#উৎসর্গ
#পর্ব:২৪
#তানজিনা ইসলাম
বাড়িতে আসার পর মাঝখানে প্রায় কেটে গেছে পঁচিশ দিন।এই পঁচিশ দিনে রুদ্রর সাথে একবারো দেখা হয়নি মায়ার।কল পর্যন্ত করেনি কেও কাউকে।এইবার যেহেতু ফাইনাল এক্সাম তাই সবার সিট আলাদা আলাদা হলরুমে পড়েছে।তাই বন্ধুদের কারো সাথেই দেখা হওয়ার অত বেশি সুযোগ নেই।মায়া নিজের বন্ধুদের সাথেও দেখা-সাক্ষাৎ করা অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। সারারাত পড়তে কেটে যায় আর সকালে উঠে এক্সাম থাকে।
মায়া নিজের কক্ষের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি নিকষ কালো আকাশের দিকে নিবদ্ধ। একটু আগেই রাফানা চৌধুরী ফোন দিয়েছিলেন।বার বার বলেছে তাড়াতাড়ি যাতে বাড়ি ফিরে যায়।মায়ার কথা তার খুব বেশিই মনে পরছে, দিনগুলো কাটছে না যেন ওকে ছাড়া ।মায়া যেদিন বাড়িতে চলে এসেছিলো সেদিনও মন খারাপ করে বলেছিলো ওকে ছাড়া বাড়িটা নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ।ওনার দিন কাটে না। খারাপ লাগে অনেক।
মায়ার নিজেরও খালি থেকে থেকে মনে পরছে রাফানা চৌধুরীর কথা।ওর আরেকটা মা।যে জন্ম না দিয়েও নিজের ছেলের মতো ভালোবেসেছে ওকে।শাশুড়ী হয়েও যে প্রতিটা পদে পদে যত্ন করেছে।মায়া দীর্ঘশ্বাস ফেললো।মনটা বিষিয়ে আছে খুব খারাপভাবে!
পুরোটা দিন হাবিজাবি কাজে কেটে গেলেও রাতটা যেন কাটতেই চায় না। কিছু প্রিয় আর তিতকুটে স্মৃতি রাতে ঘুমোতে দেয় না ওঁকে ।মাঝে মাঝে জীবন নিয়ে বড্ড আফসোস হয়!জীবনটা এমন না হলেও তো পারতো।নিজের সাজানো স্বপ্ন গুলো বাস্তবায়িত হলে কী খুব বেশিই ক্ষতি হয়ে যেত?বেশি কিছু তো চায়নি ও,শুধু চেয়েছিলো নিজের প্রিয় মানুষের সাথে একটা গোছানো সংসার।সেই ভালোবাসার মানুষটার হাত ধরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে চেয়েছিলো।কিন্তু কিচ্ছু হলো না,কিচ্ছু না। উল্টো সম্মানটুকুও হারিয়ে নির্লজ্জ হয়ে গেলো তার কাছে।
মায়া উল্টো হাতে নিজের চোখের পানি মুছলো।আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনে আওড়ালো
-“রুদ্র,আমাকে ভালোবাসলে কী খুব বেশিই ক্ষতি হয়ে যেত তোর?কেন আমাকে ভালোবাসলিনা?বিশ্বাস কর তুই আমাকে ভালোবাসলে আমার জীবনটা অন্যরকম হতো।তোর জীবনে আমার এক পয়সা মূল্য না থাকলেও আমার জীবনে যে তুইই সবকিছু ছিলি! রুদ্র,আমার প্রিয় বন্ধু, চলার পথের সাথী,সহচর,ছোট্ট বেলার খেলার সঙ্গী আমি যে আমার হৃদয়, আমার ভালোবাসা তোর নামে উৎসর্গ করেছি।যা কখনই আমার পক্ষে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব না।তুই যায় কর আমি যে তোকে ঘৃণা করতে পারি না রুদ্র।তোকে ভালোবেসে আমার জীবন শেষ হয়ে যাক,তারপরও তোর প্রতি আমার ঘৃণা না আসুক।”
