হিপনোটাইজ #তাজনিন_ত্যায়্যিবা পর্ব :28

0
35

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_ত্যায়্যিবা
পর্ব :28
⭕পূনর্জন্ম বা টাইম ট্রাবল কোন ধর্মে গ্রহনযোগ্য
___________________________________________ নয়,এটি কেবল রুপকথার উপমা।
_______________________________⭕

একজোড়া নরম গোলাপি ঠোঁটের সম্পূর্ণ অধিকার সৌবিষ্ঠ বাহুর অধিকারী পুরুষের অধর যুগলের মাঝে বন্দী। উন্মুক্ত সেই বাহুর একাংশ আঁকড়ে ধরে আছে নিস্পা, অনুভূতির গভীর টানে আকৃষ্ট হয়ে, না কি যন্ত্রণার অন্তরালে মুক্তির সন্ধানে তা বোঝা দুষ্কর। তবে স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে ,ত্রিজয়ের দৃঢ় সংবেদনশীল হাত নিস্পার ঘাড়ের পেছনে লতার মতো জড়িয়ে আছে নিঃশব্দে, নিঃসীমে।

পরপরই মোবাইলের স্ক্রিনে টুপ করে পড়লো একফোঁটা অশ্রু,নিঃশব্দ হৃদয় বিদারক স্বীকারোক্তি হয়ে।মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে থাকা ছবিটা তাকরিমের বুকের ভেতর ঘটিয়েছে ঝাঁপসা বিস্ফোরণ । হৃদয়টা ছিঁড়ে খুঁড়ে ক্ষতবিক্ষত করেছে প্রবল যন্ত্রণায়। হাতের মুঠোতে ধরে রাখা মোবাইলটা কাঁপছে, মনে হচ্ছে প্রতিটি আঙুলে জমাট বাধা যন্ত্রণা রক্ত হয়ে গড়িয়ে পড়বে যেকোনো মুহূর্তে।

চোখ দুটো রক্তাভ, অন্তরের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে নেত্রমনি।নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে, দম ফাটা যন্ত্রণায় গুঁড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছে চারপাশটা ।

নিজেকে আর সামলাতে না পেরে তাকরিম মোবাইলটা ছুড়ে মারলো দেয়ালের উপর,দু হাতে চুল খামচে ধরে চিৎকার করে উঠলো, ছেঁড়া হৃদয়ের গভীরতম প্রান্ত থেকে ছুটে এলো অসংবৃত আর্তনাদ,

“আয়ায়ায়ায়া”

নাহ! শান্ত হলো না হৃৎপিন্ডের দাপাদাপি, চুল খামচে ধরা হাত দুটো বলছে”এ যন্ত্রণা থামাও।”

কিন্তু যন্ত্রণা যে শব্দ চেনে না, চোখের জল বোঝে না। সে শুধু গিলে খায় নিঃশব্দে, ধ্বংস করে নির্দয়ভাবে।

তাকরিম নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যার্থ হলো,প্রচন্ড আক্রোশে ভাংচুর শুরু করলো ঘরের ভেতর।সাজিয়ে রাখা ফুলের টব গুলো থেকে শুরু করে দেয়াল সেট টিভি টাও ভেঙে গুড়িয়ে ফেলেছে।ভাঙা কাচের টুকরোর আঘাতে রক্তাক্ত করেছে নিজের শরীরটাকেও।

হৃদয়ের নির্লজ্জ নগ্নতা কিছুতেই সহ্য করতে পারলো না তাকরিম,ত্রিজয়ের কাছে ভালোবাসার পরাজয় মেনে নেওয়া অসম্ভব।

ভাংচুরের বিকট শব্দ পেয়ে ঘরের সামনে উপস্থিত হলো বাড়ির সকলেই।তবে তাকরিমের ক্ষোভের সামনে দাড়ানোর সাহস হলো না কারোর।একমাত্র তাকরিমের মা ছাড়া এই সাহস আজ পর্যন্ত কেউ দেখায়নি।

