#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:39
চৌচালা বিশিষ্ট টিনের ছাদের ফাঁক গলে তীর্যক আলোকরশ্মি সোজা ছুটে এসে চোখে পড়লো নিস্পার।নিস্পা চোখ বন্ধ করে ফেললো বিদ্যুৎ গতিতে, তার শরীরের প্রত্যেকটি লোমকূপ দাঁড়িয়ে গেলো অনাহুত সংবেদনে।তৎক্ষনাৎ কানে ভেসে এলো একটি বাচ্চার কন্ঠস্বর,
“আম্মিজান ও আম্মিজান তাত্তারি আসো গো অলিক কন্যার চোখ লড়ছে।”
নিস্পা চোখ বন্ধ করেই টিপটিপ করলো, মনে করলো একটু আগের ঘটনা।সে তো অপারেশন থিয়েটারে ছিলো, ত্রিজয় তার হাতটা শক্ত করে ধরে রেখে ভরসা দিয়েছিলো,সম্মোহনে রাঙা কন্ঠে বলেছিলো,
“আমি অপেক্ষা করবো তোমার ফিরে আসার।তুমি চোখ মেলে সবার প্রথম আমাকে দেখবে।”
নিস্পা চুপটি করে দাঁড়িয়ে ছিলো বেশ কিছুক্ষণ, তারপর মিনমিনে কন্ঠে জিজ্ঞেস করেছিলো একটা প্রশ্ন,
“আপনাকে চিনতে পারবো তো আমি?”
ত্রিজয় উত্তরে বলেছিলো,
“শুনো মেয়ে,আমি অপেক্ষায় আছি তোমার,আমার নীল চোখের অভ্যন্তরে তোমাকে ফাদে ফেলার অপেক্ষায়।”
ত্রিজয়ের উত্তরে বেশ সন্তুষ্ট হয়েছিলো নিস্পা,বুঝেছিলো একজোড়া নীল চোখের সম্মুখীন হতে হবে খুব শীঘ্রই।ব্যাস! এতটুকুই যথেষ্ট, সে ধিরে ধিরে ত্রিজয়ের হাতটা ছেড়ে দিলো,চলে গেলো অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে।
তারপর ধারাবাহিকতা অনুযায়ী বেডে শোয়ানো হলো তাকে,একজন মহিলা নার্স এসে ইঞ্জেকশন পুশ করলো তার শরীরে, সে তড়িৎ কুচকে নিলো চোখ,তারপর ধিরে ধিরে তলিয়ে যেতে শুরু করলো অন্ধকার রাজ্যে।পুরো পুরি জ্ঞান হারানোর প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর চোখের পাতা খুললো মেয়েটা,আর ঠিক সেই মূহুর্তে চোখে এসে বিধলো আলোর ঝলকানি।আর কানে এসে ঠেকলো সম্পূর্ণ অচেনা সেই কন্ঠস্বর।বাচ্চাটা চিকন স্বরে ডাকছে তার মাকে,
“আম্মিজান, ও আম্মিজান।”
নিস্পার মনের মধ্যে জ্বলোচ্ছাসের প্রবনতা বাড়লো,এক অদ্ভুত সমীকরণে আঁটকে গেলো তার ভাবনা।মনের মধ্যে হাজারটা প্রশ্নের উত্তাল ঢেউ এলোমেলো করে দিচ্ছে তার সমস্ত হিসেব।
তার কি চোখের অপারেশন হয়ে গেলো?অপারেশনের সাথে সাথেই সে দেখতে পাচ্ছে কি করে?তার চোখে কি ব্যান্ডেজ লাগাতে হয় নি?কিন্তু চোখ খুলে যে সূর্যের কিরণ দেখতে পেলো? সেটা কি করে?অপারেশন থিয়েটার থেকে কি তাকে বের করা হয়েছে?বের করা হয়ে থাকলে টের পেলো না কেন ও?আর এই যে কন্টিনিউয়াস যেই বাচ্চাটার কন্ঠ শুনতে পাচ্ছে সেই বাচ্চাটা কে?তার কাছে তো কোন বাচ্চা থাকার কথা না।
এমন হাজার খানেক প্রশ্ন নিস্পার অস্থিরতা বাড়িয়ে দিলো, নিস্পা হাপাতে শুরু করলো, ঘনঘন নিঃশ্বাস নেওয়ার কারণে দ্রুত উঠানামা করলো তার ঢেউখেলানো বুক।সে আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলো না, সবগুলো প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য মড়িয়া হয়ে উঠলো,নিজেকে ধাতস্থ করে ধিরে ধিরে খুললো চোখ।
চোখ খুলে আবারও দেখতে পেলো সেই অচেনা অজানা বাচ্চা ছেলেটির উদ্বিগ্ন মুখ।সে এক নাগাড়ে ডেকেই যাচ্ছে তার মাকে।নিস্পা দৃষ্টি ঘোরালো ভয়ে ভয়ে, চারদিকে টিনের বেড়ায় আবৃত ঘর, সে ঠিক মাঝখানটায় শুয়ে আছে।কোথায় এলো সে?এটা তো হাসপাতাল নয়,হাসপাতাল তো এমন হওয়ার কথা না।
পরিবেশ আর পরিস্থিতি তার ভাবনার অনুকূলে।সে কি করবে বুঝতে পারলো না,তড়িৎ সেকেন্ডের গতিতে চোখের পল্লব বুজে ফেললো পুনরায়।
চোখ বন্ধ করেই মেয়েটা ধাতস্থ করলো নিজেকে।মনে করলো সময় কাল।হ্যাঁ আজ তো সেই সময়,তার সময় ভ্রমণের দিন আজ।তারমানে কি তার সময় ভ্রমণ হয়ে গিয়েছে? মহাকালের চাকা কি ঘুরেছে তবে?তাকে কি সত্যি সত্যিই নিয়ে এসেছে তার জন্মের পঞ্চাশ বছর পেছনে?
