#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্বঃ44
ধরনী তখনও বৃষ্টির ছন্দে কাঁপছে।প্রচণ্ড বর্ষণে একের পর এক ভারি ফোঁটা আছড়ে পড়ছে পৃথিবীর বুকে।প্রতিটি ফোঁটার আঘাতে মাথায় সূঁচ ফোটার মতো ব্যথা অনুভূত হচ্ছে।মাটির কাঁচা রাস্তা রূপ নিয়েছে পিচ্ছিল সাপের ন্যায়।
বটতলার দিকে এগোতে এগোতে কথায় মশগুল হয়েছে সুফি আর আশিক।
“মনে আছে কয়েকদিন আগে বট গাছের ডালে মাথা কাটা ঝুলন্ত লাশ পাওয়া গিয়েছিল?”
আশিকের প্রশ্ন শুনে ধ্বক করে উঠলো সুফির বুক,চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেদিনের সে বিভীষিকাময় দৃশ্য,কন্ঠ খাদে নামিয়ে উত্তর দিলো ভয়ে ভয়ে,
“এমন ভয়ংকর দৃশ্যকি ভুলে যাওয়া যায় বলুন?”
আশিকের দৃষ্টি গভীর, সে ভণিতা না করে জিজ্ঞেস করলো,
“আইরিশকে ভালোবাসিছ তাই না?”
সুফি থমকে দাঁড়ালো,গ্রিবা ঘুরিয়ে তাকালো আশিকের দিকে,তারপর রিনরিনিয়ে বললো,
“আপনার প্রশ্নগুলো একটি আরেকটির সাথে মিল নেই।কেমন অদ্ভুত।”
আশিক ঠোঁট এলিয়ে হেসে দিলো,ডান হাত তুলে মুছে নিলো থুতনিতে জমে থাকা বৃষ্টির পানি,রহস্যময় কন্ঠে বললো,
“যদি কখনো যানতে পারিস ওই খুন গুলোর পেছনে আইরশের হাত আছে?তখনও কি একই রকম ভালোবাসবি?”
আশিকের এবারকার প্রশ্নে পাথরের মতো ভারি হয়ে গেলো সুফির পা,শক্ত বরফের ন্যায় জমে গেলো তার সমস্ত শরীর,ভয়াতুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালো ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছটার দিকে,আতংকিত কন্ঠে বললো,
“আপনি মিথ্যা বলছেন আশিক ভাই।আমি বিশ্বাস করি এমন কোন পরিস্থিতি কখনোই আসবে না,যদি ভুল করে কখনো এসে যায় তবে পুরো পৃথিবীর মানুষের বিরুদ্ধে গিয়ে আমি আইরিশ ভাইকে বিশ্বাস করবো,জোর গলায় বলবো আইরিশ ভাই এমন কাজ করে নি, কখনো করতেও পারে না।”
আশিক উচ্চস্বরে হেসে ফেললো এবার,হাসতে হাসতে বললো,
“শান্ত হ, শান্ত হ।ভয় পাস না। আমি এমনি মজা করছিলাম।”
সুফির চোখ থেকে তখন বৃষ্টির মতো অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে,দু হাতের তালু দিয়ে কোন রকম পানি টুকু মুছে ঠোঁট উল্টে ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বলে,
“দোহাই আপনার আশিক ভাই,আইরিশ ভাইকে নিয়ে এমন কুৎসিত মজা আর কখনো করবেন না।”
আশিক হাসি থামিয়ে দিয়ে তাকালো সুফির দিকে,তারপর স্নেহের হাত রাখলো সুফির মাথায়,শান্ত কন্ঠে বললো,
“তোর জন্য আমার ভিষণ আক্ষেপ হয় সুফি।”
সুফি চোখ উল্টে তাকালো আশিকের দিকে,বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“আক্ষেপ কেন?”
“এইযে তুই আইরিশকে এতো বেশি ভালোবাসিস অথচ আইরিশ সেই ভালোবাসা টুকু বোঝার চেষ্টা অব্দি করে না।”
“বোঝার জন্য তো একটা স্বচ্ছ মনের প্রয়োজন হয় ভাইয়া, আইরিশ ভাই তো সেই মনটা ফ্লোরেন্সার নামে লিখে দিয়েছে।”
“তোর কষ্ট হয় না সুফি?”
“প্রথম যেদিন জানতে পেরেছিলাম আইরিশ ভাই ফ্লোরেন্সাকে ভালোবাসে সেদিন একটু কষ্ট পেয়েছিলাম,কিন্তু এখন আর কষ্ট হয় না,আমি চাই আইরিশ ভাই তার ভালোবাসাকে পেয়ে সুখে থাক।”
“নিঃস্বার্থ প্রেমিকা হতে চাস তাই না?”
