#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_২৩
#জান্নাত_সুলতানা
বান্ধবীদের সাথে দাঁড়িয়ে নাক টেনে টেনে কাঁদছে সানায়া। পরীক্ষা শেষ ভীড় ঠেলে বেরিয়ে আসতে গিয়ে জুতোর বেল্ট ছিঁড়ে গিয়েছে। ব্যথায় মুখ বিবর্ণ। জুতো ছিঁড়ে এখানেই শেষ নয় সাদা পায়ে মূহুর্তেই লাল রেশ দেখা দিয়েছে। সব সময় স্কুলের জুতো গুলোই পরা হয়। আজ পরীক্ষা বিধায় ছোট মামার কিনে দেওয়া নতুন জুতো টা পরে এসেছিল। এখন মনে হচ্ছে না পরাই ভালো ছিলো। নির্ভাণ গিয়েছিল ওর জন্য ঠান্ডা কিছু পানীয় নিতে। এসেই ওর অবস্থা দেখে অস্থির হলো। রাগ সাথে নিজেকে অসহায় বোধ করলো বড্ড।
“দুমিনিট পর বেরুলে খুব ক্ষতি হতো না।”
কঠোর ধীরে কণ্ঠে বললো নির্ভাণ। সানায়া অবুঝ কান্না মিশ্রিত টলমল চোখে চেয়ে বলে উঠলো,
“আমার জুতো।”
বলতে বলতে কাঁদে মেয়ে টা। আশেপাশের অনেকেই তাকিয়ে দেখছে ওদের। নির্ভাণ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। নিজের হাতে থাকা কোল্ড ড্রিংকস টা বাড়িয়ে দিয়ে বললো, “বাইকে বোস।”
সানায়া কী করবে বুঝে পেলো না। হাত বাড়িয়ে নিলো ড্রিংকস টা। নির্ভাণ ওর হাত থেকে ফাইল টা নিয়ে নিজে বাইকে ওঠে বসলো। সানায়া আর দেরি করে না। বান্ধবীদের বিদায় দিয়ে ওঠে বসলো পেছনে। নির্ভাণ কিছু টা পথ গিয়েই বাইক থামাল একটা শপের সামনে।
সানায়া অবাক। নির্ভাণ ওকে নিয়ে শপের ভেতরে এলো। একজন সেলসম্যান এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, “কার পায়ের জুতা লাগবে স্যার?”
নির্ভাণ আঁড়চোখে সানায়ার দিকে চাইলো। সেলসম্যান বুঝে ফেললো চট করে। সানায়ার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেঁসে নিয়ে জুতা দেখা শুরু করলো। সানায়া বুঝে না এসব। আফিই নয়তো বড়োরা কেউ সাহায্য করে এসব ব্যাপারে। নির্ভাণ বুঝলো হয়তো ওর চোখের ভাষা। তাই তো নিজে থেকে বললো, “তুই পছন্দ কর শুধু।”
“কোন টা করব? সব গুলো সুন্দর।” সানায়া গুনগুন করে। নির্ভাণ দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। নিজেই এক জোড়া কালো রঙের জুতো পছন্দ করলো। দাম শুনে সানায়ার চোখ কপালে উঠলো। সে কিছুত এই জুতো টায়াল দেবে না। দোকানদার বারকয়েক বলে নিজেই পরিয়ে দিতে এগিয়ে এলো। তবে নির্ভাণ তার আগেই পেছন থেকে ছেলেটার কলাম টেনে ধরলো। রাগে চোখ-মুখ লাল হয়ে গেলো মূহুর্তেই। সানায়া বুঝলো না হঠাৎ আবার কী হয়ে গেলো। নির্ভাণ ওকে একটা চেয়ারে বসিয়ে নিজে হাঁটু গেঁড়ে ওর সামনে বসলো। খুব যত্ন নিয়ে আলগোছ জুতো টা পায়ে পরাল। আর পায়ের সাইজের সাথে একদম ফিট। সানায়া অবাক। চোখের এতো পাওয়ার এই লোকের? সেদিন চুড়ি কিনে ফেললো হাতের মাপ অনুযায়ী আর আজ জুতো? কিয়ৎক্ষণ বাদেই সানায়ার মানসপটে ভেসে উঠলো সেদিনের বলা নির্ভাণের সেই উক্তি,”শুধু হাতের না। তোর অনেক কিছুর সাইজ জানা আমার।” যদিও সেদিন সে এই কথার মানে বুঝেনি৷ তবে আজ বুঝতে পারছে।
——-
সময় গড়াচ্ছে। কিন্তু স্মৃতি গুলো মনে এখনো তাজা। একান্ত চোখ বন্ধ করলেই যেনো দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে সেই পাঁচ ফিট্ দুই ইঞ্চি মেয়েটার চঞ্চল হরিণীর ন্যায় চক্ষুদ্বয়। কত চেষ্টা ভুলে যাওয়ার প্রয়াস। তবুও বারবার মনে করিয়ে দেয় সেই সকল স্মৃতি যা তাকে অস্থির করে তুলে। মন আঙিনায় উঁকিঝুঁকি দেয় বিষণ্ণতা। ব্যাকুল হয় হৃদয়। তবুও সে-সব যেনো বৃথা। তাকে কষ্ট দিতেই সে-সকল স্মৃতি বেশি পছন্দ করে বোধহয়। সেইজন্যই তো ভুলে থাকা যায় না সে-সব।
যুবকের ভাবনা শেষ হওয়ার আগেই দরজায় কেউ উপস্থিত হলো এসে। আনমনা সে খেয়াল করে না তা।
“ভাইয়া।”
ডাকের সাথে সাড়া দেয় “হ্যাঁ, আফি বল।” পরক্ষণেই তব্দা খায়। নিজের ভুল বুঝতে পেরে তড়িঘড়ি করে একান্ত শুধরে নিয়ে বললো, “কিছু বলবি রাফা?”
