উৎসর্গ #পর্ব:৩০ #তানজিনা

0
26

#উৎসর্গ
#পর্ব:৩০
#তানজিনা ইসলাম

ছাঁদের রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে আছে রুদ্র।আনমনে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে।ঝাঁক ঝাঁক পাখি দল বেঁধে তাদের নীড়ে ফিরে যাচ্ছে। সন্ধ্যা হলেই পাখিরা তাদের জীবীকা আহরণ শেষে মেঘের নিচ দিয়ে উড়ে যায়। এই উড়ে যাওয়া এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতে ভালো লাগে।আজ তাড়াতাড়িই অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছে রুদ্র।মন টিকছেনা কোথাও।মায়াকে মনে পরছে খুব।রুদ্র অফিস থেকে ও-বাড়িতে চলে যেতে চেয়েছিলাে।কিন্তু রাফানা চৌধুরী পুরো বাড়িতে একা।তাই তাকে ফেলে যেতে পারেনি ।অফিসে যাওয়ার পর থেকে অনেকবার মায়াকে কল দিয়েছিলো ও।কিন্তু মেয়ে টা একবারো ধরেনি।শেষে আর না পেরে মাহেরা খান থেকেই খোঁজ খবর নিয়েছে মায়ার।
মন-মস্তিষ্কের দ্বন্দ্বে ভুগছে রুদ্রর।মন একটা বলছে তো মস্তিষ্ক আরেকটা বোঝাচ্ছে।ভেতর থেকে কেও একজন বারংবার বলছে ‘তোমার জন্য চলে গেছে মেয়েটা।সব দোষ তোমার।তোমার মুখে শুধু ভালোবাসার কথা টুকুই তো শুনতে চেয়েছিলো,তুমি সেটাও বলতে পারলে না।’

রুদ্র নিজের মনকে বোঝাতে চাইলো ‘আমার দোষ টা কোথায়? ভালোবাসার কথা না বললে কী ভালোবাসা হয় না?মেয়েটা কেন বুঝতে চায় না?আমি যে ওর সামনে এসব কথা বলতে পারি না। না বুঝেই চলে গেল।ও চলে যাওয়ার পর ওকে ছাড়া এক মাস পাঁচ দিন আমি কিভাবে কাটিয়েছি সেটা শুধু আমি জানি! জানাতে পারি না বলে ও জানতেও পারবে না সেটা কেমন কথা!ও কী জানে না,আমি ওকে ছাড়া থাকতে পারি নাম
ওর নিজের সত্তা ভেতর থেকে উত্তর দিলো -‘কেনো ওকেই সবকিছু জানতে হবে?কেন ওকেই বারবার বুঝে চলতে হবে?
এক পাক্ষিক কিছু হয়না রুদ্র।মেয়েটা তোমার সাথে ভালো থাকার জন্য নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করে চলেছে।তার বিনিময়ে তুমি কী করছো?নিজের ভালোবাসাটুকু অনুভব করার চেষ্টা করো।সময় থাকতে বলে দাও তাকে যে ভালোবাসাে তাকে তুমি।সেই ছোটবেলা থেকে ভালোবাসো তাকে।’
রুদ্র নিজেকে নিজে বুঝ দিলো ‘আচ্ছা,আচ্ছা ঠিক আছে।ও আসার পরপরই বলে দেবো।’
মাগরিবের আজানের ধ্বনিতে মুখরিত হচ্ছে চারিপাশ।রুদ্র ছাদ থেকে নেমে এলো।কিন্তু কক্ষে ঢুকেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো ওর।ওকে জ্বালানোর মানুষটা নেই।পুরো ঘরটা ফাঁকা হয়ে আছে তাকে ছাড়া।রুদ্র মন খারাপ করে খাটের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসলো। আজ রাতটা কিভাবে কাটাবে সেটা নিয়েই চিন্তায় পরে গেলো রুদ্র।অনেক কষ্টে কাটবে আজ রাতটা।
রুদ্র বুকের বা পাশে হাত দিয়ে বসলো।খারাপ লাগছে সেখানে।আজ মায়াকে একটু বেশিই মিস করছে।ওর আজাইরা প্যানপ্যানানিগুলা মিস করছে খুব।বিধ্বস্ত লাগছে নিজেকে। রুদ্র ফোন হাতে নিয়ে ডায়াল করলো মায়ার নাম্বারে।ওর ভয়েস শুনতে মন চাইছে খুব করে। রুদ্র এবারেও আশা করেছিলো মায়া ফোন ধরবে না।কিন্তু ওর আশাকে ভুল প্রমানিত করে দিয়ে ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো।
রুদ্রর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো।কানে মোবাইল চাপিয়ে বেলকনির দিকে চলে গেলো ও।
,