“উহু এক স্বার্থপর পুরুষকে ভালোবেসে সর্বশান্ত হতে চাই।”
“যে স্বার্থপর প্রেমিক তোকে ভালোবাসতে পারেনি তার ভালোবাসা আদায় করার জন্য স্বার্থপর হওয়া উচিত সুফি।”
আশিকের কথায় মুচকি হেসে দিলো সুফি,অনুরাগী কন্ঠে বললো,
“আমি জানি উনি ভালোবাসে না আমায়,যে ভালোবাসে না তার ভালোবাসা আদায় করে নিতে চাই না আমি।আমি চাই উনার অবহেলাতেই ফুরিয়ে যাক আমার জীবন।”
কথা বলতে বলতে আশিক আর সুফি এসে দাঁড়িয়েছে সেই অভিশপ্ত বটতলায়,জায়গাটা নির্জন, একেবারেই নিস্তব্ধ,বৃষ্টির একটানা ঝমঝম শব্দ ছাড়া তেমন কোন শব্দই শোনা যাচ্ছে না আপাতত।বটগাছটি বৃষ্টির পানিতে স্নান করে ধারণ করেছে আরো ভয়ংকর রুপ।মনে হচ্ছে শতবর্ষের ক্লান্তি বয়ে বেড়ানো দৈত্য দাঁড়িয়ে আছে তাদের মাথার উপর।
তখন বাজ পড়ার কারণে তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি গাছটার,ঝোপঝাড়ে আবৃত গাছটার মাথার দিকেই কয়েকটা ডাল পুড়েছে বোধহয়,তবে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে তাকালে ঘন বড় পাতার ফাঁকে সেই পুড়ে যাওয়া অংশটুকু দেখা যায় না।
প্রায় অনেকক্ষণ ধরে লাগাতার বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে শরীরটা ঠান্ডায় জমে এসেছে সুফির। হিম হাওয়া আর ভেজা কাপড়ের সংস্পর্শে শিহরণ খেলে যাচ্ছে তার নাজুক শরীর জুড়ে । ঠান্ডার দাপটে ঠোঁট দুটো কাঁপছে থরথর করে।ভেজা ওড়নাটাকে কোনোরকমে গায়ে জড়িয়ে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে , নিঃশব্দে গিয়ে বসলো বটগাছের মোটা, কুণ্ডলী পাকানো শেকরের উপর।
বটগাছের পাশেই তো ছিলো সে মাজার টা, যেখানে হুজুর আব্দুল খালেক এবং তার মেয়ের কবর দেওয়া হয়েছিলো।আচ্ছা সেই কবরটা কোন পাশে? সুফির খুব করে ইচ্ছে হলো ওই ভালো মানুষ গুলোর কবরটা একটু ছুয়ে দেখতে,একটা আদুরে চুমু খেতে সেই কবরের ভেজা মাটির গায়ে।
সুফি এদিক ওদিক খুঁজলো,তবে কোনপাশেই কবরের চিহ্ন অব্দি নেই।চারপাশে কেবল অযত্নে বেড়ে উঠা আগাছার বিস্তৃতি।
“এখানে তো শুনেছি হুজুর আর তার কন্যাকে কবর দেওয়া হয়েছিলো, কবরটা কোন পাশে আশিক ভাই?”
প্রশ্নটা আশিকের উদ্দেশ্যে ছুড়ে দিয়ে চোখ তুলে সামনের দিকে তাকালো সুফি,সামনের দিকে তাকাতেই চক্ষু বিস্ফোরিত,যেই জায়গাটায় আশিক মাত্রই দাঁড়িয়ে ছিলো সেই জায়গা টা খালি,কেউ নেই,আশিকের চিহ্ন অব্দি নেই।সুফু চোখ কুচকে দপ করেই উঠে দাড়ালো, এদিক ওদিক তাকিয়ে খুজলো পুনরায়, নাহ!আশিকের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া গেলো না।আশিককে দেখতে না পেয়ে অজানা ভয় খামচে ধরলো সুফির বক্ষ,সুফি গলা ছেড়ে ডাকলো,
“আশিক ভাই?আশিক ভাই?কোথায় আপনি?”
কোন সাড়াশব্দ এলোনা।সুফির পুরো শরীর কেপে উঠলো,ভয়াতুর কন্ঠে ডাকলো,
“আশিক ভাই?আশিক ভাই?দয়া করে মজা করবেন না।আমার খুব ভয় লাগছে আশিক ভাই।”
সুফির ডাকে এবারে প্রত্যুত্তর করলো আশিক।উচ্চস্বরে হাসতে হাসতে বেড়িয়ে এলো বটগাছের আড়াল থেকে।সুফির চুপসানো মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললো,
“তুই এতো ভীতু কেন রে সুফি?তোকে ভয় দেখিয়ে খুব মজা পেলাম।”
সুফি ঠোঁট কামড়ে প্যাচপ্যাচ করে কেঁদে উঠলো,অভিমানি কন্ঠে বললো,
“আপনি খুব খারাপ আশিক ভাই।আমি আর এক মূহুর্ত এখানে থাকবো না, যাচ্ছি আমি।”
কথাটা বলেই যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো সুফি,আশিক বক্র হেসে পেছন থেকে ধরে ফেললো সুফির চুলের বিনুনি, তারপর অদ্ভুত ভয়ংকর কন্ঠে বললো,
“আরে দাঁড়া, এতো তাড়া কীসের?ভীতু মেয়েকে হত্যা করতেও বেশ মজা পাবো মনে হচ্ছে।”
আইরিশের ভয়াবহ বাক্যে হিম হয়ে এলো সুফির রক্ত।অদৃশ্য শীতল তরঙ্গে আচ্ছন্ন ঠোঁট দুটো তীব্র গতীতে কেঁপে উঠলো, আতংকে বড়বড় হয়ে গেলো চোখ।শুখনো ঢোক গিলে আওড়াল,
“আশিক ভাই আপনি!”
আর কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেলো না মেয়েটা,গুমরে কেঁদে উঠলো ঠোঁট ভেঙে,দুই হাত জোর করে মিনতি করলো,
“দয়া করে আমাকে যেতে দিন আশিক ভাই।আমি তো আপনার কখনো কোন ক্ষতি করি নি।আমার সাথেই কেন,,,,
এবারেও পুরো বাক্য সম্পূর্ণ করার আগে কেঁদে উঠলো সুফি।অথচ আশিকের মনে দয়ামায়া উদয় হলো না এক বিন্দু,বরং আরেকটু জোড়ালো ভাবে চেপে ধরলো সুফির বেনুনি টা, তারপর সুফিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকালো সুফিরে ভীত চোখের দিকে।ক্রুর স্বরে আওড়াল,
“তুই সেদিন নিজের স্বার্থে ফ্লোরেন্সার ঘরের দরজা খুলে দিয়েছিলি সুফি।তুই ভেবেছিলি ফ্লোরেন্সা ব্রিটিশ পুত্রের হাত ধরে চলে গেলে তোর পথ পরিস্কার হয়ে যাবে,আইরিশকে পাওয়ার পথে আর কোন বাধা থাকবে না।”
কান্নার তোপে হেচকি উঠে গিয়েছে সুফির,দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ভেঙে ভেঙে বললো,
“আপনি এসব কি বলছেন ভাইয়া?আমি কেন নিজ স্বার্থে ফ্লোরেন্সাকে ব্যাবহার করবো?আমি তো ফ্লোরেন্সাকে সাহায্য করেছি,তার ভালোবাসাকে বাঁচাতে চেয়েছি।”
“কেন চাইলি বাঁচাতে?আমার তো মস্ত বড় ক্ষতি করে দিলি,ফ্লোরেন্সাকে পাওয়ার প্রতিযোগিতায় স্বয়ং ব্রিটিশ পুত্রকে আমার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিস প্রতিদ্বন্দ্বী রুপে,সেদিন যদি ওই ব্রিটিশ কে মেরে ফেলা হতো তাহলে তো আমার এতো কষ্ট করতেই হতো না।”
বিস্ময়ে সুফির নিঃশ্বাস আটকে এলো,শ্বাসরুদ্ধকর কন্ঠে বললো,
“আপনি ফ্লোরেন্সাকে পেতে চেয়েছিলেন?আপনিও ওকে ভালোবাসতেন?”
