#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্বঃ 62 (⭕118+ এলার্ট)
(পেজের রিচ কমে গিয়েছে।সবাই একটি করে মন্তব্য করবেন প্লিজ🙂)
একটি অবর্ননীয় পরিস্থিতি। সময় স্থান কাল আর ঘটিয়াম কাজগুলো ভিষণ ভাবে প্রভাবিত করলো অনুকে।অনুর কাছে এটি একটি জঘন্যতম অনুভূতি,তার জীবনের সবচেয়ে বাজে অভিজ্ঞতা।
একটা পুরুষ, যে কি-না একটা খুনি,যে তাকে আটকে রেখেছে অন্য একটা মেয়েকে পাওয়ার জন্য, যে তাকে কথায় কথায় হুমকি দেয়,কথায় কথায় ছুড়ি ধরে গলায়,যার কাছে তার কোন সম্মান নেই,না আছে কোন সহানুভূতি।যার আগা গোড়া সম্পূর্ণ টা স্বার্থপর আর শয়তানের প্রতিচ্ছবি, যাকে সে জীবনের সবচেয়ে বেশি ঘৃনা করে সেই জঘন্য মানুষটার ঠোঁট জোড়া তার ঠোঁটে আবদ্ধ।ঘৃনায় পেট উগড়ে বোমি আসছে অনুর।নিজের তুচ্ছতম শক্তি দ্বারা ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে কিয়ানের ঔষ্ঠদ্বয়ের কবল থেকে।
এদিকে ফোনের স্ক্রিন থেকে একনাগাড়ে ভেসে আসছে ইভানের ক্রোধিত কন্ঠ,
“এই কুত্তার বাচ্চা ছাড় ওকে,জানে মেরে দেবো আমি তোকে।”
কিয়ান ছাড়লো না,যতক্ষণ না ইভানকে তড়পানো পুরো মজাটা লুপে নিচ্ছে ততক্ষণ ছাড়লো না সে।অথচ ইভান ক্রোধে ফেটে যাচ্ছে,মোবাইল স্ক্রিনের অপর প্রান্ত থেকেই কিয়ানকে আস্ত গিলে খেয়ে ফেলবে এমন মনে হচ্ছে।সে সহ্য করতে না পেরে বিক্ষুব্ধ কন্ঠে আবার চেচালো,
“ছাড় বলছি ওকে,ছাড়।”
কিয়ান ছাড়ালো,মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে শ্লেষ হাসলো,বৃদ্ধাঙুল দিয়ে ঠোঁট ঘষে বললো,
“কুল ডাউন মিস্টার ইভান।কুল ডাউন।ইসস মেয়েটার জন্য আপনি এতো দেওয়ানা আমাকে আগে বলা উচিত ছিলো আপনার,বললে অন্তত আরও আগে খেয়ে দিতাম,কি বলুনতো কাউকে প্রচন্ডরকম তড়পাতে ভিষণ ভালোলাগে আমার।”
ইভান রাগে হিসহিসালো,চেচালো ফের,
“কুত্তার বাচ্চা তুই ওকে স্পর্শ করবি না,হাত ছিড়ে আলাদা করে ফেলবো।”
কিয়ানের অভিব্যক্তি শক্ত,তবে কন্ঠ ধারালো ভিষণ, রাগের উত্তাপ বেড়িয়ে এলো প্রতিটি বাক্যে,
“এই স্পর্শ করবো না কি আবার?স্পর্শ করবো মানে করবো।হাজার বার করবো।আমার বউকে আমি স্পর্শ করবো না তো কি অন্যকেউ করবে?তবে আমি তোকে লাইভ টেলি কাস্ট দেখাতে পারি।যে সে জিনিসের নয় বস, একদম ন্যান্টা বাসরের লাইভ দেখতে পারবি।”
রাগে কান জ্বলে উঠলো অনুর,তেজ দেখিয়ে বললো,
“ছিঃ, আপনি এতো খারাপ কেন?”
কিয়ান ফোনটা অনুর বিছানায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে পকেট থেকে একটা ছুরি বের করলো,তারপর অন্য হাত দিয়ে অনুর কোমরটা টেনে আনলো নৈকট্যে,হাতের ছুরিটা অনুর দুই ঠোঁটের উপর রেখে শান্ত সাবলীল কন্ঠে বললো,
“এসো আমার মতো আরেকটা নমুনা ডাউনলোড দেই।”
“থার্ডক্লাসের বাচ্চা লাত্থি দিয়ে আপনার জেরক্স মেশিন নষ্ট করে দিলে কি হবে?”
অনু নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে ধাক্কা দিলো কিয়ানের বুকে,কিয়ান এক চুলও টললো না,বরং নিস্পার আক্রোশ চাপা মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
“তবে সিদ্ধান্ত পাল্টালাম, এই ছুড়িটা দিয়ে আগে মাথা নয়, পা কেটে রেখে দেবো।”
কথাটা বলেই অদ্ভুত ভাবে অনুকে ছেড়ে দিলো কিয়ান।অনু ভ্রু গোটালো, কিছু বুঝে উঠার আগেই কিয়ান তার গতিপথ পাল্টালো,ছুরিটা হাতে নিয়ে পা হেলেদুলে এগোতে শুরু করলো চিত্রার দিকে।চিত্রা ভয়ে তটস্থ,আতংকে শুখনো ঢোক গিললো,ভয়মিশ্রিত স্বরে বললো,
“আপনি আমার দিকে এগোচ্ছেন কেন?”
কিয়ান উত্তর দিলো না।ছুড়িটা হাতে নিয়ে অদ্ভুত ভাবে এগোতে এগোতে বিশ্রী ভাবে ঘাড় কাত করলো।ভয়ে ধ্বকধ্বক করে উঠলো চিত্রার বুক যেন চোখের সামনে স্বয়ং আজরাইলকে দেখছে সে।তার কণ্ঠনালী কেঁপে উঠলো,সে এক পা এক পা পিছিয়ে যেতে যেতে বললো,
“ইভান!ইভান!উনি আমার দিকে এগোচ্ছে ইভান।কিছু করুন,ভয় হচ্ছে আমার।”
ইভান লাইনেই আছে কল কাটে নি।বাড়ির গেটের বাহির থেকে ভেতরের দিকে দৌড়াচ্ছে সে,ঘেমে নেয়ে একাকার,দৌড়াতে দৌড়াতে শার্টের হাতা দিয়ে মুখের ঘাম মুছলো একবার,তারপর ফোন কানে ধরে চিৎকার করে বললো,
“ডোন্ট ওয়ারি, ডোন্ট ওয়ারি চিত্রা।আমি আসছি।আমি থাকতে কিচ্ছু হবে না তোমার।আমি আছি না, কিচ্ছু হবে না তোমার।”
মোবাইলটা অবহেলায় বিছানায় পড়ে আছে।ইভানের চিৎকার চিত্রা অব্দি না পৌছালেও অনু ঠিকই শুনতে পেলো ইভানের বুক ছিঁড়ে বেড়িয়ে আসা ধরপড়ানির শব্দ।অনু কি করবে ভেবে পেলো না।লোকটাকে বাধা না দিলে নিশ্চিত কিছু একটা করে ফেলবে,তার জন্য একটা নির্দোষ মেয়ের প্রান চলে যাবে এটা কি করে হতে দেবে সে?অনু উপায়ন্তর না পেয়ে একটা ফুলদানি হাতে তুলে নিলো, তারপর কিয়ানের দিকে তাক করে বিক্ষিপ্ত কন্ঠে বললো,
“এই এই ওকে ছেড়ে দিন।আপনি ওর দিকে এগোচ্ছেন কেন?”
