রোদ_পোহাবার_ছুতোয় #পর্বঃ১৩ #নাজমুন_নাহার

0
26

গল্প #রোদ_পোহাবার_ছুতোয়
#পর্বঃ১৩
#নাজমুন_নাহার

আজকাল খুব ভোরে ঘুম ভাঙে ইফরানের। সকাল সকাল উঠেই চাচ্চুর সাথে প্রতিদিন হাঁটতে বের হয়। চাচ্চুর মতো ট্রাউজার পরে, ঢিলেঢালা গেঞ্জি পরে, পায়ে কেটস পরে এক্সারসাইজ করে সে-ও৷ আজ-ও তা-ই হলো। আসার পর থেকেই সে নিলয়ের সব কাজ খেয়াল করে। তার কথা বলার ধরন, হাঁটার স্টাইল, খাওয়ার মেন্যু, সবই অনুকরণ করে ছেলেটা। নিলয় ব্যাপারগুলোয় বেশ মজা পায়। বিচ্ছুটার সবকিছুতে কৌতুহল আছে। ভাবতে ভাবতে পেছনে ফিরে চাইলো সে। ইফরান দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত। নিলয় ওর দিকে মুখ করে পেছনে হাঁটতে হাঁটতে হেসে বলে, “কী হলো ইয়াং বয়? থেমে গেলে যে? উই হ্যাভ টু ওয়াক মোর। কাম। চাচ্চুর মতো ইনার্জেটিক থাকতে হবে। আমার ভাতিজাকে ক্লান্ত হলে চলবে না, বি স্ট্রং।”

ইফরান হাঁটুতে ভর করে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে আবার হাঁটা ধরে। হাসে নিলয়। এগিয়ে দেয় পানির বোতল। একটা বেঞ্চিতে বসে ওরা।

“তুমি কী এবরোডেও রেগুলার এভাবে হাঁটতে,চাচ্চু?”

নিলয় কাঁধে হাত রাখে ওর। “আরও অনেক কিছুই করতাম। দেশে আসার পর তোর দাদি পৃথিবীর তামান চর্বি খাইয়ে আমার ডায়াটের বারোটা বাজাচ্ছে।”

বিজ্ঞের ন্যায় উপরনিচ করে ইফরান। শুধায়, “ওখানে কি একা একাই হাঁটতে? আই মিন, আমার মতো সঙ্গ দিতো না কেউ?”

হাসল নিলয়৷ পরমুহূর্তেই ম্লান হয়ে আসে মুখটা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্যে চায় সে। “ছিল একজন। সবকিছুতেই সঙ্গ পেতাম তার। যতদিন সাথে ছিল, জীবনটা ফুলের মতো স্বর্গীয় ছিল। সে আর এখন আমার সাথে নেই।”

“নেই কেন?” ইফরানের কন্ঠে কৌতুহল।

“জিজ্ঞেস করা হয়নি কেন নেই। হয়তো আর ভালো লাগে না আমাকে। কিংবা নতুন কারো সাথে হাঁটতে যায়।”

“ফ্রেন্ড?”

বুক চিরে ভারী ভারী শ্বাস বেড়িয়ে আসে নিলয়ের। পিঠে হাল্কা চাপর মারে ইফরানের। তাচ্ছিল্য করে হেসে বলে, “হয়তো তার দিক থেকে বন্ধুই।”

“ডোন্ট ইউ হ্যাভ এনি গার্লফ্রেন্ড?”

বাঁকা চোখে চেয়ে হেসে ফেললো নিলয়। কেমন গুরুজনদের মতো প্রশ্ন করছে ছেলেটা। ইফরান তীক্ষ্ণ চোখে উত্তরের আশায় চেয়ে আছে তখনও।

“হাসছো কেন? আসলেই নেই?”

নিলয় বোতলের মুখ খুলে পানি খায়। মনে মনে হাসলেও উপরিভাগে নির্লিপ্ত কন্ঠে বলে, “ইউ আর টু ইয়াং টু আস্ক দ্যিস কুয়েশ্চন। তুমি ছোট মানুষ, এসব বোঝার বয়স হয়নি। বড়দেরকে দ্বিধাহীনভাবে যা-তা জিজ্ঞেস করতে হয় না। দ্যিস ইজ ব্যাড মেনার্স।”

ঠোঁট উল্টে নাক দিয়ে শ্বাস ফেলে ইফরান। মাথা ঝাঁকায় দু’দিকে।

“তুমি বুঝতে পারছো না৷ তোমার গার্লফ্রেন্ড আছে কি-না সেটা না জানলে দাদি তোমার জন্য আরেকটা মেয়ে ঠিক করে ফেলবে। বাবা বলেছে, তোমার গার্লফ্রেন্ড থাকলে তার সাথেই বিয়ে করাবে, না থাকলে অন্য মেয়ে দেখবে। সো আই হ্যাভ টু নৌ।”

বিস্ময় নিয়ে চায় নিলয়। কন্ঠে বিস্ময়ভাব মিশিয়ে শুধায়, “কে বললো এসব তোমায়?”

