উৎসর্গ #পর্ব:২১ #তানজিনা ইসলাম

0
24

#উৎসর্গ
#পর্ব:২১
#তানজিনা ইসলাম

ফোনের তীব্র ভাইব্রেশনে মায়ার ঘুম ভাঙে।কোনোমতে চোখ টেনে খুলে টেবিল থেকে মাথা তোলে।পড়তে পড়তে পড়ার টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল।মায়া নিজেকে ধাতস্থ করার জন্য সময় নেয়। ফোনের এলার্ম বন্ধ করে টাইম দেখে।ফোনের স্ক্রিনে বরাবর রাত বারোটা।এখনো কী ছেলেটা বাড়ি ফেরেনি?ইদানীং বেশ রাত করে বাড়ি ফিরে রুদ্র।রুয়ান চৌধুরী অফিসের কাজে দেশের বাইরে গেছেন।সেই থেকে অফিসে বেশি চাপ পরছে রুদ্রর উপর।কিন্তু এতো রাত হওয়ার তো কথা না।কোথায় যায়, কীকরে কে জানে?

মায়া উঠে দাড়ালো। অসম্ভব খিদে পেয়েছে। সন্ধ্যায়ও কিছু খাওয়া হয়নি।পড়তে পড়তে খাওয়ার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলো।সারাবছর পড়বে না,কিন্তু এক্সামের কয়েকদিন আগে থেকে পড়তে পড়তে খাওয়ার কথা পর্যন্ত ভুলে যাবে।পড়ার মাঝে ব্রেক নেওয়ার জন্য দশটার দিকে ফোনে এলার্ম সেট করে টেবিলেই ঘুমিয়েছিলো।মায়া প্রথমে ভাবলো খেয়ে নিবে।কিন্তু এতোক্ষণ যখন অপেক্ষা করতে পেরেছে রুদ্র আসার জন্য আরেকটু নাহয় অপেক্ষা করলো।কিন্তু পেটতো মানছে না।।ইশ!মামনির সাথে খেয়ে নেওয়া উচিত ছিলো।কত করে বলেছিলো খেতে।মায়া মনে মনে ভাবলো।কিন্তু রুদ্র না খাওয়া পর্যন্ত গলা দিয়ে খাবার নামবে না।ছেলেটার বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেশি দেরি হয়ে গেলে আর খেতেই চায় না।তারপরও মায়া না খেলে মায়ার জন্য হলেও খেতে বসতে হয়।
মায়া কক্ষের মধ্যে পায়চারি করছে।ফোন করবে নাকি করবে না সেটা নিয়েই দ্বিধাদন্দে ভুগছে।
দরজা খোলার শব্দে মায়া পিছনে ফিরে তাকালো।রুদ্র এসেছে।মায়া দ্রুত বেগে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো তাকে।রুদ্র পরতে পরতে সামলায় নিজেকে।এখন আর অবাক হয়না এসবে, অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে।মায়া শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে রুদ্রকে।কিন্তু রুদ্র একবার পিঠে হাত পর্যন্ত রাখলো না।মায়া ছেড়ে দেয় রুদ্রকে। প্রচন্ড উৎকন্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করে
-“কোথায় ছিলি এতক্ষণ তুই?জানিস কত চিন্তা হচ্ছিলো আমার?”

-“চিন্তা করতে বলেছি আমি।আজাইরা চিন্তা করছিস কেন?আর কোথায় গেছি সেটার কৈফিয়ত কী তোকে দিতে হবে?জেরা করছিস নাকি?”

রুদ্র মায়াকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে শক্ত কন্ঠে বলে।
মায়া অসহায় চোখে তাকায় রুদ্রর দিকে।শুধু একটা প্রশ্নের উত্তরে এতো কঠিন কঠিন উত্তর!মায়া নিজেকে ধাতস্থ করে।রুদ্রকে কাঠ কাঠ গলায় বলে
-“অবশ্যই দিতে হবে।আমকেই তো কৈফিয়ত দিবি।আমাকে না দিয়ে কাকে দিবি।মানুষ তার বউকেইতো সবকিছুর কৈফিয়ত দেয়। অন্যকেতো আর দিতে যায় না।”