কিয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো অনুর রক্তাভ মুখের দিকে,তারপর ধিম কন্ঠে বললো,
“খুন করবো বেইবি।তুমি জানতে চেয়েছিলে না আমি খুনি কিনা?চলো তোমাকে প্রেক্টিকেলি দেখাই।”
কিয়ান চিত্রার খুব কাছে পৌছে গেলো,ছুড়িটা নেড়েচেড়ে দেখলো একবার, তারপর চিত্রার গলায় চালাতে যাবে ঠিক তক্ষুনি অনু করে বসলো অকুতোভয় কাজ,নিজের হাতের ফুলদানি টা সোজা মেরে দিলো কিয়ানের মাথায়।কিয়ান মাথায় হাত দিয়ে অনুর দিকে তাকালো,অনু ভয়ে হাতের ফুলদানি টা ছুড়ে ফেলে দিয়ে তটস্থ কন্ঠে বললো,
“আমি বলেছিলাম না আমি সাধারণ মেয়ে নই।”
কিয়ান হাতের ছুরিটা ছেড়ে দিলো,ধাতব বস্তুটা ফ্লোরে পড়ার সাথে সাথে ঝনঝন শব্দ করে উঠলো, সেই শব্দে অনুর দুঃসাহসী আত্মাটা লাফ দিয়ে উঠলো কয়েকবার।কিয়ানের চোখ বন্ধ হয়ে এলো,ঝাপসা দৃষ্টি বুঝে আসার আগ পর্যন্ত তাকিয়েই রইলো অনুর দিকে,হ্যাসহ্যাসিয়ে বললো,
“মীরজাফর মালেকার জমজ বোন।তুই শেষ।”
কিয়ান ধপ করে পড়ে গেলো বিছানার উপর।অনু ভীরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।চিত্রা শঙ্কিত পায়ে এগিয়ে এলো অনুর কাছে,বিচলিত কন্ঠে বললো,
“এটা তুমি কি করলে?এখন কি করবে?চলো পালাই।”
অনু অপারগ চাইলো চিত্রার মুখের দিকে,স্থবির কন্ঠে বললো,
“কোথায় পালাবো আমি?আমার অপেক্ষায় কেউ নেই।আমার পালিয়ে যাওয়ারও যায়গা নেই।তুমি চলে যাও।”
চিত্রা খপ করে দুহাতে চেপে ধরলো অনুর হাত,উদ্বেল কন্ঠে বললো,
“কে বলেছে কেউ নেই?ইভান আছে তো, ও তোমাকে অনেক ভালোবাসে, তোমাকে আগলে রাখবে।”
অনু মলিন হাসলো, চিত্রার দু’হাত নিজের হাতের উপর থেকে সরাতে সরাতে বললো,
“ওটা মরিচিকা চিত্রা।ভুল করে ভাব হয়ে যাওয়ার মতো ছেলেমানুষী।”
চিত্রা উত্তরে কিছু বলতে যাবে ঠিক তক্ষুনি ঝড়ের মতো দৌড়ে এলো ইভান।কথা নেই বার্তা নেই বাজ পাখির থাবার মতো ছো মেরে নিজের বুকের ভেতর ঢুকিয়ে নিলো চিত্রার নাজুক শরীর টা,দিশেহারা দিশেহারা অস্থির কন্ঠে বললো,
“ঠিক আছো? ঠিক আছো তুমি?কিছু হয় নি তো তোমার?সরি।সরি চিত্রা, তোমাকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া একদম উচিত হয় নি আমার।”
কি এক দম বন্ধকর অনুভূতি।চিত্রার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।ইভানের বক্ষের সম্পূর্ণটা ছুয়ে ফেলার আনন্দে এক দল প্রজাপতি উড়তে শুরু করলো প্রেমের গান বেঁধে।এ কেমন আলিঙ্গন।ভালোবাসা তো নয়,তবে কি?যাকে ভালোবাসা যায় না তার জন্য এতো অস্থিরতা এতো ব্যাকুলতা কীসের এই লোকটার?কেন বাড়ায় মিথ্যা মায়া?কেন সৃষ্টি করে এমন মধুময় স্মৃতি।সেতো ভুলে যাবে,কিন্তু এই একটুকরো মূহুর্ত যে কতবার কুড়ে কুড়ে খাবে তার কতশত রাত,সে খোঁজ কি নিতে আসবে লোকটা?
তাকে যে পুড়তে হবে,একা একাই পুড়তে হবে এ দহনে।
কথাগুলো ভাবতেই চোখ ছেপে জল আসতে চাইলো চিত্রার।খুব কষ্ট করে নিজেকে সামলে নিয়ে,মাথা তুললো ইভানের বুক থেকে,তবে বাহু বন্ধন থেকে ছাড়া না পেয়ে রিনরিনিয়ে বললো,
“ক,,কি করছেন আপনি? কন্ট্রোল ইউর সেল্ফ।”
চিত্রার কথা কানে যেতেই হুশ ফিরলো ইভানের।মতিভ্রম কাটতেই,এক ঝটকায় ছেড়ে দিলো চিত্রাকে।নিজের কাজের জন্য লজ্জিত হয়ে কি বলবে যুতসই উত্তর খুঁজে পেলো না,ভেতর থেকে উগড়ে এলো বিরক্তি সূচক শব্দ,
“উফফস।”
তারপর ঠোঁট টিপে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো,
“সরি চিত্রা,ভেরি সরি।আসলে আমি,,
কথাটা শেষ করার আগেই ইভানের দৃষ্টি বর্তালো পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনুর দিকে।সে চিত্রার সম্মুখেই হাল্কা ঝুকলো অনুর দিকে,অশান্ত কন্ঠে বলতে চাইলো,
“অনু,,,,”
অনু নিজের হাত তুলে থামিয়ে দিলো ইভানকে,শক্ত কন্ঠে ব্যয় করলো খুব অল্প কিছু শব্দ,
“পালান,কুইক।”
ইভান ভ্রু বাঁকিয়ে বললো,
“কিন্তু তুমি?ও জেগে উঠলে তোমাকে ছাড়বে না।”
অনু এবারেও অবিচল কন্ঠে প্রত্যুত্তর করলো,
“আমি বুঝে নেবো।”
“কিন্তু আমি তোমাকে ছাড়া যাবো না।”
ইভানের খামখেয়ালি কথায় তেঁতে উঠলো অনু,তপ্ত কন্ঠে বললো,
“আপনি এতো ফালতু কেন হ্যাঁ?একটা বিবাহিত মেয়েকে তার স্বামীর কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাইছেন কোন উদ্দেশ্যে?”
ইভান চরম বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো,উত্তেজিত হয়ে দু’হাতে চেপে ধরলো অনুর দুই বাহু,দম বন্ধকর পীড়াদায়ক কন্ঠে বললো,
“এসব কি বলছো তুমি?তুমি জানো না আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
অনু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে,সে সম্মুখে তাকালো চিত্রার আহত চাহনির দিকে,তারপর নিজের জবান অনড় রেখে দৃঢ় কন্ঠে বললো,
“আমি বিবাহিত।”
ইভানের দৃষ্টি পাল্টে এলো,আলগা হয়ে এলো অনুর বাহু চেপে ধরে রাখা দুটো হাত,সে বিমূঢ় কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“বিয়েটা তুমি মানো?”
