উৎসর্গ #পর্ব:৩২ #তানজিনা ইসলাম

0
22

#উৎসর্গ
#পর্ব:৩২
#তানজিনা ইসলাম

আইসিইউ তে অবজারভেশনে রাখা হয়েছে মায়াকে।একবার একবার করে সবাই ক্ষণকাল গিয়ে দেখে এসেছে ওকে।মাহেরা খান কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন।রাফানা চৌধুরী তাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছেন।রুহানি আর রাহুলের মা দোয়া পড়ছেন।রুদ্র এখনো গাঁট হয়ে ফ্লোরে বসে আছে। সবাই গিয়ে দেখে আসলেও ও একবারও যায়নি সেদিকে।নিশ্চুপ, নিস্তেজ মায়াকে দেখা ওর পক্ষে সম্ভব না। সেই তখন থেকে ও একিভাবে বসে আছে। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পরছে, কিন্তু টু শব্দ হচ্ছে না।
ছেলেরা কয়েকজন গিয়ে খাবার নিয়ে এসেছে।অনেকেই না খেয়েই হসপিটালে দৌড় দিয়েছে।কিন্তু কারো গলা দিয়েই খাবার নামছেনা এই অবস্থায়।
ডাক্তার বলেছে ওরা মিথ্যা আশা দিতে পারবে না।সিচুয়েশন খুবই খারাপ।মায়ার কোনো রেসস্পন্স পাওয়া যাচ্ছে না।ওরা যাতে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে। যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটতে পারে।সবাই যাতে বিপদ কেটে যাওয়ার জন্য দোয়া করে।
রাহুল এসে হাটু মুড়ে বসলো ওর সামনে। রুদ্র মাথা তুলে তাকানোর প্রয়োজনবোধ করলো না।রাহুল রুদ্রর চোখের পানি মুছে দিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো
-“রুদ্র,যা একবার মায়াকে দেখে আয়।”

রুদ্র উত্তর দেয় না।বসে থাকে মাথা নিচু করে।
রাহুল আরেকটু এগিয়ে যায় ওর দিকে।রুদ্রর বাহু ধরে বলে
-“মায়া যদি চোখ খুলে তোকে না দেখে তাহলে যে অনেক কষ্ট পাবে।তুই কী চাস ও কষ্ট পাক?”

রুদ্র টলমল চোখে তাকালো রাহুলের দিকে।কিছু বলার চেষ্টা করলো, কিন্তু পারলো না।মুখ দিয়ে শব্দ বের করতেও কষ্ট হচ্ছে। রাহুল রুদ্রর বাহু ধরে ওকে উপরে তুললো।রুদ্রর দাঁড়াতেও কষ্ট হচ্ছে। নিজের দেহের সব শক্তি যেন ফুরিয়ে গেছে।নিজেকে চৈতন্যশূণ্য মনে হচ্ছে।
রাহুল রুদ্রর কাঁধে হাত রেখে যেতে বললো।রুদ্র টলমলে পা টেনে ইউনিটে ঢুকলো।পুরো রুম হিম হয়ে আছে।রুদ্র ঢোকায় নার্স রুম ছেড়ে বেরিয়ে এলো। রুদ্র ঝাপসা চোখে সামনে তাকালো।সাদা বেডের উপর নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে মায়া।মুখে অক্সিজেন মাক্স লাগানো।এক হাতে স্যালাইনের ক্যানোলা সহ আরো কয়েকধরনের টিউব লাগিয়ে রাখা।অন্য হাতে ব্লাডের জন্য ক্যানোলা লাগানো। হার্ট রেট মেশিনের দাগগুলো খুব আস্তে, ধীরে ঢেউয়ের মতো উপরে উঠছে আর নিচে নামছে।রুদ্রর মনে হচ্ছে ওর কলিজা কেও ছুরি দিয়ে এফোড় ওফোড় করে দিচ্ছে। রুদ্র টলমলে পায়ে গিয়ে মায়ার সামনে ধ্বপ করে বসে পরলো।মায়ার সুন্দর মুখটা রক্তশূণ্য সাদা হয়ে আছে। ও রুদ্রর চেয়ে অনেক বেশি ফর্সা।এটা নিয়েও রুদ্রর হিংসার শেষ ছিলো না। মায়া তো ওঁকে হিংসুটে বলতো। সবকিছুতে মায়ার সাথে ওর হিংসে। মায়া ওর চেয়ে বেশি ফর্সা এখানে হিংসে, সবাই মায়াকে ওর চেয়ে বেশি ভালোবাসে সেখানেও হিংসে। আজকে আরো বেশি ফর্সা লাগছে মেয়েটাকে। কিন্তু আজ রুদ্রর কোনো হিংসে হলো না।

