মেহবুব লেখনীতে:‎#তাবাসসুম_তোয়া ‎৪.

0
35

‎#মেহবুব
লেখনীতে:‎#তাবাসসুম_তোয়া
‎৪.

‎আমার মেডিকেলে চান্স হলো না। আমি ভীষণ ভেঙে পড়লাম। আমার সারাজীবনের স্বপ্ন মেডিকেলে পড়া! বিশেষ করে আর্মড ফোর্সেস মেডিকেলে ( AFMC)।
‎উনার পাশাপাশি থাকতে চেয়েছি এজন্য। কিন্তু আমার মেডিকেলেই আসলো না। তবে চারটা পাবলিক ভার্সিটিতে টিকলাম। কিন্তু সেই চান্সে আনন্দিত হলাম না মোটেও! আমার সকল আনন্দ ম্লান হলো মেডিকেলের দুঃখে। সেই মুচড়ে পড়ার অসহনীয় যন্ত্রণার সময় কেউ একজনের ফোন পেলাম! তার ফোন পেয়ে আমার সকল দুঃখ গায়েব হয়ে গেল! যে ছিলো আমার কাছে জাদুর সোনার কাঠি রুপোর কাঠি মতোই!
‎ফোন কানে নিয়ে সালাম দিলাম, নম্বরটা অপরিচিত,

-‎” আসসালামু আলাইকুম, কে বলছেন? ”

-‎” ওয়ালাইকুম আসসালাম, তারিক স্পিকিং ”

‎কন্ঠ শুনেই আমার হার্ট অ্যাটাক হলো। হার্ট ব্লক হয়ে গেল! সেখানে এয়ার সার্কুলেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার দরুন আমি দম বন্ধ হয়ে হ্যাং হয়ে থাকলাম!
উনি কেন ফোন দিয়েছেন! সবসময় চেয়েছি ফোন দিক কিন্তু এখন যখন ফোন দিয়েছে ওমনি আমার কথা বন্ধ হয়ে গেল। উনি কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বললো,

-‎” মুনিবা, grow up, মেডিকেলে চান্স না পেলে কি মানুষ খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয়? রুম আটকে বসে থাকে?”

‎আমার আবারও কান্না পেলো! আমি কি পরিমান দুঃখে আছি উনি কি করে বুঝবেন! উনি তো সারাজীবন সবকিছুতে সেরা ছিলেন!

-‎” মুনিবা, জীবনের শুধু একটা পরীক্ষায় সফল হওনি, তার মানে কি তুমি ব্যর্থ? জীবনের আরকিছুই বাকি নেই! সব শেষ! বলো? ”

বেশ খানিকক্ষণ থেমে থেকে আস্তে করে বললাম,
-‎” না, তবে অনেক বেশিই চেষ্টা করেছিলাম! সবচেয়ে বড় স্বপ্নের জায়গা এটাই ছিলো। অনেক রাতের অক্লান্ত পরিশ্রম ব্যর্থতাই পর্যবসিত হলো! ”

-‎” ব্যর্থ কোথায় হলে? অনেক গুলো ভার্সিটিতে চান্স পেয়েছো শুনলাম ? ”

-‎” ঢাবি,জাবি, সাস্ট আর খুবিতে।”

-‎” গুড, এগুলো সফলতা নয়? সারা বাংলাদেশের কত হাজার স্টুডেন্ট পাবলিকে চান্সের চেষ্টা করে জানো ? কতজন পায়? তাদেরও কি রুম আটকে বসে থাকা উচিত?

‎আমি কিছু বলতে পারলাম না। উনি বলে চললেন,

-‎” জয় আর পরাজয় দুটোই আমাদের জীবনের শিক্ষক-একজন শেখায় কেমন করে উঠতে হয়, আরেকজন শেখায় কেমন করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ! বুঝেছো? ”

-‎” জ্বি ”

-‎” কোথায় ভর্তি হতে চাইছো? ”

-‎” জাবিতে কেমিস্ট্রি আসবে ৷ ওটাতে। ”

-‎” নাহ,ওটাতে নয়। ঢাবিতে কোনটা আসবে? ”

-‎” বোটানি।”

-‎” ওকে গুড। এটাই। ”

-‎” ঘাস লতাপাতা নিয়ে পড়ে কি করবো? ”

-‎” তাহলে? ”

-‎” কেমিস্ট্রি? ”

‎খানিকক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

-‎” নাহ জাবিতে পড়ার অনুমতি নেই আমার তরফ থেকে, এখন তুমি দেখো কি করবা? তোমার ইচ্ছে। একজন স্বাধীন মানুষকে তো কেউ জোর করতে পারে না? ”

‎অনুমতি নেই কথাটা এতো আপন লাগলো! মনে হলো আমি তার! একান্তই তার! আর আমার সকল বিষয় তার অনুমতিতেই চলে! আমি লজ্জায় বিছানায় মুখ গুঁজলাম!