রুদ্র তাচ্ছিল্য হাসে।মায়াকে কঠিন গলায় বললো
-“তুই ঠিক কী দিয়ে তৈরী মায়া?আল্লাহ কী তোকে এক অণু পরিমান লজ্জা শরম দিয়ে পাঠাননি?লজ্জা করে না এসব বলছিস যে।আমি তোকে বউ বলে মানি না।যেখানে বিয়েটাই মানতে পারিনি সেখানে তোকে কৈফিয়ত দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।আমার ব্যাপারে কোনোভাবে বা-হাত ঢোকানোর ট্রাই করবি না।”

রুদ্র পা বাড়াবে এমন সময় মায়া পিছন থেকে বলে উঠলো
-“আমি সেই প্রশ্নটাই করি যেটার উত্তর আমি জানি রুদ্র।আমি জানি তুই আজকে আরশির সাথে দেখা করতে গিয়েছিলি।অনেক টাইম একসাথে স্পেন্ড করেছিস সেটাও জানি। কষ্ট পেলাম,অনেক বেশিই কষ্ট পেলাম তোর এইসব কাহিনিতে, তাই বা-হাত ঢোকাতে হচ্ছে।”

রুদ্র থেমে গেলো।মনে মনে অবাক হলো ভীষণ। মায়া কী করে জানলো, ও আজকে আরশির সাথে দেখা করতে গেছে?পিছনে গোয়েন্দা লাগিয়ে রেখেছে নাকি মেয়েটা?রুদ্র মনে মনে সাহস সঞ্চার করলো।মায়ার সামনে কোনোমতে হেরে গেলে চলবে না।সবসময় মেয়েটার মন মর্জি মতো চলবে নাকি সবকিছু।রুদ্র পিছনে ফিরলো।মায়া এক দৃষ্টে চেয়ে আছে তার দিকে।রুদ্র এগিয়ে গেলো ওর দিকে।চোখে চোখ রেখে বললো
-“হ্যাঁ গেছিতো দেখা করতে।কী বলতো মনটা অনেক বিক্ষিপ্ত ছিলো। কোনোকিছুই ভালো লাগছিল না।তাই মনটা ভালো করতে গেছিলাম।মেয়েটার কাছে জাদু আছে, গেলেই মন ভালো হয়ে যায়।ওই যে রবীন্দ্রনাথের গানের একটা লাইন আছে না ‘তুমি সুখো যদি নাহি পাও, তবে সুখেরো সন্ধানে যাও’।”

মায়া নিজের পরনের জামা খামচে ধরলো।কথা দিয়ে মারা হয়তো একেই বলে। রুদ্র প্রতিনিয়ত মারছে তাকে এইভাবে।এই তিক্ত বুলি যে মায়ার সহ্যসীমার বাইরে।ভালোবাসার মানুষটার মুখে অন্য নারীর প্রশংসা যে মায়ার কাছে মৃত্যু সমান।
-“কী এমন জাদু করলো তোকে আমাকেও বল।আমিও ওই জাদুটা করার ট্রাই করি।যার কারণে ওর কাছে মন ভালো করতে গেছিস সেই কারণটাও বল।কই আমার সাথে থাকলে তো তোর মন ভালো থাকে না।সবসময়ই একটা না একটা কারণ নিয়ে ঝগড়া লাগাস।তুই নিজেই ঝগড়া লাগিয়ে তোর মন খারাপ করে ফেলিস,সাথে আমারও।”
মায়া ভাঙ্গা গলায় বললো।

রুদ্র মায়ার দিকে তাকিয়ে
-“তুই ওর সাথে নিজের তুলনা কীকরে করতে পারিস মায়া?তোর সাথে ওর তুলনা হয়?না ও কাউকে ছলনা করে বিয়ে করেছে,না ও কারো ভালোবাসার মানুষকে কেড়ে নিয়েছে।উল্টো স্যাক্রিফাইস করতে গিয়ে নিজের জীবন শেষ করে দিতে চেয়েছিলো।আল্লাহ ওকে বাচিয়ে দিয়েছে।তোর সাথে ওর তুলনা হয় না মায়া। ও তোর মতো কোনো ছেলেকে সিডিউস করে না।”

মায়া বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলো রুদ্রর দিকে।রুদ্রর এহেন কথায় উত্তর দেওয়ার মতো কিছু খুঁজে পেলো না।মায়া বিহ্বল হয়ে আওড়ালো
-“আমি ছেলেদের সিডিউস করি?কোন ছেলেকে সিডিউস করেছি আমি?কীভাবে করেছি?এমন ড্রেস তো কোনোদিন পরিনি যা দেখে ছেলেরা সিডিউস হবে।আমার কী দেখে সিডিউস হয়েছে ওরা উত্তর দে।”