আশিক সুফির চুলের মুঠি চেপে ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলো বটগাছের কাছে,তারপর শক্ত গাছের সাথে সুফির মাথাটা স্ব জোরে পিষে ধরে বললো,
“আমি এখনো ফ্লোরেন্সাকে ভালোবাসি সুফি। আর আমি এটাও যানি তুই ফ্লোরেন্সার আপন বোন।”
সুফির চোখ বড়বড় হয়ে গেলো ফের।যন্ত্রণা আর বিস্ময়ের মিলিত ছাপ নীল করে দিলো সম্পূর্ণ মুখ,মাথা ফেটে বের হতে শুরু করলো তাজা রক্ত।এক হাতে কপাল চেপে ধরে কোনরকমে জিজ্ঞেস করলো,
“ফ্লোরেন্সা আমার আপন বোন আপনি কি করে জানলেন?এই কথা তো আমি কাউকে জানতে দেই নি।”
আশিকের চোখে মুখে হিংস্রতা,সে সুফির গলা টিপে ধরে বললো,
“তুই ফ্লোরেন্সাকে হিংসা করিস সুফি,আমার ফ্লোরেন্সাকে হিংসা করিস তুই?”
আশিকের শক্ত থাবার যাতাকলে ফুরিয়ে এলো সুফির প্রান,সে মুখ হা করে শ্বাস টেনে বললো,
“আপনি ভুল বুঝছেন আশিক ভাই।আমি ফ্লোরেন্সাকে ভালোবাসি।ও আমার বোন,ওকে কেন আমি হিংসে করবো।”
“বিশ্বাস করুন আমাকে বিশ্বাস করুন।”
আশিকের কোনরকমেই ভাবান্তর হলো না।সুফির প্রতি কোন কারণ ছাড়াই রেগে আছে সে,যে রাগ সুফিকে হত্যা করা ছাড়া কমবে না। কিছুতেই কমবে না।
সুফি হাঁপাচ্ছে,নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টায় ছিড়ে আসছে কন্ঠনালী।জীবন বাঁচানোর তাড়নায় নিস্ক্রিয় লাগছে মস্তিষ্ক।নিঃশ্বাস ক্রমশ বন্ধ হয়ে আসার দরুন চোখের কোটর হয়েছে রক্তাক্ত।ভারি পল্লব আর বুজে রাখা সম্ভব হলো না,ঠিক সে মূহুর্তে ঘটে গেলো এক হাড়হীম করা দৃশ্য,আশিকের ধরে রাখা হাতটা তখনও সুফির গলায়,অথচ তার মাথাটা?তার মাথাটা সঠিক স্থানে নেই।শরীর টা দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই তবে ঘাড় থেকে মাথাটা আলাদা হয়ে ছিটকে পড়েছে অদূরে।
_____________
আছরের শেষ প্রহর। পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়া সূর্য আজ নেই।সারাদিনের ঝড়বৃষ্টি শেষে প্রকৃতি নিজের ক্লান্ত গা ধুয়ে শান্ত হয়েছে।বুড়িগঙ্গা নদীর বুকে আজ অব্যক্ত প্রশান্তি, নাড়িভোঁজানো এক নিস্তব্ধতা।ভিজে পলিমাটির গন্ধ ছড়িয়ে আছে বাতাসে।
মাটির কাঁচা রাস্তা কর্দমাক্ত,পিচ্চিল।আব্দুল হানিফ সে পথ ধরেই এগোচ্ছে সামনের দিকে।নিস্পাকে খুঁজে বেড় করার তাড়নায় গত তিন রাত ঘুম হয় নি তার।অবশেষে নিস্পার কোন খোঁজ না পেয়ে নিজেই বেড়িয়েছে।সন্দেহ হচ্ছে মেয়েটাকে ব্রিটিশ পুত্র ধরে ফেলেনি তো?ব্রিটিশ পুত্র তো এই তল্লাটের আনাচ কানাচ হন্যে হয়ে খুজছিলো মেয়েটাকে,হটাৎ করে সেসব বন্ধ হয়ে গেলো কেন?নিশ্চয়ই কাঙ্খিত জিনিস খুঁজে পেয়েই দমে গিয়েছে।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আরও কয়েকপা এগোলো হানিফ।তার পা কাঁদায় মাখামাখি।পা জোড়া ধোঁয়ার প্রয়োজন বোধ হতেই দ্রুত এগিয়ে গেলো বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ের দিকে।নদীর পাড়ে নামতেই বাধলো বিপত্তি,একটা ধাতব বস্তুর চৌকল অংশ গেঁথে গেলো হানিফের জুতোর চামড়ায়।হানিফের চোখ কুচকে এলো,সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালো বস্তুটির দিকে,একহাতে জুতোটা তুলে ধরে আরেকহাতে টেনে বেড় করলো একটা ধাতব তীর।যার গায়ে ছোট ছোট ইংরেজি অক্ষরে লেখা আছে কিছু একটা।সেসবে বিশেষ মনযোগ দিলো না হানিফ,তার দৃষ্টির সমস্ত তীক্ষ্ণতা আপাতত তীরের গায়ে লেগে থাকা এক টুকরো ভেজা কাপড়ের উপর।
এই কাপড় টা চেনা তার,সেদিন নিস্পা পালানোর সময় ঠিক এরকমই একটা ফ্রক পড়েছিলো,এটা যে সেই কাপড়ের অংশবিশেষ এ বিষয়ে পুরোপুরি শিউর হানিফ।আর এই তীর টা যে স্বয়ং ব্রিটিশ প্রিন্সের সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই বলে মনে হচ্ছে না।দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে বেশ একটা কষ্ট করতে হলো না হানিফকে,এখানে ঘটিয়মান ঘটনা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আঁচ করতে পেরেই ঠোঁটের নিচে খেলে গেলো ক্রুর হাসি,বিরবির করে আওড়াল,
“আমি আসছি রুপাঞ্জেল।আমার রুপকথিকা।”
________
ম্যান্ডেট মহলের অতিথিশালায় বৈঠকে বসেছে জোসেফ আর হানিফ।হানিফের অযাচিত আগমনে কিঞ্চিত বিরক্ত জোসেফ,চোখে মুখে সে ছাপ স্পষ্ট হলেও,কন্ঠে নমনীয়তা ধরে রেখে স্বাভাবিক স্বরে বললো,
“অসময়ে ম্যান্ডেট মহলে আপনাকে একদমই আশা করি নি আমি।”
জোসেফের ভরাট কন্ঠের বিপরীতে সৌজন্য হাসলো হানিফ,উত্তরে বললো,
“খোঁজ নিতে এলাম,সেদিন যাকে হন্যে হয়ে খুঁজেছিলেন পেয়েছিলেন তাকে?”
