#মেহবুব
লেখনীতে: #তাবাসসুম_তোয়া
১.
আমার আজও মনে পড়ে, আমি তখন ক্লাস টু’তে। বছরের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে বাপ্পি আমাদের কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি হয়েছিল! ওর বাবা বদলি হয়ে এসেছিল এবং কি এক জটিলতা ছিলো তাই বছরের মাঝামাঝি সময়েই ওরা শহর চেঞ্জ করেছিল ৷
ক্যাবলাকান্ত বললে ভুল হবেনা একদম উজবুক ছেলেটা প্রথম দিনেই পিটি প্যারোডের সময় দৌড়ে এসে আমার পায়ে দিলো এক পাড়া! এমন ভয়াবহ পাড়া ছিলো সেটা,যে আমার পায়ের কনিষ্ঠা একদম পিষে গেল মনে হলো। আমি চিৎকার দিয়ে উঠে অটোমেটিক আত্মরক্ষার্থে ওকে দিয়েছিলাম জোরে এক ধাক্কা। কিভাবে দিয়েছিলাম মনে পড়ে না। তবে সেই ধাক্কায় উজবুকটা পড়লো গিয়ে মক্কায়!ধারাভাষ্যকার চৌধুরী জাফরুল্লাহ শারাফাতের ভাষায় যাকে বলে,একেবারে সীমানা ছাড়িয়ে মাঠের বাইরে! ও এতোটা দূরে গিয়ে পড়বে কে জানতো?
ঠিক তখনই একজোড়া রক্তচক্ষু দৃষ্টি আমাকে ছুয়ে গেল তীক্ষ্ণ ভাবে! বাপ্পির বড় ভাই তারিক ভাই। উনার চোখ দেখেই আমি এতো ভয় পেয়েছিলাম যে ভ্যাঁ করে কান্না জুড়ে দিলাম। উনি সেদিন নির্দয়ের মতোই আচরণ করলেন। একবারও আমার দিকে এগিয়ে এলেন না। নিজ ভাইকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করলেন। উনি তখন কোন ক্লাসে জানি পড়তেন, আমার জানা ছিলো না!
মিনারা মিস আমাকে আদর করে শান্ত করলেন। এরপর থেকে আমি তারিক ভাইকে এতো বেশি ভয় পেতাম! উনাকে দেখলেই কোন কিছুর পিছনে লুকিয়ে পড়তাম! কখনও পিলার, কখনও বেঞ্চের নিচে,কখনও বা ক্লাসে ছুট দিতাম! এমন ভাবেই চলছিল দিনকাল।
এরমধ্যে আরেকদিন বাপ্পি উজবুকটা আরোও একটা কান্ড ঘটালো। নাক ঝেড়ে হাত ঝাড়া দিতেই সেই সর্দি এসে পড়লো আমার স্কার্ফে! একদম আমার মুখের কাছাকাছি! আমি তো সেটা দেখেই তুমুল চিৎকার। দৌড়ে এলেন দিলারা মিস। উনি টিস্যু দিয়ে সেটা পরিষ্কার করলেন আর বাপ্পিকে এই ব্যাপারে সর্তক করলেন। গাধা বাপ্পি সেই নালিশ করলো তার বড় ভাইকে,আমার সামনেই অদূরে দাড়িয়ে আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো, আমি নাকি মিসকে দিয়ে তাকে বকা খাইয়েছি। সেদিনও তারিক ভাই আবারও আমার দিকে রক্তচক্ষু দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন!
এভাবেই দিনকে দিন গাধাটা আমার কাছে অসহ্যকর হয়ে উঠেছিলো। সাথে গাধার বড়ভাইটাও।
ওমা এর মধ্যে একদিন বিকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি সেই বান্দারা আমাদের বাসায়। বাপ্পি তার ভাই আর বাবা মা সহ ! আমি আকাশ থেকে পড়লাম যেন! এরা আমাদের বাড়িতে কেন?
