#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_৭
#জান্নাত_সুলতানা
শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে গ্যারাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে নির্ভাণ। বাইক বের করে নিয়ে গেইটের কাছে গেলো। দারোয়ান গেইট খুলে দেয়। হাসি মুখে নির্ভাণ ওনাকে কিছু বলতে বলতে বাইক স্টার্ট করে বেরিয়ে যায়। অদ্ভুত। এতো সাধারণ একটা সিন এতো মনোযোগ দিয়ে দেখার কী আছে?
সানায়া পানির মগ বালতিতে রেখে রুমে আসে। প্রিয়ম এসে বিছানায় শুয়ে আছে। হাতে একটা কিছু নড়ে-চড়ে দেখছে।
“কী হয়েছে? এতো সকালে আমার ঘরে?”
“এমনই। একটা দরকার আছে।”
“এমনই! আবার দরকার আছে?”
সানায়া ভ্রু কুঁচকে বই খুলতে খুলতে বলে উঠলো। প্রিয়ম বিছানা ছেড়ে এসে সানায়ার টেবিলের ওর একটা খাম রাখলো। জোর করে হেঁসে বললো,
“হে হে। হয়েছে কী তুমি কী এটা ভাইয়া কে দিতে পারবে?”
“কী এটা? তুই গিয়ে দে।”
সানায়া বিরক্তিকর স্বরে বলে। প্রিয়ম ছলছল চোখে তাকিয়ে বলে উঠলো, “আমি দিতে পারবো না।”
“কেনো?”
সানায়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জানতে চায়। প্রিয়ম আমতা আমতা করে জানায়,
“এটা লাভ লেটার।”
সানায়ার চোখ বিস্ময় বড়ো বড়ো হয়ে আসে। বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠে। অস্ফুটে বেরিয়ে আসে,
“তুই,,,
সানায়ার কথা সম্পূর্ণ করতে দেয়না প্রিয়ম তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,
“না না, আমার না। আমার টিচার আছে না। তিনিই দিয়েছে এটা। প্লিজ দিয়ে দাও। নয়তো ম্যাম বলেছেন আম্মুর কাছে আমার নামে মিথ্যা বলে বিচার দিবে।”
মেয়ে টার ছলছল চোখের দিকে তাকিয়ে সানায়ার ভ্রু কুঁচকে আসে। এই মেয়ে হবে ডক্টর? এতো ভীতু! সানায়া তপ্ত শ্বাস ফেললো। রাগ হলো ওই টিউটরের ওপর। তবে প্রিয়ম কে বুঝতে দিলো না সেটা। চিঠি টা টেবিলের ওপর থেকে নিজের হাতে নিয়ে খামটা উলটে-পালটে দেখতে দেখতে প্রিয়ম কে আশ্বস্ত করে,
“আচ্ছা আমার কাছে রাখি। আমি দিয়ে দেবো।” সানায়া চিঠি টা হাতে নিলো আর অংক বইয়ের ভাজে রাখলো। প্রিয়ম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
—–
সানায়া আজ কোথাও যাবে না ভেবেছিল। সারাদিন ঘুমবে। যেহেতু আজ সে স্কুল যাবে না তাই নিশ্চিন্তে ঘুমানো যাবে। শুয়ে শুয়ে সে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ে আরোরা। সানায়া দরজা খুলে মাকে ফোন হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চিন্তিত হলো। জিজ্ঞেস করলো,
“কী হয়েছে আম্মু?”
“তায়েবা কল দিয়েছে।”
তিনি ফোন টা সানায়ার দিকে বাড়িয়ে দেয়। সানায়া ভ্রু কুঁচকে ফোন হাতে নেয়। কানে নিয়ে “হ্যালো” বলতেই ওপাশ থেকে তড়িঘড়ি করে রিক্তা বলে উঠলো,
“তাড়াতাড়ি লাইব্রেরিতে আয়। আমরা সবাই আছি। শোন তোর মাকে কিছু বলিস না। তোর মা’কে বলেছি তোর একটা বই আমার কাছে রয়ে গেছে ওটা নিতে আসবি।”
“আচ্ছা আসছি।”
সানায়া ফোন মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “যাবো আম্মু?”
