হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পর্ব:52

0
34

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:52

সুনশান নিস্তব্ধতা। অন্ধকারে ডুবে আছে পুরো গ্যারেজ। বা দিকের দরজাটা খুলে গেলো হটাৎ।দমকা হাওয়ার মতো ভেতরে প্রবেশ করলো ত্রিজয়,বুক টান টান করে হাঁটছে সে,পায়ের ভারিক্কি আওয়াজে কাঁপছে মেঝে, শ্বাসপ্রশ্বাস দাউ দাউ আগুনের মতো জ্বলছে।তার ঘাড় পেচিয়ে ফনা তুলে বসে আছে সেই সাপ, যাকে ন্যাক্সোরা নাম দিয়েছে ত্রিজয়।ন্যাক্সোরার ফনা তোলা বিষাক্ত চোখ জ্বলজ্বল করছে বাল্বের হলদে আলোয়,দেখে মনে হচ্ছে সাপটা ত্রিজয়ের আত্মারই সম্প্রসারণ, মৃত্যুর ছায়া হয়ে সঙ্গ দিচ্ছে তার প্রতিটি নড়াচড়ায়।

ত্রিজয় একা নয়,অদ্ভুত ভাবে তাকে অনুসরণ করে ঘরে ঢুকলো আরেকজন।কোনো শব্দ নেই, কোনো কথা নেই ছায়ার মধ্য থেকে উঠে আসা মূর্তির ন্যায় সে কেবল হেঁটে আসলো নিঃশব্দে। হাটার ধরন, তার অভেদ্য শূন্য দৃষ্টি বুঝিয়ে দিচ্ছে ত্রিজয়ের আজকের শিকার হতে চলেছে লোকটা।তবে প্রতিবারের মতো শিকার চয়েজে ভিন্নতা দেখা গেলো আজ।সম্মোহনের জালে বেধে নিয়ে আসা ব্যাক্তি কোন মেয়ে নয়,বরং একজন পুরুষ।

গ্যারেজের ঠিক মাঝখানে এসে দাড়ালো ত্রিজয়,হাতে ধরে রাখা রিমোট প্রেস করতেই পায়ের দু ইঞ্চি সামনে খুলে গেলো বেজমেন্টের যান্ত্রিক দরজা।সিড়ি ধরে সে ধিরে ধিরে নেমে গেলো নিচের দিকে,তার পিছু পিছু একই ভাবে বেজমেন্টে এসে দাড়ালো সেই লোকটাও।

ভেতরটা নান্দনিক।তেমন বিশেষ কিছু নেই, তবে ঘরটার বিশেষত্ব জুড়ে রয়েছে কাচের তৈরি দুটো বাক্স।যা পরিপূর্ণ কয়েক হাজার অস্ত্রে।আরেক পাশে রয়েছে একটা বার ক্যাবিনেট। যেখানে সারিসারি ভাবে সাজিয়ে রাখা আছে আ্যলকোহলের বোতল।

সেখান থেকে একটা ওয়াইনের বোতল আর একটা চাপাতি নিয়ে সোজা গিয়ে বসলো মোলায়েম ভেলভেট কাপড়ে আবৃত ল্যাদারের চেয়ারে ।লোকটা পোষ মানানো বিড়ালের ন্যায় তার সামনে দাঁড়ানো,কোন শব্দ নেই, কোন প্রশ্ন নেই,অপলক দৃষ্টিতে নেই কোন প্রান,না আছে কোন ভাষা।

ত্রিজয় গ্লাসে ওয়াইন ঢাললো,তারপর দুটো বরফের টুকরো নিতে নিতে রাশভারি কন্ঠে বললো,

“পঞ্চম খন্ডটা কোথায়?”

লোকটা চোখের পল্লব অব্দি নাড়ালো না,রোবটের ন্যায় যান্ত্রিক কন্ঠে বললো,

“আমার লকারে।”

ত্রিজয় গ্লাসে চুমুক বসালো,ঠান্ডা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“পাসওয়ার্ড?”

