গল্প #রোদ_পোহাবার_ছুতোয়
#পর্বঃ২৫
#নাজমুন_নাহার
সবুজ ঘাসের মতো ছাঁদের এককোণে বিস্তররুপে বিছিয়ে পড়ে আছে বর্ষার বাগানের বাহারি ফুলের থোকা থোকা পাপড়িগুলো। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে গাছের ডালে বসা ছোট্ট শহুরে চড়ুই পাখিটার।রাস্তার ধারে দূরে কোথাও নিয়নের টিমটিমে আলো ভাসমান। কেবলই অন্ধকার নামলো ধরণীতলে। আকাশে চাঁদ উঠেছে মস্ত বড়ো। মেঘহীন আকাশ হতে থেকে থেকেই গলে পড়ছে চাঁদের নৈসর্গিক আলো। বর্ষাকালে সচরাচর মেঘহীন রাতের আকাশের দেখা মেলে না। ব্যাপারটা বিরল। জানালার ফাঁক হয়ে জ্বলজ্বল করছে অদ্ভুত সুন্দর আলোক রশ্মি।
কোনো এক অজানা কারণবসত নাবিল বাড়িতে ঢোকার কিছু মূহুর্ত পরই কিছুদিন আগের ঘটে যাওয়া সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটির কথা দাদুকে, বড়মাকে জানানোর প্রয়োজনবোধ করলো। উদ্দেশ্যটা অবশ্য বর্ষাই৷ মেয়েটাকে সবকিছু পরিস্কারভাবে জানানো দরকার। নিজের অবস্থানের স্বচ্ছতা রাখা দরকার। এই এক পিছুটানের জন্য নয়তো সে বিভ্রান্ত হবে বারবার। দোটানায় আর আগাতে পারবে না সামনে। এসব এতো তাড়াতাড়ি জানানোর ইচ্ছে ছিলোনা নাবিলের। তবে ভাইয়ের কাছ থেকে তার পছন্দের মানুষের কথাটা জানবার পর থেকে নিজের ভেতর আর উত্তেজনা দমিয়ে রাখতে পারেনি সে। নিলয় তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলোর মধ্যে একজন। বর্ষার সঙ্গে শৈশব, যৌবন দেখা না হলেও মেয়েটার জন্য আলাদা একটা টান অনুভব করে নাবিল। ভীষণ মায়া হয় ওর জন্য। এই দু’টো মানুষ নিজেদের জীবনের একটা পূর্ণতা পাবে এটা ভেবেই তো বুকটা অন্যরকম প্রশান্তিতে ভরে উঠে। সবটা জানাতে পেরে বর্ষার জন্য ভেতরে পুড়তে থাকা একটা দিকের আগুন এই বুঝি নিভলো বলে৷ বর্ষার প্রতিক্রিয়া অতো জটিল ছিল না। নাবিল ওর চোখ পড়েছে। মেয়েটা স্বাভাবিক আছে। মুখে প্রকাশ না করলেও কেবল একজন মানুষই ওদের বিয়ের খবরটা শুনে অসন্তুষ্ট। বড়মা। হয়তো মনে মনে তিনি নাবিলকে বর্ষার সঙ্গেই কল্পনা করেছিলেন, ওর সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার আশা বেঁধেছিলেন নিজের মেয়েরুপী বর্ষাকে নিয়ে।
বন্ধুত্বের দায়বদ্ধতা থেকে রাতবিরেতে নিলয়ের ডাককে প্রত্যাখান করতে পারেনি বর্ষা। অবশ্য নিজেও আসতে চেয়েছে। নিলয়ের তাকে আর জ্যোৎস্নাকে নিয়ে আড্ডা দেওয়ার খায়েশ মেটাতে।