কথাগুলো ভাবতেই বুক ধড়পড় করে উঠলো নিস্পার।কানে ভেসে এলো সত্যবীনা পাখির উড়ে আসার শব্দ,ডানা ঝাপ্টানোর সেই পরিচিত শব্দ পেয়েই লাফিয়ে উঠলো মেয়েটা,মনে মনে খুশি হলো বেশ,তার মনে জাগা সমস্ত প্রশ্নের উত্তর তাহলে সত্যবীনা পাখির কাছেই যেনে নিবে সে।
নিস্পা উঠে বসা মাত্রই পাখিটি উড়ে এসে বসলো তার মাথার উপর,অদ্ভুত ভাবে শব্দ করলো,
“পিউক পিউক।”
নিস্পা দীর্ঘশ্বাস ফেললো, চোখ বন্ধ করেই ডাকলো সত্যবীনা পাখিকে,
“সত্যবীনা পাখি!”
নিস্পার ডাক শুনে বাচ্চা ছেলেটি হা হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে, বিস্মিত কন্ঠে বললো,
“তুমি মোগো নাম জানলা কেমনে গো অলিক কন্যা?”
বাচ্চা ছেলেটির এমন কথায় কিঞ্চিৎ বিব্রত হলো নিস্পা,ফট করে খুলে ফেললো বুজে রাখা চোখের পেল্লব,প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো বাচ্চাটির দিকে, অস্ফুটে বললো,
“নাম!”
সাদা ময়ুর পেখমে আবৃত পাখিটি ততক্ষনে নিস্পার মাথার উপর থেকে উড়ে এসে বসলো বাচ্চাটির কাঁধে,বাচ্চাটি এক হাত তুলে হাত বুলালো পাখিটির মাথায়,হাস্যজ্বল কন্ঠে বললো,
“হ গো অলিক কন্যা, আমার নাম সত্য আর এই আমার পাখি তার নাম আমি আদর কইরা রাখছি বীনা।”
নিস্পা অবাক হয়,কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে তাকিয়েই থাকে বাচ্চাটির মুখের দিকে।আবারও অস্পষ্ট আওড়ায়,
“সত্য আর বীনা।সত্যবীনা!”
নামের ক্যালকুলাস করতেই ধড়পড়িয়ে উঠলো নিস্পা, বুকের ভেতর শুরু হলো তোলপাড়।চতুর মস্তিষ্ক ইঙ্গিত দিলো দ্রুত,সতর্ক বার্তা প্রেরণ করলো বিদ্যুৎ গতিতে,বুদ্ধিমতী নিস্পা বেড় করে ফেললো এই নামের রহস্য।তার মনে পড়ে গেলো সত্যবীনা পাখির কথা।সে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলো সময় ভ্রমণের পর সত্যবীনা পাখিকে পাশে পাবে কিনা।উত্তরে সত্যবীনা পাখি বলেছিলো, “সত্য পাইবা, বীনা পাইবা, তবে সত্যবীনা পাখি পাইবা না।”
এই উত্তরের মানে এখন পরিস্কার বুঝতে পারছে নিস্পা।সে প্রকট নেত্র তুলে তাকালো বাচ্চাটির দিকে তারপর তাকালো বাচ্চাটির কাঁধে বসে থাকা পাখিটির দিকে, এক আঙুল তুলে অস্ফুটে বিরবির করলো,
“সত্য পেলাম বীনা পেলাম, সত্যবীনা পাখি পেলাম না।”
বাচ্চাটি বুঝলো না নিস্পার বিরবিরানি,সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো নিস্পার মুখের দিকে।তবে নিস্পার দৃষ্টি এখন আর স্থির নেই, সে অবলোকন করতে ব্যাস্ত তার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা এক গুচ্ছ আলো।
“কি হয়েছে সত্য?ডাকাডাকি কেন করছো?”
একটি সুকন্ঠি স্বরের সাথে ঘরে প্রবেশ করলো একজন সুন্দরী মহিলা।নিস্পা দ্রুত তার দৃষ্টি ঘোরালো সেথায়,তাকালো সেই মহিলার দিকে।মহিলার পরনে মোটা সুতোয় বোনা একটি সুতি কাপড়।তার উপরে একটা ওড়না দিয়ে ঢেকে রেখেছে মাথা থেকে দু বাহুর সম্পূর্ণটাই।মুখমণ্ডল আর দুই হাত ছাড়া তেমন কিছুই পরিলক্ষিত নয় আপাতত।তিনি এস্ত এসে দাড়ালো নিস্পার কাছে,আদুরে কন্ঠে বললো,
“এমা জ্ঞান ফিরেছে তোমার?এখন কেমন বোধ করছো মেয়ে?”
নিস্পা হতহ্বিবল হয়ে তাকিয়ে রইলো মহিলার দিকে,নতুন পৃথিবীর সবকিছুই ঘোরের মতো লাগছে তার, কি থেকে কি হচ্ছে না হচ্ছে কিছু বুঝতে পারছে না, নাতো চিনতে পারছে তার জীবনে আগমন করা নতুন মানুষ গুলোকে।সে মহিলাটির দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট উচ্চারণ করলো,
“আপনি?”
মহিলা এগিয়ে এসে বসলো নিস্পার কাছে, তারপর একগাল মুচকি হেসে বললো,
“আমি মালেকা, এই বাড়ির বেগম।”
এতটুকু উত্তরে সন্তুষ্ট হলো না নিস্পা,চোখের মনি ঘুরিয়ে দেখতে শুরু করলো চারপাশ,তারপর আবার জিজ্ঞেস করলো,
“নাম কি এই বাড়ির?”
