#মেহবুব
লেখনীতে:#তাবাসসুম_তোয়া
১১.
ফজরের নামাজে উনি ইমামতি করলেন। আমি উনার পিছনে দাড়িয়ে নামাজ পড়লাম। উনি বললেন কফি খাবেন। তাই কফি বানাতে কিচেনে এসেছি।
কফি বানিয়ে হাতে নিয়ে গিয়ে দেখি উনি ঘুমিয়ে গেছেন।
ফোন দুটোর একটা ভাইব্রেট করছে। আমি তাড়াতাড়ি সেটা নিয়ে ভাইব্রেট বন্ধ করে টেবিলের উপরে রাখলাম। ফোন যে আমার সবচেয়ে বড় সতীন হবে এটা আমার বদ্ধমূল বিশ্বাস! সারাক্ষণ অনবরত বাজতেই থাকে!
মানুষটা কিছুক্ষণ ঘুমাক। উনার রেস্টটা খুবই জরুরি! কিন্তু সে কথা উনাকে কে বোঝাবে? উনি কি শুনবেন। আমাকে বলে ছুটোছুটি অথচ নিজে? আমি ঘুমন্ত মানুষটাকে দেখলাম অনেকক্ষণ! ঘুমন্ত উনাকে দেখার এই এক সুবিধা ঐ বড় বড় চোখ জোড়া বন্ধ তাইতো আমার দেখতেও সমস্যা হলোনা। কি সুন্দর শান্ত শীতল নদীর মতোই ঘুমিয়ে আছেন! অথচ জেগে থাকলে খরস্রোতা নদী! কি তার তর্জন গর্জন! আমার বড্ড ইচ্ছে হলো ছুঁয়ে দেখার অথচ সে হিম্মত নেই! তাকিয়ে থাকতেই কি ভীষণ লজ্জা আমাকে ঘিরে ধরছে!
আমি উনার কফিটা কিচেনে রেখে এসেছি। তারপর আলতো পায়ে হেঁটে সিড়ির পথ ধরলাম। কফি হাতে ছাদে গেলাম!
আমার নতুন জীবনের নতুন সূর্যোদয় দেখতে! সেদিনের সূর্যটা তখনও উদিত হয়নি। হবো হবো ভাব।
কবুতর গুলো উড়ে বেড়াচ্ছে খাঁচার ভিতরে। আর বাক বাকুম শব্দ করছে। আমি খাঁচার গেট খুলে দিলাম। উনার বড্ড শখের জায়গা এটা। আমি ছোটবেলা থেকে শুনেছি। একবার একটা বনবিড়াল এসে উনার পছন্দের একটা লোটন কবুতরকে মেরে রেখে গেছিলো! সেই শোকে উনি যে কত পাগলামি করেছেন শুনেছিলাম!
কফিটা শেষ করে সূর্যোদয় দেখছিলাম।
বেশ খানিকক্ষণ পর টের পেলাম কেউ উঠে আসছে। আমি কবুতরের খাঁচা পেরিয়ে একদম ঐ পাশের দেয়ালে গিয়ে লেগে থাকলাম। আমার মন বললো উনিই আসছেন! এতো সকালে আর কে আসবে?
আর উনার সামনে পড়তে ইচ্ছে করছে না একটুও।এতো এতো লজ্জা লাগছে! যে ইচ্ছে হচ্ছে মাটির সাথে মিশে যাই!
উনিই ছিলেন এবং আমাকে খুঁজেও পেলেন এক মূহুর্তেই, এসেই দিলেন এক ধামকি।
-” এই তুমি আমার চুল গুলোকে নষ্ট করতে চাও?
কেন ওগুলোকে বেধে রেখেছো? তোমাকে না হেয়ার ড্রায়ার দিলাম! ”
আমি চোখ নিচু করে দাড়িয়ে আছি সকালটা শুরু হলো ধামকি দিয়ে। নাহ বিবাহিত জীবনের প্রথম সকালে গরম গরম ধামকি!