বর্ষা বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আড়ালে চাইলো পাশে থাকা প্রশস্ত পুরুষ অব্যয়টির দিকে। লম্বা শ্যামবর্নের সুঠাম দেহের অধিকারী এই নির্বিক মানুষটার জন্য ইদানীং একটু বেশি অস্বস্তি, আরক্ত ধরনের অনুভুতি উঁকিঝুঁকি মারে মনের এককোণে। আজকের ব্যাপরাটা তাই নেহাতই বিস্ময়কর লেগেছে। লোকটা যে সত্যি সত্যি বাড়ি পর্যন্ত আসতে সক্ষম হবে, ভাবেনি সে। রীতিমতো জলজ্যান্ত নিলয়কে সামনে দেখে লজ্জায় কেঁপেছে মেয়েটা।
নিলয় কাতায় ওর পানে। চুলে ব্যাকব্রাশ করতে করতে বলে,
“অস্বস্তি কাটিয়ে আজকে আদতেও কথা বলতে পারবো তো আমরা? তোমার অবস্থা দেখে আমার কিন্তু অসম্ভব হাসি পাচ্ছে। নিজেকে অপরাধীও লাগছে।”
বর্ষা ধ্যান ভাঙ্গিয়ে চায় আরক্তভাব লুকিয়ে। হাসে স্মিত। মেয়েটা আবারও খানিক বিভ্রম হয়। অনেকটা লম্বা শ্বাস টেনে চলে যায় আরেক ভাবনায়। আচ্ছা, এতো বড় সত্যটা জানার পরও এতোটা স্বাভাবিক কী করে লাগতে পারে বর্ষার? নাবিল ভাই বিবাহিত। সে ভালোবেসে বিয়ে করেছে নিরাকে। ওরা এখন থেকে দম্পতি। এই তেতো সত্যটা জানার পরও বর্ষার উচাটন লাগছে না। ধ্বংস হচ্ছে না সে। ওদের দু’জনের চোখে দু’জনের জন্য অসম্ভব প্রেম দেখা যায়। বর্ষার চোখে কি দেখা যায় না তা? তার ভালোবাসাটা তবে কেমন ছিল? নিষ্ঠুর, নির্লিপ্ত? হবে হয়তো। এইযে, বর্ষা জানতো সে নাবিলকে ভালোবাসে? তবে তার পাশে অন্য নারীকে বৈধ রুপে দেখার পরও কেন বুকের ভেতরটায় তোলপাড় হচ্ছে না? কেন রক্তশূণ্য হলো না আজ? স্নায়ুদের মরন হওয়ার কথা ছিল তো। হওয়াও উচিত। এমন হিংস্র সত্য জানার পর তার তো বিধ্বস্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার কথা ছিল। কথা ছিল বুকের মধ্যে সুউচ্চ কয়েকশো ইমারত ধ্বসে পড়ার। বুকের ভেতরটা ছিন্নভিন্ন হওয়ার কথা ছিল। কই, কিছুই তো হলো না? কেন হলো না? কাউকে ভালোবাসলে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে যেতে হয়। তবে সে কেন স্থির রইলো এখনও? কীসের বলে? তবে কি সে আবেগহীন? তার ভালোবাসায় কোনো স্বচ্ছতা ছিল না? যেমনটা আছে নিরার ভালোবাসায়? যে টানে নাবিল ভাই সেদিন ওকে প্রত্যাখ্যান করেছিল!
নিলয়ের দৃষ্টি আকর্ষণসূচক কাশিতে সম্বিত ফিরল বর্ষার। একধ্যানে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে অপ্রস্তুত হয়ে মেয়েটা বলে,
“আপনি আসলেই মাঝে মধ্যে ভীষণ অদ্ভুতভাবে চমকে দেন আমাকে। পরিচয়ের শুরু থেকেই এই অবস্থা। এই বাসে হুট করে চলে আসছেন, তো এই ভার্সিটির সামনে। আজ যে আসবেন, আগে কেন জানালেন না?”
নিলয় হাসল মাথা নুয়িয়ে। মেয়েটা আসলেই অবাক হয়েছে বেশ।
“জানালাম তো।”
“এরকম জানানো তো রোজই জানান। আপনি খুব খারাপ একটা লোক। সত্যি সত্যি আসবেন জানলে বড়মা একটু প্রিপারেশন নিতে পারতো।”
“বড়মা প্রিপারেশন নিতে পারতো না-কি তুমি? বিপদে ফেললাম না তো?”