রুদ্র কাঁপা কাঁপা হাত মায়ার কপালে রাখলো।কিছুসময়ের মধ্যেই মেয়েটার মুখটা শুকিয়ে গেছে। ঠোঁট ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।চোখের নিচে ডার্ক সার্কেলের মোটা দাগ পরেছে।
রুদ্র অক্লিষ্টে ঢোক গিললো।ওর মনে হচ্ছে ও এই নিস্তেজ মায়াকে দেখছে না।ও দেখছে হাটু পর্যন্ত প্রিন্সেস ফ্রক পরা একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়েকে।যে দৌড়ে এসেছিলো সেদিন রাস্তায় পরে যাওয়া বাচ্চা ছেলেটাকে বাঁচাতে।ছেলেটা হাঁটুতে ব্যাথা পাওয়ায় চোখমুখ ঢেকে কাঁদছিলো।মেয়েটা দৌড়ে আসলো,যত্ন করে ছেলেটার শার্ট-প্যান্ট থেকে বালি ঝেরে দিলো। ছেলেটা কে নিজের কাঁধে ভর দিয়ে দাড় করালো।তারপর নিজের রিনরিনে বাচ্চাসুলভ কন্ঠে স্বান্তনার বাণী দিয়ে বললো ‘ও না অনেক স্ট্রং, স্ট্রং ছেলেরা কাঁদে না।’
রুদ্র মায়ার হাতের উপর কপাল ঠেকিয়ে কেঁদে দিলো।ফুপিয়ে ফুপিয়ে বললো ‘মায়ু,তোর রুদ্র যে একটুও স্ট্রং না।সে এখনো ছোটোবেলার মতো ভীতুই আছে।সে এখনো নিজের কান্না আটকে রাখতে পারে না।বিশ্বাস কর মায়ু,সে তোকে অনেক ভালোবাসে।অনেক। শুধু হিংসের বশবর্তী হয়ে তোকে কষ্ট দেয়। তুই ওর চেয়ে বেশি পার্ফেক্ট তাই।
তুই যেভাবে ছোটবেলায় দুষ্টু ছেলেদের সাথে ফাইট করে তাকে বাঁচাতি ওদের হাত থেকে,প্রটেক্ট করতি ওকে।সেই থেকেই যে তোর উপর ডিপেন্ডেন্ট ছিলো সে।সেই থেকেই ভালোবাসতো তোকে সে। তুই না থাকলে তাকে কে প্রটেক্ট করবে বল।সে যে এখনো তোকে ছাড়া কোনো ফাইটে জিততে পারে না।প্লিজ,মায়ু।প্লিজ চোখ খোল।একবার তাকা আমার দিকে।তোর চোখগুলো দেখতে মন চাইছে খুব করে। কিন্তু এভাবে বোজা অবস্থায় না। একবার তাকা প্লিজ।অন্য যা শাস্তি দিবি দে। এভাবে না। প্লিজ এভাবে না। আমি মরে যাবো, বিশ্বাস কর।আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে রে।এভাবে শাস্তি দিস না আমাকে।এই শাস্তি মেনে নিতে পারবো না আমি।”

রুদ্র বিরবির করে একের পর এক কথা বলছে মাথা নিচু করে।চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পরছে মায়ার হাতের উপর।
রুদ্র মায়ার ক্যানোলা লাগানো হাতে যত্ন করে চুমু খেলো।মায়ার হাতের আঙুল একটু নড়লো বোধহয়।রুদ্র চকিতে তাকালো মায়ার দিকে।মায়া নিভু নিভু চোখে তাকালো ওর দিকে।রুদ্র দাঁড়িয়ে পরলো।মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে উৎকন্ঠা নিয়ে বললো
-” জান।চোখ খুলেছিস তুই!”

মায়া চোখের পাতা ফেলে বোঝালো ‘হ্যাঁ।’ রুদ্র খুশিতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো মায়াকে।মায়ার বুকের উপর মাথা রেখে শব্দ করে কেঁদে দিলো।
রুদ্রর কান্নার শব্দে আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে এলো সবাই।রুদ্র এখনো মায়ার বুকের উপর মাথা রেখে কাঁদছে।মায়ার জ্ঞান ফিরেছে দেখে রাহুল গিয়ে নার্স কে ডেকে নিয়ে এলো।নার্সরা আসার পরপর ডাক্তারও রুমে ঢুকলো।রাহুল গিয়ে রুদ্রর পিঠে হাত দিয়ে ডাকলো।নিম্নস্বরে বললো ডাক্তার এসেছে,ও যাতে সরে আসে।রুদ্র উঠে একটু পিছিয়ে গেলো।
ডাক্তার এসে পালস চেক করলো মায়ার।
নিম্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলো
-“ভালো লাগছে?কোথাও সমস্যা হচ্ছে? ”

মায়া মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়।ডাক্তার খুশি হয়ে আশ্বাস দেয় সবাইকে।হয়তো মিরাকল ঘটেছে।সবার দোয়ায় হয়তো সৃষ্টিকর্তা সুস্থ করে দিয়েছে তাকে। সবার মুখে হাসি ফুটে,খুশি হয়ে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে আল্লাহর কাছে।
,