মায়া বিছানার উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে।রুদ্রর সাথে কথা বলার পর মনটা ভীষণ ছটফট করছে।বারবার মনে হচ্ছে ওর প্রিয় মুখটা আর দেখতে পাবে না।মায়ার এসব চিন্তা মনে আসার কারণ খুঁজে পায় না।কালকে সকালেই তো রুদ্র নিতে আসবে বললো।তখনই তো দেখতে পাবে ওকে।বুকের উপর হাত দিয়ে বড় বড় শ্বাস ফেললো মায়া।মন খারাপের সাথে বুকেও ব্যাথা করছে ভীষণ।শিরশির অনুভূতি হচ্ছে শরীরে।আবার মনে হয় জ্বর বাড়ছে।মায়া গায়ে লেপ পেঁচিয়ে শুয়ে পরলো।

কুয়াশাঘেরা পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে মায়া।রুদ্র আশেপাশে তাকিয়ে জায়গাটা কোথায় বোঝার চেষ্টা করলো।কিন্তু কুয়াশার জন্য বোঝা যাচ্ছে না জায়গা টা।অচেনা জায়গা,রুদ্র এর আগে কখনো আসেনি এইখানে।রুদ্র তাকালো মায়ার দিকে।মায়া নিষ্পলক তাকিয়ে আছে ওর দিকে।ওর পরিধানে সাদা লঙ ফ্রক।বাতাসের তোপে চুলগুলো মুখের উপর এসে আঁচড়ে পরছে।চোখে কোনো অনুভূতি নেই।দৃষ্টিহীন তাকানোর ধরণ।
রুদ্র আশেপাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো মায়াকে
-“এটা কোন জায়গায় নিয়ে এসেছিস?এমন আজব কেন যায়গাটা?”
মায়া প্রতিত্তর করলো না এর।নিজ থেকেই উদাস কন্ঠে বললো
-“আমি বিদায় নিতে এসেছি তোর কাছে।”
-“বিদায়?”রুদ্র ভ্রু কুচকে বললো।
-“হুম।চলে যাবো,তাই বলতে এসেছি তোকে।বিদায় দে আমায়।”
-“মানে?কোথায় যাবি?”রুদ্র ফের প্রশ্ন করলো।
মায়া প্রশ্নের উত্তর দিলো না।কুয়াশা আরো ঘনীভূত হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পরলো।মায়া কুয়াশার ভীড়ের অন্ধকারে হারিয়ে গেলো।রুদ্র চিৎকার করে ডাকলো ‘মায়া,মায়া।’ কিন্তু সাড়া দিলো না মায়া। রুদ্র চারপাশে খুঁজে চিৎকার করে ডাকলো মায়াকে।আর না পেরে হাটু মুড়ে বসে পরলো।মুখ হাত দিয়ে ঢেকে চিৎকার করে বললো ‘মায়া,কোথায় চলে গেলি তুই আমাকে ছেড়ে?’

