটু খেয়ে দেখ। ভালো লাগবে। আমি বানিয়ে আনি বরং। কুহু এখনই চলে আসবে।”
বলে রাত্রিও চলে গেল। ও চলে যেতেই কণা নিজের ফোন খানা বের করল। শরীর ও মন মেজাজ খুব খারাপ হয়ে আছে। ও রাগীবের নাম্বার খানা সবার আগে ব্লক করে দিলো।
ঔষধ নিয়ে এসেছে দীপ্র। কুহু আর রাত্রি পাশে বসা। সামান্য স্যুপ মুখে তুলতে পেরেছে মেয়েটি। দীপ্র বিছানায় বসে কণার মাথায় হাত রাখল।
“এখন কেমন লাগছে?”
“একটু ভালো ভাইয়া।”
“অল্প একটু স্যুপ খেতে পেরেছে।”
বলল রাত্রি। দীপ্র কুহুকে বলল,”পানি নিয়ে আয়। ঔষধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
কণা ঔষধ খেয়ে সবে শুতে যাচ্ছিল। তখনই ওর চোখ গেল দরজাতে। ছোট ছোট হাত দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ওর মুখ থেকে আপনা আপনিই বেরিয়ে এল,”কুঞ্জ।”
কুঞ্জ ডাক পেয়ে নড়েচড়ে ওঠল। সবার নজর ও ওদিকে গিয়েছে। দীপ্র ডাকল।
“কুঞ্জ, ভেতরে আয়। বাইরে কেন?”
ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে এল কুঞ্জ। ওর মাঝে অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে। কুহু বলল,”দূরে কেন? এদিকে আয়।”
“না, আমি এমনি এসেছি কুহুপু। আমি যাই।”
বলেই চলে যেতে নিচ্ছিল। দীপ্র ডেকে ওঠল। কুঞ্জ থামল। পেছন ফিরে দেখল দীপ্র ভাই দাঁড়িয়ে।
“কিছু হয়েছে কুঞ্জ? মনটা এমন কেন?”
“কিছু হয়নি ভাইয়া।”
দীপ্র যেন সবটা বুঝেই ফেলল। কুঞ্জর হাত খানা ধরে বিছানার কাছে আনল। বলল,”কণাকে দেখতে এসেছিলি?”
কুঞ্জ কি বলবে বুঝল না। তাকিয়ে রইল কণার মুখের দিকে। বড়ো আদুরে কণাপু। তাকে যে ও ভীষণ ভালোবাসে। অথচ মায়ের কড়া নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, ওদের সাথে যেন না মেশে।
| গতকাল দেয়ার কথা থাকলেও আপনাদের রেসপন্স দেখে হতাশ হয়েছি। সেই সাথে আমার নতুন মলাট বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তাই আর দেয়া হয়নি। প্রিয় পাঠক, অভিনব-ঝিলকে যাদের মনে আছে, অথবা নতুন করে চিনতে চান তারা টাকা জমান। |
চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি
(৬১)
https://www.facebook.com/100076527090739/posts/900338112527084/?app=fbl