মায়া কক্ষে ফিরে এলো।বিছানার সামনে হাত-পা ছিটিয়ে বসলো।কালকে এক্সাম আছে।তাই আর আজকে রাতে ঘুম হবে না।রাতের ঘুমও মায়ার সাথে বেইমানি করছে।এই পঁচিশটা দিনে ও প্রতি রাতে ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়েছে। নয়তো হাজার চেষ্টা করেও ঘুম আসে না।হয় পুরো রাত জেগে থেকে পড়েছে,নয়তো ঘুম আনার জন্য মেডিসিন নিয়েছে।শুধুমাত্র এক্সামের আগের রাতেই মেডিসিন স্কিপ করে।কারণ মেডিসিন নিলে সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙা সম্ভব হয়ে উঠে না।
বসে থেকেই মায়ার হঠাৎ মনে পরলো রুদ্র ওকে সবসময় ‘নিশাচর’ বলে ডাকতো।কারণ ও পুরো রাত জেগে থাকতো আর পুরো দিন ঘুমাতো।এটা নিয়ে অনেক বকাও খেয়েছিলো রুদ্রর কাছে।
মায়া হেঁসে দিলো।আজ পুরোনো কথাগুলো বড্ড বেশি মনে পরছে।রুদ্র সবসময় আগলে রাখতো ওকে, একটু বেশিই কেয়ার করতো ওর।সবসময় মায়ার সব ভালো লাগা, খারাপ লাগার খেয়াল রাখতো।আচ্ছা তখনতো ওদের মধ্যে বন্ধুত্ব ছাড়া কিছু ছিলো না।তখনও রুদ্রকে মায়া বিয়ে করেনি, ভালোবাসার কথা জানায়নি।তারপরও তাদের মধ্যে সুন্দর একটা সম্পর্ক ছিলো,আন্ডারস্ট্যান্ডিং ছিলো,রুদ্র একদিনও ওকে ম্যাসেজ না দিয়ে থাকতে পারতো না।তাহলে আজ কী হলো?কেন রুদ্র এতটা পাল্টে গেল? কেনো এতবছরের বন্ধুত্বর উপরও ঐ একটা ভুলকেই বড় করে দেখলো?কেন?কেন?
মায়া জোরে শ্বাস ফেললো।এসব ভাবলেই বুকের মধ্যে ব্যাথা শুরু হয়। আফসোসে ভরে যায় প্রতিটা শ্বাস-প্রশ্বাস” মায়া বিছানার উপর থেকে ডাইরি নিলো। টেবিল থেকে কলম নিয়ে মেঝেতে বসলো।ডাইরিটা বিছানার উপর একের পর এক কলমের আচড়ে লিখলো রুদ্রকে নিয়ে হাজার হাজার কথা,অভিমান,অভিযোগ। বাড়িতে আসার পর থেকেই এই ডাইরি লেখার অভ্যাস তৈরী হয়েছে।মায়ার মন খারাপ থাকলেই এখন ডাইরি লিখে।নিজের অব্যক্ত কথাগুলো ডাইরিকে বলে সাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
লেখা শেষে মায়া ডাইরি বন্ধ করে,বিছানার একপাশে রাখলো।ফোন নিয়ে দেখলো এখনো মধ্যরাত।আজান দিতে এখনো ঘন্টা,দেড়-ঘন্টার মতো দেরি আছে।কিন্তু এই সময়টুকু মায়া কী করবে খুঁজে পেলোনা। ও বাড়িতে থাকতে যতক্ষণ ওর ঘুম আসতো না ততক্ষণ রুদ্রকেও ঘুমোতে দিতো না।ঘুম না আসা পর্যন্ত বিরক্ত করতো,একপ্রকার জ্বালিয়ে মারতো ওকে।তারপর ওর বুকে মাথা রেখে ঘুমোতো।এটাও একটা অভ্যাস হয়ে গেছে যেন।ওই হার্টবিটের আওয়াজ না শুনলে ঘুমই আসে না।
মায়া উঠে দাড়ালো। ওজু করে পরিপূর্ণ পাক হয়ে আসলো।জায়নামাজ বিছিয়ে তাহাজ্জুদের নামাজের জন্য দাঁড়ালো।নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে দোয়া করলো যাতে আল্লাহ ওর মা-বাবা,মামনি-বাবাইকে ভালো রাখে।ও না থাকলেও যাতে ওর মা-বাবা ভালো থাকতে পারে। নিজের প্রত্যেক প্রিয় মানুষের জন্য ওর বন্ধুদের জন্য নাম ধরে ধরে দোয়া করলো।সব শেষে রুদ্রর জন্য দোয়া করলো যাতে আল্লাহ ওর সব মনের ইচ্ছা পূরণ করে দেয়।