আপনার_হৃদয়ে_আমি #পর্ব_৫ #জান্নাত_সুলতানা

0
36

#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_৫
#জান্নাত_সুলতানা

নির্ভাণ ক্যাম্পাস থেকে ক্লান্ত দেহ টেনে বেরিয়ে এলো। কাজ করতে করতে অবস্থা এমন হয়েছে যে সে আজ একটু ফ্রী সময় পায়নি। সে গোপনে দীর্ঘ নিঃশ্বাস টানলো। রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে টের পেলো পেছনে তিয়ান আর ইকবাল ও তাকে অনুসরণ করছে৷ রাস্তায় থাকা ল্যাম্পপোস্টের বাতি ওদের বড়ো বড়ো ছায়া নির্ভাণ কে নিশ্চিত করে সেটা। নির্ভাণ হঠাৎ থামলো। ওরা দু’জন গুটিগুটি পায়ে এসে নির্ভাণের দুইপাশে দাঁড়াল। নির্ভাণ গম্ভীর। কোনো অজানা কারণে যুবকের মুড খারাপ আছে আজ। বন্ধুর মন খারাপ দূর করতেই ওরা আজ এতো রাত পর্যন্ত কাজ করেছে। ইকবাল হঠাৎ নিজের টি-শার্ট মাথার ওপর গলা দিয়ে অর্ধেক বের করে মাথায় রাখলো। হাত দু’টো উঁচু করে আঙুল ছড়িয়ে ঝুঁকে গেলো। নির্ভাণ অবাক। তিয়ান হু হা করে হেঁসে ওঠে। নির্ভাণ খেয়াল করতেই নিজের হাসি আঁটকে রাখতে পারলো না। উচ্চস্বরে হাসিতে ইকবাল সোজা হলো। নিজেও হেঁসে বললো,

“এটা সুন্দর না। চল তিনজনে করি।”

তিয়ান সাথে সাথেই নিজের শার্ট মাথায় তুলে ঘাড় থেকে। হাত উঁচিয়ে পাঁচ আঙুল ছড়িয়ে সেও ব্যাঙের মতো লাফাতে লাফাতে সামনে যেতে লাগলো। ইকবাল ও তাই করে। নির্জন ফাঁকা রাস্তা। রাতের নিস্তব্ধতা চারদিকে। নির্ভাণ ওদের সাথে তাল মেলালো। খুব হাসি পেলো বেচারার। অদ্ভুত কাজ। এমন দামড়া দামড়া ছেলেরা রাস্তায় এমন করছে কেউ দেখলে ইজ্জত থাকবে তো? নির্ভাণ একটু যেতেই মনে পড়লো সে এই দুই বজ্জাতের খপ্পরে পড়ে নিজেও বাচ্চাদের মতোই করছে।

“বা*ল।”

নির্ভাণ কে থতমত খেয়ে বাইকের কাছে পৌঁছাতে দেখে ইকবাল বিড়বিড় করে উঠলো।

—–

সানায়া আজ স্কুল যাবে না। ওর বান্ধবীরা দুজন ট্যুরে গেছে। আর একজন ট্যুরে যেতে পারেনি তাই মামার বাড়ি বেড়াতে গেছে। সানায়া দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। ওর তো যাওয়ার কোনো যায়গাই নেই। যে মন খারাপ হলে বা রাগ করে কোথাও গিয়ে দুদণ্ড শান্তিতে থাকতে পারবে। আফি সন্ধ্যায় এলো। ভার্সিটি থেকে ফিরেই হয়তো চলে এসছে ওর ঘরে। আফিকে অসময়ে নিজের রুমে দেখে সানায়া জিজ্ঞেস করলো, “ভার্সিটি থেকে ফিরেছ?”