“তুমি বাড়িতে আসার পর থেকেই তো আম্মু আর দাদি সারাদিন তোমার বিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে। আমি শুনেছি, কয়েক জায়গায় মেয়ে দেখাও শুরু করেছে গোপনে। এখন তোমাকে জিজ্ঞেস করে কনফার্ম হওয়া বাকি।”

গাল ফুলিয়ে শ্বাস ফেলে নিলয়৷ মেজাজ বিগড়াচ্ছে তার। শুধুমাত্র এই কারণেই সে বাড়িতে আসতে চায়নি এতোদিন। এর চেয়ে বিদেশে বসেই চার দেয়ালে বন্দীদশায় জীবন কাটানো উত্তম ছিল। ফোঁস করে রাগ ঝারল নিজের উপর। উঠে হাত বাড়ায় ওকে ধরতে। ইফরান হাত ধরল চাচ্চুর। হাঁটতে হাঁটতে নিলয় বলে, “বড়দের কথায় কান দিতে হয় না। বড়রা কথা বললে তুমি ওদের আশেপাশে থেকে আর কখনও এসব শুনবে না। মনে থাকবে?”

ইফরান বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ায়। পূনরায় শুধায়, “তোমার সত্যি গার্লফ্রেন্ড নেই, চাচ্চু?”

নিলয় হাঁটতে হাঁটতে চায়। মনে মনে হাসি পাচ্ছে ব্যাপক। “আপাতত নেই।”

“শিটটট! তাহলে আমি বন্ধু বানাবো কাকে? জানো? আমার একটা ফ্রেন্ড আছে, ওর চাঁচি ওকে খুব আদর করে। চকলেট কিনে দেয়, ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ওর চাঁচি নাকি ওকে বন্ধু বানিয়েছে। আমারও ইচ্ছে তোমার বউয়ের সাথে বন্ধুত্ব করার। আমার কোনো ভালো ফ্রেন্ড নেই,চাচ্চু। তুমি তাড়াতাড়ি বিয়ে করো প্লিজ!”

নিলয় শব্দ করে হেসে ফেললো ইফরানের অভিমান অভিমান মুখখানা দেখে। এমনভাবে আবদার করছে, যেনো দোকান থেকে একটা খেলনা কিনে দিতে হবে। কাঁধে চড়ায় ভাতিজাকে সে। হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ দু’জনের নানান রঙের কথায় অতিবাহিত হয়। ওরা খিলখিল করে হাসে, আবার দৌড়ায়।

—-

রাতুল লাজুক স্বভাবের ছেলে। শশুর বাড়িতে বলেকয়ে দু’দিনের বেশি তাকে কিছুতেই রাখা যাচ্ছে না। শশুরের গম্ভীর মুখ এখনও স্বাভাবিক হয়নি। এই ব্যাপারটাও তাকে কিছুটা জড়তায় ফেলছে। আজ ভোরেই সে রওনা দিয়েছে ফেনির উদ্দেশ্যে। জয়নাল সিকদার বাহ্যিকভাবে নির্লিপ্ত রইলেও আমিনা বেগমের অভিমান-অভিযোগের শেষ নেই৷ কাজের ছুতো, এটা-ওটার বাহানা দেখিয়ে শাশুড়ীকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কোনোমতে সে সিকদার বাড়ির চৌকাঠ ডিঙাতে সক্ষম হয়েছে। মিরা থাকছে কিছুদিন।