ওর সব মন খারাপের জিনিস যেন ওর থেকে সরিয়ে দেয়।ও যেহেতু মায়ার সাথে থাকতে চাচ্ছে না তাহলে আল্লাহ যেন ওর মনস্কামনা পূর্ণ করে দেয়। যার সাথে সুখে থাকতে চায় তাকেই যেন ওর জীবনে ফিরিয়ে দেয়।যদি ভালোবেসে ভালো রাখতেই না পারে তাহলে কীসের ভালোবাসলো ও!অনেকতো করলো চেষ্টা, অনেকতো নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিলো ওর কাছে একটু থাকার জন্য কিন্তু রুদ্র তো ওর সাথে ভালো নেই।যার সাথে ভালো থাকবে তার কাছেই নাহয় ছেড়ে দিবে।কিন্তু মেনে নিতে কী পারবে?সে শক্তি তো মায়ার নেই। মায়া হিচকি তুলে কাঁদছে।সহ্য হচ্ছে না যে এই যন্ত্রণা। রুদ্রকে অন্য কারো সাথে দেখার আগে ওর মৃত্যু হোক।ও পারবে না এই ব্যাথা সইতে।
,
এক্সাম হলে বসে আছে মায়া। হলের বিশৃঙ্খল অবস্থা। সবাই মনের সুখে গল্প করছে।মায়া খুঁজে পায় না এত সুখ এরা পায় কোত্থেকে। যেখানে অসুখে অসুখে ওর মনটা মরে যাচ্ছে, সেখানে এদের সুখের যেন শেষ নেই।সবার মুখে খই ফুটছে! মায়া বিরক্তিতে মুখ থেকে চ-বর্গীয় শব্দ বের করলো।আসলে আমাদের জীবনে আমাদের মা-বাবার পরে আমাদের সবচেয়ে কাছের থাকে আমাদের বন্ধুরা।যাদের সাথে থাকলে আমাদের মনটা ভালো হতে বাধ্য। সব মন খারাপি এরা জাদু করে উড়িয়ে দিতে পারে।ওরা এক একজন জাদুকর।
মায়া পদে পদে বুঝতে পারছে ওর বন্ধুদের শূণ্যতা। ওর সাথে ওর একটা বন্ধুরও সিট পরেনি এই হলে।কতোদিন ধরে ওদের সাথে সামনাসামনি দেখা হয়নি।মূলত ও নিজেই পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে।ওরা থাকলে হাজারটা প্রশ্ন করে।তবে অনেককিছুই কানে আসে মাঝেমধ্যে। রাহুল নাকি কথা বলছে না রুদ্রর সাথে,ওর ব্যাপারটা নিয়ে ঝগড়া লেগেছে দুজনের মধ্যে।মায়ার খারাপ লাগে শুধু শুধু ওর জন্যে দুজনের মধ্যে কথা হয় না।
আবার সাহিল আর রিয়ানার মধ্যেও কিছু একটা হয়েছে।কী যে হচ্ছে এসব মায়ার বুঁজে আসে না।কখন যে সব সমস্যার সমাধান হবে!কবে ওদের সবার বন্ধুত্ব আগের মতো হবে?
ওর এসব ভাবনার মাঝেই ইনভিজিলেটর কক্ষে ঢুকলো।ন্যানো-সেকেন্ডের মধ্যেই সবাই চুপ হয়ে গেলো।শিক্ষার্থীরা সবাই শান্ত হয়ে বসলো।একে একে সবাইকে পেপার দেওয়া হলো। এই এক্সামে বেশিই কড়া গার্ড পরছে।গাঢ় ফেরানো পর্যন্ত দায় হয়ে যাচ্ছে।
লেখার মাঝখানে মায়ার চিন্তা হয়, ওই বলদগুলা টুকলি করতে পারছে কিনা কে জানে!টুকলি করা ছাড়াতো একটা এক্সামও দেয়নি ছেলেগুলা।
লিখতে লিখতে মায়ার আঙুল ব্যাথা হয়ে গেছে।দু হাতের তালুতে কলমের কালির অসংখ্য দাগ পরেছে। ত্রস্ত হাতে পেপার জমা দিয়ে দ্রুত পায়ে বের হলো মায়া।তাড়াতাড়ি বের হতে হবে এখান থেকে। নয়তো বন্ধুদের কারো না কারো সামনে পরবে।মায়া বারান্দায় দাঁড়ালো,তখনই আকাশ ছাপিয়ে বৃষ্টি নামলো।মায়া বিরক্তিতে কপাল চাপড়ালো।এই এখনই বৃষ্টি নামতে হলো?
