#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:55
ভেতর ভেতর ক্রোধের পাহাড় জমিয়ে থমথমে স্বাভাবিক মুখ নিয়ে দরজা খুলল ত্রিজয়।দরজার বাইরে হোটেল ম্যানেজার সহ প্রায় আরও পাঁচ জনের মতো স্টাফ। বিরক্ত আর বিস্ময়ের ভঙ্গিমায় সবার আপদমস্তক পরখ করলো ত্রিজয়।চাপা ক্রোধ মিশ্রিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে?”
হোটেল ম্যানেজার এগিয়ে এসে নতজানু হলো, অত্যন্ত বিনয়ী কন্ঠে বললো,
“সরি স্যার। আপনাদের প্রাইভেসি নষ্ট করার জন্য আমরা দুঃখিত।কিন্তু আপনাকে না ডাকা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না।”
বিরক্তিতে কপাল কুচকে এলো ত্রিজয়ের, কন্ঠে কিঞ্চিৎ রূঢ়তা টেনে বললো,
“কি বলবেন সেটা বলুন।”
হোটেল ম্যানেজার আইঢাই করে আমতা আমতা করে বললো,
“আসলে এই মূহুর্তে আপনাদের এই রুম টা ছাড়তে হবে।”
“কেন?”
ত্রিজয় চটে গেলে ম্যানেজার সাবলীল কন্ঠে বললো,
“কারণ এই রুমটা এমপি তাওসিফ তাকরিমের পছন্দ হয়েছে, তাই উনি পুরো ফ্লোর খালি করে দেওয়ার ওয়ার্ডার দিয়েছেন।”
ম্যানেজারের কথা শুনে ত্রিজয়ের বিরক্তিভাব আরেকটু বেড়ে গেলো,রূঢ় কন্ঠে সহসা প্রশ্ন ছুড়ে বললো,
“আপনারা কি মামা বাড়ির আবদার নিয়ে এসেছেন?আপনাদের এমপিকে গিয়ে বলুন কাল সকালের আগে এই রুম আমি ছাড়বো না।”
“কিন্তু স্যার,আপনাকে এই রুমটা ছাড়তে হবে।”
ধিরে ধিরে কঠিন হয়ে উঠলো ত্রিজয়ের অভিব্যক্তি, জোড়ালো গলায় বলল,
“ছাড়বো না বলেছি ছাড়বো না,দেখি কোন বাপ এসে এই রুম থেকে বের করতে পারে আমাকে।”
“কোন বাপের দরকার নেই জনাব।আপনাকে এখান থেকে বের করার জন্য তাওসিফ তাকরিম নিজেই যথেষ্ট।”
চেনা কন্ঠের সাথে ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাড়ালো এমপি তাওসিফ তাকরিম।ত্রিজয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো,দাঁতে দাঁত পিষে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
“বাহ!এমপি মশাই নিজেই হাজির?কবে থেকে এতো স্পেশাল হয়ে গেলাম আমি।”
তাকরিম ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো, বক্র কন্ঠে বললো,
“আপনি তো স্পেশাল বটেই।তবে আমার পাশে দাড়ানোর জন্য নয়,আমার পায়ের নিচে থাকার জন্য।”
ত্রিজয় ভ্রুকুটি তুলে বললো,
“ওহ আই সি।বাট, আমি যার পায়ের নিচ দিয়ে যাই তার পা ভেঙে সোজা মাথায় চড়ে বসি।এখন আপনার টা ভেঙে গেলে কি হবে বলুন তো এমপি মশাই?”
“পঁচা শামুকে পা কাটার অভ্যাস আমার নেই, ব্রেন্ডের জুতোর নিচে ডিরেক্ট পিষে ফেলি।”
“আমি তো অতো নির্ভোদ প্রজাতি নয় মশাই।আমি বিষাক্ত সাপ,যার বিষ আপনার পায়ের নখে লাগলেই পুরো শরীর গ্রাস করবে দু সেকেন্ডে।”
“সাপের বিষ দাঁত ভাঙার অভিজ্ঞতা আছে আমার।বিষের ভয় আমার লোমও স্পর্শ করতে পারবে না।”
“অথচ আমিই প্রথম যে আপনার সবচেয়ে দামি জিনিসটাকে গভীর ভাবে স্পর্শ করে দিলাম।”
তুরন্ত রাগে দপদপ করে উঠলো তাকরিমের মস্তিষ্ক,ক্রোধের বষবর্তি হয়ে ত্রিজয়ের মুখোমুখি হয়ে বললো,
“জানোয়ার ভদ্রভাবে কথা বল।”
ত্রিজয় জ্বলন্ত চোখে তাকালো তাকরিমের দিকে,রক্ত জমাট কন্ঠে বললো,
“আমি জন্ম থেকেই অভদ্র।”
তাকরিম দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
“আলেকজান্দ্রা কোথায়?”
ত্রিজয় লাজুক ভঙিতে মাথা চুলকে বললো,
“আমার বউ আমার বেডরুমেই থাকার কথা,যদিও এতোক্ষণ আমার উন্মুক্ত বুকের ভেতরেই ছিলো।”
“আমার আলোর সাথে কি করেছিস তুই?”
রাগে ভিষণ ক্ষেপে উঠলো তাকরিম,অথচ ত্রিজয় খাপছাড়া ভঙিতে বললো,
“বেশি কিছু না এমপি মশাই,প্রথমে দুটো মিসডকল দিয়েছি,তারপর কল ঢুকলো,ভালোভাবে কথা বলার আগেই রিচার্জ শেষ।আমার বউজান একটু বেশিই দূর্বল।”
তাকরিম নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে দু হাতে টেনে ধরলো ত্রিজয়ের কলার,ক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো,
“কুত্তার বাচ্চা আমার আলোকে নিয়ে আর একটা নোংরা কথা বলবি না।”
ত্রিজয় গা ছাড়া ভাব নিয়ে বললো,
“কি আমার আমার লাগিয়ে রেখেছেন তখন থেকে?শুনুন, পৃথিবীতে নিজের বলতে কিচ্ছু নেই।যেটাকে নিজের ভাবা হয় সেটাও অন্যের জন্যই দাঁড়ায়।”
তাকরিম এক হাত ত্রিজয়ের কলারের উপর রেখে আরেক হাতে ঘুষি তুললো ত্রিজয়ের নাক নরাবর,হিংস্র বাঘের ন্যায় হুংকার করে বললো,
“শালা মাদারফা*কার।আমি তোকে,,,
” কি হয়েছে?কে এ,,,,,,”
ভেতরের ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে ঠিক ত্রিজয় আর তাকরিমের মুখোমুখি হয়ে দাড়ালো নিস্পা।
নিস্পার কোমল ত্বক, ভেজা স্নিগ্ধ চুল আর চোখের দিকে তাকাতেই শরীর জুড়ে একটা প্রশান্তি বয়ে গেলো তাকরিমের।হাতের মুঠো নরম হয়ে এলো চোখের ভাষা পরিবর্তন হলো মেঘলা দিনে হটাৎ আকাশ পরিবর্তন হওয়ার মতো।
তাকরিম ছেড়ে দাড়ালো ত্রিজয়ের কলার।তারপর উপস্থিত বাকি সবার উদ্দেশ্যে হুকুম করে বললো,
“গেট আউট।পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে পুরো ফ্লোর খালি করো।কুইক।”
যেই কথা সেই কাজ,কেউই দাঁড়িয়ে থাকার সাহস দেখালো না আর,দু সেকেন্ডের মধ্যেই খালি হয়ে গেলো পুরো ফ্লোর।নিস্তব্ধতা আর উপস্থিত তিনজনের ভারি নিঃশ্বাস ব্যাতিত আর কিছু শোনা গেলো না আপাতত।
তাকরিম ধিরে ধিরে এগিয়ে এলো নিস্পার দিকে।অনুভুতি শুন্য দুচোখ ভরে দেখলো তার আলেকজান্দ্রা কে।তাকরিমকে এতো নিকটে দেখে অস্বস্তি বেড়ে গেলো নিস্পার,চিবুক নামিয়ে আওড়াল,
“আ,,আপনি?”