“প্রিন্স জোসেফ খুঁজলে অমৃত পেয়ে যায় সে তো সামান্য মানব কন্যা।”
“তার মানে পেয়েছিলেন?”
হানিফের প্রশ্নে সন্দেহ প্রকাশ করলো জোসেফ,তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললো,
“এই ব্যাপারে আপনার এতো বেশি কৌতুহল বেমানান।”
“শুনেছি যাকে খুঁজছিলেন সে নাকি এই মহলের দাসী। সামান্য একজন দাসী কে খুঁজে বের করার জন্য নিজের বিয়ে ভেঙে দেওয়াটাও তো বেমানান।”
প্রিন্স জোসেফের সৌষ্ঠাব্য চোয়াল শক্ত হয়ে এলো ধিরে ধিরে, চাপা স্বরে বললো,
“এ বিষয়ে কথা এগিয়ে নিতে অনিচ্ছুক আমি।”
হানিফের কন্ঠে চতুরতা,সে বিলম্ব না করে বললো,
“কিন্তু আমার কেন যানি মনে হচ্ছে আপনি এড়িয়ে যেতে চাইছেন।”
“কথা এড়িয়ে যাওয়া সত্ত্বেও জেনে-বুঝে ঘুরেফিরে জিজ্ঞেস করাকে কি বলে যানেন?নির্লজ্জ বেহায়াপনা।”
প্রিন্স জোসেফ কাঠকাঠ কন্ঠে ছুড়ে দিলো তার পরবর্তী বাক্যে কিছুটা অপমানিত বোধ করলো হানিফ,তবে ঠোঁটে হাসির ফোরাক ধরে রেখেই উত্তর দিলো,
“সে আমাকে যা ইচ্ছে তাই বলুন না কেন প্রিন্স।আমার কিন্তু মনে হচ্ছে ওই দাসীর পরিচয় কেবল দাসীতেই সীমাবদ্ধ নয়।”
“চিন্তা করবেন না জনাব।খুব শীঘ্রই শুনতে পাবেন সেই সীমাবদ্ধতা কতদূর লঙ্ঘন হয়েছে।এখন আপনি আসতে পারেন।”
হানিফ কূটবুদ্ধি আঁটে,এই মহলে থেকে যাওয়ার প্রয়াসে বলে,
“আপনার কাছে এই ব্যাবহার আশা করি নি প্রিন্স,রাত বেড়েছে দেখতেই পাচ্ছেন,এতো রাতে ব্রিটিশ মহল থেকে অতিথিকে চলে যেতে বলছেন?আমার বাড়িতে আতিথিয়তা গ্রহণ করেন নি ভালো কথা,কিন্তু আমি তো বলি নি আমি আপনার আতিথেয়তা গ্রহণ করবো না।আপনি যদি চান আজকে রাতটা আমি এখানেই থেকে যাই।”
জোসেফ তার বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাক করলো হানিফের দিকে,কঠোর কন্ঠে বললো,
“মানুষের চোখের দিকে তাকিয়েই তার উদ্দেশ্য বুঝে ফেলার ক্ষমতা আছে আমার,আপনি থেকে যান, আমি আপনাকে বুঝিয়ে দিবো প্রিন্স জোসেফের মহলে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে ঢুকলে হাসিল করা সম্ভব হয় না।”
হানিফ একগাল হাসলো,ছলচাতুরী না করে সোজাসাপ্টা উত্তর দিলো,
“মানুষের প্রত্যেকটি কাজের পেছনেই উদ্দেশ্য থাকে প্রিন্স,আমার উদ্দেশ্যটাও ধরে নিন সেরকম,এসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে আপনার চিন্তা না করলেও চলবে।”
__________
আঁধারে ডুবে থাকা মৃত্যুপুরীতে বাতাস জমে গিয়েছে, নিঃশ্বাস নিতে গেলেই মনে হয় গলা চেপে আসছে।মেঝেতে পড়ে আছে ফ্লোরেন্সা। হাত পা মোটা দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাধা। দড়ির ঘষা ঘষিতে রক্ত জমে গেছে কোমল হাতের চামড়ায়।তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ, জিভ ঠোঁটে বোলাতে গেলেই কাঁটার মতো চিরে যাচ্ছে।রক্তজবার ন্যায় ঠোঁট ফেটে রক্ত জমে গেছে। তামাশা শুরু করেছে রোধ হয়ে আসা কন্ঠ।
কি নিদারুণ অসাহয়ত্ব বুকে চেপে গোঙাচ্ছে ফ্লোরেন্সা,অস্ফুটে আওড়াচ্ছে,
“পানি, একটু পানি৷ দেও আমায়।মরে যাচ্ছি, পিপাসায় গলাটা ফেটে যাচ্ছে।”
“আমার খিদে পেয়েছে, আশিকভাই,হাতের বাধন টা খুলে দিন না।আমি পালাবো না,কথা দিচ্ছি, পালাবো না আমি।”
নিঃশ্বব্দ ঘরে ঠোঁট কামড়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো ফ্লোরেন্সা,একটু খাবার আর পানির তাড়নায় সুস্ক কণ্ঠনালী ভেদিয়ে ফের ডাকার চেষ্টা চালালো,
“ও আশিক ভাই।দোহাই আপনার।আমাকে দুটো খেতে দিন।মরে যাচ্ছি,মরে যাচ্ছি আমি।”