মায়া নিচ তলায় নামলো।ক্যাম্পাসের সব বিল্ডিংয়ের রেলিঙের কাছে শিক্ষার্থীরা এসে দাঁড়িয়েছে। মনের আনন্দে হাত দিয়ে বৃষ্টি ছুয়ে দিচ্ছে সবাই।মায়া এদিক ওদিক তাকালো।অনেকেই ছাতা মাথায় দিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।এই প্রথমবার ছাতা না আনার জন্য আফসোস হলো মায়ার।মা কতবার করে বলেছিলো সঙ্গে ছাতা আনতে।
সবার আনন্দ একেবারে চোখে পরার মতো, কেওই এই বৃষ্টি তে বিরক্ত না।
মায়া পাংশুটে মুখে দাঁড়িয়ে ছিলো। একটা জায়গায় মায়ার চোখ আটকে গেলো ওর। দুজন মানব-মানবী পাশের হলের রেলিং এ দাঁড়িয়ে আছে।মেয়েটা হয়তো ছাতা আনেনি,তাই ছেলেটা তার আনা ছাতাটা মেয়েটিকে দিয়ে দিলো।পরক্ষণে মেয়েটা হয়তো কিছু একটা অনুরোধ করে বললো।ছেলেটা নিজে ছাতা ধরে খুবই সাবধানতার সহিত মেয়েটাকে পার্কিং লট পর্যন্ত দিয়ে এলো।নিজ হাতে গাড়ির দরজা খুলে মেয়েটাকে গাড়ির ভেতর বসালো।গাড়ির জানালায় দাড়িয়ে ড্রাইভারকে কিছু একটা বললো।হয়তো গাড়ি সাবধানে চালাতে বলছে।এই বৃষ্টির দিনে ভালোবাসাময় এই দৃশ্যটা হয়তো অনেকের কাছেই সুন্দর মনে হবে।কিন্তু মায়ার কাছে একটুও ভালো লাগলো না,উল্টো অসুন্দর, তিক্ত লাগলো।বুকের মধ্যে যেন এক পাহাড় সমান ওজনের ভর।মায়ার হাসফাস লাগলো।দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না ওখানে আর। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, এক দৌড়ে নিজের গাড়ি পর্যন্ত এসে থামলো।ড্রাইভার কিছু একটা বলছে,কিন্তু মায়ার সেসব মাথায় ডুকছে না। মানস্পটে কিছুক্ষণ আগের সেই দৃশ্য।
মায়ার কাক ভেজা অবস্থা। গাড়ির ভিতর এসি থাকায় কনকনে ঠান্ডা অনুভুত হওয়ার কথা। কিন্তু মায়ার কোনো অনুভূতিই হচ্ছে না।রুদ্র তাহলে ভালোই আছে আরশির সাথে। ও না থাকলেও রুদ্রর কোনোদিন কিচ্ছু যায় আসবে না।ও বাড়ি থেকে চলে আসায় রুদ্রর সুবিধাই হয়েছে বরং। মায়া কাউকে না দেখালেও মনে মনে ভাবছিলো রুদ্রর হয়তো একটু হলেও মনে পরছে ওকে।যেখানে ওর পুরোটা দিন-রাত কাটে রুদ্রর কথা ভেবে সেখানে রুদ্রর মনে একটু হলেও উঁকি দেয় ও।কিন্তু না,মায়া ভুল ভেবেছে,মায়াকে ছাড়া ও আরো বেশি ভালো আছে।আরশির সাথে সুন্দর সময় কাটানোর মাঝে রুদ্রর মায়ার কথা মনে করার কোনো সুযোগই নেই।
,
বিছানার উপর বসে একটু পর পর হাঁচি দিচ্ছে মায়া আর টিস্যু দিয়ে নাক মুচ্ছে।একটু আগেই মাহেরা খান বকে গেছে ওকে। ছাতা নেয়নি ঠিক আছে,কিন্তু ভিজে আসতে গেলো কেন।ও কী জানে না,বৃষ্টির পানি সহ্য হয়না ওর।সেই যে দুপুরে ভার্সিটি থেকে এসে ঘুম দিয়েছে, উঠেছে একেবারে মাগরিবের পর।আর সেই থেকে শুরু হয়েছে ওর হাঁচি দেওয়া।
মাহেরা খান ট্রে তে করে খাবার নিয়ে কক্ষের ভেতরে ঢুকলেন।মেয়েকে বকতে বকতে খাবার আর মেডিসিন খাইয়ে দিলেন।একজন সার্ভেন্ট এসে ট্রে টা নিয়ে গেলো।মাহেরা খান মেয়ের চুলে হাত বোলালেন। চুলে জট বেঁধে গেছে।একেবারে মাথার তালু থেকে জট বাঁধা। মাহেরা খান মায়াকে প্রশ্ন করলেন
-“চুল কখন আঁচড়িয়েছো মনে আছে তোমার?কিভাবে জট বেঁধেছে দেখেছো?”