মায়ার বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে সবাই আছে।মাহেরা খান আর রাফানা চৌধুরী মায়ার মাথার কাছে বসে আছে।রুহানি আর রিয়ানা মায়ার পায়ের কাছে বসেছে।মুস্তাফিজ খান মায়ার হাত ধরে বসে আছেন।
রাহুল,সাহিল,রুদ্র,আরিয়ান দাঁড়িয়ে আছে। বাকিরা চলে গেছে নিজেদের বাড়ি।সবাই নিজেদের কাজ শেষে আবার দেখতে আসবে মায়াকে।
মায়া আধো আধো দৃষ্টিতে তাকালো সবার দিকে।সবাই চোখ মুছছে বারংবার।মায়া অক্সিজেন মাক্স খোলার চেষ্টা করলে মাহেরা খান থামিয়ে দিলেন। মায়া ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে আস্তে করে বললো
-“তোমরা সবাই এ্এভাবে কাঁদছো কেন?
মাহেরা খান চেচিয়ে বললেন
-“সবাই কেন কাঁদছে জানো না?কী অবস্থা করেছো তুমি নিজের?কীসের এতো কষ্ট তোমার? কীসের ডিপ্রেশন বলো।”
বলতে বলতেই মাহেরা খান আবার হু হু করে কেঁদে দিলেন।।

মুস্তফিজ খান থামলেন তাকে। মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন
-” প্রিন্সেস।কিচ্ছু হবে না তোমার।ঠিক হয়ে যাবে তুমি।আল্লাহ তোমাকে আবার সুস্থ করে দিবেন।”

মায়া বাবার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো।মুস্তফিজ খান উঠে দাঁড়িয়ে চোখ মুছতে মুছতে বাইরে চলে গেলেন।
হামিদ ইয়াসির ও যাওয়ার আগে বলে গেছেন ‘মায়া সুস্থ হলে অবশ্যই ওর হাতের এক কাপ চা খেতে যাবে।ও যাতে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যায়।’

রাফানা চৌধুরী চোখ মুছে মায়াকে বললেন
-“একটু তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যা বাচ্চা আমার।তোকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবো।হসপিটালের এই পরিবেশে থাকতে ভালো লাগছে না।আমার প্রেশার টা আবার বেরেছে রে।মাথা ঘোরায় শুধু। তখন তোকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করে।তুই সেবা না করলে যে আমি সুস্থ হবো না।

রুহানি বললো
-“আমরা না প্ল্যান করেছিলাম, এক্সাম শেষ হলে অনেক জায়গায় ঘুরবো।শুধুমাত্র লেকের পারে গিয়েছি।আরো অনেক জায়গা ঘোরা বাকি।আমরা আবার পার্কে ঘুরতে যাবো।তুই তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যা দোস্ত।”

রিয়ানা বললো
-“তুই না বলেছিলি আমার বিয়ে খাবি।প্রমিস করছি তোকে,তুই সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরপরই বিয়ে করে নিবো আমি।”
রিয়ানার কথা কেড়ে নিয়ে সাহিল বললো
-“হ্যাঁ রে মায়ু।তোর বান্ধবী কে তো তোকেই মানাতে হবে।তুই তো জানিস ওর পাত্র কে হবে।তুই বোঝালে তোর কথা ফেলতে পারবে না ও।”

আরিয়ান বললো
-“ব্রো,তোর জন্য আরেকটা চিঠি লেখেছি আমি।তবে এটা দেখে তোর মন খারাপ হবে না,আরো ভালো হয়ে যাবে।তুই সুস্থ হয়ে গেলেই আমি তোকে দেখাবো সেটা।”
রাহুল আরিয়ান থেকে ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো
-“কীসের চিঠি রে?”
-“ওটা আমাদের পার্সোনাল ম্যাটার।তাই না মায়ু?”
মায়া মাথা নেড়ে হাসলো।
রাহুল আবার বললো
-“জানিস,টাউনের শেষ মাথায় একটা নতুন ক্যাফিটেরিয়া উঠেছে।মায়া সুস্থ হয়ে গেলেই ওখানে খেতে যাবো সবাই মিলে।বিলটা নাহয় আমিই পে করবো।”

সবাই খুশিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে।রাহুলকে বাহ্বা দেয় এত সুন্দর একটা স্টেপ নেওয়ার জন্য। বন্ধুদের পকেট খালি করার মতো শান্তি এই দুনিয়ায় আর কিছু আছে নাকি!
মায়া ঠোঁট প্রসারিত করে হাসে।চোখের কার্ণিশ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরে ওর।মানুষগুলোকে ছেড়ে কী করে যাবে ও?ও থাকতে পারবে না ওদের কে ছাড়া।কিন্তু সৃষ্টিকর্তা ডাক দিলে তো যেতেই হবে।আয়ু ফুরিয়ে গেলে যে এই দুনিয়ায় কেউই টিকে থাকতে পারে না।

সবাই একে একে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। রুদ্র নিশ্চুপ হেটে মায়ার সামনে এসে ধ্বপ করে বসলো।মায়ার হাতটা যত্ন করে নিজের হাতে নিলো।সন্ত্বর্পণে চুমু খেলো মায়ার হাতে।মায়া পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে।চুলগুলো উশকোখুশকো হয়ে কপালের উপর পরে আছে।চোখের পাপড়ি ভেজা।নাকটা টকটকে লাল হয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরপর নাক টানছে।জাম কালার শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা।প্রশস্ত বুক দেখা যাচ্ছে।শার্টের হাতা ফোল্ড করে কনুই পর্যন্ত এনে গুটিয়ে রেখেছে।মায়ার হাতটা নিজের কাছে নিয়ে কী যেন দেখছে হাতের মধ্যে!

