#প্রণয়ের_রূপকথা (৬)
কুহুর জ্বরটা আবারো ধরা দিল। সেই রাত্রিতে ওর ঘুমই হলো না। ও জ্বরের শরীরেই বিছানা ছাড়ল। ঘরে থাকতে ইচ্ছে করছে না। মায়ের কাছে কণা আছে। ও একটু উঁকি ঝুঁকি দিয়ে মায়ের রুম থেকেও চলে এল। তারপর এল রাত্রির ঘরে। রাত্রি জেগে আছে। সম্ভবত কারো সাথে কথা বলছে। কুহুর আগমনে খানিকটা মিইয়ে গেল। তবে সামলে নিল মুহূর্তেই।
“সরি রাত্রিপু। তোমাকে বিরক্ত করলাম।”
“আরে কীসের বিরক্তি। কোথায় যাস? বোস এখানে।”
রাত্রি ওঠে এসে কুহুকে টেনে বসাল বিছানায়। ওর একটু অস্বস্তিই হচ্ছে।
“ভুল সময়ে এসেছি।”
“কীসের ভুল?”
“তুমি কথা বলছিলে।”
“আরে তেমন সিরিয়াস কেউ না। এখন বল তোর কী খবর?”
কথা শেষ করে কুহুর হাত খানা স্পর্শ করল রাত্রি। মুহূর্তেই তাপমাত্রা বুঝে গেল।
“তোর তো খুব জ্বর রে।”
“খারাপ লাগছে খুব। তাই এলাম।”
“দাঁড়া আমি পানি নিয়ে আসি। পানি পট্টি দিলে ভালো লাগবে।”
কুহু চুপ করে রইল। রাত্রি গিয়ে কাপড় আর পানি নিয়ে এল।
“শুয়ে পড় কুহু।”
কথা মতন কুহু শুয়ে পড়ল। তারপর একটা নিশ্বাস ফেলে বলল,”তোমাকে কষ্ট দিচ্ছি রাত্রিপু।”
“আরে ধুর। কী যে বলিস তুই।”
রাত্রি সময় নিয়ে ওর কপালে পানি পট্টি দিল। কিছু সময় পর কুহু ঘুরে রাত্রির কোমর জড়িয়ে ধরল। এটা ওর অভ্যাস। ও সব সময় এমনই করে।
“পাগল মেয়ে।”
হেসে কথা খানা বলল রাত্রি। কুহু একটু মৌনই রইল। খানিক বাদে বলল,”রাত্রিপু, যা হয় ভালোই হয় তাই না?”
“হয়তো রে। আসলে ভালোই হয় যা হয়।”
“হুম।”
“তোর আবারো মন খারাপ?”
“তেমন না।”
“তাহলে?”
“মন থেকে মানতে পারছি না।”
“কুহু, তুই কি দীপ্র ভাইকে আগে থেকে পছন্দ করতি? এমন কিছু কি? যদি তেমনই হয় তবে বিয়েতে তুই ও তো খুশি ছিলি না রে।”
“ঠিক তা না রাত্রিপু।”
“শোন বোন, এটা নিয়ে যত ভাববি তত জটিল হবে সব।”
“কিন্তু আমি যে চেয়েও ভুলতে পারছি না। ওনি আসলে আমাকে অপমান করলেন। কিন্তু কেন রাত্রিপু?”
বলেই ওঠে বসল কুহু। রাত্রি ওর জ্বরের মুখটা আদুরে হাতে ছুঁয়ে দিল।
“আমাদের কুহুরানির জন্য একজন রাজপুত্র আসবে। হাতির পিঠে করে আসবে সে। মন খারাপ করে না কুহু সোনা।”
জবাবে কুহু বলে,”তাহলে আমি বিয়েই করব না।”
“কেন কেন?”
“আমার যে শখ রাজপুত্র ঘোড়ায় চড়ে আসবে। টগবগ করে ঘোড়া ছুটিয়ে আসবে আমার কাছে।”
এ কথায় রাত্রি হাসি। ওদের এই একই কথোপকথন নতুন নয়। একদম ছোট থেকে এই কথোপকথন হয়ে এসেছে। রাত্রি যখনই হাতির পিঠে চড়ে রাজপুত্রর আসার কথা বলে, কুহু তখন বলে ঘোড়ায় চড়ে আসার কথা। কে জানে কুহুর জন্য সত্যিই কোনো রাজপুত্র আসবে কি না।
কুহু ঘুমিয়ে পড়েছিল রাত্রির ঘরেই। রাত্রিও আর ডাকেনি। তবে সকাল হতে না হতেই কুঞ্জ এসে দরজায় নক করে গেল। দীপ্র ভাই নাকি ডেকেছে। রাত্রি ওঠতে গিয়ে কুহুর মুখখানা দেখল। মেয়েটা বড়ো আদুরে। ছোট মামার মুখের আদলটা বড়ো স্পষ্ট। ও হালকা হাতে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে এল দীপ্রর ঘরে। দীপ্র তখন ল্যাপটপে কিছু একটা করছিল। রাত্রিকে দেখেই বলল,”এসেছিস।”
“হ্যাঁ। কুঞ্জ এসে বলল তুমি ডেকেছ।”
“হুম। একটা বিষয় বলতে ডাকলাম।”
“কী বিষয়ে?”
“গতকাল আয়ানা বায়না ধরেছে ঘুরতে যাবে। তো ভাবলাম সবাইকে নিয়ে ঘোরাঘুরি করাটা খারাপ হবে না। কিন্তু কথা হলো কুহু…..