অনু তার সিদ্ধান্তে অটল,অদম্য কন্ঠে বললো,
“আপনাকে বলতে বাধ্য নই।আপনারা এখান থেকে চলে যান প্লিজ।”
ইভানের মুখাবয়ব পাল্টে গেলো সেকেন্ডের গতিতে,অনুকে ছেড়ে দিয়ে মুখের উপর লেপ্টে থাকা ঘাম মুছলো শার্টের হাতায়,তারপর স্নায়ু চাপা কন্ঠে চিত্রাকে বললো,
“চিত্রা চলো।”
চিত্রা দ্বিমত প্রকাশ করে বলতে চাইলো,
“কিন্তু,, ”
“চলো।”
ইভানের রক্তাক্ত কন্ঠ থেকে বেড়িয়ে আসা একটি শব্দ চিত্রাকে আর কোন কথা বলার সুযোগ দিলো না।সে বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে পা বাড়ালো ইভানের সাথে।
ইভান প্রথম কদমটা ফেলতে গিয়ে থেমে গেলো।কি যেন মনে করে নিজের মুখটা এগিয়ে নিয়ে এলো অনুর কানের কাছে,ফিসফিসিয়ে বললো,
“মাদারচো*দ।”
____
কোন রুপ বাক্য ব্যয় না করে চিত্রাকে কিয়ানের বাড়ি থেকে নিয়ে সোজা চলে এসেছে ইভান।তবে বাড়িএ দিকে যায় নি।খুব স্প্রিডে মিনিট বিশেক গাড়ি চালিয়ে এসে থামলো একটা খালি রাস্তায়।
গাড়ি থামিয়েই হনহনিয়ে নেমে গেলো ইভান।কোন কথা নেই চিন্তা ভাবনা নেই,গাড়ি থেকে নেমে হাটতে শুরু করলো সামনে,যেন প্রতিটি কদমে অনুর প্রতি জন্ম নেওয়া রাগ দলিতমথিত করছে সে।
গাড়িতে বসে ভ্যাবলার মতো ইভানের দিকে এতোক্ষণ তাকিয়ে ছিলো চিত্রা।মানুষটার মনের ভেতর কি চলছে ভালোই বুঝতে পারছে চিত্রা।তাই চুপচাপ ইভানের পেছন পেছন নিজেও গাড়ি থেকে নেমে হাটা শুরু করলো, ইভানের সাথে পায়ে পা চালিয়ে বললো,
“আপনি এভাবে চলে এলেন কেন?অনুকে নিয়ে আসা উচিত ছিলো।”
চিত্রার কথায় কোনরুপ হেলদোল দেখালো না ইভান,ছোট্ট করে বললো,
“প্রয়োজন নেই।”
“কিন্তু আপনি তো ওর জন্যই,,,”
“ওকে অন্য কেউ ছুয়ে ফেলেছে দেখলে না?”
“তো?
“তো আর কি?অন্যের ইউজ করা মাল আমার প্রয়োজন নেই।”
ইভানের স্পষ্ট জবাবে তব্দা খেয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে গেলো চিত্রা।এই লোকটার রুপ একবার একেক রকম।যখন যেই রুপ সামনে আসে চিত্রাকে বিব্রত না করে ছাড়ে না।এ কেমন মানুষ ভাই।ফিলিংসের চল্লিশা করে দিয়ে এমন স্পষ্ট কথা বলে কি করে?
“দাঁড়িয়ে গেলে কেন?”
সাত পাঁচ ভাবনার মাঝেই ডাক পড়লো ইভানের।চিত্রা নড়েচড়ে দাড়ালো, তবে এক পাও এগোলো না,অস্ফুটে বললো,
“আপনাকে এই মূহুর্তে অচেনা লাগছে।”
ইভান ভ্রুকুটি তুলে বললো,
“কেন?আমার রুপ যৌবন কোন দিক দিয়ে বেড়েছে নাকি?”
চিত্রা কটমট করে তাকালো ইভানের দিকে,নাকের ডগা ফুলিয়ে বললো,
“এতো আজাইরা কথা কই পান আপনি?”
ইভান নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে হাসলো,বিপরীতে কিছু বলার জন্য চিত্রার দিকে তাকাতেই হুশ উড়ে গেলো তার,একটা গাড়ি হাই স্প্রিডে ছুটে আসছে,গাড়িটা উচ্চশব্দে হর্ন বাজাচ্ছে অথচ কানেই তুলছে না মেয়েটা,নতো সরে দাড়াচ্ছে সেখান থেকে,তার সমস্ত ধ্যান তখন ইভানের হাসির মাঝেই নিবদ্ধ।ইভান উপায় না পেয়ে দৌড়ে গেলো,হেচকা টান মেরে সরিয়ে নিলো চিত্রাকে।চিত্রা টাল সামলাতে না পেরে থুবড়ে পড়লো ইভানের বুকের উপর। ইভান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চিত্রাকে নিয়ে পড়ে গেলো রাস্তার উপর,অপ্রত্যাশিত ভাবে তখনই ঘটলো অঘটন। চিত্রার লিপস্টিকে রাঙা ঠোঁট দু’খান ভিষণ বাজে ভাবে ঘষা খেলো ইভানের খরখরে ঠোঁটের সাথে।
ঘটনার আকস্মিকতায় চোখ মার্বেলের মতো বড় বড় হয়ে গেলো চিত্রার।বিদ্যুৎ গতিতে উঠে বসলো ইভানের উপর থেকে।ইভানও উঠে দাড়ালো প্যান্ট ঝেড়ে ঝুড়ে।ঘটিয়মান ঘটনায় লজ্জিত দুজনেই,চিত্রা সেই যে চিবুক নামিয়েছে আর তোলার নাম গন্ধই নেই।
ইভানও পড়েছে খুব অস্বস্তিতে।দুজনের চুপ করে থাকাটা সেই অস্বস্তি টা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।তাই চুপ না থেকে কথা বলতে চাইলো,ইনিয়েবিনিয়ে বলতে চাইলো,
“আসলে,,,
ইভান কি বলতে চাইছে?বেফাঁস কিছু নয়তো? ভাবতেই কলিজাটা বরফে মতো জমে গেলো চিত্রার,সে ব্যাপারটা পান্তাভাতের মতো ছোট খাটো বিষয় মনে করার ভং ধরে ঠোঁটে হাত রেখে বললো,
” ওহ গড!আমার লিপস্টিক।”
চিত্রা বিষয় টা এড়িয়ে যেতে যেতে যে লিপস্টিকের গুরত্ব দিতে চাইছে ভালোই বুঝতে পারলো ইভান।তাই নিজেও একটু ভং ধরে বললো,
“ওহ গড!একটুর জন্য পেট খারাপ হওয়া থেকে বেঁচে গেছি।”
চিত্রার থোতা মুখ ভোতা হয়ে গেলো, চোখ উল্টে বললো,
” মানে?”
“মানে আর কি?পৃথিবীর অর্ধেক ছেলের পেট খারাপের কারণ তো এই ননব্র্যান্ডেড লিপস্টিক।বিড়ালের পায়খানার মতো জিনিসটা একবার যদি পেটে ঢুকে যেত, আমার কি অবস্থা হতো ভাবতে পারছো?”
“ছিঃ ওয়াক।আপনি এতো জঘন্য কথা কি করে বলেন?”
ইইভান দুজনের মধ্যকার অস্বস্তিটাকে পুরোপুরি নরমাল করতে আফসোস করে বললো,
“এই জঘন্য জিনিসটা ভবিষ্যতে আমার ডিজিটাল খাবারে রুপান্তর হবে সেটা ভেবেই ঘুম হারাম,আর তুমি পড়ে আছো কথা নিয়ে।”
চিত্রা সরল মনে উপদেশ দিলো,
“তাহলে আপনার ভবিষ্যৎ বউকে ঠোঁটে লিপস্টিক পড়তে বারণ করে দিবেন।”
ইভান বিরোধিতা জানিয়ে বললো,
“উঁহু, সেটা সম্ভব নয়।”
“কেন?”
“স্যার বলেছে লিপস্টিক ছাড়া ঠোঁটের টেস্ট শুটকি মাছের মতো জঘন্য লাগে।”
ইভানের এবারকার উত্তরে আরেক দফা তব্দা খেলো চিত্রা, ভ্যাবাচেকা খেয়ে বিরবির করল,
“যেমন স্যার তেমন তার এসিস্ট্যান্ট। বাহ!”
