হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পর্ব:23

0
41

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:23

গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে বসে আছে নিস্পাপ,মস্তিষ্ক জুড়ে হাজার টা চিন্তার বিস্তার।ত্রিজয়ের সাথে বাকবিতন্ডার মধ্যে কাল রাতে তার কাছে আসা সত্যবীনা পাখির কথা একদমই ভুলে গিয়েছিলো সে।

চারপাশের প্রকৃতি শান্ত হতেই আবারও মনে পরে গেলো সত্যবীনা পাখির কথাগুলো।সমস্ত চিন্তা ভাবনা ম্লান হয়ে, সেই অদ্ভুত শিহরণ জাগানো মূহুর্তটা রাজ করতে শুরু করলো তার মন মস্তিষ্ক জুড়ে।সত্যবীনা পাখির বলা প্রতিটি বাক্য মনে পড়তেই কাল রাতের মতোই অদৃশ্য শিহরণ বয়ে গেলো তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

গাড়ির সামনের সিটে বসে আছে ইভান।প্রায় বেশ কিছুক্ষন চুপ থেকে গলা খাকালো সে,স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,

“কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করতে পারি?”

ইভানের কথায় একটু নড়েচড়ে উঠলো নিস্পা, অস্ফুটে বললো,

“হু?আমাকে বললেন?”

“হ্যাঁ।” ছোট্ট জবাব দিলো ইভান।

নিস্পাপ তাড়াহুড়ো কন্ঠে বললো,

“হ্যাঁ বলুন না, কি প্রশ্ন?”

ইভান জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো,

“না আসলে আপনার চোখ কি জন্ম থেকেই,,,,”

পুরো কথাটা শেষ করতে হলো না ইভানের, নিস্পা ম্লান হেসে বললো,

“জন্ম থেকে নয়, একটা এক্সিডেন্টে আমি আমার দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলি।”

“তখন কি আপনার বাবা মা ছিলো? ”

“আমার পাঁচ বছর বয়সে আমার মা মারা যায়।আর তার পাঁচ বছর পর একটা এক্সিডেন্টে আমার বাবা মারা যায় আর ওই এক্সিডেন্টেই আমি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলি।”

ইভানের মনটা নরম হয়ে এলো,নিস্পার জন্য মায়া হলো খুব, আফসোসের সহিত বললো,

“এতো অল্প বয়সে এতো কিছু সাফার করতে হলো।তাহলে তো জীবনযুদ্ধে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে।”

“তাতো একটু হবেই,অন্ধদের জন্য পৃথিবীতো অন্ধকার থাকেই, তাদের সাথে সমাজ আর সমাজের মানুষ গুলোও অন্ধের মতোই ব্যাবহার করে।”

“আপনার মায়ের কি কোন অসুখ হয়েছিলো?”

“না। ” ছোট্ট জবাব দিলো নিস্পা।

“তবে?”

“গলায় ফাসি দিয়ে সুইসাইড করেছে,যদিও আমার বাবা পরবর্তীতে জানতে পেরেছিলেন সেটা সুইসাইড ছিলো না মার্ডার ছিলো।”

নিস্পাপের শান্ত সাবলীল জবাবে চমকালো ইভান,যেহেতু সে আইনের কলকাঠি নাড়ে তাই এসব বিষয়ে একটু বেশিই আগ্রহ থাকে,নিস্পাপের মায়ের কথা শুনেও সেই আগ্রহ টা বাড়লো কিছুটা,কন্ঠে উৎকন্ঠা মিশিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,

“মার্ডার জানার পর আপনার বাবা থানা পুলিশ করে নি?”

“সে অনেক কাহিনি আপনি যেনে কি করবেন।”

“এসব জিনিস সম্পর্কে জানলে অভিজ্ঞতা লাভ করা যায়, প্লিজ বলুন না, আমি শুনছি।”

“শুনবেন?”