তাকরিম বুক ধুকপুক করে উঠলো,এক অজানা দহনে ভেতরটা ভস্ম হতে শুরু করলো আচমকা।সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ফুল টা তার অথচ সে দাবি করতে পারছে না।ক্ষমতা টাকা পয়সা কোন কিছুর বিনিময়েই এই একটা ফুলকে জয় করার সামার্থ তার হলো না।ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস এবারেও তকে ঠকালো, ভিষন বাজেভাবে ঠকালো।কথা গুলো ভাবতেই হাড়ভাঙা যন্ত্রনা চেপে ধরলো বক্ষপট,বেদনা বিধুর কন্ঠে বললো,
“তুই আর আমার নেই আলেকজান্দ্রা।তবুও আমি তোকে পেতে চাই।এটা আমার অভিশাপ নাকি হৃদয়ের ক্ষুদা?”
না চাইতেও হু হু করে কেঁদে উঠলো নিস্পার হৃদয়,কেমন একটা হাহাকার ছুটে বেড়ালো রক্তের শিরায় উপশিরায়,কেন যানি কৈফিয়ত দিতে ইচ্ছে করলো ভিষণ, আমতা আমতা করে বলতে চাইলো,
“আপনি আসলে যা ভাবছেন,,,,,,
তাকরিম নিরব দৃষ্টি বুলালো নিস্পার ভেজা বদনে।মাত্রই স্নান শেষ করে এসেছে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে।বিরাগী দৃষ্টিতে নিস্পার আপদমস্তক পর্যবেক্ষন করতেই বুকের ভেতর রক্ত জমাট বাধার মতো থমকে গেলো তাকরিমের দৃষ্টি।নিস্পার বিউটিবোনে একাধিক লাল চিহ্ন।তাকরিম বড় কষ্টে তিক্ত ঢোক গিললো,নিস্পার শরীরে চিহ্ন গুলো যে ত্রিজয়ের দেওয়া ভালোবাসার চিহ্ন একটুও বুঝতে অসুবিধা হলো না তার।বেশ কয়েক জায়গায় লালচে দাগ হয়ে আছে,সদ্য ক্ষতের মতোই দগদগ করছে রক্ত জমাট বেধে।তাকরিমের বুকটা টিকটিক করে লাফাচ্ছে।সে খুব সাবধানে হাত বাড়িয়ে নিস্পা ভেজা চুলের গোছা সামনে এনে ঢেকে দিলো দাগ গুলো, ক্ষতবিক্ষত ব্যাথাতুর কন্ঠে বললো,
“তোমার কলঙ্ক আমি গোলাপের কাটার ন্যায় গোপন করিলাম,হাতে বিধবে যেনেও গ্রহণ করিলাম বীনাসর্তে।”
ততক্ষণে এগিয়ে এলো ত্রিজয়।এক হাত বাড়িয়ে তাকরিমের সামনে আঁকড়ে ধরলো নিস্পার বাহু।ঠান্ডা কন্ঠে নিস্পাকে বললো,
“ভেতরে যাও।”
নিস্পা ঠোঁট কামড়ে বলতে চাইলো কিছু,
“কিন্তু?”
“কোন কিন্তু নয়।আমার বউ পরপুরুষের সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকুক আমি চাইছি না।”
নিস্পা বিরক্তি প্রকাশ করে কটমট করে বললো,
“অধিকার দেখাচ্ছেন যে?”
ত্রিজয়ের অভিব্যক্তি শক্ত।সে কন্ঠে দৃঢ়তা রেখে একই ভাবে বললো,
“অধিকার আছে বলেই দেখাচ্ছি।গো নাও।”
নিস্পা ঠোঁট টিপে এক নজর তাকালো তাকরিমের দিকে।ভেতর ভেতর একটা অজানা টানাপোড়ন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে তাকে।তবে এই মূহুর্তে কোন প্রকার বাক্য ব্যয় করতে চাইলো না নিস্পা।দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ চলে গেলো ভেতরের ঘরে।
নিস্পা চলে যাওয়া মাত্রই ত্রিজয় তাকরিমের দিকে তাকিয়ে বললো,
“আপনি এবার আসতে পারেন এমপি মশাই।”
তাকরিমের বুকের ভেতরটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে।নিস্পার দর্শনে হাপর হাপর লাগছে সব।দুনিয়াটা কেমন গোল গোল ঘুরছে মাথার চারপাশে।সে ত্রিজয়ের দিকে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বললো,
“আমার সাথে এমনটা কেন করলি?”
তাকরিমের অসহায়ত্বে পৈচাশিক আনন্দ লুপে নিলো ত্রিজয়,তাচ্ছিল্যের সুর তুলে বললো,
“আপনি আমার শালা না সমুন্ধি যে আপনার সাথে এমনটা করা যাবে না?”
“ওকে আমি আগে ভালোবেসেছিলাম।”
“তাতে কি?জয় তো আমিই করলাম।”
“এটাকে জয় বলে না প্রতিহিংসার রেশে ছিনিয়ে নেওয়া বলে।”
“ধরে নিন সেটাই,প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসা দুটোতেই ওকে আমার চাই।”
তাকরিম চুপ করে গেলো।তারপর শক্ত কন্ঠে বললো,
“আমি আমার বাবাকে তোর হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত।”
তাকরিমের কথায় পুনরায় তাচ্ছিল্য হাসলো ত্রিজয়,ব্যাঙ্গ কন্ঠে বললো,
“বুঝুন এমপি মশাই, আমার হাতে ঠিক কি আছে?যার জন্য স্বয়ং এমপি তার বাবার বিভৎস অতীতের পর্দা ফাস করে দিতে চাইছে।আমি এমন রত্ন হাতছাড়া করি কি করে বলুন তো?”