লোকটা এবারেও সেই একই টোনে আওড়াল,

“4 3759”

ত্রিজয় মুচকি হাসলো,গ্লাসে চুমুক বসালো পুনরায়, তারপর চাপাতিটা হাতে তুলে লোকটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

“সোজা বুক বরাবর মারবে,তবে সাবধান হৃদপিন্ড যেন অক্ষত থাকে।”

ত্রিজয়ের কথামতো লোকটা চাপাতি বসিয়ে দিলো হৃদপিন্ড বরাবর,কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই রক্তের গরম ছট ধেয়ে এসে আছড়ে পড়ল ত্রিজয়ের চোখ-মুখে।ত্রিজয়ের ফর্সা মুখ লাল রক্তে বিভৎস হয়ে উঠেছে।তার ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠা পৈশাচিক হাসি আরও বেশি ভয়ংকর করে তুলেছে তার মুখাবয়ব।

লোকটা মেঝেতে পরে ছটপট করছে,মৃত্যুর আলিঙ্গনে গোৎগোৎ শব্দ বের হচ্ছে মুখ থেকে।এতো নৃশংসতার পরেও শান্তি পেলো না ত্রিজয়,তৃপ্তি পেলো না তার ভেতরের পৈশাচিক আত্মাটা,সে ন্যাক্সোরার দিকে তাকিয়ে হিসহিসালো,

“আই এম নট সেটিস্ফাইড ন্যাক্সোরা।আমি এই জানোয়ারের বাচ্চাকে টুকরো টুকরো করে কাটতে চাই।”

কথাটা বলেই ধিম পায়ে এগিয়ে গেলো ত্রিজয়,বাক্স থেকে আরেকটি চাপাতি নিয়ে গিয়ে বসলো লোকটার কাছে,মৃত্যু যন্ত্রণায় কোটর ফেটে যাচ্ছে লোকটার,ত্রিজয়কে দেখা মাত্রই সেই যন্ত্রণা আরেকটু বাড়লো, হ্যাসহ্যাসিয়ে বলতে চাইলো,

“পা,,পা,,নি।”

মুচকি হাসলো ত্রিজয়,উঠে গিয়ে একটা গ্লাসে পানি ঢাললো খুব ধিরে ধিরে,তারপর ভরাট কন্ঠে বললো,

“ও পানি খেতে চেয়েছে ন্যক্সোরা।তৃষ্ণার্ত ব্যাক্তিকে পানি দেওয়া উত্তম কাজ।”

সাপটা ত্রিজয়ের ঘার থেকে হাত পেচিয়ে নেমে এলো,তারপর তার বিষধর কালো কলকলে জ্বিভ ডুবিয়ে দিলো পানির গ্লাসে।স্বচ্ছ পানি রুপ নিলো হাল্কা নীল বর্ণে।সাপের বিষ তীব্র ভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো পানির প্রতিটি কণায়।ত্রিজয় ধিরে ধিরে এগিয়ে গিয়ে লোকটার সামনে বাড়িয়ে দিলো গ্লাসটা, তারপর ধিম কন্ঠে বললো,

“এই বিষ টুকু এর নক পর্যন্ত পৌছানোর আগে আমি এর তরতাজা হৃদপিন্ডটা খুলে নেবো ন্যাক্সোরা।”

“লেট’স প্লে গেম ডার্লিং।দেখি কে বেশি খাতারনাক তোমার বিষ নাকি প্রিন্স জোসেফের চোখের বিষ।”

_____________

একটা ক্ষতবিক্ষত লাশ।সারাঘর রক্তে রঞ্জিত।সাথে ত্রিজয়ের শরীরেরও ভয়ংকর দশা।টেবিলের উপর রাখা লাল এক খন্ড হৃদপিন্ড, সেখানটায় একমনে ছুড়ি চালাচ্ছে সে।ইভান বাকরুদ্ধ হয়ে বসে আছে লাশটার পাশে।ঘটনার ভয়াবহতা তাকে প্রভাবিত করতে না পারলেও ত্রিজয়ের এমন নৃশংসতা খুব ভাবাচ্ছে তাকে।প্রত্যেকবার নিজের অজান্তে করেছে বলে ঘটনা এড়িয়ে যাওয়া লোকটা আজ একবারের জন্যও বলছে না ভুল করে খুন হয়ে গিয়েছে,কি করেই বা বলবে?এত বিশ্রী নির্মম নিখুঁত খুন কোনভাবেই ভুল করে হয় না, যার পেছনে কারণ থাকে কোন বিশাল কারন, অন্ধকার রহস্য।