“এই বাড়ির নাম হলো মোল্লা বাড়ি, এই বাড়ির কর্তার নাম হলো আব্দুল হিকমত মোল্লা।”
নিস্পা চিনলো না, না চেনারেই কথা,সে পুনরায় প্রশ্ন করলো,
“আমি এখানে কি করে এলাম?”
“তোমাকে সত্যের আব্বা এইখানে নিয়ে এসেছে মেয়ে, তার কাছে শুনেছি তিনি নাকি তোমাকে নদীর ধারে অজ্ঞান অবস্থা পেয়েছে।”
বেগম মালেকা নিস্পার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে পরপরই করে বসলেন আরেকটি প্রশ্ন,
“তুমি কি সাঁতার জানো না মেয়ে?এতো বড় মেয়ে হয়ে পানিতে ডুবলে কি করে?”
নিস্পা শুখনো ঢোক গিললো,তার মানে মহাকাল তাকে ফেলে দিয়ে গিয়েছে নদীর কিনারায়,যেখান থেকে বেগম মালেকার স্বামী তাকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে এখানে।কিছু সেকেন্ডের মধ্যেই হিসেব মিলিয়ে ফেললো নিস্পা,তবে খুঁজে পেলো না যুতসই উত্তর,রিনরিনিয়ে জবাব দিলো,
“আমি জানি না।”
বেগম মালেকা কেমন তাজ্জব হয়ে তাকালো নিস্পার দিকে,এতো বড় মেয়ে সাঁতার জানে না এই কথা বিশ্বাসই হলো না তার,কেমন সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“তুমি সাঁতার জানো না?”
“না,আমি সাঁতার জানি না কারণ আমি শহরে থাকি।”
নিস্পার উত্তরে বেশ বিব্রত হলো বেগম মালেকা,বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“শহর?শহর আবার কি?তুমি কি গঞ্জের কথা কইতাছো মেয়ে?”
নিস্পা আইঢাই করলো, কি বলবে বুঝতে পারলো না,সে দ্রুত নজর বুলালো হাতের কড়ে,গননা শুরু করলো তার জন্ম সাল থেকে পঞ্চাশ বছর পেছনের দিকে, 1998 সাল থেকে পঞ্চাশ বছর পেছনে গিয়ে পাওয়া গেলো 1947 সাল।তার মানে সে 1947 সালে চলে এসেছে,আর খুব স্বাভাবিক ভাবেই এখনকার মানুষ শহরের অর্থ বুঝবে না।নিস্পা নিজেকে প্রস্তুত করলো,সত্যটা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলো বেগম মালেকা কে,
“আপনি আমার কথা বুঝবেন না বেগম মালেকা।কারণ আমি আপনাদের সময়ের মানুষ নই,আমি ভবিষ্যৎ থেকে এসেছি।”
বেগম মালেকা এবার চরমভাবে বিস্মিত হলো,হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো নিস্পার দিকে।পরপরই পাশে বসে থাকা সত্যকে আদেশ করলো,
“তাত্তারি যাও সত্য,তোমার আব্বাকে ডাইকা নিয়া আসো,এ কোন পাগল কন্যা কুড়াইয়া আনলো বাসভবনে।”
______________
দ্যা ম্যান্ডেট মহলের বাতাস আজ গরম।ফুলে সজ্জিত বিয়ের মন্ডপে বসে আছে জমিদার শওকত মোল্লার কন্যা জুবাইদা,তার পাশেই বসে আছে প্রিন্স জোসেফ।লর্ড মাউন্ট আজ বেশ খুশি।বিহারি পুরের জমিদার শওকত মোল্লার সাথে সম্পর্ক তৈরি হলে তার উদ্দেশ্য হাসিল করা থেকে কেউ আটকাতে পারবে না তাকে।পুরো বিহারি পুরের শাসন এবং দখলদারিত্ব বাজেয়াপ্ত করে নিবে এক লামহায়।কারণ এই দেশের সিংহভাগ অঞ্চলের ভালো ফলন এবং চাষাবাদ বিহারি পুরের উর্বর জমিতেই হয়ে থাকে।
জমিদার কন্যা জুবাইদাকে নিজের পুত্রবধূ করার পর বিহারি পুরে রাজত্ব ফলাতে পারবে সে,দেশের সম্পদ লুটে নিতে পারবে খুব সহজে, কোনরকম যুদ্ধ বিদ্রোহ ছাড়াই।কথাগুলো ভাবতেই লর্ড মাউন্ট প্রফুল্ল হাসলো।
রানী ক্যাথরিন বসে আছে নিজ আসনে।প্রিন্স জোসেফের বিয়ে নিয়ে খুব বেশি মাথাব্যথা নেই ক্যাথরিনের।জুবাইদা নিঃসন্দেহে তার চেয়ে কম সুন্দরী,এতেই সে খুব খুশি।এই মহলে দ্বিতীয় কোন সুন্দরী মেয়ে আসবে না কস্মিনকালেও।
বিয়ের আয়োজন জমজমাট।দেশের ধর্মিয় নিয়ম অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়েছে বিয়ের সমস্ত নিয়মকানুন।ধর্মিয় নিয়ম মোতাবেক একজন হুজুর আনা হয়েছে ম্যান্ডেট মহলে।শওকত মোল্লার বিশ্বস্ত মানুষ তিনি।বিহারি পুরের বড় মসজিদে নামাজ পড়ায় এই ইমাম সাহেব।আজ জুবাইদা আর প্রিন্স জোসেফের বিয়ে তিনিই পড়াবেন।
যদিও কালিমার প্রতি অগাধ বিশ্বাস নেই কালো জাদুর পূজারি প্রিন্স জোসেফের,কেবল বাধ্য হয়েই বসে থাকতে হচ্ছে এখানটায়,তবে কতক্ষণ এই ধৈর্য স্থায়ি হবে জানে না সে,কারণ বিয়ে নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা নেই তার।না তো আগ্রহ আছে জুবাইদার প্রতি।
তার নীল রঙা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অবচেতনে খুজছে কাউকে।দূরের ওই কোনে একা দাঁড়িয়ে আছে নাবহা।তার সাথে একজন থাকার কথা, কিন্তু কোথায়?তড়িৎ পুরো কক্ষে দৃষ্টি ঘোরালো জোসেফ।নাহ!কোথাও তো নেই।গেলো কোথায় মেয়েটা?পালালো নাকি?”