“দুদিন বাদে পরীক্ষা। যা গিয়ে বইটা নিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে আসবি।”
আরোরা জাহান মুখ গম্ভীর করে চলে গেলেন। সানায়া বিরক্তি নিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে একটা ফ্রক, জিন্স আর মাথায় হিজাব বেঁধে ব্যাগ টা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে এলো। তার ঘুমে বাঁধা দেওয়া ব্যক্তিদের ওপর তার প্রচুর বিরক্তি এলো।
—–
“সম্ভবত পুরুষের ঘুমঘুম কণ্ঠস্বর নেশাকেও হার মানায়।”
সানায়ার আনমনে বলা কথাখানা বান্ধবীদের মাঝে বিস্ফোরণ ঘটাল। তায়েবা মজা করে বলে,
“প্রেমে পড়েছিস মনে হচ্ছে।”
“এখানে প্রেমের কথা কেনো আসছে?”
“প্রেম ছাড়া যে কারোর ঘুম জড়ানো কণ্ঠস্বর নিশ্চয়ই মধুর মতো শোনাবে না।”
রিক্তার কথায় সানায়া অবাক হয়। অবিশ্বাস্য স্বরে বলে উঠলো, “সত্যি?”
“তোর বিশ্বাস না হলে আমরা ট্রাই করতে পারি।”
তায়েবা লাইব্রেরিতে দরজার সামনে বসে ঘুমিয়ে থাকা আঙ্কেল টার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো। সানায়া অবাক। এখন কিভাবে সম্ভব?
“এখন কিভাবে আর কাকে দিয়ে?”
তায়েবা ইশারা করে আঙ্কেল টাকে দেখালো। সানায়া কিছু বলার আগেই ওরা সবাই আঙ্কেলের কাছে পৌঁছে গেলো। সানায়া পৌঁছানো মাত্র রিক্তা আঙ্কেল কে ডেকে উঠলো, “আঙ্কেল ব্রেকফাস্ট করেছেন সকালে?”
কিন্তু কোনো জবাব এলো না। তায়েবা আরও একটু এগিয়ে কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কিছু টা জোরে বলে উঠলো,
“আঙ্কেল ঘুমিয়ে আছেন?”
ঘুমন্ত মানুষ কে ডেকে জিজ্ঞেস করছে ঘুমিয়েছে কি-না। আশ্চর্য হয় সানায়া। তৎক্ষনাৎ ধড়ফড়িয়ে উঠে লাইব্রেরিয়ান সেই লোক। সাথে খ্যাকখ্যাক করে বলতে থাকেন,
“এহ্,,, ক-কে কে?”
“আমরা আঙ্কেল।”
“এই যাহ্। একটু চোখ লেগে এসছিলো। তোমাদের কিছু দরকার?” ভদ্রলোক চোখ ডলে জিজ্ঞেস করলো। সবাই এক সাথে মাথা নাড়ে। তায়েবা নিজের ব্যাগ থেকে একটা বিস্কিটের প্যাকেট বের করে লোকটাকে দিয়ে বলে,
“আজ যাই আমরা।”
লোকটা ওদের হাসিমুখে বিদায় দেয়।
সানায়ার মুখ পানসে। ওই লোকের কণ্ঠস্বর শুনে সানায়ার এখন সত্যি চিন্তা হচ্ছে। তবে কী ও সত্যি প্রেমে পড়ে গেলো? তা-ও আবার,,, আর ভাবতে পারে না সানায়া। মাথা দুই দিকে নাড়তে থাকে অনবরত।
চারজন ভার্সিটি চত্ত্বর গিয়ে ভার্সিটির ভেতর রমরমা পরিবেশ দেখে কৌতূহলী হলো। ষোল ডিসেম্বরে ভার্সিটিতে কেমন হয়? স্কুলের জন্য এই সময় টা অন্য বছর কোথাও যাওয়ার সুযোগ হয়নি। পেছন গেইট দিয়ে কিছু মেয়ের পেছন পেছন ওরা প্রবেশ করলো ভার্সিটির ভেতর। কপাল ভালো স্কুল ড্রেস পরে আসেনি কেউ। তাই তেমন অস্বস্তি হলো না। বিকেল তিনটা তখন। লাঞ্চ বিরতির পর আবার অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। মাঠে গিয়ে ওরা তিন জন কয়েকজন মেয়ের পেছনে দাঁড়াল। সবাই বেশ উৎসুক। মঞ্চে একজন হোস্ট শাড়ি পরে মাইক হাতে এনাউন্স করছেন, “ফাইনালি আমাদের গানের পর্ব চলে এসছে।”
সানায়া বিরক্ত হলো। পেটে খিদের জ্বালা নিয়ে গান শুনতে তার একটু ও ইচ্ছে করলো না। তবে বান্ধবীদের সাথে হয়তো আর এমন মূহুর্তে না ও আসতে পারে। তাই দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইলো। পরপর দুজনের গান শেষ হতেই আরও একজনের নাম মাইকে এনাউন্সমেন্ট হলো। সেই নামটা শোনামাত্র সানায়া সহ ওর দুই ফ্রেন্ড ও অবাক হলো। একে অন্যের দিকে তাকালো। মানুষ টা ভালো গান করে এটা সে এবং তার পুরো কাজিন মহলে জানে। কিন্তু ভার্সিটিতে!