প্রায় মিনিট বিশেক হলো ইভানের মুখ সিল হয়ে আছে বাকরুদ্ধতায়,বেশ কিছুক্ষণের নৈঃশব্দের পর সে ফুসতে থাকা ত্রিজয়ের হিংস্র মুখের দিকে তাকালো, তারপর দমদমে কন্ঠে বললো,

“আপনি সজ্ঞানেই সবগুলো খুন করতেন স্যার!”

ত্রিজয়ের হাতের চাকুটা চলতে চলতে আচানক বন্ধ হয়ে যায়,সে চোখ তুলে তাকায় ইভানের ভড়কানো মুখের দিকে,তুরন্ত দৃষ্টি নামিয়ে ঘাড় বাঁকায়,এবারে তাকায় গলায় পেচানো সাপটির দিকে তারপর উদ্বেল কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

“ন্যাক্সোরাকে দেখতে পাচ্ছো তুমি ইভান?”

ইভান নির্বাক দৃষ্টিতে তাকায় সম্মুখে,অস্পষ্ট আওড়ায়,

“ন্যাক্সোরা?”

ত্রিজয় বক্র হাসে,দুই ঠোঁট এগিয়ে নিয়ে চুমু খায় সাপটার গায়ে, রক্তহিম করা কন্ঠে বলে,

“গেম খেলছিলাম ইভান,নেক্সোরা দুঃখ পেয়েছে দেখ।আমার কাছে হেরে গিয়েছে।”

ইভানের জ্বিভ শুকিয়ে এলো,হ্বিবলতায় বাক হারালো কন্ঠ,ত্রিজয়ের এই দানবীয় হিংস্র রুপ কিছুতেই ধাবন হচ্ছে না তার,তীব্র অধিকারবোধ দেখিয়ে সে কন্ঠে ঝাজ বাড়িয়ে বললো,

“কি করছেন স্যার?এই খুন গুলো কেন করছেন আপনি?

ত্রিজয়ের চোখ দপ করেই জ্বলে উঠলো,ঠান্ডা মাথায়, সুক্ষ্ম কৌশলে অকস্মাৎ হাতের চাকুটা ছুড়ে দিলো ইভানের দিকে।চাকুটা ধেয়ে আসতেই কলিজা কেঁপে উঠলো ইভানের,ঘটনার তীব্র সংঘাতে সরে যাওয়ার সুযোগ পেলো না ইভান,মেরুদণ্ড শক্ত করে চোখ বন্ধ করে নিলো খিচে,চাকুটা ছুটে এসে বিধলো ঠিক তার ন্যানো ইঞ্চি দুরত্ব দিয়ে ছুটে যাওয়া একটি টিকটিকির গায়ে।

চাকুর শব্দে তরাগ করে চোখ খুলে তাকায় ইভান।কাউচে পায়ের উপর পা তুলে রাজার বেশে বসে আছে ত্রিজয়,সেই একই রকম শিকারিকে ভেদ করা বাজপাখির মতো স্থির, নির্ভুল, আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।অটল সাহসে মহিমায় নিটোল তার টানটান বক্ষ।সর্বমুখে রাজকীয় দাপট,বংশের আভিজাত্য দগদগ করছে কপালে ভেসে উঠা শিরা-উপশিরা গুলো তে, চোখের অভ্যন্তরে চিকন সুতোর মতো রগ গুলো লাল হয়ে উঠেছে রাজরক্তের স্পন্দনে।রুক্ষ ঠোঁটে খেলা করছে সেই একই রকম গম্ভীর দৃঢ়তা, যার দাম্ভিকতার মৃদু রেখা তাকে করে তুলেছে অপরাজেয়।

ইভান কিংকর্তব্যবিমুঢ়,সে এক দৃষ্টে মূক নয়নে তাকিয়ে রইলতত্রিজয়ের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রুপের দিকে,রুদ্ধশ্বাস কন্ঠে আওড়াল,

” স্যার!”