______
কাল রাতে বাড়ি থেকে জরুরি কাজে বেড়িয়েছিলো তাকরিম।বরিশালে গিয়েছিলো কোন এক দরকারে।সারাদিন কাটিয়ে সেখান থেকে মাত্রই ফিরলো সে।রাত আটটা কি নয়টা হবে।বাড়িতে এসে জানতে পারলো কাল রাত থেকে নিস্পা ত্রিজয় দুজনের একজনও নাকি বাড়িতে নেই।
খবরটা শুনতেই মাথা গরম হয়ে গেলো তার।তবে তেমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখালো না।যেহেতু ত্রিজয় নেই সেহেতু ত্রিজয়ের সাথেই আছে নিস্পা,তাই নিস্পার বিপদ হওয়ার তেমন আশঙ্কা বা ভয় নেই।
বরিশালে গিয়ে এক ভয়ংকর তথ্য যেনে এসেছে সে। আপাতত সেটার সত্যতা খুটিয়ে দেখতে হবে।নয়তো মাথা ঠান্ডা হবে কিছুতেই।এম্নিতেই ঘটনা আন্দাজ করে মস্তিষ্ক নিস্ক্রিয় লাগছে তার।
সে দ্রুত পায়ে চলে গেলো প্রভার ঘরের দিকে।প্রভার ঘর অন্ধকার।তাকরিম এসে লাইট অন করলো। কিন্তু ঘরের কোথাও প্রভা নেই।
তাকরিমের সন্দেহ প্রগাঢ় হলো।রাতের বেলা কোথায় গেলো মেয়েটা,সে তো দিনের বেলাতেই বাইরে বের হয় না,তাহলে কি এমন প্রয়োজনে বাইরে বেড়োলো সে?
তাকরিম কিছু একটা ভেবে সোজা বাড়ির বাইরে বেড়িয়ে গেলো।সে গাড়ি চালিয়ে সোজা পৌছে গেলো তাদের পুরনো বাড়িতে।যেখানে প্রভার নিজ হাতে রোপণ করা বকুল গাছটা বাকের গঞ্জ থেকে স্থানান্তরিত করে রোপন করা হয়েছিলো।যেহেতু স্থানান্তর করা হয়েছে সেহেতু এই গাছের নিশ্চয়ই কোন রহস্য আছে যেটা প্রভা তার কাছ থেকে লুকিয়ে গিয়েছে।
তাকরিমের গাড়িটা সোজা এসে থামলো সেই বকুল গাছের সামনে।আশেপাশে তেমন কিছু নেই।একটা ভাঙাচোরা পুরনো টিনের ঘর।এছাড়া তেমন কিছু নেই।এখানে আগেও এসেছে তাকরিম, সময় কাটানোর জন্য।একাকি বসে ছিলো ঘন্টার পর ঘন্টা।কিন্তু কখনো তেমনভাবে সন্দেহের দৃষ্টিতে ভেবে দেখে নি।অথচ এখন মনে হচ্ছে এই জায়গাটাতেই সব রহস্য লুকিয়ে আছে, কিন্তু কোথায়?কোথায় খুজে পাবে এই রহস্যের সমাধান।
প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরপাক খেতেই তাকরিমের তীক্ষ্ণ নজর গিয়ে আটকালো সেই ভাঙাচোরা ঘরটার দিকে।কেন যানি না চাইতেও সেখানটায় একটা আকর্ষণ অনুভব করলো তাকরিম।ধিরে ধিরে পা বাড়ালো সেদিকে।ভারি ভারি কদম গুলো টেনে নিয়ে প্রবেশ করলো ঘরের ভেতর।ঘুটঘুটে অন্ধকার সেখানে। তাকরিম মোবাইলের ফ্লাশ অন করে এগিয়ে গেলো ভেতরের দিকে।ঘরের একটা কোনা আবছা দেখা যাচ্ছে, যেখানে একটা বুড়ি বসে আছে থালা হাতে,সেই থালায় ঘরের চালের সাথে রসি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা একটি মাথা থেকে টুপটুপ করে পড়ছে তাজা রক্ত।
অসম্ভবপ্রায় দৃশ্য দেখতেই শিরদাঁড়া বেঁকে এলো তাকরিমের।সে অস্পষ্ট আওড়াল,
“প্রভা?”
বুড়ির চোখ বড় বড় হয়ে গেলো অদ্ভুত ভাবে,তাকরিমের কন্ঠ কানে আসতে ধড়পড়িয়ে উঠে দাড়ালো সে।সাদা পাঞ্জাবী পরিহিত তাকরিমের হাত থেকে ব্যালেন্স হারিয়ে মোবাইলটা পড়ে গেলো তখন।মুখ দেখা না গেলেও সামনে যে তাকরিমই দাঁড়িয়ে আছে বুঝতে অসুবিধা হলো না বুড়ির,সে আতংকিত কন্ঠে তোতলালো,
“আ,,,আ,,,প,,,,”
“ডাকতে বোধহয় ভুল হয়ে গেলো, প্রভা নয়,তুই তো সুফি।প্রভার তো জন্মই হয় নি তাই না।”
তাকরিমের হিমশীতল কন্ঠে ভয় পেয়ে গেলো বুড়ি,কাঁপা কন্ঠে বললো,
“আ,,আমি ফ্লোরেন্সা,,,,”
“আমাকে কি তুই গাঁধা পেয়েছিস?যা বলবি তাই বিশ্বাস করতে হবে?”
বুড়ি কেঁদে ফেললো এবার,আকুতি মিনতি জানিয়ে বললো,
“আমি সত্যিই ফ্লোরেন্সা আইরিশ ভাই।আমি অভিশপ্ত।আপনাদের মতো আমি মৃত্যু পাই নি,নাতো পেয়েছি পূনর্জন্ম।”
তাকরিম ধিরে ধিরে ঝুকলো,হাত ফস্কে পড়ে যাওয়া মোবাইলটা তুলে নিয়ে ফ্লাশ তাক করলো সরাসরি বুড়ির মুখে।বুড়ি দুই হাত আড়াআড়ি করে রাখলো মুখের উপর, সংকুচিত কন্ঠে বললো,
“আহ!আলো বন্ধ করুন আইরিশ ভাই।”
আইরিশ শ্লেষ হাসলো,তরল কন্ঠে বললো,
“কেন?আলো বন্ধ করলে কি হবে?তোর স্বরুপ ধরা পরে যাবে নাকি প্রভা?”
প্রভা ধিরে ধিরে মুখের উপর থেকে হাত সরিয়ে নিলো নিজের,সে বুঝে গেলো সে ধরা পড়ে গিয়েছে,তার স্বরুপ সামনে এসে পড়েছে।তাকরিম ধরে ফেলেছে তার ভেতর লুকিয়ে রাখা সমস্ত রহস্য।সে ভয়ে ভয়ে উচ্চারণ করলো,
“আইরিশ ভাই!”