তারিক ভাইকে দেখেই সেই যে ঘরের দিকে দৌড় দিলাম! আজও দৌড় কালও দৌড়! আর বের হইনি! বাপ্পির আম্মু আমাকে রুমে এসে আদর করে গেলেন। আন্টির সে কি আদর। উনার মেয়ে নেই! কিন্তু মেয়ের শখ ছিলো ভীষণ। সেজন্য আমাকে আদরটা যেন একটু বেশিই ছিলো।
উনারা চলে গেলে জানতে পারলাম তারিক ভাইয়ের বাবা আমার আব্বুর ছোটবেলায় জানের জিগার দোস্ত!
জগতে এতো মানুষ রেখে ঐ বড় বড় চোখের মানুষটাকেই কেন আব্বুর বন্ধুর ছেলে হতো হলো সেই হিসাব আমার মিললো না কখনও! সেই গরুর মতো চোখ জোড়ার মানুষটাকে আমার সহ্য হতো না একবিন্দুও,এমনকি আমার সহ্য হয়নি বড় হওয়া অব্দিও। অবশ্য এটাও সঠিক সেই গুরুগম্ভীর মানুষটা কোনদিনও আমার সাথে কথা বলেনি!
নট আ সিঙ্গেল ওয়ার্ড! কোনোদিন না! খুবই অবাক
করা ব্যাপার ছিলো সেটা। আমরা প্রায় পনের বছর ধরে পরিচিত ছিলাম তবুও উনি কোনদিন একটা ওয়ার্ড আমাকে বলেননি! আর তাই আমিও কোনদিন বলিনি। অবশ্য বড় হওয়ার পর উনার সামনে আমি কোনদিনই পড়িনি। সেটা ইচ্ছাকৃতই ছিলো।
শুনেছিলাম উনি রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে পড়তেন। বাড়িতে আসতেন অনেক পরে পরে। যার জন্য দেখাই হতো না উনার সাথে। আর উনি হয়তো হাতে গোনা এক দু’বার এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে। যার কারনে বাপ্পির সাথে মোটামুটি একটা নটখট সম্পর্ক থাকলেও উনি ছিলেন একদম ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। বাপ্পির সাথে আমার স্কুল কলেজ একই ছিলো! বারো বছরের বন্ধুত্ত্ব প্রায়।
আমি তখন এইট কিংবা নাইনে! তারিক ভাইয়ের এক রিলেটিভসের বিয়েতে গিয়েছিলাম। আমার মনে হলো, উনি ঘুরে ফিরে আমাকে কয়েকবার নোটিশ করলেন!আমার সাথে চোখাচোখিও হলো! আমি ভীষণ অবাক হলাম! ঐ কয়েকবারের দৃষ্টিতেই আমার কেমন যেন অনুভূতি হলো! ঐ যে কথায় আছে না, মেয়েদের সিক্সথ সেন্স অনেক হাই!
সেই তখন আমার ছোটবেলার দূরন্তপনায় ভাটা পড়েছে অনেকটাই,আমি তখন শান্তশিষ্ট মেয়েটা। যে সবসময় আম্মুর বোরকার কোণা ধরে ঘুরে বেড়াই! সেদিনও যথেষ্ট শালীনভাবেই ছিলাম আমি। হজ্জ্ব থেকে ফিরে আব্বু আমার জন্য খুব দামী এরাবিয়ান বোরকা সেট নিয়ে এসেছিলেন। বিয়েতে আমি সেটাই পরেছিলাম। সাথে আম্মু আব্বু থাকায় কোনরূপ এদিকে ওদিকেও তাকাতে পারিনি। পুরোটা সময় ভদ্র মেয়ের মতোই আম্মুর পাশে বসেছিলাম। সেদিন আমার ভদ্রতা দেখে নাকি দুইটা বিয়ের প্রস্তাবও এসেছিলো! আম্মু বাসায় এসে একথা বলতেই আমি হেসে গড়াগড়ি খাওয়ার জোগাড়!
তবে উনার ঐদিনের দৃষ্টি আমাকে অনেকদিন ভুগালো! কেন সেটা আমার জানা হলো না! কেন উনি ওমন করে আমাকে বার বার দেখছিলেন? কি জানি! ছোট্ট আমার মাথায় ঢুকলো না!