“এটাই তো তোর উদ্দেশ্য ছিলো, এটার জন্যই তো আমার আলেকজান্দ্রার পেছনে পরে আছিস তুই।”
“উদ্দেশ্য যাই হোক,ওকে আমি আর ছাড়তে পারছি না এমপি মশাই।”
“আমি কিন্তু খারাপ করে ফেলবো।”
“আর কি খারাপ করার বাকি আছে আপনার?যা খারাপ করার সেটা আপনার বাপ করে দিয়েছে।আমার খারাপ হওয়ার মতো কিচ্ছু বাকি নেই।”
তাকরিমের রাগের প্রলেফে ঢাকা পড়লো নিস্পাকে হারানো অসহায়ত্ব,ক্রোধ ছড়িয়ে পড়লো শিরায় শিরায়,দাঁতে দাঁত পিষে ডেবিল কন্ঠে বললো,
“আছে, তোর এই ইউজলেস জীবন টা এখনো বাকি আছে,কুত্তার মতো তড়পিয়ে তড়পিয়ে মারবো বলে দিলাম।”
ত্রিজয় ক্রুর হাসলো, শিতল কন্ঠে বললো,
“আপনাকে তড়পানোর হাতিয়ার তো আমার হাতে,কিন্তু আমাকে তড়পানোর মতো কোন হাতিয়ার তৈরি হয় নি মনে হয়।”
“আমার জন্য তৈরি করা হাতিয়ারটাই কেড়ে নিয়ে সোজা গলার রগ কেটে দিবো তোর।”
ত্রিজয় নিম্নাষ্ঠো বাকালো কিঞ্চিৎ,বিদ্রুপ স্বরে বললো,
“আপনাকে একটা এডভাইস দেই শুনুন।নিজের ঘরে গিয়ে জেগে জেগে স্বপ্ন দেখুন কীভাবে কেড়ে নেওয়া যায়।আমি আমার বাকি বাসর টুকু সেরে নেই কেমন?”
ত্রিজয় ঠাস করে তাকরিমের মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলো,তাকরিম ক্ষোভে আক্রোশে পান্স মারলো দরজার উপর,ওপাশ থেকে আগুনঝরা কন্ঠে চেচিয়ে বললো,
“কুত্তার বাচ্চা আমার আলোকে স্পর্শ করবি না।”
ত্রিজয় দুই ঠোঁট গোল করে শিশ বাজাতে বাজাতে বললো,
“আমি আমার বউকে অনেক কিছুই করবো এমপি মশাই,আপনার আলোর প্রতি আমার এক চুলও ইন্টারেস্ট নেই।”
___________
হসপিটালের পেছনের রোডে দাঁড়িয়ে আছে অনু।যেখানে কিছুক্ষণ আগেই তাকে আনা হয়েছিলো তার অর্গান গুলো খুলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে।যদি কিয়ান সময় মতো না বাঁচাতো তাহলে এতোক্ষণে তাকে মেরে লাশ টা গুম করার কাজটাও হয়ে যেত বোধহয়।
প্রথমে বিশ্বাস হয় নি অনুর।কিন্তু কিয়ান যখন জলজ্যান্ত কতগুলো প্রমাণ দেখালো সেগুলো কে অস্বীকার করার পথ রইলো না আর।মনটা বিষিয়ে এলো তার।তাকরিমের এমন জঘন্য পরিকল্পনার কথাটা যতবার ভাবছে ততবারই বুকের ভেতরটা চৌচির হচ্ছে অদ্ভুত জ্বালাপোড়ায়।
পাশেই নির্বিকার ভঙিতে একের পর এক সিগারেট টানছে কিয়ান।এই যে অনু বিষন্ন মনে এতোক্ষণ ধরে কেঁদে কেটে অস্থির হলো সেদিকে একবারও তাকালো না লোকটা।একটু সান্ত্বনাও প্রকাশ করলো না । এতোক্ষণে কিয়ানের ব্যাপারে যতটুকু ধারণা হয়েছে অনু বেশ ভালো করেই বুঝে গেছে লোকটা একঘেয়ে দাম্ভিক, অহংকারে পা মাটিতে ফেলে না এমন একজন মানুষ।
কিয়ানের দিকে এক নজরে তাকিয়ে থেকেই ফুফিয়ে উঠলো অনু,হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে বিমর্ষ কন্ঠে বললো,
“এমপি মশাই কোথায় আছে আপনি জানেন?”
কিয়ান একই ভঙিতে সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বললো,
“না জানার কথা নয়।”
সেই প্রথম থেকে কিয়ানের এই বাঁকা বাঁকা কথাগুলো শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছে অনু।এই যে সুন্দর একটা প্রশ্নের বিপরীতে এমন বাঁকা উত্তর দিবে কল্পনা করে নি সে,যদিও কল্পনা না করে ভুলই করেছে।এই অহংকারী তেড়া লোকের থেকে এর চেয়ে ভালো উত্তর আশা করা যায় না।অনু ভিষণ বিরক্ত হয়ে বললো,
“সোজা সাপ্টা কথা বললে কি আপনার হজমে সমস্যা হয়?”
কিয়ান গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“আমার কথা তোমার মতো নির্বোধের মাথায় ঢুকবে না।”
“আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন কেন এটা বলুন তো।”
“বাচিঁয়েছি কারণ তুমি রুপাঞ্জেলের ফ্রেন্ড।”
অনু কপাল কুচকে তাকালো,চোখ ছোট ছোট করে অস্পষ্ট আওড়াল,
“তো?”
কিয়ান সিগারেটের শেষ অংশটুকু ছুড়ে ফেলে পায়ের নিচে পিষতে পিষতে ভরাট কন্ঠে বললো,
“তো তোমার গলায় ছুড়ি ধরে আমি রুপাঞ্জেলকে নিজের করে নেওয়ার একটা চান্স নিতে চাই।”
কিয়ানের কথা শুনে কান ঝাজিয়ে উঠলো অনুর,ঘৃনায় তেঁতো হয়ে এলো কণ্ঠনালি,
“ছিঃ, আপনি এতো জঘন্য।আমাকে মারার জন্য আমাকে বাঁচানোর কি প্রয়োজন ছিলো।”
কিয়ান শান্ত অভিব্যক্তিতে চেপে ধরলো অনুর চিবুক,ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
“আমি এর চেয়েও জঘন্য, বাট যখন তখন রিভিল করি না।”
অনু টুপ করে চোখের পানি ছেড়ে দিলো, নিজের জীবনকে বড্ড অসহায় লাগছে তার,সে সরাসরি কিয়ানের চোখের দিকে তাকালো,অস্পষ্ট করে বললো,
“মারার দরকার হলে মেরে ফেলবেন না হয়,কিন্তু একটা শেষ ইচ্ছে পূরণ করে দিন প্লিজ।”
কিয়ান ছুড়ে ফেলার মতো অনুর চিবুক ছেড়ে দিয়ে কঠোর কন্ঠে বললো,
“আমি কারো ইচ্ছে পূরণের দায়িত্ব নিয়ে বসি নি।”
অনু পড়তে গিয়েও সামলে নিলো নিজেকে, শক্ত কন্ঠে বললো,
“কিন্তু আপনাকে এটা করতেই হবে।”
“নো ওয়ে।”
“এমপি মশাই এর সাথে দেখা করিয়ে দিন না আমাকে।”
“বিনিময়ে কি পাবো?”
“বিনিময়?”
“বিনিময় ছাড়া কিচ্ছু হবে না।”
“ওকে, নিস্পাকে পেতে হেল্প করবো।”
“যেমন?”