অনুরিকাকে ঘরের ভেতরে আটকে রেখেছে কাল রাত থেকেই।ঘরের ভেতর বসে থেকে বাহিরের আলামত ঠিকই শুনতে পাচ্ছে মেয়েটা।দরজাটা খোলা থাকলে নিশ্চয়ই দৌড়ে যেতো,থামানোর চেষ্টা করতো ওই ঘাড় তেরা এমপি মশাইকে।কথাটা ভেবেই ফোস করে নিঃশ্বাস নিলো অনু,ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো বারান্দায়,সেখানটার একটা টবে ক্যাকটাস গাছের ডাল বেড়িয়েছি।অনু আনমনে এগিয়ে গিয়ে এক আঙ্গুল দিয়ে ছুয়ে দিলো একটা ডাল,ঠিক তক্ষুনি ক্যাচ করে একটা কাঁটা বিঁধে গেলো তার আঙুলে।অনু অস্ফুট শব্দ করে উঠলো,

“আউচ।”

আঙুলের দিকে নজর বুলাতেই দেখলো এক ফোটা রক্ত বেড়িয়েছে।অনু এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলো সেই রক্তের দিকে,ধিরে ধিরে চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে এলো সব।রক্তের রঙ বর্ণ পাল্টালো, নীল আকার ধারণ করলো মূহুর্তেই।
অনু অবাক হলো না, পাথরের মূর্তিরর মতো এক ধ্যানে তখনও তাকিয়েই রইলো।প্রকৃতির সাথে বিচ্ছিন্ন হলো তার সম্পর্ক, এক আলাদা জগৎ, এক আলাদা দৃশ্য ভেসে উঠলো চোখের পাতায়।

***
মৃত্যুর সঙ্গে নারকীয় খেলার মত্ত এক পুরুষ,তার দেহজুড়ে বিষের দাহ, প্রতিটি রন্ধ্রে ছড়িয়ে আছে বিষের হুঙ্কার। চোখ দুটো রক্তজবা, দৃষ্টি বিস্ফোরিত প্রলয়ের পূর্বাভাস। ঠিক পাশেই নির্বিকার হয়ে বসে আছে একটি মেয়ে। পরনের চুড়িদার ধুলোয় একাকার, মাথার এলোমেলো ঘোমটা বহন করছে এক দূর্বিষহ ঝড়ের সাক্ষ্য । কুচকানো ঠোঁটের কোণে জমে আছে এক অদ্ভুত রূঢ় হাসি।হাসির ঝঙ্কারে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে বিষের মাঝে নৃত্যরত এক ব্যার্থতার গল্প।

সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে পুরুষটার পুরো মুখ নীল বর্ন ধারণ করলো,মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে আরো বেশি কাতরাতে শুরু করলো। পুরুষটির কাতরানোয় চোখ রাখল মেয়েটি। কণ্ঠে শব্দ নেই, চোখে করুণা নেই,শুধু ব্যঙ্গভরা হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটের কোণে। সুঠাম গড়নের পুরুষটির নীলরঙা যন্ত্রণা হয়ে উঠেছে মেয়েটির রসিকতার উপকরণ।

মেয়েটি ধিরে ধিরে দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকালো একজোড়া হাতের দিকে।রুক্ষ, বিষাক্ত যন্ত্রণায় কাঁপতে থাকা পুরুষটি তার সমস্ত শক্তি দিয়ে তার শেষ আশ্রয়, শেষ অধিকার খাটিয়েছে, আঁকড়ে ধরেছে একটি কোমল মসৃণ হাত।

মেয়েটি চুপচাপ তাকিয়ে আছে,আকুল নয়নে দেখছে চেপে ধরা হাতের মধ্যে পুরুষটির মরিয়া উষ্ণতার অসম সংঘাত।

মেয়েটি ওভাবেই তাকিয়ে রইল, নিশ্চল, নিঃস্পন্দ, শীতল নির্লিপ্তি।

তারপর অপারগ ভঙ্গিতে ঝুঁকে এলো, নিঃশব্দে নিজের ঠান্ডা, শীতল হাতটি রাখল সেই হাত যুগলের উপর,যেখানে পুরুষটি এখনও তার সর্বশক্তি দিয়ে আঁকড়ে আছে এক টুকরো কোমল স্পর্শ।