মায়া অনেক কষ্টে শব্দ বের করলো নিজের মুখ দিয়ে।কাঁপা কাঁপা গলায় বললো
-” রুদ্র।”
রুদ্র মাথা তুলে তাকালো। মায়া চোখের ইশারায় নিজের কাছে ডাকলো ওকে।রুদ্র মুখ এগিয়ে নিয়ে মায়ার কাঁধে মুখ গুঁজলো। মায়া বললো
-“শার্টের বোতাম দুটো লাগা।”

রুদ্র মৃদু হেসে মাথা তুললো।বিনাবাক্য বেয়ে শার্টের বোতাম দুটো লাগালো।এগিয়ে গিয়ে মায়ার কপালে চুমু দিলো। মায়ার অক্সিজেন মাক্স টা ভারী লাগছে।তাই আবার যখন মাক্স টা খুলতে গেলো রুদ্র বাঁধা দিলো।মায়া অসহায় চোখে চাইলো ওর দিকে।রুদ্র বললো
-“ডক্টর আঙ্কেল অক্সিজেন মাক্সে হাত লাগাতেও নিষেধ করেছে।খবরদার খোলার চেষ্টা করবি তো এটা।”
-“এটার জন্য তোর সাথে ভালো করে কথা বলতে পারছি না।”

রুদ্র উঠে এসে বেডের উপর বসলো। পিঠের নিচে হাত দিয়ে তুলে মায়াকে নিজের বুকের উপর রাখলো।অক্সিজেন মাক্স,স্যালাইনের ক্যানোলা সব চেক করে নিলো ঠিক আছে কিনা।মায়া গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে রুদ্রর বুকের উপর। রুদ্রর গরম নিঃশ্বাস ওর চোখমুখে আঁচড়ে পরছে।রুদ্র বুকের উপর যত্ন করে শোয়ানোয় মায়ার ঘুম এসে যাচ্ছে। কিন্তু এখন তো ঘুমালে চলবে না।রুদ্রকে যে অনেক কিছু বলার আছে ওর।এই সুযোগটা কাজে না লাগালে যদি ওর জীবনে আর কোনো সুযোগ না আসে তখন?
মায়া আস্তে করে ডাকলো
-“রুদ্র। ”

-“হুম।”

-“তুই তখন কী যেন বলছিলি আমাকে?”

-“কখন?”

-“যখন কেঁদে কেঁদে ডাকছিলি আমাকে। আমি চোখ খুলছিলাম না। কিন্তু তখন আমার সেন্স এসেছিলো। আমি জাস্ট কথা বলতে পারছিলাম। তোর কথাগুলোও বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কিন্তু আমি শুনেছি।”

-“আমার তো মনে পরছে না রে জান।কী যেন বলেছিলাম?”
রুদ্র ভাবার চেষ্টা করে বললো।

-“তুই আমাকে ভালোবাসার কথা বলছিলি। বলছিলি আমাকে ভালোবাসিস তুই।”

রুদ্র মাথা নিচু করে তাকালো। মায়া বুকের সাথে লেপ্টে আছে ওর।রুদ্র চুলগুলো খোঁপা করার চেষ্টা করলো। কিন্তু এক হাতে তা সম্ভব হলো না।তাই চুলগুলো পিঠের পিছনে এনে ঠিক করে দিলো।চুলের জন্যও যদি মায়ার ডিস্টার্ব হয় সেটাও রুদ্রর সহ্য হবে না।রুদ্র মুখে হাত বুলিয়ে দিলো ওর।
মায়া আবার ডাকলো ওঁকে।বললো
-“রুদ্র।”

-“হুম।বলছিলাম হয়তো।আমার মনে পরছে না। তখন আমি নিজের মধ্যে ছিলাম না।”

-“এখন আরেকবার বল।”

-“কী?”

-“ভালোবাসার কথা।”

-“তাহলে তোকে যে তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে হবে।সুস্থ হলেই বলবো।”

-“সুস্থ যদি না হয়।যদি সৃষ্টিকর্তা নিয়ে যান আমাকে।তখন?”
-“মায়া,প্লিজ।এমনিতেই ডক্টর আঙ্কেল অনেক ভয় দেখিয়েছে আমাদেরকে
রুদ্র মৃদু ধমক দিলো, আবার অসহায় গলায় বললো।
-” বলনা।”

-“হুম।ভালোবাসি।”

-“আরেকবার।”

-“ভালোবাসি জান।”

-“আরেকবার।”

-“ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি।”

মায়া রুদ্রর বুক খামছে ধরলো।রুদ্র হকচকিয়ে তাকালো ওর দিকে।মায়ার চোখ বেয়ে পানি পরছে।রুদ্র মায়ার চোখের পানি মুছে দিলো।চুলের উপর চুমু খেলো।মাথাটা আরেকটু বুকের সাথে চেপে ধরে শান্তস্বরে বললো
-“এইরকম করার জন্য বলেছিলাম বুঝি?”