“যেমন আমি ফোন করে যদি নিস্পাকে বলি আমি বিপদে আছি ও উড়ে উড়ে চলে আসবে।এন্ড তখন আপনি খুব সহজে নিস্পাকে পেয়ে যাবেন।”
কিয়ান বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো, এর মাঝে শেষ করল আরও একটি সিগারেট।অনু চুপচাপ মুখিয়ে রইলো কিয়ানের উত্তর শোনার জন্য।মিনিট দুয়েক কাটার পর অনুকে অবাক করে দিয়ে কিয়ান চট করেই চেপে ধরলো অনুর হাত,শর্টকাট উত্তরে বললো,
“ওকে। ডান।চলো এমপির সাথে দেখা করাবো।”
অনু ভড়কালো প্রথমে, তারপর কিয়ানের কথার মানে বুঝতে পেরে বললো,
“হু”
গাড়িতে উঠতে নিয়েও থামলো কিয়ান,কিছু একটা চিন্তা করে বললো,
“লিসেন।”
অনু উদ্বিগ্ন কন্ঠে আওড়াল,
” কি ?”
কিয়ান চোয়াল শক্ত করে,গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“রুপাঞ্জেলের বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে ওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলে তুমি।তোমার দ্বারা আমার রুপের বড় কোন ক্ষতির সম্ভাবনা আছে।ওর ক্ষতি থেকে নিজেকে বাচিঁয়ে রাখবে,নয়তো আমি তোমার বড়সড় ক্ষতি করে দেবো।”
কথাটা বলেই হনহনিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো কিয়ান।অনু থ মেরে দাঁড়িয়ে থেকে বিরবির করে বললো ,
“যাহ বাবা।যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর।”
___________________
রাত তখন আটটা।শহরের পথ জমজমাট।নিস্পাকে নিয়ে লং ড্রাইভে বের হয়েছে ত্রিজয়।যদিও নিস্পা এ ব্যাপারে কিছুই যানে না।জরুরি দরকার আছে বলে নিস্পাকে সাথে নিয়ে বেড়িয়েছে।নিস্পাকে ফ্ল্যাটে একা রেখে বের হওয়ার ভরসা পায় নি একদম,যদি সুযোগ পেয়ে এমপি মশাই আবার আসে এই চিন্তায় আর নিস্পাকে একা রেখে আসা হয় নি।
কোলাহল থেকে গাড়ি হাইওয়ে রোডে উঠতেই জানালা দিয়ে মাথা বেড় করলো নিস্পা।চোখ বন্ধ করে খোলা বাতাসে নিশ্বাস ছাড়লো কিয়ৎক্ষন।ত্রিজয়ের উদ্দেশ্যে বললো,
“কোথায় যাচ্ছেন?”
ত্রিজয়ের মুখের ভাব গম্ভীর,সে ভরাট কন্ঠে বললো,
“কাঁচি কিনতে।”
নিস্পা চোখ উল্টে তাকালো,জানালার দিক থেকে মাথা তুলে তাকালো ত্রিজয়ের মুখের দিকে,অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“হটাৎ কাঁচির দিয়ে কি করবেন?”
“ভাবছি নিজের জমি নিজেই পরিস্কার করবো,আগাছা থাকলে চাষ করতে অসুবিধা হবে।ভালো চাষ না হলে ফলনও হবে না,চারটা বাচ্চার আশা হতাশায় বদলে যাবে।লস আর লস।এতো লস কি করে হতে দেই বল।”
ত্রিজয়ের অভিব্যক্তি এবারেও নির্বিকার।এই যে এতো বড় একটা বাক্য বিশ্লেষণ করলো তার মাঝে কোন প্রতিক্রিয়াই নেই।যেন মনে হচ্ছে সামান্য একটা সাধারণ কথা বলেছে মাত্র।
অথচ নিস্পা মোটেও কথাটা সাধারণ ভাবে নিতে পারলো না,কথার মানে পরিস্কার করে বুঝতে না পেরে তিরিক্ষি কন্ঠে আওড়াল,
“আপনার কথা নোংরা? নাকি আমার ভাবনা নোংরা?”
ত্রিজয় এবারেও দৃষ্টি সামনে স্থির রেখে,নরমাল টোনে বললো,
“একজন কৃষকের স্বপ্ন কখনো নোংরামি হতে পারে না।”
নিস্পা কটমট করে তাকালো, মেজাজ গরম করে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি ইনডিরেক্ট আমাকেই নোংরা বললেন তাই না?”
“ইদানীং তেমনই তো দেখছি।আমি একটা নিঃশ্বাস ফেললেও সাপের মতো মুচড়াতে থাকো।”
ত্রিজয়ের বেফাঁস কথায় অস্বস্তিতে পরে গেলো নিস্পা,বিব্রতকর কন্ঠে বললো,
“কিসব আজেবাজে কথা বলছেন।”
ত্রিজয় আচমকা নিস্পার হাতটা নিজের হাতের পৃষ্ঠে চেপে ধরে দলিতমথিত করতে শুরু করলো,তারপর নিজের অধরজোড়া নিস্পার কানের কাছে এগিয়ে এনে ফিসফিসিয়ে বললো,
“বাজে কথা কোথায়?আজকেও তো কেমন,,,,
লজ্জায় অস্বস্তিতে নিঃশ্বাস আটকে এলো নিস্পার,ত্রিজয়ের এমন হুটহাট ছোয়া কেমন কাবু করে নিতে চায় তার ভেতরটা।ত্রিজয়কে কথা শেষ করতে না দিয়ে হাসফাস করে উঠলো সে,ত্রিজয়ের মুখে হাত চেপে ধরে রাগান্বিত কন্ঠে বললো,
” থামবেন আপনি?গাড়ি থামান আমি নামবো।”
আচমকাই ত্রিজয়ের মুখের ভঙ্গি পাল্টে গেলো।ফর্সা কপালের ভাজ আর চোখের জ্বলন্ত অগ্নি রুপ চিন্তিত করলো নিস্পাকে।সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির স্প্রিড বেড়ে গেলো,সোজা রাস্তায় কেমন উন্মাদ পাগলা ঘোড়ার ন্যায় ছুটতে শুরু করলো ত্রিজয়ের গাড়ি।ত্রিজয় শক্ত হাতে ব্রেক চেপে আছে, অথচ গাড়ি ছুটে যাওয়া স্প্রিড দেখে মনে হচ্ছে গাড়ি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।নিস্পা ভয়ে সিটিয়ে গিয়েছে,এমন ভাবে চলতে থাকলে যেকোনো মূহুর্তে এক্সিডেন্ট করবে।নিস্পা শক্ত করে দু’হাতে চেপে ধরলো গাড়ির সিট,ভয়মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
“কি হলো? গাড়ি থামানোর বদলে স্প্রিড বাড়ালেন কেন?”