তিনটি হাত একত্রে জড়াজড়ি করে রাখার পর, মেয়েটি ঠোঁট নাড়ালো, বিরবির করে বললো,

“নির্দয় স্বার্থপর পুরুষ,আপনার জন্য কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুখিয়ে গিয়েছে দেখুন।আমি কাঁদছি না, আমার চোখে জল নেই,আমার বুকে কষ্ট নেই,আপনার পরিনতি আমাকে কাঁদাচ্ছে না একটুও।”

“আমাকে ভালোবাসলে এতো কষ্ট পেতে হতো কি বলুন?আমাকে ভালোবাসলে আমি আপনার রজনীগন্ধা হয়ে থাকতাম,প্রতিদিন সুভাষ ছড়াতাম আপনার হৃদয়ে, ভুলিয়ে দিতাম সমস্ত না পাওয়ার অভিযোগ।”

“আপনি আমার কাছে শান্তি চাইলেন অথচ আমায় ভালোবাসায় রাখলেন না।কিন্তু আমি তো আমার দায়িত্ব এড়াতে পারি না বলুন, আমি চাই আপনার শান্তির মৃত্যু হোক।আপনি শান্তিতে গভীর নিদ্রায় তলিয়ে যান,আমি দু চোখ ভরে দেখি আপনার শান্তির মৃত্যু।”

“আপনি মৃত্যু দিয়ে ইতি টানলেন অথচ আমি চাই আরো একটি সূচনা হোক,পূনর্জন্ম হোক আমার আপনার।একজোড়া জালালি কবুতর হয়ে জন্মাবো,হিংসা বিদ্বেষ থেকে গুটিয়ে নিবো নিজেদের।খোলা আকাশে বিলিয়ে বেড়াবো ভালোবাসা আর ভালোবাসা।”

কথাগুলো বলতে বলতে হাসির ঝলক ফুটে উঠলো মেয়েটির নিস্প্রভ চোখে।তারপর নিজের মুখটা এগিয়ে নিয়ে চুমু খেলো নিথর হয়ে যাওয়া সেই হাত যুগলের পিঠের উপর।হাত বুলিয়ে পরম মমতায় বন্ধ করে দিলো পুরুষটির খুলে রাখা দু চোখ।ঘার ঘুরিয়ে তাকালো পাশে পরে থাকা এক থালা খাবারের দিকে।নির্লিপ্ত ভঙিতে উঠিয়ে নিলো খাবারের থালাটি,অদ্ভুত ভাবে তাকালো থালায় সাজানো খাবারের দিকে, তারপর? তারপর বড় তৃপ্তি সহকারে কামড় বসালো মাংসের টুকরোতে,উন্মাদ পাগলের মতো একের পর এক লোকমা তুলে খেতে শুরু করলো ভাত আর মাংস,খেতে খেতে বিরবির করে আওড়াতে লাগলো,

“আপনার বিয়ের খাবারে মৃত্যু মৃত্যু গন্ধ আসে কেনো?আপনি কি কারো মনে কষ্ট দিয়েছেন?আপনি কি কাউকে আঘাত করেছেন বলুনতো?”

“আপনার বিয়ের খাবারে মৃত্যুর স্বাদ পাচ্ছি শুনতে পাচ্ছেন?আপনি বোধহয় খুব স্বার্থপর ছিলেন তাইনা?”

****

বিকট কিছু ভাঙার শব্দের সাথে ভেসে আসা তাকরিমের যন্ত্রণাময় চিৎকারে আঁতকে উঠল অনু,নড়েচড়ে উঠতেই ধ্যান ফিরলো,তাকালো কাঁটা বিধে যাওয়া আঙুলের দিকে,একটু আগের সমস্ত ভাবনা মিলিয়ে গেলো,মস্তিষ্ক হয়ে গেলো শুন্য,জ্বিভ কেটে নিজে নিজেই বললো,

“এই যাহ!সামান্য কাঁটা ফুটে রক্তও বেড়িয়ে গেলো?”