-“আমার খুব ভালো লাগছে, বুঝলি। অনেক ভালো লাগছে। এতোক্ষণ বুকে খুব কষ্ট হচ্ছিলো।শ্বাস ফেলতে পারছিলাম না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমি পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছি।
যদি সুস্থ থাকতাম,তাহলে এটার জন্য তোকে ট্রিট দিতাম আমি।” মায়া চকচকে দৃষ্টিতে তাকালো

-“ঠিক আছে। এই ইচ্ছা টা সুস্থ হওয়ার পর পূরন করার জন্য রেখে দিস। কাচ্চি খাবো আমি কিন্তু! ”

ক্ষণকাল নিরবতায় কেটে গেলো।মায়া আবার ডাকলো রুদ্রকে।ওর শব্দভান্ডার যে আজকে ফুরাতেই চাইছে না।
রুদ্র কেমন করে যেন ডাকলো ওঁকে।
-“এমন কেন করলি তুই?”
-“কেমন?”
-“কীসের এতো কষ্ট তোর? কীসের? কীসের জন্য নিজেকে ভেতরে ভেতরে এতোটা শেষ করে ফেললি।”
-“তুই মুক্তি চাইতি, আমি মুক্তি দিতে চেয়েছিলাম। ডিভোর্স দেওয়া সম্ভব ছিলো না। সম্ভব ছিলো মরে যাওয়া। ওটাই করতে চেয়েছিলাম।তুই জানিস তো, তোর কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না। তোর খুব কষ্ট হচ্ছিলো রে, আমার সাথে থাকতে।”
রুদ্র নিষ্চুপ। ওর মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না। শুধু টপটপ করে জল গড়িয়ে পরছে, মায়ার চুলে।
-“ওই,রুদ্র।” মায়া ডাকলো।
-“হু।”
-“তোর এখনো অনেক রাগ আমার উপর, তাই না?”
-“নাহ। ওটা এখন নিজের উপর হচ্ছে। ঘৃণা হচ্ছে নিজেকে।একটা অমানুষের উপর।”
-“নাহ,
মায়া মাথা নাড়লো। ঢোক গিলে বললো
-“তোর আমার রুদ্র কে ঘৃণা করার কোনো অধিকার নেই। আমি খুব রেগে যাবো তাহলে।”
-“কেন মায়া? কেন? নিজেকে এভাবে শেষ করার কি খুব দরকার ছিলো!”
-“ছিলো তো। তুই আমাকে মাফ করেছিস?”
-“হাহ! ওটা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করার মতো জবানও আমার নেই।”
-“তোর সাথে আমি অনেক ছলনা করে বিয়ে করেছি। সরি!”
-” কেন এরকম করছিস তুই? আমি নিতে পারছি না।”
-“জানিস রুদ্র, আমার না তোর সাথে সংসার করার খুব শখ ছিলো।অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম বোঝার বয়স হওয়ার পর থেকে। কিন্তু আমার বডিতে অনেক কমপ্লিকেশন ছিলো। আমার মনে হতো আমি বেশিদিন বাঁচবো না। মরতে তো একদিন হবেই। তবুও মনে হতো হায়াত বেশি নেই। যথেষ্ট সময় নিয়ে আমি পৃথিবীতে আসিনি। এতো অসুস্থতা নিয়ে তো বাঁচা যায় না। যে একমাসের মধ্যে বিশদিনই অসুস্থ থাকে, বিছানা থেকে উঠতে পারে না, হসপিটালে এডমিট থাকে, সে কি করে আশা করে বেশিদিন বাঁচার। আমি আশা করিনি রুদ্র। ডক্টর আঙ্কেল আমাকে অনেক স্বান্তনা দিতো,
মা-বাবা আমার সোলমেটরা ওরা আমাকে খুব বেশিই দাম দিতো রে। খুব এফোর্ট দিতো আমাকে। এমন ছিলাম তাই হয়তো। আমি শুধু তোর সাথে সংসারটা করতে চেয়েছিলাম। মনে করেছিলাম বিয়ের পর কিছুদিন হয়তো তোর রাগ থাকবে। কিছুদিন রুড বিহেভ করবি, তারপর তো মানায় নিতে পারবি। বেস তুই রাগ করবি, এ জন্য তো আমার ইচ্ছে টা অপূর্ণ থেকে যেতে পারে না। আমি আমার এই ইচ্ছে অপূর্ণ রেখে মরে গেলে, মরেও শান্তি পেতাম না। আচ্ছা রুদ্র, তুই কী আমার উপর কালোজাদু করেছিলি? দরকার তো ছিলো না, তোর তো মেয়ের অভাব ছিলো না। কিন্তু আমার খুব অভাব ছিলো রে তোর। এমন কেন লাগতো আমার কে জানে! তুই কাছে না থাকলেই আমার পাগল পাগল লাগতো। ভালো না বাসতি, এতোটা খারাপ ব্যবহারও না করতি! কতোটা ছ্যাচড়া হয়ে গিয়েছিলাম রে আমি। শুধু তোর জন্য।শুধু ভাবতাম মরেই তো যাবো, একটু থাকি ওর সাথে। খুব অল্প সময়। ও রাখতে না চাক, তারপরও থাকি। মৃত্যুর আগে মানুষ তার বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলে, আমারও তেমনটাই হয়েছিলো হয়কো।
আত্মহত্যা মহাপাপ না হলে আমি সেটাই করতাম।শুধু ভাবতাম, ইহকালে তো কিছুই পেলাম না। একটা সুস্থ জীবন পর্যন্ত না। এভাবে তো একটা মানুষ বাঁচতে পারে না।পরকালের জীবনটা না-হয় ভালো হোক। একটু আমার সাথে ভালো ব্যবহার করতি। একটু। জাস্ট একটু থাকতি আমার সাথে। মরেই তো যেতাম।তুই জানতি না আমি মরে যেতাম? কতোবার বলেছিলাম তোকে। খুব ছোট সময়টাইতো। সেটুকুও একটু দাম তুই দিতে পারলি না আমাকে। আমি এতোটাই বোঝা ছিলাম রুদ্র। বন্ধু হিসেবে হলেও কি আমার মৃত্যুর আগের শেষ ইচ্ছে টা তোর পূরণ করা উচিত ছিলো না?কেন আমার ইচ্ছে টা অপূর্ণ থেকে গেলো বল!”
রুদ্র হিচকি তুললো। মায়া ধরফরিয়ে বললো
-“কাঁদছিস কেন? মরি নি তো এখনো। ইচ্ছেটাও পূর্ণ হয়ে গেলো। ভালোবাসার কথাও শুনতে পারলাম। এখন তো যেতে ইচ্ছে করছে না। আরেকটু থাকি তোর সাথে? আমার খুব ইচ্ছে জানিস, তোর সাথে ছোট্ট একটা সংসারের। অনেকগুলো বসন্ত আমি পাড়ি দিতে চাই তোর সাথে। তুই রাখবি আমাকে? আর অপমান করবি না তো? এখানটাই খুব লাগে রে!” মায়া বুকের উপর তর্জনী ঠেকালো।
-“শোন, এই। আর একটু বেশি বাচি আমি। তুই তো বললি ভালোবাসিস।এখন তো আমার ভালোবাসায়পূর্ণ একটা সংসার থাকবে। রুদ্র, আমি যদি আর একটু বেশি বাচি, তোর কী খুব সমস্যা হয়ে যাবে? বেশিদিন বাঁচবো না সত্যি! খুব অল্প কয়েকদিন। বেশি সমস্যা হয়ে যাবে রে তোর?”
রুদ্র নিজের হাত চেপে ধরলো মায়ার ঠোঁটে। ও সত্যিই আর শুনতে পারছে না।মায়া ওর গালে হাত রাখলো। চোখের পানি মুছিয়ে দিলো ওর। দুর্বল গলায় ডাকলো।
-“রুদ্র।”