নিরা সকাল সকাল ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেড়িয়েছে। সামনে তার ইনকোর্স। এই সময়টায় রেগুলার ক্লাস না করতে পারলে এক্সামে পিছিয়ে যাবে সে। আমিনা বেগম রান্নার কাজে ব্যস্ত। মিরা এটা-ওটা এগিয়ে দিয়ে মা’র কাজে কাজে সাহায্য করছে। কখনও কখনও নিজে নিজেই খুন্তি নাড়ছে। আমিনা আরচোখে মেয়েকে খেয়াল করছেন। মেয়েটার আচরণে বেশ পরিবর্তন লক্ষ করছেন তিনি। শরীর স্বাস্থ্য কিছুটা বেড়েছে মিরার। চেহারা উজ্জ্বল হয়েছে অনেকখানি। চালচলনে গিন্নি গিন্নি ভাব। তিনি হাত ছোঁয়ালেন মেয়ের মাথায়। মাতৃস্নেহের স্পর্শে মিরার মনটা ভরে উঠে আবেগে। শৈশব ফিরে পায় মা’র ছোঁয়ায়। সহসাই মা’কে জড়িয়ে ধরে সে। কতোদিন পর আম্মুকে সে এভাবে ধরলো। আম্মুর শরীর থেকে ভেসে আসা মা মা সুভাসটা কতোদিন পর নাকে নিতে পারলো মিরা। আহ্লাদে আটখানা হয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো মেয়েটা। এই তুমুল আবেগময় দৃশ্যটা নিরা দেখলে হিংসেতে আজ সারাদিন ভাতই খেতো না মেয়েটা। গাল ফুলিয়ে বসে থাকতো ঘরের বারান্দায় অথবা কোনো এক কোনে। কন্ঠে অভিমান মিশিয়ে বলতো, “চুপিচুপি বড় মেয়েকে আদর করো তুমি? আমার সাথে এতো বড় প্রতারণা! আই হেইট ইউ।”

সেসব মনে করে হাসলেন আমিনা। চুলে হাত বুলিয়ে মেয়েকে শুধালেন, “শশুর বাড়ির লোকেরা ভালোবাসে তো তোকে, মা?”

মিরা মা’কে আরও কোমলপ্রাণ জড়িয়ে ধরলো। সুখ সুখ আনন্দ তার ঠোঁটের হাসিতে। “ওরা সবাই আমাকে অনেক ভালোবাসে, আম্মু। আমার শাশুড়ীটা একদম তোমার মতো। বোকা বোকা। তবে অনেক আদর করে আমাকে। একদম মেয়ের মতো আগলে রাখেন। ইচ্ছে হলেই উনাকে জড়িয়ে ধরতে পারি আমি। যেমনটা তোমায় ধরতে পারি। কোনো সংকোচ,জড়তা ছাড়াই।”

স্মিত হাসলেন তিনি। “জামাই সোহাগ করে তো তোকে?”

লজ্জায় মুখটা লাল হয়ে আসে মিরার। মা জাতিরা সম্ভবত এমনই। সরাসরি স্বামীর ভালোবাসার কথা জিজ্ঞেস করবে না। ইনিয়েবিনিয়েই জানতে চাইবে।
মিরা মা’র প্রশ্নের উত্তরের বদলে আদরমাখা সুরে বলে, “তুমি আমাদের জন্য কতো ভাবো, আম্মু। সবসময়, সব বিপদে ঢাল হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছো ছোট থেকেই। আব্বুর কতো ঝাড়ি খেয়েছো আমাদের অপরাধ ঢাকতে। তুমি হেল্প না করলে আমার জন্য সবকিছু কঠিন হয়ে যেতো। আব্বুকে বুঝানো কঠিন হয়ে যেতো তুমি পাশে না থাকলে। তুমি অনেক ভালো, আম্মু। তুমি আছো বলেই পৃথিবীটা এতো সুখের!”

হাত বুলালেন মাথায়। মিরা মা’র পানে চায়। মুখভঙ্গি পাল্টে হয়ে যায় চিন্তিত। আবদারি সুরে বলে, “একটা বিষয় নিয়ে আলাপ করার ছিল তোমার সাথে। ব্যাপারটা সিক্রেট।”

তিনি চোখ বড় বড় করে সন্দিহান দৃষ্টিতে মেয়ের পেটের দিকে চাইলেন। মাতৃমন কিছু একটা বলছে। মিরা মা’র মতিগতি বুঝতে পেরে ফিক করে হেসে ফেলে।

“ওসব না। এতো তাড়াতাড়ি তোমাকে নানু ডাক শোনাচ্ছি না। আমার পড়াশোনা বাকি এখনও।”

“তাহলে?”