“ভাইয়া বড়ো চাচ্চু ডাকে তোমাকে।”
একান্ত তৎক্ষনাৎ ল্যাপটপ রেখে ওয়াশরুমের উদ্দেশ্য যেতে যেতে রাফাকে বললো, “তোর চাচ্চু কে গিয়ে বল, ভাইয়া আসছে।”
একান্ত যখন নিচে নেমে এলো তখন লিভিং রুমে বাবা চাচা সবাই আছে। সে গিয়ে বসলো সেখানে সবার মাঝে। একান্তর বাবা বললেন, “তোমার তো যাওয়ার সময় হয়ে এসছে৷ একবার ঘুরে এসো ফুপির বাড়ি থেকে।”
“আমিও যাব আব্বু।” রাহার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ। সেহেরের জন্মদিনে অনুষ্ঠান রাখা হয়েছে। সবাই কে যেতে হবে।
“তাহলে তুমি ওদের নিয়ে যাও। আমরা দু’দিন পর অনুষ্ঠানে উপস্থিত হবো৷ এরপর ফিরে আসবো এক সাথে।” বাবার কথা পছন্দ হয়নি একান্তর। এক সাথে গেলে ভালো হতো বলে ধারণা তার। তবে বাবার সাথে ঝামেলা আছে তার। তাই কথা বাড়ায় না আর।
——
নতুন বছরের শুরুতেই সেহেরের জন্মদিন। এবার সেহের রেজাল্ট ও টপ করেছে। পুরো স্কুলে সে দ্বিতীয় হয়েছে। তবুও তার মন খারাপ কেননা সে প্রথম হতে পারেনি। এনিয়ে মনখারাপ যেনো গাঢ় না হয় সেইজন্য তার জন্মদিন বেশ ঝলমলে উৎযাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিজাম সিদ্দিকী। বাড়ি ভরতি মেহমান। সানায়া প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষা শেষ বাড়ি ফিরে গেইটে অনেকগুলো জুতো দেখে একটু অবাক হলো। তবে এক জোড়া মেয়েলি জুতো নির্ভাণের লোফারের পাশে দেখেই মস্তিষ্ক চিড়বিড় করে উঠলো। সেই মেয়েলি জুতো জোড়া লাত্থি মেরে ফেলে দিলো অদূরে। ফুসফুস করে নিজের জুতো খুলে রাখলো নির্ভাণের জুতোটার একপাশে।
“পরীক্ষা কেমন হয়েছে?”
চিরপরিচিত রাশভারী কণ্ঠস্বর শুনেই থমকে গেলো সানায়া। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। নির্ভাণ ফোনের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখেছে। সানায়া একবার ভাবল নির্ভাণ ভাই তাকে ওই কাজ করতে দেখেছে পরক্ষণেই ভাবলো তিনি ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে হয়তো দেখেনি। নিশ্চুপ কয়েক সেকেন্ড পেরুতেই সে গুনগুনিয়ে বললো, “হুঁ, ভালো হয়েছে।”
নির্ভাণ এবার দৃষ্টিপাত করলো ওর দিকে। তীক্ষ্ণ চাহনি তার। সানায়ার বুকের ভেতর টিপটিপ করে। তিনি কী কিছু দেখে ফেললো! ভীত সে আঁড়চোখে জুতোর দিকে চাইলো। নির্ভাণ এরমধ্যে আবার বললো, “হুম, যা।”
সানায়া গুটিগুটি পায়ে ভেতরে গেলো। ও দৃষ্টি আড়াল হতেই নির্ভাণ দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। কয়েক কদম এগিয়ে এসে নিজের জুতো টা সানায়ার জুতোর দু’পাশে রেখে দিলো। এমন একটা কাজ, যা করে সে নিজেই থমকে গেলো। আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলো নিজের বড়ো বড়ো জুতো গুলোর মাঝে থাকা ছোট জুতো টার। সেদিকে তাকিয়ে আনমনে হেঁসে বিড়বিড় করলো,
“লুকস লাই্ক সামওয়ান’স জেলাস।”
#চলবে…..
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