-“হুম।”

-“একটা কথা বলতাম তোকে।”

-“না মায়ু।আর কোনো কথা না।এতো এক্সেসিভ কথা তোর শরীরের জন্য ভালো হবে না।যা বলার সুস্থ হওয়ার পর বলিস।”

-“প্লিজ,কথাগুলো বলা যে খুব প্রয়োজন।”

-“না মানে না।ডক্টর কথা বলতে বারণ করেছে তোকে।”

-“রুদ্র যে সময়টুকু পাচ্ছি সে সময়টুকুতোর সাথে কথা বলে কাটাতে দে।অনেক কথা যে জমে আছে আমার মনে।পরে যদি সময় কুলাতে না পারি!”

-“ফালতু কথা বলতে মানা করেছি তোকে আমি। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।”

রুদ্র চিল্লিয়ে বললো। মায়া জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে বললো
-“শান্ত হ।রেগে যাস না।রাগ কন্ট্রোল করতে শেখ।তোর এই রাগ গুলো সহ্য করার জন্য আমি নাও থাকতে পারি।”

-“প্লিজ এসব বলিস না।সহ্য হচ্ছে না আমার।তোকেই সারাজীবন সহ্য করতে হবে আমার রাগগুলা।আমার রাগ সহ্য না করে কোথায় যাবি তুই? “রুদ্র ভাঙ্গা গলায় বললো।