অন্ধকার ঘরের চারদেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো ফ্লোরেন্সার মুমূর্ষু কন্ঠের আকুতি মিনতি।অথচ কোন প্রত্যুত্তর এলো না,অভাগী মেয়ে জানতেই পারলো না,পৃথিবীর কোন এক অভিশপ্ত স্থানে চিরকালের মতো নিভে গিয়েছে তার বেঁচে থাকার শেষ আশা টুকুও।
___________
জুবাইদার পড়নে হাঁটু অব্দি এক টকটকে লাল ফ্রক।দুষ্প্রাপ্য গোলাপ রুপে নিজেকে উপস্থাপন করার জন্য চেষ্টার কোন কমতি নেই।ফ্রকের নিটোল কাটিংয়ে তার দেহের প্রতিটি বাঁক সুস্পষ্ট। ভালবাসা আর বিদ্রোহে রাঙানো ঠোঁট দুটো গাঢ় লাল।বড় বড় কাজল আঁকা চোখদুটো লাস্যময়ী।চুল গুলো কাধ পর্যন্ত ছড়ানো।এমনিতেও বাঙালি কন্যা হলেও আজকের বেশভূষায় তাকে ব্রিটিশ কন্যা মনে হচ্ছে।
“আমাকে কেমন লাগছে প্রিন্স?”
জোসেফ সিগারেটের ধোঁয়া উড়াতে ব্যাস্ত,তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জুবাইদার প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই তার।সে কেবল কাঠকাঠ কন্ঠে উত্তর দিলো,
“দেখার প্রয়োজন বোধ করি নি।”
জুবাইদার মুখটা চুপসে গেলো,চাঁদ মুখে গ্রহণ লাগার মতোই তার সজ্জিত মুখ জুড়ে নেমে এলো অন্ধকার।বিষাধময় কন্ঠে বললো,
“আমি আপনার জন্য নিজেকে সাজিয়েছি।”
জোসেফ এবারেও তাকালো না,পেছন ঘুরে দাঁড়িয়েই বললো,
“বলিনি আমি।”
জুবাইদার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে আসতে শুরু করলো,জোসেফের এমন অবজ্ঞা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না সে,কিন্তু কিছু করার নেই, জোসেফের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য না-হয় মুখ বুজে সহ্য করে নিবে সমস্তকিছু।জুবাইদা তপ্ত শ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলো জোসেফের দিকে,এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে রাখলো জোসেফের কাধের উপর,মোলায়েম কন্ঠে বললো,
“তাকান না একবার।চোখ ফেরাতে পারবেন না।”
জোসেফের হাত থেমে গেলো,আঙুলের ভাজে ধরে রাখা জ্বলন্ত সিগারেট টা ছুড়ে ফেলে পিষে ধরলো পায়ের নিচে, তারপর ঘুরে তাকালো জুবাইদার দিকে।জোসেফ ঘুরে তাকানো মাত্রই লাজুক দৃষ্টি নমিত করলো।দুরুদুরু করতে শুরু করলো বুক।হাতের নখ খুটতে খুটতে বললো,
“আমাকে গ্রহণ করুন প্রিন্স।”
জোসেফের অভিব্যক্তি শক্ত,রুক্ষ স্বরে বললো,
“আমার চোখ বিকৃত জিনিসে আটকায় না জুবাইদা।তোমার রুচিবোধ বড্ড বাজে।”
কথাটা বলতে বলতে নিজের গায়ের সুট টা খুলে জুবাইদার দিকে এগিয়ে দিলো জোসেফ,শক্ত কন্ঠে বললো,
“উন্মুক্ত জিনিসে মশা-মাছির উপদ্রব হয়।প্রিন্স জোসেফ সেসবে নজর দিয়ে স্বাস্থ্যহানী ঘটাতে অনিচ্ছুক।”
জোসেফের কঠিন কথার মানে বুঝতে পেরেই ভেতরটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলো জুবাইদার।দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আড়াল করার চেষ্টা চালিয়ে বললো,
“আমি আপনাকে ভালোবাসি প্রিন্স।কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি আপনি আর আমার নেই।”
“আমি কোনকালেই তোমার ছিলাম না।নাতো তোমার হওয়ার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম।”
“প্রশ্রয় তো দিয়েছেন প্রিন্স।আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা যখন মাধবী লতার মতো একটু একটু করে বেড়ে উঠছিলো তখন তো থামিয়ে দিয়ে বলেন নি আপনাকে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিতে।”
“যদি বলি মানুষকে আশাহত করতেই তৃপ্তি পাই আমি।”
“তাহলে একই রকম তৃপ্তি কেন দাসী ফ্লোরেন্সাকে চাবুক মেরে পাননি?কেন নিজ হাতে শাস্তি দিয়ে আবার তাকে ঔষধ লাগিয়ে দিতে গিয়েছিলেন?”
“আমার কাজের কৈফিয়ত চাইছো?”