“ধুর! সব সময় ফাজলামো। আপনি কাজটা আসলেই খারাপ করেছেন।”
“ডোন্ট ওয়ারি, খোঁটা দিবো না। ওতো পোলাও, কোরমা খাওয়াতে হবে না। ডিম ভাজিতেই রাজী।”
ওর রসিকতা ধরতে পেরে হাসল বর্ষা। কী ভেবে হঠাৎ শুধায়, “নাবিল ভাইয়ার বিয়েটা আমার কাছে কেমন অদ্ভুত লাগছে। ওরা তো বিয়ে করবে না বলেই বিয়ে থেকে পালিয়েছিল সেদিন। তাহলে?”
গাল ফুলিয়ে শ্বাস ফেলে কৌতুক করে হাসে নিলয়। বলে, “এদের কথা আর বলো না। এরা দু’টো হচ্ছে জলজ্যান্ত সার্কাস। যখন যেটা যেভাবে করতে মন চাইবে, সেভাবেই করে।”
“মানে?”
“মানেটা আপাতত বাদ দাও। এইটুকু জেনে রাখো, এদের লাইলি-মজনু ধরনের পীরিত থেকেই ঘটনা বিয়ে পর্যন্ত গরিয়েছে। কয়েকদিনের প্রেম, তবে একেবারে খাঁটি।”
এ পর্যায়ে দু’জনেই হেসে দেয়। ভেতরে ভেতরে কিছু হিংসে অবশ্য হচ্ছিলো বর্ষার। তবে সেটাও অতি সামান্য। বুকে জ্বলে যাওয়ার মতো না।
মাঘের শুপ্ত বিকেলের মতো বেশ কিছুক্ষণ পিনপতন নিরবতা। এই নীরবতা ভেঙ্গে হুট করেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্ন করে বসে নিলয়। রীতিমতো ঘাবড়ে দেওয়ার মতো প্রশ্ন।
“বিয়ে নিয়ে কী প্ল্যান তোমার?”
বর্ষা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে তাকায়। নিলয়ের প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক।
“প্ল্যান বলতে?”
হাসে নিলয়। “এইযে, কবে বিয়ে করবে, কার সাথে করবে? বাসা থেকে এই বিষয়ে কোনো প্রেশার পাও কি-না?”
নীরবে শ্বাস ফেলল বর্ষা। দৃষ্টি দুরে রেখে বলে, “বাবা-র এক বন্ধুর ছেলেকে নিয়ে বাসায় বেশ কিছুদিন ধরে কথা বলতে শুনছি৷ যদিও আমার এসবে কান দেওয়ার দরকার নেই। ওরা আমার অমতে আগাবে বলে মনে হয় না।”
“তো তোমার মতটা কী?”
হুট করেই একটা মৃদু হাওয়া এসে লাগলো মুখে। কী বিষন্ন এক হাওয়া। সেই হাওয়ার সঙ্গে কন্ঠ মিলিয়ে বর্ষা জবাব দেয়, “আপাতত একাই থাকতে চাই। সময় দরকার আমার। ওই লোক না-কি বিয়ে করে কানাডায় নিয়ে যাবে আমাকে। চেনা নেই, জানা নেই একটা মানুষকে হুট করে বিয়ে করেই দেশ ছেড়ে দেবো? ব্যাপারটা অদ্ভুত না?”
মাথা ঝাঁকায় নিলয়। শুধায়, “তোমার বাবা-র কি কানাডিয়ান ছেলে খুব পছন্দ? আই মিন, মেয়ের জামাই হিসেবে?”
