আপনার_হৃদয়ে_আমি #পর্ব_৩০

0
20

#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_৩০
#জান্নাত_সুলতানা

“এটা ক্যারি করতে পারবি তুই? শিওর?”

আফি সানায়ার পায়ে হিলের বেল্ট লাগাতে লাগাতে চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো। সানায়া ভাবনায় পড়ে যায়। নির্ভাণ ভাই কত লম্বা। সে নির্ভাণ ভাইয়ের বুকের নিচে পড়ে। আজ যদি ফ্যামেলি ফটো তোলা হয় তবে কী সবার ভীড়ে তাকে দেখা যাবে? নির্ভাণ ভাইয়ের পাশে দাঁড়াল তো তাকে ছবিতে দেখাই যাবে না। দেখা গেলেও বা হয়তো প্রিয়মের বয়সী মনে হবে। সে কষ্ট করে হলে-ও আজ হিল ক্যারি করার ব্যাপার টা ম্যানেজ করবে। সানায়া মিনমিন করে বললো,

“পারব।”

“আমার মনে হচ্ছে পারবি না।” আফি ওঠে দাঁড়াল। সানায়া কে ধরে দাঁড় করাতেই সানায়া পা ফেলে ঠিকঠাক দাঁড়াতে হিমশিম খেলো। সানায়া বোকা বোকা হাসার সাথে মন টা ও খারাপ হলো। সে পারবে তো? আবার ইজ্জত না গেলেই হয়। আফি ওর কান্ড দেখে তপ্ত শ্বাস ফেললো।

সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় সানায়া রেলিং ধরে ধরে নিচে এসে কোনো রকম সোফায় বসলো। আরোরা জাহান কোথাও যায় না। বাড়ি থেকে বের হয় না তেমন। যদিও নির্ভাণের সেই সমুদ্রের তীরে ডিনারে গিয়েছিলেন তবে এবার যাবেন না তিনি। মা মেয়ে একই ধাঁচের। মায়ের জন্য সানায়ার খারাপ লাগলে-ও নানিজান যাবে না শুনে তেমন খারাপ লাগলো না। নানি তাকে দেখতে পারে না। যতক্ষণ সে ওনার সামনে থাকে ভদ্রমহিলা সানায়ার দোষত্রুটি ধরতেই ব্যাস্ত থাকে। আর বাকি মহিলারা এখনো রেডি হচ্ছে। সেহের এসে সানায়ার পাশে বসলো। গোলগোল চোখে চশমার নিচ থেকে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। সানায়া ঘাবড়ে গেলো। তাকে কী বাজে দেখাচ্ছে? বিশ্রী দেখতে লাগছে ভীষণ? সেহের কেনো তবে এভাবে দেখছে? চিন্তায় যখন গলা শুঁকিয়ে আসার উপক্রম সেহের তখন গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো, “একটু দাঁড়াবে আপু?”

সানায়া অবুঝ চোখে চেয়ে। বুঝতে পারে না কথা ঠিকঠাক। সেহের সানায়া কে বসে থাকতে দেখে আবারও বললো, “একটু দাঁড়াও। একটা ছবি তুলবো। তোমাকে অনেক প্রিটি দেখাচ্ছে।” সানায়া চকমকানোর সাথে সাথে খুশি হয়ে লাফিয়ে উঠলো। আর খুশির ঠেলায় সে ভুলে গেলো পায়ে তার সাধারণ কোনো জুতো ছিলো না। ব্যাল্যান্স হারিয়ে যখন পড়তে যাবে তার আগেই হাতে এবং কোমরে দানবীয় হাতের বাঁধন তাকে আঁটকে নিলো কেউ। ভয়ে চোখ বন্ধ করে রাখা চোখ দু’টো মেলে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে নির্ভাণ কে দেখে ভালো লাগার সাথে লজ্জাও পেলো। রোমান্টিক এই মূহুর্ত টা এভাবে তৈরী না হয়ে অন্য ভাবে হতে পারতো। ইশ! এই জুতো নিয়ে ইজ্জতের ফালুদা হয়ে গেলো। সে ঠোঁট কামড়ে ধরে। নির্ভাণ শান্ত। গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলো, “পায়ে লেগেছে?”