এদিকে হুজুর বারবার জোসেফকে কবুল পড়ার জন্য তাগিদ দিচ্ছে,একবার নয় প্রায় কয়েকবার বলার পড়েও টু শব্দ অব্দি করলো না জোসেপ।কর্ণপাত করলো না হুজুরের কথায়।প্রিন্স জোসেফের পক্ষ থেকে কোন উত্তর না আসায় চিন্তিত হলো জুবাইদা।ব্যাগ্র নয়ন ঘোরালো প্রিন্স জোসেফের দিকে। অথচ প্রিন্স জোসেফের কঠোর একাগ্র চাহনিতে নমনীয়তার ছিটেফোঁটাও দেখতে পেলো না,নাতো দেখতে পেলো তার প্রতি বিন্দুমাত্র মনোযোগ।প্রতিটি সেকেন্ডের সাথে প্রিন্স জোসেফের অভিব্যক্তি পাল্টালো রকেটের গতিতে,কবুল বলা ছাড়াই ধপ করে উঠে দাড়ালো বসা থেকে,কঠোর কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো সৈন্যদের উদ্দেশ্যে,
“ফ্লোরেন্সা কোথায়?”
প্রিন্স জোসেফের এমন কাজে ভড়কালো সবাই।তার চেয়ে বেশি অবাক হলো বিয়ের আসর থেকে উঠে দাঁড়িয়েই সবার প্রথম একটা সামান্য দাসীর খোঁজ করায়।সবার মধ্যে হৈচৈ বেধে গেল মুহুর্তেই,কানাঘুঁষা শুরু হয়ে গেলো ফ্লোরেন্সাকে নিয়ে।
হটাৎ পরিবেশ পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ায় রাগে ক্ষোভে ফুসে উঠলো রানী ক্যাথরিন।প্রচন্ড আক্রোশে হাতের চার আঙুল দিয়ে চেপে ধরলো নিজের আসনের হাতল।ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলে উঠলেন,
“কি করছো কি প্রিন্স?এতো বড় একটা শুভ কাজে সামান্য একটা দাসীর খোঁজ কেন করছো?দিনকে দিন তোমার জ্ঞান লোপ পাচ্ছে দেখছি।”
প্রিন্স জোসেফ প্রতিক্রিয়া দেখালো না,আদেশ ছুড়লো সৈন্যদের উদ্দেশ্যে,
“মেয়েটাকে দ্রুত এখানে হাজির করো।”
প্রিন্স জোসেফের আদেশ পাওয়া মাত্রই সমস্ত সৈন্য পিপড়ের মতো ছড়িয়ে গেলো পুরো মহলে।ঘটনার আকস্মিকতায় চমকালো প্রত্যেকে।সামান্য একজন দাসীর জন্য প্রিন্স জোসেফের এমন উদগ্রীব আচরণ ভাবালো সবাইকে।জুবাইদা তখনও থ মেরে বসে আছে, মুখে রা নেই তার।প্রিন্স জোসেফের সাথে যেদিন প্রথম ওই মেয়েটাকে দেখেছিলো সেদিনই তার মনে কু গাইছিলো,ভবিষ্যতে এমন কোন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কায় হাপড় হাপড় লাগছিলো বুক।
আজ ষোল কলা পূর্ণ হলো, প্রিন্স জোসেফ ওই মেয়েটার জন্য উঠে দাড়ালো বিয়ের আসর থেকে।তবে কি সত্যিই তার আর প্রিন্স জোসেফ কে পাওয়া হবে না?তার প্রতীক্ষার সময়কাল কি তবে বেড়ে গেলো আরও এক যুগ?
জমিদার শওকত মোল্লা ভিষণ উত্তেজিত, তার একমাত্র আদরের মেয়েকে ফেলে রেখে প্রিন্স জোসেফের উঠে দাঁড়ানো নিয়ে চরম আপত্তি জানালো তিনি।প্রচন্ডরকম অস্থির হয়ে সামনে এসে দাড়ালো জোসেফের,কন্ঠ চড়াও করে বললো,
“একটা সামান্য দাসীর জন্য তুমি আমার মেয়ের বিয়ে মাঝপথে থামিয়ে দিতে পারো না প্রিন্স।”
প্রিন্স জোসেফ নিটোল দৃষ্টি সরাসরি নিক্ষেপ করলো জমিদার শওকত মোল্লার দিকে।গভীর দুটো নীল রঙা চোখে ভাসমান ক্রোধ,ব্লেডের মতো ধারালো বক্ষ সটান,কন্ঠ শান্ত অথচ গম্ভীর রেখে বললো,
“প্রিন্স জোসেফের সামনে দাঁড়িয়ে উঁচু গলায় কথা বলার অপরাধে আমি আপনার কণ্ঠনালী এপার ওপার করে দিতে পারি।”
জমিদার শওকত আশ্চর্য হলো,উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
“তুমি ভুলে যাচ্ছো প্রিন্স আর কিছুক্ষণের মধ্যে আমি তোমার শশুর হতে চলেছি।”
প্রিন্স জোসেফ এবারেও অভিব্যক্তি পাল্টালো না,শক্ত কন্ঠে প্রতিত্তোর করলো,
“ক্ষন, কাল,সময় এই তিনটি শব্দে অবিশ্বাসী আমি।আশা করছি আমার কাজে বাধা দেওয়ার মতো বোকামি দ্বিতীয়বার করবেন না।”
শওকত আলী থতমত খেলো, প্রিন্স জোসেফের হুমকিতে ভয় পেলো কিঞ্চিৎ,তাই পূনরায় তর্কে না জড়িয়ে, গিয়ে দাড়ালো লর্ড মাউন্টের সামনে।একটু ক্রোধিত কন্ঠে বললো,
“আপনিও চুপ করে থাকবেন লর্ড?আপনার পুত্রের এমন কাজে কেন কিছু বলছেন না?”