বর্ষা শান্ত চোখে চায় একপলক। কী যেনো একটা খুঁজে পায় নিলয়ের কথার গোপনে। লোকটার আবেদনময়ী শব্দগুলো কিছু একটার ইঙ্গিত দিচ্ছে। খুব সুক্ষ কিছু একটার। মেয়েটা চোখ নামায়। কোনো এক অজানা অনুভুতির জোরেই কিছুটা ভীত হয়, আরক্ত হয় সে। সর্বাঙ্গে অদ্ভুত ভয় ভয় অস্বস্তি জন্মায়।
——
দাদাভাইয়ের ঘরের আটপৌরে কাঠের বড় দোলনাটায় হাত-পা ছড়িয়ে দায়সারা ভঙ্গিতে আধশোয়া হয়ে বসে আছে নাবিল। শুয়ে থেকেও শরীর স্থির থাকছে না তার। মুখ চলছে একটা স্ট্রবেরি ফ্লেভারের চুইংগামের সাথে। সাগরের ক্রিকেট বলটা হাতে। আপাতত এটাই তার বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম। দাদাজানের জ্ঞানসভায় বিশেষ কান দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করলো না। মনোযোগ দেওয়ার মতো ভদ্রলোকও সে নয়। তবুও একপলক চাইলো মহা অলস ভঙ্গিতে ওদের পানে। নিরার মাথায় হাত বুলাচ্ছেন শ্রদ্ধেয় দাদামশাই। নাতবউয়ের সাথে রাজ্যের আলাপ জুড়েছেন তিনি। হেসে কতো কতো অতীতের গল্প শোনাচ্ছেন। দাদীর গল্প, ষাট বছরের সংসারের গল্প, নবীন থেকে প্রবীণ হওয়ার প্রমোশনের গল্প, আরও কতো কী। নাবিল হতাশ শ্বাস ফেলে আপন কাজে মত্ত হয় ফের সে। বলটাকে চোখের সম্মুখে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলো কিছুক্ষণ। তারপর প্রস্তুত হলো সেটা দেয়ালে মারতে। শক্ত দেয়ালে আঘাত লেগে বার-বার সেটা তারই কাছে ফিরে আসছে আবার। এমনই চলছে শেষ একঘন্টা ধরে। দাদাজানের সামনে ওর এহেম বালকসুলভ খাপছাড়া আচরণে বিরক্ত হয়ে ক্ষণে ক্ষণে চোখ রাঙিয়ে তাকাচ্ছে নিরা। কিন্তু এই ছেলে সেসবে পরোয়া করলে তো? ইশতিয়াক এহসান হাসলেন ঠোঁট টিপে নাতি আর নাতবউয়ের গোপন খুনসুটি ধরনের যুদ্ধ দেখে। নীতিটা তার ছোটবেলা থেকেই ভয়ংকর দস্যি ধরনের। নীরবতা তার চোখের দুশমন। আজন্ম চঞ্চলতাকেই আগলে ধরেছে ছেলেটা৷ ভয়ংকর অস্থির প্রকৃতির হলেও কোনো এক অলীক কারণে, এই ছেলেকে সকলেই ছোট থেকে অসম্ভব স্নেহ করে। অগোছালো, স্বাধীন চলাফেরার এই পাজি নাবিলকে খুব অদৃশ্য কারণবসত কেউই এড়িয়ে যেতে পারে না। ইশতিয়াক এহসানও সেদিন পারেনি৷ ভেতরের শক্ত ক্ষোভের প্রাচীরটা সেদিনই ভেঙে চৌচির হয়ে গিয়েছিল। জন্মের দিন নাতিটার মুখ দেখে গম্ভীর মানুষটাও হার মেনেছিলেন ছেলের কাছে। ততদিনে ছেলে তার নিজের জীবন,সংসার নিজেই গুছিয়ে নিয়েছে। আর ফেরার প্রয়োজনবোধ করলো না।
আলাপচারিতায়র এক পর্যায়ে আলমারি থেকে একটা ছোট্ট কাঠের অলঙ্কারের বাক্স বের করলেন তিনি। পরের দৃশ্য প্রত্যাশিত। বাক্সের রহস্য উন্মোচন হওয়ার আগেই নাবিল তীক্ষ্ণ চোখে একপলক পেলব মুখের মেয়েটির পানে চেয়ে শান্ত স্বরে দাদার উদ্দেশ্যে বলে, “দাদীর জন্য তোমার মায়া-দয়া কম তা-ই তার অতি মূল্যবান শেষ স্মৃতিগুলো তুমি আরেকজনকে দিয়ে দিতে দু’বার ভাবছো না, তা আমি জানি। তোমার ভালোবাসা একেবারেই নেই তোমার বউয়ের প্রতি। আমি কিন্তু আবার এতো দিলদরিয়া লোক না। ভেবেচিন্তে দিবে। কারণ এইসব জিনিস প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বয়ে বেরানোর মতো মহামানব হওয়ার