আমতাআমতা করে মিরা। “কথাটা আসলে নিরার ব্যাপারে,আম্মু।”

সন্দিহান দৃষ্টিতে চাইলেন আমিনা। চিন্তা হচ্ছে এবার।

“বুঝিয়ে বল।”

“আম্মু, নিরা একজনকে ভালোবাসে।”

কোনো প্রকার ভনিতা ছাড়াই সরাসরি কথাটা বলে ফেলল মিরা। চোখের মনি আপনাআপনি বেড়িয়ে আসতে চাইলো আমিনার। যেনো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো ব্যাপার। বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় তিনি। হাত-পা কাঁপছে অস্থিরতায়। মূর্তির মতো ঠায় দাঁড়িয়ে চেয়ে রইলেন মেয়ের পানে।

“ও নাবিলকে বিয়ে করতে চায়নি এই কারণেই। তুমি তো কিছুই জানো না, আম্মু। ও পাঁচ বছর ধরে একজনকে ভালোবাসে। কিচ্ছু বুঝতে দেয়নি কাউকে।”

আমিনা দেয়ালে হাত ভর করে দাঁড়ালেন। স্থির দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হচ্ছে না আর। মিরা চেয়ার টেনে বসালো মা’কে। মাথায় হাত রেখে শরীরের ভার ছেড়ে দিলেন চেয়ারে আমিনা।

“তুমি কিন্তু বেশিই রিয়েক্ট করছো। এমন কাঁপা-কাঁপি করার মতো কিছুই হয়নি।”

এতোক্ষণের স্নেহময় মুখটা মাটিতে মিশে উৎপত্তি হলো তীব্র ক্ষোভের। সহজ-সরল আমিনা এবার রনমূর্তি রুপ ধারণ করলেন। গর্জে উঠে বললেন, “তোরা আমাকে শান্তিতে থাকতে দিবি না,তাই না? দিবি না থাকতে? তোদের বাপ হিটলারের যন্ত্রণায় পুরোটা জীবন আতঙ্কে আতঙ্কে কাটলো, এখন হিটলারের মেয়েরাও তারই অনুসারী হয়ে বসে আছে। আমি বেঁচে আছি কেন মাবুদ! ম*রে কেন যাচ্ছি না আমি!”

আহাজারি করতে করতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন তিনি। মিরা মা’র অবস্থা দেখে কপাল চাপরায়। “আরেহ বাবা, কাঁদছো কেন তুমি? কাঁদার কী হলো? কথায় কথায় বাপকে টানবে না তো।”

“বাপকে টানবো না? হয়েছিস তো বাপের মতোই। আমার জীবনটাকে নরক না বানালে তো হচ্ছে না তোদের।”

মিরা যথেষ্ট নরম হয়ে সামলাচ্ছে মা’কে। “তুমি চুপটি করে বসো তো। শুনো আগে।”

হাত ঝাড়ি মারলেন তিনি। গর্জে উঠে বললেন, “ছাড় বেয়াদব, কথা নেই তোরা সাথে। আসুক ছোটটা আজকে। ওর চৌদ্দ গোষ্ঠীর নাম যদি উদ্ধার না করি, তো আমিও আমার বাপের মেয়ে না।”

মিরা ঠোঁট টিপে হাসে।

“তোমাকে বাপের মেয়ে হতে হবে না। তুমি আমার মেয়ে।”

গললো না দুই মিনিটে জমে যাওয়া বরফের পাহাড়। তিনি চোখ দ্বিগুণ লাল করে চেয়ে ধুপধাপ পা ফেলে ঘরের দিকে ছুটলেন। মিরা দাঁত দিয়ে নোখ খুটলো। মারাত্মক খেপেছে মা জননী। দৌড়ে গেলো পিছু পিছু।

“পুরো কথাটা শুনবে তো?”

“কী শুনবো? আমার উপর পৃথিবীর সব বিপদের ভার ফেলতে পারলেই তো তোর বেঁচে যাস। এই কথা তোর বাপের কানে গেলে কী হবে বুঝতে পারছিস, মিরা? বাসায় আগুন লাগবে। এই লোক আমার ঘুম হারাম করবে এবার।”

“উফফ! লাগবে না আগুন৷ তুমি কথাটা শেষ করতে দাও।”

ফোঁসফোঁস করতে করতে চাইলেন মেয়ের পানে। মিরা মা’র পাশে বসে। পিঠে হাত বুলায়।

“মাথা ঠান্ডা করো। এতো প্যানিক খাওয়ার মতো সংবাদ দিচ্ছি না।”

“আর একটাও বাড়তি কথা না বলে পুরো কথা শেষ কর।”

মা’র নিরব হুশিয়ারীতে ভীত হয় মিরা। একটা শুষ্ক ঢোক গিলে চেয়ে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পিনপতন নিরবতা। হুট করেই নির্জনতার বাঁধ ভেঙ্গে বলে ফেলল, “নিলয় ভাইকে কেমন লাগে তোমার?”