“কৈফিয়ত দিবেন না সেটা আমি ভালো করেই যানি।তাই কৈফিয়ত চাইছি না।শুধু একটা সত্য কথা শুনতে চাইছি।”
“কি সত্য?”
জুবাইদার নিঃশ্বাস ভারি হয়ে এসেছে,হাপড় হাপড় লাগছে বুক,অথচ চুপচাপ একটা শুখনো ঢোকের সাথে গিলে নিলো সমস্ত তিক্ততা,চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“দাসী ফ্লোরেন্সাকে আপনি ভালোবেসে ফেলেছেন তাই না?”
জোসেফের দৃষ্টি শক্ত,ভরাট কন্ঠে প্রত্যুত্তর করলো তুরন্ত,
“এই মহলের রানী বানিয়ে ফেলেছি।কাল সকালে এর পূর্নাজ্ঞ ঘোষণা দেওয়া হবে।আশা করি আজকের মধ্যেই নিজেকে প্রস্তুত করে নিবে তুমি।”
“কীসের প্রস্তুতি?আমার জায়গায় অন্যকাউকে দেখার?”
জুবাইদার আহত স্বরের উত্তরে ভেসে এলো জোসেফের কাঠকাঠ কন্ঠস্বর,
“জায়গা টা কখনোই তোমার ছিলোনা।”
“কিন্তু আমার তো হওয়ার কথা ছিলো।”
“আমার কাছে কথার কোন মূল্য নেই।”
জোসেফের নিটোল বাক্যের বিপরীতে প্রত্যুত্তর করল না জুবাইদা।অপমান গিলে নিয়ে নিঃশ্বব্দে বেড়িয়ে গেলো কক্ষ থেকে।
___________
রানী ক্যাথরিনের কক্ষে গোপন বৈঠক বসেছে।দাসী শারিকার সাথে উপস্থিত আছে জুবাইদা নিজেও।তাদের ঠোঁট জুড়ে শয়তানি হাসি, কোন এক কাজ সম্পূর্ণ করার খুশিতে চকচক করছে তাদের চেহারা।
তবে রানী ক্যাথরিন এখনো কিছুটা শঙ্কিত,তার চেহারায় স্পষ্ট হয়েছে শঙ্কার ছাপ।দাসী শারিকাকে ভরসা করতে পারছে না তিনি,সন্দেহ দূর করার জন্য জিজ্ঞেস করলো,
“কাজটা ঠিক মতো করেছ তো শারিকা?ওই ঔষধ টা ঠিক মতো মিশিয়েছ তো?”
শারিকা আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে উত্তর দিলো,
“একদম ঠিক মতো করেছি রানী,ভুল হওয়ার কোন সুযোগ নেই।ওই আইরিশ বেচারা আজ নিজের অজান্তেই লুট করবে দাসী ফ্লোরেন্সার স্বতীত্ব।ঔষধের সম্পূর্ণটাই মিশিয়ে দিয়ে এসেছি খাবারের সাথে।”
শারিকার কথায় প্রসন্ন হাসলো জুবাইদা,হিংস্র কন্ঠে বললো,
“এতো সৌন্দর্য আর রুপ দিয়ে কি করবে ওই ফ্লোরেন্সা,যার স্বতিত্বই থাকবে না তার রুপ দিয়ে কি হবে?সেই তো কাল সকালে একটা অপবিত্র শরীর নিয়ে কুৎসা রটাবে সবাই।”
রানী ক্যাথরিনের ঠোঁটেও বাঁকা হাসি,
“এই মহলের রানী হওয়ার স্বাদ জন্মের মতো মিটে যাবে ওই দাসীর।দেখে নিও কাল থেকে ওই মেয়ের জন্য জোসেফের চোখে কেবল ঘৃনা আর ঘৃনা থাকবে।আচ্ছা! তোমাকে যেই কাজটা করতে জোসেফের ঘরে পাঠিয়েছি সেই কাজটা করেছ তো?”
“সে আর না করে থাকি?নেশাদ্রব্য মিশ্রিত সরবত প্রিন্স জোসেফের ঘরে খুব যত্ন করে রেখে এসেছি আমি।এতোক্ষণে হয়তো খেয়েও ফেলেছে।”
জুবাইদার কথা শুনে উঠে দাড়ালো রানী ক্যাথরিন,প্রফুল্ল কন্ঠে বললো,
“তাহলে আর দেরী কীসের? দ্রুত যাও।আজকে রাতটা তোমার আর প্রিন্স জোসেফের।জোসেফকে নিজের করে নেও জুবাইদা,আজকে রাতে এমন ভালোবাসো যেন ওই ফ্লোরেন্সার নাম জোসেফের মন থেকে সম্পূর্ণভাবে মুছে যায়।”
জুবাইদা লজ্জায় মাথা নামালো,ভারাক্রান্ত কন্ঠে বললো,
“আমি এভাবে উনাকে পেতে চাই নি বিশ্বাস করুন।ওই মেয়েটার জন্য আমার সব স্বপ্ন গুলো ভেঙে গেলো,আজ নিজের ভালোবাসাকে জয় করার জন্য এই জঘন্য পথ বেছে নিতে হলো স্বইচ্ছায়।”
রানী ক্যাথরিনের তেমন কিছু এলো গেলো না,জুবাইদাকে সে কেবল ব্যাবহার করছে,প্রিন্স জোসেফকে সায়েস্তা করার জন্য জুবাইদার মতো একটা বোকা গুটিরই তো প্রয়োজন তার।চেহারায় মিছে দুঃখের ছাপ এনে কন্ঠ নরম করলো ক্যাথরিন,জুবাইদার কাঁধে হাত রেখে বললো,
“দুঃখ পেয়ো না জুবাইদা, ওই মেয়ের জন্য আজকের রাতটা ভয়ংকর হতে চলেছে।কাল সকালটা শুধুমাত্র তুমি উপভোগ করবে।”
ভারী পর্দার আড়ালে লুকিয়ে এতোক্ষণ ধরে এদের সমস্ত কথা শুনছিলো সত্য।অলিক কন্যার ক্ষতি করার কথা শুনে চুপ থাকতে পারলো না অবুঝ বাচ্চাটা,হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে এলো পর্দার আড়াল থেকে,রাগী কন্ঠে বললো,
“তোমরা আমার অলিক কন্যার ক্ষতি করার জন্য ষড়যন্ত্র করতাছো, আমি সব শুইনা ফালাইছি।আমি সব বইল্লা দিমু।”
সত্যের কথা শুনে চমকে উঠলো রানী ক্যাথরিন।সাথে সমানভাবে চমকালো দাসী শারিকা আর জুবাইদাও।এই ছেলে এখানে লুকিয়ে থেকে তাদের সব কথা শুনিছিলো,অথচ তিনজনের একজনও ঘুনাক্ষরেও টের পায় নি।
দাসী শারিকা রীতিমতো ঘামতে শুরু করেছে,ভয়ের তোপে কাঁপছে কণ্ঠনালী,
“এখন কি হবে রানী ক্যাথরিন?এই ছেলে যদি সত্যি সত্যিই প্রিন্স কে সব বলে দেয় তাহলে তো প্রিন্স গর্দান নিবে আমাদের।”
শারিকার কথায় সায় দিলো জুবাইদা,শঙ্কিত কন্ঠে বললো,
“দাসী শারিকা ঠিক বলেছে রানী ক্যাথরিন, এই বাচ্চা ছেলে যদি সব বলে দেয় তাহলে তো আমাদের সব ষড়যন্ত্র ফাস হয়ে যাবে।আর প্রিন্স যদি কোনভাবে এসব জেনে যায় আমাদের কি পরিনতি হবে ভেবে দেখেছেন?”