নির্ভাণ দৌড়ে এসে গ্রিন রুমে উপস্থিত হলো। নির্ভাণ কে দেখেই ইকবাল গিটার টা নির্ভাণের হাতে দিলো। নির্ভাণ গিটার নিয়ে আবারও দৌড়ে লাগালো। আর তার পেছনে বাকিরা। তার গানের পারফর্ম আছে। গানে নাম দেয়ার কোনো ইচ্ছে ছিলো না তার। তিয়ান জোর করে দিয়েছে। আর এতো কাজের ভীড়ে সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল গানের কথা। মাইকে নিজের নাম এনাউন্স হতেই তার খেয়ালে এসছে। মঞ্চে যখন নির্ভাণ উপস্থিত হলো তখন সে এলোমেলো। কালো রঙের শার্টের বাটন দুইটা বুকের দিকে খুলে আছে। চুল কিছু টা এলোমেলো। হাতে কালো ফিতার একটা ঘড়ি। সাধারণ ড্রেসআপ মানুষ টার। অথচ মারাত্মক লাগছে এতেও। গিটার হাতে সে বার স্টুলে বসলো। গান শুরু করার ঠিক আগমুহূর্তে চোখ বন্ধ করে নেয়।
Dekhle toke, bodlay din
Bodlay raat, bodlay ghum, shonge somoy…
Sondhey hole, bondho ghore
Mone pore, tor-e kotha, emoni hoy…
Keno je toke pahara pahara dilo mon
Keno re eto sahara sahara saradin
Keno je toke paina paina mone hoy
Saratadin…
Keno je toke pahara pahara dilo mon
Keno re eto sahara sahara saradin
Keno je toke paina paina mone hoy
Saratadin…
Chader-e jhorna jemon, vejay pahar
Totota aador ache, toke debar
Dekhe ja icchey koto, akash chowar…
Moner o moner kotha,
Je shekhalo mukhera
Du’chokh buje, tal melalo
Tor-e to rasta dhore, mon palalo…
Keno je toke pahara pahara dilo mon
Keno re eto sahara sahara saradin
Keno je toke paina paina mone hoy
Saratadin…
এতো অনুভূতি কাকে ঘিরে নির্ভাণ ভাইয়ের? এমন একটা মানুষ কী কোনো নারীর প্রতি অনুভূতি আদৌও রাখে? যদি রাখে তবে সেই নারী নিসন্দেহে ভাগ্যবতী। আচ্ছা এমন নয়তো তিনি যার জন্য গান গাইলো ভার্সিটিতে আছে সেই নারী! হয়তো ওনার সাথে যায় এমন সুন্দরী কোনো ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে হবে। পরক্ষণেই মনে পড়ে নির্ভাণ ভাই এসব করার মতো ছেলে নয়। ওনার যা ক্যারেকটার তার সাথে এসব যায় না। এমন গম্ভীর মানুষের প্রেমে কে পড়বে? পড়লেও দু’দিনেই আবার তা ফেরত নেবে। সানায়া গানের সমকালটায় শুধু এই প্রশ্ন-উত্তর গুলো ভেবে গেলো।
“মানুষ টা সুন্দর আর গানও। তোর মুখে যা বর্ণনা শুনি তার কোনো টাই তো যাচ্ছে না নির্ভাণ ভাইয়ের সাথে।”
সানায়াকে উদ্দেশ্য করে বললো তায়েবা। সানায়া নাকমুখ কুঁচকে তাকালো তায়েবার দিকে। একটা গান দিয়ে নিশ্চয়ই কাউকে বিচার করা উচিৎ নয়। তবে তিনি আর যা-ই হোক বাড়িতে সানায়ার জন্য একটা আতংক এবং খুব খারাপ লোক। যার নিজের সবকিছুতে স্বাধীনতা আছে কিন্তু অন্যের বেলায় তিনি তা মানতে একদমই নারাজ।