-“আচ্ছা শোন না। আর বলবো না।তাহলে আমার কথা মন দিয়ে শোন।”
-“হু।”
-“যদি আমার কিছু হয়ে যায় তাহলে আম্মু আর বাবাকে দেখবি।ওদের যে আমি ছাড়া কেও নেই।তুই যাতে খেয়াল রাখিস রুদ্র। অফিসের প্রতি অতিরিক্ত কনসেন্ট্রেট করতে গিয়ে মামনির প্রতি বেখায়ালি হোস না।ওনার হাটুর ব্যাথা বেড়েছে। সব সময় সাথে থাকার ট্রাই করবি।বাবাইকে যাতে অফিসের জন্য বেশি প্যানিক হতে নাহয়।আমি না থাকলেও বন্ধুদের সবার সাথে প্রাণোচ্ছল হয়ে মিশবি। আমাদের দুজনের ঝগড়ার সময়,যেভাবে সবার মধ্যে দুরত্ব তৈরী হয়েছিলো সেভাবে যাতে আর দুরত্ব সৃষ্টি না হয়।”
রুদ্র নিশ্চুপ।

মায়া ঢোক গিলে আবার বলে
-“নিজের খেয়াল রাখবি রুদ্র।সবার সাথে সাথে নিজেরও যত্ন নিবি।নিজের কোনো ক্ষতি হতে দিবি না।আমি সবসময় তোর সাথে থাকবো।আমি না থাকলেও আমাকে অনুভব করতে পারবি তুই।”

রুদ্র নিশ্চুপ চোখের পানি বিসর্জন দিচ্ছে। ওর চোখের পানিতে মায়ার মাথার তালুর চুল ভিজে যাচ্ছে।
মায়া আবার বললো
-“রুদ্র।কীরে তুই কথা বলছিস না কেন?”

-“কী বলতাম?”রুদ্র ভেজা গলায় বললো।

-“যা পারিস বল।আর কাঁদছিস কেন তুই?মরে যাইনি তো আমি। বেঁচে আছি।তোকে ছেড়ে এতো সহজে যাবো না কোথাও।অনেকদিন জ্বালানোর ইচ্ছা আছে তোকে।”

রুদ্র আরেকটু শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো ওকে।
-“রুদ্র।”

-“হু।”

-“আমি যদি মরে যাই,আরশিকে বিয়ে করে নিস।তোদের দু’জনকে আলাদা করে দিয়েছিলাম আমি।আমি মরে গেলে দুজনে এক হয়ে যাস রুদ্র।হয়তো আমার একটু কষ্ট হবে, কিন্তু এটা ভেবেই আমি ভালো থাকবো যে তুই ভালো আছিস।আর হ্যাঁ তোকে আর তোর বউকে ভুত হয়ে ভয় দেখানোর প্ল্যান ক্যান্সেল।”

-“তোকে ছাড়া কোনোদিন ভালো ছিলাম না আমি।আর না কোনোদিন ভালো থাকবো।যা করেছি অতীতে সব তোর উপর রাগ করে করেছি।কিন্তু তুই রাগ করতে পারবি না আমার উপর। তুই যেখানে যাবি আমিও তোর সাথে সেখানে চলে যাবো।”

-“রুদ্র।”

-“চুপ। একদম চুপ। অনেক, অনেক কথা বলে ফেলেছিস।আর না।ঘুমা এবার।”

রুদ্র নিজের বুক থেকে বালিশে শোয়ালো ওকে।একজন নার্স এসে জিজ্ঞেস করে গেলো কিছু লাগবে কি-না। রুদ্র জানিয়েছে কিছুর দরকার নেই এখন।দরকার হলে রুদ্র ডেকে নেবে।রুদ্র মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো মায়ার। মায়ার চোখের পাতা বন্ধ করে দিলো।ফিসফিস করে বললো ‘ঘুমা।’
,

মায়া পিটপিট করে চোখ খুললো।লাইটের আলোতে চোখ খুলতে কষ্ট হচ্ছে।হাতে কারো স্পর্শ পেয়ে সেদিকে তাকালো।রুদ্র মেঝেতে বসে ওর হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে।মায়া মুচকি হাসলো।হাতে টান পরছে।মনে হচ্ছে জমে গেছে হাতটা।ক্যানোলাতে রক্ত উঠে গেছে। তবুও রুদ্রর ঘুম ভেঙে যাওয়ার ভয়ে, মায়া হাতটা সরিয়ে আনলো না।
রুদ্রর ঘুম ভাঙলো কিছুক্ষণ পর।ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখে মায়ার দিকে তাকালো ও।মায়ার হাসিমুখের দিকে তাকাতেই ঘুম সম্পূর্ণ ছেড়ে গেলো।রুদ্র তটস্থ হয়ে বসলো।
মায়া মৃদু হেসে বললো
-“কীরে?ঘুম ভেঙে গেলো?”
-“হুম।”

বলতে বলতেই রুদ্রর চোখ গেলো মায়ার হাতের দিকে।রুদ্র আতঙ্কিত হয়ে মায়ার হাত ধরলো।অগোছালো স্বরে বললো
-“জান।আমার জন্য হয়েছে এটা তাই না?বেশি ব্যাথা পেয়েছিস? ”

-“উহু।ঠিক আছি আমি। ”

রুদ্র হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মায়ার হাতে।কিছুক্ষণ পরপর ফু দিয়ে ভালো করার চেষ্টা করছে।
মায়া রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বললো
-“আম্মি,মামনি কোথায় রে?আর ওরা?ওরা কোথায়? আমার খুব মনে পরছে ওঁদের কথা। রুহি,রিয়ানা কোথায়? রাহুল,আরিয়ান, সাহিল? বাবা ই বা কোথায়?”