“আহ!সামান্য একটা বাচ্চাকে ভয় পাচ্ছো কেন তোমরা?আমি এখানে আছি কি করতে?”
জোড় গলায় কথাটা বললেও রানী ক্যাথরিন নিজেও বেশ শঙ্কিত।যেকোনো মূল্যের এই ছেলের মুখ বন্ধ করাটা আবশ্যক।
সত্য তখনও দাঁড়িয়ে,তার শিশুসুলভ মন এখনও আঁচ করতে পারেনি তাদের নিসংসতা,সে কেবল নিস্পার হয়ে সালিশ দিলো,
“তোমরা এতো পচা কেন?অলিক কন্যা কত ভালো তোমরা যানো?ওর ক্ষতি করলে তো মাবুদ নারাজ হইবো।তোমাদেরকে শাস্তি দিবো।”
রানী ক্যাথরিন আর চোখে তাকালো শারিকার দিকে,চোখের ইশারায় বোঝালো সত্যকে আটক করতে।শারিকা সেই ইশারা অনুসরণ করে কৌশলে এগিয়ে গেলো সত্যের কাছে,সত্য কিছু বুঝে উঠার আগেই শক্ত হাতে চেপে ধরলো সত্যের মুখ।সত্য ঘাবড়ালো,দুইহাত দিয়ে ছাড়াতে চাইলো শারিকার হাত,অস্ফুট শব্দ করলো,
“উ,, উ,উম।”
সত্য হাত পা ছুড়তে শুরু করলো অনবরত। ক্ষীন নিঃশ্বাস আটকে গেলো কণ্ঠনালীতে,ভেতরের ছটফটানো আত্মাটা চিৎকার করে বলতে চাইলো,
“আমাকে ছেড়ে দেও তোমরা,আমি অলিক কন্যাকে সব বলে দিবো।”
___________
নিঃশব্দ রাত। পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়েছে কোনো প্রাচীন উপকথার মায়ায়।আকাশের বুকে থালার মতো চাঁদ, তার রুপালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে নিস্পার নিস্তব্ধ কক্ষে।নাবহার ঘুমানোর জায়গাটা আজ ফাঁকা।সন্ধ্যা হতে না হতেই রানী ক্যাথরিনের জরুরি তলবে যেতে হয়েছে তাকে।সেই যে গিয়েছে এ পর্যন্ত ফেরার নামগন্ধ অব্দি নেই।
পুরো ঘরজুড়ে থমথমে ভাব।শরীরটা অজানা কারণেই হিম হয়ে আসছে নিস্পার।মনে হচ্ছে কক্ষে কেউ আছে,কিন্তু অন্ধকারে অস্পষ্ট সব,কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।তবে নিস্পার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় প্রখর, সে ঠিক বুঝতে পেরেছে ঘরের মধ্যে কেউ একজন এসেছে,একটা চন্দনের সুবাস ধেয়ে এসে স্পর্শ করেছে নিস্পার নাসিকা গ্রন্থ।নিস্পা ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো,পাশের টেবিলে রাখা টিমটিমে হারিকেনের আলোটা একটু বাড়িয়ে নিলো সে,সতর্ক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কে?কে আছে এই ঘরে?”
নিস্তব্ধতা!
কারো সাড়াশব্দ অব্দি নেই, নিস্পা ধিরে ধিরে উঠে দাড়ালো বিছানা থেকে,সুস্ক একটা ঢোক গিলে আবার বললো,
“আমি জানি এই ঘরে কেউ আছে,কে আছে সামনে আসুন,নয়তো খারাপ হয়ে যাবে বলে দিলাম।”
ঠিক তক্ষুনি নিস্পা টের পেলো তার ঘাড়ের উপর কারো উত্তপ্ত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে। নিস্পার পুরো শরীর ঘেমে একাকার,হাত পা অসার হয়ে এসেছে,শুখনো কন্ঠতালু বিদীর্ণ করে কম্পিত স্বরে বললো,
“কে?”