ইচ্ছে আমার নেই। এই প্রাচীন ন্যাকামির ধারেকাছেও আমি নেই। আমার বউয়ের জিনিস আমি আর কাউকে দিচ্ছি না। এসবের মালিকানা শুধু তারই। দেখা গেলো, বৃদ্ধ বয়সে টাকাপয়সা কমে আসলে তখন ছেলে-মেয়েদের উপর নির্ভর হয়ে থাকতে হচ্ছে। সব তাদের দিয়ে নিঃস্ব হয়ে আমার বউকে আমি পরনির্ভরশীল করে রাখতে চাই না। তারচেয়ে বরং এসব বিক্রি করে শেষ বয়সে দু’জন মিলে মালদ্বীপ একটু ঘুরে আসবো। বৃদ্ধ বয়সে হানিমুন। সেটাই কাজের কাজ হবে। অন্তত জীবনে আর কোনো অপূর্ণতা রইলো না। যেমনটা তোমার আর দাদীর ছিল। আজন্ম সন্তান আর সংসার নিয়ে পড়ে থাকলে হয় না। নিজেরও একটা অস্থির কোয়ালিটি লাইফ থাকা চাই, দাদু।”
নিরা ফের চাইলো চোখ রাঙিয়ে৷ ছেলেটার লাগামহীন কথাবার্তার মাত্রা ছাড়াচ্ছে দিন দিন। ইশতিয়াক এহসান হাসলেন মিটিমিটি। নাতবউয়ের হাতে স্বর্নের বালা দু’টো পরিয়ে দিতে দিতে বলেন, “তোর শাশুড়ীর পরার কথা ছিল এই অবশিষ্ট বালা জোড়া। নাবিলের দাদী তার জন্যই রেখেছিল। তার সৌভাগ্য হয়নি, তাই তোকে বঞ্চিত করলাম না।”
পরক্ষণেই আবারও হাত বুলালেন মাথায় কেমন মায়া করে। এক ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন করে বললেন, “তোর বাপকে নিয়ে ভয় পাইস না বোইন। জয়নাল মানুষটা অতো খারাপ না।আর দাদু বাঁইচা থাকতে এমনিতেও তোদের কেউ আলাদা করতে পারবে না৷ আর বেশিদিন পরের বাইত থাকনের কাম নাই৷ দেখি আমি, কী করন যায়।”
নাবিল শান্ত চোখে চাইলো৷ হাই তুললো মৃদুমন্দ হেসে। আরচোখে নিরাও চায় একপলক। দু’জনের চারজোড়া গভীর চোখে অল্পস্বল্প লাজুকতা আর পূর্নতার আনন্দ।
নিরা নিজের কোমল হাতে উনার চোখ মুছিয়ে দিলো। হেসে বলল, “আপনি এখন থেকে আমাদের সাথে ঢাকায় থাকবেন, দাদু? এখানে আর থাকতে হবে না। অনেক থেকেছেন বড় দুই ছেলের ছায়ায়। আমরা আর থাকতে দিচ্ছি না আপনাকে। আপনার শাসন, স্নেহ থেকে আমাদের বঞ্চিত করবেন না আর। বাকিটা জীবন ছোট ছেলের বাড়িতে কাটাতে হবে। শেষ বয়সে আপনার সেবাযত্ন না করতে পারলে আমরা বেঁচে থেকেও স্বস্তি পাবো না। না করবেন না দয়া করে।”
হাসলেন তিনি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“তোর শশুর দেশে ফিরে নিজে থেকে যতদিন না নিয়ে যেতে চায়, আমি কোথাও যাচ্ছি না।”
দাদুর অভিমান ধরতে পারে নাবিল। বলল না কিছুই। বাবা-ছেলের এই গোপন মান-অভিমান নতুন নয়। দু’জন দু’জনকে অসম্ভব ভালোবাসে, মনে করে। তবে প্রতিবার বাবা-র জেদের কাছে হেরে যায় তার সহজ- সরল দাদুটা।
উঠে দাঁড়ায় সে। নিরার দিকে আড়ালে একপলক চেয়ে নাবিল হাই তুলে অলস ভঙ্গিতে। দরজার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে হাওয়ায় বলে, “ঘুম পেয়েছে আমার। গেলাম।”
পাজি ছেলের ইশারা ধরতে পেরে নিরার অসম্ভব রাগ হলো। বেহেলাজ লোক! এমন একটা ভাব ধরছে যেনো সবসময় বউকে নিয়ে একই রুমে থেকে অভ্যস্ত সে। আজ নতুন করে অনিয়ম হচ্ছে। স্বাভাবিক সম্পর্কের মতো অধিকার খুব। মেয়েটা কন্ঠে আগুন ঝেরে বলল, “ঘুম পেলে ঘুমাও। আমি বর্ষার সাথে ঘুমাচ্ছি।”