উনি হাত ধরে নিচে নিয়ে গেলেন। তারপর নিজ দায়িত্বে নিজেই চুল গুলোকে শুকিয়ে দিলেন। আমি আবারও লজ্জায় মাটির সাথে মিশলাম! অথচ সে নির্বিকার! আমার ইচ্ছে হলো বলতে ‘ আপনার নির্লিপ্ততা আমাকে একটু ধার দেন, আমিও বাঁচি এই হাঁসফাঁস অবস্থা থেকে! অথচ তা বলা হলো না! আমি বললাম
-” আপনার ঘুম প্রয়োজন।”
উনি বললেন
-” তোমাকে প্রয়োজন, আমার কফি কই? ”
কথাটা শুনে হৃদয়ে ঘন্টা বাজলো,পালাতে চাইলাম! আমি বললাম
-” নিয়ে আসি? ঘুমাচ্ছিলেন দেখে রেখে এসেছি। ”
-” আচ্ছা যাও ”
আমি কফি নিতে আসলাম, চা বসালাম সবার জন্য। এটা সেটা করে সময় ক্ষেপন করছি। রুমে যেতে পারছি না কিংবা আর যাবো না। চা বানানো শেষ করে সেটা বড় ফ্লাস্কে ঢেলে রাখলাম। আমি এর আগেও আন্টির সাথে এ কাজ করেছি।
এরপর কফি হাতে যখন রুমে ঢুকবো তখন পা চলতে চাইলো না। যেতে পারছি না নিজের রুমেই! উনার সামনে পড়তে ইচ্ছে করছে না। উনি স্বাভাবিক হলেও আমি মোটেও স্বাভাবিক হতে পারছি না! কাজিনের মেয়ে রুমু যাচ্ছিল ওকে দিয়ে দিলাম কফি মগটা।
এরপর আমি ফ্লাস্ক হাতে নেমে এলাম নিচতলায়।
উনি কিচেনে এসে আম্মুকে দেখে বললেন
-” তোমার মেয়ে কই? কফি আনতে পাঠালাম আর দেখছি হারিয়ে গেল! ”
-” মাত্র তো তোমার খালাদের জন্য চা নিয়ে গেল নিচে! কফি না রুমুকে দিয়ে পাঠালো? ”
আমি চা নিয়ে নিচে গিয়ে দেখলাম কেউ উঠেনি
তাই ফ্লাস্কটাকে ওখানে রেখে এদিকে ওদিকে দেখছি। তখন দেখি উনি সিড়ি দিয়ে নেমে আসছেন ৷ আমি দৌড়ে দরজার আড়ালে চলে গেলাম ! পড়বো না উনার সামনে! আল্লাহ বাঁচাও!
উনি এসেই আমাকে পেয়ে গেলেন! কেমনে এতো সহজে পাচ্ছেন? ঈগলআই সম্পন্ন মানুষ!
দরজার ওপাশ থেকে টেনে এনে একদম সামনে দাড় করালেন। আমি চোখ বন্ধ করে ফেলেছি। এতো দ্রুত টান দিয়েছেন বাতাসে সাঁই করে ভেসে সামনে এসে পড়েছি। উনি চুপচাপ দেখলেন কিছুক্ষণ। আমি চোখ খুলতে নিলেও আবারও আটকে দিলাম! উনি ফু দিলেন আমার চোখেমুখে ! তারপর বললো
-” বুঝলাম না মানুষ বিয়ে করেছি নাকি ইদুর! হুটহাট কোন গর্তে লুকায় টের পাই না। খুঁজেও পাইনা৷
বলি কি ইদুর সাহেবা নাকি বিড়াল ছানা! আমি যে ক’দিন আছি আর কোনো গর্তে লুকায়েন না৷ প্লিজ! আপনাকে খুঁজে পেতেই আমার অনেকটা সময় চলে যাচ্ছে! ”
আমি চোখ খুলে তাকালাম। উনি ভ্রু নাচালেন,
-” কি সমস্যা? কফি কই আমার? ”
আমি মাথা নিচু করে ফেললাম! আমি কিচ্ছুটি বলতে পারলাম না। উনি আবারও আমাকে কোলে করে দোতলায় নিয়ে গেলেন!
দরজা আটকে বললেন
- ” স্বামীর নির্দেশ মানা ওয়াজিব। সো তোমার স্বামীর নির্দেশ হচ্ছে চোখের আড়াল হবে না৷ ”
আমি আস্তে করে বললাম
- ” আপনার ক্ষত দেখবো।”
উনি বললেন
-” নেই, সেরে গেছে। তুমি এসেছো না? ”
তারপর রুমের পর্দা টেনে আবারও শুয়ে পড়লেন। আমি বললাম
- ” কফি? ”
” খাবো না, কিছুক্ষণ ঘুমাবো” বলেই আমাকে টেনে নিয়ে কোলবালিশ বানিয়ে শুয়ে পড়লেন! কি সুন্দর! নিজেকে কি পুতুল মনে হচ্ছে! সামান্য স্পর্শেই জ্ঞান হারাচ্ছি! কি এক নাজুক অবস্থায় পড়ে আছি আমি!
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
সকালে নাস্তার পর উনি বের হবেন। আব্বুর ওখানে যাবেন। আমি যেতে চাইছি উনি বললেন,
-” রাতে আব্বুকে নিয়ে চলে আসবো। তুমি রেস্ট করো। তোমার রেস্ট দরকার! ”
আমি উনার এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছি। উনার প্রত্যেকটা জিনিসে হাত দিতে আমার হাত কাঁপছে!