“হ্যাঁ বলুন না?আপনার মাকে মার্ডার করার কারণ কি ছিলো? ”

“পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়ে ছিলাম আমি অতো জটিল হিসেব কি বুঝি?তবে আমার মা একজন উকিল ছিলেন,বড় হওয়ার পর শুনেছি কোন বড় মাপের মানুষের বিরুদ্ধে একটা কেস লড়তেন তিনি,আমার মায়ের হাতে নাকি সব প্রমাণ ছিলো,তাই তারা আমার মাকে মেরে ফেলেছিলো।এবং ঘটনাটাকে আত্মহত্যার মতো সাজিয়ে দিয়েছিলো নিখুঁত পরিকল্পনায়।”

“তারপর? ”

“তারপর ওসব নিয়ে নাকি আর ঘাটাঘাটি হয় নি।আমার বাবা আমার মাকে খুব ভালোবাসতো।তিনি বিশ্বাস করতেন আমার মা আত্মহত্যা করতে পারে না, কারণ আমার মা আমাকে আর আমার বাবাকে খুব ভালোবাসতো।তিনি আমার বাবাকে কথা দিয়েছিলো পৃথিবীর কোন খারাপ সময়ে সে আমাদের রেখে কোথাও যাবে না।অথচ তখন ওই কেসটা ছাড়া মায়ের মাথায় নাকি অন্য কোন প্রেসার ছিলো না,তাই আত্মহত্যার কোন প্রশ্নই আসে না।”

“তার মানে এতো কিছু জানার পরেও আপনার বাবা কেসটা নিয়ে ঘাটাঘাটি করে নি।”

“আমাকে নিয়ে আর দাদিকে নিয়ে কোন ঝামেলা পোহাতে চায় নি বাবা, তাই আর তেমন ভাবে ভাবে নি বিষয় টা নিয়ে।আমার যখন দশ বছর বয়স তখন নাকি আমার বাবার হাতে কিছু প্রমাণ আসে,কেউ একজন দিয়েছিলো তাকে, যেখানে স্পষ্ট ছিলো আমার মায়ের মৃত্যু মার্ডার ছিলো।হাতে প্রমাণ পেয়ে আমার বাবা আর চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না,মায়ের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর আবারও কেসটি রিওপেন করেন।”

“তারপর? তারপর কি হয়েছিলো?আসল কালপিটকি ধরা পড়েছিলো?”

নিস্পা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,ছেড়ে দেয় চোখের পানি। নিস্পাপের নিস্তব্ধতা দেখে পেছনে ফিরে তাকায় ইভান,নিস্পাপের চোখে জল দেখে ভিষণ বিব্রত হয়।পকেট থেকে একটা টিস্যু এগিয়ে দিয়ে বলে,

“আপনি কাঁদছেন?আমি কি একটু বেশিই প্রশ্ন করে ফেলেছি?”

নিস্পা চোখে জল রেখে ঠোঁট কামড়ে ধরলো, নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,

“ওই কেসটা রি ওপেন করার সাথে সাথেই উপর ওয়ালা আমার ভাগ্যের খাতা বন্ধ করে দিয়েছেন।আমার সেদিন জন্মদিন ছিলো,দশ বছরে পা রেখেছিলাম আমি।আমি খুব বায়না ধরেছিলাম বাবার সাথে পার্কে বেড়াতে যাবো।বাবা তখন মায়ের কেসটা নিয়ে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিলেন,পরেরদিনই কেসটা কোর্টে উঠার কথা ছিলো,আর প্রমাণ গুলো পেশ করলেই আসল অপরাধীর শাস্তি কেউ আটকাতে পারতো না।

বাবা আমায় নিয়ে বাইরে বেরোনোর রিক্স নিতে চায় নি বোধহয়, হয়তো বিপদ আঁচ করতে পেরেছিলান।তাই আমাকে পার্কে নিয়ে যাবে না বলে বারন করে দিলো।
মা হারা বাচ্চা ছিলাম আমি, তাদের অতো জটিল হিসেব নিকেশ কি আর আমি বুঝতাম?খুব জোর করতে শুরু করলাম বাবাকে,সারাদিন না খেয়ে বসে রইলাম বাবার সাথে অভিমান করে।বাবা উপায় না পেয়ে রাজি হলেন,বিকেল বেলা আমাকে নিয়ে বেড় হলেন পার্কে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।

কিন্তু আমাদের আর পার্ক পর্যন্ত যাওয়া হলো না,মাঝরাস্তায় একটা বড় ট্রাক এসে পিষে দিলো আমাদের গাড়ি টা।আমার বাবা আমাকে বাঁচানোর জন্য গাড়ির দরজা খুলে বাইরে ছুড়ে ফেললেন,রাস্তার পাশে তাড়কাটার বেড়ার উপর গিয়ে ছিটকে পড়লাম আমি,শুনতে পেলাম আমার বাবার শেষ আত্মচিৎকার,