ত্রিজয় বক্র হাসলো, ঠান্ডা অথচ দাম্ভিক কন্ঠে আওড়াল,

“উঁহু।জোসেফ।প্রিন্স জোসেফ।তোমার রক্তের শত্রু আমি, জনাব ইমরান খাঁন।”

___________

ব্র‍্যাক ইউনিভার্সিটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে শুধুমাত্র চিকিৎসা নয়,বছরের পর বছর এখানে চলছে কালো কারবার, যার একমাত্র নৈপথ্য নায়ক বা মাস্টার মাইন্ড স্বয়ং দেশের এমপি তাওসিফ তাকরিম।

ভালোমানুষির মুখশের আড়ালে এটা তার রক্তচক্ষু, ভয়ঙ্কর অন্ধকার রূপ।যার সাথে সভার কিছু উচ্চপদস্থ মন্ত্রি এবং সরকারি কর্মকর্তা ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত।প্রভাব, অর্থ আর ক্ষমতার আঁতাতে হসপিটাল টি পরিণত হয়েছে এক ভিন্ন আখড়ায়, যেখানে চিকিৎসা নয়, চলে দুর্নীতি, ষড়যন্ত্র আর অবৈধ কারবার।

চিকিৎসার আড়ালে চলে মানুষের শরীরের সুস্থ সবল অর্গান কেনা বেচার রমরমা ব্যাবসা।বিদেশি বড় বড় ডন-মাফিয়া, ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব এবং উচ্চপদস্থ শাসকরা তাদের প্রিয়জনদের বাঁচানোর জন্য কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে এই অর্গান কিনে নেন।আর এই অর্গান গুলো কালেক্ট করা হয় একটা সুস্থ সবল মানুষের শরীর থেকে।

এই সব কিছু ঠান্ডা মাথায় পরিচালনা করে তাকরিম।সেক্ষেত্রে সে টার্গেট করে অসহায় বা অনাথ মানুষ দের।যাদের আগে পিছে কেউ থাকবে না, কোন ক্ষয় ক্ষতি বা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেলেও তাদেরকে খোজার জন্য কেউ থাকবে না।আর সেরকমই একজন হলো অনু।যার সামনে পিছে কেউ নেই,যে হারিয়ে গেলেও খোজার কেউ নেই।

শুরু থেকেই তাকরিমের অন্ধকার পরিকল্পনার দৃষ্টি স্থির ছিলো অনুর দিকে।অনু এমন এক শিকার, যাকে ধীরে ধীরে ফাঁদে আটকে খাইয়ে দাইয়ে পালা পোষা হয়েছে তার ভেতরের অর্গান গুলো সুস্থ সতেজ রাখার উদ্দেশ্যে।যেটাকে অনু ভালোবাসা ভাবছে তা কেবল এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র যার বিন্দু মাত্রও আঁচ করতে পারে নি অনু।

________

ছয়মাস আগে আয়মান একটা টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার হিসেবে কাজ করতো।যদিও এতোগুলা মামলার আসামি হয়ে সে এখন পলাতক। চাকরিতে ফিরে যাওয়ার অবস্থায় নেই এখন।

তবে তার কাছে এখনও একটা ধারালো অস্ত্র আছে,তার গলায় ঝুলে থাকা ক্যামেরা টা এখন তার একমাত্র অস্ত্র।আর এই ক্যামেরা হাতে নিয়েই আয়মান পিছু লেগেছে তাকরিমের।কোনভাবে হসপিটালের ভেতরের গোপন তথ্য ফাস করে দেওয়া যায় তবে তাকরিমের পরিনতি হবে ভয়ংকর। তার ধ্বংস কেউ থামাতে পারবে না।কিন্তু কোনভাবেই সম্ভব হলো না।হসপিটালের কড়া সিকিউরিটি ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করার সাধ্য হলো না তার।তাই বাধ্য হয়েই ফিরে আসতে হলো তাকে।

হসপিটালের বাউন্ডারির বাইরে এসে তপ্তশ্বাস ফেললো আয়মান।নিজের উপর নিজেই রেগে গিয়ে ক্যামেরাটা ছুড়ে মারতে মারতেও থমকে গেলো, ফোনের রিংটোনে ফিরে এলো সৎবিৎ।ভেতরের রাগকে কোনরকম সংবরণ করে ফোন বের করল পকেট থেকে,রিসিভ করে কানে ধরতেই শোনা গেলো চিন্তিত কন্ঠস্বর,

“কোথায় তুই?”