“হ্যাঁ। নে ধর। দেখ কোন টা ভালো লাগে।”

আফি নিজের হাতের শপিং ব্যাগ দুটি সানায়ার হাতে দিয়ে বললো। সানায়া ব্যাগ হাতে কৌতূহলী হয়ে নড়েচড়ে দেখলো। তিনটি থ্রি-পিস। কালার ভিন্ন ডিজাইন একই। সানায়া ভ্রু কুঁচকে নিলো। তারা তো কিছুদিন আগেই শপিং করেছে৷ মা এমনিতেই তাকে বকাবকি করে সে অতিরিক্ত টাকাপয়সা খরচ করে বলে। এখন আবার এটা দেখলে তাকে বকাবকি করবে। সত্যি টা জানতে চাইবে না। উলটো বলবে হয়তো সে-ই আফিকে জোর করে শপিং গিয়েছে। সানায়া হঠাৎ করে বললো, “আপু আমার কোনো ড্রেস লাগবে না। তুমি প্রিয়ম নিয়ে নাও।”

ওর মন টাও খারাপ অন্য সময় হলে মায়ের বকা উপেক্ষা করেই খুশি মনে জামা টা নিয়ে নিতো। যেহেতু আজ মন ভালো নেই তাই সে ড্রেস ফিরিয়ে দিলো। আফি ওর রুমের ওয়াশ রুমে যেতে যেতে আদেশের স্বরে বলে গেলো, “তোর যেটা ভালো লাগে ওটা রেখে আমার টা আমাকে ওয়াশরুম দিবি। আর বাকি যেটা থাকে প্রিয়ম কে নিয়ে দিয়ে আসবি। ও স্কুলের হোমওয়ার্ক শেষ রেডি হবে।”

“এখন রেডি হবে?”

“হ্যাঁ, ঘুরতে যাবে বাড়ির সবাই।”

“আমি যাবো না।”

“কেনো?”

“সে-ই তো ওই চিরপরিচিত রেস্টুরেন্টে গিয়ে ডিনার। প্রতিবার এক যায়গা দেখতে ভালো লাগে না।”

“আরেহ চিল, ভাইয়া বলেছে অন্য কোথায় নেবে এবার।”

আফি ওয়াশরুম থেকে উচ্চস্বরে কথা বলে। সানায়া কালো থ্রি-পিস টা নিজের জন্য রেখে পার্পল রঙের টা আফির জন্য রাখলো৷ আর ঘি রঙের টা প্রিয়মের জন্য নিয়ে গেলো। প্রিয়ম খুব ভালো স্টুডেন্ট। মেয়ে টা ফিউচারে ডক্টর হতে চায়। সেহের ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। আফি রাইটার হতে চায়। সুন্দর সুন্দর স্ক্রিপ্ট লিখে কবিতাও লিখতে পারে সুন্দর। সবার কোনো কোনো স্বপ্ন, শখ আছে। আর সে নিজে? সানায়া দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। তার কোনো স্বপ্ন দেখতেও ভয় লাগে। যদি পূরণ না হয়?

——-

আমেনা খাতুন। আর ফারাজ সিদ্দিকী যাবে না। বাকিরা রেডি হয়ে বসে আছে শুধুমাত্র নির্ভাণ ছাড়া। কেউ বা বাড়ির বাইরে অপেক্ষা করছে। সানায়া প্রিয়ম আফি এক সাথে দাঁড়িয়ে ফুসুরফুসুর করছিলো। আমেনা খাতুন সোফায় বসে হাঁক ছেড়ে বলে উঠলো, “দামড়ি মাইয়া মানুষ লইয়া বাইরে যাচ্ছ দাদুভাই। সাবধানে চলাচল করো।”

দাদির কথায় সবার দৃষ্টি সিঁড়ির দিকে গেলো। নির্ভাণ গম্ভীর মুখে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। কালো শার্ট-প্যান্ট পরনে। কালো শার্ট টা সুগঠিত শরীর টা সুন্দর করে ঢেকেছে। হাতা ফোল্ড করে কনুইয়ের ওপর ভাজ করে রাখছে। সানায়া কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে দেখলো। পরপরই নির্ভাণ ভাইয়ের কণ্ঠস্বর তার ধ্যান ফিরে। দাদিকে তিনি আশ্বস্ত করেন। বিদায় নিয়ে বেরিয়ে যান হনহন করে। যাওয়ার আগে গম্ভীর স্বরে বলে গেলো, “তাড়াতাড়ি এসো সবাই।”