লর্ড মাউন্ট বরাবর শান্ত স্বভাবের কূটবুদ্ধি সম্পন্ন একজন মানুষ।কোন কাজেই বিন্দুমাত্র তাড়াহুড়ো দেখায় না সে,প্রত্যেকটি কাজ সম্পাদন করে অত্যন্ত চতুরতার সাথে।
তবে প্রিন্স জোসেফের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন,কারণ প্রিন্স জোসেফের অপছন্দের মানুষের তালিকায় তিনিই প্রথম এই কথা বেশ ভালো করেই যানেন লর্ড।কিন্তু প্রিন্স জোসেফ তার কাছে সোনার ডিম পারা হাঁসের মতো।প্রিন্স জোসেফের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি,সমস্যা সমাধানের উপস্থিত বক্তব্য,বুক ভরা সাহস আর অদম্য শক্তি লর্ড মাউন্টকে এই দেশে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে বছরের পর বছর।
কিন্তু লর্ড মাউন্ট এবারে আশাহত প্রিন্স জোসেফের এমন কাজে তার সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা পাচ্ছে সে।কিন্তু লর্ড তা কখনোই হতে দিবে না, আজ যেকোনো মূল্যে জুবাইদার সাথে প্রিন্স জোসেফের বিবাহ দিয়েই ক্ষান্ত হবে সে।
লর্ড মাউন্টের নিরবতার বিপরীতে ক্ষোভ প্রকাশ করলো শওকত, আবার বললো,
“কি হচ্ছেটা কি লর্ড? আমার মেয়েকে নিয়ে কি তামাশা শুরু হয়েছে?আপনি চুপ করে আছেন কেন?”
শওকতের উচ্চস্বরের ডাকে ভাবনার জাল ছিড়ে বেড়িয়ে এলো লর্ড মাউন্ট।দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাত রাখলো জমিদার শওকত আলীর কাঁধে তারপর বললো,
“আমি দেখছি।”
লর্ড মাউন্ট এবারে এগিয়ে এলো প্রিন্স জোসেফের কাছে,গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“প্রিন্স সময় নষ্ট হচ্ছে,বিয়ের কাজ শেষ করো দ্রুত।”
প্রিন্স জোসেফ শক্ত কন্ঠে জবাব দিলো,
” দুঃখিত লর্ড, দাসী ফ্লোরেন্সা এখানে উপস্থিত না হলে এই বিয়ে সম্পন্ন করতে নারাজ আমি।”
লর্ড ভেতর ভেতর ক্রোধে ফেটে গেলো, অথচ টু শব্দটি করলো না, খুব সাবধানে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে চাপা স্বরে বললো,
“তুমি প্রিন্স,এই মহলের ভবিষ্যৎ লর্ড।তোমার বিয়ের সাথে ওই দাসীর কি সম্পর্ক।”
“আমি আপনাকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।”
“আমি লর্ড মাউন্ট, আমাকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য তুমি।”
“আমাকে অযথা ক্ষেপাচ্ছেন কেন লর্ড? আপনি নিজেও যানেন আমি আপনাকে এক ফোটাও গুরুত্ব দেই না।”
প্রিন্স জোসেফের এবারকার কথায় লর্ড মাউন্ট কিঞ্চিৎ দমে গেলেও পুরো উদ্যোমে ফুসে উঠলো রানী ক্যাথরিন,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,
“প্রিন্স!মহামান্য লর্ড কে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার সাহস হয় কি করে তোমার?”
প্রিন্স জোসেফ শান্ত কন্ঠে অকুতোভয় উত্তর দিলো,
“আমি প্রিন্স!প্রিন্স জোসেফ।সাহস আমার রক্ত কনিকায় মিশে আছে ওতপ্রোতভাবে।”
রানী ক্যাথরিন রাগান্বিত কন্ঠে আরো কিছু বলতেই যাবে তার আগেই হাজির হলো সৈন্যদল, সবাই একজোটে মাথানত করে বললো,
“পুরো মহল তন্নতন্ন করে খুজেছি প্রিন্স।দাসী ফ্লোরেন্সা কোথাও নেই।”
প্রিন্স জোসেফের চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়লো ক্রোধ।সামান্য একটা মেয়ের এতো বড় স্পর্ধা সহ্য হলো না তার,ক্রোধিত কন্ঠে চেচিয়ে উঠলো,
“দাসী নাবহা,দ্রুত আমার সম্মুখে এসো।”
প্রিন্স জোসেফের ক্রোধিত কন্ঠে কেঁপে উঠলো নাবহা,ভয়ে জমে গেলো তার পা জোড়া,মায়াবী চোখ জুড়ে ঠিকরে পড়লো অসহায়ত্ব।প্রিন্স জোসেফ দ্বিতীয়বার ডাকার প্রয়োজন বোধ করলো না,ইশারা দিলো সৈন্যদের, কয়েকজন সৈন্য গিয়ে ধরে ফেললো নাবহাকে, দু দিক থেকে বাজেয়াপ্ত করে সামনে নিয়ে দাড় করালো প্রিন্স জোসেফের।
অতিরিক্ত ভয়ে হেচকি তুলে কাঁদছে নাবহা,দু হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে রেখেছে পড়নের লম্বা ফ্রকটা।ঠোঁট দুটো ভূমিকম্পের ন্যায় কাঁপছে,চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে অঝোর বারিধারা।
অথচ প্রিন্স জোসেফ বিন্দু মাত্র তোয়াক্কা করলো না সেদিকে,ধমকের স্বরে বললো,
“ফ্লোরেন্সা কোথায়?”