” মা রে,,,,,,,,,,,,”

আর কিছু শুনতে পেলাম না যানেন,আমি সেন্সলেস হয়ে গেলাম।আর যখন জ্ঞান ফিরলো তখন আমি অভিশপ্ত, আমার দুটো চোখের আলো তখন অন্ধকার গ্রাস করে নিয়েছিলো চিরতরে।”

নিস্পাপের কথাগুলো শুনে ইভান থম মেরে রইলো কিছুক্ষন, তারপর আরেকটি টিস্যু এগিয়ে দিতে দিতে বললো,

“কাঁদবেন না,যা হওয়ার তা,,,,,,

বাকি কথাটুকু শেষ করতে পারলো না ইভান, তার আগেই ড্রাইভার গাড়ির ব্রেক কষলো জোড়েসোড়ে।নিস্পা আর ইভান দুজনের নিজেদের জায়গা থেকে সামান্য ঝুকে গেলো সামনের দিকে।ড্রাইভারের এমন হটাৎ করে ব্রেক করায় খুব রাগ হলো ইভানের, চোয়াল শক্ত করে বিরক্তি মিশ্রিত কন্ঠে বললো,

” কি হয়েছে কি আপনার?ব্রেক চাপলেন কেনো?”

ড্রাইভারের নজর তখন সামনের দিকে,সামনে আরো অনেক গাড়ি আটকে গিয়েছে, হাইওয়ে রোডে জ্যাম লেগে যাচ্ছে তাই অবস্থা।ড্রাইবার গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বেড় করলো,চোখ ছোট ছোট করে তাকালো সামনের দিকে,তারপর উত্তেজিত কন্ঠে বললো,

“সামনে মনে হয় কিছু হইছে স্যার,অনেক লম্বা জ্যাম লেগে গেছে, মনে তো হইতাছে আর এগোনো যাবে না।”

ড্রাইভারের কথা শুনে ইভান নিজেও জানালা দিয়ে মাথা বেড় করলো,সামনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো সামনে নিশ্চয়ই কোন কিছু ঘটেছে।ইভান এদিক সেদিক তাকিয়ে একটা লোককে ডাকলো,

“এই ভাই শুনুন।”

লোকটা এগিয়ে এসে দাড়ালো, বললো,

“কিছু বলবেন।”

“সামনে কীসের ঝামেলা হয়েছে?”

“সামনে একটা মেয়ের মাথা কাটা লাশ পাওয়া গেছে,শরীর আছে মাথা নেই।এজন্য জায়গাটা সিল করে দেওয়া হয়েছে,এমপি মশাই ঘটনা স্থলে আছেন তাই কোন গাড়ি সামনে এগোতে দিচ্ছে না।”

ইভান চোখ উল্টালো, অস্ফুটে বললো,

“এমপি মশাই।”

ইভান গাড়ির ভেতর বসে থেকেই চুপচাপ ভাবলো কিছু একটা।পেছনের সিটে বসে থেকে বোর হচ্ছিলো নিস্পা,ইভানকে বললো,

“ভাইয়া কিছু হয়েছে?”

ইভান নড়েচড়ে উঠলো, বললো,

“হু?না কিছু হয় নি, জানালা খুলে দিচ্ছি আপনি মাথা বের করে হাওয়া খেয়ে নিন।”

ইভানের কথাটা নিস্পার মনঃপূত হলো,গাড়ির ভেতর এসির বাতাসে গা গুলিয়ে আসছে তার, তাই বাহিরের স্নিগ্ধ বাতাস শুষে নেওয়ার জন্য মুখ বের করে লম্বা শ্বাস টানলো নিস্পা।ঠিক সেই সময় এমপি তাওসিফ তাকরিমের মনোযোগ পাওয়ার জন্য একেধারে হর্ন বাজাতে শুরু করলো ইভান।

তাকরিম তখন রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলায় মনোযোগ দিয়েছে,সাদা পাঞ্জাবীর হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে মোবাইলটা কানে ধরে আছে সে।চোখ মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যায় হয়তো কোন সিরিয়াস বিষয় নিয়ে কারো সাথে কথা বলছে সে।তন্মধ্যেই অনবরত গাড়ির হর্ন কানে আসতেই বিরক্তিতে চোখ মুখ কুচকে তাকালো নিস্পাদের গাড়ির দিকে।ব্যাস!