গাড়ির চাবিটা বাপ্পির রুমে। আমি দরজায় গিয়ে দেখলাম বান্দরটা মুহাইমিনকে কোলবালিশ বানিয়ে ঘুমুচ্ছে। আমি ভিতরে গেলাম না। সাকিবকে বললাম,
- “গাড়ির চাবিটা? ”
সাকিব দিলো।
উনাকে চাবিটা দিতেই উনিও এগিয়ে এলেন। ড্রেসিং টেবিলের উপরে থাকা টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু নিয়ে আমার ঠোঁটের লিপস্টিক মুছে দিতে দিতে বললেন
-” এটা আর পরো না, হ্যাঁ? It tastes weird! ”
শুনেই আমার কান ঝালাফালা হয়ে গেল। গাল দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হলো!
তখনই বাইরে মামা এসে দাড়িয়েছেন। ডাকলেন উনাকে। উনি বের হয়ে গেলেন। আমি
দৌড়ে বিছানার পড়ে বালিশ চাপা দিয়ে থাকলাম। ‘উফফ! এটা কোন কথা! ‘
কিছুক্ষণ পর টের পেলাম কেউ পাশে! আমি সাথে সাথে বালিশ সরিয়ে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করলাম! দেখি উনি হাসছেন! আমি উঠতে নিলাম উনি উঠতে দিলেন না, আরো হেলে আসলেন আমার দিকে!! চোখে চোখ রেখে বললেন
-”এটা তোমার স্বভাব তাই না? ”
-” কোনটা ”
-”এই যে কিছু হলেই বালিশ চাপা দিয়ে পড়ে থাকো! ”
আমি বললাম
-” আপনি আমাকে লজ্জা দিচ্ছেন! ”
উনি ভ্রু দিয়ে ইশারা করে বললেন
-”যে কারনে এটা মুছলাম সেটা তো শেষ করা হলো না।”
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
ঐদিন দুপুরে বৌ ভাতের পর প্রায় সব মেহমান চলে গেল। উনার রেস্ট দরকার। তাই কেউ ভীড় করলো না। আমি অপেক্ষা করছিলাম কখন আব্বু আসবে। সবাইকে বিদায় দিয়ে বার বার ঘর টু বারান্দা করছিলাম।
বিকালের পর আব্বু এলেন৷ মোটামুটি সুস্থ। মাইল্ড স্ট্রোকের মতোই হয়েছিলো।
বাকিদিন কেটে গেল আব্বুর পাশে বসেই।
রাতের দিকে আমি আম্মুর পাশে বসেই ছিলাম। উনি আসলেন। আব্বুর ব্লাড সুগার চেক করলেন। প্রেসার মাপলেন। অক্সিজেন স্যাচুরেশন চেক করলেন! তারপর ঔষধ পত্র গুলো ঠিকমতো বুঝিয়ে দিলেন আমাকে আর আম্মুকে,
-” তিনবেলা সময় ধরে ঔষধ গুলো খাইয়ে দেবে । ”
বাসায় থাকতে আব্বুর ঔষধ গুলোও আমি খাইয়ে দিতাম। উনি চলে গেলেন। আমি বসেই থাকলাম। কি করবো? আম্মু হয়তো সরাসরি বলতে পারলেন না, বললেন
-” রুমে অবশ্যই ওয়াটার পট নিয়ো, সাথে কিছু স্ন্যাকস। কিচেনের সেলফে তারিকের ওয়াটার পটটা আছে। ”
আমি কিচেনে গিয়ে চুপচাপ দাড়িয়ে আছি। লাইটও জ্বালাইনি। কি করবো? কই যাবো? আমার কোন যাওয়ার জায়গা নাই! উনাকে দেখলাম রুম থেকে বের হলেন। আমি একদম সেলফের সাথে লেগে থাকলাম। উনি এদিকটা দেখে চলে গেলেন! টের পেলাম ছাদে যাচ্ছেন। তারপর আবারও রুমে ফিরে গেলেন ৷ উনি কি আমাকেই খুজঁছেন?