তীর্যক দৃষ্টিতে চাইলেন আমিনা। মিরা মনে মনে মিটিমিটি হাসছে। কৌতুহলে চোখ ছোট ছোট হয়ে এলো আমিনার। অবাক কন্ঠে জপলেন, “নিলয়! নিরা নিলয়কে ভালোবাসে?”

হাসে মিরা। মাথা উপরনিচ করে সে।

“বলিস কী! আমাদের নিলয়? হায় আল্লাহ!”

মিরা চোখ টিপে মা’কে। ” মেয়ের জামাই হিসেবে পাত্র কেমন,আম্মু? তোমার ছোট মেয়ের চয়েজ দেখেছো?”

খুশিতে শব্দ করে হেসে ফেললেন তিনি। হাসল মিরাও। প্রায় একঘন্টা ধরে মা’কে সবকিছুই বুঝিয়ে বললো মিরা। আমিনা এবার চরম খুশি। খুশিতে কেঁদেও ফেললেন বার কয়েক। তার বড় ননদের ছোট ছেলেটা পাত্র হিসেবে লাখে একটা। সে-ই ছেলে কি-না নিরাকে পছন্দ করে? তা-ও পাঁচ বছর ধরে! অথচ কাউকে কিচ্ছুটি বুঝতে দেয়নি বাদরগুলো।

নিলয় যথেষ্ট আদর্শ একটা ছেলে। তার মেয়েটাকে ওর হাতে তুলে দিতে পারলে নিলয়টা ঠিকি সামলে নিবে নিরাকে। এমন একটা সোনার টুকরো ছেলেকে মেয়ের জামাই করতে পারাটা তো পরম সৌভাগ্যের কথা আমিনার জন্য। সিদ্ধান্ত নিলেন, আজই স্বামীর সঙ্গে কথা বললেন এই ব্যাপারে তিনি। নিলয়টা যাওয়ার আগেই চার হাত এক করবেন।
—–

“নাবিল ভাই,

মুঠোফোনে বার্তা প্রেরণের যুগে এসে যারা এখনও চিঠিপত্রের মাধ্যমে মনের ভাবটুকু প্রকাশ করে, বুঝতে হয়– তারা সম্ভবত মারাত্মক কথার জড়তায় ভুগছে। এই ধরনের মানুষরা লিখে যতো সহজে মন খুলতে পারে, মৌখিক উপায়ে তা পারে না। আমার ব্যাপারটাও কিছুটা সেরকমই। যার দরুন, নিজের সাথে বহু তর্ক-বিরোধ করে শেষমেশ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম। লিখেই ফেললাম একটা কাঁপা কাঁপা হাতের চিঠি।

আপনি তো জানেন, আমি ছোটবেলা থেকেই ভীষণ লাজুকলতা। এই এক আড়ষ্টতা কারণে আজীবন ঘরকুনো হয়ে থাকলাম। স্কুল-কলেজ ডিঙিয়ে ভার্সিটিতে পা মারালাম, কিন্তু আমার এই জড়তার কারণে ঠিকঠাক বন্ধুর মতো বন্ধু জোটাতে পারিনি। যারা আছে, কেবলই নামের বন্ধু। জানেন? বড়মা ছাড়া আমি পৃথিবীর কারো সঙ্গেই হয়তো নিঃসঙ্কোচে নিজেকে খোলা বইয়ের মতো উপস্থাপন করতে পারিনি। এমনকি আম্মু-আব্বুর সাথেও না। আমি জানতাম, আমি সম্ভবত এমনই। ইন্ট্রোভার্ট আর আনসোশ্যাল। আমার এই ভুলটা ভাঙ্গলো সেদিনই, যেদিন বাড়িতে দাদির মৃত্যুর শোকে অমাবস্যা নেমে এসেছিল৷ ভুলটা ভাঙ্গলো বাড়ির এককোণে বসে থাকা একটা বিষন্ন মুখ দেখে। চোখে-মুখে খুচরো বিষাদ অথচ কী উজ্জ্বল তার চাহুনি। বাড়ির পশ্চিমের জারুল গাছটার নিচে বসেছিল সে। মানুষটার শুভ্র পাঞ্জাবী আর শুভ্র চেহারাখানি মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল সেদিন। কী উজ্জ্বল একটা মুখ! কেঁদেকেটে দু,তিনবার অজ্ঞান হলাম, আবার জ্ঞান ফিরে সেই ভারাক্রান্ত স্থির মুখটাই দেখছি। সেদিনই ঘটল এক অলৌকিক ঘটনা। তাকে দেখার পর থেকে আমি জানলাম, বর্ষা নামক বোবা মেয়েটার কারো সাথে রাত জেগে কথা বলতে ইচ্ছে হয়, মাইলের পর মাইল কারো হাত ধরে দেশ থেকে দেশান্তরী হয়ে যেতে ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে হয়, গোটা একটা কৃত্রিম জীবন এক বুক আনন্দ নিয়ে খুব অনায়াসেই কাটিয়ে দিতে৷ ওড়নার কার্নিশে কারো কপালের ঘাম মুছে দিতে ইচ্ছে হয়। জানেন,আমার ছোট্ট কিশোরী মনটা সেদিনই প্রথম আলোর দেখা পেলো!