চারপাশের কোলাহল, গাড়ির হর্ন বা পথচারীদের ব্যস্ত চলাফেরা সবকিছু থমকে গেল মুহূর্তেই, স্থির হয়ে গেলো সময়, ঠিক সিনেমার কোনো দৃশ্যের মতো। তার দৃষ্টি আটকে গেল গাড়ির জানালা দিয়ে উঁকি দেওয়া নিস্পাপের মুখের দিকে।

নিস্পাপের স্নিগ্ধ, মায়াভরা মুখটায় দৃষ্টি পড়তেই বেড়ে গেল হৃদয়ের ধুকপুকানি , ভারী হয়ে এলো নিঃশ্বাস । উপলব্ধি করলো এক অদৃশ্য টান, এক অপ্রকাশিত অনুভূতি যা চাপা পড়েছিলো অবচেতন মনে ।

টানা তিন দিন পর দেখলো মেয়েটার সরলতায় মোড়ানো মুখটা,তিন তিনটে দিন নাওয়া খাওয়া ছেড়ে পাগল কুকুরের মতো খুজে বেড়িয়েছে নিস্পাকে।আর আজ দেখা হয়েই গেলো, কি এক বিস্ময়, কি এক টান, যেনো পুরো পৃথিবী সংকুচিত হয়ে গিয়ে তার হৃদয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

হাতের মোবাইলটা তখনও কানে, কথোপকথনের সাথে, স্থবির হয়ে গেছে মস্তিষ্কের সব স্নায়ু।তাকরিমের অপলক দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ডেবিল হাসলো ইভান,দ্রুত কন্ঠে বললো,

“গাড়ি ঘোরাও ড্রাইভার, ফাস্ট।”
ইভানের কথা শুনা মাত্রই ড্রাইভার দ্রুত হস্তে গাড়ি ঘোরালো,হাইওয়ে রোড বলে গাড়ি ঘোরাতে তেমন অসুবিধা পোহাতে হলো না ড্রাইভার কে।

গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে বুঝে নিস্পাও মুখটা ঢুকিয়ে নিলো গাড়ির ভেতর।এইবার নড়েচড়ে উঠলো তাকরিম,হাতের মোবাইল ফোনটা চেপে ধরে চেচিয়ে উঠলো,

“আলেকজান্দ্রা,,,,,, ”

নিস্পা স্পষ্ট শুনলো সে ডাক,তড়িঘড়ি করে বললো,

“গাড়ি থামান।আমাকে কেউ ডাকলো মনে হলো।”

ইভান গাড়ি থামালো না, ধীরে ধীরে উঠিয়ে দিলো জানালার গ্লাস,শান্ত কন্ঠে বললো,

“কেউ ডাকে নি আমি এসি অন করে দিয়েছি আপনি একটু ঘুমিয়ে পড়ুন।”

নিস্পা অস্ফুটে শব্দ করে বললো,

“কেউ ডাকে নি?”

“নাহ!কেউ ডাকে নি।”

নিস্পা কথা বাড়ালো না,গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো।

গাড়ির ইঞ্জিন গর্জে উঠা মাত্রই, তাকরিমের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটলো। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়াতে শুরু করলো পাগলের মতো , পাশে থাকা পুলিশদের দিকে চিৎকার করে চেঁচিয়ে উঠলো,

“গাড়িটাকে আটকাও, কুইক।”

তাকরিমের চিৎকারে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি ঘুরে গেলো তার দিকে ,অথচ তাকরিম থেমে নেই, সকলের দৃষ্টিকে তোয়াক্কা না করে দৌড়ের গতি বাড়ালো,দৌড়ের দাপটে আগুনের মতো গরম হয়ে উঠলো পায়ের নিচের রাস্তা।চিৎকার করে বললো,