-“অন্য কাউকে সিডিউস করেছিস কিনা জানিনা।কিন্তু আমাকে করেছিস।মনে নেয় সে রাতের কথা তুই তোর চুল দেখিয়ে সিডিউস করেছিলি আমাকে।নয়তো আমি কোনোদিন যেতাম না তোর কাছে।হয়তো অন্য ছেলেকেও করেছিস,তাতো আর আমার জানার কথা না।”

রুদ্র ঠোঁটে বাকা হাসি ঝুলিয়ে বললো।

মায়া জোরে রুদ্রর কলার ধরলো।টলমল চোখে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বললো
-“আমার সম্মানের উপর প্রশ্ন তুলিস না রুদ্র।এত বিশ্রী অপবাদ দিস না আমাকে।আমার আল্লাহ জানে আমি কোনোদিন কারো সাথে কোনো খারাপ করিনি!সেদিন একটা এক্সিডেন্ট ঘটে গিয়েছিলো।এতে আমার কোনো দোষ নেই।”
রুদ্র শক্ত হাতে মায়ার হাত কলার থেকে ছারালো।গম্ভীর স্বরে মায়াকে বললো
-“আমার লাইফের পার্সোনাল ম্যাটার নিয়ে ইন্টারফেয়ার না করলেই এসব শুনতে হতো না তোকে।নিজে জেচে শুনতে গেলি।এতে আমার দোষ কী? কিন্তু কী জানিস তোর কথাও আমার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়।তোর সাথে একরুমে থাকতেও আমার রুচিতে লাগে।”
বলেই রুদ্র গটগট পায়ে কক্ষের বাইরে বেরিয়ে গেলো।

মায়া ওভাবেই কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো কিছুক্ষণ।তারপর নির্লিপ্তি ভঙ্গিতে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসলো।আয়নায় নিজের বিম্বের দিকে তাকালো। আজ তার বিম্বও যেন উপহাস করছে তাকে দেখে।ভেতর থেকে কেও যেন চিৎকার করে বলছে,দেখ মায়া দেখ একতরফা ভালোবাসার জ্বালা দেখ। মায়া নিজের চুলে হাত দিলো।রুদ্র না বলেছিলো মায়ার চুলগুলো ওর অনেক পছন্দের।তাহলে কেনো এভাবে অপবাদ দিয়ে গেলো।ছেলেদের সিডিউস করার মতো এতো বিশ্রী অপবাদ তাও নাকি মায়ার শখের চুল দিয়ে।
মায়া ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে কাঁচি বের করলো।তারপর নিজের কোমর সমান লম্বা চুল একবারে কেটে কাঁধ পর্যন্ত নিয়ে এলো।মায়া জোরে শ্বাস নিয়ে চোখদুটো বন্ধ করে ফেললো।মনে হচ্ছে সে তার কলিজার উপর ছুরি চালিয়েছে।মায়া পিটপিট করে চোখ খুলে নিজেকে দেখলো।বুঝ হওয়ার পর থেকে কোনোদিন ও নিজের চুল কাটেনি।উল্টো মাহেরা খান বিভিন্ন ধরনের হ্যায়ার প্যাক লাগিয়ে দিতো চুলে।মায়ার শখের চুলগুলো আজ ও নিজের হাতে কেটে ফেলেছে। যেখানে সে শখের মানুষকে হারাতে বসেছে সেখানে চুলের জন্য আফসোস করা বিলাসিতা বৈ কিছু নয়।
মায়া পুরো রাত ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে থাকলো।উঠতে ইচ্ছা করছে না।বারংবার নিজের চুলগুলো হাত দিয়ে ধরে দেখছে।আচ্ছা এই চুল দেখেতো আর কোনাো ছেলে সিডিউস হবে না। তাই না?
চুল হচ্ছে নারীর সবচেয়ে দুর্বলতার জায়গা।সেটা নিয়েই যখন কেও অপবাদ দেয় তখন আর সহ্য করার মতো শক্তি থাকে না।মায়া সকাল হওয়া পর্যন্ত একইভাবে বসে থাকলো ড্রেসিং টেবিলের সামনে।
,