সেদিন তার পাশে বসতে ইচ্ছে হয়েছিল খুব। তার মেঘে ঢাকা চোখ দু’টো দেখে বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, “আপনি প্লিজ একটু ঠোঁট উল্টে কাঁদুন,নাবিল ভাই। দাদির সঙ্গে সময় না কাটাতে পারার আক্ষেপটুকু চোখের বৃষ্টিতে প্লিজ ঝেরে ফেলুন৷ আপনার বিষন্ন মুখটা দেখতে আমার একটুও ভালো লাগছে না। খুব কষ্ট হচ্ছে। মন খারাপের গল্পগুলো আমাকে নির্দিধায় বলুন। আমি রোমাল এগিয়ে দেবো, মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দেবো। প্লিজ একটু কাঁদুন!”

আপনি কাঁদলেন না। জড়বস্তুর মতো ঠায় বসে রইলেন। শোকের বাড়িতে শতগুণ শোক নেমে এলো আপনার নিরব দুঃখে। আমার ভীষণ মায়া হয়েছিল আপনার জন্য। কেন হয়েছিল সেটা বোধহয় আজ ভালোই বুঝতে পারছি।

এর পর আর-ও কয়েকবারই এহসান মঞ্জিল আপনার দেখা পায়। আমার লজ্জা, আড়ষ্টতা, আর পালাই পালাই ভাবটা দিন দিন বেড়েই চললো। আপনাকে দেখামাত্রই আমার যে কী হয়–জানি না। শুধু বুঝি, আমি খুব লজ্জা পাই! আবার কাছেও চাই আপনাকে। কী অদ্ভুত ব্যাপার, তা-ই না?

চিঠির পৃষ্ঠা বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আমার হৃদপিণ্ডের উঠানামাও। ভারী আশ্চর্য কথা! আপনি চিঠিটা পড়ছেন ভেবেও কেমন ব্যাকুল হয়ে উঠছি। চিঠিতে আপনার হাতের ছোঁয়া লাগছে ভেবেও কতো এলোমেলো শিহরণ আমার! আচ্ছা, চিঠিটা পড়ার সময় আপনি কী করছেন, নাবিল ভাই? শুয়ে আছেন– নাকি বারান্দায় বসে? কিংবা আমার কলমে আঁচড় লাগা শব্দগুলো আপনার চেহারার প্রতিক্রিয়া কেমন পরিবর্তন করেছে? আপনি কি বিস্মিত? নাকি অনেকটা রাগ হচ্ছে? তা হোক। আপনার রাগ না সইতে পারলে এ আবার কেমন ভালোবাসলাম?

হা হা। দেখুন না? বলি না বলি না বলেও কতো অপ্রাসঙ্গিক কথার ঝুলি খুলে বসেছি। এতোকিছুর মধ্যে এটাও ভুলেই গেলাম, আমি যে আপনাকে লিখে কথা পাঠাচ্ছি। কেন যেনো মনে হচ্ছে, আমি ঠোঁট নাড়িয়ে বলছি এসব, আর আপনি গালে হাত ঠেকিয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনছেন সামনে বসে। কখনও কখনও কপালের খুচরো চুল সরিয়ে দিচ্ছেন আমার! হয়তো এমনটা কামনা করি বলেই মনে হচ্ছে!