“তোর এই অদ্ভুত রুপ স্বচ্ছ জলের মতো পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি আমি।যদিও আমি আগে থেকেই এমন কিছু আন্দাজ করেছিলাম,আর সেদিন ওই চিঠি টা পাওয়ার পর সবকিছু ক্লিয়ার হয়ে গিয়েছিলো।এখন তুই ডিসাইড কর,আপোষে বলবি নাকি জোর করে বলাবো।”
তাকরিমের কন্ঠ থেকে ধেয়ে আসা ছুড়ির মতো ধারালো বাক্যগুলো কলিজায় গিয়ে লাগলো প্রভার,সে রাগে আক্রোশে কেঁদে উঠলো উচ্চশব্দে,কাঁদতে কাঁদতে বললো,
“জেনে গেলেন?অবশেষে জেনে গেলেন আপনি।”
“তুই নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছিস প্রভা।তোর মনে আছে ব্রিটিশ প্রিন্স যে আমাদের বাড়িতে আছে সেই কথাটা জানিয়ে আমাকে সেবার চিরকূট কে লিখেছিলো?মনে না থাকার কথা নয় নিশ্চয়ই কারণ চিরকূট টা সেদিন তুই আমার ঘরের দরজার সামনে রেখেছিলি।কারণ তুই হিংসে করতি ফ্লোরেন্সাকে।তুই ওকে সুখি দেখতে চাইতি না কোনদিনই।যখন দেখলি ফ্লোরেন্সা প্রিন্স জোসেফের প্রেমে পড়ে সুখ সাগরে ভাসছে ঠিক তখনই প্ল্যান করলি বাড়ির সবাইকে জানিয়ে দিতে, আর ব্রিটিশ প্রিন্সকে বাড়িতে লুকিয়ে রাখার অপরাধে অভিযুক্ত করে ফ্লোরেন্সাকে গঞ্জছাড়া করতে।
কিছুদিন আগে ফ্লোরেন্সার নাম করে সেই একই রকম চিরকূট আমার হাতে ধরিয়ে দিলি।যেখানে লেখা ছিলো নিস্পা ফ্লোরেন্সা নয় ফ্লোরেন্সা বৃদ্ধা মহিলা।যাকে আমি এক রাতে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে হসপিটালে ভর্তি করিয়েছিলাম।ওই চিরকূট পড়া মাত্রই তো সব ক্লিয়ার হয়ে যায় আমার কাছে।এতো বোকা কেন ভাবিস আমাকে?এমপি আমি এমপি?আগের আইরিশ হলেও তো কথা ছিলো।তুই কি ভেবেছিস তোকে যে আমি নিজের হাতে ধরে বাংলা লেখা শিখিয়েছিলাম সেটাও ভুলে গিয়েছি?
কথাটা বলেই ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তাকরিম শক্ত হাতে চেপে ধরলো প্রভার গ্রীবাদেশ,রাগে গর্জে উঠে বললো,
মানে কেমনে কি?নিজেকে কি মনে করিস তুই?এতো বড় একটা গেম খেলবি আর আমি বোকাচো*দা হয়ে বসে থাকবো?কেন করলি বল?কেন করলি এমন?”
প্রভার দম আটকে এলো তাকরিমের হাতের থাবায় আঁটকে, সে চোখ থেকে দু ফোটা পানি ফেলে দিয়ে মুখ হা করে শ্বাস টানলো,হ্যাসহ্যসিয়ে বললো,
“কেন করতাম না বলুন?কেন করতাম না?আপনারা তো মরে গিয়ে বেঁচে গিয়েছেন।কিন্তু উপরওয়ালা তো আমার মৃত্যুর সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে।আমার অভিশপ্ত জীবন আমাকে মৃত্যু দেয় নি এটা কি আমার দোষ।”
“তার জন্য তুই মানুষ খুন করবি?”
“খুন করবো না আইরিশ ভাই।কথা দিলাম আর খুন করবো না।তুমি শুধু আমাকে বিয়ে করে নেও ব্যাস।আমার অতৃপ্ত ইচ্ছেটা পূরণ করে দেও।আমি মরেও শান্তি পাবো”
“মজা করছিস?”
“আমার জীবনটা তো তার চেয়েও বেশি মজার হয়ে গিয়েছে আইরিশ ভাই।”
আইরিশ নিজের হাতের মুঠো হাল্কা করলো,ছেড়ে দিলো প্রভার গলা,তারপর এক প্রকার ধাক্কা দিয়ে ছুড়ে ফেলে বললো,
“কি হয়েছিলো সেদিন?কে করতো সেই খুন গুলো? তুই নয় নিশ্চয়ই।”
“তুমি আমাকে বিশ্বাস কর আইরিশ ভাই?তুমি বিশ্বাস করো খুনগুলো আমি করি নি।”
“এটা বিশ্বাস নয় প্রভা,এটা সিক্সথ সেন্স।1947 সালে তোর দ্বারা এতোগুলো মানুষ হত্যা সম্ভব ছিলো না।তাই ভালোয় ভালোয় বল আসল কালপ্রিট কে?আর সেদিন কি হয়েছিলো?”
“শুনবে?শুনবে সেদিন কি হয়েছিলো? তবে শোন।সেদিন ফ্লোরেন্সাকে আমি নিজের হাতে বউ সাজিয়ে দিয়েছিলাম।খুব যত্ন করে নীল শাড়িটা পড়িয়ে দিয়েছিলাম তাকে।এর মধ্যেই কাজের জন্য ডাক পরে আমার।আমি ফ্লোরেন্সাকে একা রেখে বের হয়ে যাই।ঠিক তখন আমার দেখা হয় আমার ছোট খালার মেয়ে ছবির সাথে।সে জানালো সে এই বাড়িতে প্রতিশোধ নিতে এসেছে।এই বাড়ির সমস্ত হাসি মুছে দিতে এসেছে সে।
কিন্তু তার কাজে বাধা হয়ে দাড়াই আমি।আমি সিদ্ধান্ত নেই নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও এই পরিবার আর পরিবারের মানুষ গুলো কে বাঁচাবো আমি।কিন্তু আমি নিরুপায় হয়ে গিয়েছিলাম। ছবি আমার জীবনের এক চরম সত্য ফাস করে দেওয়ার হুমকি দিলো আমায়।”
“সেই চরম সত্যটা কি? তুই ফ্লোরেন্সার বোন?আর তুই নিজের হাতে নিজের পালিত বাবা মায়ের গলা কেঁটেছিস সেটা?”
“আপনি এটাও,,,, ”
“যেনে গেছি।নিজের পালিত বাবা মাকে খুন করে কি সুন্দর করে খুনগুলো মাথা কাটা খুনিটার ঘাড়ে চাপাতে চেয়েছিলি তাই না।ওরা তো তোকে ছোট থেকে আদর স্নেহ দিয়ে বড় করেছিলো প্রভা।নিজের বাবা মাকে হত্যা করতে হাত কাঁপলো না তোর?
“না কাঁপে নি। একদম কাঁপে নি আমার হাত।কারণ ওরা আমার নিজের বাবা মা ছিলো না।ফ্লোরেন্সা আর আমি এক বাপের সন্তান। অথচ ফ্লোরেন্সা বড় হলো সোনার চামচ মুখে দিয়ে আর আমি বড় হলাম দাসীর পরিচয়ে,এই নিয়তি কে মেনে নিতো বল?আমার যন্ত্রণা হতো, খুব যন্ত্রণা হতো।মনে হতো আমার পরিচয় যদি খান বাড়ির মেয়ে হতো তাহলে আপনি হয়তো ফ্লোরেন্সাকে বাদ দিয়ে আমাকে ভালোবাসতেন।আমি আপনাকে না পাওয়ার যন্ত্রণায় ধুকে ধুকে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম।”
“আলগা প্যাচাল বাদ দিয়ে সামনে কি হয়েছিলো সেটা বল।”
“আপনার আর ফ্লোরেন্সার বিয়ে সহ্য করতে না পেরে আমি নিজের সীদ্ধান্ত পাল্টালাম আবার।ছবির সাথে হাত মিলিয়ে পুরো পরিবারকে ধ্বংস করার প্ল্যান করলাম।”
“তার মানে খাবারে বিষ তোরাই মিশিয়েছিলি?”
“উঁহু।আমরা খাবারে বিষ মেশাই নি।”
তাকরিম পুনরায় ক্ষুব্ধ হলো, তেড়ে গিয়ে চেপে ধরলো প্রভার চুলের মুঠি,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,
“নাটক মারাছ আমার সাথে?”