আয়মান চাপা স্বরে বললো,

“কেন?”

“এডভোকেট ত্রিজয় তেজের ঠিকানা পেয়েছি।লোকেশন সেন্ড করেছি তোকে,দেখে নিস।”

“আচ্ছা রাখ।”
সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে ফোন কাটতে চাইলো আয়মান,অপরপ্রান্তের ব্যাক্তি বাধা দিয়ে বললো,

“শোন,ওই এডভোকেট কিন্তু সাধারণ মানুষ নয়।খবর নিয়ে জেনেছি লোকটা হিপনোটাইজ জানে,যা করার সাবধানে করিস।”

আয়মান চুপ করে শুনলো,তবে প্রত্যুত্তরে কিছু বললো না।ফোন কেটে দিয়ে তাকালো আকাশের চাঁদের দিকে,বিরবির করে আওড়াল,

” আমি আসছি চাঁদ।আমি কিন্তু তোমার প্রথম প্রেম।”

____________

রাত বারোটা।বেজমেন্টের গল্প ধামাচাপা দিয়ে বাইরে বেড়িয়ে এসেছে ত্রিজয়।ফর্মাল লুক,একদম জেন্টালম্যান হয়ে নিজের চিরাচরিত পার্সোনালিটিতে ফিরে এসেছে সে।
বাসায় ফিরে নি, সোজা এসেছে জেসিকার কাছে।যেহেতু নিজের বাড়ি তাই ভেতরে ঢোকার জন্য নক করার প্রয়োজন পরে নি তা,ডুব্লিকেট চাবি লাগিয়ে সোজা ঢুকে গিয়েছে ঘরে।

জেসিকা তখন কারো সাথে ভিডিও কনফারেন্সে ছিলো, ত্রিজয়ের অপ্রত্যাশিত আগমনে বেশ ঘাবড়েছে মেয়েটা,দ্রুত কল কেটে দিয়ে রক্ষা করতে চেয়েছে গোপনীয়তা।তবে খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারে নি,ত্রিজয়ের তীক্ষ্ণ শিকারি চোখ ঠিকই ধরে ফেলেছে সবটা,অথচ সে কোন প্রতিক্রিয়াই দেখালো না,সোজা গিয়ে দাড়ালো জেসিকার সামনে।

জেসিকা ঢোক গিলে গলা ভেজালো,চোখ তুলে একবার পরখ করলো ত্রিজয়ের ভাবসাব।জেসিকা তাকানো মাত্রই বক্র হাসলো ত্রিজয়,ঠান্ডা কন্ঠে বললো,

“আমার প্রতিক্রিয়া বোঝার ক্ষমতা তোমার নেই নির্বোধ বালিকা।”

জেসিকা কিঞ্চিৎ তথমত খেলো,খরখরে জ্বিভের ডগা দিয়ে ভেজানোর চেষ্টা করল ঠোঁট,ক্ষীণ কন্ঠে বললো,

“আপনি কখন এলেন?আমি তো ভেবেছি আসবেনই না।”

ত্রিজয় অভিব্যক্তি শক্ত রেখে ভ্রুকুটি তুলে বললো,

“কেন?এমন কেন ভেবেছিলে?”

জেসিকা কন্ঠে নমনীয়তা বজায় রেখে বললো,

“বিয়ে করেছেন নতুন বউ ঘরে রেখে এক্সের কাছে আসা টা কি আর ভাবনার মধ্যে পরে।”

“তুমি আমার এক্স?কিন্তু কখন হলে?”