ত্রিজয় এক হাতে গাড়ির ব্রেক সামলে আরেক হাত বাড়িয়ে দিলো নিস্পার গালে, তারপর দ্রুত নিস্পার সিটবেল্ট খুলতে খুলতে বললো,
“গাড়ি ব্রেক ফেইল করেছে কলিজা।”
আঁতকে উঠলো নিস্পা,আতংকের তোপে কন্ঠনালি কেঁপে উঠলো তার,
“কিহ!এখন কি হবে?আমরা তো মরে যাবো।”
নিস্পার সিট বেল্ট খুলে নিস্পাকে টেনে এনে নিজের বক্ষে জড়িয়ে নিলো ত্রিজয়,স্বাভাবিক স্বরে বললো,
“অসম্ভব।বাসর করার আগে তোমার কিচ্ছু হতে দিবো না আমি।
এমন দূর্দর্শ পরিস্থিতিতে ত্রিজয়ের এমন খাপছাড়া কথা নিতে পারলো না নিস্পা,তেঁতে উঠে বললো,
” এই মূহুর্তে মমশকরা করছেন আপনি?”
“উঁহু ভরসা করতে বলছি।”
“এই মূহুর্তে ভাগ্যকেও ভরসা করতে পারছি না আমি,আপনাকে তো নয়ই।”
ত্রিজয় নিস্পাকে শক্ত করে আগলে নিয়ে নিস্পার কপালে চুমু খেলো,খুব শান্ত কন্ঠে বললো,
“কুল ডাউন কলিজা।আমি তোমার হাসবেন্ড,একমাত্র ভরসার কাঁধ, যে কাঁধে নিঃসঙ্কচে পা তুলে দেওয়া যায়।আর তুমি কিনা সামান্য হাত রাখতে ভয় পাচ্ছো।”
সহ্যের সীমা অতিক্রম করলো নিস্পা,রাগে আগুন হয়ে তাকালো ত্রিজয়ের দিকে,উষ্মা কন্ঠে বললো,
“আপনি পাগল?মাথা নষ্ট লোক আর কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িটা এক্সিডেন্ট করবে,এই পরিস্থিতিতেও নোংরামি করা লাগবে?”
ত্রিজয় স্পষ্ট জবাবে বললো,
“বললাম না বাসর করার আগে কিচ্ছু হতে দেবো না তোমার, চুপ করে বসে থাকো।”
গাড়ির লাগাম ছাড়া অনিয়ন্ত্রিত গতিতে ধড়ফড়িয়ে উঠলো নিস্পা,মাত্রই একটা ট্রাকের সাথে ধাক্কা খেতে খেতে বেসেছে,আর কতক্ষণ এভাবে টিকে থাকবে যানে না সে,ভয়ে কান্না চলে এলো নিস্পার, মনে মনে উপর ওয়ালার কাছে প্রার্থনা করে বললো,
“ওহ খোদা।এই পাগলের হাত থেকে আজকের জন্য বাঁচাইয়া দেও।”
নিস্পার চোখে পানি দেখে ভ্রু গোটালো ত্রিজয়,খুব দক্ষ হাতে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রচেষ্টা চালাতে চালাতে বললো,
“কাঁদতেও পারো?”
নিস্পা হাতের পৃষ্ঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে নাক টানলো, অস্ফুটে বললো,
“কেন?”
ত্রিজয় ভনিতা বিহীন নিরেট কন্ঠে বললো,
“সময় মতো না কাঁদলে এই কান্নার কি দাম?হুদাই নিজের পারফরম্যান্সের উপর সন্দেহ হচ্ছিলো এতোক্ষণ।”
“ছিঃ আপনার মুখে ঠাডা পড়ুক।”
“ঠাডা তো পড়েই আছে, মুখে না পরুক বাসরে তো পড়েছে।ডিপজলের মতো অভিশাপ দেওয়া বন্ধ কর।”
“আপনি সালমান শাহ এর মতো ভাব নেওয়া বন্ধ করুন।আর কিছুক্ষণের মধ্যে উপরে চলে যাবেন সেই ভয় তো চোখে দেখছি না।”
নিস্পাদ কথার মাঝেই ত্রিজয় হাত বাড়িয়ে গাড়ির দরজা খুলে ফেললো,ত্রিজয়ের বাহুর নিচে নিস্পার মুখ চাপা পড়তেই ব্যাথায় বিরক্তি প্রকাশ করলো নিস্পা,
” উফফ!কি করছেন?
ত্রিজয় দরজার লক টা খুলে,নিস্পার দিকে তাকিয়ে বললো,
” পুরোটা খুলে ফেলো কলিজা,জাম্প করতে ইজি হবে।”
নিস্পা ভয়ে ভয়ে গাড়ির দরজাটা খুলে দিলো,পাশেই বড় একটা নদী,ত্রিজয় এই নদীতেই জাম্প করতে বলছে নাতো তাকে?ভয়ে গলা শুকিয়ে এলো নিস্পার অসম্মতি জানিয়ে বললো,
“অসম্ভব! আমি পারবো না।”
ত্রিজয় নিজের ঠান্ডা হাতটা নিস্পার গালের উপর রেখে বললো,
“কাম অন কলিজা।আমি হেল্প করছি।”
নিস্পা শুকনো ঢোক গিললো বাইরের দিকে তাকাতেই পিলে চমকে উঠলো তার,পুনরায় অসম্মতি জানিয়ে বললো,
“উহু,আমার ভয় লাগছে।”
ত্রিজয় ব্রেক ছেড়ে দিলো,গাড়িটা অজানা গন্তব্যের দিকে ছুটছে,আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এক্সিডেন্ট করবে,ত্রিজয়, নিস্পাকে জড়িয়ে ধরলো দু হাতে, নিস্পার মুখটা বুকের ভেতর চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বললো,
“এই জাম্পিং টা করতে পারলে ভবিষ্যতে আরও অনেক জাম্পিং করার সুযোগ পাবে।আমাকে শক্ত করে ধর।”
ত্রিজয়ের কোনরকম কথা শোনার মতো মানসিকতা এই মূহুর্তে নেই নিস্পার,সে চোখ বন্ধ করে দুই হাতে খামচে ধরলো ত্রিজয়ের শার্ট,ভয় জড়ানো কন্ঠে বললো,
“ভয় লাগছে প্লিজ।”
ত্রিজয় নিস্পাকে নিয়ে ঝুঁকলো,গাড়ি ঠিক নদীর কিনার ঘেঁষে যাচ্ছে, এটাই জাম্প করার মোক্ষম সুযোগ।ত্রিজয় নিস্পাকে সামলাতে ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
“কিচ্ছু হবে না।চোখ বন্ধ কর।যা করার আমি করছি।ওকে?”
ত্রিজয় ধিরে ধিরে বুক থেকে নিস্পার মাথাটা তুললো, নিস্পার অশ্রুশিক্ত ভীত লোচনের দিকে তাকিয়ে আওড়াল,
“আর ইউ রেডি কলিজা?”