“দাড়াও আলেকজান্দ্রা,আমার জীবনকে অন্ধকার করে সব আলো কেড়ে নিয়ে গিয়েছো তুমি, আমি অন্ধকারে দগ্ধ হয়ে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছি, আমার হৃৎপিন্ডটা ঝলসে যাচ্ছে তোমার অনুপস্থিতিতে।দয়া কর আলেকজান্দ্রা, আমার প্রান ভিক্ষা দেও,আমাকে বাঁচতে দেও।”

টগবগে পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটছে তাকরিম, নিঃশ্বাস দ্রুততর হচ্ছে,অতিরিক্ত যন্ত্রণা ভির করেছে চোখের কোঠায়, চোখ লাল হয়ে এসেছে, প্রচন্ড জ্বালার সাথে টুপ করে গড়িয়ে পড়েছে এক ফোটা অশ্রু।

পায়ের মাংসপেশি ব্যথায় টনটন করছে,যে ছেলে গাড়ি ছাড়া রাস্তায় বেড় হয় নি, সে ছেলে উন্মাদের মতো দৌড়াচ্ছে মাঝ রাস্তায়। যেনো বাজপাখি বা চিলের মতো এক ছোবলেই ছিনিয়ে আনবে নিস্পাপকে,অথচ নিস্পা তা টেরও পেলো না।

গাড়ি স্পিড তুলেছে। দূরত্ব বাড়িয়েছে।দৃষ্টি সীমার নাগাল থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করা মাত্রজ বুকের ভেতরটা ধ্বংসস্তূপের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করলো তাকরিমের, মাঝরাস্তাতেই বসে পড়লো হাঁটু ভেঙে।গলাকাটা মুরগির মতো ছটপট করতে করতে বললো,

“যদি নিয়তিকে খন্ডানো যেতো,তবে ফিরে যেতাম অতীতে,প্রিন্স জোসেফের আগমনের আগেই জয় করে নিতাম,পালিয়ে যেতাম সূদুরে।আমাদের আর তড়পাতে হতো না আলেকজান্দ্রা।বাঁধা পড়তে হতো না পূনর্জন্মের অলিখিত নিয়তির শিকলে।”

_____________

প্রায় আধাঘন্টার মধ্যেই বাড়ি ফিরে এসেছে ইভান, নিস্পাকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই যাবে ঠিক তক্ষুনি ত্রিজয়ের সাথে মাথায় ধাক্কা খেলো নিস্পা।নিস্পা কপালে হাত রেখে অস্ফুটে শব্দ করলো। ত্রিজয় রাগে কটমট করে তাকালো,গজগজ করে বললো,

“কানা নাকি? চোখে দেখতে পাস না।”

কথাটা বলেই সঙ্গে সঙ্গে জ্বিভ কাটলো ত্রিজয়,তাচ্ছিল্য কন্ঠে বললো,

“কাকে কি বলছি?কানাকে বলছি চোখে দেখে হাঁটতে,এর সাথে থেকে তো আমার মাথাটাই যাবে দেখছি।”

নিস্পা রাগে ক্ষোভে নাক ফোলাল, ক্রোধিত কন্ঠে বললো,

“একদম বাজে কথা বলবেন না,আমি ঠিক মতোই এসেছি আপনি ইচ্ছে করেই আমাকে ধাক্কা দিয়েছেন।আমার তো মনে হচ্ছে আপনার চরিত্রে সমস্যা আছে।”

নিস্পার কথা শুনে ঠোঁট টিপে হেঁসে দিলো ইভান,পরমূহুর্তে ত্রিজয়ের চোখে চোখ মিলতেই নিজেকে দমিয়ে নিয়ে কাঁচুমাঁচু করে দাড়ালো ইভান। মনে মনে বললো,

“কানা বলে কি হয়েছে স্যার, এই মেয়ে আপনার তেড়া ঘাড় ডান্ডা মেরে সোজা করার ক্ষমতা রাখে।”

তারপর উপরের দিকে তাকিয়ে বললো,

“থ্যাংক গড,আমার ঘাড় তেরা স্যারকে জব্দ করার জন্য অবশেষে পাঠালে একজনকে।”

ত্রিজয় রাগে নিসপিস করে বললো,

“এই মেয়ে খবরদার আমার ক্যারেক্টর নিয়ে কথা বলবি না।”

নিস্পা মুখ ভেঙালো,ত্রিজয়কে এড়িয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললো,