মায়া ঠোঁট উল্টে বসলো। মাহেরা খান তেল আর চিরুনি নিয়ে যত্ন করে মায়ার চুল বাঁধতে বসলো।চুলে হাত দিয়ে প্রশ্ন করলো
-“কেন যে চুলগুলো কাটতে গেলে? তোমার মাথায় মাঝে মাঝে কী যে উদয় হয় আমি বুঝতে পারি না!এতো সুন্দর চুলগুলো কেটে ফেললে।তোমার চুলের জন্য এত খাটাখাটনি করে লাভ কী হলো আমার?সেইতো কেটে ছেঁটে ছোট করে ফেললে।
মায়া চুপচাপ বসে থাকলো।এখন উত্তর দিতে গেলে কেঁচাল বাজবে।মায়ার মিথ্যে ধরে ফেলা মাহেরা খানের বা-হাতের কাজ।তাই আর কিছু বললো না।মাহেরা খান মায়ার চুলে ঝুঁটি করে দিলেন। চুল বাঁধা শেষে মায়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন
-“দেখেছো এখন কত ভালো লাগছে।চুলগুলো বেঁধে রাখতে সমস্যা কোথায়,সেটাই বুঝিনা!
মায়া নিজের মায়ের কোলে মাথা রাখলো। মাহেরা খান মায়ার মাথায় হাত রেখে বললো
-“কী হয়েছে তোমার? সারাক্ষণ মন খারাপ করে বসে থাকো কেন?রুম থেকেও বের হওনা।”
মায়া নিস্প্রভ কন্ঠে বললো
-“কই মন খারাপ করে থাকি?আসলে এক্সামের একটু টেনশনতো। এর চেয়ে বেশি কিছু না।আর তুমি তো জানো আম্মু, আমি এক্সামের সময় রুম থেকে তেমন একটা বের হইনা।”
-“আমাকে শেখাচ্ছ তুমি?এক্সাম মনে হয় এর আগে দাওনি তুমি?কই কোনোদিনতো একফোঁটা চিন্তা করতে দেখলাম না তোমাকে।খুব চিল মুডে এক্সাম দাও সবসময়। সত্যি করে বলো কী হয়েছে?”
মাহেরা খান গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করলেন।মায়া জোরপূর্বক হেসে বললো
-“আরে কী হবে?সত্যি করে বলছি কিছু হয়নি।”
-“ও তাই নাকি?আচ্ছা তাহলে এই পঁচিশ টা দিন রুদ্র একবারো তোমাকে ফোন দিলোনা কেন?তুমিও তো একবার কল করোনি ওকে?তুমিতো ওর সাথে কথা বলা ছাড়া একদিনও থাকতে পারো না।এতোদিন কী করে থাকলে?
মায়া চুপ হয়ে গেলো।ঝটপট মস্তিষ্ক কোনো বাহানা বানাতে পারলো না।মায়াকে চুপ থাকতে দেখে মাহেরা খান বললেন
-“কী হলো?কথা বানাতে পারছো না?গতবার যখন বাড়িতে এসেছিলে রুদ্র সেইদিন মধ্যরাতে চলে এসেছিলো তোমাকে নিতে।কিন্তু আজ এতটা দিন হয়ে গেলো তোমাকে দেখতে পর্যন্ত এলো না?”