নিজাম সিদ্দিকী বাড়ি নেই। তারা বারোজন যাচ্ছে। দুটো গাড়ি। সানায়া সুযোগ পেতেই ছোট মামার গাড়িতে ওঠে পড়লো৷ মেঝো মামি আর ছোট মামি পেছনে বসেছে। সে তাদের মাঝে গিয়ে বসে পরলো। ছোট মামার পাশে ড্রাইভিং সিটে নিজাম সিদ্দিকী। সে কিছুতেই নির্ভাণ ভাইয়ের গাড়িতে যেতে চায় না। এই মানুষ টার জন্যই তার ট্যুরে যাওয়া ক্যান্সেল হয়েছে। শয়তান একটা, হুঁ। ওদের গাড়িটা পেরিয়ে যখন নির্ভাণের গাড়িটা গেলো তখনই সানায়া খেয়াল করলো নির্ভাণ রাগান্বিত দৃষ্টিতে এক পলক জানালা দিয়ে ওর দিকে তাকাল। দেখে মনে হচ্ছে খুব রেগে আছে। সানায়া বুঝলো না একটু আগে ও তো সব ঠিক ছিলো। তাহলে একটু সময়ের মধ্যে এমন কী হয়েছে যে এতোটা রেগে আছে? কোনো ভাবে কী স্কুলের সে-ই কাহিনি নির্ভাণ ভাই জেনে গেলো? সানায়ার মনে দুশ্চিন্তা ঢুকে গেলো। সে পরক্ষণেই ভাবল অন্য কারণ ও হতে পারে। হয়তো সে একটু বেশি ভাবছে। তাকে নিয়ে ভাবার মতো এতো সময় এই যুবকের আছে না-কি? শুধু খবরদারী। এটা ছাড়া তিনি আর কিছু করতে জানে না।

—–

গাড়ি দুটো এক ঘন্টার ও বেশি সময় ধরে চলছে তো চলছে। সানায়ার বিরক্তি ভর করছে চোখে-মুখে। মামাকে কিছু জিজ্ঞেস করবে তখনই সামনের গাড়িটা থামলো হঠাৎ করে। যার ফলস্বরূপ তাদের টাও থামল। সবাই গাড়ি থেকে নামছে ধীরে ধীরে। সানায়া নিজেও নামতেই একটু থমকে গেল।
শহরের কোলাহল পেরিয়ে যে জায়গাটায় তারা এসেছে, সেটা একটা লেকের নীরব পাড় চারদিকে গাছ, সামনে শান্ত পানি। লেকের ওপর চাঁদের আলো লম্বা একটা রুপালি রেখা টেনে দিয়েছে। বাতাসে নোনা না, কিন্তু কাঁচা পানির ঠান্ডা গন্ধ।
হাঁটাপথের দু’পাশে মাটিতে বসানো ছোট ছোট ফেয়ারি লাইট, আলো জ্বলছে-মিটছে। পথের শেষে খোলা জায়গা, ঠিক লেকের কিনারায়।
সেখানে পৌঁছাতে সবাই থমকে গেল।
বালুর মতো নরম মাটির ওপর সাদা কাপড় পাতা লো টেবিল। চারপাশে গোল করে রাখা কাঠের স্টুল আর কুশন। টেবিলের মাঝখানে কাচের জারে ভাসমান মোমবাতি। পানির ওপর আলো পড়ে কেঁপে কেঁপে উঠছে। লেকের দিকে মুখ করে বাঁশের ছোট আর্চ তাতে ঝুলছে সাদা পর্দা আর শুকনো ফুলের গার্ল্যান্ড। প্রিয়ম ফিসফিস করে বললো, “এটা খুব সুন্দর। তাই না আপু?”

