#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_১৪
#জান্নাত_সুলতানা
“ব্যাথা পেলি কী করে?”
আফি সানায়ার কাঁধে ব্যাথা উপশমের একটা জেল লাগাচ্ছে। এটা এনেছে বড়ো মামির কাছ থেকে। আর এনেই কিছু না বলে সানায়ার কাঁধ উন্মুক্ত করে ঔষধ লাগাতে শুরু করে দিয়েছে। সানায়া অবাক। হতভম্ব হয়ে নিশ্চুপ বসে নিজের মনে অংক মেলাল নির্ভাণ ভাই নিশ্চয়ই আপুকে বলেছে।
“তুমি যেহেতু ঔষধ লাগাতে এসছো তার মানে তুমি জানো। তো আবার জিজ্ঞেস করছো কেনো?” সানায়া আফির প্রশ্নের উত্তরে ফুসফুস করে বললো। আফির থেকে কোনো জবাব এলো না। আফি নিজের মতো ঔষধ লাগিয়ে বললো, “বাড়ির সামনে দোকান এসছে অনেক কিছুর। একটু পর যাবো আমরা।”
“আমিও যাব?”
সানায়া অবাক হয়ে বলে উঠলো। তার বিশ্বাস হচ্ছে না। সত্যি নির্ভাণ ভাই তাদের ওই এতো মানুষের সমাগমে যেতে দিবে? আফি সানায়ার কথায় মজা করে বললো,
“না তোর ভূত।”
সানায়ার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জানতে চাইলো,
“কী কী দোকান এসছে আপু?”
“খাবার দোকান এসছে অনেক গুলো। আর কিছু কসমেটিকস দোকান এসছে সেহের বললো।”
কসমেটিকসের দোকান এসছে শুনে সানায়ার ভীষণ খুশি হলো। আজ সেই এই খোলা দোকান থেকে চুড়ি কিনবেই কিনবে। একদম ছোট থাকতে যখন তারা একবার এই মাহফিলে এসেছিলো তখনও চুড়ির দোকান বসেছিলো। ছোট মামা তাকে এক মুঠো কাঁচের চুড়ি কিনে দিয়ে ছিলেন। কিন্তু সানায়ার ভাগ্য খুবই খারাপ। সে তখন ছয় বছরের আর হাত এতোটাই চিকন ছিলো তার হাতে ওই চুড়ি পরে থাকা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। হাত থেকে খুলি পরে তিনটি চুড়ি ভেঙে গেলো। আরোরা জাহান তখন রাফা কে চুড়ি গুলো দিয়ে দিয়েছিলেন। রাফা এখন যেমন দেখতে শরীর স্বাস্থ্য তেমন তখনও ছিলো। ওর হাতে চুড়ি গুলো মাপে হওয়াতে মা চুড়ি গুলো ওই মেয়ে কে দিয়ে দিয়ে ছিলো। সানায়ার এই কথা মনে পড়লো এখনো কান্না পায়।
—–
ছাঁদে গেলে বাড়ির পেছনে মাহফিলের প্যান্ডেল আর রাস্তায় বসা দোকানগুলো পরিষ্কার দেখা যায়। সানায়া ছাঁদে কাপড় মেলতে এসেছিল। বালতি রেখে সে আনমনে রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে এসব দেখতে লাগলো। যেহেতু বাড়িটা তিন তলার তাই ঘাড় উঁচিয়ে কেউই ওপরে তাকাচ্ছে না। এতে সানায়ার সুবিধা হলো। সানায়া খেয়াল করলো নিচে সবাই এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করে কাজে ব্যাস্ত। কিন্তু সবার মাঝে নির্ভাণ কে সে কোথাও দেখতে পেলো না। কৌতূহলবশে সে মনোযোগ দিয়ে খুঁজতে লাগলো। পরক্ষণেই সে টের পেলো ছাঁদে সে ছাড়াও আরও কেউ আছে। সানায়া ভয় পেলো। ভূত টুত না-কি? গ্রামে এই ভরদুপুরে ছাঁদে আসতে বুঝি এইজন্যই ছোট মামি নিষেধ করেছিল! সানায়া ভাবল পেছন না তাকিয়ে সোজা এক দৌড়ে ছাঁদ থেকে নেমে যাবে। কিন্তু হলো তার উলটো। ধপাস করে পা বেঁধে পড়তে পড়তে সে একটা কিছু আঁকড়ে ধরলো আঙুলের ভাজে শক্ত করে।
ভয়ে চোখ বন্ধ করে ঠোঁট কামড়ে ধরে। ভূত কী তাকে ধরে ফেললো? এখন কী ছাঁদ থেকে ফেলে দেবে? না-কি ঘাড় টা মটকে দেবে? চুলের টাওয়াল মাথা থেকে খুলে পড়েছে অনুভব করলো। সে তবুও ভয়ে চোখ খুলতে সাহস পেলো না।