-“সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি মায়ু।চলে আসবে খানিক বাদে।”

-“ভালো করেছিস।কালকে থেকে সবাই এখানে পরে আছে।কয়টা বাজে রে?”

-“সকাল সাড়ে দশটা।”

-“তুই বাড়ি যাবি না?”

-“তোকে নিয়েই একেবারে ফিরবো।”

-“আমার তো ঠিক হতে দেরি লাগবে অনেক।ততদিন কী এখানে পরে থাকবি নাকি?”

-“দরকার হলে তাই থাকবো।”

মায়া মলিন চোখে তাকালো ওর দিকে।তখনিই মাহেরা খান,রাফানা চৌধুরী আর ওর বন্ধুরা ঢুকলো।মাহেরা খান এসে মায়ার পাশে বসলো।রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বললো
-“কিছু খেয়েছো তুমি?”
রুদ্র পাংশুটে মুখে মাথা নাড়লো।

রাফানা চৌধুরী অবাক হয়ে বললো
-“কী বলো কিছু খাওনি?কাল সকাল থেকে কিচ্ছু খাওনি তুমি রুদ্র।এক ফোটা পানি পর্যন্ত মুখে দাওনি।এভাবে তো তুমিই অসুস্থ হয়ে পরবে।তখন মায়ার খেয়াল রাখবে কীভাবে?”

-“আরে আম্মু,কিছু হবে না আমার।ঠিক আছি আমি।”
বলেই রুদ্র উঠে দাঁড়ালো।মায়া আলতো হাতে টেনে ধরলো রুদ্রর হাত।রুদ্র ঝুঁকে এলো ওর কাছে।মায়া আস্তে করে বললো
-“বাড়ি যা রুদ্র।”

-“যেতে হবে না মায়ু।আমি ঠিক আছি।”রুদ্র মায়ার গালে হাত দিয়ে বললো।

-“তোকে আমি বাড়ি যেতে বলেছি।কালকে থেকে কেন কিছু খাসনি তুই? বাড়িতে গিয়ে ফ্রেশ হবি,তারপর পেট ভরে কিছু খাবি।এখানে সবাই আছে, আমার থাকতে কষ্ট হবে না।

-“না,কোথাও যাবো না আমি।এখানেই থাকবো।দরকার হলে এখান থেকে কিছু কিনে খেয়ে নিব।”

রাহুল বললো
-“বাড়িতে গিয়ে খাওয়া আর এখানে খাওয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য।আর এখানে ফ্রেশ কোথায় হবি তুই?তাই বলছি যা।গিয়ে ফ্রেশ হয়ে, কিছু খেয়ে নে।আমরা সবাই তো আছি মায়ার কাছে।”

সবাই যেতে বলছে রুদ্রকে।কিন্তু তারপরও ও যেতে রাজি হচ্ছে না।

রুদ্রর হাতে টান পরায় রুদ্র আবার ঝুঁকলো মায়ার কাছে।
-“রুদ্র, ডক্টর আমাকে উত্তেজিত হতে মানা করেছে। বেশি প্যানিক হতেও মানা করেছে।কিন্তু তোর জন্য আমি প্যানিক হচ্ছি রুদ্র।তোর জন্য চিন্তায় আরো অসুস্থ হয়ে পরবো আমি। তুই যদি এখন বাড়ি না যাস,তাহলে তোর সাথে আর কথায় বলবো না আমি।”

রুদ্র অসহায় মুখ করে তাকালো মায়ার দিকে।ওকে ছেড়ে এক সেকেন্ডের জন্যও নড়তে মন চাচ্ছে না।বাড়িতে যেতে মন সাই দিচ্ছে না একটুও।কিন্তু মায়ার জেদ জানে ও।যদি ওর না খাওয়ার চিন্তায় প্যানিক হয় তখন?মায়া টেনশন সইতে পারে না।অসুস্থ হয়ে পরে।আচ্ছা,ও যাবে আর আসবে।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সব কাজ কমপ্লিট করে চলে আসবে।

রুদ্র সবকিছু ভেবে বললো
-“ঠিক আছে।যাচ্ছি আমি।”

রুদ্র তাকালো মায়ার দিকে।আবার ঝুকে বললো
-“আমি তাড়াতাড়ি চলে আসবো জান।”

মায়া মিষ্টি হাসলো।চোখ দিয়েই বিদায় জানালো রুদ্রকে।
রুদ্র সবার থেকে বিদায় নিয়ে কক্ষের বাইরে পা বারালো।মায়াকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কাঁচের দরজার ওপার থেকে হাত দিয়ে বাই জানালো।মায়া এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওর যাওয়ার দিকে।ভেতর থেকে কেও জানান দিচ্ছে, মানুষটাকে যে চলে যেতে দিলি,আবার ওকে দেখার সুযোগ হবে তো তোর?

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here