নাবহা বিদ্যুৎস্পষ্টের ন্যায় কেঁপে উঠলো, আতংকিত কন্ঠে ভেঙে ভেঙে বললো,
“জা,,জানি,,না।আ,,আমি,,জানিনা।”
প্রিন্স জোসেফ ক্ষুব্ধ কন্ঠে ধমকে উঠলো ফের,
“মিথ্যা, আমি জানি, ফ্লোরেন্সাকে পালাতে তুমিই সাহায্য করেছ।”
নাবহা দু’হাত জোড় করে আকুতি জানালো,ভেজা কম্পনরত কন্ঠে বললো,
“আমি জানিনা প্রিন্স, আমি সত্যিই জানিনা ফ্লোরেন্সা কোথায়।”
প্রিন্স জোসেফ নিজেকে সামলাতে না পেরে গলা টিপে ধরলো নাবহার, শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করলো,
“ভালোয় ভালোয় বলো ফ্লোরেন্সা কোথায়।”
নাবহার শ্বাসনালী রোধ হয়ে এলো,গলা ফেটে যাচ্ছে, বুক ভারি হয়ে এলো যন্ত্রনায়,আটকে আটকে বললো,
“জা,,,নি,,,না।আমি জা,,,নি না।”
প্রিন্স জোসেফ আশানুরূপ উত্তর না পেয়ে আরেকটু ক্ষেপে উঠলো,নাবহাকে ছুড়ে ফেললো সৈন্যদের দিকে, কঠিন স্বরে আদেশ করলো,
“সত্যিটা স্বীকার না করা অব্দি শরীরে ব্লেড চালিয়ে লবন লাগানোর কার্যক্রম জাড়ি রাখবে।”
নির্দয় জালিম পুরুষ মায়াদয়া দেখালো না আর,কঠোর নির্দেশ দিয়েই বেড়োতে চাইলো মহল ছেড়ে।সৈন্যদের হুকুম তালিম করলো জোড় গলায়,
“মহলের আশেপাশে যতগুলো গ্রাম আছে সবগুলো গ্রামে তল্লাশি চালাও।দরকার পড়লে প্রত্যেকের ঘরে ঢুকে ওই মেয়েকে খুজবে। যে করেই হোক মেয়েটাকে আমার চাই।”
প্রিন্স জোসেফ চলে যাওয়ার জন্য উদ্যোত হতেই বাধ সাধলো জুবাইদা, ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বললো,
“আমার কি দোষ প্রিন্স?”
প্রিন্স জোসেফ ঘুরে তাকালো না, ভরাট কন্ঠে উত্তর দিলো,
“তোমার কোন দোষ নেই জুবাইদা।”
জুবাইদা গুমরে কেঁদে উঠলো,চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো ফোটা ফোটা জল,জড়ানো কন্ঠে বললো,
“আমাদের যে বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো?”
প্রিন্স জোসেফ এবারে প্রতিত্তোর করলো কঠিন স্বরে,
“সেটা তোমার পিতা আর লর্ডের সাথে বুঝে নেও।কারণ তোমাকে বিয়ে করার মতো কোন কথা আমি দেই নি।”
প্রিন্স জোসেফ আর কথা বাড়ালো না,বিয়ের আসরে জুবাইদাকে ফেলে রেখেই সম্মুখে পা বাড়ালো ফ্লোরেন্সাকে খুঁজে বের করার জন্য।তবে দু পা এগোতেই পুনরায় পেছন ডাকলো লর্ড মাউন্ট,
“দাড়াও প্রিন্স! কোথায় যাচ্ছো তুমি?বিয়ে সম্পন্ন করে যেখানে ইচ্ছে যাও।”
প্রিন্স জোসেফ দাড়ালো না,প্রচন্ড আক্রোশে ছুড়ে ফেললো মাথায় পড়ে থাকা বিয়ের টুপি,তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“ক্ষমা করবেন লর্ড। প্রিন্স জোসেফ কারো হুকুমে আজ পর্যন্ত কোন কাজ করে নি, তাই বিয়েটাও করতে পারলো না।তারচেয়ে বরং আপনিই বিয়েটা করে নিন,এমনিতেই একাধিক বিয়ে করার অভ্যাস আছে আপনার।”
**
মহলের এক কোনায় দাঁড়িয়ে পুরো বিষয় টা পর্যবেক্ষন করলো আইরিশ।সে এসেছিলো ফ্লোরেন্সাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।কত কাঠখোট্টা পুহিয়ে বাইরে থেকে বিয়ের রান্নার জন্য নিয়ে আসা বাবুর্চিদের সাথে ছদ্মবেশে মহলে প্রবেশ করেছে সে।অথচ ফ্লোরেন্সার সাথে দেখা করা হলো না, বোকা মেয়েটা পালিয়েছে,কোথায় পালিয়েছে মেয়েটা?কতদূর পালিয়েছে?আদৌও কি বেড়োতে পেরেছে এই মহল থেকে?নাকি পালানোর জন্য ঘাপটি মেরে বসে আছে মহলের কোন কোনে?