পরপরই মুখে আঙুল ঢুকিয়ে চলে গেলো ঘরের ভেতরে।

________

এদিকে তাকরিম আরো বেশি হাইপার হয়ে উঠেছে, কখনো ভাঙচুর করছে তো কখনো বুক ফাটা যন্ত্রণায় চিৎকার করে কাঁদছে।প্রভা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না,ভাঙা মানুষটার হাহাকার তার ভেতরটা চৌচির করে দিলো, ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভাঙা কাচের টুকরো গুলোর উপরেই পা বাড়ালো,কোমল পায়ে কাচের টুকরো গেথে গিয়ে হলো রক্তাক্ত। অথচ মেয়েটার সেদিকে ধ্যান নেই,অসহ্যকর যন্ত্রণা গিলে, দৌড়ে গেলো তাকরিমের কাছে।

কি করবে বুঝতে না পেরে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তাকরিমের চওড়া বাহু,মাথাটা চেপে ধরলো তাকরিমের পিঠের উপর,কাঁদতে কাঁদতে বললো,

“থামুন ভাইয়া,দয়া করে শান্ত হোন।নিজেকে আর কত কষ্ট দিয়ে আমাকে খুন করবেন আপনি?”

তাকরিম শান্ত হলো,হাঁপাতে হাঁপাতে আহত কন্ঠে বললো,

“খুনের হাত পাকাপোক্ত করতে হবে প্রভা,নিজেকে নিজে খুন করার সময় বুঝি নৈকট্যে চলে এসেছে।”

প্রভা আঁতকে উঠল, আরেকটু শক্ত করে খামচে ধরলো তাকরিমের বাহু,বললো,

“দয়া করুন, এ কথা আর মুখে আনবেন না।প্রয়োজন হয় তো আমাকে খুন করে হৃদয় শান্ত করুন।”

“হৃদয়ের একমাত্র মালিকানা যার হাতে, সে নির্লিপ্ত সাই দিয়েছে অন্যকারো আলিঙ্গনে।আমি খুব চেয়েও এবারেও হারাবো তাকে।”

“যে ভাগ্যে নেই তার পেছনে কেনো ছুটেন? এমনও তো হতে পারে পৃথিবীর কোন এক কোনে কেউ আপনাকে এর চেয়েও বেশি ভালোবাসে।”

প্রভার কথা শুনে পূর্বের তুলনায় আরেকটু শান্ত হলো তাকরিম।ঘরের বাইরে দাড়ানো স্টাফ দের দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে ইশারা করলো চলে যাওয়ার জন্য,তাকরিমের আদেশ মতো সেকেন্ডের গতিতে স্থান ত্যাগ করলো সবাই।

তাকরিম শান্ত হয়েছে দেখে প্রভা ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিলো,দুরত্ব নিয়ে দাড়ালো তাকরিমের কাছ থেকে।তাকরিম নির্লিপ্ত ভঙিতে গিয়ে বসলো বিছানার উপর, জোরে জোরে শ্বাস নিলো কয়েকবার। তারপর শান্ত কন্ঠে বললো,

“আমি স্বার্থপর প্রভা।আলেকজান্দ্রা ব্যাতিত আমার স্মৃতিতে সব ঝাপসা।”

প্রভা এগিয়ে এলো দু কদম,পাশের একটি চেয়ার টেনে এনে বসতে বসতে বললো,

“আপনার চোখ বলছে আপনি মিথ্যা বলছেন,কোন কিছুই ঝাপসা নয়, হয়তো আপনি ইচ্ছে করেই মনে করতে চাইছেন না।”

“আমার মন ধ্যান জ্ঞান একমাত্র আলেকজান্দ্রাকে ঘিরে।”

“আর যে আপনাকে ভালোবাসলো?তার কি হবে?ভেবে দেখেছেন?আপনি না পাওয়ার যন্ত্রণায় যতটা ছটপট করছেন, সেও তো নিশ্চয়ই আপনাকে ভালোবেসে এমন ভাবেই ছটপট করছে।তার যন্ত্রণা কি আপনার কাছে কোন দাম নেই?”