“ছাড়।”
চোখ বন্ধ করে অবস্থা শুনতে পেলো শরীরের রক্তহিম করা কণ্ঠস্বর। পরক্ষণেই দারুণ সেই পরিচিত সুগন্ধি টা নাসারন্ধ্রে গিয়ে ঠেকল। চোখ খুললো পিটপিট করে। হাতের দিকে তাকিয়ে সর্বপ্রথম চমকে উঠলো সানায়া। ঝট করে হাত সরিয়ে নিলো। সাদা শার্টে শেওলার দাগ ঝকঝক করছে। ভয় পেলো সানায়া। নিশ্চয়ই থাপ্পড় দিবে নির্ভাণ ভাই। সেদিন কফি ফেলে দিলো গায়ে। আজ আবার শেওলা। সাদা রঙ নির্ভাণ ভাইয়ের ফেভারিট। সেদিনের কফিও সাদা টি-শার্টে ফেলেছে আজ শেওলা ও সাদা শার্টে।
“সব সময় কোনো না কোনো আকাম তোর দ্বারা হবেই। এই দুপুরে এখানে কী? যা নিচে।”
কপাল ভালো শুধু ধমক দিয়েছে। সে তো ভেবেছে আজ বুঝি নির্ভাণ ভাই তাকে ধাক্কা মেরে সত্যি ছাঁদ থেকে ফেলে দিবে। সে তো মানুষটার পছন্দের জিনিস নষ্ট করছে। যদিও ইচ্ছে করে করছে না। সানায়া মাথা নুইয়ে টাওয়াল হাতে নিয়ে বারকয়েক আওড়াল, “সরি।আপনি বললে আমি শার্ট এক্ষুনি পরিষ্কার করে দেব?”
“দরকার নেই।”
নির্ভাণ গম্ভীর স্বরে কথা টা বলেই অন্য পাশে চলে গেলো। সানায়া বালতি নিয়ে দৌড়ে লাগাল। এলোমেলো চুল কোমরের নিচ পর্যন্ত ছুঁয়েছে। বয়সের তুলনায় চুলটা মেয়েটার একটু বেশি লম্বা হয়েছে। তন্বী রহমান ভীষণ যত্ন করেন যে। নির্ভাণ পেছন থেকে হঠাৎ বলে উঠলো, “চুলের পানি ভালো করে শুকাবি।”
“আচ্ছা।”
সানায়া মাথা নেড়ে এবার যেনো পালিয়ে গেলো। নির্ভাণ নিজের হাতের কব্জির একটু ওপরে তর্জনী আঙুল টা ছুঁয়ে দিলো। চোখের সামনে আঙুল টা নিতেই দেখা মিললো এক ফোঁটা জল চিকচিক করছে। সে অপলক তাকিয়ে রইলো সে জলের ফোঁটার দিকে।
——
দুপুরের খাবার সবাই খেয়ে নিয়েছে। মেয়েরা সবাই আসরের পরে দোকানের ওইদিকে যাবে। তখন পুরুষ মানুষেরা নামাজে থাকলে তেমন সমস্যা হবে না। বাড়ির পুরুষরা যদিও তখন বাড়িতে ছিলো না। তাই মহিলারা সবাই মেয়েদের বোঝাচ্ছে কোনো সমস্যা যেনো ওরা তৈরী না করে। তন্বী রহমান কথা বলার এক পর্যায়ে সানায়া কে উদ্দেশ্য করে বললো,
“একদম আলাদা হবে না সবার থেকে।”
“আমি ছোট না এখনো মামুনি।”
“খুব বড়ো ও না।”
রাফার মা বলেন। সানায়া কে এখানে ও সবাই খুব আদর করছে। সানায়া বুঝে না কেনো সবাই তাকে এতো আলাদা করে দেখে। সবচেয়ে ছোট সদস্য রাহা প্রিয়ম এবং সেহের হলে-ও বাচ্চামিতে সানায়ায় ছোট। সহজ সরল এবং সহজেই ঝামেলায় পড়ে যায়। এইজন্যই তন্বী রহমান আরও চিন্তিত।
—–
আসরের আজান পড়েছে৷ একটু পর-ই পুরুষ মানুষ সব নামাজে চলে গেলে ওরা যাবে। সবাই রেডি হয়ে বসে আছে। রেডি বলতে এই মাথায় ঘোমটাটা আর মুখে মাস্ক পরে। সবাই লিভিং রুমে। আফি সানায়া কে রেডি হওয়ার সময় দেখেনি। তাই তন্বী রহমান কে জিজ্ঞেস করতেই মা জানলো সানায়া ওনার রুমে। আফি অবাক হলো। অসময়ে মায়ের রুমে কী করছে ও? আফি সবাই কে অপেক্ষা করতে বলে নিচে গেস্ট রুমে এলো। সানায়া গুটি-শুটি মেরে একদম কম্বল মুড়ি দিয়ে শুধু আছে। আফি অবাক হলো। তবে এই মূহুর্তে তার রাগ হলো। সবাই ওর জন্য বসে আছে ও এভাবে শুয়ে আছে? বেয়াদব মেয়ে।
“তুই জানতি না আমরা এমন সময় বেরুনোর কথা?”