নিস্পা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিইয়ে বললো,
“হু।”
“লা হাওলা ওয়ালা কু ওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।”
দোয়াটা পড়েই বুক ফুলিয়ে শ্বাস টানলো ত্রিজয়।অতঃপর নিস্পার ঠোঁটের মাঝে ঠোঁট ডুবিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিলো তাকে।গাড়িটা ছুটে গিয়ে একটা লড়ির সাথে ধাক্কা খাবে ঠিক সেই মূহুর্তে নিস্পাকে নিয়ে গাড়ি থেকে লাফ দিলো ত্রিজয়।
একটা বিকট শব্দের সাথে নদীতে গিয়ে পড়লো নিস্পা, বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো দুটো হাত দুটো দেহ।ত্রিজয় শত চেষ্টা করেও ধরে রাখতে পারলো না নিস্পাকে।গাড়ি থেকে জাম্প করার সময় রাস্তার মোটা পিলারের সাথে গিয়ে বাড়ি খেয়ে ছিটকে গেলো ত্রিজয়,
হাত ফস্কে বেড়িয়ে গেলো নিস্পা।ত্রিজয় গুরুতর রক্তাক্ত হয়ে রয়ে গেলো মেইন রোডে।আর নিস্পা ছিটকে গিয়ে পড়লো নদীতে।
প্রায় দু মিনিটের মতো পানির নিচে শ্বাস আটকে ডুবন্ত অবস্থায় রইলো নিস্পা।চোখের সামনে ভেসে উঠলো তার নিজেরই এক বিভৎস অতীত।অন্ধকার আর অন্ধকার, সব অন্ধকারের মাঝে ডানা ঝাপ্টে উড়ে এলো সত্যবীনা পাখি,অদ্ভুত স্বরে ডাকলো,
“ফ্লোরেন্সা।ও ফ্লোরেন্সা।মনে পড়ে গো?মনে পড়ে ব্রিটিশ পুত্র প্রিন্স জোসেফের কথা?”
নিস্পার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠলো সব।প্রিন্স জোসেফের নিষ্ঠুর তম আঘাত, অত্যাচার নির্যাতনের দৃশ্যগুলো এক এক করে মনে করতে লাগলো নিস্পা।
সত্যবীনা পাখি ফের ডাকলো,চিকন স্বরে বললো,
“ফ্লোরেন্সা।ও ফ্লোরেন্সা। মনে পড়ে গো?মনে পড়ে তোমার আইরিশ ভাই এর কথা?”
নিস্পার চোখের সামনে দৃশ্য পরিবর্তন হয়।দেখা মিলে সেই বকুল গাছের।মনে পরে সেই ফুল কুরানো রাতের কথা, যেখানটায় আইরিশ ভাই দাঁড়িয়ে থেকে বলেছিলো সে বকুল ফুলের মতো নিস্পাপ।আর?আর সেই আলেকজান্দ্রা খচিত আংটি?যে আংটিটা আইরিশ ভাই তার সারা জীবনের উপার্জনের টাকায় কিনেছিলো সেই আংটিটার কথা মনে পড়তেই ঝরঝর করে কেঁদে উঠে নিস্পা।
ডুবন্ত পানি থেকে উপরের দিকে উঠে মুখ হা করে শ্বাস টানে,দিকভ্রান্ত হয়ে নদীর পানিতে সাতার কাঁটতে কাঁটতে খুজে ত্রিজয়কে,
“ত্রিজয়?ত্রিজয় কোথায় আপনি?ত্রিজয়।”
পরক্ষণেই নিজের কাজে নিজেই থমকে যায় নিস্পা,পাগল উন্মাদের মতো আওড়ায়,
“আমি ফ্লোরেন্সা,আপনাকে কেন খুজবো?আপনার মৃত্যুতে তো আমার খুশি হওয়ার কথা।আপনি কি মরে গেছেন?যা ইচ্ছে হোক, আমি আপনাকে খুজবো না।”
সাঁতরে নদীর কিনারায় এলো নিস্পা।কিন্তু মন কিছুতেই মানছে না।ত্রিজয়কে খুঁজে না পেয়ে অদ্ভুত ভাবে দহন শুরু হয়েছে ভেতরে,সে কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারলো না।আবারও ঝাপ দিলো নদীতে,ত্রিজয়কে খুঁজতে খুঁজতে চেচালো,
“কোথায়?কোথায় আপনি?”
মস্তিষ্কের দ্বন্দে পাগল পাগল লাগছে নিস্পার।ত্রিজয়কে ডাকলেই মনে পড়ে যাচ্ছে সে কয়েক যুগ আগের প্রিন্স জোসেফকে, তার করা অমানবিক নির্যাতন গুলোকে।
নিস্পা ছটপট করে উঠলো।মাঝ নদীতে সাতার কাঁটতে কাঁটতে কিনারায় আসতে ভুলে গেলো সে,চোখে মুখে অন্ধকার দেখলো।ফিরে আসার পথ খুঁজে পেলো না।কি করবে কি না করবে ভাবতেই মস্তিষ্ক দুভাগ হয়ে এলো,বুকটা ফেটে এলো যন্ত্রনায়।সে আকাশ কাপিয়ে চিৎকার করে ডাকলো,
“আইরিশ ভাই।কোথায় আপনি।আমি পুনরায় পথ হারিয়ে গন্তব্য ভুলেছি।আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলুন।”
_____________
ইভানদের গাড়ি মাত্রই বরিশালে ঢুকেছে।তবে লোকেশনে পৌছাতে আরও ত্রিশ মিনিটের মতো লাগবে।সাথে চিত্রা আছে,দুজন একসাথেই এসেছে বরিশাল।ইভানকে পেয়ে চিত্রা তার ড্রাইভারকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে,আপাতত গাড়ি ড্রাইভিং করছে ইভান,আর পাশের সিটে বসে ইভানকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছে চিত্রা।ইভানের দৃষ্টি লুকিং গ্লাসের দিকে,সেখানটায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে চিত্রার মুগ্ধ দুখানা চোখ।অথচ ইভান খুব একটা আমলে নিলো না বিষয় টা,বরং দুস্টুমি করে বললো,
“পুরুষ মানুষ কখনো দেখো নি? নাকি আমার মতো হ্যান্ডসাম পুরুষ দেখো নি?”
ইভানের বিব্রতকর প্রশ্নে কিঞ্চিৎ ভড়কায় চিত্রা,পরপরই নিজেকে সংযত করে দৃষ্টি ঘুরিয়ে বলে,
“নিজেকে হ্যান্ডসাম মনে করেন আপনি?”
ইভান মুচকি হেসে ঠোঁট টিপে উত্তর দিলো,
“তোমার চোখ তো তাই বলছে।”
চিত্রা ঠোঁট উল্টে প্রশ্ন করলো,
“চোখের ভাষা বুঝেন নাকি আপনি?”
“অবশ্যই।”
“তাহলে বলুন তো, এই মূহুর্তে আমার চোখ কি বলছে?”