ধড়ফরিয়ে উঠে বসলো রুদ্র।হৃদপিণ্ড জোরে জোরে শব্দ করে কাঁপছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে হয়ে বের হচ্ছে। পুরো শরীর ঘামে ভিজে একাকার হয়ে গেছে। পরণের টিশার্ট ঘামে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে।ফুল স্পিডে এসি চলছে।কিন্তু তারপরও ঘামছে রুদ্র।রুদ্র আশেপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো নিজের অবস্হান। নিজের কক্ষের বিছানায় বসে আছে ও।কক্ষে আবছা আলো।বেলকনি দিয়ে রাস্তার ল্যাম্প পোস্টের হালকা আলো কক্ষে প্রবেশ করছে। আর তাতেই কক্ষের সবকিছুর অবয়ব ঠাওর করা যাচ্ছে।

বালিশের উপর একটা ছবির ফ্রেম রাখা।রুদ্র হাত বাঁড়িয়ে ফ্রেমটা হাতে নিলো।ফ্রেমে ওদের সাতজনের হাস্যোজ্বল ছবি।সেদিন লেকের পাড়ে তুলেছিলো ছবিটা।শ’খানেক ছবির মধ্যে এই ছবিটায় সিলেক্ট করেছিলো সবাই মিলে।তারপর সাতটা সুন্দর ফ্রেমে বাঁধিয়ে সবাই একটা একটা করে নিয়েছে।
রুদ্র আলতো হাত বুলিয়ে দিলো ছবিটাতে।সবাই একসাথে দলবেঁধে পানিতে পা ভিজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, চোখেমুখে উপচে পরা খুশি নিয়ে।রুদ্র ফ্রেমটা নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। ফ্রেমের ছবিতে সবাইকে দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পরেছিলো ও।কিন্তু ঘুম ভাঙলো ভয়ংকর একটা স্বপ্নে।রুদ্রর এখনো বুক কাঁপছে। কী বিশ্রী একটা স্বপ্ন! এই স্বপ্ন টা ও কালকেও দেখেছিলো। রুদ্রর ভয় লাগছে।
বিছানা হাতড়ে ফোন খুঁজে নিয়ে রুদ্র মায়ার নাম্বারে কল দিতে গিয়েও দিলো না।ফোনের স্ক্রিনে দুইটা বেজে পনেরো মিনিট।নিশ্চয়ই এতোক্ষণে ঘুমিয়ে পরেছে মেয়েটা।যদিও মায়া এতো তাড়াতাড়ি ঘুমানোর মানুষ না।পুরো রাত জেগে থাকা ওর অভ্যাস।এই সময়টা ওর কাছে সন্ধ্যা মাত্র।কিন্তু এখন অসুস্থ ও।সন্ধ্যায় কল করে রুদ্র জেনেছিলাে,মায়ার আবার জ্বর উঠেছে।রুদ্র পই পই করে বলে দিয়েছে যাতে নিজের যত্ন নেয়,ও,তাড়াতাড়ি যাতে ঘুমিয়ে পরে।নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পরেছে।
রুদ্র ফোন রেখে দিলো।যদি ঘুমিয়ে পরে তাহলে ঘুম ভেঙে যাবে মায়ার,আর একবার ঘুম ভাঙলে মেয়েটা আর শত চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারবে না।মাইগ্রেনের ব্যাথা উঠবে। আরো অসুস্থ হয়ে যাবে।

রুদ্র বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ালো।ধীরে পায়ে বেলকনিতে চলে গেলো।শুধু কয়েক ঘন্টার ব্যবধান,তারপর মায়ার কাছে চলে যেতে পারবে ও।শুধু সকালের আলো ফোঁটার অপেক্ষা, একটু আলো ফুটলেই মায়াকে নিয়ে আসতে যাবে ও। রুদ্র বেলকনিতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকলো সকাল হওয়ার।