নাবিল ভাই, জানেন? আমি ভীষণ একা! আমার আজ-কাল খুব মন খারাপ হয়। উত্তাল মহাসমুদ্রের ক্ষুদ্র বিচ্ছিন্ন দীপের মতো একা আমি! এতোটাই একা যে– মাঝেমধ্যে ভীরের মধ্যেও পৃথিবীটাকে শূন্য লাগে! মনে হয়, কোথাও কেউ নেই…কেউ কখনোই ছিল না! অনেক ভাবলাম, আসলেই অনেকটা ভেবেছি–আমার জীবনের সকল আঁধার মুছে দিতে কেউ একটা বোধহয় সত্যিই চাই। সে-ই কেউ একটা আপনি হলে কি খুব মন্দ হয়? আপনার তলোয়ারের মতো শক্তপোক্ত পুরুষালী হাতটা আমার নরম হাতের উপর লাখলে কি খুব ক্ষতি হবে? দেখুন না একটু চেষ্টা করে! একটু ভালোবাসার চেষ্টা করুন আমায়! ব্যাপারটা অতোটাও কঠিন না।

গত চারটা বছর ধরে আপনাকে নিয়ে কতো সুক্ষ অনুভুতি লালন করলাম। আমি অনেক ভেবে দেখেছি নাবিল ভাই– আপনাকে ছাড়া এই কোলাহলময় পৃথিবীটায় আমার বড্ড একা লাগবে! দুঃখে দুঃখে আমি শান্ত নদী হয়ে যাবো। একটা নির্ঘুম রাত নির্জন রাস্তায় আপনি ছাড়া আর কারো সাথে হাঁটতে পারবো না৷ আমার নিরব পথের পথিক হওয়ার জন্য হলেও একটু চেষ্টা করে দেখুন আমাকে ভালোবাসার! আপনি আমার হয়ে যান, নাবিল ভাই। আমারই থাকুন! আমি আপনাকে বুলবুলির বাচ্চার মতো আগলে বাঁচতে চাই!

ইতি
আপনারই বর্ষণ ”

আলমারি খুলে একটা টি-শার্ট খোঁজার সন্ধান করছিল নাবিল। হঠাৎ চোখ যায় এককোণে পরম অবহেলায় পড়ে থাকা চিঠিটার উপর। গিফ্টটা সে অনেক আগেই খুলে ফেলেছিল। চিঠিটার কথা খেয়াল ছিল না। আজ দেখেই কৌতুহলে মেলে ধরেছিল সেটা। কৌতুহলের চিঠিখানা ভেতরটাকে দুমড়েমুচড়ে শেষ করে ফেলবে জানলে সেটা আলমারির এককোণেই ফেলে রাখতো। জমাতো আরও অবহেলা।

চোখ দু’টো বুঝে লম্বা শ্বাস নিয়ে পূনরায় সাদা কাগজটার পানে চাইলো নাবিল। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে কপালে হাত ঠেকাল। ঘনঘন শ্বাসপ্রশ্বাস বাড়ছে। কাগজটা ভাজ করে বালিশের নিচে রাখলো সেটা। ধীরপায়ে উঠে জানালার পাশে দাঁড়াল। বুকের ভেতর তান্ডব শুরু হয়েছে। নানান রকম ভাবনায় মন উৎকণ্ঠিত। আকাশের পানে চেয়ে পূনরায় গাল ফুলিয়ে শ্বাস ফেলে আকস্মিক নিজের হাত দিয়ে আঘাত করে বসল লোহার গ্রিলে। ক্রোধে নিজের চুল টেনে ধরল। সজোরে আছাড় মারল হাতের ফোনটা। চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে তার। ভাঙ্গচুর করতে ইচ্ছে করছে। শিট! শিট! শিট! অনেক বড় ভুল হয়ে গেলো। অনেক বড়! হাত দিয়ে পরপর কয়েকটা ঘুষি মারল দেয়ালে। রক্ত পড়ছে হাত থেকে। সেসব পরোয়া করলো না সে। অস্থির পায়ে ঘরময় পায়চারি করে বেশ কিছুক্ষণ পর নিজেই ভাঙা ফোনটা মেঝে থেকে হাতে নিলো। পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। উপরের ডিসপ্লেটা ভেঙ্গেছে কিছুটা৷ হাত থেকে চুয়িয়ে চুয়িয়ে রক্ত পড়ছে ফোনে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর কাঙ্ক্ষিত নাম্বারটি পায়। ডায়াল করে সে।

“হ্যালো।”

শাহিনা বেগমের কন্ঠ। নাবিল বারকয়েক নিঃশব্দে শ্বাস ফেলে ধাতস্থ হয়। কন্ঠ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে শুধায়, “বড়মা, বর্ষা ঘুমিয়ে পড়েছে?”