“আমি সত্যি বলছি আমরা খাবারে ওইদিন বিষ মেশাই নি।আমরা কেবল ঘুমের ওষুধ মিশিয়েছিলাম।কারণ আমাদের প্ল্যান ছিলো সবাইকে অস্ত্র চালিয়ে হত্যা করা।পুরো বিয়ে বাড়ির সব মানুষকে মেরে আমাদের কি লাভ হতো?কেনই বা আমরা নির্দোষ মানুষ গুলো কে মারতাম বলুন?আমরা গোস্তের তরকাড়িতে ঘুমের ঔষধ মিশিয়েছিলাম।কিন্তু কেউ পানিতে বিষ মিশিয়ে আমাদেরকে বাজিমাত দিয়ে দিয়েছিলো।”
____
রাত খুব গভীর নয়।নয়টা,সাড়ে নয়টা হবে।সারাদিনে ঘরে আসে নি ত্রিজয়।গোটা দিন সীদ্ধান্ত হীনতায় কাটিয়ে দিয়েছে নিস্পা।কি করবে বুঝতে পারছে না।তবে সত্যবীনা পাখি তো আর মিথ্যা বলে নি।ত্রিজয় সত্যি সত্যিই সত্য কে মারে নি।আবার সেদিন দাদির মুখে শুনলো তাদের মৃত্যুর পর কালোজাদু করা হয়েছিলো।আর নিস্পা নিশ্চিত যে এই জাদু করেছে সেই বিষ মিশিয়েছিলো খাবারে।আর প্রিন্স জোসেফ তো তার চোখের সামনেই মারা গেলো,তাই এবারেও খুনি ত্রিজয় হওয়া অসম্ভব। বাদ বাকি রইলো অত্যাচার নির্যাতনের কথা,সেটা যতটুকু করতো ত্রিজয় নিজে করতো আবারও নিজেই মলম লাগাতো।তবে একটা সত্য বিষয় হলো আজ পর্যন্ত নিস্পার গায়ে কাউকে টোকাও দিতে দেয় নি।এমনকি যেই মায়ের জন্য তাকে দাসী হিসেবে নিয়ে আসা হয়েছিলো সেই মাকেও না।
সমস্ত নেগেটিভিটি সাইডে রেখে পসেটিভ দিক গুলো ভাবলে ত্রিজয়ের কোন ভুল খুঁজে পায় না নিস্পা।সুস্থ মস্তিষ্ক বারবার তিরস্কার করে শুধু একটা কথাই বলে ত্রিজয়কে এতোদিন কারণ ছাড়া শুধু শুধুই ঘৃনা করতো সে।
কিন্তু কাল যে চোখের সামনে খুন করতে দেখলো, এতো জঘন্যতম খুন কেন করলো মানুষ টা?এর পেছনে কি কারণ রয়েছে বুঝতে পারছে না নিস্পা।তবে মানুষটাকে মিথ্যা মিথ্যা ঘৃনা করার জন্য খুব অনুতপ্ত সে।তাই সীদ্ধান্ত নিলো সম্পর্কটাকে একটু স্বাভাবিক করে পরের খুন গুলোর কারণ জেনে নিবে কৌশলে।
কথাগুলো ভেবেই ঘরের বাইরে বেড়োলো নিস্পা।তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলে বাইড়ে পা বাড়াতে যাবে তখনই তাজ্জব হয়ে গেলো,দরজার সামনে ত্রিজয়কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।
এই লোক না সকালে মরার কথা বলে বেড়িয়ে গিয়েছিলো? যায় নি নাকি?নিশ্চয়ই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সকালের সেই প্যান্ট টাই পড়নে এখনো।উদোম শরীর, ঠিক যেমনটা সকালে ছিলো। মানে সকাল দশটা থেকে রাত দশটা অব্দি এখানেই দাঁড়িয়ে ছিলো লোকটা।আস্ত একটা পল্টিবাজ তো।তাকে মরতে বলে আবার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পাহারাও দিচ্ছিলো নাকি।
নিস্পার এমন হটাৎ দরজা খোলায় কিঞ্চিৎ ভড়কালো ত্রিজয় নিজেও।হাতে তখন তার জ্বলন্ত সিগারেট,সে তাড়াহুড়ো করে এড়িয়ে গেলো নিস্পাকে।সিগারেট টা ঠোঁটে চেপে ধরে ক্ষানিকটা দূরে সরে দাড়ালো একটু ভাবসাব নিয়ে।
নিস্পা দরজার সামনে ফ্লোরে তাকিয়ে দেখলো সিগারেটের অনেকগুলো পোড়া অংশ আর ছাই পড়ে আছে।কম করে তিন প্যাকেট তো হবেই।তার মানে সারাদিন এখানে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিলো লোকটা, আর এখন তাকে দেখে এমন ভাব করছে যেন তার পাত্তাই নেই।কথাটা ভেবেই পিক করে হেঁসে ফেললো নিস্পা।
তারপর চেহারায় গম্ভীরতা টেনে আস্তে করে গিয়ে দাড়ালো ত্রিজয়ের পাশে,কোন কথাবার্তা ছাড়াই ত্রিজয়ের ঠোঁটের মাঝখান থেকে সিগারেট টেনে এনে রাখলো নিজের পরাগ মাখা মসৃন ঠোঁটের ভাজে।
তারপর সাহস করে একটা টান বসাতেই নিকোটিনের ঝাজালো ধোঁয়া ঢুকে গেলো নাকে মুখে।ধোঁয়ার ঝাঁজে জ্বলে উঠলো নিস্পার নাকের তালু থেকে মাথার মস্তক।খুক খুক করে কাশি উঠে গেলো মূহুর্তেই।অথচ ত্রিজয় ফিরেও তাকালো না।শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো পিলারের মতো, ভং ধরলো যেন নিস্পার কোন কিছুতেই তেমন যায় আসে না তার।
কিন্তু নিস্পার কাশি যখন মাত্রাতিরিক্ত হলো, থামার নাম গন্ধ নিলো না,তখন আর চুপ থাকা সম্ভব হলো না।দু আঙুলে নিস্পার নাক চেপে ধরে আরেক হাতে কয়েকটা থাপ্পড় দিলো নিস্পার মাথার তালুতে।নিস্পা হা করে শ্বাস টানলো, প্রায় বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হলো তার।ত্রিজয় শান্ত হয়ে পুনরায় সটান হয়ে দাড়ালো, কাঠ কাঠ গলায় বলল,
“মরিস নি এখনো?”
ত্রিজয়ের কাঠকাঠ কন্ঠ থেকে বেড়িয়ে আসা খাপছাড়া শব্দ গুলোর মাঝে অভিমানের অস্তিত্ব টের পেলো নিস্পা।দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো
“মরলে খুশি হতেন?”
ত্রিজয় নিস্পার হাত থেকে সিগারেট টা টেনে নিয়ে অল্প শব্দে বললো,
” খুব।”
নিস্পা পুনরায় ত্রিজয়ের হাত থেকে সিগারেট টা টেনে নিয়ে দ্বিতীয় টান বসালো,আশ্চর্য ব্যাপার এবার আর কাশি উঠলো না নিস্পার, তবে ধোঁয়া ছাড়ার কৌশল টা তখনও বুঝে উঠতে পারে নি,তাই তামাক পোড়া ধোঁয়া গিলে নিয়েই বললো,
“এজন্যই মরলাম না।আপনাকে খুশিতে এলার্জি আছে আমার।”
ত্রিজয় একইভাবে সিগারেট টা নিস্পার হাত থেকে নিয়ে নিয়ে দুই ঠোঁটের মাঝে রাখলো,বিরবির করে আওড়াল,
“নটাংকি।”
নিস্পা ত্রিজয়ের ঠোঁটের ভাজ থেকে সিগারেট টা নিয়ে নিলো,এবারে দুই ঠোঁট গোল করে মুক্ত বাতাসে ধোঁয়া ছেড়ে দিতে সক্ষম হলো সে,শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি খুন গুলো কেন করছেন?”