“না।” আসলেই লাগেনি। নিচে পড়লে হয়তো লেগে যেতো। নির্ভাণ কথা টা শুনে স্বস্তি পেলো। আর আলগোছে ওকে সোফায় বসিয়ে দিলো। সেহের পাশে দাঁড়িয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে দেখলো। নির্ভাণ ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে আদেশ করলো,”আমার রুম থেকে ক্যামেরা টা নিয়ে আয় সেহের।”

“ওকে ভাইয়া।” সেহের নিজের হাতে থাকা নিজের বাবার ফোন রেখে দৌড় লাগাল। নির্ভাণ অপেক্ষা করতে পারলো না। কোত্থেকে কে চলে আসবে সে হয়তো আর এমন সুযোগ পাবে না। নিজের পকেট থেকে ফোন বের করে ক্যামেরা অন করতে করতে বললো, “হাত সামনে কোলের ওপর রেখে বোস।”

সানায়া একবার ভাবলো বলবে সেহের তো এখনো ক্যামেরা নিয়ে আসেনি। তবে পরক্ষণেই ভাবলো থাক এই মানুষ যে তাকে ছবি তুলে দিবেই এটাই অনেক। তাই কথা না বাড়িয়ে নির্ভাণের কথামতো হাত কোলের ওপর রেখে ছবির জন্য পোস দিয়ে বসলো। নির্ভাণ দুটো ছবি ক্লিক করলে। সানায়া এটা বুঝতে পেরে বললো, “মাত্র দুটো ছবি? অনেকগুলো তুলে দিন না। যেটা ভালো আসবে সেটাই রাখব।”

“দুটোই ইনাফ।”

সেহের আসায় সানায়া আর কিছু বলতে পারলো না। সেহের এসে বোনের ছবি তোলার জন্য উদ্যত হতেই নির্ভাণ বাঁধা দিয়ে বললো, “ও ছবি তুলবে না।”

“তাহলে ক্যামেরা আনতে কেনো বললে?” সেহের ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে জিজ্ঞেস করে।

“আমার জন্য।” নির্ভাণ সানায়া কে ইশারায় উঠতে বলে নিজেই সানায়া যেখানে বসে ছিলো সেই যায়গা টা থেকে একটু দূরত্ব রেখে সোফার আর্মের ওপর হাত ছড়িয়ে বসে গেলো। সেহের ভোঁতা মুখ চকচক করে। ভাই ছবি তুলবে। যাক তার ক্যামেরা নিয়ে আসা স্বার্থক হয়েছে।