তিনি বিভ্রান্ত হলেন। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে কৌতুহল নিয়ে বললেন, “ঘুমায়নি মনে হয়। কেন বল তো?”

নাবিল আমতাআমতা করে। “কাজ ছিল। একটা প্রয়োজনীয় পেপার ফেলে এসেছি আমার রুমে। ফোনটা ওকে দাও, আমি বুঝিয়ে বলছি। ও খুঁজে বের করবে।”

মনে মনে কী ভাবলেন তিনি কে জানে। কথা বাড়ালেন না আর। চুপচাপ ফোনটা বর্ষার হাতে এগিয়ে দিলেন। যাওয়ার আগে কেবল হাসলেন মিটিমিটি। কয়েকবার হ্যালো বলার পর অপর পাশ থেকে পুরুষালি স্বরটা শুনতে পায় বর্ষা। নাবিলের কন্ঠ দৃঢ়। চিঠির ব্যাপারে কোনোপ্রকার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন না চেয়েই স্পষ্ট স্বরে বলল, “দেখা করো আমার সাথে।”

বর্ষা সহসাই শোয়া থেকে উঠে বসলো৷ উত্তেজনার দরুন গলা দিয়ে কথাই বের হচ্ছে না। আমতাআমতা করলো মেয়েটা। “ইয়ে মানে, এখন?”

“আগামীকাল।”

“ঠিক আছে। কোথায় দেখা করবো আমরা?”

“কোথায় আসলে সুবিধা হয় তোমার?”

“আমি আসি? মানে আগামীকাল আমি এমনিতেও ঢাকায় যাচ্ছি৷ আপনি শুধু শুধু কষ্ট করতে হবে না, আমিই না-হয় আসবো।”

“হু। বাস টার্মিনালে এসে ফোন করবে আমায়। আমি রিসিভ করবো গিয়ে।”

ফোন রেখেই দুই হাতে বুকে এনে লম্বা শ্বাস নিলো বর্ষা। এ তো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি পড়ার মতো ব্যাপার। চোখে-মুখে আনন্দ উপচে পড়ছে। সহসাই লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। এলোমেলো করলো আলমারিতে ঘুছিয়ে রাখা জামা-কাপড়েরগুলো। কোনটা পরবে কাল? কোনটা পরলে নাবিল ভাই মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকবে? পাগলের মতো চেঁচাল কিছুক্ষণ। গ্যালারিতে বসবাস করা নাবিলের ছবিগুলো ঘাটল। একটা ছবি বুকে জড়ালো, টপাটপ সেটায় চুমু খেলো কতোগুলো। বর্ষা স্বপ্ন দেখছে না তো? নাবিল ভাই দেখা করতে চায় তার সাথে? তার মানে, চিঠিটা পড়েছে সে! উফ! উফ! উফ! উত্তেজনায় কেমন এলোমেলো লাগছে বর্ষার। ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলতে ইচ্ছে হলো আবেগের তাড়নায়। সত্যি সত্যি কাঁদলোও। এই বালিশ জড়িয়ে ধরছে, তো এই খিলখিল করে একা একা হাসছে। খুশিতে ঘরটাকে উল্টেপাল্টে লন্ডভন্ড করে ফেলতে ইচ্ছে হলো। করতে পারলে ভালো হতো। দুই হাত ছড়িয়ে লাফালো খাটের উপর। বিছানার চাদর,বালিশ অগোছালো হয়ে ঘরের বিদিগিস্তা অবস্থা। নীল রঙের শাড়ীটা বুকে জড়িয়ে পুরো ঘরে ঘুরে ঘুরে আবেগ ঢেলে গুনগুন করে গাইলো,

“কী দিয়া মন কাড়িলা, ও বন্ধুরে…
অন্তরে পিরিতের আগুন ধরাইলা….”

[ভার্সিটি থেকে ফিরতে লেইট হয়েছে বলে লিখতেও সময় লাগল।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here