ইভান এক হাতে স্টেয়ারিং চেপে ধরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো চিত্রার চোখের দিকে,তারপর অপকটে বললো,
“উমম,বলছে ‘ইস এই সুদর্শন লোকটার মতো আমার যদি একটা বয়ফ্রেন্ড থাকতো?’কিন্তু আফসোস আমি ইভান এক পিসই আছি।”
চিত্রা অসন্তুষ্ট দৃষ্টিতে তাকালো ইভানের দিকে ,আকুল মনটা বেহায়ার মতো ভাবলো এই মন প্রান সব যে শুধু মাত্র এই লোকটাকে চায় কবে বুঝবে লোকটা?কবে বুঝবে সে ভালোবেসে ফেলেছে? যুগ যুগ আগের এক অনাকাঙ্ক্ষিত সাক্ষাৎ এর প্রথম আলাপনেই ভালোবেসে ফেলেছে এই প্রানবন্ত চমৎকার মানুষটাকে।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল চিত্রা,নিজের কন্ঠে দৃঢ়তা টেনে বললো,
“নিজেকে স্মার্ট ভাবছেন?”
ইভান ঠোঁট কামড়ে হেসে উত্তর দিলো,
“উঁহু ওভার স্মার্ট।”
চিত্রা না চাইতেও ফের মুগ্ধ হয়ে তাকালো ইভানের হাসির দিকে,এই মানুষ টা বড্ড বেশি হাসে, যেখানে হাসার প্রয়োজন নেই সেখানেও হাসে।এতো হাসির কি আছে যেমন চিত্রা বুঝেনা ।তেমনি এই লোকটাকে বোঝাতে পারেনা হাসলে তাকে কতটা সুন্দর লাগে।
চিত্রাকে এক ধ্যানে চুপচাপ তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু নাচালো ইভান,ইশারায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি?”
চিত্রা নরম নিঃশ্বাসের ফাঁকে মৃদু কোমল সুর টেনে বললো,
“আপনি একদম বেশি কথা বলেন।”
ইভান নির্বিকার ভঙিতে বললো,
“এটা একটা গুন, সবাই বলতে পারে না।”
চিত্রা প্রত্যুত্তর করলো না আর,গাড়ির জানালার দিকে মুখ করে সিটে হেলান দিয়ে বসলো চুপচাপ।ইভান আর চোখে পরখ করলো চিত্রাকে। মনস্পটে ভেসে উঠলো অনুর চেহারাটা।কাল রাত থেকে মেয়েটাকে দেখা হয়নি এক পলক।ব্যাস্ততার ভারে মনেও পড়ে নি এপর্যন্ত।অথচ এখন হুট করেই ভেতরটা নড়ে উঠলো,অনুর ব্যাপারে কথা বলার জন্য ছটপট করে উঠলো জবান।চিত্রার নিস্তব্ধতার সুযোগ লুপে নিলো ইভান,ঘুরিয়ে পেচিয়ে বললো,
“বাই দ্যা ওয়ে এমপি মশাই যে মেয়েটাকে বাড়িতে আটকে রেখেছে মেয়েটার কি খবর?”
তরাগ করে ফিরে তাকালো চিত্রা।চমকপ্রদ চাহনিতে ইভানের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললো,
“মেয়েটার খবর নিতে চাইছেন নাকি আমাকে বোকা পেয়ে এমপি মশাই এর ইনফরমেশন লিক করাতে চাইছেন?”
ইভান সংক্ষিপ্ত উত্তরে বললো,
“যেটা ভেবে শান্তি পাও।”
চিত্রা গাড়ির সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে, চোখ বন্ধ করে বললো,
“সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালান,আমি আপাতত চোখ বন্ধ করে শান্তি পাবো।”
________________
রাত গভীর, চারপাশে নীরবতা।বাতাস শীতিল,মুষুলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে মিনিট পাঁচেক হলো।শুনশান রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে একটি কালো মার্সিডিজ।স্ট্রিটলাইটের ক্ষীণ আলোয় হালকা আলোকিত হচ্ছে অন্ধকার পথ।
বৃষ্টির ফোঁটা ঝাপটা মেরে পড়ছে গাড়ির কাঁচের উপর, ওয়াইপারগুলো অবিরাম ছন্দে দুলে যাচ্ছে,বৃষ্টির পানি সরানোর প্রচেষ্টায়। চাকার ঘর্ষণে জমে থাকা বৃষ্টির পানি ছিটকে পড়ছে দুই ধারে।
এমতাবস্থায় প্রায় বেশকিছুক্ষন ধরেই গাড়িতে বসে মুচড়া মুচড়ি করছে অনু।সরু পথ,গ্রামের ভেতর দিয়ে ঢুকেছে বোধহয়, এই গোমড়া মুখো বেড়ালকে গাড়ি থামাতে না বললে গাড়ি থামাবে না মনে হচ্ছে।তাই এক প্রকার বাধ্য হয়েই মুখ খুলল অনু,মিনতি করে বললো,
“গাড়ি থামান।প্লিজ প্লিজ গাড়ি থামান।”
কিয়ান গাড়ি থামালো না,স্টেয়ারিং এ হাত রেখেই ভ্রু উঁচালো,
“হোয়াট?”
অনু ঠোঁট টিপে চোরা চোখে চাইলো, আইঢাই করে বললো,
“ইয়ে মানে আমার এক পেয়েছে।”
অনুরা কথা বুঝতে না পেরে ঘাড় ঘুরালো কিয়ান,চোখ কুচকে আওড়াল,
“ওয়ান?”
বিরক্তির শ্বাস ফেলে বিরবির করলো,
“উফফস!কীভাবে বুঝাই।”
শুখনো ঢোক গিললো অনু,দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
“টয়লেট। টয়লেটে যাবো আমি।”
তৎক্ষনাৎ ক্ষুদ্ধ চোখে চাইলো কিয়ান,রাগে উষ্মা গলায় বলল,
“হোয়াট দ্যা হেল?রাত দুটো এখন।লুক আউটসাইড। এটা মনে হচ্ছে একটা গ্রাম।এখানে টয়লেট কোথায় পাবো?”
অনু তাকালো বাইরের দিকে।চারপাশে প্রবল বেগে বৃষ্টি অন্ধকারে অস্পষ্ট সব।তবে এই মূহুর্তে টয়লেট না যাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোন অপশন নেই,তাই উপায় না পেয়ে বলল,
“পাবো পাবো।একটু খুজলেই পাবো।প্লিজ প্লিজ।গাড়িটা থামান।”
কিয়ান গাড়ির স্প্রিড একই রেখে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“নো ওয়ে বৃষ্টি হচ্ছে।চেপে যাও।”
এপর্যায়ে ভিষণ রাগ হলো অনুর,ঝাজালো কন্ঠে বলে উঠলো,
“হোয়াট চেপে নেও?আই এম পেট ফেটে মরে যাবো।”
অনুর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকালো কিয়ান,বিরক্ত মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
“মাথায় সমস্যা? নাকি ইংলিশে কাঁচা?”
“সে যাই হোক।গাড়ি থামান।”
অনুর কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আচমকা ব্রেক চাপলো কিয়ান।গাড়ি থামিয়ে শুন্য অভিব্যক্তিতে গমগমে কন্ঠে বললো,
“গেট আউট। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফিরে না এলে চলে যাবো।”
অনু ঢোক গিলে বাইরে তাকালো,বৃষ্টি কমে এসেছে,কিন্তু ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিক।সে ভয়ে ভয়ে জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো,
“একা একটা মেয়েকে এই অন্ধকারে একা বের হতে বলছেন?”