“ভালোবাসায় লক্ষ স্থির রাখতে হয়,কারো যন্ত্রণাকে প্রাধান্য দেওয়ার নিয়ম এখানে নেই।”

“আপনি বড্ড স্বার্থপর।”ছোট্ট করে বললো প্রভা

তাকরিম শান্ত ভরাট কণ্ঠে বললো,

” ভালোবাসা আমাকে অন্ধ করে দিয়েছে প্রভা, আমি অনেক কিছু দেখেও দেখতে পাই না।”

“অন্ধ থাকুন কিন্তু অবুঝ থাকবেন না, ভালোবাসা খুঁজে নেওয়ার লড়াইয়ে নয়তো হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।”

“আমি সম্ভাব্য জিনিসে ভরসা করি না,সম্ভবকে আদায় করি,মালিকানায় লিখি নিজের নাম।”

“আপনাকে যে ভালোবাসে নিঃসন্দেহে সে দূর্ভাগিনি,কিন্তু তার চেয়ে দূর্ভাগা আপনি,তার ভালোবাসা ছুতে পারলেন না।”

” ভাগ্যকে কেয়া পাতার নৌকায় ভাসিয়ে দিবো।যদি কোন এক দিন আমার আলেকজান্দ্রা সে নৌকার সাক্ষাৎ পায় তবে দূর্ভাগার সিলমোহর মুছে যাবে চিরতরে।”

“আর যদি উল্টো টা হয়?যদি সে নৌকা ভাসতে ভাসতে গন্তব্য হারায়?আর ফিরে না আসে?”

“তবে বুঝে নিবো এ জন্মও বৃথা গেলো,আরো একটি নতুন জন্ম আমার জন্য অপেক্ষা করছে।”

“যদি জন্মাতে জন্মাতে হাঁপিয়ে যান?যদি না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়ে শেষ জন্ম টুকুও বৃথা যাওয়ার খবর পান?তবে কি আপন করে নিবেন?যে আপনাকে আপনার চেয়েও বেশি ভালোবাসে?যে আপনার পিছু নিয়ে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করেছে স্বইচ্ছায়,নতুন জন্মে আপনাকে পাওয়ার আকাঙ্খায়।”

“যদি কখনো শুনতে পাই জন্মের শেষ সুযোগ টুকুও বৃথা যাবে তখন খুনি হবো,ভালোবাসার পরাজয় স্বীকার করার আগে নিজের হাতে খুন করবো সে ব্যার্থ ভালোবাসার গল্প,তবুও হৃদয়মাঝে অন্য কাউকে ঠাই দেওয়ার কৌতুহল দেখাবো না, কারন আমার হৃদয় শুধু মাত্র আলেকজান্দ্রার জন্য নিবেদিত।”

“যে নারীকে ভালোবেসে হৃদয় নিবেদন করার জন্য মড়িয়া হয়েছেন,সে নারীর হৃদয়ে আপনি আছেন তো?”

“যদি না থাকি তবে হৃদয় ছিড়ে আনবো,নিজ হস্তে খোদাই করে লিখে দিবো আমার নাম।”

প্রভা আর টু শব্দটি করলো না, বিনিময়ে ফ্যাকাসে হাসলো কেবল।মনে মনে আওড়ালো,

“আমিও তবে ছুড়িতে ধার দিবো আজ থেকে,সময় হলে আপনার হৃদয়টা খুলে নিবো বড় যত্ন করে, নিজ হস্তে লিখে দিবো এই সুফির নাম।আমাকে কিন্তু অপবাদ দিতে পারবেন না, আপনিই তো শেখালেন ভালোবাসলে স্বার্থপর হতে হয়।”