দীপ্র শেষ করার আগেই রাত্রি বলে ওঠল,”কুহু কী করল দীপ্র ভাই?”
“কী করেনি সে? আমি নাকি দয়া দেখাচ্ছি। মেজাজটা এত গরম করে দিল। যাই হোক, আমি ওকে যেতে বলব না।”
“তাহলে? কুহু যাবে না?”
“যাবে।”
“কীভাবে?”
“ওকে তুই যেতে বলবি।”
“আমি?”
“হ্যাঁ।”
“যদি না যায়?”
“কেন যাবে না? ওকে যেতেই হবে।”
বলে মুখটা শক্ত করল দীপ্র। রাত্রি মিনমিনে সুরে বলল,”ওর যে শরীরটা ভালো নেই।”
“ভালো হবে কেমন করে? আমি যে ঔষধ দিয়েছি তা খায়নি। বেয়াদব একটা।”
রাত্রি কি বলবে বুঝল না। যদিও দীপ্রর সাথে তার বোঝা পড়া ভালো। তবে এটা তো সত্য মানুষটা ওর নিজেরও চার বছরের বড়ো। তাই অনেক কথাই বলতে গিয়ে আটকাতে হয়। দীপ্র হাত বাড়িয়ে পাশের ড্রয়ার খুলে। সেখান থেকে ঔষধের প্যাকেট বের করে বলে,”এটা খাওয়াবি।”
“আচ্ছা।”
“বলিস না আমি দিলাম যে।”
“ও নিয়ে চিন্তা কোরো না। আমি ম্যানেজ করে নেব।”
“সেই সাথে ঘুরতে যাওয়ার বিষয়টাও ম্যানেজ করে নিস।”
“আচ্ছা,দেখছি কি করতে পারি।”
বলে ও অলস ভঙ্গিতে কক্ষ ছাড়ে। ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে থেকে চোখ বন্ধ করে দীপ্র। ওর মাথাটা আজকাল কাজ করে না। কী করে, কী বলে, সব উলোটপালোট লাগে। জীবনটা কেমন পানসে হয়ে গিয়েছে।
রাত্রির হস্তক্ষেপে ঠিক হলো কুহু যাবে। যদিও মেয়েটির ইচ্ছে করছে না। এই যে যেমন এখন মুখটা আঁধার করে বলল,”এটা আমার আত্মসম্মানের বিষয় হয়ে গেল না রাত্রিপু? তার কথা মতন চলতে হবে কেন আমায়?”
“শোন তুই, একটা বিষয় তো সত্য, দীপ্র ভাই আমাদের সিনিয়র। আর বিয়ের যে বিষয়টা ঘটল এতে কাকে দোষ দিব আমার জানা নেই। তুই ও তো বিয়ে করতে চাসনি তাই না?”
হ্যাঁ বোঝাতে কুহু মাথায় দোলায়। রাত্রি বলে,”তাহলে তো কাটাকাটি হলো। দোষ দুজনের কারোই না।”
“হয়নি।”
“কেন?”
“সে কেন আমার দায়িত্ব নিতে চাইবে? আর বিয়েটা শেষ সময়ে কেন ভাঙল? আগে ভাঙল না কেন?”
এ কথার জবাব রাত্রিও দিতে পারে না। কুহু ঠোঁট কামড়ে বলে,”একদিন আমি ওনাকে ঘু ষি….
পুরোটা শেষ করার আগেই আরশিতেই দীপ্রর ছবি ভেসে ওঠে। কুহুর হাত খানা ওঠানো ছিল। ও এবার সেটা নামিয়ে ফেলে। দীপ্র শক্ত মুখে কক্ষে প্রবেশ করে। কুহুর একটু অস্বস্তি হয়। তবে সেই অস্বস্তি কেটে যায় দীপ্র ভাই যখন তাকে পুরোপুরি অবজ্ঞা করে রাত্রিকে বলে,”বিকেল চারটায় বের হব। লেট যেন না হয়।”
ভদ্র মেয়ের মতন মাথা দোলায় রাত্রি। দীপ্র চলে যায়। কুহু এক প্রকার লাফিয়ে গিয়ে দরজা লাগায়।
“আসার আর সময় নেই। ওনাকে আসলেই ঘুষি দেওয়া উচিত।”
“ধুর পাগল। কী সব বলিস। একটু আগে আমি তোকে কী বোঝালাম? দীপ্র ভাই সব স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করছে। তুইও তেমনটাই কর। তাহলে প্রমাণ হবে, তুই নিজেও ওনাকে বিয়ে করার জন্য ম রে যাচ্ছিলি না।”
রাত্রির এই কথাটা একেবারে ঠিক। সত্যিই তো, কুহুও তো ম রে যাচ্ছিল না। তবে এ কথাও ফেলে দেওয়া যায় না বিয়েটা দীপ্রর দিক থেকে ভাঙায় ওর সম্মানে বেশ বড়ো একটা ধাক্কা লেগেছে। তবে সেই জন্য শোক করলেও চলবে না। সব স্বাভাবিক দেখাতে হবে। রাত্রিপুই ঠিক। কুহু এখন থেকে সব স্বাভাবিক দেখাবে। আর সময় সুযোগ মতন দীপ্র’কে ঘু ষিও দেবে। এটা কুহুর নিজের কাছে নিজের প্রতিজ্ঞা।
| এই যে রাইটিং ব্লক ভেঙে টুকটুক করে লিখছি। আপনাদের কমেন্ট না পেলে আবার হারিয়ে যাব। সবাই একটু মতামত জানিয়েন তো। |
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি
(৭)
https://www.facebook.com/100076527090739/posts/741574425070121/?app=fbl