নাবিল থম মেরে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে চায় হতাশা নিয়ে। একপলক দাদুর দিকে চেয়ে আবার নিরার দিকে কঠিন দৃষ্টি ফেলে থমথমে গলায় বলে, “আমার ব্লাক শার্টটা আয়রন করে দিয়ে যা। এক্ষুণি।”
হুকুম দেখো ছেলের। নিরা না চেয়েই নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দেয়, “এই মুহূর্ত ওটা আয়রন করার কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখছি না। যখন লাগবে, করে দিবো। পাঁচ মিনিটের ব্যাপার। এখন না করলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে না।”
দৃঢ় বালকসুলভ রাগ-অভিমান মুখে তার। নিরা সেদিকে চাওয়ার প্রয়োজনবোধ করলো না। প্রেয়সীর এহেম নিষ্ঠুর অবহেলায় ভেতরটা দবদব করে জ্বলছে নাবিলের। ক্ষোভের পাহাড় জমেছে মস্তিষ্কে। বাঁকা চোখে শেষ বারের মতো চেয়ে গম্ভীর মুখে প্রস্থান নিলো দাদুর ঘর থেকে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তুমুল বৃষ্টি। পরিস্কার জ্যোৎস্নার আকাশ ভেঙ্গে হুট করেই মাঝ রাত্তিরে নামলো বর্ষণ। অঝোর প্রকৃতি ভারী করা বৃষ্টির সাথে গগন কাঁপানো বাজ পড়ার শব্দ। ধুপধাপ আওয়াজে ঘুমের ঘোরেই খানিক নড়েচড়ে উঠল নাবিল। গায়ের উপর কাঁথার উষ্ণতা অনুভব হতেই চোখ মেলে পিটপিট করে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার দরুণ ঘরের টিমটিমে ড্রিমলাইটটারও আলো নেই৷ ঘুটঘুটে অন্ধকারেও কাঁচের জানালা ভেদ করে খানিক পরপর আকাশের যে ঝলকানো আলো পড়ছে, তা দিয়েই আবিষ্কার করা গেলো একটা পেলব মুখের রমণীর উপস্থিতি। বারান্দার দরজা মেলে তাতে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অলস ভঙ্গিতে মেয়েটা। শোঁশোঁ করে বইছে এলোমেলো দিকের হাড়কাঁপানো বাতাস। নাবিল অবাক হলো না, উঠে বসলোও না৷ ওভাবেই চেয়ে রইলো সেদিকে। অদ্ভুত এক বিষন্ন ভঙ্গি মেয়েটার দাঁড়ানোর। অকস্মাৎ ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু হয়। বৃষ্টির পানির ঝটকা এসে ঢুকছে ঘরে। নিরা যত্রতত্র দরজা লাগিয়ে দেয়। ফিরে আসে রুমে। নাবিল ওর উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে ফের৷ নিরা খাটের কার্নিশে বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে ওর পাশে। চুলে হাত বুলিয়ে আলতো করে হুট করেই চুমু খায় অভিমানী নাবিলের কপালে। ভেতরে ভেতরে হাসল ছেলেটা। বাপের মতো শুধু বাইরে থেকেই যত জেদ মেয়েটার। তবে একটা ছোট্ট চুমুতে তার সর্বাঙ্গ এলোমেলো, ভেতরটা তোলপাড় করে দিলেও চোখ বুঁজে অনড় রয় পূর্বের ন্যায়। অটুট রাখে আপন অভিমান। নিরা গুটিশুটি হয়ে ওর পাশে শুলো। নাবিলের হাতটা টেনে নিজের কোমরে রাখলো নিজেই। অসংযমবসত হাত দু’টো শক্ত হয়ে এলো নাবিলের। ইচ্ছে করছে এক্ষুণি চোখ মেলে জোরেশোরে একটা চুমু খেয়ে মেয়েটার সব ক্রোধে পানি ঢেলে দিতে। এতো ভদ্রতা, নিয়মানুবর্তিতা আর মেনে নেওয়া যাচ্ছে না৷ নয়তো ঠাটিয়ে দু’টো মেরে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, ” একলা ঘুমিয়ে বিরহ করার জন্য তোকে বিয়ে করেছি, বেয়াদব?” কিন্তু বলল না। দমিয়ে রাখলো নিজেকে,নিজের অভিমানকে।
“তুমি কি বাচ্চা, নাবিল ভাই?”