পাশেই রাখা ফোল্ডিং টেবিলে খাবারের আয়োজন ঢাকা কন্টেইনারে ভাত আর পোলাও, গরম ভুনা মাংস, মাছভাজা, সালাদ আর লেবু। এক পাশে থার্মোসে গরম স্যুপ, আরেক পাশে জুস আর পানি। খাবারের গন্ধে পুরো জায়গাটা উষ্ণ হয়ে আছে।
আশেপাশে কেউ নেই। তবে হঠাৎ পেছনে থেকে ইকবাল আর তিয়ান উপস্থিত হলো। তাদের দেখে সবাই অবাক। ইকবাল হাতের একটা কফি পট টেবিলের ওপর রাখলো। তিয়ান ততক্ষণে সবাই কে স্বাগত জানাচ্ছে। ইকবাল উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জানালো,
“আজকের ডিনার আমরা হোস্ট করছি।”

নিজাম সিদ্দিকী অবাক হয়ে নিশ্চিত হতে বলে উঠলেন, “সব তোমরা করেছো?”

“শুধু খাবার টা বাইরে থেকে অর্ডার করা।”

তিয়ান ইকবালের দিকে তাকিয়ে মেকি হেঁসে নিজাম সিদ্দিকী কে জানায়। ইকবাল থতমত খায়। মুখের হাসি হাসি ভাব চলে যায়। নির্ভাণের দিকে তাকায়। নির্ভাণ ঠোঁট চেপে এক পাশে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। তিয়ান ব্যাপার টা সামলে সবাই কে বসতে বললো।
লেকের পাড়ে আলো, খাবার আর মানুষের হাসি সব মিলিয়ে জায়গাটা আর সাধারণ কোনো স্থান থাকল না।
ওটা হয়ে উঠল একটা সন্ধ্যা, যেটা স্মৃতি হয়ে এক সময় ভাসবে চোখের সামনে।
সানায়া এতো ভিড়ে ভুলেই গেলো তার আজ সারাদিন মন খারাপ ছিলো।
আফি, প্রিয়ম, সেহের একপাশে গিয়ে ছবি তুলতে ব্যাস্ত হয়ে গেলো। সবাই এদিকটায় বসে গল্পগুজবে মেতে উঠলো। তবে নির্ভাণ চেয়ারে বস, খুশিতে নিজের মামাতো বোনদের সাথে মেতে থাকা সানায়ার দিকে তৃপ্তি নিয়ে তাকিয়ে রইলো।

“ভাইয়া এতো আয়োজন কেনো করলো হঠাৎ?”

প্রিয়ম বলে উঠলো। আফি ফোনে ছবি দেখছিল। প্রিয়মের কথায় কাঁধ ঝাঁকাল। সেহের পাশ থেকে বললো,

“তোমরা জানো না, সানা আপু পিকনিক যেতে পারেনি মন খারাপ যেনো,,, ”

“সেহের!”

সেহের পুরো কথা সম্পূর্ণ করতে পারেনা। ইকবাল তার আগেই ডেকে উঠে, সেহের চলে গেলো। সানায়া আফির সাথে ফোনে ছবি দেখছিল তবে সেহেরের কথায় চমকে ওঠে নির্ভাণ ভাইয়ের দিকে তাকাল। নির্ভাণ কফির মগে ধীরে চুমুক দিয়ে সবার সাথে বসে কথা বলছে। সানায়া অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল সত্যি এই পাষাণ যুবক তার মন ভালো করতে এখানে নিয়ে এসছে? না, না এটা অবিশ্বাস্য। সানায়া অন্যমনস্ক হয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে নিজের মনেই যখন এসব ভাবছিল নির্ভাণ তখন আচমকাই ওর দিকে দৃষ্টিপাত করলো। নিষ্প্রভ দৃষ্টে চেয়ে নির্ভাণ, সানায়া সেই চোখের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে শুঁকনো ঢোক গিলে ধীরে আফির পেছনে গিয়ে দাঁড়াল আর নিজে কে আড়াল করে নিলো।

#চলবে……

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here