গানের পুরো টা সময় নির্ভাণ চোখ বন্ধ রেখেছে আবার কখনো বা একটু সময়ের জন্য চোখ মেলে গিটার তারে তাকিয়েছে। গান শেষ হতেই চারপাশে করতালি আর হৈ-হুল্লোড় করে উঠলো অনেক স্টুডেন্ট। কোনো প্র্যাকটিস ছাড়াও নির্ভাণ এতো সুন্দর গান করবে তার ফ্রেন্ড সার্কেলে কেউই তা কল্পনা করে নি। নির্ভাণ দ্রুত মঞ্চ ত্যাগ করলো। কালো শার্টটা সুঠাম দেহের মানুষ টার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে কিছু মেয়ের চিৎকার করে প্রসংশা শোনা গেলো তবে এতে যুবকের কোনো ভাবান্তর নেই। মানুষ এতো কাটখোট্টা কী করে হতে পারে? একটু নরম হলে ক্ষতি কী হতো? সানায়ার ভ্রু কুঁচকে এলো তারউপর পরপরই বিরক্ত হলো আশেপাশের কিছু মেয়ের কথাবার্তা কানে আসতেই। গান ভালো হয়েছে সেটার প্রসংশা মানা যায় কিন্তু গান গাওয়া মানুষ টাকে নিয়ে ফিসফিস সানায়ার পছন্দ হলো না। তৎক্ষনাৎ সে ভীড় ছেড়ে বেরিয়ে আসে। তবে এতো ভীড়ে সে নিজের সব ফ্রেন্ড’দের থেকে আলাদা হয়ে গেলো। পেটের ক্ষুধা নিয়ে আর সময় নিয়ে ফ্রেন্ড’দের খোঁজার শক্তি মনে মনে জোগাড় করতে পারলো না। তাই সিদ্ধান্ত নিলো বাড়ি চলে যাবে। গেইট পর্যন্ত প্রচুর মানুষের সমাগম। আসার সময় তেমন অস্বস্তি না হলে-ও এখন একা ভেবেই কেমন একটা অস্বস্তি হতে লাগলো। ফ্রেন্ড কাউকে পাওয়ার আশায় যখন এদিক-ওদিক মাথা ঘুরিয়ে দেখছিল ঠিক তখনই নিজের থেকে একটু দূরে নির্ভাণ কে দেখেই সানায়া জমে গেলো। হাতে কতগুলো কার্ড মানুষ টার। সানায়া কী করবে কিছুই এই মূহুর্তে মাথায় এলো না। নির্ভাণ হাতে থাকা কার্ড গুলো একটা ছেলের হাতে দিয়ে ওর দিকে এগিয়ে এলো। কিছু টা দূরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, “এখানে কী করছিস তুই?”
দৃষ্টি অন্য দিকে মানুষ টার। সানায়া কী জবাব দিবে উত্তর খুঁজে পেলো না। মাথা নিচু করে রেখে নিশ্চুপ রইলো সে। ততক্ষণে তিয়ান কোথাও থেকে দৌড়ে এসে উপস্থিত হলো সেখানে।
“এদিকটা সামলে নে। আমি একটু পর আসছি।” তিয়ান কে উদ্দেশ্য করে বলে নির্ভাণ। তিয়ান মৃদু হেঁসে মাথা নাড়ে।
“আচ্ছা।”
“আমার সাথে আয়।”
নির্ভাণ সামনে আগে আগে হাঁটে। সানায়া মানুষ টাকে অনুসরণ করে। অদ্ভুত ভাবে নির্ভাণ কে দেখে সবাই সরে দাঁড়িয়ে তাকে যাওয়ার জন্য যায়গা করে দিচ্ছে। দুইপাশে সামনে অনেক মানুষ আর সে পাঁচ ফিট্ দুই ইঞ্চি একটা মেয়ে পাঁচ ফিট্ এগারো ইঞ্চি এক তাগড়া যুবকের পেছনে পেছনে মাথা নুইয়ে হাঁটছে। সানায়ার এবার অস্বস্তি আরও বাড়ল। তবে সামনের পুরুষ ভাবগাম্ভীর্যের সাথে হেঁটে যাচ্ছে আবার মাঝেমধ্যে ঘাড় বাঁকিয়ে পেছন শান্ত চোখে তাকিয়ে সানায়াকে নজরবন্দী রাখছি।
#চলবে….
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