কী ধূর্ত! ফাজিলটা ঠিকি ধরে ফেলেছে ঘুমিয়ে থাকার চোরা অভিনয়টা। নাবিল তবুও জবাব দিলো না। নিরা ফের বলে, “জেগে আছো সেটা জানি। খামোখা ঘুমিয়ে থাকার ভান ধরবে না আমার সামনে। আমাকে পাশে দেখতে না পেলে বর্ষা খোঁজ করতে চলে আসবে। বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না। উঠো।”
নাবিল দৃষ্টি মেলে চাইলো গাল ফুলিয়ে। চোখে-মুখে সে কী ক্ষোভ তার। চোখ খুলেই আচমকা কিছু না বলেই হামলে পড়ল নিরার বুকে। সজোড়ে প্রচন্ড ক্রোধের সাথে কামড় বসিয়ে দিলো নিরার তুলতুলে ঘাড়ে। মেয়েটা ওর কোমল অভিমান ধরতে পেরে হাসে। আর বাঁধা দেয় না। ব্যথা পেলেও তা দমিয়ে রাখলো। দীর্ঘসময় ধরে সেই অভিমানী দাঁত বসিয়ে রেখে মেয়েটার নরম শরীরে দাগ করে তবেই ছাড়ল নাবিল। নিরা হতাশ শ্বাস ফেলে ব্যথাতুর জায়গাটায় হাত রেখে স্বাভাবিক স্বরে শুধায়, “কমেছে জেদ?”
শান্ত চোখে চায় নাবিল। সেই ছলছল দৃষ্টিতে কতো চাওয়া, কতো আকাঙ্ক্ষা, কতোই না কাতরতা! সে নীরবে মাথা দোলায় দু’দিকে। নিরা হাসে মৃদু। শান্তনাবানীর মতো করে বলে, “বিয়েটা সকলের অমতে করলে-ও সংসারটা শুরু করার আগে পুরো ঝামেলাটা মিটমাট করা দরকার। আমি জানি আমরা বৈধ, তা-ও প্লিজ আরেকটু অপেক্ষা করো। এখনও ব্যাপারগুলো ভীষণ ঘোলাটে। এই মুহূর্ত বাবাকে বিষয়টা জানানো মানে বড়ো ধরনের বোকামি। আমরা তো আছি একসাথে, তাই না? বিয়েটা তো হয়েছে আমাদের। এখন চাইলেই জোড়াকে ভাঙা যাবে না। দূরে সরানো যাবে না আমাদের। ব্যাপারটা ওদের জন্য জটিল। শুনছো তুমি? এদিকে তাকাও।”
নাবিল চাইলো বিষন্ন চোখে। লালিত্য ঠোঁটে তখনও ভীষণ অভিমান লেপ্টানো। নিরা ওর শক্তপোক্ত হাতটা টেনে নিজের বুকের কাছে আনে। নরম হয়ে বলে,
” চিন্তা করো না,সব ঠিক হয়ে যাবে খুব শীগ্রই।”
“আর কতো শীগ্রই? তুই বুঝতে পারছিস না। আমি মরে যাচ্ছি তোকে ছাড়া,নিরা!”