___________________

ত্রিজয় এসেছে শপিং মলের একটি দোকান দখলের ইস্যু নিয়ে। দোকানটির বর্তমান মালিকের হাতে সমস্ত বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও ত্রিজয়ের চতুর চালের কাছে সম্পূর্ণ অসহায় তিনি। ত্রিজয় আইনের মারপ্যাঁচে ওস্তাদ।অত্যন্ত কৌশলে একটি জাল দলিল তৈরি করে দোকানটির মালিকানা আরেকজনের নামে প্রমাণ করে ফেলে । তার মিথ্যা প্রমাণের দক্ষতায় দোকানের প্রকৃত মালিক তার শেষ কর্মস্থলটুকুও হারিয়ে ফেলেন।

আজ সেই দোকান খালি করছে দখলদারিরা,দোকানের মালিক যেনো কোন ঝামেলা করতে না পারে তাই স্ব শরিরে ত্রিজয়কে উপস্থিত থাকতে হয়েছে।এমনি এমনিতো আর না,সামান্য ত্রিশ মিনিট সময়ের জন্য ত্রিশ হাজার টাকা ডিল করে তারপর এসেছে সে।

কসমেটিকস এর শফ।নানাধরণের কসমেটিকস ছুড়ে ছুড়ে বের করা হচ্ছে দোকানের বাইরে।দোকানের মালিক নিরুপায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে,চোখে অস্বচ্ছ জল জমে আছে, যেনো কোন ডোবা, যে ডোবায় ত্রিজয়কে ডুবিয়ে মারার বড় ইচ্ছে তার।

ত্রিজয় একাই দাঁড়িয়ে ছিলো এতোক্ষন,ইভান মাত্রই এসে দাড়ালো,ফিসফিসিয়ে বললো,

“স্যার,আপনার কথামতো সবজায়গায় খুজেছি কিন্তু নিস্পা ম্যামের দাদি কে কোথাও দেখা যায় নি।”

“এমপি মশাইয়ের পুরোনো গেস্ট হাউজে খোঁজ নিয়েছিলে?”

“নিয়েছিলাম স্যার, সেখানেও নেই।”

ত্রিজয় আর কিছু বললো না,পকেট থেকে লাইটার টা বের করে একটা সিগারেট ধরালো, চোয়াল শক্ত করে তাকালো পায়ের নিচে সাদা টাইলসের দিকে।

বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর, ইভান আইঢাই করে বললো,

“স্যার আমার মনে হচ্ছে নিস্পা ম্যামের দাদি গায়েব হওয়ার পেছনে এমপি মশাইয়ের কোন হাত নেই।”

ত্রিজয় সিগারেটের পোড়া অংশ টা ফেলে দিয়ে পা দিয়ে পিষতে পিষতে বললো,

“তোমার তো অনেক কিছুই মনে হয় ইভান, আজ পর্যন্ত কোনটা সঠিক হয়েছে?”

ইভানের মুখটা চুপসে গেলো, আর কিছু বলতে পারলো না যেচে পরে।ভোতা মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ।

ত্রিজয়ের দৃষ্টি তখন দোকানের ভেতরে।মালপত্র বের করা লোকগুলোর মধ্যে একটা লোকের হাতে এক ঝুড়ি লিপস্টিক। সেদিকেই চোখ ছোট ছোট করে নিবিষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। অজানা কারনেই এগিয়ে গেলো লোকটির কাছে।লোকটি ঝুড়িটা ছুড়ে ফেলবে ফেলবে ঠিক সেই সময় পেছন থেকে লোকটার হাত ধরে ফেললো ত্রিজয়।

লোকটা বিস্মিত হয়ে তাকালো ত্রিজয়ের দিকে,ত্রিজয় শান্ত কন্ঠে বললো,

“এগুলো ফেলার দরকার নেই।”

ততক্ষণে ইভান এসে দাড়িয়েছে পাশে,লিপস্টিকের ব্যাপারে ত্রিজয়ের আগ্রহ দেখে হতভম্ব হয়ে বললো,

“স্যার ফেলবে না কেন?এগুলো তো মেয়েদের জিনিস আপনার কাজে আসবে না।”

ত্রিজয় জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো,

“পুরো ঝুড়িটাই নিয়ে নেও, সবগুলোই আমার কাজে লাগবে।”

ইভান ভ্যাবাচেকা খেলো,ভ্যাবলার মতো ঠোঁট ফাঁক করে বললো,

“স্যার শেষে কিনা আপনার লিপস্টিক দিতে ইচ্ছে করলো?”