ততক্ষণে দুটো পুরুষালী খরখরে হাত দু দিক থেকে আঁকড়ে ধরেছে নিস্পার কোমড়,এক জোড়া ঠান্ডা অধর স্পর্শ করেছে নিস্পার ঘাড়।নিস্পার পুরো শরীরে বিদ্যুৎ বয়ে গেলো,বজ্রপাতের ন্যায় ঝলসে উঠলো ভোতা অনুভূতি।পরপরই নিস্তেজ মস্তিষ্ক শুনতে পেলো প্রিন্স জোসেফের মাদকিয় কন্ঠস্বর,
“তোমার ঘাড়ের কোমল চামড়া বিদীর্ণ করার অদ্ভুত ইচ্ছে জেগেছে আমার।”
নিস্পার হৃদযন্ত্র থমকে গেলো,আতংকে শিউরে উঠলো সর্বাঙ্গ,প্রচন্ড ক্রোধে শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে ধাক্কা দিলো জোসেফকে,ভীত স্বরে বললো,
“আ,,আপনি এতো রাতে এই কক্ষে কেন?আপনাকে তো নেশাগ্রস্ত দেখাচ্ছে।”
জোসেফের চোখে মুখে উপচে পড়া নেশা,নীল চোখ জুড়ে আজ কেবল ঘোর,তার মস্তিষ্ক দিশেহারা,নিস্পার প্রতি এক নিষিদ্ধ কামনাকে প্রশ্রয় দিয়ে এক ঝটকায় টেনে খুলে ফেললো নিজের শার্ট।সহসা আঁতকে উঠে দু কদম পিছিয়ে গেলো নিস্পা,চোখ বড় বড় করে বললো,
“কি করছেন কি আপনি?”
জোসেফের নীল সমুদ্রের ন্যায় দুচোখে জমে আছে কামুকতা, পৃথিবীর সমস্ত কুন্ঠা নিয়ে সে চোখে চোখ রাখতেই জমে গেলো নিস্পার শরীর, শুরু হলো অন্তঃকরন। ততক্ষণে জোসেফ নিজের শার্ট দ্বারা নিস্পার হাত দুটো বাধতে শুরু করলো, টালমাটাল কন্ঠে ফিসফিসালো,
“কেঁচোর বাসস্থান কোথায় তুমি কি জানো মেয়ে?তার থাকার মতো উপযুক্ত টানেলের সন্ধান পেতে এসেছি তোমার কাছে।”
অগত্যা সৎবিৎ ফিরলো নিস্পার, নাক মুখ কুচকে তাকালো জোসেফের দিকে,জোসেফের কথায় রাগে পুরো শরীর কিড়মিড় করে উঠলো তার, দাঁতে দাঁত পিষে কর্কষ কন্ঠে বললো,
“হাত বেঁধে নিয়েছেন বলে একদম নিজেকে হিরো ভাববেন না।ভুলে যাবেন না আমার পা দুটো কিন্তু মুক্ত আছে,এমন লাথি মারবো আপনার ওই কেঁচোর দম ফানুশের মতো উড়ে যাবে।”
নিস্পার রুক্ষতাকে প্রত্যাখ্যান করে আরেকটু এগোলো জোসেফ,শক্ত থাবায় নিস্পার হাতটা কব্জা বন্দি করে বললো,
“শোন মেয়ে তোমার প্রতিটি কথার ঘা ভূমিকম্পের মতো কম্পন তুলে আমার হৃদয়ে।”
নিস্পার চোয়ালে বাঁক ধরা,জোসেফের মাতাল চোখে চোখ রেখে তিরিক্ষি কন্ঠে বললো,
“বেডা মানুষ গিরগিটির জাত,হৃদয় কাঁপলে এরা বিছানা কাঁপাতে চলে আসে।আপনাকে বিশ্বাস করা অসম্ভব।”
জোসেফ বিরক্ত হয়,নিস্পাকে ছোয়ার বাহানায় পরাজিত হয় তার সকল যুক্তি,সে তিক্ত বিরক্ত কন্ঠে বলে,
” তোমার মস্তিষ্ক অসুস্থ।মনে হচ্ছে চিকিৎসার প্রয়োজন।”
নিস্পা তার হাতে পেচিয়ে রাখা শার্টের বাধন খুলতে খুলতে প্রত্যুত্তর করলো চটপট,
” চিকিৎসা আমার নয় আপনার প্রয়োজন।হারবাল খেয়ে দেখতে পারেন,সব কাঁপাকাঁপি বন্ধ হয়ে যাবে।গ্যারান্টি।”
জোসেফ আরেক দফায় কব্জা বন্দি করলো নিস্পার দুটো হাত,নেশায় মসগুল তার মস্তিষ্ক,সে কেবল রাশভারি কন্ঠে আওড়াল,
“আই ওয়ান্ট টু বাইট ইউ অভিশপ্ত সুন্দরী।”
নিস্পা কটমট করে তাকালো,জোসেফের প্রত্যেকটি কথায় ত্যাড়া জবাব দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে সে,
“বাইট তো মশাও দিতে আসে,আমি এক থাপ্পড়ে চ্যাপ্টা বানিয়ে দেই।চ্যাপ্টা হওয়ার ইচ্ছে হয়েছে নাকি আপনার?”
এপর্যায়ে ধৈর্যের সমস্ত বাঁধ ভাঙলো জোসেফের।চোয়াল শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করলো হাত,ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করে ধারণ করলো রণমুর্তি, পরপরই দাঁতে দাঁত খিচে নিস্পার পেলব কোমল গাল বরাবর একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে বললো,
“নে,এক থাপ্পড়ে চ্যাপ্টা।শালার রোমান্সের মায়রে বাপ।”
শক্ত হাতের চাপেটাঘাতে মস্তিষ্ক ঝাঝিয়ে উঠলো নিস্পার,ভগ্নহৃদয় কেঁদে উঠলো আচানক,হাতটা গালের উপর রেখে ফুফিয়ে উঠলো,
“আপনি সত্যি সত্যি থাপ্পড় মেরে দিলেন?”
জোসেফ নেশার ঘোরে নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখতে ব্যার্থ,নিস্পার প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো নিস্পার বিছানায়।নিস্পা তখনও গালে হাত রেখে ঠায় দাঁড়িয়ে,অস্ফুটে বিরবির করছে,
“কিন্তু আমিতো বাইট দিলামই না,আমাকে চ্যাপ্টা বানানোর কারণ কি?”
চলবে,,,,,,,,