“যেই না পদের তাই, নাকে অর্ধেক নাই।আসছে ক্যারেক্টর ওয়ালা।”

নিস্পাপের কথায় আরেকটু ক্ষেপে গেলো ত্রিজয়,ক্ষেপা ষাড়ের মতো নিস্পাপের পেছনে তেড়ে যেতে নিলে ডেকে বসলো ইভান,

“ছাড়ুন না স্যার।”

ত্রিজয় রাগান্বিত কন্ঠে বললো,

“ছাড়বো আবার কি?এই কানার বাচ্চা কি বলে গেলো শুনলে?মুডটাই বিগড়ে দিয়েছে।”

ইভান মুচকি হাসলো, বলল,

“আমার কাছে মুড ভালো করার খবর আছে স্যার।”

ত্রিজয় চোখ বড় করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“কী?”

অত:পর ইভান রাস্তায় ঘটে যাওয়া ঘটনা সবটা খুলে বললো।তাকরিমের কথা শুনে খুশিতে উত্তেজিত হয়ে উঠলো ত্রিজয়, ইভানকে জড়িয়ে ধরে বললো,

“ওয়েল ডান ইভান, ওয়েল ডান। এই প্রথম একটা কাজের কাজ করেছো।”

“ইশস যদি নিজ চোখে দেখতে পেতাম এমপি মশাইয়ের ছটপটানি, কলিজাটা ঠান্ডা হয়ে যেতো ইভান।মিস হয়ে গেলো, খুব মিস হয়ে গেলো। এক কাজ করবো, এই মেয়েটাকে নিয়ে এখন থেকে যেখানে যাওয়ার আমি যাবো, এমপি তাওসিফ তাকরিমের ছটপটানি নিজ চোখে দেখবো ইভান, নিজ চোখে দেখবো।”

ইভান জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো, তারপর একটু অপ্রস্তুত ভঙিতে বললো,

“স্যার আরেকটা কথা ছিলো।”

“কি কথা? ”

“স্যার ওইযে মহিলাটার কেসের কথা বললাম না? ষোল বছর আগের কেসটা, ওই টা কি একটু ঘেটে দেখবেন?”

“নো ওয়ে ইভান,এতো পুরোনো কেস হাতে নিয়ে কি পাবো আমি?ওই গরীব ভিখারি আমার চা নাস্তার ফি ওই মেন্টেইন করতে হিমসিম খাবে।সাফ সাফ বারন করে দেও।”

কথাটা বলেই বেড়োতে চাইলো ত্রিজয়, ইভান আবার ডেকে উঠলো,

“স্যার।”

“আবার কি বলবে?”

“মহিলা বলেছে ভিটে মাটি বিক্রি করে আপনার ফি দিবে, তাও যেনো আপনি কেসটা হাতে নেন।”

ত্রিজয় চুপ করে রইলো কিছুক্ষন, তারপর বৃদ্ধাঙুল দিয়ে কপাল চুলকে বললো,

“কেসটার হিস্টোরি বের করে রাতে আমার সাথে দেখা করবে।”

______________

রাত সাড়ে দশটা নাগাদ,কেসের সব ডকুমেন্ট নিয়ে ড্রয়িং রুপে বসে কথা বলছে ত্রিজয় আর ইভান।

এদিকে ঘুমের মধ্যে বাজে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গিয়েছে নিস্পাপের।আতংকে গলা শুখিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে।প্রতিদিনই এমন হয় তার সাথে, সেই অন্ধকারের আবরানে ঢাকা কালো ছায়ামূর্তির ব্লু ব্লাড গার্ল আর আলেকজান্দ্রার মিশ্রিত ডাক তার ঘুম কেড়ে নেয় প্রতিরাতে।

ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে কম্পিত হাত এগিয়ে নিয়ে টেবিলের উপর পানির গ্লাস টা হাতরে হাতরে খুজতে লাগলো নিস্পা,কিন্তু হাতের অতিরিক্ত কম্পনে কাঁচের গ্লাস্টি ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলো নিচে।

নিস্পা উপায়হীন হয়ে বিছানা থেকে উঠে দাড়ালো,ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো ড্রয়িং রুমের দিকে।