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই তার নজর আটকালো নাবহার দিকে,মেয়েটাকে কয়েকজন সৈন্য টেনে নিয়ে যাচ্ছে টর্চার সেলের দিকে।আচ্ছা!এতো এতো দাসী থাকতে এই মেয়েটাকেই কেন জিজ্ঞেস করা হলো ফ্লোরেন্সার কথা?তার মানে কি মেয়েটার সাথে ফ্লোরেন্সার কোন সখ্যতা ছিলো? মেয়েটা কি সত্যিই ফ্লোরেন্সার ব্যাপারে কিছু জানে।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই পা টিপে টিপে আরো কয়েক কদম এগোলো আইরিশ।সবার ব্যাস্ততার সুযোগ লুপে নিয়ে খুব সাবধানে পিছু নিলো সৈন্যদের, উদ্দেশ্য যে করেই হোক ওই মেয়েটার কাছে পৌছেতে হবে, জানতে হবে ফ্লোরেন্সার কথা।
_____________
অন্ধকার ঘর।শো শো নিস্তব্ধতা ছাড়াও আরো একটি শব্দ কানে আসছে। কেউ গোঙাচ্ছে!হ্যাঁ, একটু মনযোগ দিয়ে শুনলেই স্পষ্ট শোনা যাবে কারো গোঙানীর শব্দ।
অন্ধকার ঘর আলোকিত হলো খুব দ্রুত।কয়েক সেকেন্ডের ব্যাবধানে কেউ একজন মশাল জ্বালালো, আগুনের ফুলকিতে স্পষ্ট হলো দুটো আতংক গ্রস্ত ভীতু চোখ।
মেয়েটার দুধ সাদা ফর্সা ত্বক আগুনের আলোতে হলদেটে দেখাচ্ছে, টানা টানা হরিনি চোখে জমে থাকা অস্বচ্ছ জলে প্রতিফলিত হচ্ছে মশালের আগুনের লেলিহান শিখা।
ভয়ে আতংকে জর্জরিত কোমল মুখ জুড়ে অসহায়ত্ব। মুখে বাধা কাপড়ের ফাঁক গলে তখনো বের হচ্ছে অস্পষ্ট গোঙানী।অথচ মেয়েটির গোঙানীর শব্দে টনক নড়লো না সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষ অবয়বটির।সে কেবল হাসলো,অদ্ভুত সম্মোহিত কন্ঠে বললো,
“ভয় পেয়ো না রুপের রানী ফ্লোরেন্সা।তোমাকে স্পর্শ করে একটুও অপবিত্র করবো না আমি।তোমাকে আমি দেখবো, প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ যখন ইচ্ছে তখন দেখতে চলে আসবো আমি।তোমাকে দেখে তৃষ্ণা মেটাবো চোখের।তুমি আমার চোখের মনিকোঠায় আয়নার মতো বন্দী হয়ে থাকবে আজীবন।”
__________
নিস্পাকে খাবার খেতে দেওয়া হয়েছে কিছুক্ষণ হলো। খাবার শেষ হলেই তার সাথে দেখা করতে আসবে মালেকার স্বামি।নিস্পা খেতে খেতে নিজের লক্ষ্য স্থির করে নিচ্ছিলো। তার প্রথম লক্ষ হলো ত্রিজয়কে খুঁজে বের করা।কিন্তু এজন্মে ত্রিজয়ের নাম কি সেটা তো জানে না সে, তাহলে কি করে খুঁজে বের করবে লোকটাকে?তবে তার ব্যাকুল প্রান যে সেই লোকটাকে একটা নজর দেখার জন্য ছটপট করছে।
ত্রিজয়ের কথা ভাবতে ভাবতেই খাবার শেষ করলো নিস্পা।পানি খাওয়ার জন্য হাতে তুলে নিলো একটা স্টিলের গ্লাস।তারপর ঢকঢক করে খেয়ে নিলো পানিটুকু।পরপরই মনে পড়লো ত্রিজয়ের বলা কথাটা।ত্রিজয় বলেছিলো তার নেত্রমনি নীল,তার মানে এজন্মেও নীল চোখের পুরুষ থাকবে, আর এই নীল চোখের পুরুষকেই খুঁজে বের করতে হবে তাকে।
আইডিয়াটা মাথায় আসতেই দুই ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে উঠলো নিস্পা।ঠিক তক্ষুনি ভেসে এলো এক পুরুষালী কন্ঠস্বর,
“মাশাল্লাহ,কি সুন্দর হাসি।”
নিস্পা চুপসে নিলো ঠোঁট, নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে তাকালো সামনের দিকে। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে একজন সুদর্শন পুরুষ।পাঞ্জাবি আর লুঙ্গিতে বেশ পরিপাটি লাগছে লোকটাকে।নিস্পাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে লোকটা কণ্ঠনালীর মিলন ঘটালো ফের,অনুমতি চেয়ে বললো,
“ভেতরে আসবো?”
লোকটার এইটুকু ব্যবহার বেশ পছন্দ হলো নিস্পার।বসে থাকা থেকে উঠে দাড়ালো সম্মানার্থে।চিকন কন্ঠে বললো,
“অবশ্যই, আসুন না।”
লোকটা ভেতরে এলো,তার পেছন পেছন এলো সত্য।সত্যের কাঁধে তখনও কি সুন্দর করে বসে আছে বীনা পাখি।নিস্পা কোন কিছুর দিকে তাকালো না, এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলো সত্য আর বীনা পাখির দিকে।
লোকটা নিস্পার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালো পাখিটির দিকে, তারপর মোলায়েম কন্ঠে বললো,
“পাখিটা পছন্দ হয়েছে তোমার?”