-“আমি তো বলেছি আম্মু,আমার এখানে পড়তে বেশি সুবিধা হয়।অন্য এক্সামগুলা ঐ বাড়িতে থেকে দিলেও এটা ফাইনাল এক্সাম।এই এক্সামের উপর আমার পুরোটা লাইফ ডিপেন্ড করছে।তাই হেলায়ফেলায় এই এক্সাম দেওয়া যাবে না। আর রুদ্রর নিজেরও পড়া আছে।এক্সামের পাশাপাশি ওকে অফিস পর্যন্ত সামলাতে হচ্ছে। তাই হয়ত সময় পাচ্ছে না আমার সাথে দেখা করতে আসার জন্য।”
মাহেরা খান মায়ার এতো যুক্তি আমলে নিলেন না।মায়ার মুখ দেখেই তিনি অনুভব করতে পারেন কিছু একটা হয়েছে রুদ্রর সাথে। যদিও এতোদিন চুপ থেকেছেন, ঝামেলা হলে সবকিছু ঠিক করে নিবে দুজন মিলে এই ভেবে। কিন্তু কিছুই তো ঠিক হচ্ছে না,কিছু বলছেও না মায়া।উল্টো লুকাচ্ছে তার থেকে।সারাদিন মন খারাপ করে বসে থাকে।ওনার চঞ্চল মেয়েটা কেমন শান্ত-শিষ্ট হয়ে গেছে!আগে পুরো বাড়ি দাপিয়ে বেড়াতো মেয়েটা আর এখন আছে নাকি নেই সেটাও অনুভব করা যায় না।সারাক্ষণ দোর দিয়ে কক্ষের মধ্যে বসে থাকে।
মাহেরা খান নরম কন্ঠে মায়াকে বললেন
-“রুদ্রর সাথে কী কিছু হয়েছে? মা কে বলো।আমাকে না বললে কাকে বলবা?বিয়েটা কী এখনো মেনে নিতে পারে নি ও?”
মায়া আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো নিজের মা’কে। কিন্তু মুখ ফুটে একটা উত্তরও দিলো না।রুদ্রর নাম মুখে নিলেই বুকের মধ্যে এক পাহাড় সমান যন্ত্রণা ভর করে। কষ্ট হয়! খুব বিশ্রীভাবে চুপে বুকের ভেতর।
মাহেরা খান অধৈর্য হয়ে আবার প্রশ্ন করলেন
-“বলো মায়া।চুপ থেকো না।রুদ্র কী এখনো মেনে নিতে পারেনি তোমাকে?ও কী তোমার সাথে থাকতে চায় না।মায়া, জোর করে আর যায় হোক না কেন,সংসার হয় না।ছেলেটার সাথে আমরা সবাই মিলে অন্যায় করেছি।বড়রা সবাই মিলে নিজেদের সিদ্ধান্ত ওর উপর চাপিয়ে দিয়েছি। নিজেরা নিজেরাই ভেবে নিয়েছি হয়তো একদিন সবকিছু মেনে নিতে পারবে ও।বিয়ের প্রায় একটা বছর পেরিয়ে যাচ্ছে মায়া।এখনো যদি ও বিয়েটা মানতে না পারে তাহলে কোনোদিন মানতে পারবে না।বুঝতে পারছো তুমি আমার কথা?বলো আমাকে সব।”
মায়া উত্তর দিলো না।চোখ দিয়ে কান্নারা উপচে আসছে ওর।মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে বসে আছে। মুখ তুলে একটা কথারও যে উত্তর দেওয়ার শক্তি পাচ্ছে না।কী উত্তর দেবে?ওর জেদের কাছেই তো হার মেনে সবাই মিলে বিয়ে দিয়েছে ওদের।সব দোষই তো ওর।না এখানে ওর মা-বাবার দোষ আছে, না ওর মামনি আর বাবাইয়ের।সবাইতো ওর সুখের কথাটাই চিন্তা করেছে।আসলে রুদ্রর কথাতো কেও ভাবেইনি।তাহলে রুদ্র কেন ওর কথা ভাবতে যাবে?কেন ওকে নিজের মনের বিরুদ্ধে ভালোবাসতে যাবে?না,রুদ্র ঠিকই করছে সব।এসব ওর প্রাপ্য। ওর কর্মের ফল।যা ও হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।রুদ্রর ভালোবাসাকে তার কাছ থেকে আলাদা করে কী করে ও নিজের ভালোবাসা পাওয়ার আশা করে?এই সব ওর প্রাপ্য শাস্তি! সৃষ্টিকর্তা সবার শাস্তি এই দুনিয়ার মাটিতেই দিয়ে দেন।
#চলবে