—-

সানায়া রাগে ফুঁসছে। না-কি অভিমান হচ্ছে নির্ভাণের ওপর বুঝতে পারে না। তার খুশি ওই পুরুষের সহ্য হয়না। সে রাগ করে নির্ভাণের পেছনে আর গেলো না আজ। মামিদের সাথেই গাড়িতে বসলো। তুষার আগে থেকেই সেই রেস্টুরেন্টে থাকবে বলে জানিয়েছে।
নিদিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে সবাই জানতে পারলো আজ তুষার বাবা মায়ের বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষে এই আয়োজন করেছে। তবে দুঃখের বিষয় ফারাজ সিদ্দিকী ছেলের এই আয়োজনে আসেনি। যেহেতু তিনি রাজনীতি করে তাই জরুরি একটা কাজে ওনাকে নিজের দলের লোকদের নিয়ে মিটিংয়ে আটকে গিয়েছে। বাবা না আসায় তুষারের ভাবমূর্তি বোঝা গেলো না। সে স্বাভাবিক ভাবে মাকে নিয়ে পরিবারের সাথে পার্টি এনজয় করতে লাগলো।
খাবার খেতে সানায়া রাফাকে নির্ভাণের পাশের চেয়ারে বসতে দেখে একদম সহ্য করতে পারলো না। তাই সে কিছুটা দুঃখ পেয়ে ওয়াশরুমের নাম করে একটু অন্য পাশে গেলো। একটা খোলা ব্যালকনি দেখতে পেয়ে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। যায়গাটা কাঁচের দেয়াল ছিলো। সামনে দাঁড়িয়ে বাইরে পুরো শহর দেখা যাচ্ছিল এক ঝলক। সানায়ার মন টা ফুরফুরে হলো না। সে কাঁদার জন্য প্রস্তুতি নিতেই কিছুর আওয়াজ পেয়ে কান্না ভুলে কৌতূহল হয়ে একটু পেছনে সরে এসে একটা দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে বুঝতে পারলো এটা আসলে ম্যান ওয়াশরুম। সে কৌতূহল বশত সেখানে গিয়েও অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে? ছেলেদের দেখতে সে এখানে এসছে? দ্রুত পা বাড়িয়ে বেরিয়ে আসার জন্য উদ্যত হতেই শুনতে পেলো চাপা আওয়াজ। আবারও কৌতূহল। কান পাতলো একটা দরজায়। আর শুনতে পেলো,

“আজকে এমনটা না করলে-ও পারতে পাপ্পা। আই হেট ইউ। আই জাস্ট লাভ মাম্মা।”

“তুষার ভাইয়া?”

কণ্ঠস্বর শুনে সানায়ার সন্দেহ নিশ্চিত হলো। তুষার খাবার টেবিলে ছিলো না। সে বুঝতে পারলো তুষার মানুষ টা নিজেকে যেমন দেখায় আসলে সে তেমন নয়। ভেতর থেকে সে-ও বাবা-মা কে ভালোবাসে। শুধু প্রকাশ করতে পারে না। সানায়া এসব ভাবনায় ডুবে ভুলেই গেলো এটা ছেলেদের ওয়াশরুম। আর একটা ছেলে পেছন থেকে এসে ওকে এটা-সেটা বলে বাজে মন্তব্য করতে লাগলো। ভয়ে, ঘৃণায় সানায়ার চোখে পানি চলে আসে। তুষার বাইরে এসে সানায়া কে এখানে দেখে ঘটনা বুঝতে এক সেকেন্ড লাগলো না। সে ছেলেটার পেটে এক লাত্থি মেরে নিচে ফেলে ছেলে টার কলার ধরে এলোপাথাড়ি পাঞ্চ মারতে লাগলো। একের পর এক মাইর ছেলেটার নাকমুখ রক্তাক্ত করে দিলো। সানায়া ভয়ে এক কোণে গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকে।
তুষারের মারার স্কিল দেখে মনে হচ্ছে সে যেন এসবে প্রফেশনাল। কোথায় আঘাত লাগলে ছেলেটা ফিডব্যাক দিতে পারবে না সেই কৌশল ও খুবই ভালো জানা মনে হচ্ছে।

“তুষার ভাই থামুন। প্লিজ।”

সানায়া বিড়বিড় করে। তুষারের কান অব্ধি পৌঁছায়নি সেই বাক্য। ছেলেটার চিল্লা চিল্লিতে অনেকেই দৌড়ে এলো। সানায়া পরিচিত মুখ দেখে একটু স্বস্তি পেলো। নির্ভাণ অস্থির হয়ে যখন ছুটে এসে জিজ্ঞেস করলো, “তুই ঠিক আছিস?”