ত্রিজয় দাঁতে দাঁত পিষে বললো,

“শাট আপ উজবুক কোথাকার।এগুলো আমার জন্য নয়।”

“তাহলে?”

ত্রিজয় গলা খাকালো,আইঢাই করে বললো,

“ওই মেয়েটার জন্য, ঠোঁট গুলো দেখনি কেমন বিশ্রী লাগে।”

ত্রিজয়ের এবারকার কথা শুনে বিষম খেলো ইভান, চোখ গোল গোল করে বললো,

“তো?”

“তো আবার কি?একে তো ফাটা ঠোঁট, তার উপর কোন ফ্লেবার নেই, টেস্ট শুটকি মাছের চেয়েও জঘন্য।”

কথাটা বলেই দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলো ত্রিজয়,ভুল জায়গায় যে ভুল কথা বলে পেলেছে সে বিষয় টা বুঝতেই সোজা হাঁটা ধরলো লম্বা পা ফেলে,যেতে যেতে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,

“সবগুলো নিয়ে গাড়িতে এসো।”

ত্রিজয়ের যাওয়ার পানে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে রইলো ইভান,প্রায় দশ পনেরো সেকেন্ড তাকিয়ে থাকর পর বিরবির করে বললো,

“শালা কিপ্টার বংশধর,মাগনা পেয়ে পুরো এক ঝুড়ি লিপস্টিকের প্রয়োজন পরে গেলো, আর টাকা দিয়ে তো একটা সুতোও কিনিস নি আজ পর্যন্ত।”

________________

রাত আটটা।তাকরিমের কেসটা নিয়ে স্টাডি করছে ত্রিজয়।হাতে ধরে রাখা ফাইলের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে ঘরের এপাশ থেকে ওপাশ পাইচারি করে যাচ্ছে কখন থেকে, একটু পর পর টেবিলের উপরে রাখা কফির মগটা তুলে নিয়ে চুমুক দিচ্ছে ধির গতিতে।

হুট করেই নজর গেলো টেবিলের উপর রাখা দুটো ব্যাগের উপর।সকালে নিয়ে আসা লিপস্টিক গুলোর সাথে একটা শাড়িও কিনেছিলো ত্রিজয়।কিন্তু নিজের ইগো সেটিস্ফাইডের জন্য দেওয়া হয়ে উঠে নি নিস্পাকে।

ত্রিজয় ফোস করে নিঃশ্বাস নিলো,হাত থেকে ফাইলটা রেখে দিয়ে, চট করেই তুলে নিলো ব্যাগ দুটো, অগ্রসর হলো নিস্পার ঘরের দিকে।

নিস্পা বালিশে হেলান দিয়ে মাথা এলিয়ে বসে আছে।গুনগুন করে গাইছে গান,তবে কি গাইছে শোনা যাচ্ছে না। ত্রিজয় ঘরে এসেই শোনার চেষ্টা করলো কি গান গাইছে কিন্তু বুঝতে পারলো না একটুও।পরপরই ঠোঁট গোল করলো, তৈরি করলো এক মোহময় সুর,নিস্পা হকচকিয়ে উঠলো, মন্ত্রমুগ্ধকর এই সুর তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইলো কোন গভীর অতলে।ত্রিজয় সুর তুলতে তুলতে এগিয়ে এলো নিস্পার কাছে,ভরাট কন্ঠে বললো,

“গান গাইলে এভাবেই গাইতে হয়,নয়তো আর কখনো কাকের মতো প্যাচপ্যাচ করবি না।”

সুরটা থেমে যেতেই হাইপার হয়ে উঠলো নিস্পা,হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,

“এই সুর!এই সুর আমি চিনি, আগে কোথাও শুনেছি আমি,আপনাকে কে শিখিয়েছে এই সুর বাজানো?”