“শখে।”
“সত্যকে?”
“চারটে বুলেট মেরে শেষ করে দিয়েছি”
“অথচ সত্যকে ছুড়ি চালিয়ে মারা হয়েছিলো।”
ত্রিজয় সিগারেট টা চতুর্থ বারের মতো নিয়ে নিলো নিস্পার হাত থেকে,সিগারেটে শেষ টান দিয়ে পোড়া অংশ টুকু ছুড়ে ফেলে দিয়ে বললো,
“গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছিস?”
“উকিলে গোয়েন্দায় জমবে তো?”
ত্রিজয় আরেকটা সিগারেট বেড় করলো, তবে এবার আর নিজের ঠোঁটের মাঝে নয়,নিস্পার দুই ঠোঁটের মাঝে রেখে জ্বালিয়ে দিলো লাইটার,সিগারেট ধরিয়ে দিতে দিতে চাইলো নিস্পার টলমলে চোখের গভীরে,রাশভারি কন্ঠে বললো,
“উস্কে দিতে চাইছিস?”
নিস্পা সিগারেটে টান বসালো না আর,সোজা নিজের ঠোঁটর মাঝ থেকে সিগারেট নিয়ে ঢুকিয়ে দিলো ত্রিজয়ের ঠোঁটের ফাঁকে,সাবলীল কন্ঠে বললো,
“আপনি উস্কে যাচ্ছেন নাকি?”
ত্রিজয় নিম্নোষ্ঠ কামড়ে হাসলো,সিগারেট সেই পুরনো কৌশলে চেপে ধরলো নিস্পার উদরে,বিদ্রুপ কন্ঠে বললো,
“ভাঙবি অথব মচকাবি না।”
নিস্পা চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো,হাত দিয়ে খামচে ধরলো ত্রিজয়ের উন্মুক্ত বুক,অনুরাগী কন্ঠে বললো,
“ভাঙার টেকনিক ফেইল করেছে বোধহয়।”
ত্রিজয় চট করেই দু’হাতে কোলে তুলে নিলো নিস্পাকে,সোজা হাটা শুরু করলো বেডরুমের দিকে,মাদকিয় কন্ঠে বললো,
“এবার আর ফেইল করার চান্স নেই।”
নিস্পা ধরা দিলো,নাক ঘষলো ত্রিজয়ের উন্মুক্ত বুকে,সংকুচিত কন্ঠে বললো,
“আপনি বড্ড বেপরোয়া।”
ত্রিজয় বেড রুমে ঢুকেই নিস্পাকে ছুড়ে ফেললো বিছানায়,তারপর প্যান্টের বেল্টে হাত চালিয়ে বলল,
“বেশামাল আমিকেই সামলাতে হবে।”
ত্রিজয় বেল্ট টা খুলে ফেলে ছুড়ে ফেললো, এগিয়ে গেলো নিস্পার দিকে,নিস্পা ঘনঘন ঢোক গিলে বললো,
“উঁহু। পারবো না।”
ত্রিজয় ঠোঁট কামড়ে হাসলো, হাত বাড়ালো নিস্পার পড়নের ওভার সাইজ টি শার্টে নেশাময় কন্ঠে বললো,
“উপায় নেই।ইউ আর অলরেডি হেল্প লেস।”
ত্রিজয় আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়েই বাধা দিলো নিস্পা,ত্রিজয়ের মুখের উপর হাত রেখে বললো,
“উঁহু আগে কথা আছে।”
“কি?”
“এই নির্মম খুন গুলো করার কারণ কি?”
“ওরা আমার মায়ের খুনি,আমার মাকে খুন করেছে।লুটপাট করেছে সব এভিডেন্স।”
“প্রতিশোধের নেশায় আপনি জানোয়ার হয়ে যাচ্ছে সেটা বুঝতে পারছেন?”
“তাতে কি?ওদের কাছে একটা ছবি আছে যেখানে আগের বার সত্যকে কে মেরেছিলো তার মুখ আঁকা ছিলো, আর এই ছবিটার জন্যই আমার মা খুন হয়েছে,তার মানে এই ছবিতে যে ছিলো সেই খুনি,সত্যের এবং আমার মায়ের।”
“একটা চমৎকার কথা বলবক,আগে আমার মাথা ছুয়ে কসম করুন রিয়েক্ট করবেন না।”
ত্রিজয় সাত পাঁচ না ভেবেই হাত রাখলো নিস্পার মাথায়,হেলামি করে বললো,
“দিলাম।”
“ছবিতে যেই মুখটা আঁকা সেটা এমপি মশাই এর মায়ের।”
নিস্পার কথায় চমকে উঠলো ত্রিজয়,রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠলো,
“হোয়াট!”
নিস্পা শান্ত স্বরে বললো,
“আপনার গাড়ির লকারে ছবির টুকরো গুলো পেয়েছিলাম আমি,মুখের তিন ভাগের এক ভাগের কয়েকটা টুকরো নেই,কিন্তু চোখের অংশ টা মিলাতেই কেমন চেনা চেনা লাগলো আমার, তখন অতো গুরুত্ব দেই নি কিন্তু এখন হটাৎ করেই মনে পড়লো এটা এমপি মশাই এর মা।”
“তুমি শিউর?ওই জানোয়ারের বাচ্চাকে কুকুরের খাবার বানাবো আমি।”
উত্তেজিত স্বরে কথাটা বলেই নিস্পার উপর থেকে উঠতে নিলো ত্রিজয়,নিস্পা তাড়াহুড়ো করে বাধা দিয়ে বললো,
“দাড়ান,আপনি কিন্তু বলেছেন উত্তেজিত হবেন না।”
ত্রিজয় কিছুতেই নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারলো না,তবে নিস্পার মাথা ছুয়ে কসম করায় দমলো কিছুটা।নিস্পা রয়েসয়ে বললো,
“দেখুন অতীতে যা হয়েছে হয়েছে।খুনিদের শাস্তি দিতে গিয়ে আপনিও তো খুনি হয়ে গিয়েছেন। পাপের সাজা আপনি দেওয়ার কে?তাও নিজের হাতে পাপ করে?তাহলে তাদের মধ্যে আর আপনার মধ্যে তফাৎ রইলো কোথায়?
দয়া করে আমার কথা ভেবে এই রক্তারক্তি বন্ধ করুন।”
ত্রিজয় হিসহিসিয়ে বললো,
“তুমি বলতে চাইছো আমি আমার মায়ের খুনিকে শাস্তি দিবো না?আর আগের জন্মে যে ওই রানী ক্যাথরিনই সত্যের মৃত্যুর পেছনে দায়ি ছিলো তার শাস্তিও দেবো না?আমি যে ওর মৃত্যুর দায় বয়ে বেড়িয়ে নিজের জীবনের অন্তিম প্রহর অব্দি তড়পেছি সেটার কি হবে?এতো সহজে পার পেয়ে যাবে? ”
“কে বলেছে পার পেয়েছে?শুনলেন না উনি হসপিটালে ভর্তি ছিলো, জীবন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে বেঁচে ফিরেছে কোনরকম, এটাই তো তার শাস্তি, বিধাতা তার প্রাপ্য শাস্তি তাকে দিবেই,প্রকৃতিরও তো একটা নিরব প্রতিশোধ আছে।”
“তারমানে তুমি আমাকে বোঝাতে চাইছো যেই খুনিকে ধরার জন্য আমি খুনি হয়ে উঠেছি তার শাস্তি প্রকৃতির উপর ছেড়ে দিতে?”