ত্রিজয়ের ভাবলেশহীন প্রশ্নে ভিষণ বিব্রত হলো জেসিকা,কন্ঠে কোমলতা টেনে বললো,

“বাদ দিন না।আপনি এসেছেন এতেই আমি খুশি।অতীতে আমরা কি ছিলাম তা নাহয় নাই ঘাটি।চলুন বর্তমানে একটি সুন্দর সম্পর্ক স্থাপন করি।”

ত্রিজয় ঠোঁট কামড়ে এলোমেলো চোখে তাকালো,কন্ঠে মুগ্ধতা টেনে বললো,

“ইউ আর রাইট বেইব।বাট কি সম্পর্ক তৈরি করা যায় বলোতো?”

জেসিকা আর চোখে চাইলো ত্রিজয়ের দিকে,তারপর নিজের দু-হাত বাড়িয়ে পেচিয়ে ধরলো ত্রিজয়ের গলা,পা টা একটু উঁচুতে তুলে মোহিত কন্ঠে বললো,

“আমি সুস্থ হয়ে গিয়েছি ত্রিজয়,ওই মেয়েটাকে ডিভোর্স দিচ্ছো না কেন?এখন তো তোমার লাইফে আমি বেক করেছি।”

ত্রিজয় ঠোঁটে টিপে হেসে ফেললো,নিজের হাত তুলে জেসিকার টপসের হাতাটা উপরে তুলে দিতে দিতে বললো,

” আমি ল ইয়ার ত্রিজয় তেজ,পাহাড়ের উচ্চতা দেখেই আরোহির সংখ্যা বলে দিতে পারি,তোমার উচিত আরেকটু ফিটিং কিছু পড়া, মিস জেসিকা।হাত সরাও,যেতে হবে আমার।”

জেসিকা ভড়কালো,ত্রিজয়ের মুখে নিজের আসল নাম শুনে ভয় পেলো কিছুটা,কিন্তু হাত সরালো না একদম।বরং আরেকটু শক্ত বাধনে বাধার চেষ্টা চালিয়ে বললো,

“আজকে রাতে আমার সাথে থেকে যাও ত্রিজয়।আমি তোমার সমস্ত অভিযোগ পুষিয়ে দেবো।”

“একাকিত্ব বোধ করছো?”

জেসিকা মাথা নাড়িয়ে বোঝালো, “হ্যাঁ।”

ত্রিজয় অভিব্যক্তি বাহিনী শান্ত কন্ঠে উত্তর দিলো,

“ওকে বেইব।তুমি তাহলে আমার ন্যাক্সোরাকে সাথে নিয়েই আজকের একাকিত্ব দূর করে নেও।”

জেসিকা কপাল কুচকালো,বুঝতে না পেরে অস্পষ্ট আওড়াল,

“ন্যাক্সোরা?”

ত্রিজয় নিজের মুখ জেসিকার কানের কাছে এনে ফিসফিসিয়ে বললো,

“ইয়েস বেইব।ন্যাক্সোরা।”

দুই ঠোঁট গোল করে এক সম্মোহনী সুর তৈরি করলো ত্রিজয়।কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার স্যুটের ভেতর থেকে সাই-সাই করে বেড়িয়ে এলো কালো কুচকুচে দেখতে সাপ ন্যাক্সোরা।

ত্রিজয় আর জেসিকার মধ্যে ফনা তুলে ফোসফাস শব্দ করছে ন্যাক্সোরা।ঘটনার ভয়াবহতায় নিঃশ্বাস থমকে গেলো জেসিকার,ভয়ে আতংকে ছিটকে গিয়ে পড়লো দূরে।ভয়ের তীব্রতায় মস্তিষ্ক নিস্ক্রিয় হয়ে এলো মূহুর্তেই,জেসিকার কণ্ঠনালী বন্ধ হয়ে শব্দরা আটকে গেলো খরখরে জ্বিভের ডগায়,ফ্যাসফ্যাস করে আওড়াল,

“সা,,, সা,,,সাপ।”

অতিরিক্ত ভয়ে আর ঠিক থাকতে পারলো না মেয়েটা।জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে।ত্রিজয় অদ্ভুত সম্মোহনী সুর বাজাতে বাজাতে তাকে সেভাবেই ফেলে রেখে বেড়িয়ে গেলো বাড়ির বাইরে।