‎আমাকে চুপ দেখে বললো,

-‎” খাবারে আর অনিয়ম হবে? ”

-‎” উহু। ”

-‎” আম্মুকে একবার ফোন দিও, দুশ্চিন্তায় আছেন তোমাকে নিয়ে ”

-‎” আচ্ছা ”

-‎” ওকে গুড গার্ল। রাখছি তবে ”

‎আমি চুপ করেই থাকলাম। উনিও।

‎কিছুক্ষণ পর আবারও শুনলাম

-‎” মুনিবা? ”

ভীষণ ভীষণ সাহস নিয়ে বলে ফেললাম,
-‎” আমি আপনাকে ফোন দিতে পারি মাঝে মাঝে?”

-‎” নাহ ”

-” মেসেজ?”

-” নাহ ”

‎আমি আর কিচ্ছুটি বললাম না। আমার গলা আটকে আসলো! খট করে ফোনটা কেটে গেল। আমি অনেকক্ষণ সেটা কানে নিয়ে বসে থাকলাম। না পাওয়ার মাঝে যতটুকু পেলাম ততটুকুতেই আমি খুশী!

‎ঢাবিতে ভর্তি হয়ে উঠে গেলাম সুফিয়া কামালের গণরুমে। আমার নতুন সংসার শুরু হলো একটা বিছানা একটা বালিশ আর একটা ছোট্ট ট্যাংকের সাথেই।


°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°


‎এরপর কেটে গেল কতগুলো মাস। একদিন খবর পেলাম উনি ভীষণ ভাবে আহত হয়েছেন।
‎উনার পোস্টিং তখন বান্দরবানে ছিলো। পাহাড়ে ড্রাগ ডিলার আর পাহাড়ী উপজাতি সন্ত্রাসীদের সাথে তুমুল বন্দুক যুদ্ধ হয়েছে। সেখানে কতগুলো ডিলার,এজেন্ট ক্রসে মারা পড়েছে।
সেই ভয়াবহ ত্রিমুখী যুদ্ধে সেনাবাহিনীর অবস্থা নাজুক হয়েছে। অনেকেই ভীষণভাবে আহত হয়েছেন। পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের একাংশ ঘটনাস্থলে এসে আহত সেনা কর্মকর্তা, সৈনিকদের নির্দয়ভাবে পাহাড় থেকে ফেলে দিয়েছে! তাদের ঘাটি উৎখাতের উদ্দেশ্যেই মূলত সেনাবাহিনীর এই অপারেশন ছিলো!

‎গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উনি যখন পড়েন ছিলেন উনাকেও পাহাড় থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। একজন নাকি শহীদ হয়েছেন! কথাটা শুনে আমি থরথর করে কেঁপে উঠলাম! উনাকে ঢাকা সিএমএইচে আনা হয়েছে হেলিকপ্টার যোগে, সাথে আরোও গুরুতর আহতদের কয়েকজনকেও।
‎আন্টি আঙ্কেল সিএমএইচে আসার পথেই আম্মুকে খোঁজ দিলেন।

‎সে খবর পেয়ে আমি কেন যেন পাগল হয়ে গেলাম!আমার মাথায় কাজ করছিলো না! কিচ্ছু ভাবতে পারছিলাম না। মাথা পুরো ফাঁকা হয়ে গেল। মনে হলো আঘাত গুলো আমার শরীরে হয়েছে! আমার সারা শরীরে ব্যাথা! আমি থরথর করে কাঁপছিলাম! ইয়া আল্লাহ, এ কোন বিপদ! মনে হচ্ছিল বুলেট এফোড় ওফোড় করেছে আমার দেহ! আমার ছটফটানি দেখে আমার রুমমেট সানি দৌড়ে এসে আমাকে ধরলো।


‎চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here