মৃদু আওয়াজ করে হেসে ফেলল নিরা। একটু চেয়ে চোখ বুঁজে আবারও হাসে। ওর গালে হাত বুলিয়ে বলে, “তুমি আর কতো অত্যাচার করবে আমাকে,নাবিল ভাই? কী-ই বা বয়স আমার? এই অল্প বয়সেই তোমার বালকসুলভ দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে জীবনটা প্রবীণ করে ফেলছি। কোথায় যাবো আমি এই ছেলেকে নিয়ে! এই বাচ্চা ছেলেটাকে কী করে বিয়ে করে ফেললাম সেটাও ভেবে পাই না আমি। কী হবে আমার মাবুদ! অসম্ভব জ্বালায় এই ছেলে আমাকে।”
ধীরে ধীরে অভিমান মুছে হাসির রেখা ফুটে উঠে নাবিলের লালিত্য ঠোঁটে। অবুঝ কন্ঠে ম্যাকি রাগ ঝেরে বলে, “তুই একটা নিকৃষ্ট বউ।”
“ঠিক আছে। আমি একটা নিকৃষ্ট বউ। নাবিল এহসানের নিকৃষ্ট বউ আমি।”
নাবিল কোমরে হাত বুলিয়ে বলে,
“অভিশাপ দিলাম, তোর একসাথে ছয়টা বাচ্চা হবে। এদের যন্ত্রনায় তুই অতিষ্ঠ হয়ে যাবি। পোকার মতো কিলবিল করবে তোর জীবনে ওরা। আমাকে শাস্তি দেওয়ার শোধবোধ মোটেও ভালো হতে যাচ্ছে না।”
বিদ্যুৎ ফিরে এসেছে। ড্রিম লাইটের আলো পড়েছে ঘরে। আলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শব্দ করে হেসে ফেলল নিরা। বলল, “মাত্র ছয়টা? ব্যাপারটা তবে আসলেই খুব হতাশাজনক! ছয়টা বাচ্চা দিয়ে কী হবে? আমি তো চাই বারোটা হোক।”
নাবিল বোয়াল মাছের মতো লাফিয়ে উঠলো। দৃষ্টিতে বিস্ময়ভাব। “বারোটা সামলাতে পারবি বেডি তুই?”
নিরা ওর পুরুষালী বুকে নিজের মাথাকে ঠাই দেয়। তৃপ্তির শ্বাস ফেলে বলে,
“তুমি একাই তো বারোটার সমান। তোমাকে সামলাতে পারলে ওদেরকেও পারবো। আফ্টার অল, তোমারই রক্ত। এক্সপিরিয়েন্স আছে।”
নাবিল মাথা ঝাঁকায় অবিশ্বাস্য ভঙ্গিতে। চায় ছোট ছোট সন্দিহান চোখে। নিরা ওর চাওয়ার ধরন দেখে হাসে আবারও। কী নিষ্পাপ সেই চাহুনি! ছেলেটার পানে চাইলেই কেন যেনো নিরার বুক ভেঙ্গে আসে। ইচ্ছে করে খুব যত্ন করে বুকের মধ্যে জায়গা করে দিতে ওকে। সারাক্ষণ যত্ন চাই যত্ন চাই ভাব এই ছেলের। বেড়ালের স্বভাব।সর্বক্ষণ শুধু উষ্ণ আদরের অভিলাষ! নিরা মায়া করে হেসে চোখে-মুখে হাত রাখে ওর। প্রেয়সীর নরম স্পর্শের প্রশ্রয়ে চোখ বুঁজে নাবিল। নিরা বার-বার তাকায়। লোকটার ঝিলের মতো গভীর চোখজোড়ায় কী বিস্ময়কর মায়া ঢেলে দিয়েছেন বিধাতা নিজ হাতে। শরতের কাশফুলের মতো শুভ্র, স্বচ্ছ একটা মুখ। আহা! কতো পবিত্রতা ও মুখে, কতো আহ্লাদ, কতো নিষ্পাপভাব! এই একটা চেহারায় তাকালে পৃথিবীর সকল ক্লান্তিভাব এক নিমিষেই গুচে যাওয়া সম্ভব। সম্ভব শরীরের প্রতিটা নিউরনের সচল হওয়া। সে একটা জাদু! তার উপস্থিতি জাদু, তার কথা জাদু, তার সংস্পর্শ জাদু। বুকে নিযুত মোহতা ভরে রাখা জাদুর পুরুষ নিরার এই নাবালক মনের পুরুষটা! যে হাসলে হাসে পাহাড়, সমুদ্র, ঝর্না। অভিমান করলে ভেঙ্গে আসে সুবিশালদেহী আকাশও। তার লালিত্য আবেদনময় ঠোঁটে যেনো সবই মানায়। সব!
[রিচেক করা হয়নি। সময় পাইনি।]