জ্বর বাড়তেই মায়ার ঘুম ভেঙে গেলো। কাশতে কাশতে উঠে বসলো ও।শরীর অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে। মাথা ঘুরছে।মায়া আশেপাশে তাকালো।কিন্তু সবকিছু ঝাপসা, অন্ধকার। মনে হচ্ছে ও কোনো অন্ধকার পাতাল-পুরিতে আটকে গেছে।গলা শুকিয়ে কাঠের ন্যায়।বুকের ভিতর ধূ ধূ মরুভূমি। মাথা-ব্যাথায় মনে হচ্ছে এক্ষুনি মরে যাবে।মায়া বসা অবস্থায় কোনোমতে সাইড টেবিল রাখা জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢাললো।হাতের কাপুনির ফলে পানি ছিটিয়ে পরলো কিছুটা।মায়া এক ঢোকে পুরো গ্লাস শেষ করলো মাথা চেপে বসে থাকলো কিছুক্ষণ। সহ্যশক্তি ভেঙে গেলে বিছানা ছেড়ে দাঁড়ালো।পা টলছে,মাথা ঘুরে পরে যাবে মনে হচ্ছে।চেয়ারে হাত দিয়ো ঠেকিয়ে পরতে পরতে সামলালো নিজেকে।হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলো শক্ত করে।নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। মায়া টলমলে পায়ে কক্ষ ছেড়ে বাইরে এলো।বিধ্বস্ত কন্ঠে ডাকলো নিজের মা-বাবা কে।কিন্তু এতো রাতে দুজনের কেউই হয়তো জেগে নেই।

শরীরের ব্যালেন্স রাখতে না পেরে পায়ের সাথে পা লেগে ধ্বপ করে মেঝেতে বসে পরলো মায়া।কিছু পরার শব্দে মাহেরা খানের ঘুম ভেঙে গেলো।বাহির থেকে কারো অস্পষ্ট ডাক ভেসে আসছে। নিজের মেয়ের কথা মাথায় আসতেই কক্ষের বাইরে দৌড় দিলেন তিনি।মায়া মেঝেতে হাত ঠেকিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে।
মাহেরা খান দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলেন মেয়ের কাছে।বিধ্বস্ত মায়াকে দেখে গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিলেন তিনি।নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে নাক চেপে ধরলেন মায়ার।মাহেরা খানের চিৎকারে মুস্তাফিজ খান হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন।
মাহেরা খান মেয়ের মাথা বুকের সাথে চেপে ধরে বসে আছেন।মায়া জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে।ওর রক্তে মাহেরা খানের শাড়ি ভিজে যাচ্ছে। চোখমুখ টকটকে লাল হয়ে গেছে ওর।
মাহেরা খান কেঁদে দিলেন। জোরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন
-“আমার মেয়েটা এমন করছে কেন?ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে ওকে।”

মায়া শক্ত করে হাত চেপে ধরলো নিজের বাবার।ভাঙা ভাঙা কন্ঠে অতি কষ্টে বললো
-“বাবা-মা।আমি মনে হয় আর বাঁচবো না।আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।কষ্ট হচ্ছে খুব। রুদ্রকে কল করো প্লিজ।আমি মরার আগে একবার ওকে দেখতে চাই।”
মাহেরা খান ঝরঝর করে কেঁদে দিলেন। নিজের মেয়েকে বুকের সাথে আরো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলেন।মুস্তফিজ খান কল করলেন হামিদ ইয়াসির কে।

রুদ্র এখনো দাঁড়িয়ে আছে বেলকনিতে।অপেক্ষা করছে সকাল হওয়ার।ওর মস্তিষ্কে এখন শুধু একটাই চিন্তা কখন সকালের আলো ফুটবে আর কখন সে গিয়ে নিজের প্রিয় মানুষকে নিজের কাছে নিয়ে আসবে।কিন্তু এই প্রান্তে থাকা রুদ্র জানলো না,ঐ প্রান্তে থাকা মানুষ টা কতটা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। প্রতিটা নিঃশ্বাসে তাকে দেখার জন্য কতটা আকুলতা জানাচ্ছে। রুদ্র জানে না।কিচ্ছু জানে না সে।মায়া যখন রাত জেগে অপেক্ষা করতো ওর জন্য, রুদ্র ফিরে আসতো।হয়তো ওকে বকতো একটু,কিন্তু মায়ার কাছে ফিরে আসতো শেষ রাতে হলেও।কিন্তু রুদ্র জানে না ওর অপেক্ষা শেষ হবে কিনা!ওর মানুষটা আদোও ফিরবে তো?ওর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মায়া ওর কাছে ফিরে
আসবে তো?

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here