____

“স্যার ষোল বছর আগের কেস,তবে মাঝে একবার রি ওপেন করা হয়েছিলো কিন্তু কোর্টে যার প্রমাণ নিয়ে আসার কথা ছিলো সে এক্সিডেন্টে মারা যায়।তাই উপযুক্ত প্রমানের অভাবে কেসটা আবারো বন্ধ হয়ে যায়।”

ইভানের কথা শুনে ত্রিজয় গম্ভীর কণ্ঠে বললো,

“ডিটেইলসে বলো।”

“বড়লোক বাপের একমাত্র ছেলে সখের বসে গাড়ি ড্রাইভিং করতে চেয়েছিলো,তার ভুল ড্রাইভিং এর কারনে ওই মহিলার দুটো বাচ্চা আর একটা প্রেগন্যান্ট মেয়ে চাপা পড়ে মারা যায়।মহিলার স্বামী ছিলো নাকি তাদের সাথে।মানে বাপ তার দুই ছেলে আর প্রেগন্যান্ট মেয়েকে নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলো।আর তখনই গাড়ির নিচে চাপা পড়ে।”

“তাহলে মহিলার স্বামীকে পাষানো হলো কীসের ভিত্তিতে?”

“উল্লেখ আছে বাচ্চাদের বাবা মানে মহিলার স্বামীর পরকেয়া ছিলো, আর সেই মহিলার সাথে দেখা করার সময় বাচ্চারা নাকি দেখে ফেলেছিলো এজন্য তিনজনকে গাড়ির সামনে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিলো।যদিও এসব মিথ্যা বানোয়াট গল্প সাজানো হয়েছিল। বড়লোক বাপ তার ছেলেকে বাঁচানোর জন্য।”

ত্রিজয় বিরক্তিতে দাঁত পিষলো, রাগান্বিত কন্ঠে বললো,

“বড়লোক বাপ বাপ কেন করছো তখন থেকে?বড়লোক বাপটা কে?আর তার ছেলের নামই বাকি?”

“শুনবেন?”

ত্রিজয় আরেকটু তেজি কন্ঠে বললো,

“মশকরা করছো আমার সাথে?”

ইভান মুচকি হাসলো, মাথা চুলকে বললো,

“নামটা শুনলে ঝটকা খাবেন।”

ত্রিজয়ের কপালে ভাজ পড়লো, সন্দিহান কন্ঠে বললো,

“কে?”

“সাবেক এমপি তোফাজ্জল তাকরিমের ছেলে এমপি তাওসিফ তাকরিম।”

নামটা শোনা মাত্রই ত্রিজয়ের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো, উত্তেজিত কন্ঠ চওড়া করে বললো,

“হোয়াট?”

“হ্যাঁ স্যার, তবে আর বলছি কি?”

ত্রিজয় এবার একটু সিরিয়াস হলো, চট করেই টেনে নিলো ইভানের হাতে ধরে রাখা ফাইল টা, ব্যাস্ত ভঙিতে চোখ বোলাতে বোলাতে বললো,

“ষোল বছর আগে কেসটা একটা মহিলা উকিল হ্যান্ডেল করেছে দেখছি।”

ইভান সম্মতিতে বললো,

“হ্যাঁ স্যার,এডভোকেট কামিনী শিকদার কেস টা হ্যান্ডেল করেছিলো।খোঁজ নিয়েছিলাম আমি, বর্তমানে বেঁচে নেই।”

ড্রয়িং রুমে এসে দাড়াতেই ইভান আর ত্রিজয়ের সমস্ত কথাই কানে এলো নিস্পার,কোন রুপ মাথা ঘামালো না তাদের কাজের বিষয়ে, নিজের মতোই পানি না পেয়ে ফিরে যাচ্ছিলো ঘরের দিকে, কিন্তু এডভোকেট কামিনী শিকদারের নামটা কানে যেতেই থমকে গেলো তার পা, উত্তেজিত কন্ঠ থেকে ধেঁয়ে বেড়িয়ে এলো,

“মা,,, আমার মায়ের নাম কামিনী শিকদার।”

‼️সবার আগ্রহ দেখেই তাড়াতাড়ি লিখলাম, নয়তো লেখার আগ্রহ ছিল না।তাই প্লিজ সবাই বেশি করে রেসপন্স করবেন। ‼️

চলবে,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here