রুদ্র ডাইনিং টেবিলে বসে আছে।বার উঁকিঝুঁকি দিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকাচ্ছে।মেয়েটা এখনো নামছেনা।কাল রাতে একটু বেশিই বারাবারি করে ফেলেছিলো মেয়েটার সাথে।আসলে আরশির সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা টা জেনে ফেলাই রুদ্র ওরকম রিয়েক্ট করে ফেলেছে।নিজেকে প্রটেক্ট করতে গিয়ে মায়ার সাথে ওরকম করছে।মায়া যদি ওকে কথা শোনাতো,কিন্তু কাল রাতে রুদ্র একেবারেই মায়ার কথা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলো না।তাই ওকেই কথা শুনিয়ে দিয়েছিলো। রাগ দেখিয়েতো একেবারে কক্ষ থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিলো।কিন্তু এটাও সত্যি রুদ্র পুরো রাত ঘুমোতে পারেনি ।মায়ার চুল নিয়ে বলা উচিত হয়নি ওর।তাও কতো খারাপ খারাপ কথা বলেছে।রুদ্রর খারাপ লাগছে। কিন্তু ইগোর জন্য কক্ষে গিয়ে ডেকেও আনতে পারছে না।রাফানা চৌধুরী রুদ্রর উঁকিঝুঁকি দেখে জিজ্ঞেস করলেন
-“কীরে এখনো নামলো না যে ও?ডেকে নিয়ে আয় ওঁকে।”

রুদ্র উঠতে চাইলো কিন্তু আবার এটিটিউড দেখিয়ে বসে থাকলো।রাফানা চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বললো
-“কোন দেশের প্রেসিডেন্ট ও?যে ওকে ডেকে আনতে হবে।নিজে নিজেই চলে আসবে।”

-“রুদ্র,কেনো সবসময় এমন করিস ওর সাথে?কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট না হলেও তোর বউ হয় ও।মায়া তো পারে নিজে না খেয়ে বসে থাকতে। আর তুই কি-না একটু ডেকে আনতে পারছিস না!”

রুদ্র কিছু বললো না।চুপচাপ খাওয়া শুরু করলো।
মায়া নিচে নেমে এসে রাফানা চৌধুরীর পাশে বসলো।রুদ্র মাথা তুলে তাকালো না। কালকে এমন জঘন্য একটা ঝগড়ার পর আজ মেয়েটার চোখে চোখ রাখতেও যে কষ্ট লাগবে।
রাফানা চৌধুরী মায়ার দিকে তাকালো। অবাক হয়ে বললো
-“চুল কেটে ফেলেছিস তুই?

রুদ্র রাফানা চৌধুরীর কথা শুনে মায়ার দিকে তাকালো। কাঁধ পর্যন্ত চুলগুলোয় সুন্দর করে বিনি করে সামনে এনে দিয়েছে।সাথে একটা ছোট্ট ক্লিপও লাগিয়েছে মাথায়। রুদ্র হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকলো মায়ার দিকে।কালরাতে ওর কথার কারণে বুঝি কেটে ফেলেছে চুলগুলো। কিন্তু নিজের এত শখের চুলগুলো ওর কথায় কী করে কাটতে পারে মায়া?
রাফানা চৌধুরী আবার জিজ্ঞেস করলো মায়াকে
-“চুল কেন কেটেছিস তুই?এতো সুন্দর চুলগুলো কেন কাটলি?”

-“আসলে মামনি এতো গরম পরছে।চুলগুলো খোলা রাখলে আরো বেশি গরম লাগে তাই কেটে ফেলেছি।”

-“শুধু গরম লাগার কারণে চুলগুলো কেটে ফেলবি?”

রাফানা চৌধুরী বকছে মায়াকে।রুদ্র তাকিয়ে আছে মায়ার দিকে।ইনোসেন্ট মুখ করে সব বকা শুনছে।রুদ্র আর খেতে পারলো না।গলা দিয়ে নামছে না একটা খাবারও।রুদ্রর বুক জ্বলছে।মায়া ঠিক কতটা যন্ত্রণা নিয়ে তার শখের চুলগুলো কেটে ফেলেছে। রুদ্র টেবিলে বসে থাকলো কিন্তু একটা খাবারও খেতে পারলো না।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here