___________

রাত দুটো নাগাদ।বাড়ি ফিরে এসেছে ত্রিজয়।নিস্পা ঘরে নেই,ফুলমতির ঘরেই ঘুমিয়ে পড়েছে বেশ অনেক্ষন হলো।ত্রিজয় সরাসরি এসে ঢুকলো ফুলমতির ঘরে।নিস্পা ঘুমিয়ে আছে আলুথালু হয়ে।বুকে ওড়না নেই,ফর্সা বুকের মাদকিয় বাঁক এক অবাঞ্চিত ভ্রমে আচ্ছন্ন করলো ত্রিজয়কে।নিস্পার বুকের উঠানামা তরঙ্গ তৈরি করলো তার পুরুষালি পিপাসু হৃদয়ে।নীল রঙা চোখে জমে থাকা সমস্ত হিংস্রতা আর রুক্ষতা উবে গেলো এক মূহুর্তে।সে চোখের গভীরে স্পষ্ট হলো নেশা, প্রেয়সীকে ছুয়ে দেওয়ার গভীর নেশায় উন্মাদ হৃদয়ে বাজতে শুরু করলো দামাঢোল।

এমন মোহনীয় দৃশ্য কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারলো না ত্রিজয়।নেশাতুর প্রাণীর ন্যায় ধিরে ধিরে এগিয়ে গেলো নিস্পার কাছে।ভাবনার জন্য এক ন্যানো সেকেন্ড সময়ও ব্যয় করলো না সে,তড়িৎ ঝুকে গিয়ে কোলে তুলে নিলো অবেচতন নিস্পাকে।

নিস্পা হকচকিয়ে উঠে, ঘুম ভেঙে যায় নড়াচড়ায়,চোখ খুলে নিজেকে শুন্যে আবিস্কার করার পর ভড়কায় কিছুটা।পরপরই ধাতস্থ হয় ত্রিজয়ের নীল চোখের দর্শন পেয়ে।তবে ত্রিজয়ের এমন কান্ডে ভিষণ রাগ উঠে তার,করা মেজাজি কন্ঠে বলে,

“সমস্যা কি আপনার? রাত বিরাতেও কি শান্তি দিবেন না?”

“ত্রিজয় নিস্পাকে কোলে নিয়ে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে গেলো,মোহিত কন্ঠে বললো,

” রাত তো শান্তি দেবার জন্যই আসে মিসেস চাটনি,তুমি চাইলে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুখে মুড়িয়ে দেবো তোমায়।”

নিস্পা কটমট করে তাকায়,দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“সবসময় মেজাজ একরকম থাকে না,এতোরাতে এসব ফালতু বিষয় নিয়ে তর্ক করার মুড আমার একদমই নেই।”

ত্রিজয় ধিরে ধিরে নিস্পাকে বিছানায় শুইয়ে দিলো,একটু আগেও যেই হাতে অস্ত্র ধরা ছিলো, যে হাত লিপ্ত হয়েছিলো নির্মম হত্যাকাণ্ডে, সেই হাতে কোমলতা ভির করেছে এখন,চেহারার সাথে হাতের রুপও পাল্টে গেছে নিস্পার সংস্পর্শে।পৃথিবীর সমস্ত মমতা হাতের তালুতে আবদ্ধ করে নিস্পার গাল স্পর্শ করলো ত্রিজয় , মোলায়েম কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“শরীর খারাপ?”

নিস্পা রুক্ষ স্বরে উত্তর দেয়,

“যদি বলি মন?”

ত্রিজয় নিস্পার আরেকটু কাছাকাছি এসে বসলো,শুস্ক কন্ঠে বললো,

“তবে গান শোনাতে পারি,শুনবে।”

ভ্রুকুটি তুলে ঠোঁট উল্টে তাকালো নিস্পা,বললো,

“বলুন শুনি।”

গলা পরিস্কার করে গান ধরলো ত্রিজয়,নিস্পাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ধরলো গান,

“দু পায়ের মাঝ খানে আস্তে করে ঢুকালাম
দু পায়ের মাঝ খানে আস্তে করে ঢুকালাম
ঘট করে চাপ দিয়ে মুখে ভরে নিলাম,,,,,,,,”

চলবে,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here