তখন মনে হলো কেউ এলো কিচেনের দিকে। কিচেনের দেয়ালে লাগোয়া ফ্লিটার থেকে পানি নিচ্ছিলো বাপ্পি। অন্ধকারে আমাকে খেয়াল করেনি। আমি বললাম
-” বাপ্পি, উনার ওয়াটার পটটা কোথায়।”
ঐ উযবুকটা এমন এক চিৎকার দিলো আমারই জান বের হয়ে গেল তাতে ! ছেলে মানুষ এতো ভয় পায় জানা ছিলো না।
আমি সাথে সাথে লাইট জ্বালালাম। সবাই দৌড়ে এসেছে। বাপ্পি তখনও বুকে থুথু দিচ্ছে।
-” বাসায় একটা ভূতনি নিয়ে এসেছো আম্মু? অন্ধকারে দাড়িয়ে থাকে! ”
উনি কেমন চোখে তাকালেন। তারপর আমার হাত ধরে নিয়ে গেলেন রুমে।
হঠাৎ এমন কান্ডে আমি হাসছিলাম খুব। কিন্তু উনার চেহারার দিকে তাকিয়ে হাসি উবে গেল!
রুমে এসে গেট আটকে দিলেন। আমার গলা শুকিয়ে গেল!
-”কোথায় ছিলে তুমি? আমি তোমাকে মাত্র খুঁজে এসেছি। ছাদেও গিয়েছি, কিচেনেও গিয়েছিলাম!
অন্ধকারে কি করছিলে? কি সমস্যা? সবসময় পালাই পালাই কেন! ”
আমি চুপচাপ পড়ে থাকলাম। এ যে গতরাতের মানুষটা নয়। এযে কঠিন মানুষটা! উনি বললেন
-” কথা বলো, বলো কি সমস্যা আমি শুধরে নিচ্ছি। তুমি যা চাইবে তাই হবে! তবুও স্বাভাবিক হও। ”
আমি এবার সাহস করলাম।
আমি উনার চোখ দুটো হাত দিয়ে ঢেকে বললাম
-”এই দুটো সমস্যা! ”
উনি হেসে উঠলেন।
-”এখন কি আমি তাকাবোও না”
এমন ভাবে তাকালেন আমি বললাম
-”এই ভাবে তাকানো যাবে না!”
উনি আরেকটু অন্যরকম করে তাকালেন। আমি আবারও বললাম
-” না এই ভাবেও না। ”
উনি আমার দিকে আরোও প্রখর দৃষ্টিতে তাকালেন! আমি সে দৃষ্টি টের পেলাম! আর আমার ভুল বুঝতে পারলাম। আমি চুপ হয়ে মাথা নামাতে গেছি উনি আমার গাল ধরে ফেললেন।
-” উহু মুখ নামাবে না। ”
আমি বললাম “সরি।” আমার চোখে আর্জি!
উনার চোখে প্রখরতা সাথে দুষ্টুমি! উনি দৃষ্টি আরোও প্রখর করলেন। আমার অন্তর কেঁপে উঠলো!
এক দৃষ্টি দিয়েই পড়ে ফেলেন পুরোটা হৃদয়! দৃষ্টিটা একদম হৃদয়ে গিয়ে বিদ্ধ হয়! আমি সে দৃষ্টিতে মাতাল হয়ে যাচ্ছিলাম! আমি চোখ বন্ধ করতে নিলেই বললো,
-”উহু চোখ বন্ধ করলেই কঠিন পানিশমেন্ট পাবে! ”
আমি আবারও আর্জি পেশ করলাম চোখে চোখে। সে আর্জি মঞ্জুর হলো না!
আমি ভাবছি উনি হয়তো আমার জন্যই দৃষ্টি চেঞ্জ করছিলেন একবারও টের পাইনি উনি এতোটা সিরিয়াস হয়ে উঠছেন!
আমি পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম সে দৃষ্টির গভীরতায়। কিন্তু চোখ সরানোর পারমিশন দিলেন না। আমার গলা শুকিয়ে গেল!
আমি চোখে চোখে আর্জি জানিয়েই গেলাম। আমি নিশ্বাস নিতে ভুলে গেলাম! একটা সময় হার মেনে চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
আমি কাঁপছি! আবেগের এই খেলায় আমি বড্ড কাঁচা খেলোয়াড!
উনি আমার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললেন
-” আমি সবসময় এই ভাবেই তাকাই। আর এভাবেই তাকাবো। তোমাকে সহ্য করতে হবে! তোমাকেই সব সহ্য করতে হবে,মেহবুব! ”
সেই ফিসফিসানিতে পুরো স্নায়ুতন্ত্র ঝা ঝা করে উঠলো, আমি থর থর করে কেঁপে উঠলাম
সেই ধীমিস্বর ছড়িয়ে পড়লো প্রতিটি নিউরনে নিউরনে, প্রতিটি লোমকূপের গোড়ায়!
আমার মনে হলো আমি পাগল হয়ে যাবো! কি ঝড়কে বরন করেছি আমি! এ তো পাগলা ঝড়! এ ঝড় সামলানো কি আমার কাজ!
চলবে….