“হুম।” একটু থেমে আবার বললো,”তুষার ভাইয়া কে থামান প্লিজ।” কোনো রকম সানায়া বললো। একান্ত এবং নেয়ামত সিদ্দিকী যদিও ততক্ষণে তুষার কে সামলে নিয়েছে। তবুও সে সাপের মতো হিসহিস করে। ভালো করে মারতে পারেনি সে। সবাই তার আগেই চলে এসছে। রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার এসে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ছেলেটাকে বের করে নিতে চাইলো। কিন্তু নির্ভাণ তা হতে দিলো না। মায়ের কাছে সানায়া কে রেখে সে পুলিশ কল করলো। ম্যানেজার নিজের রেস্টুরেন্টের কথা ভেবে নিজাম সিদ্দিকীকে ব্যাপার টা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ইনিয়েবিনিয়ে বোঝাতে লাগলেন। তবে নিজাম সিদ্দিকী মানার পাত্র নয়। তিনি ম্যানেজারের মনোভাব বুঝতে পেরো বললেন, “আমার মেয়ের অসম্মান আমরা কখনোই সমঝোতায় যাব না। আজ ছেড়ে দিলে এই পুরুষ নামের কাপুরুষ গুলো আরেকবার এরচেয়ে খারাপ করতেও পিছপা হবে না।”

সিদ্দিকী পরিবার এলাকায় একটা সনামধন্য পরিবার। অর্থসম্পদ দাপট সবই আছে। ফারাজ সিদ্দিকীর বদৌলতে পুলিশ এলো দ্রুত এবং ছেলেটাকে নিয়ে গেলো।

“নিজের মতো এনজয় করো মামুনি। মামা রাতে তোমার জন্য স্ট্রবেরি ফ্লেভারের কেক নিয়ে আসবো।” সানায়া মামার সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলে ফোন টা নির্ভাণের দিকে এগিয়ে দিলো। নির্ভাণ ফোন নিয়ে ওকে নিজের প্লেট থেকে স্পুন দিয়ে খাবার খাইয়ে দিতে শুরু করলো। সবাই তখন নিজেদের মতো ব্যাস্ত আলোচনায়। তবে তুষারের প্লেট থেকে কোনো খাবার নড়লো না। রাফা তো মাথা নিচু করে কয়েক ফোটা চোখের জল ও আড়ালে ফেললো। এক তরফা ভালোবাসা তো এমনই। শুধুই একাকী নীরব কষ্ট।

“একান্ত ভাই হাত সরান।”

একান্ত আফির ফিসফিসানি সুর পাত্তা দিলো না। নিজের মতো আফির কোমরে হাত টা স্থির রাখলো। এবং খুব স্বাভাবিক ভাবে নিজের প্লেটের খাবার খেয়ে যাচ্ছে। এদিকে আফি ভয়ে খাবার তো দূর বেশি কিছু বলতে ও পারে না। কেউ দেখে ফেললে কেলেঙ্কারির শেষ থাকবে না। মনে মনে কয়েক দফা বকাবকি করে মুখে বললো, “আপনি ছাড়ুন নয়তো আমি ভাইয়া কে বলবো।”

“তোর বাপ ভাইকে ভয় পাই না আমি।”

“ওহ্ রিয়েলি?”

“অফকোর্স।”

“তাহলে টেবিলের ওপর আমার হাত টা ধরে দেখান।” আফির ঠোঁটে শয়তানি হাসি। একান্ত আশেপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে চট করে টেবিলের ওপর রাখা আফির ডান হাতটা বাঁ হাতে চেপে ধরার সঙ্গে সঙ্গে শুনতে পেলো, “ভাইয়া ,,,” একান্ত ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে নিতেই আফি থেমে গেলো। নির্ভাণ বোনের দিকে তাকাতেই আফি মৃদু হেঁসে বললো, “আজ তুমি অফিস গিয়েছিলে? কেমন কাটলো পুরো দিন?” আফি আঁড়চোখে একবার একান্তর ভোঁতা মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসে। নির্ভাণ বোনের দিকে এক পলক তাকিয়ে আবারও নিজের মতো করে ফ্রাইড রাইসের সঙ্গে সানায়ার জন্য চিলি চিকেন মিক্সড করতে করতে জবাব দিলো,

“নট ব্যাড।”

#চলবে…….

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here