আফির রাগান্বিত স্বর। সানায়া কম্বল সরিয়ে মুখ টা একটু বের করলো। চোখ দু’টো ফুলে গেছে। আফি অবাক। হঠাৎ করে চিন্তা এসে ভর করলো মাথায়। দ্রুত রাগ ফেলে ওকে জিজ্ঞেস করলো, “কী হয়েছে তোর? জ্বর? এমন লাগছে কেনো?”
“আমি যাব না আপু। তোমরা যাও।”
সানায়া কোনো কথার জবাব না দিয়ে শুধু বললো। আফি ওর কপালে গায়ে হাত দিয়ে চেক করলো। আশ্চর্য! গায়ে জ্বর নেই। তাহলে যাবে না কেনো?
“জ্বর নেই। তাহলে যাবি না কেনো?”
আফির দ্বিতীয় দফা প্রশ্ন করতে করতে ওকে জোর করে শোয়া থেকে তুললো। সানায়া ঠোঁট উলটে কেঁদে ফেললো হঠাৎ করে। আফি আহাম্মক বনে গেলো। ওর কান্না দেখে আফি হতভম্ব হয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলো। সানায়া এমন করে কখনো কাঁদে না। অন্তত এভাবে কখনোই না। যখনই মায়ের কথায় বেশি মন খারাপ করবে তখন অভিমান করে ঘন্টা দুই একা থাকে। একবার প্রথম আফি ওকে কাঁদতে দেখেছে যখন ওকে ওর মা প্রথমদিন স্কুল নিয়ে যায়নি। দ্বিতীয় বার যখন গত মাসে ওর মেয়েলী প্রবলেম টা প্রথমবার হয়। আর আজ আবার। আফির বুঝতে বেশি অসুবিধা হলো না। সেদিন খুব কেঁদেছে সানায়া। সবাই বুঝিয়েছে তবেই সে শান্ত হয়েছিল। আফি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। অভয় দিয়ে বললো,
“কিছু হবে না চল।”
“না আমার কেমন লাগছে।”
সানায়া একগুঁয়ে হয়ে বসে থাকে মাঝেমধ্যে। আজো তাই হয়েছে। কিছুতেই সে এই অবস্থায় বাহিরে যাবে না। আফি নিজেও যাবে না যখনি বললো তখনই ওর বায়না শুরু হলো।
“প্লিজ তুমি যাও। আমার জন্য সবার যাওয়া বন্ধ হয়ে যাক আমি চাই না।” আফির কাঁধ ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে একটু থেমে আবারও বললো,” আর শোনো, আমার জন্য চুড়ি এনো। আমি অপেক্ষা করব।”
আফি দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। কাল থেকে যাবে যাবে করে পুরো বাড়ির সবাইকে রাজি করাল আর আজ ও যেতে পারছে না, এটা ভেবে আফিরও ওর জন্য খারাপ লাগলো। আবার সানায়ার কথায়ও যুক্তি আছে। আফি ওকে রেস্ট করতে বলে চলে গেলো। যাওয়ার আগে বলে গেলো বাকিদের ও ম্যানেজ করে নেব। সানায়া যেনো এটা নিয়ে লজ্জায় অস্বস্তিতে না পড়ে।
#চলবে…….
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