আম্মুর সাথে জামান আন্টির যোগাযোগ চলতো সবসময়ই। তারিক ভাই ISSB তে টিকেছেন সেই নিয়ে বিশাল এক আনন্দের উৎসব শুরু হলো যেন! আন্টি তো ভীষণ খুশি। তিনবেলা ফোন দিয়ে ছেলে কখন কি করেন সব আপডেট দিতে থাকেন। এদিকে আমিও ফোনে কথা বলার পুরোটা সময় আম্মুর পাশে এ বাহানায় সে বাহানায় ঘুরঘুর করতে থাকি!
এর মাঝে তারিক ভাইয়েরা সবাই এলেন একদিন মিষ্টির প্যাকেট হাতে ৷ আমি তিনতলার উপর থেকে উনাদের আসতে দেখলাম। সামনে যাওয়ার সাহস হয় নি ৷ তখন আমি যথেষ্ট বড় ৷ বাইরের মেহমানের সামনে যাইনা একদমই ৷ কিন্তু ঐদিন উনাকে দেখতে ইচ্ছে হলো ভীষণ! কতদিন পর এসেছেন! আন্টি ভিতরে আমার রুমে এসে আমার সাথে গল্প করলেন অনেকক্ষণ।
তারপর আঙ্কেল ভাইয়েরা সবাই নামাজে চলে গেলে আমি গেলাম দরজা বন্ধ করতে ৷ ঠিক তখনই উনি যেন কোন কারনে ফিরে এসেছিলেন। আমি দরজা আটকাবো ওমনি উনি হাত দিয়ে দরজা থামিয়ে দিলেন। আমি চোখ উঁচিয়ে উনাকে দেখে দরজা ছেড়ে সরে দাড়ালাম ৷ তারিক ভাইয়ের আর্মি কাটিং চুল, সাথে পুড়ে যাওয়া চেহারা দেখে অবাক হব কি, ভীষণ মর্মাহত হলাম! মানুষটা চেনার মতোই ছিলো না। কি পরিমান গাধার খাটুনি তিনি খেটেছেন সেটা উনাকে দেখে খুব বুঝলাম। উনি আমার দিকে খুব স্বাভাবিক দৃষ্টি দিলেন, যেন উনি আশা করেছিলেন আমায়! তারপর হাতের ঘড়িটা খুলতে খুলতেই একবার আম্মু বলে ডাকলেন, কিন্তু আন্টি আসছেন না দেখে উনার ঘড়িটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। আমি কাঁপা হাতে সেটা ধরতেই উনি গটগট পায়ে নেমে চলে গেলেন! আমার মনে প্রশ্ন জাগলো নামাজে কি ঘড়ি পরে যাওয়া যায় না? তবে? আমি উনার ঘড়িটা ধরেও ধরতে পারছিলাম না। এতোটা লজ্জা লাগছিলো! হাতের মুঠোয় পুরে যেন উনার স্পর্শকে অনুভব করতে পারছিলাম!
সেদিন আমি নিজেকে চিনতে পারছিলাম না, এ আমি অন্য আমি! এ আমি’র কি হলো?
আমি ঘড়িটাকে সেন্টার টেবিলের উপর রেখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম। আমি কি এর আগে কখনও ঘড়ি দেখিনি! তবে ঘড়িটা কেন এতো আপন লাগছিলো? আমি করলাম কি, আমার ফুল হাতা জামার নিচে ঘড়িটা পরে থাকলাম। লম্বা মানুষটার বড় ঘড়িটা আমার চিকনা হাতে ঝুলে থাকলো ব্রেসলেটের মতোই! পড়েই যাচ্ছিল, কোনরকমে পতন ঠেকালাম। আমি সেটাকে পরে থাকলাম উনারা ফেরা অব্দি,তবে লুকিয়ে চুপিয়ে।
বাপ্পি তখন আমার সাথে অনেক ফ্রী। তবে পরিমিত ডিস্টেন্স বজায় রাখতো সবসময়ই। আমার রুমের দরজায় এসে নক করে বললো
-” মুনিবা, ভাই তোর কাছে ঘড়ি দিয়েছিলেন? ”
আমি দরজার ঐ পাশ থেকে বললাম
-” আমার ঘড়িটা ভীষণ পছন্দ হয়েছে যদি ফেরত না দিই তবে ভাইয়া কি আমায় মারবে? ”
চলবে..