“তাহলে আর কি করবেন?খুন করবেন?ওই বৃদ্ধা অসুস্থ রুগ্ন মহিলাকে খুন করলে শান্তি পাবেন?উল্টো অশান্তি মারবে।নিজের মায়ের মৃত্যুর বদলা নিতে ক্ষেপে উঠবে এমপি মশাই, শুরু হবে নতুন রক্তারক্তি, খুনোখুনি।”
নিস্পার এতোগুলো কথায় কোনরকম হেলদোল দেখা গেলো ত্রিজয়ের মাঝে,সএ একইভাবে ফোসফোস করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে,নিস্পা উপায় না পেয়ে নিজেই নিজেকে সপলো,আবেদনময়ী ভঙিতে এগিয়ে গেলো তার দিকে,তারপর পরম আবেশে ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে একটা ছোট্ট চুমু খেয়ে বললো,
“আমার জন্য,আমার জন্য ভুলে যান সব।কালকের ভোরটা সুন্দর হতে দিন।দোহাই আপনার।”
ত্রিজয়ের নিঃশ্বাস শীতল হয়ে এলো,সমস্ত প্রতিশোধস্পৃহা ভুলে গিয়ে ডুব দিলো নিস্পার রুপের মোহে,কথার ছলে।
নিস্পা চোখ বন্ধ করে নিলো।সব অতীত সব অসুন্দর ভুলে গিয়ে কবুল করে নিলো এই অসম্ভব সুন্দর মূহুর্তটাকে।ধরা দিলো নিজ ইচ্ছায়,নিজের শরীর আত্মসমর্পণ করলো সজ্ঞানে।এক প্রাপ্তির উৎসবে কুকিয়ে উঠলো কয়েকবার।
ত্রিজয়ের দংশন মাত্রা হারালো।নিস্পা ত্রিজয়ের চুল আর নগ্ন পিঠ খামচে ধরে চোখের পানি ফেললো। চোখের পাতায় ভেসে উঠলো সেই অতীত,বিভৎষতায় রাঙা অতীত।
মানুষ টা ব্রিটিশ ছিলো।সে কি করে বুঝত বাঙালির হৃদয়ের অনুভূতি?শত অত্যাচার, শত নির্যাতনের মধ্যে একটা তেতো সত্য হলো মানুষ টা ফ্লোরেন্সার পবিত্রতা ক্ষুন্ন হতে দেয় নি।কোন পর পুরুষের ছোয়া লাগতে দেয় নি তার ফুলের মতো শরীরে।তার আদেশেই তো মহলের হাজার হাজার সৈন্য বন্ধ করে নিয়েছিলো তাদের কামনার দৃষ্টি,গুটিতে নিয়েছিলো অশরীরী হাত।
সে কথা কি অস্বীকার করা যায়?সে যে নির্মমতার মাঝে নির্মম সত্য।
কতশত ভাবনার মাঝেই শোনা গেলো ত্রিজয়ের ফিসফিসানি।সে নিস্পার কানের কাছে মুখ নিয়ে হাস্কি টোনে ডাকলো,
“কলিজা!”
নিস্পা কল্পনার জগৎ বেড়িয়ে এলো,অস্ফুটে শব্দ করলো,
“হুম!”
ত্রিজয় গভীর চুমু আঁকলো নিস্পার ঠোঁটে,তারপর সেই চুমুর নমনীয়তা রুপ নিলো তীব্র দংশনে,ত্রিজয় নিজের দাঁত দিয়ে পিষে ধরলো নিস্পার অধর,নিস্পা ব্যাথায় গোঙিয়ে উঠলো কন্ঠ ফুড়ে বের হলো, অস্পষ্ট কোকানির শব্দ,
“আয়ায়ায়া।”
ত্রিজয় প্রসন্ন হাসলো,মাদকিয় কন্ঠে বললো,
“কাঁদো প্লিজ।বাসর বাসর ফিল পাচ্ছি না।”
নিস্পা লজ্জায় মুখ লুকালো ত্রিজয়ের উন্মুক্ত বুকের মধ্যখানে, লাজে রাঙা কন্ঠে বললো,
“ছিঃ এতো অসভ্য কেন আপনি?”
ত্রিজয় তার উন্মাদ বিচরন আরেকটু জোড়ালো করে বললো,
“সভ্য হলে হালাল ফিল পেতে কোথায়?”
লজ্জায় নিস্পার কান দিয়ে ধোঁয়া বেড়োতে শুরু করলো, ত্রিজয়ের শক্ত পোক্ত শরীরের নিচে অনুভব করলো নিজের সম্পূর্ণ উন্মুক্ত শরীর।শিউরে উঠলো শিহরণে,শরীরের সমস্ত লোমকূপ গাইলো প্রেমের গান,ধরলো দুটো শরীর মিলেমিশে এক হয়ে যাওয়ার গল্প,নিজেকে কোনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে নিস্পা আরও জোরে খামচে ধরলো ত্রিজয়ের নগ্ন পিঠ, মৃদু স্বরে আওড়াল,
“উফফ,চুপ করুন।”
ত্রিজয় নিজের ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো,নিস্পার নাকের ডগায় একটা আলতো কামড় খেয়ে আবেশময় কন্ঠে বললো,
“শব্দ গুলো জোস।বারবার বল।দারুন ফিল আসে।”
নিস্পা দাঁতের সাথে দাঁত পিষে নিঃশ্বাস আঁটকে নিলো।এক অন্যরকম পবিত্র স্পর্শ অনুভব করলো হৃদয় দিয়ে।ত্রিজয়ের লাগামহীন স্পর্শ শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে,প্রতিটি অঙ্গ উপলব্ধি করতে পারছে প্রেম নামক প্রিয় ব্যাথা।
ত্রিজয় আজ উন্মাদনায় মেতেছে।তার বহু অপেক্ষিত এক রাত আজ,বহু আকাঙ্খিত দেহ,যে দেহ স্পর্শ করার জন্য সম্মতি প্রয়োজন হতো তার, সম্মতি ছাড় বুঝি মিলনে মোহাব্বত মিলে?
কই কাল তো পায় নি এমন সুখ সুখ অনুভূতি।পাজরের অংশে মিশে থাকা নারীর শরীরের গন্ধ কাল তো এতো আনন্দ দিতে পারে নি।আজ কেন এলোমেলো হচ্ছে সব?কেন এই নারীর শরীরে ইঞ্চি ইঞ্চিতে দাগ বসাতে ইচ্ছে করছে?কেন গুনতে ইচ্ছে করছে সেই দাগের সংখ্যা।
বারবার ইচ্ছে করছে আজ ভালোবাসা হোক লাগামহীন।প্রেমের চিহ্ন হোক শত সহস্রের বেশি।যেন এই ব্যাথা সুখ সুখ গন্ধ ধরে রাখে আরও বছর খানেক।
মিলনের সর্বশেষ প্রান্তে উপনীত হয়ে স্থির হলো ত্রিজয়।তার শরীরের ঘাম লেপ্টে গিয়েছে নিস্পার নগ্ন শরীরে।তার কপাল বেয়ে নেমে আসা ঘাম নাকে এসে জমেছে,সেই উত্তপ্ত তরল টুপটুপ করে পড়েছে নিস্পার মুখের উপর।নিস্পা চোখ খিচে বন্ধ করে আছে।বুকের ভেতর ধ্বক ধ্বক করছে তার,ত্রিজয় দু’হাতে নিস্পাকে লতার মতো জড়িয়ে ধরে নিজের মাথাটা রাখলো নিস্পার উন্মুক্ত বুকের উপর,কামুক কন্ঠে ডাকলো,
“কলিজা!”
নিস্পা চোখ বন্ধ করেই তপ্ত কন্ঠে বললো,
“বারবার কেন ডাকছেন?
ত্রিজয় নিজের নাক ঠোঁট ঘষলো নিস্পার বুকের উপর,আবেদন মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
“নিজ ইচ্ছেতে ধরা দিয়েছ পেইন কিলার কিন্তু দুটো খেতে হবে।হালাল কাজে ছাড়াছাড়ি হবে না।”
চলবে,,,,,,,,