ত্রিজয় চোখ উল্টে তাকালো,দাম্ভিক কন্ঠে বললো,

“ত্রিজয় অন্যের কিছু শিখেও না, নেয়ও না। ত্রিজয় যা করে সবটাই তার ক্রিয়েটিভ।”

“কিন্তু এই সুর এর আগে আমি কোথাও শুনেছি।কিন্তু কোথায় শুনেছি মনে করতে পারছি না।”

“মনে করতেও হবে না। তোর আজাইরা কথা শোনার জন্য আসি নি আমি।”

ত্রিজয় নিজের হাতের দুটো ব্যাগ এগিয়ে দিলো নিস্পার দিকে,একটা তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো,

“ধর, এগুলো দিতে এসেছি।”

নিস্পা কপাল কুচকালো,ভাবুক কন্ঠে বললো,

“কি?”

ত্রিজয় ঠোঁট দিয়ে ঠোঁট টিপে ধরলো, একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললো,

“লিপস্টিক আছে আর ড্রেস।”

নিস্পা অবাক হয়ে বললো,

“কি?আপনি আর লিপস্টিক? আপনি আমার জন্য লিপস্টিক এনেছেন?”

“তো কি হয়েছে? এনেছি বলে আবার নিজেকে সেলিব্রেটি ভাবিস না,জাস্ট বোন মনে করেই এনেছি।”

কথাটা বলেই ব্যাগ দুটো নিস্পার হাতে ধরিয়ে দিলো ত্রিজয়।নিস্পা একটা ব্যাগে হাত ঢুকালো,ব্যাগের ভেতর হাতড়ে দেখতে গিয়ে কপাল কুচকে এলো তার,বিস্মিত কন্ঠে বললো,

“একি!এটা তো শাড়ি মনে হচ্ছে।আমি তো শাড়ি পরতে পারি না।”

“মেয়ে হয়ে শাড়ি পরতে পারিস না?এ জীবন রেখেছিস কোন দুঃখে?পরতে না পারলে গলায় ফাস লাগিয়ে মরে যা।”

“ফালতু কথা বলবেন না,শাড়ি এনে দিয়েছেন খুসি হয়েছি, এবার আপনি আসতে পারেন।”

ত্রিজয় বিরক্ত হলো, তিরিক্ষি কন্ঠে বললো,

“ত্রিজয় কারো জন্য এক পয়সাও খরচ করে না অথচ তোর জন্য গুনে গুনে চব্বিশ হাজার টাকা দিয়ে শাড়িটা কিনেছি,না পড়লে এই শাড়ি দিয়েই মেরে ফেলবো।”

কথাটা বলেই ঘর থেকে বের হতে নিলো ত্রিজয়।পরপরই কিছু একটা ভেবে দাড়ালো, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো নিস্পার দিকে,জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো,

“তুই চাইলে শাড়িটা আমি পড়িয়ে দিতে পারি।”

“দরকার নেই মাপ করুন।” তিরিক্ষি কন্ঠে বললো নিস্পা।

ত্রিজয় মেজাজ খারাপ করে বললো,

“ভাব বেড়ে গেলো নাকি?শোন তোর প্রতি চুল পরিমাণ ফিলিংস নেই আমার জাস্ট বোন মনে করে মানবতা দেখাতে চেয়েছি, নিজেকে সেলিব্রিটি ভাবা বন্ধ কর।ডিজগাস্টিং।”

(যারা প্রশ্ন করছেন তাকরিমের সব মনে আছে আর কারো মনে নেই কেন?
উত্তর হলো, প্রথমে কিন্তু দেখানো হয়েছিলো তাকরিমের কিছুই মনে ছিলো না,তারপর আলেকজান্দ্রা খচিত আংটিটি পাওয়ার পর তার সবকিছু মনে পড়েছে ।)

আরেকটি বিষয়, দয়া করে ধর্ম টানবেন না। আমি আমার ধর্মকে সম্মান করি বিশ্বাস করি।ধর্ম ধর্মের যায়গায়।আমার গল্প শুধু মাত্র আমার কল্পনা।তাই গল্পের বিষয় বস্তু গুলো রুপকথার মতো করে পড়লেই খুশি হবো।

চলবে,,,,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here