“তো?”
“সাথে আসুন না।”
মেজাজ একশোতে একশো বিগড়ে গেলো কিয়ানের, দাঁতে দাঁত পিষে ধমকে বললো,
“এক থাপ্পড়ে গালের দাঁত ফেলে দেবো অসভ্য মেয়ে।”
কিয়ানের ধমক খেয়ে আমের আটির মতো চুপসে গেলো অনুর মুখ,মিনমিনিয়ে বললো,
“ওকে!ওকে! আমি একাই যাচ্ছি।”
ভাগ্য সহায় ছিলো অনুর।বেশি খোজাখুজি করতে হলো না,পাঁচ মিনিট খুজতেই একটা টয়লেট পেয়ে গেলো।কোন রকম নিজের কাজ সেরে বেড় হয়ে এলো কয়েক মিনিটের মধ্যে।শরীরটা হাল্কা লাগায় তেজ এলো হাঁটায়, দ্রুত পা ফেলে এগোতে লাগলো গাড়ির দিকে।
হাঁটার মাঝেই হটাৎ তার ওড়না টা আটকে গেলো কোন কিছুর সাথে ।যেন মনে হলো কেউ পেছন থেকে ওড়না টা চেপে ধরে রেখেছে।অনু চোখ বড়বড় করে ওড়নাটা চেপে ধরলো, ভয়ে খচখচ করছে তার বুক।শুনেছে গ্রাম অঞ্চলে ভূতের উপদ্রব থাকে,তারমানে কোন ভুত প্রেত ওর ওড়না টা চেপে ধরে নি তো?আতঙ্কের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে মেয়েটা আর নিজেকে সামলাতে পারলো না,গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বললো,
“ও খোদা গো,মা গো।”
অনুর চিৎকার কানে ভেসে আসতেই কপাল কুচকে এলো কিয়ানের,তেমন একটা গুরুত্ব না দিলেও,কি হয়েছে জানার জন্য বেড় হলো গাড়ি থেকে।দু পা এগোতেই অনুকে ভয়ে সিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো কিয়ান,আশপাশে তাকিয়ে বিপদে পড়ার মতো তেমন কিছু দেখতে না পেয়ে খিটখিটে কন্ঠে বললো,
“কি হয়েছে?”
অনু ভয়ে জড়সড়, কিয়ানকে দেখে কান্না বিজরিত কন্ঠে বললো,
“বাঁচান আমাকে, আমার ওড়না টা ভুতে ধরে রেখেছে।”
অনুর এমন উদ্ভট কথা শুনে চোয়ল চোয়াল বেঁকে এলো কিয়ানের,এগিয়ে গিয়ে দেখলো অনুর শিফন ওড়না টা একটা গাছের ডালের সাথে আঁটকে আছে।সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ খারাপ হলো কয়েকগুন।অনুর ভীত চেহারার দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে টান মাড়লো ওড়নাটা,জোড়ে টান বসানোর কারণে ওড়না ছিড়ে দুভাগ হয়ে গেলো, অথচ সেদিকে বিন্দু মাত্র তোয়াক্কা করলো না কিয়ান,ওড়নাটা ছিড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে অসহিষ্ণু কন্ঠে বললো,
“ওড়নাটা গাছের ডালে আটকেছে বেয়াদব মেয়ে।”
বুকের উপর থেকে ভারি পাথর নামার ন্যায় বড় শ্বাস ফেললো অনু,অতঃপর নিজের ছেড়া ওড়নাটার দিকে তাকিয়ে বিক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো,
“আপনি আমার ওড়নাটা ছিড়ে ফেলেছেন?”
কিয়ান চোখ মুখ শক্ত করে বিদ্রুপের স্বরে আওড়াল,
“সো হোয়াট?”
এতক্ষণে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিলো,বৃষ্টির হাল্কা ছাটেই ভিজে গিয়েছে অনুর শরীর। যার দরুন পড়নের সাদা কামিজ টা ভিজে লেপ্টে গিয়েছে শরীরের সাথে,ভেতরের অন্তঃর্বাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।যার দরুন ওড়না ছাড়া ভিষণ বাজে দেখাচ্ছে তাকে।
কিয়ান একবার খেয়াল করেছে।যতই লয়াল হোক,পুরুষ মানুষ তো,নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষণ টা এড়ানো যায় না,না চাইতেও দৃষ্টি সেখানটাতেই আটকায়।তবে কিয়ান যথেষ্ট সংযত,অনুর দিকে একবার নজর পড়তেই দ্বিতীয়বার নজর দেওয়ার রুচি হয় নি,বরং নিজের পড়নের শার্ট টা খুলে বাড়িয়ে দিলো অনুর দিকে,ঠান্ডা অথচ গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“নিজেকে ঢাকো,ইউ লুকস অকওয়ার্ড।”
শার্ট টা নেওয়ার জন্য অনু নাজুক ভঙিতে হাত বাড়ানো মাত্রই একটা টর্চ লাইটের আলো এসে থুবড়ে পড়লো তার চোখেমুখে।অন্ধকারের মধ্যে হটাৎ আলো চোখে পড়তেই অনু মুখের উপর হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করলো।পরপরই কানে ভেসে এলো কারো গলা ছোড়া ডাক,
“এই কারা রে, কারা এইহানে?”
সঙ্গে সঙ্গে আরো দুটো টর্চ লাইট হামলে পড়লো কিয়ান আর অনুর মুখের দিকে।এমন বেয়াদবি টলয়েড করতে পারলো না কিয়ান,বিরক্তিতে নিশপিশ করে আওড়াল,
“হোয়াট দ্যা হেল?টার্ন অফ দ্যা টর্চ।”
গ্রামের সভ্য জাতি কিয়ানের কথা শোনার মেজাজে নেই,তাদের মধ্যে একজন টর্চ হাতে এগিয়ে গেলো তাদের দিকে।কিয়ানের উন্মুক্ত উদোম শরীর আর,পাশেই লুটিয়ে পড়ে থাকা অনুর ছেড়া ওড়না দেখে ভেবে বসলো এক বিকৃত ভাবনা,হাক ছেড়ে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজনের উদ্দেশ্যে বললো,
“শহরের পোলাপাইন মনে হইতাছে আব্বা।এইহানে জামাকাপড় খুইল্লা নষ্টামি করতাছে।”
কথার প্রত্যুত্তরে তৎক্ষনাৎ ভেসে এলো বয়স্ক কন্ঠের রুষ্ঠ স্বর,
“কয়দিন পর পর এই পোলাপান গুলা এইহানে আইসা নষ্টামি কইরা গ্রামডারে কুলষিত কইরা দিতাছে।ধর ওগোরে সুমন,আইজ কোন ছাড়াছাড়ি নাই।”
পরপরই লোকটা বড় গলায় চেচিয়ে ডাকলো আরও কয়েকজনকে,
“রহমান,সোহেল,রিয়াজ।সব্বাই তাড়াতাড়ি বাইরা।রফিক তুই গিয়া মসজিদে মাইকিং কর,পুরা গ্রামবাসীরে এহনি এইখানে হাজির হইতে ক।”
চলবে,,,,,