নিস্পা ঠোঁট টিপে স্মিথ হাসলো,উত্তরে বললো,
“পাখিটি খুব সুন্দর।”
“আচ্ছা তোমাকে একটা এনে দেওয়ার ব্যাবস্থা করবো।”
লোকটার কথায় অসম্মতি জানালো নিস্পা,বললো,
“তার দরকার পড়বে না।আমি আজকেই এখান থেকে চলে যাওয়ার সীদ্ধান্ত নিয়েছি।”
নিস্পার কথা শুনে আঁধার নামলো লোকটার মুখ জুড়ে, তবে বেশ একটা পরিলক্ষিত হলো না,খুব স্বাভাবিক ভাবেই বললো,
“সে না হয় যাবে।কিন্তু তোমার নাম ঠিকানা কিছুই তো জানা হলো না।”
নিস্পা তপ্ত শ্বাস ছাড়লো।মলিন স্বরে বললো,
“আপনি বিশ্বাস করবেন?”
“কেন?তোমার কি মনে হচ্ছে আমি তোমাকে ঘাতক ভাবছি?”
নিস্পা ঠোঁট টিপে হাসার চেষ্টা করে বললো,
“আসলে আমি তা বলতে চাইছি না,আমার পরিচয় শুনলে হয়তো আপনি বিশ্বাস করবেন না।”
“কি পরিচয় শুনি?কোন মহলের প্রিন্সেস তুমি?যদিও প্রিন্সেস হলেই বিশ্বাসযোগ্য হবে আমার, তুমি প্রিন্সেস থেকে কম কিছু নও।”
নিস্পা কিঞ্চিৎ লজ্জা পেলো, চিবুক নামিয়ে বললো,
“আমি আপনাদের সময়ের মানুষ নই,আমি ভবিষ্যৎ থেকে এসেছি।কোন প্রিন্সেসও নই আমি,ভবিষ্যতের একজন অতিসাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে আমি।”
লোকটা স্থির চিত্তে তাকিয়ে রইলো নিস্পার দিকে, অভিব্যক্তি দেখে বোঝা গেলো নিস্পার কথার কোন কিছুই বিশ্বাস করে নি সে।উল্টো মুচকি হেসে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“তোমার নাম কি মেয়ে?”
নিস্পা উত্তরে বললো,
“নিস্পাপ শিকদার।”
“বাহ!খুব সুন্দর নাম তো তোমার। তুমি কি জানো নামের মতোই তোমার মুখটাও কতো নিস্পাপ।”
“জানার প্রয়োজন মনে করি নি কখনো।”
“তবে নামের সাথে তোমার কথাবার্তায় বেশ অমিল,কি দারুণ মজা করতে পারো তুমি।”
“আমি মোটেও মজা করছি না বিশ্বাস করুন,আমি সত্যিই ভবিষ্যৎ থেকে এসেছি।2025 সাল থেকে এসেছি আমি।”
“তুমি নিশ্চয়ই বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছো তাই না?এজন্যই আত্মগোপন করতে চাইছো।”
নিস্পা ক্ষানিক বিরক্ত হলো, কপাল কুচকে বললো,
“মোটেও না।আমি মোটেও পালিয়ে আসি নি।আমি যা বলছি তাই সত্যি।”
লোকটা এবারেও বিশ্বাস করলো না নিস্পার কথা,নরম কন্ঠে বললো,
“সমস্যা নেই মেয়ে। নিজের পরিচয় বলার প্রয়োজন নেই তোমার।আমি বরং তোমার একটা সুন্দর নাম দেই কি বলো?আত্মগোপনে আরেকটু সুবিধা হবে। ”
নিস্পা নিজের কথাকে সত্য প্রমাণ করতে আবার বলতে চাইলো,
“আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন,বিশ্বাস করুন আমি,,,”
“রুপাঞ্জেল।তোমার নাম আজ থেকে রুপাঞ্জেল।তুমি রুপকথার মতো সুন্দর।তুমি না হয় এই নামেই আত্মগোপন করে থেকো যতদিন ইচ্ছে, আমি মোটেও যানতে চাইবো না তোর আসল পরিচয়।”
রুপাঞ্জেল?লোকটার সন্মোধনে থমকালো নিস্পা,থেমে থেমে স্পন্দিত হলো হৃৎপিন্ড।নিগূঢ় দৃষ্টিতে তাকালো লোকটার দিকে, কানে বাজলো ডক্টর কিয়ানের বলা সেই কথা,
“রুপাঞ্জেল তুমি আমার, তোমার জন্য খুনি হয়েছি আমি।”
নিস্পার বুক ধড়পড় করে উঠলো,মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে গেলো বরফের মতো শীতল স্রোত,শুখিয়ে এলো জ্বিভের আগা,অস্পষ্ট জিজ্ঞেস করলো,
“কে আপনি? কি নাম আপনার?”
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা সম্মোহিত হাসলো, ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
“হানিফ।আব্দুল হানিফ মোল্লা আমি।”
নামটা শোনা মাত্রই কলিজা শুকিয়ে এলো নিস্পার,মনে পড়ে গেলো ডক্টর কিয়ানের বলা ভয়ংকর কথাগুলো,
“আমি হানিফ,আব্দুল হানিফ।যে তোমাকে পাওয়ার লোভে খুনি হয়েছে, নিজের আপন মানুষ গুলোর গলা কেটেছে নির্দিধায়।”
চলবে,,,,,,

